একটি গদ্য উপন্যাস || নির্বাণ পথ || সুবল দত্ত


নির্বাণ পথ
সুবল দত্ত
॥প্রথম অধ্যায়॥
বিচ্যুতি                                                      

 ১     
Perineum/বিলয়/সাত সেকেন্ড

মৃত্যু তার দেহ থেকে মাত্র পাঁচ সেকেন্ড দূরে। কোমরের নিচে এখনো ভার। এখনো রাত দিন আকাশ ও ভয়ের অনুভব। প্রাণশক্তি ছেড়ে যাওয়ার অনুভব গহন চেতনাতে এখনো আসেনি কিন্তু এবার স্পষ্ট টের পেল তার অন্তর্মন তাকে আর আমল দিচ্ছে না। আগে যেমন হতো,চিন্তার গভীরে...আরো গভীরে অন্তর্মনের ইচ্ছেমতো ভেসে যাওয়া বা কোনো চিন্তা আবর্তে ঢুকে যাওয়া টের পেতেই সে সহজেই টেনে এনে নিজের কর্ম মতন চিন্তা ও বিচারধারায় বসিয়ে দিতে পারতো। এখন সে কোনো কথাই শুনছে না। এখন তার অন্তর্মন অতীতের এলোমেলো আবেগ বিস্ময় ও ভালোলাগাগুলি অজানা অংকের নিয়মে ছন্দবদ্ধ করে প্রাণশক্তির পোঁটলাতে ভরতে ব্যস্ত। যতক্ষণ জীবন থাকে, প্রাণশক্তির কোনো পরিমাপ হয়না, ক্ষতি বৃদ্ধির হারও হয়না। সে আদি অকৃত্রিম না শূন্য না অসীম না সঞ্চারণশীল না স্থির। যখন শরীর মন তার থেকে বিচ্যুত হয় তখনও সে তেমনিই থাকে। এখন মৃত্যুর আগে অন্তর্মন জাতীয় বিজাতীয় অজস্র বোধ ও অনুমানের সারগুলি এক আধারহীন শক্তিতে পুরে দিয়ে তার মধ্যেই নিজেকে বিলীয়মান হতে চায়। যেন এই কর্মছকটি অবশ্যম্ভাবী পূর্ব নির্ধারিত। প্রাণশক্তি ত্যাগের এই কি সূচনা? কিন্তু এখন তার মধ্যে প্রশ্ন নেই বিচার নেই চিন্তা নেই তাই যা হচ্ছে সেটার নিস্তার বেগ নেই। সবই এখন সমান্তরাল।

    তার বহির্মনের আকাশ এখন শূন্য, তরঙ্গহীন। একদম সপাট বর্ণহীন নিখাঁজ। বহির্মন সারাজীবন ধরে অস্থির করে রেখেছিল।এমনকি ঘুমের মাঝেও তাকে খুঁচিয়ে তুলে ছোটো ছোটো স্বপ্নের আকারে সমস্যা ও প্রশ্ন হাজির করত। ঘুম থেকে জেগে উঠে খুব অস্পষ্ট হলেও জানা অজানা ভয় রাগ দুশ্চিন্তা বা লোভ সাময়িক তাকে অস্থির করে তুলতো। বহির্মনের এত তীব্র শক্তি যে কখনো ঘুম থেকে উঠে দেখত তার অন্তর্বাস শুক্ররসে ভিজে গেছে। কী এমন অদৃশ্য শক্তি যে বাহ্য বিষয়বস্তুকে চালনা করতে পারে? ভাবা যায়না। কী এমন শক্তি যার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় পঁচিশ মিটার দূরে থাকা কোনো একটি মানুষের গালাগালিতে ক্রোধে তার শরীর গরম হয়ে উঠত? কর্মমুখর থাকতে থাকতে কতবার যে বহির্মনের অসংখ্য রকমের অদৃশ্য অন্তর্ঘাতে দুর্বল হয়ে গেছে তার হিসেব নেই।

    কেবল গভীর ঘুমে যখন তার চোখের পাতা দু চারবার কেঁপে স্থির হয়ে যেত তখন বহির্মন অন্তর্মনে বিলয় হতো।

সেই ক্ষণগুলি ছোটো ছোটো মৃত্যু। সেই বিলয় ছোটো ছোটো পর্যাবৃত্ত মৃত্যু। কিন্তু এখন তা পূর্ণতাগামী। সমস্ত সারগুলি একে অপরের সাথে বিলীয়মান হয়ে সে এখন শূন্যতা প্রাপ্ত হতে চলেছে। এই পূর্ণ শূন্যতাবোধে সে তার স্বরূপের আভাস পাচ্ছে। বুঝতে পারছে এই নেই বোধটিই অমূর্ত আমিত্বের প্রকাশ। যার স্বভাব অচল। যে দেশ কাল পাত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। সে অচল থেকে যেমন খুশি স্থান সময় আকার বানিয়ে নিতে পারে। সময় সেখানে বিলকুল অর্থহীন।

      বহির্মন যখন তখন ঘটনা বানিয়ে ফেলত। যখন তখন অতীতে ঢুকে টেনে বার করতো ছোটো ছোটো অশান্ত অগভীর স্মৃতি। কল্পনা মিশিয়ে উত্তেজক করে তুলত। শরীরকে কষ্ট দিত আর পরিবেশকে দুমড়ে মুচড়ে বিকৃত করে তুলত। শরীর বরং তাকে বিশেষ কষ্ট দিত না। সুস্থ সবল থাকার জন্য শরীর নিজের বিপাকীয় ক্রিয়াগুলো নিজে নিজেই করত। বরং শরীর ভাঙার কাজে বহির্মন অন্তর্মনকে প্রলোভন দিত। শরীর নষ্ট করার কাজে জিতেও যেত। শরীরকে অনেকরকম ক্ষতিকারক নেশায় আসক্ত করার কাজে বহির্মন নিজেকে খরচ করতে অনেক সময় নষ্ট করত।

     এখন বহির্মন নিঃশেষ। শরীর এখন নিশ্চিন্ত আর অতি বিচক্ষণ স্বয়ংক্রিয় কুশলী যন্ত্রের মত নিজেকে স্তব্ধ করার কাজ করে চলেছে। নিজের ভিতরে অসংখ্য অর্বুদ অর্বুদ জৈব ঘড়িগুলির অর্বুদ অর্বুদ নির্দেশগুলি নিমেষে পালন করে যাচ্ছে। শেষ হচ্ছে অসংখ্য জৈবিক রস। সারাজীবন ধরে মাথার ভিতরে নিরাসক্ত নিষ্ক্রিয় বেকার কিছু কোষকলাকে তার শরীর সযত্নে লালনপালন করে এসেছে সেইগুলি জেগে এখন মারমুখী সংহারকর্তা হয়ে শরীরনাশের কাজে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এবং আশ্চর্য! শরীর নিজেকে তাদের হাতে সমর্পণও করে দিচ্ছে !

    প্রকৃতি ও অপ্রাকৃত অলৌকিক দেশের মাঝে অবর্ণনীয় অজ্ঞাত আড়ালটি ইতিমধ্যে তার কাছে স্পষ্ট পরিষ্কার। তাই শরীরকে বাধা দেবার কোনো উপায় নেই কারণও নেই। শুধু তার নাসিকার ভিতরে কোষকলাগুলি বেঁচে থাকার একটি আনুষ্ঠানিক স্বয়ংচালিত ইচ্ছাকে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। তাই হিক্কার ও সোঁ সাঁ শব্দ। তবে অন্তর্মনের গভীরে এই অজ্ঞাত প্রাচীরটির তথ্য ছিলো,কিন্তু অন্তর্মনের কাছে সেটির উন্মেষের সংকেত ছিল না। তাই সে জীবনে এক আধবার  অন্তর্মনের গভীরতলের খোঁজ পেলেও এই বোধটি তার কাছে একেবারে অজ্ঞাত ছিল। বরং সে মনের প্রত্যন্ত গভীরে গিয়ে মৃত্যুভীতি ছুঁয়ে এসেছিল।তাই শরীরনাশের চিন্তা হতনা।সেই প্রাচীরটির বোধ ভেদ করে প্রকৃতি থেকে অপ্রাকৃতে যাবার জন্যে এখন সে তৈরি।শরীর থেকে নিজেকে আলাদা করার সংকেতগাঁঠ খুলে দৃশ্য ব্রহ্ম থেকে অদৃশ্য মহাব্রহ্মের অসীম শক্তি সমুদ্রে মিশে যাওয়ার এক অপার্থিব স্বয়ংক্রিয় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার জন্যে সে পুরোপুরি তৈরী।

     বহির্মন অন্তর্মনে লীন হবার ঘটনাটি তার অনুভবে এখন স্থিরচিত্র। প্রাণশক্তিতে সমস্ত প্রেম অপ্রেম বোধ সংস্কারগুলি ভরে দেবার জন্যে অন্তর্মন উন্মুখ এবং এই যে, ভরে দিচ্ছে এবং সে ক্রমশ শেষও হয়ে যাচ্ছে,তাও সে প্রত্যক্ষ করল। অন্তর্মন তো প্রাণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে,কিন্তু শরীর প্রবাহ থেমে যাওয়া অব্দি তাকে অপেক্ষা করতেই হবে। তাই সে এখন নিস্পন্দ আলোড়নহীন। এখন নিজের শারিরীক জীবনযাত্রার স্মৃতিগুলির সাথে একটি অনন্ত শৃংখলের  মত তার বংশ পরম্পরা, মানব সমগ্র, পার্থিব প্রাণীকূল আদি জৈব প্রকৃতির সমস্ত স্মৃতি সংকেতগুলি দ্রুত গাণিতিক ছন্দে প্রাণের ভিতরে নিজে নিজেই বিন্যস্ত হচ্ছে সেটা সে সাক্ষী হয়ে প্রত্যক্ষ করল। রাগ অনুরাগ সত্য মিথ্যা এইসব ভাবগুলি, অনুকূল প্রতিকূল আবেগ, দৈহিক ও মনোরম প্রেমের সমস্ত স্তরগুলি এক একটি অবাস্তব শক্তি পুঁটুলিতে সামঞ্জস্যে জমা হতে লাগলো। এই সব মুহুর্তের মধ্যেই দেখতে দেখতে সে জীবিতকালের অতীতের সীমাপ্রান্তে পৌঁছে গেল। সে তার শূন্যকাল প্রত্যক্ষ করল। চেতনের গর্ভ আবরণ তখনও বিলীন হয়নি। গর্ভের ভিতরে অগণিত মাতৃ চেতননাড়ির স্রোত প্রবহমান। গর্ভ আবরণের বাইরে অসংখ্য পার্থিব প্রাকৃতিক আলো গন্ধ শব্দ তরংগের অনুমান। এখন মৃত্যু সীমানায় সেইগুলির নিমেষ বোধ। জন্মলগ্নের শূন্যকালে ভ্রূণগত হওয়ার সংকেত মুহূর্তের সাথে এখনকার শূন্যকালের মৃত্যু সংকেতের আশ্চর্য মিল ! একদম এক ! এই বোধ। সে যেন নির্দেশ পেল এই দুই সংকেত একে অপরে উপরিপন্ন হয়ে গেলেই সে নিশ্চিত এক বৃহত্তর শূন্য দেশে প্রবিষ্ট হয়ে যাবে।

     এই বৃহত্তর শূন্যতা যে অসীম আনন্দ চেতনা তার এক ঝলক আবেশ পেল সে। যখন জীবনযাপন ছিল তখনকার হতাশ ও অসহায় ক্ষণে আতঙ্কের গভীরে তলিয়ে যেতে যেতে নিশ্চিন্ত নির্ভয় হবার অদৃশ্য অবলম্বন তার অন্তর্মনে আলো ভাব হয়ে আসতো সেই একটুকরো আলোহীন আলোর সাথে এই আভাসের মিল। সে বুঝলো এটি একটি আনন্দ শূন্যতা। এই আনন্দ শূন্যে শূন্য হয়ে মিশে যাওয়ার মুহূর্ত। এই মূহুর্তে জীবনযাপনের পরিশ্রুত ছবিগুলি প্রাণের এক একটি শক্তি পুটুলিতে অপসৃয়মান হওয়ার সময় এক দুটো সময় থেমে যাওয়ার মত আনন্দঘন ক্ষণ বোধে এল। এইগুলি এক একটি বিশেষ আনন্দ পুঁটুলিতে থাকা মানেই হল এগুলোর মহাব্রহ্মে কখনো পুনরাবৃত্তি হবেনা, এগুলো শাশ্বত ছোটো ছোটো অমৃত। ছোটো ছোটো মৃত্যুহীনতা। জীবন থাকতে তার এই জ্ঞান হয়নি। কারণ বহির্মনের সম্মোহক আবেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ইন্দ্রিয় উত্তেজক কল্পনাতে সে ফেঁসে থাকত আর আপাত বর্ণালী উষ্ণতায় বিভোর হয়ে থাকত। কিন্তু...এইযে...এই তো ! একটুকরো ভালোলাগা অতীত নিমেষে অপসৃয়মান হতে হতে তার বিলীয়মান অস্তিত্ব ছুঁয়ে গেল। একটি ভিন্ন মাত্রিক ক্ষণবোধ। আর...এইযে,আর একটি অপসৃয়মান দৃশ্য। আয়নায় তার একটি কৌতুহলী প্রতিবিম্ব। বিস্মিত ভাবনায় বুঁদ। আমি কে? আর একটি কৈশোর প্রতিবিম্ব। স্বমেহনের সময়কার একটি মুহূর্ত।শরীরের ভিতরে অজস্র লোহিত নদীর লক্ষ উপনদী উপউপনদী বেয়ে নিজেরই অসংখ্য অনুদেহ টেনে বেরকরে অসহ কষ্টের শ্বেত শুক্রস্রোতে নিজেকে বইয়ে দেবার বিক্ষেপ যন্ত্রনা। নিজেই নিজেকে ভিতর থেকে বাইরে বার করে দিচ্ছে তার কয়েক লক্ষ অনুশরীর বীজ।কয়েক লক্ষ অনুশরীরের মৃত্যু আক্ষেপ। এই তো ! ঠিক এখনকার বোধের মতই হুবহু। মৃত্যুজ্ঞান?

     এইরকম অসংখ্য ঘটমান অতীত পরিবেশ দৃশ্যাবলী সময় সম্পর্ক এমনকি সেগুলির সংশ্লিষ্ট আকাশ বোধের মুক্ত শৃঙ্খলগুলি এমন ভাবে দ্রুত সরে সরে যাচ্ছে যে সে বুঝল সে অনন্তকাল ধরে অপরিবর্তনীয় অটল অক্ষর এমনিভাবে একই জায়গায় রয়েছে আর অর্বুদ অর্বুদ জীবনযাপন এই ভাবে তার সামনে চিত্রকল্পের মত প্রাণগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শরীরে এখনো আভ্যন্তরীণ বেগবান রক্তপ্রবাহ কুলকুল। এই একটি বৃত্তীয় প্রাণ সংকেত। আবর্ত। বেগবান লোহিত কোষগুলিও এক একটি ঘূর্ণায়মান জীবনবৃত্ত। সেই অর্বুদ অর্বুদ জীবনবৃত্তে সমগ্রভাবে ঢুকে পড়ল সে। তাকে ঢুকতে হল। এটি একটি অবশ্যম্ভাবী আদেশ। যেকোনো একটি জীবনকোষে ঢুকে সে পেল অনুবৃত্ত তার ভিতরে পরমাণুবৃত্ত কণা উপকণা আলো তড়িত এইসব পরপর বেগবান ক্ষণবৃত্তের মুহূর্মুহু শক্তি রূপান্তর। সে বুঝতে পারছে সব শক্তির রূপান্তরণ এবারে শূন্যশক্তির দিকেই। আর সময় নেই। একের পর এক সে এইসবের ভিতর দিয়ে নিমেষে পার হয়ে এক অজ্ঞাত জ্ঞানের আবেগে থরথর কাঁপতে কাঁপতে প্রবল ঘূর্ণায়মান শূন্যশক্তির বেগে এক বিশালতায় এসে পড়ল। (ক্রমশ)

                                            


 ২                                          
Secral/উত্ক্ষেপণ/ছয় সেকেন্ড

 

  যে মেরুদন্ডীয় রসক্ষরনে সে এখন মৃত্যুগামী,তার উত্সটি এইমাত্র শুকিয়ে গেল। অভ্যন্তরের দেহাংশ ও সেগুলোর স্বয়ংক্রিয়তা দেখা বা বোধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। প্রকৃতি তার মায়াপর্দা দিয়ে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অনুভব কেন্দ্র আজীবন ঢেকে রাখে। এই বিশেষ বিপাকীয় জ্ঞান ক্রিয়া ওই কেন্দ্রটিতে সক্রিয় হলে সে মস্তিষ্ক হৃদয় ফুসফুস যকৃত শিরাউপশিরা পাকস্থলী যৌনগ্রন্থি এইসবগুলো অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নজররাখতে পারতো। বিশ্ব নিয়ামক সেই অন্তর্জ্ঞানটি কোনো প্রাণীকেই দেননি তাই সারাজীবন তার প্রয়োজনীয়তা জানতেই পারে না। এখন ক্ষণিকের জন্য সেই কেন্দ্রটি সক্রিয় হতেই শরীরবৃত্তীয় নানা বৃত্তপথগুলির পর্যবেক্ষণ বোধ সে জেনে গেল। সে দেখল, নিতম্বের কাছে মেরুদাঁড়ের প্রথম তড়িত্‍ জালিকা থেকে যে বৈদ্যুতিক রস উর্দ্ধমুখে মস্তিষ্কের জ্ঞানকেন্দ্র ছুঁয়ে আবার অন্যস্রোতে নিম্নগামী হচ্ছিল, সেই বৃত্তিয়পথটি বন্ধ হয়ে গেল। সে তো এখন মনশূন্য,ফাঁকা। মেরুদণ্ডের শেষপ্রান্তে এখনো নিবু নিবু উদ্দীপিত স্নায়ুজালিকাতে বৈদ্যুতিক রস। এইখানের উদ্দীপ্ত বিদ্যুতে সে চেতনায় যৌন পুরুষ ছিল। এইখানের বৈদ্যুতিক বিক্ষেপে তার পুরুষাঙ্গ দৃঢ় হতো।বহির্মন চাইত যৌনতা এবং সেই উগ্র যৌনকামনা কখনো বিকৃতকাম এবং তারফলে হিংস্রতা ভীতি এবং পরে ধিক্কার। এখন বিলকুল ফাঁকা। মুহুর্তেই সে এইসব বোধগুলিকে শক্তি পুঁটুলিতে অন্তর্মন সহ গায়েব হতে দেখেছে। অন্তর্মন যখন এই বিদ্যুত্‍রস সিক্ত বহির্মনকে পোষ মানিয়ে ফেলতে পারত, তখন এইরস ফোয়ারার মত উর্দ্ধগামী হয়ে মস্তিষ্কে সৃষ্টিশীলতাকে ভিজিয়ে ফেলতো। কলম ধরতেই বেরত একের পর এক কাব্যভাবনা চিত্রকল্প বিচারধরা অধ্যাত্মিক বিস্ময়বোধ। রং তুলি দিয়ে রঙের বিন্যাস ও হাত দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি রক্ষার নিয়মশৃঙ্খলা। নিজের সৃজনস্পর্ধা দেখে তার অন্তর্মন আনন্দে নিজেকে বিস্তৃত করে ফেলতো। তখন অহংকার তার অতি উত্তম সহকারী। সে তখন বহির্মনের বিক্ষিপ্ততা দাবিয়ে রাখতো। তার অহমবোধ যেন অসীমে ছড়িয়ে পড়তে চাইত।

    এখন উদ্দীপন নেই প্রশমন নেই,নেই কোনো নিম্নগামী ইন্দ্রিয়সুখ,কোনো উদ্দেশ্য বা বিপথুমান হওয়া, না কোনো কর্মের আগ্রহ বা নিস্পৃহতা। যে গুচ্ছ মূল জালিকা থেকে জনন রস ও সৃষ্টিশীলতার উত্সেচক ক্ষরিত হোত সে দেখল তার উত্সটি থেকে কমলা আভায় কালোপদ্মের আকারে কৃষ্ণশক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এই পদ্মটি থেকে এখনো ছয়টি পুঞ্জ পুঞ্জ কমলা রঙের পাপড়ির মত ক্ষীণ উত্তেজক কামনা নির্গত হচ্ছে। কিন্তু নিভু নিভু। এই ছয়টি ভিন্ন মাত্রার কমলা প্রভা সে চিনতে পারলো। এই রঙ তার লিঙ্গ বোধের অহংকার।এই ছয়টি কমলাউষ্ণতা ছয় রকমের কামনা। ছয় রকমের অপ্রতিরোধ্য গাণিতিক ফর্মুলায় রয়েছে সৃষ্টিরহস্যের নির্দেশাবলী। সেই কামনা প্রদাহ ভেদ করে একদিন এই অজানা কৃষ্ণ পদ্মের কেন্দ্রে অজ্ঞাতেই ঢুকে পড়ে পেয়ে গেছিল সৃষ্টিশীলতা। তার শরীর মন প্রাণ সৃজনশীলতার স্রোতে উর্দ্ধগামী মস্তিষ্কের বুদ্ধিদীপ্ত কেন্দ্র ভেদ করে ফোয়ারার মত মানবসমাজে ছড়িয়ে পড়তে চেয়েছিল।

   সে দেখল শক্তি পদ্মের শিকড়টি কোমরের এক ত্রিকোণ অস্থি বর্মের গর্তে থাকা মেরুদাড়ের বাঁকানো শেষপুচ্ছের জালজটে শেষ হয়েছে। আগে সেখান থেকে সংবেদন প্রবাহবাহী স্নায়ুসুতোগুলি মস্তিষ্কের ঘোলাটে ধুসর তরলে নিরন্তর প্রবাহিত হতো একিই সাথে সৃষ্টিশীলতা আত্মজ্ঞান ঈশ্বরবোধ এবং লিঙ্গোথ্থানশক্তি। সে দেখল পদ্মের কেন্দ্রে একটি পারদর্শী লিঙ্গের আকারে সে নিজেই আধারভূত দেহপ্রকৃতিতে প্রোথিত হয়ে রয়েছে এবং তাঁকে পেঁচিয়ে রয়েছে দুটি সাপের মতো উজ্জ্বল তড়িত্‍ প্রবাহ। এই বিদ্যুতের শিখা দুটি তেমনিই তেজি এবং একে অপরের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে উন্মুখ। তার বোধে দৃশ্যমান হলো কৃষ্ণ পদ্মের গভীর কেন্দ্রে এই দুইসাপ অটুট বজ্রবাঁধনে বাঁধা। অন্তর্মন যখন প্রাণশক্তিতে তার অতীত তথ্য ভরে  দিচ্ছিল তখন একটা ক্রিয়া দৃশ্য সে দেখেছিল। এই দুইশক্তি সাপের বজ্রবাঁধন খুলতে বহুবার সে সমাধির অভ্যাস করতো যাতে তার ব্রম্হজ্ঞান হয়।  তার এই প্রচেষ্টা সফল হয়েও ছিল কিন্তু তার সেটা বোধে আসেনি। এখন তার বোধগম্য হল। যদি এই শক্তিজট না খুলতো তাহলে কি সৃষ্টিশীলতার আনন্দে মজে থাকা তার মতন সংসারী মানুষের চাইলেই শব্দ ভাষা মর্মভেদীবোধ ভবিষ্যতে অমর হয়ে থাকার কোনো বিশেষ বার্তা আপনা আপনি কলম থেকে উত্সরিত হতো ? সে চাইত আর তার প্রগতিশীল মানবকল্যাণকর কর্ম অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত। স্বয়ং প্রকৃতি পরিবেশ ও সময় তার উপযোগী আধার তৈরি করে দিত। এখন সেই দিব্য শক্তিজটের সাক্ষাতে সে অভিভূত হয়ে গেল। সেইজন্যেই তো জীবনযাপনে তার শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক যেকোন স্তরে যেকোনো অনুভবে ও যেকোনো পরিস্থিতিতে তার পবিত্র যৌনতা ও ঈশ্বর চিন্তা তাকে আবেগে আপ্লুত করে রাখতো। আকর্ষণ, আবেগ, জাগরণ, সতর্কতা, আবেগ, আগ্রহ, অনুপ্রেরণা, উত্তেজনা, সৃজনশীলতা, উত্সাহের ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপে কম বেশি এই যৌনশক্তিই তো তাকে বারবার মনেকরিয়ে দিত যে সে এই পৃথিবীতে বেঁচে রয়েছে।

 এই আধার শক্তি স্ফুরনেই যে জীবনে প্রেমাবেগ অনুভবে এসেছে এখন সে তা প্রত্যক্ষ করল। যে যৌনশক্তিতে সারা যৌবন আচ্ছন্ন হয়ে ছিল সেটি একটি গভীরতম ও অন্তর্নিহিত অন্তরঙ্গ প্রেমের আধার এখন তার পরিষ্কার বোধগম্য হলো। দুই সমর্পিত শরীরের যৌনমিলনে হয় অবিচ্ছেদ্য প্রেম। এই যৌনশক্তির প্রবাহকে ঠিকমত চালনা করতে পেরেই সে জীবনযাপনে লজ্জ্বা ভয় বিকৃতকাম অপরাধবোধ হিংসাকে সহজেই দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছে এই গর্ব এখন অনুভূত হোল।ভালোখারাপ ভুলঠিক সত্যমিথ্যা মৃত্যু মৃত্যুহীনতা ঠান্ডাগরম আলোঅন্ধকার এইসব দ্বন্দ্ব সংকট থেকে এই যৌনশক্তিই তাকে মুক্ত রেখে আত্মবোধের পথে এগিয়ে নিয়ে যেত। এক সুবিন্যস্ত গাণিতিক নিয়মে স্তরে স্তরে যৌনতার গভীর খনির ভিতর থেকে আত্মবোধ ও ষষ্ঠইন্দ্রিয় তার জীবনপথকে পবিত্র করে রাখতো বলেই এই মৃত্যুমূহুর্তে তার প্রজ্ঞাদর্শন হচ্ছে। এই তড়িত্‍ বোধে সে কেঁপে উঠলো।

         জন্মলগ্নে মাতৃগর্ভ থেকে মাতৃযোনির ভিতর দিয়ে ভূমিষ্ট হওয়ার পরই তার প্রথম পার্থিব ডাকের কম্পনে এই কৃষ্ণপদ্ম বিদ্যুতাধার থেকে কমলা রঙের বিদ্যুত্‍ প্রভা সক্রিয় হতেই সে প্রথমেই মুখে নিতে চেয়েছিল মাতৃস্তন। সেই থেকেই সারাযৌবন ধরে তার প্রাণ ও অপান শ্বাসবায়ুর মতই স্বাভাবিক যৌনচেতনার প্রবাহ। তাই শরীরের সংরচনা এমনই যে শ্বাস প্রশ্বাসের মতই ক্ষণে ক্ষণে যৌনশক্তি রূপান্তরিত হচ্ছিল কর্মক্ষমতায়। এই নিভন্ত বিদ্যুত্‍ প্রবাহটি ছিল বাঁচার ইচ্ছে, পৃথিবীকে জানার ইচ্ছে, পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছে ও প্রেম প্রকৃতিপ্রেম বিশ্বপ্রেম অনুভব।

      এখন কশেরুকার শেষপ্রান্তে দেখল কৃষ্ণপদ্ম থেকে কৃষ্ণউষ্ণতা নিভন্তের মুখে। তার বোধ হোলো, এই মহাবিশ্বে একটিই শক্তি অগণিত শাখা উপশাখা মেলে আছে। তার সৃষ্টি নেই বিনাশ নেই। শুধু তার অসংখ্য ডালপালার অসংখ্যবার একটি অপরটিতে রূপান্তরণ হতে থাকছে। তার অস্তিত্বের এই কৃষ্ণপদ্মটি নিখিল ব্রহ্মান্ডের মহাকৃষ্ণবিবরেরই একটি অনু অংশ। তার অস্তিত্বে এখনো যেটি রয়েছে সেটি ক্ষুদ্র প্রাণশক্তি তারই একটি কণা রূপান্তর। এই অথৈ মহাকৃষ্ণবিবর শক্তিসমুদ্রে মহাবিশ্বের সমস্ত আলো অস্তিত্ব যে কয়েকটি ছোট প্রদীপের মতো ভাসছে এটা সে জ্ঞানচোখ দিয়ে দেখল। সে বুঝল তার শরীরের অজ্ঞাত এই কৃষ্ণপদ্মটি উর্দ্ধমুখে তড়িত ক্ষরিত হয়ে ব্রহ্মান্ডের কৃষ্ণমহাশক্তি সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। এবং তার সাথে সাথে সেও সেই স্রোতে বহমান।

     এই অপ্রতিরোধ্য অবর্ণনীয় ফোয়ারার মতো নানা রূপশক্তিস্রোত তাকে তুলে নিয়ে চলল। ক্রমে ক্রমে কমলা কামনা থেকে হলুদের অনুভব। যত নিম্নজট থেকে উপরে উঠছিল তত তাকে স্বর্গীয় প্রশান্তি ও আনন্দের অনুভব ধুইয়ে দিচ্ছিল। যেন এ এক আনন্দময় নিস্ক্রমন। প্রকৃতির চাপচাপ মায়াবন্ধন খুলে খুলে যাচ্ছে আশ্চর্য রকমের দ্রুত একের পর এক গাণিতিক সমাধানে একটির পর একটি  স্তর অতিক্রম করার অনুভব। অর্বুদ অর্বুদ মায়াবন্ধন থেকে মুক্ত অনুভব হতেই দেখে হলুদ মায়াময় একটি রাসায়নিক বিদ্যুত্‍জঠরে সে আটকা পড়ে আছে। এই ক্ষণটি তার অনেক অসহনীয় দীর্ঘ লাগলো।তার বোধ হল এই বদ্ধ জঠরে এত প্রচণ্ড কালো লীন তাপ যেন পৃথিবীও সহ্য করতে পারবেনা। জঠরের এই পরম তাপে তো মহাবিশ্বে অগণিত নক্ষত্রের জন্ম হতে পারতো। কিন্তু তার জীবনকালে তো  কখনো এই তাপের সামান্যতম অনুভবও আঁচে আসেনি? প্রকৃতির এই আশ্চর্য নিয়মে সে ক্ষণিক অভিভূত হয়ে গেল।

(ক্রমশ)

৩ 
Solar plexus/নাভীযজ্ঞ/পাঁচ সেকেন্ড


    অন্তিমপ্রয়ানের এ এক অলঙ্ঘ্য নির্দেশিত নিয়ম। তাই মেরুদন্ডীয় বিদ্যুত্‍ আবেশের প্রবল ফোয়ারায় উর্দ্ধগামী হতে হতেই যেসব শেষ অবশিষ্ট স্মৃতির রেশ, যেগুলিকে প্রাণশক্তিতে অন্তর্হিত হতে দেখেছিল,তাও এবার হারিয়ে ফেলে চিরকালের মত স্মৃতিহীন হয়ে গেল। আর এই হলুদ ক্ষেত্রটিতে তার জন্মসুত্রে পাওয়া উষ্ণতা আদি পার্থিব প্রাণীজঠর থেকে ক্রমবিবর্তিত হয়ে অর্বুদ অর্বুদ শরীর বেয়ে এই শরীর অব্দি ক্রমানুসারে সঞ্চিত হয়ে ছিল। এই চরম পরমউষ্ণতা এখন তার পার্থিব অস্তিত্ব নিমেষেই গলিয়ে ফেলতে লাগল। 

 সে দেখল এই স্বর্ণময় বৃত্তকুণ্ডে তার অতিচেতন ক্ষমতা, তার ষষ্ঠইন্দ্রিয় চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেমন যেমন দ্রবীভুত হচ্ছে তেমনি তেমনি হলুদবৃত্তটি পুরোপুরি  সোনারঙের হয়ে যাচ্ছে। তার ক্ষণিক বোধ হলো প্রকৃতি এই হলুদবৃত্ত মাধ্যমে যে অতিচেতনা তাকে জন্মলগ্নে দিয়েছিল সেটির বিন্দুমাত্র ব্যবহার হয়নি।

      নাভীপ্রদেশের এই হলুদ বৃত্তকুণ্ডটি থেকে দুটি চুলের মত কিন্তু প্রায় শূন্য পরিধির সূক্ষ্ম হলুদ আলোকরশ্মি বেরিয়ে সাপের মতো সর্পিলাকারে আন্দোলিত হচ্ছে। একটি নিম্নমুখী হয়ে পৃথিবীর পরিমণ্ডলে ঢুকে যাচ্ছে আর একটি উর্দ্ধমুখী অসীমে বিলীয়মান। এবার সে নিশ্চিত হল, পৃথিবীতে নিম্নগামী সংযোজক আলোকরেখাটি এবার ছিন্ন হলে সে অসীমের টানে অসীমে বিলীন হয়ে যাবে। সে দেখল পৃথিবীগামী আলোক রেখাটিতে অসংখ্য দীপ্ত আলোক গাঁঠ। এই গাঁঠগুলো নানা অপার্থিব রঙের। সে চিনতে পারলো ওই আলোরেখাটিতে গাঁথা সূক্ষ্ম রঙীন পুঁতিগুলিকে। অর্বুদ অর্বুদ বংশানুক্রম, মনুষ্যপ্রজাতিক্রম, প্রানীজ বংশানুক্রম ও নানাধরনের জৈবসৃষ্টির ক্রম এই রঙীন আলোগ্রন্থিগুলি। সে বুঝতে পারলো এই ক্রম থেকে বিচ্যুত হবার সময় হয়েছে। এই ক্রমের থেকে বিচ্ছেদ হলেই তার চিরতরে পৃথিবী থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। সে এখন অনুভুতিহীন।এখন সে সাক্ষী মাত্র। কিন্তু এখনো এই মূহুর্তে হৃদয়াবেগ রয়েছে। সেই আবেগ দিয়েই অনুভব হলো অর্বুদ অর্বুদ প্রাণীদের এইরকম প্রচণ্ড দাউদাউ জঠর আগুনবৃত্তগুলিকে  সজল পৃথিবী মাতৃভাবে কেমন ধারণ করে আছে। সূর্যের আর কী এমন অসহ তাপ তার চেয়ে অযুতগুণ তাপ এই স্নেহময়ী পৃথিবী সহন করে আছে। তাছাড়া সূর্যের দহনশীল তাপ তো আধিভৌতিক। তা কেবল পদার্থকেই পোড়ায়। তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি দহনশীল অধ্যাত্মিক লীনতাপ। এক মানুষী মায়ের তেমনি মায়াময় উত্তাপ ঘেরা অগ্নিজঠরে তার জন্ম, আর মানুষী মায়ের সেই প্রানীজ জঠর ধারণ করে পৃথিবী মা। এইভাবে বংশানুক্রমে প্রজাতিক্রমে অসংখ্য অগ্নিগর্ভ ধারণ করে যায় মা পৃথিবী। তার সমস্ত তথ্য প্রোথিত রয়েছে হলুদ বিদ্যুত্‍ কুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসা এই আলোকরশ্মিতে।আর কয়েক মুহূর্ত পরে এই অতিসূক্ষ্ম আলোক সংযোজনটি ছিঁড়ে যাবে ও সে পৃথিবীচ্যুত হয়ে যাবে। আর তখনই উর্দ্ধমুখী সর্পিল আলোকরেখাটি মহাকাশে তার পার্থিব অস্তিত্ব নিয়ে ধাবমান হবে।

     সারাজীবন ধরে যত শস্য প্রাণীমাংস ও উদ্ভিদ তার মুখ দিয়ে এমনকি শ্বাস দিয়েও সে গ্রাস করেছিল, সেগুলোর লীনশক্তি বংশ সুত্রে পাওয়া উষ্ণতার সাথে এবার উর্ধে অসীমে বিকীরণ হতে দেখল। পৃথিবী থেকে বিচ্ছেদ হওয়ার মুহূর্তটি এবার শুরু হোলো। এখন পৃথিবীচ্যুত হওয়ার আগে তাকে তাপশক্তির হিসেব মিলিয়ে যেতে হবে। নিখিল জগতের স্থিতির একমাত্র প্রাথমিক নিয়মটি তার মহাবোধে ধরাপড়ল। ব্রহ্মান্ডে কোনো কিছুই সৃষ্টি হয়না কোনোকিছুর ধ্বংসও হয়না। তা পদার্থভিত্তিক হোক বা লীনভিত্তিক হোক।      

       উজ্জ্বল হলুদ বৃত্তকুণ্ডে প্রায় অদৃশ্য একটি লাল ত্রিকোণ আকারের সংকেত তার সামনে ভেসে উঠলো। সেটি তাকে সম্পুর্ণ বোধগম্য করতে হলো। এটি একটি অনিবার্য নিয়ম। তার পুং অহংকার বোধটি এই সংকেতে রয়েছে। এইখানেই পুরুষ ভাব ও প্রকৃতি ভাবের ভেদন ছিল। জীবনযাপনে তার পার্থিব শরীর পুরুষ হলেও যদি এই লাল ত্রিকোণের সংকেত প্রকৃতি ভাবের থাকতো তবে তার ব্যাক্তিস্বত্তা নারীকেন্দ্রিক হতো। সংকেত অসম্পূর্ণ থাকলে সে হতে পারতো পুরুষত্বহীন। কিংবা উভয়লিঙ্গ বোধের এক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু এখন যাই থাকুক। সংকেতটি তার বোধে আসা মাত্রই সেটি হলুদ তড়িতাধানে ডুবে গেল। এবং সেই মূহুর্তে লিঙ্গবোধের অহংকার চিরতরে লয় হোলো। ত্রিকোণটি ছিল নিম্নমুখী। জন্মলগ্নে ভূমিষ্ট হবার ঠিক মূহুর্তে এই রক্তবর্ণ সংকেতের সাক্ষাত্‍কারে সে তার পুরুষভাবটি মননে পেয়েছিল।এখন মননহীন হয়ে সেই সংকেতটি পড়ে তার পুরুষভাবটি বিসর্জন দিয়ে দিতে হলো।

     হলুদ বিদ্যুত্‍ বৃত্তে পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়েও সে কিন্তু বুঝতে পারলো এখনো সে পৃথিবীচ্যুত হয়নি। বৃত্তের গভীরে পৃথিবীগামী অদৃশ্য আলোরশ্মীর গায়ে বসানো অর্বুদ অর্বুদ পূর্বজ আলোগ্রন্থির সাথে সেও সেঁটে রয়েছে সেটা প্রত্যক্ষ করল। সে বুঝল পৃথিবী থেকে তার বিচ্ছেদ হলেই অর্বুদ অর্বুদ নিজবংশানুক্রম মনুষ্যপ্রজাতিক্রম প্রানীজ বংশানুক্রম ও নানাধরনের জৈবসৃষ্টির ক্রমের সংকেত বহনকারী এই আলোরশ্মিটি নিভে যাবে। তার সাথে সাথে এই বর্তুলকার হলুদকুণ্ডটিও অসীমের টানে মহাব্রহ্মে বিলীন হয়ে যাবে।

 এই বিদ্যুত্‍ কুণ্ডটি একটি সূর্যমুখী ফুলের মতো এবং তাতে হলুদ পাপড়ির মত দশটি আত্মিকগুণ সম্পন্ন সোনা রঙের প্রাণশিখা। কুণ্ডটির ধারক আলোরশ্মীটি যেন পুষ্পদন্ড। সে এইবার বুঝল এই হলুদ বর্তুলকার ক্ষেত্রটিই ছিল তার পার্থিব বুদ্ধির আধার এবং দশটি প্রাণশিখা সেই বুদ্ধির দশ রকমের গভীরতম পবিত্র প্রকাশ।
 তরল হলুদ তড়িত্‍ প্রাণরসে ডুবে যেতে যেতে সে প্রত্যক্ষ করল পাপড়িগুলির কয়েকটি উজ্জ্বল সুবর্ণ জ্যোতিশিখা আর কয়েকটি জ্যোতি কালো শুকনো মৃতপ্রায় পাপড়ির মত, প্রায় নিভন্ত। যে পাপড়িগুলি উজ্জ্বল তরতাজা সেগুলির একটি হোলো এমন ইচ্ছাশক্তি যা অন্যের প্রাণরক্ষা,অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ প্রাণী উদ্ভিদকে রক্ষা ও উদ্ধার করতে সমর্পিত। আরএকটি উজ্জ্বল প্রাণশিখা হলো এমন বুদ্ধিবৃত্তি যা সমর্পণ ও বিশ্বাস ঘেঁষা শান্ত গভীর অন্তর্মন থেকে উঠে আসা স্থির সিদ্ধান্ত। 

দু চারটে প্রাণশিখা পাপড়ি একটু ম্লান কালো হয়ে আসছে। সেগুলো হোলো আত্মবিশ্বাস স্বাধীনচেতনা ও আত্মসংযম। আর যেগুলো কুঁকড়ে ছোট হয়ে কালো হয়ে গেছে সেই পাপড়িগুলি হোলো তার অজ্ঞান ক্রোধ একগুঁয়েমী ছলেবলে নিজেকে যেকোনো ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মিথ্যেকে প্রশ্রয় করা আর লোভের ক্ষিদে।        

       বৃত্তবদ্ধ লাল ত্রিকোণ সংকেতটি সম্পুর্ণ মুছে গেছে। দশটি সুবর্ণ ও কালো প্রাণশিখা হলুদ কুণ্ডে অদৃশ্য। ওই হলুদ তড়িত কুণ্ডে তার নিরাকার পার্থিব অস্তিত্ব সম্পুর্ণ গলে গিয়ে একটি অদৃশ্য নিরাকার পরম কণাশক্তি হয়ে পার্থিব সর্পিল সম্পর্করশ্মিতে সেঁটে ছিল। এবার সেটাতে ভয়ংকর টান অনুভব করল। আর সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশ জুড়ে এক অতি সূক্ষ্ম আলোড়ন অসীম থেকে অসীমে ছড়িয়ে গেল। তারকাছে পৃথিবী একটি অর্থহীন মৃত্যুপুরী বোধ হলো। সেটি ক্রমশ তার বোধ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল।

      উর্দ্ধমুখে এক প্রবল টানে সে এক তড়িত কণাশক্তি হয়ে আলোর চেয়ে অযুত অযুতগুণ বেগে যেই অসীমের দিকে ধাবিত হতে যাবে ঠিক সেই মূহুর্তে এক অজানা প্রেমাবেগ বৃত্তে আটকে গেল। অতিক্ষুদ্র পরম তড়িতকণা হয়েও তার বোধব্যাপ্তির কোনো তারতম্য হয়নি। সে বুঝতে পারলো এটি একটি হৃদয়বৃত্তদ্বার এবং হৃদয়বৃত্তির ছাঁকনি। সম্পুর্ণ শ্রাবিতশুদ্ধ না হওয়া অব্দি এখানে থাকতে হবে। যেহেতু পৃথিবীসহ বস্তুমাত্রার মহাবিশ্ব এখন তার সংলগ্ন নেই পার্থিব সময়ের কোনো প্রশ্নই নেই। তাই বিশুদ্ধ হৃদয়াবেগের পরিমাপ অব্দি সে এই বৃত্তবদ্ধ হয়ে রইল। (ক্রমশ)


৪ 
Unstruck/হৃত্‍পঙ্কজ/চার সেকেন্ড


জৈব হৃদয়ের সংবেগ তো এখন চিরকালের মত স্তব্ধ কিন্তু জীবন থাকতে যখন সেটি অহৈতুকি নিঃস্বার্থ প্রেমে আকুল ও উদ্বেল হয়ে উঠতো সেই পবিত্র হৃদয়াবেগের আবর্তটি আসলে জৈব নির্বিশেষে একটি আকারহীনতার বোধ ও পরম প্রশান্তির সঙ্গম সেটা তার বোধে পরিষ্কার হলো। জন্ম বিজন্ম প্রজন্ম সব এখন তার অচেনা অজ্ঞাত কিন্তু জন্মরহস্য এখন সবুজের রেশ হয়ে অনুভবে থাকতে চাইছে। যেন এই সবুজের টান তার পরম আরাধ্য। সম্পুর্ণ সমর্পিত হয়ে যাবার মাধ্যম। পার্থিব আকৃতির জ্ঞান আর তার বোধে নেই। সে এখন একটি অনুজ্বল নিরাকার শক্তিশিখা। সবুজ বাদে অন্য বর্ণালী তাকে লাল ও সাদা দুটি সর্পিল তড়িত্‍ রেখাতে বেঁধে দিয়ে একে একে অপসৃয়মান হয়ে যাচ্ছে। তার বোধে এখন শুদ্ধ লাল সবুজ ও সাদা। বুঝল অনন্ত সবুজের মাঝে সে ভাসছে । সবুজ প্রেমাবেগের সমুদ্র। অসংখ্য প্রাণ প্রবাহ তাতে ভাসছে আর তার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই প্রাণস্রোতগুলি শুধু তার চারপাশেই নয় একে অপরের অঙ্গাঙ্গী বিসর্পিল। অসংখ্য সেই জীবনস্রোতগুলি দ্রুতছন্দে পর্যাবৃত্তে তাকে ঘিরে ঘুরছে। সেগুলিকে মানুষ প্রাণী উদ্ভিদ এই ভাবে পৃথক চেনা যায় না। সবগুলির ভাব একরকম কিন্তু জীবনজ্যোতির উজ্জ্বলতা ভিন্ন। যেহেতু ইন্দ্রিয় থেকে সে বিচ্যুত তাই শব্দের নাদ ভেদ আর তার বোধে নেই কিন্তু শব্দের ভাববোধ এখনো স্পষ্ট। হৃতকম্পন কবে বন্ধ হয়ে গেছে। হৃদয়ের অনাহত নাদ অনুভবে আর নেই কিন্তু জীবনস্রোতগুলির ঘূর্ণননাদ এখন ভাব হয়ে তার বোধে পর্যাবৃত্তে আঘাত করছে। সে বুঝল তার পরিশ্রুত হয়ে যাবার এটিই একটি অপ্রাকৃতিক নিয়ম।

      আর আশ্চর্য !এই কম্পনহীন নাদের ভাববোধ হুবহু অনাহত ধ্বনির সাথে মেলে। অসংখ্য সেই জীবন ঘূর্ণনের অর্ধচক্র সাঁ আ আ আ..., বা, সো ও ও ধ্বনি এবং পরের অর্ধচক্র ম ম ম ম...,বা, হমমম নাদ বোধ। সো ও ও ও ও ও ও ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা হম ম ম ম ম অনুজ্জ্বল তরঙ্গ। সে নিজ অক্ষের চতুর্দিকে দ্রুত একপাক ঘুরে যেতেই তার বোধে এলো অনন্ত শূন্যতা এবং তার মধ্যে বস্তু অবস্তু অগণিত ধরনের তেজ ও শক্তিকণা সবারই এই একই আবর্তন। প্রতিটির আবর্তনে একই নাদ প্রবাহ। কোনো রকম অনুনাদ নেই। কোনো রকমের বিক্রিয়া নেই। কোনো প্রতিবিম্ব প্রতিচ্ছবি প্রতিফলন কিছুই নেই সব মৌলিক অনস্তিত্ব। কোনোকিছুই কারোর উপর আরোপিত নয়। সেইসব নাদ একইসাথে সমতরঙ্গে।

   প্রবাহমান অনন্ত সবুজে অসংখ্য জীবনস্রোতের আবেগ আবর্তে তার নানারকমের পার্থিব বোধগুলি প্রশমিত হতে লাগলো। যে নষ্টকারী ভাবগুলি তার শক্তিশিখার উপরে পরত পরত অম্লপাপড়ির মত আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে তাকে অনুজ্বল করে রেখেছিল এবং তার আত্মিক অবনতির কারণ ছিল, সেগুলি ছিল অনুশোচনা অহংকার হীনমন্যতা বৈষম্য লালসা এবং আরও। এইগুলি যেমন যেমন সবুজ দিয়ে ধুয়ে যেতে লাগলো তেমনি তেমনি ভিতর থেকে উজ্জ্বলতর কিছু আবরণ বেরিয়ে আসতে লাগলো। সেই পর্দাগুলি সমবেদনা, অন্যের দুঃখে কাতর হওয়া, শান্তি, প্রেম, অন্যের জন্যে বাঁচার প্রবণতা এইসব। জীবিতকালে এই ভাবগুলি তার ঋণাত্মক অবগুণগুলিকে প্রশমিত করতে থাকতো।এবার সেগুলিও সবুজ স্রোতে একে একে মুছে যেতে লাগলো। যেমন যেমন সে পরিশ্রুত হতে লাগলো তেমনি তেমনি তার নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের তীব্রতা বাড়তে লাগলো। সুতীব্র ঘূর্ণনবোধে সে দেখল তার হৃদয়াবেগ অসংখ্য টুকরো হয়ে তাকে ছেড়ে যাচ্ছে। তার সাথে জন্ম মৃত্যুর বোধ ওতপ্রোতে সেঁটে রয়েছিল সেটিও এবার অপসৃয়মান। শেষে সেইবোধটি পূর্ণস্রাবিত হয়ে বিলীয়মান হলো।

       এবার তার ঘূর্ণন কমে আসছে। ঘুরতে ঘুরতে অনন্ত সবুজ ভাবের কেন্দ্রে একটি অতি উজ্জ্বল হরিত্‍শিখা হয়ে সে স্থির হয়ে রইল। বুঝল এই হরিত্‍ শিখাটিই পরমপ্রেম যা সে নিষেকলগ্নে সম্ভাবিত ভ্রূণসৃষ্টির জন্য পৃথিবীতে এসেছিল। জীবনযাপনের কোনো অন্তরঙ্গ মূহুর্তে এক আত্মদর্শনে সমর্পিত প্রেম হয়ে তার পার্থিবশরীরের হৃদয় কন্দরে পবিত্র উত্থানের জন্য অসীমের সাথে যোগসাধন করেছিল। কিন্তু মননে তা ধরে রাখতে পারেনি। এই অতি উজ্জ্বল হরিত্‍ প্রেমশিখাটি একসময় অনন্ত সবুজে মিলিয়ে যেতেই শুভ্র ও রক্তিম সর্পিল শিকলের মত তড়িত্‍ রেখাদুটি একটি অনন্তগামী সিঁড়ির মত সোজা হয়ে গেল। এবার না রইল তার দেহ না বিদেহ। সে এখন না আলোশিখা না আলোকণা না নিরাকার শক্তি। কেবলমাত্র আধারহীন বোধ এবং অবাধ উত্তরণ। (ক্রমশ) 

                       
Divine expression/বিশুদ্ধি সংগম/তিন সেকেন্ড

তার অস্তিত্ব এখন বোধ ছাড়া কিছুই নয়। এই বোধে সে বুঝতে পারলো দিব্য আলো সিঁড়ি থেকে নিজেকে আর আলাদা করা যাচ্ছেনা। এটিও কোনো শক্তি বা শক্তির তারতম্য নয়,কোনো প্রায় অদৃশ্য রেখানয়,কোনো সূচক বা দিশাও নয় কেবল একমুখী গমন। দিব্য আলোটি হয়তো সংশ্লিষ্ট সিঁড়িতে প্রতিভাসিত কিংবা নয়। সিঁড়িটিও যেন কোনো অদৃশ্য প্রভা। সিঁড়ির অনন্ত গমনের সাথে সাথে সেটিকে ঘিরে ষোলোটি পরাবেগুনী তরঙ্গ উপবৃত্ত সর্পিলাকারে বহমান। প্রতিটি এক বিশেষ শুদ্ধ লয়ে তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিবার সে যেমন যেমন তরঙ্গপৃষ্ট হচ্ছে তার আত্মজ্ঞান পাওয়ার আত্মক্রন্দনের শুদ্ধিকরণ তেমনি তেমনি অনুনাদিত হচ্ছে। এবং এইসব প্রক্রিয়া নীরবে নিরাকারে সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে। ষোলোটি উপবৃত্তের ষোলোরকমের অব্যক্ত নাদবোধ। সেই অব্যক্ত লয়গুলি তাকে যেমন যেমন ছুয়ে যাচ্ছে তেমনি তেমনি সেগুলির ভিন্ন স্বরস্বাদ শেষবারের মত শুদ্ধতা দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু সে এখন দিব্য আলোসিঁড়ি থেকে নিজেকে আলাদা ভাবতেই পারছেনা,তাই অনুভবে বোধ হোলো তার একমুখী অনন্ত প্রান্তের কোথাও এক অদৃশ্য বিন্দুচক্র থেকে ফোঁটা ফোঁটা অব্যক্ত অনাহত শাব্দিক অমৃত তরঙ্গ ঝরে পড়ছে সিঁড়ির গা বেয়ে। সেই অরূপ অমৃত তরঙ্গ সিঁড়ির গায়ে ওতপ্রোতে থাকা তার উপর পড়ছে ও তাকে পর্যাবৃত্তে মাখিয়ে দিচ্ছে ষোলোটি উপবৃত্ত। এভাবেই তার অনস্তিত্ব বোধ এই অমৃতনাদে ধুয়ে যেতে লাগলো। ষোলো রকমের বিশুদ্ধতা তাকে আনন্দসঙ্গীতময় পার্থিব প্রকৃতির ষোলো রকমের আনন্দ ভাব মুর্ছনা আবার নতুনকরে চিনিয়ে দিল। যখন সে পার্থিব জীবজগতে ছিল,ষোলো রকমের বিশুদ্ধ তরঙ্গ তার জীবন সঙ্গীতময় করে তোলার জন্য সবসময় তাকে ঘিরে থাকতো। কিন্তু অবস্থা বিশেষে ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তার পরিবেশ ও স্থিতি বিষময় হয়ে উঠতে এই বিশুদ্ধতা বিকারগ্রস্ত হয়ে যেত। তাই তার জীবন দুঃখময় ও আত্মজ্ঞানহীন হয়ে পড়ত। আবার এমনও হতো। কখনো কখনো এই মিশ্র আনন্দ লহরে ভাসতে ভাসতে নিজের অস্তিত্ব ভুলে বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ত ও ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও তার আত্মজ্ঞান হয়ে যেত। এক অমৃতময় সুরের গিমিকে সে শরীর ও মন থেকে আলাদা হয়ে সম্পুর্ণ বিশুদ্ধ আত্মারাম হয়ে যেতো। কিন্তু সেটি ক্ষণিকের জন্য। তার শরীর ও মন জুড়ে আবার দুর্দশাগুলি তক্ষুনি ঘিরে আসতো। এখন কালের গর্ভ নামের অপ্রতিরোধ্য মহাজাগতিয় মাত্রাটি থেকে সম্পুর্ণ ছিন্ন হওয়ার ফলে তার এখন পবিত্রতা মাত্রাটি ছাড়া কোনো টান নেই। ষোলোটি পবিত্র আনন্দ ধ্বনিধারা একসময় এক এক করে বন্ধ হলেই সে অন্তর্জগত থেকেও বিমুক্ত হয়ে যাবে। এই উপলব্ধিতে সে এক অনন্য ভিন্ন আনন্দ আবেগে রূপান্তরিত হতে লাগলো। এ এক অজানা অমহাজাগতিক সত্ত্বায় রূপান্তরন। অনন্ত যাত্রা পথে সে অনন্ত অব্যক্ত স্নিগ্ধ ধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো অসীম থেকে ভিন্ন অসীমতায়।

       যেমন যেমন সে রূপান্তরনে পূর্ণতা প্রাপ্ত হতে চলল তার অব্যক্ত অস্ত্বিত্বের আবেগ অনন্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। ষোলো রকমের পবিত্রতাগুলি অন্তর্হিত। পূর্ণ মৃত্যু বা অনন্ত শূন্যতা প্রাপ্তির ঠিক আগে দেখা গেল সে একটি প্রায় শূন্য বিন্দুর মত তেজ জ্যোতি রূপ ধারণ করেছে। সেই জ্যোতিটি অগোচর নিখিলের অনুশাসন। (ক্রমশঃ) 



 ৬
The supreme intuition/অনুশাসন/দু সেকেন্ড

   এবার সে নিরাকার প্রভাহীন তেজবিন্দু। কিন্তু বোধ হলো সে নিজেই অসীম এবং মহা অসীমে পরিব্যাপ্ত। পরিব্যাপ্তির পরিমণ্ডল মাত্র দুই দিশায়। দুই অনন্ত দিশায় ছড়িয়ে রয়েছে বেগুনী ও ঘন নীলপদ্মের পাপড়ির মত তার তেজ নীলিমা। আত্ম বিশুদ্ধিকরনের ও শূন্যতা প্রাপ্তির পর এখন আবার কিছুকিছু মানবিক বোধগুলি অনন্তময় হয়ে তার উজ্জ্বল তেজপ্রভাতে ফিরে এলো।  চিনতে পারল যে এই দুই নীল শক্তির সাথে সে পূর্বপরিচিত। বস্তুতঃ পার্থিব জগতে সে জানতো বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ধনাত্মক ও ঋণাত্মক এই দুই বিচারহীন পরিকল্পনাহীন স্বপ্নহীন ও সমাধানহীন প্রাকচেতনা ও পার্থিবঅস্তিত্বের সমন্বয়। পার্থিব জীবন ছিল বহমান উচ্চ ও নিম্ন মনোবৃত্তির এক গাণিতিক ছন্দবদ্ধ সমন্বয়।

     জীবিতকালে প্রাকচেতনা তার অস্তিত্বজুড়ে কখনো কেমনো আসতো। কিন্তু তা ছিল সীমিত ও ক্ষণিক। তা ছিল কেবল ছলনা। পরে ঘটনার সত্যতায় নিজেকে গর্বিত কিংবা দোষারোপ করা ছাড়া আর কিছুই সেটার মূল্যায়ন ছিল না। এবার অনুভবে এলো যে সে ছিল এক অন্তঃস্থিত কণ্ঠস্বর।  দুই ধন ও ঋণ শক্তির সমন্বয়ে তার বহমান জীবন স্বতঃস্ফুর্ত ছিল ঠিকই কিন্তু জীবিতকালে আত্ম অভ্যন্তরে যে এক মহাজাগতিক গাণিতিক নিয়ামকের দ্বারা সে পরিচালিত হচ্ছিল সেই স্বয়ংটিকে এবার সে চিনতে পারল। এই সেই তেজবিন্দু সে স্বয়ং, যার আদেশে তার জৈবিক জীবনের ঘটনাগুলি পূর্বনির্ধারিত হিসেবে সময়ের স্রোতে প্রবহমান ছিল।

      সময় তারকাছে যুক্তিহীন। অসীমে সে পরিব্যাপ্ত রয়েছে ঠিকই তবু সে নিজেই নিজের কেন্দ্রাতিগ হয়ে পরত পরত কয়েকটি অস্থায়ী পরিবর্তনশীল ভেদ্য স্তরবৃত্তের ভিতরে কম্পমান। স্তরগুলি হোলো নিখিল জগতের জৈব চেতনার ভাব। স্বপ্ন মন গুরুত্ব ও মৃত্যু। এই ভাবগুলিতে তার নিজস্বতা মোটেই বাছা যায় না। এমনকি এক একটি স্তরবৃত্তে অনন্ত ভাব। একটি স্বপ্নবৃত্তে অনন্ত ভিন্নতা। আবার যেমন একটি স্বপ্ন থেকে অসংখ্য স্বপ্নে যাওয়ার সম্ভাবনা তেমনি মন থেকে মননে যাবার অসংখ্য সম্ভাবনা। আর নিয়ন্ত্রক সেইই। ভাবগুলি এত বিশাল যে অনন্ত বললে কম বলা হয়। তবু সেগুলি একান্তই তার নিজের বলে বোধ হল। প্রতিটি স্তরবৃত্ত ভাবে তারই স্বজ্ঞা। তার বোধহল, যে একক জীববিশেষ জীবনধারাটি সে এইমাত্র ছেড়ে এল, সেটি শূন্যপ্রায়,অতি নগণ্য। নিখিলজগতের অনু থেকে বৃহত্তর সমস্ত জীবনীর ওই স্তরবৃত্ত ভাবগুলি সেইই তো পরিচালিত করেছে। কিন্তু এই পরিব্যাপ্তি ও বিশালতার বোধ কখনোই ছিল না,এখন হয়েছে। প্রকৃতি ও পুরুষ দুইই তার তেজবিন্দু স্বজ্ঞা। তার আরও বোধ হল, এই অভিজ্ঞানটি দেহ ছাড়ার পরই এসেছে। সেটি ছিল তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতে। দেহ ছাড়ার পর ভূবন ছাড়ার পর অনেকবার অনেকরকম পবিত্রতায় ধুতে ধুতে শেষে এবার তার কাছে উন্মেষিত হল তার এই স্বজ্ঞা।

  অদৃশ্য শূন্যপ্রায় বিন্দু সে। সে স্বয়ং সম্ভাবনার নিয়ামক। যখনই এই ভাবের পূর্ণতা তার বোধে এল তখনই এও তার অনুভবে এল যে এই অদৃশ্য শূন্য থেকে নির্গত আকারহীন সংখ্যাহীন সজল ভাব স্রাবিত হচ্ছে। তারই সেই জলজ অমৃতাশ্রু ধারা যে প্রেমাবেগ এবং নিখিল জগতকে প্রাণময় সরস ও সজল করে রেখেছে এই প্রেম,এই পূর্ণতায় সে উদ্বেল হয়ে উঠলো। ক্রমে ক্রমে সে বিন্দু থেকে ছড়িয়ে পড়তে চাইল। তার এই চাওয়াটি যে স্বতঃই তাও তার জানা। সে যে প্রাণীজগতের নিয়ামক এবং সেই পার্থিব জলজ প্রাণপ্রকৃতির প্রেম বিধাতা এই অনুভবে সে বুঝতে পারলো স্বপ্ন মন গুরুত্ব ও মৃত্যু এইগুলি এখন তার কাছে সরস সাবলীল ও বাধাহীন। এইগুলি প্রেমেরই অঙ্গ এবং প্রেম বিনিময়ে বা প্রেমের তাগিদে পার্থিব প্রাণ জীবনযাত্রায় পেয়ে থাকে। এইসব ভাব অনন্ত। যদিও সময় বলে কিছুই নেই তবু এই আপাত অনন্ত পরম প্রেম ভাব বাধা অতিক্রম করে নিজেকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এইলগ্নে তার কি স্থিতি কি ব্যাপ্তি সেটা সম্ভাবনা ঠিক করে দেবে। এখন শুধু নিস্ক্রমন।   

      সে ছড়িয়ে পড়তে চাইল। নিজে নিজেই সৃষ্টি করল উচ্চচেতনাময় অমৃতধারা। সেই ধারায় প্রবাহিত হতে চাইল। নিখিলে পরিব্যাপ্ত সে নিজেই একমাত্র স্বজ্ঞা তবু সে নিজেকেই আদেশ দিল অনন্ত প্রেমধারায় অসীম থেকে অসীমতায় ছড়িয়ে পড়তে।এই সজল আবেগ ধারা দিয়েই নতুন প্রানের সৃজন করতে হবে। তার নিজেরই শুদ্ধাত্মার অনুকৃতি। (ক্রমশঃ)

                     
The final detachment/মহারন্ধ্র/এক সেকেন্ড

এই অস্তিত্ববিহীন অনন্ত প্রেম প্রস্রবনের না আছে কোনো ব্যাপ্তি না আয়াম। শুধুমাত্র প্রশান্ত অধিচেতনা। অনন্ত পরিধিহীন প্রশান্ত চেতনা। সৃজনশীল মায়াপ্রকৃতি থেকে ক্রিয়াহীন দিব্য পুরুষভাব আড়াল করে রেখেছে এই চেতন পর্দা। এই নিশ্ছিদ্র আবরনের অপরপারে অবিরাম ক্রিয়াশীল মায়াপ্রকৃতি আসলে অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়। সে এই অবিরাম অনন্ত মাত্রার প্রশান্ত আবরনে সংখ্যাহীন সাময়িক রন্ধ্র সৃষ্টি করল। রন্ধ্রপথে প্রবাহনালী যুক্ত করল। সেগুলোর কোনো আয়াম নেই। না আছে বিস্তার না শূন্যতা। সে নিজেকে অন্তর্দৃষ্টিরূপে সৃষ্টি করে প্রতিটি রন্ধ্রপথে বসিয়ে নিলো। এই অন্তর্দৃষ্টি তিন স্তরের। বহির্ভাগে শুধু প্রশান্তি ও আনন্দ। একটু ভিতরের স্তরটি তার কল্পবিস্তার ও তার ভিতরের স্তরটি দিব্যচেতনা। এক একটি রন্ধ্রপথ দিয়ে প্রবাহনালী অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে মিশেছে। ভিন্ন ভিন্ন রন্ধ্রপথে ভিন্ন সৃষ্টি ও লয়ের এক সাথে প্রবেশ ও বিলয় হচ্ছে। সে কল্পস্তরটি ভেদ করে গর্ভাশয়ে প্রবেশ করতে চাইল। গর্ভাশয়গুলির অনেকগুলি নিষ্ক্রিয় নির্বাপিত। আর অনেকগুলি নির্বাণের মুখে। যে গর্ভাশয় সৃষ্টির আনন্দে উদ্দীপিত, তার রন্ধ্রপথে ক্রিয়াশীল মহাশূন্যতারূপী অন্ধকার। কিন্তু যেগুলি নির্বাপিত তাদের রন্ধ্রপথ মহাপ্রশান্তিতে শ্বেতদীপ্ত।         

    তার অনন্ত আনন্দময় বিস্তৃতি। কিন্তু এই মূহুর্তে সে নিজেকে অসংখ্য অন্তর্দৃষ্টির ভিন্ন স্রোতে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেরই সৃষ্ট অগণিত শূন্য আকারের রন্ধ্রগুলিতে প্রবেশ করল। প্রবেশ করা মাত্র সে মহাব্রহ্মান্ডের আদি স্ফোটশক্তির সৃষ্টি সম্ভাবনার মতো খুঁজতে লাগলো তেমনই এক সম্ভাবনা। সে সম্ভাবিত প্রাণশক্তির পুনরায় আহরণের জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। এই সম্ভাবনা তো নিজেরই প্রক্ষেপন। সে নিজেই নিজেকে অন্তর্দৃষ্টিতে প্রক্ষেপ করে ও নিজেকে মহাশক্তি সম্ভবা করে অনন্ত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে প্রবেশ করল এবং মুহুর্তেই নিজের সামনে নিজেকে সম্ভাবনায় পরিবেশিত করে সম্ভাবিত প্রাণশক্তির আহরণ শুরু করে দিল। সেই মূহুর্তে রন্ধ্রপথগুলি অদৃশ্য হয়ে গেল।

       কুম্ভের মত সৃষ্টির গর্ভাশয়ে নিয়তিগুলি প্রাণশক্তি রসে ভাসমান ক্রিয়াহীন সুসুপ্ত হয়ে রয়েছে। কখনো বহুমাত্রিক সৃজনশক্তির বুদবুদ ব্রহ্মান্ডের অসীমতা জুড়ে ফাটছে। কিছু অনন্তে বিলীন হওয়ার জন্য উন্মুখ। গর্ভাশয়ের ভিতরে ভিন্ন মাত্রার আনন্দময় জগত সৃষ্টির জন্য পরিণত হচ্ছে মহাজাগতিক ভ্রূণ। প্রাণশক্তি রসে ডুবে রয়েছে অতিচেতনার কল্প আধার তৈরির পূর্বাভাস।

     বুদ্বুদের বিস্ফোট থেকে একটি অতিমাত্রিক প্রাণশক্তিপুঞ্জ সে আহরণ করল। সে এখন নিজেই সম্ভাবনা তাই সেখান থেকে একটি সৃজনশক্তির অঙ্কুর বেছে তাতে নিজেকে লয় করে দিল। এই অভিযোজন ক্রিয়া হতে না হতেই সে অকল্পনীয় বেগে ফোয়ারার মতো ছিটকে বেরিয়ে মহাপ্রশান্তির অসীম আবরনে চিপকে গেল এবং সেখানেই সে প্রাণশক্তির বীজ হয়ে প্রাণের অংকুরোদ্গমের প্রতীক্ষায় রইল। শূন্যপথে শুরু হলো তার বিজারণ ঘুম।  (ক্রমশ)          

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ