আজ বেবী সাউয়ের অনুবাদে সুগতকুমারীর একটি কবিতা পড়লাম। বেবী কবি ফলে কবিতাটির খুব সুন্দর অনুবাদ করেছে। বোধ হয় গত বছর আজকের তারিখে পোস্ট করেছিল। আজ সেটি ফিরে এসেছে। আমি মাস চারেক আগে সুগতকুমারীর অন্য একটি কবিতা অনুবাদ করি। ভাবলাম বেবীর অনুবাদের পাশাপাশি সুগতকুমারীর আর একটি কবিতা ফেসবুকে থাক।
কন্যাসন্তান
( একটি মলয়ালম কবিতার বাংলা অনুবাদ )
সুগতকুমারী
অনুবাদ : রামকুমার মুখোপাধ্যায়
অজানা বাড়ির বাইরের বারান্দায়
অন্ধকারে নামিয়ে রাখছি
এই অবৈধ সন্তানকে
শোনো, একে ভালো করে নজরে রেখো
এ এক কন্যাসন্তান
ক্ষমা করো, মারতে পারিনি
তোমার বুকের উপরে ওকেও
থাকার একটু জায়গা দিও
চোখের জলের মুষলধারায়
মা ওকে চান করায়
তারপর বুকের দুধ খাইয়ে
কপালে চুমুর টিপ দেয়
আমি আলতো হাতে
তোমার বুকের হলরেখায়
নামিয়ে রাখছি মৃত্তিকাজননী
অসহায় অনাথা ছোট্ট সীতাকে
কাল যে নতুন দিনের সূর্য উঠবে
তা কি এই মেয়েটার জন্যেও ?
নাকি কুকুরের ধারালো দাঁতের কামড়ে
আজকের রাতই ওর শেষ রাত ?
তারপর কাল কী ? হায় কপাল
একটি মেয়ে, শিশুকন্যা, তার
জন্মের দিনেই পরিত্যক্ত হলো
এ কোন্ জীবন ও পেল ?
ও কি কোনোদিন বুঝতে পারবে
"ভালোবাসা" শব্দের অর্থ
এক ক্লান্ত বিবর্ণ মুখে
ও কোন্ অনাথখানায় গিয়ে উঠবে?
ওকে কি বিদেশে উড়িয়ে নিয়ে যাবে
ভারতীয় গিনিপিগের মতো
শোয়ানো হবে বিজ্ঞানের টেবিলে
কোনো কিছুর নমুনা হিসেবে ?
ও কি কোনো গৃহস্থ বাড়িতে
হতে পারবে স্নেহের মেয়ে
কোনো পুরুষ কি ওকে ভালোবেসে
বুকে টেনে আদর করবে?
কে ওর জন্যে জোগাড় করবে
বরপণের লাখ লাখ টাকা
কে আছে ওর শরীরটাকে
সোনার গয়নায় মুড়ে দিতে?
সোনার পুরো দাবি না মেটায়
ওকে কি তরল আগুনে পোড়ানো হবে
কিংবা স্বামী কি ওকে ছেড়ে যাবে
যেদিন ওর যৌবন ফুরিয়ে আসবে?
ওকে কি ঝিয়ের মতো খাটাবে
ঠেলে দেবে মৃত্যুর দরজায়
মদে চুর হয়ে ওর স্বামী কি
ওকে মেরে ক্ষত-বিক্ষত করবে?
ওকে কি নিলামে তুলে
বাজারে বিক্রি করে দেবে
ওকে কি শুষে শেষ করে দেবে
রাস্তার ধারের ওই যৌনালয়ে?
তারপর ওর ছিবড়ে শরীরটা
নর্দমায় জলে ফুলে উঠবে?
হাসপাতালের বারান্দায় মরে
ওর শরীরটা কি পচতে থাকবে?
ক্ষমতার আগুনও সন্তানের মতো
জন্ম নিতে পারে ওর ভিতরে
তখন পৃথিবীর দহনের উপশম মিলবে
ওর ওই শীতল কাঁধের উপরে
আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি
এমনকী এই শিশুটির ব্যাপারেও
আজ অবাঞ্ছিত বলে যে পরিত্যক্ত
অর্থলোলুপদের আগাছার জগতে।
অন্ধকার হালকা হয়ে আসছে
থাকার আর কোনো উপায় নেই
ওর ললাটে একবার চুমু দিই
একবার এবং এ-জীবনে শেষবার
পিছনে তাকিও না, ছোটো,
দূরে চলে যাও, অনেক দূরে
কাঁদা চলবে না, ঢেকে ফেলো
তোমার মুখ আর দু কান
চোখ দুটোকে শুকোতে দাও
জলে ভরে গেলে গড়াতে দিও না
ভারী বুকের উথলে পড়া দুধ
হাত দিয়ে মুছে নাও
যাও, বুকের ক্ষত থেকে
রক্ত পড়তে দিও না
পিছনে ফিরে তাকাতে নেই, ছোটো
ছুটে চলো দূরে, অনেক দূরে।
------
সুগতকুমারীর জন্ম ১৯৩৪-এ আর প্রয়াণ ২০২০-তে। উপরের কবিতাটি গত ইংরেজি শতকের নব্বইয়ের দশকে ছাপা হয়। মলয়ালমে নাম ছিল 'পেনকুঞ্জু নাইনটি'। পেনকুঞ্জু শব্দের অর্থ 'কন্যা সন্তান' আর নাইন্টি মানে নব্বইয়ের দশক। আমার মলয়ালম বন্ধু এবং সাহিত্য অকাদেমিতে এক সময়ের সহকর্মী এ জে টমাস এটি আমাকে মাস চারেক আগে পাঠিয়েছিলেন। মলয়ালম থেকে ইংরেজি অনুবাদ টমাসের নিজের।
0 মন্তব্যসমূহ