ফিরে আয় সুভাষ || সুদেষ্ণা সিনহা

ফিরে আয় সুভাষ
সুদেষ্ণা সিনহা

স্নেহের সুবি,
জীবন সায়াহ্নে এসে আজ তোর কথা বড় বেশী করে মনে পড়ছে।১৩০৩ বঙ্গাব্দের ১১ই মাঘ,শনিবার যেদিন তুই আমার কোলে এলি সেদিন একবারের জন্যেও ভাবনায় আসেনি দেশমায়ের জন্যই তোর জীবন ও জন্ম। ছেলেমেয়ে,স্বামী,আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বিরাট সংসারের দায়িত্ব আমার কাঁধে। সেভাবে তোর দিকে নজর দেবার সময় পাইনি কোনদিন।কিশোর বয়স থেকে তুই ধর্মপ্রাণ,প্রকৃতিতে একেবারেই সাধু,অথচ পড়াশোনায় অমনোযোগী নোস,বাইরে তখন কিছুটা হলেও লাজুক প্রকৃতির --সকলের মাঝে থেকেও কিছুটা যেন স্বতন্ত্র।
     ছোটবেলায় খিদে পেলে মুখে আঙুল পুরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে থাকতিস তুই।ধাইমা সারদা ঠিক বুঝতে পারত তোর খিদে পেয়েছে। সেও তোকে অসম্ভব স্নেহ করত। তোর প্রতি একটু বেশীই স্নেহ নজর ছিল আমার।জানি কোনো বৈষয়িক ভাবনা তোকে পীড়িত করে না ,অথচ সবার জন্য তোর প্রাণ কাঁদে।জগৎ সংসারই যে তোর সংসার সুবি।
     ছোটবেলায় আমার কাছে শুয়ে থাকতিস তুই।মাঝে মাঝে রাত্রে উঠে দেখতাম তুই পাশে নেই।বিছানা ছেড়ে উঠে দেখি তুই ছাদের উপর হাতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিস।তুই বলেছিলি জীবনে বড় হতে গেলে দেশের কাজ করতে গেলে শরীর সুদৃঢ় করা দরকার,নরম বিছানায় শুয়ে তা করা যাবে না। 

১৯১৪ সালে মে জুন মাসের তপ্ত গরমে সাধুবেশে নিখোঁজ হয়ে গেলি তুই।বেশ কিছুকাল উত্তর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থানে সাধু সন্তদের সঙ্গ করছিলি।তোর নিখোঁজ কান্ডে তোলপাড় পরিবার। বেলুড়ে খোঁজ করা হল।,হরিদ্বার রামকৃষ্ণ মিশনে টেলিগ্রাম করা হল। তোর নামে পুলিশে হুলিয়াও করা হল।আমার তো পাগলের মতো অবস্থা। ঠিক করেছি বাড়ি ছাড়ব।অগত্যা তোর অনুসন্ধানে বৈদ্যনাথ দেওঘরের পাহাড়ে খোঁজ করে পত্র দেওয়া হল।দিনরাত বিলাপ করছি।হাওড়ার এক গণৎকার দিয়ে গনণা করা হল।সে বললে পশ্চিমে কোথাও আছে।সন্ন্যাসে বাধা আছে,নিশ্চয়ই ফিরবে। জুলাই মাসে বাড়ি ফিরলি তুই।আমার কাছে খবর গেল।তোকে দেখে কান্নায় বুক ফেটে গেল।মুখে বললাম আমার মৃত্যুর জন্য তোর জন্ম,তাই না রে?আমি এতক্ষণ থাকতাম না,পারিনি শুধু মেয়েদের জন্য।পরে তুই বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলি।তিনিও তোকে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন সেদিন।
দেশ ও দশের জন্য তোর প্রাণ কেঁদে উঠত চিরদিন।কটকে কলেরা রুগীদের সেবা থেকে, সাময়িক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও শুরু করেছিলি তুই।প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় ট্রামলাইন থেকে এলগিন রোডের বাড়ি পর্যন্ত গরীব দুঃখী ভিখারি থাকলে ট্রাম ভাড়া দিয়ে দিতিস। 
১৯১৯ সালে ১৫ ই সেপ্টেম্বর সিটি অব ক্যালকাটা জাহাজে চেপে ICS পরীক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলি তুই। ICS পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়ার পর এই চাকরী ছেড়ে দেওয়ার সময় তোর জীবনে একটা ঝড় এসেছিল।আমি বুঝেছিলাম তোর পক্ষে স্বপ্ন,আকাঙ্ক্ষা,আদর্শ বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়।সুখী গৃহকোণ আর নিশ্চিন্ত জীবন তোর জন্য নয় রে!সবাই ভেবেছিল আমি কষ্ট পাব,ব্যথা পাব।আমি সবাইকে বলেছিলাম ,আমার আটটা ছেলে একটা না হয় দেশের কাজই করল।তোর চলার পথে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে চাইনি কোনদিন।
    তারপরের ইতিহাস সকলের জানা।দেশবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মাতৃভূমির যজ্ঞবেদীর প্রধান সেবক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলি তুই।১৯৩১ সাল।তখন তুই কলকাতার মেয়র।১নং উডবার্ন পার্কের বাড়িতে শরতের সঙ্গে বাস করতিস তুই। নানান রাজনৈতিক কাজের মধ্যেও ছোটভাই অসুস্থ সন্তোষকে দেখতে আসতিস তুই।গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মজার ছড়া গল্প বলে সেখানেই শুয়ে পড়তিস।চারিদিকে শ্যেনচক্ষু গোয়েন্দা দল।তাই তোর নিরাপত্তার কথা ভেবে আমার বুক হিম হয়ে যেত।তোর ছোট ভাই চলে গেল।সে বছর ২৬ শে জানুয়ারি অশৌচ অবস্থায় বিশাল শোভাযাত্রা নিয়ে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে গিয়ে পুলিশের এলোপাথারি গুলিতে রক্তাক্ত হলি।নন কো অপারেটর তাই ,ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে ছয় মাস সশ্রম কারাদন্ড মঞ্জুর হল। 
    ১৯৩৪ র মাঝামাঝি কটকের আদালতে সওয়াল করতে করতে তোর বাবা সেই যে অসুস্থ হয়ে পড়লেন,বহু চেষ্টা করেও তাঁকে আর সারানো গেল না।চিকিৎসকেরা হাল ছেড়ে দিলেন।তোকে গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য তার করা হল। ৩ রা ডিসেম্বর পুলিশের গাড়িতে করে বাড়ি ফিরলি তুই -সাদা খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি  পরণে ,গায়ে চাদর,খালি পা,চোখে বেদনার অশ্রু।স্বামী হারানোর মানসিক ক্ষত অনেকটাই লাঘব হয়েছিল তোর সাহচর্যে।
    তোর নিরুদ্দেশ যাত্রা আমার জীবনে এক তীব্র হাহাকার এনে দিয়েছে।শচীমাতা তো জানতেন নিমাই কোথায় যাচ্ছে,আমি তো জানতে পারলাম না আমার সুভাষ কোথায়।জীবনের বোধহয় এইই নিয়ম,যে সকলের জন্য তাকে কোনদিনই ছোট একটি পারিবারিক গন্ডীর মধ্যে আটকে রাখা যাবে না।ব্রিটিশরা মানসিক চাপ বাড়ানোর জন্য গুজব রটাচ্ছে তুই মৃত।আমি আর পারছি না সুবি।মনের দিক থেকে বড় একলা আমি।আমার আর বেশী সময় নেই সুবি।আমার মন বলছে তুই ফিরে আসবি।দরজাটা আজও খোলা আছে।তুই ফিরে আয় সুবি,তুই ফিরে আয়।
তোর মা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ