অবশেষে সকলেই বাড়ি ফিরে যায় ||পঙ্কজ বণিক

অবশেষে সকলেই বাড়ি ফিরে যায়

পঙ্কজ বণিক
........................

আমার এই কবিজীবনের শুরুতে বিশালগড়ে যে ক'জন কবির কবিতা প্রেরণার উৎস হয়ে ছিল, তাদের মধ্যে কবি তপন দেবনাথ অন্যতম। কবির চূড়ান্ত সান্নিধ্য পাইনি কখনও। তার পূর্বেই তিনি চলে গেলেন। ১৯৯৯ সালের ১লা এপ্রিল - মাত্র ২৯ বছর বয়সে অামাদের সকলকে বোকা বানিয়ে তিনি চলে গেলেন। কবির মৃত্যুর পর ২০০৪ সালে আগরতলা বইমেলায় কবির একমাত্র একক কাব্য সংকলন 'অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো 'প্রকাশিত হয়। সংকলনটি ৩২ পৃষ্ঠার, যা কবির অপ্রকাশিত কবিতার সংখ্যার দিক থেকে খুবই নগন্য একটি সংকলন। তারও আগে জীবদ্দশায় কবির যৌথ কাব্য সংকলন ' বাঁশের সাঁকো '(১৯৯৫) প্রকাশিত হয়। কবি তপন দেবনাথের প্রচুর কবিতা অাজও অপ্রকাশিত রয়ে গেল। কবিতাগুলো এখন কবি অপাংশু দেবনাথের তত্ত্বাবধানে আছে। 

কবির মৃত্যুর প্রায় ১৮ বছর অতিক্রান্ত। এমন এক সংবেদনশীল কবিকে নিয়ে তারপর আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যে আর কারোর স্বর শোনা গেল না। আমরা দেখি, বিশালগড়ের অপর অকালপ্রয়াত প্রতিশ্রুতিবান তরুণ কবি জাফর সাদেকের কবিকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন আরেক তরুণ কবি তমাল শেখর দে। কবি সন্তোষ রায় সম্পাদিত ' জলজ ' কবিতাপত্রে আলোচনাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে সেই আলোচনা কবি তমাল শেখর দে'র একটি প্রবন্ধ সংকলনে স্থান পায়।

আমরা চাই, এই মরমী কবির অপ্রকাশিত কবিতার ভুবন প্রকাশিত হউক ও আলোচনার আলোকে আসুক। ত্রিপুরার নতুন প্রজন্ম জানুক এই কবিকে।

কবির 'অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো' কাব্য সংকলনের প্রথম কবিতটি নিচে দেওয়া হল -

***
পাখি, সব নিয়ে যা

তপন দেবনাথ
.........................

পাখি, সব নিয়ে যা দ্রবীভূত স্মৃতিগগুলোও নিয়ে যা
অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল থেকেই যায় মানুষের পৃথিবীর ঘন উপত্যকায়
পলিথিন ফেলে যাওয়ার মতো
দীর্ঘকায় হাত দিয়ে ভ্রমগুলো ব্ল্যাক-বোর্ডের গা থেকে মুছে দিতে চাই
চাইলেই কী আমাদের মনোকামনা অনুযায়ী সাজে ভ্রমগুলো?
এক অনুতপ্ত বিকেলবেলা বারে বারে ফিরে আসে আমাদের অশ্বাকৃতি জীবনে
বিকেলের রোদকে তেজহীন করে ভিখিরি করে
পাখি, দেখিস্ সব কিছু যাতে যথাযথ নিয়ে যেতে পারিস
শ্মশানের সন্ধ্যাঘাসে ভেজা অনুভূতির মতো মৃত হয়ে আসা 
অচেনা হয়ে আসা
তোমাদের নিয়ে আলোচনা চলে ভরপুর -
মেয়েরা এমনই হয় -অনেকটা অভিজ্ঞ চালে বলে যাই
মেয়েদের মায়েরা আরো অনেক গল্প জানে
আঙুলের ফাঁক গলে পরে গল্ গল্ ঢালাই স্মৃতি
মাসিমা, ছবি হওয়ার আগেই গল্পগুলো কবিকে বলে যেয়ো
অনুভূতিগুলো অপুষ্ট উপজাতি শিশুর মতো মরে যায়
শুকায় অজৈব স্বপ্নসমূহ
জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া পাখির পালকের মতো
আসন্ন ধ্বংসের খবর জেনেও আমরা তবু কেন আগুনমুখী?
পতঙ্গেরা নয় আগুনের বিজ্ঞান নাও জানতে পারে ;
কিন্তু
আমরা তো জানি।

খ.

কবি তপন দেবনাথ তার কবিতায় আমাদের সামাজিক পারিবারিক এমনকি রাজনৈতিক ভুল-ত্রুটিগুলোর কথা তুলে ধরেছেন নিপুণভাবে । সমাজকে পাল্টানো কবির কর্ম নয়। কবি শুধুু আঙুল দিয়ে স্পষ্ট তুলে ধরেন আমাদের অনটন। কবি তপনের কবিতায় সেই হাহাকারগুলোই এভাবে উঠে আসে -
'' অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল থেকেই যায় মানুষের পৃথিবীর ঘন উপত্যকায়
পলিথিন ফেলে যাওয়ার মতো
দীর্ঘকায় হাত দিয়ে ভ্রমগুলো ব্ল্যাক-বোর্ডের গা থেকে মুছে দিতে চাই
চাইলেই কী আমাদের মনোকামনা অনুযায়ী সাজে ভ্রমগুলো? " (পাখি, সব নিয়ে যা)
তপনের কবিতার ভাষা লুসিড। তর তর করে তিনি কবিতা লিখতে পারতেন। পাঠককেও বেগ পেতে হয় না তার কবিতা কমিউনিকেট করতে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক সুখ- দুঃখ-অভাব-অনটন -হাহাকারের কথা উঠে আসে তার কবিতায় । মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা উঠে আসে যেমন, উঠে আসে বিড়ি শ্রমিকটির কথা -
"বিড়ি শ্রমিকের বউ কাঁচালঙ্কায় মাখামাখি করে খাবে
ভাতের জীবন অথবা জীবনের ভাত " (অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো)
খেয়ে বাঁচি, নাকি খাবো বলে বেঁচে থাকি আমরা, স্পষ্ট হয়ে যায় যখন কবি বলেন -
" আলোমুখো পঙ্গপালেরর মতোন কে আর বোঝে
অত কুহক গোমরতা
অত জীবনের মানে? ক্লীন্ন গোধূলির মানে?" ( অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো) 

মায়ের জন্মভূমির প্রতি কবির রক্তগত টান রয়েছে। পিতামাতার জন্মভূমি ত্যাগের প্রত্যক্ষদর্শী না হয়েও পূর্ববঙ্গের স্মৃতিকাতর ব্যথা কবির মনে বেজে চলেছে এইরকম-
" স্বাধীন সীমান্ত থেকে অন্য দেশ দেখি, যেখানে মায়ের জন্ম
বিষাক্ত ক্ষত নিয়ে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকি ফতুর বালক কোনো" ( অভিমন্যুর কাছে শিখি)।
অথবা, 
'' আমার বাবার দ্বিতীয় স্বদেশ আমার হাতে
আমার প্রথম স্বদেশ হয়ে যায়।'' (আজব)

বহিরঙ্গের পৃথিবীতে আমরা নিজের আত্মপরিচয় নিজের আত্মউন্মোচন বিস্মৃত হতে চলেছি। নিজেকে লুকিয়ে রেখে স্বার্থসিদ্ধির পথে হাঁটছে মানুষ। এক অন্ধকার ঘিরে রেখেছে আমাদের আত্মপরিচয়। কবি এই দুঃসহ বোধকে অনুধাবন করে লিখেন -
" এক সময় নিজেকে চিনে নেওয়ার দক্ষতাও লুপ্ত হয়ে যাবে
অন্ধ অন্ধকারে 
ভয়ংকর অন্ধকার, ললাটে লেপা হয়ে থাক
অসংখ্যবার তবু নাটকের রিহার্সালের মতো হাঁক দিই
- কে লুকাও নিজের ছায়ার অন্ধকারে।" (অন্ধকার) 

কবির আছে উদাত্ত আহ্বান, স্পষ্ট স্বরে দিক নির্দেশনা। কবির কোন আদেশ নেই। 
কবি সম্ভাবনার কথা বলেন গভীর প্রত্যয়ে কিংবা কখনও সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন -
" আমার বীর্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল
মেট্রোপলিটন সিটির আলো ও অন্ধকারের মতো
অথচ তুমি চাইছো একটিমাত্র সন্তান
(আমার ভেতরের দেবতা ও দানব কার আদল পাবে তবে?) (বীর্য)
আবার এমনও বলেন কবি-
''আমাদের সম্ভাবনাও আমরাই মুছে যাই
ভাঙা গলায় রামায়ণ পড়ার মতো
উদাসীন বালির স্তরে চড়ুই পাখির মতো আমাদের গল্প
আমরাই মুছে যাই। '' (স্বাক্ষরহীন) 

অথবা, '' খড়ের স্তূপ রাশি রাশি বিড়ম্বনার মতো
কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের মতো শুকিয়ে শুকিয়ে
মরে চিকিৎসাহীন গ্রাম্য বালকটির মতো '' ( ঝিনুক কুড়াও)

বাঁধাধরা জীবনযাপন করে যারা,তারা হিসেবি ভীষণ। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করেই ফেলেন। এতসব হিসেবের পর আমরা ভুলে যাই অনেককিছু, ভুল করে ফেলি - কবি বলেন-
"যেমন দুপুরের আহারের কথা ভুলে যাই
যেমন মনে থাকে না আমাদেরও একটা সভ্যতা ছিল
আসলে বেনিয়াদের কাছে আমাদের অংক শেখা উচিত ছিল " ( স্বাক্ষরহীন) 
পৃথিবীটা এখন বেনিয়াদের অংকের হিসেবে চলছে। শিল্পপতি পুঁজিপতিদের সময় এখন। পৃথিবীর শাসনভার যেন তাদেরই হাতে। কিন্তু সৃজনশীল ব্যক্তি সে' হিসেব জানে না বলেই সে কবি -লেখক হতে পেরেছে। 
অধুনা বাজার সভ্যতার প্রতি কবির বিষোদগার কিভাবে প্রকাশিত হয়েছে ' বাজার' কবিতার এই পংক্তিগুলো তা স্পষ্ট করে দেয় -
''গাছগুলো ফল দিয়ে আমাদের মায়ের মতো আদর দিত
তাকেও কেউ না কেউ বাজারে এনে ছেড়ে দিয়েছিস
আমাদের গৃহপালিত পশুদের মতো
রাজনীতির লোকেদের প্ল্যানমাফিক দাঙ্গা ছড়ানোর মতো
এমনতরো বাজার আমাদেরও বাজারী করে দিয়েছে
আমাদের জননাঙ্গকেও বাণিজ্যিক করে দিস্
অষুধে, প্রসাধনে, খাদ্যে আমাদের বাজারমানসিকতা
কলার খোসার মতো যত্রতত্র পড়ে আছে
....................................

যে ঘাসগুলো কবিকে মোলায়েম দেশী মদের জলের মতো তৃপ্তি দিত
তাকেই বাজারে এনেছে কেউ।'' (বাজার)

নারীদের চিরন্তন ব্যথা -বেদনার কথা কবি তার অপূর্ব কাব্য উপমা ও চিত্রকল্পে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে - 
১. এমন আগুন পরীক্ষায় আরো যেতে চাও? তবু কী সাধ্বী হতে চাও 
কবি জানতে চাইলেন
কোনো কী ফারাক ছিলো অশোককাননের ছায়া আর
পোড়া গায়ে? ( অঞ্জনা বোষ্টমীর সীতাগান)
২.যে নারী স্পর্ধিত চিৎকারে বলে উঠেছিলো একদিন
দুর্যোধনের সামনে, যেখানে দ্রোণাচার্যও ছিলেন, ছিলেন ভীষ্মও 
-'আমি নই কোনো ব্যবহার্য সরঞ্জাম। ' ( অথ প্রসূতি সদন কথা)
৩. বোন তুই ফিরে আয়, মায়ের কোল নিঝুম ফাঁকা.... মানবের কাছে আসবে না আর ভীরু পায়ে কিশোরী একা একা। (যজ্ঞ ঘোড়া) 
৪.তোমাকে সরিয়ে আনবার নামে হয়ে গেল
এক রক্তক্ষয়ী আস্ফালন ( অঞ্জনা বোষ্টমীর সীতাগান)
৫. কালো মেয়ে ছুঁয়ে যেতে চাই তোর হৃদয় নামক অঙ্গ
স্ফূর্তিছলে বন্ধুরাও বিবাহের রাতে ছুঁয়ে যায় তোর স্তনযুগল। ( বিবাহ রাত্রি)
৬. মেয়ে, আমি তোর নোংরা নেবো আমি তোর গরল নেবো
আমি তোর সংবহনতন্ত্র, স্নায়ু নিয়ে যাবো
নেবো রূপকথা ছড়ানো হৃদয়  (ফতুর বালকের জন্য) 

৭.নতমুখ উপজাতি বালিকা তুই
অভাব অভিযোগ ভ্রুতে রাখিস ঢেকে ( থিতু হয়ে যাই)
৮. বেশ্যাদের একটা নিজস্ব কাহিনী থাকে
পুরাতন রাজবাড়ীর মতো ( বৃদ্ধ বটের দীর্ঘ ছায়ার মতো).....
পতিতাদের যেমন কোন স্বাক্ষর থাকে না কোন উইলে ( স্বাক্ষরহীন)

উপমানির্ভর ও সরল চিত্রকল্পে ভরপুর তপনের প্রায় সকল পংক্তি। তপন দেবনাথের সমস্ত কবিতায় যেন এক বিনয়ী আবেদন ছড়িয়ে আছে। অভিযোগ যেন আবার অভিযোগও নয়। সরল রোদে লক লক করে বেড়ে উঠা লাউ ডগার মতো তার কবিতার ভাষাও আমাদের সূর্যগামী করে তোলে। এত কিছুর পরেও কবিই লিখে যেতে পারেন-
''আসন্ন ধ্বংসের খবর জেনেও আমরা তবু কেন আগুনমুখী? 
পতঙ্গেরা না হয় আগুনের বিজ্ঞান নাও জানতে পারে;
কিন্তু
আমরা তো জানি।''(পাখি,সব নিয়ে যা)
বর্তমান পৃথিবী সেদিকেই যাচ্ছে, এ যেন জেনে শুনে বিষপান। তবু কবি আরেকবার আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। দিয়েছেন অাশ্বাস-
'' এই শাদামাটা যৌবন নিয়ে ফিরে ফিরে
যতটা হাসি টেনে টেনে লম্বা করা যায়
ইলাষ্টিকের মতোন। ''( অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো) 

এতসব গূঢ় কথার জানান দিতে দিতে কবি তার প্রিয় মনবালিকাকে উদ্দেশ করে লিখেন -
'' ঝিনুক কুড়াও মেয়ে ঝিনুক কুড়াও
কবি মরে যায় বিকেলের মৃত আলোর মতো
বাড়ী ফিরে যায় ঝাঁক ঝাঁক অতিথি পাখি ''( ঝিনুক কুড়াও) 
তবে কি কবিও ওপারে ফিরে যাবার কথা আমাদের শুনিয়ে গেছেন। তবে '' মৃত্যু কি নদীর সমুদ্রে মেশার মতো কোন এক পরম্পরা? ' নাকি অন্তর্মুখি অন্ধকারে সকলেই 'অবশেষে বাড়ী ফিরে যাবো' একদিন। 

কবির আসা :  অক্টোবর ১৪,  ১৯৭০
কবির যাওয়া: এপ্রিল  ০১,  ১৯৯৯

( বি: দ্র: আলোচনাটি ইতোমধ্যে এয়োদশ বিশালগড় বইমেলা ২০১৮-র স্মরনিকায় প্রকাশিত) 

*************

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ