কবি, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, প্রকাশক: ব্রজকুমার সরকার
মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর
পরিচিতি দিন: আমার জন্ম বামুটিয়া, সদর আগরতলায়, ১৯৬০ সালে।
পড়াশুনা-কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং Institute of Cost & Works Accountant of India.
পেশা- রাষ্টায়ত্ব ইস্পাত কারখানার আধিকারিক(সেইল)
সাহিত সম্পর্কিতঃ সৃজনশীল দ্বিভাষিক লেখক(বাংলা ও ইংরাজী)। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ ৮ টি। অনুবাদ গ্রন্থ-১টি। প্রবন্ধ গ্রন্থ -১টি । শীঘ্রই প্রকাশিত হচ্ছে প্রথম ইংরাজী কবিতা সংকলন।
বিভিন্ন সংকলিত কাব্য গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত। ইংরাজী, মণিপুরি, অসমীয়া এবং হিন্দী ভাষায় কবিতা অনুদিত হয়েছে।
অনুবাদকার্যঃ হিন্দী, ইংরাজী ও অসমীয়া ভাষার সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ । বাংলা থেকে ইংরাজী ভাষায়ও অনুবাদ করেছি।
সম্পাদিত সাহিত্যপত্রঃ ত্রিষ্টুপ। এছাড়া ত্রিপুরায় ‘সমতট’ নামক সাহিত্য পত্রিকার সাথে যুক্ত ।
পুরস্কার/সম্মাননাঃ অজিতমোহন গুহ সাহিত্য পুরকার, কবি সুধাংশু সেন স্মৃতি পুরস্কার , নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মাননা। সম্পাদিত পত্রিকা ‘ত্রিষ্টুপ’ বর্ধমান জেলার শ্রেষ্ট পুরস্কারে সম্মানিত।
সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন যুগ্মভাবে প্রসিদ্ধ মণিপুরি কবি শরতচান্দ থিয়াম এর সাথে- ‘আধুনিক মণিপুরি কবিতা’ এবং ‘স্বর অষ্টক’।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস ।
প্রশ্ন :১
কবে কখন লেখালেখি শুরু করেন? শুরুর দিনের ধারাপাত নয়, যাপন শুনবো।
ব্রজকুমার সরকার :
হাইস্কুল-এ যখন পড়ি,তখন বেশ কিছু কবিতা লিখেছিলাম,কোথাও ছাপা হয়নি, সেই সুযোগও ছিলনা। একটি কবিতার খাতাও ছিল,সেটা এক বন্ধু নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। কলেজে পড়ার সময়ও লিখেছি,কিন্তু যত না লিখেছি তার চেয়ে পড়াশুনাটা বেশি করেছি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সাহিত্যের পড়া শুরু হয়েছিল,আজও চলছে। আমার স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়মিত বই নিয়ে আসতাম, তখন পড়াশুনা ছাড়া কিছুই করতাম না। খেলাধুলাও করতাম না তেমন, কিন্তু গল্প বই পড়তাম ।পরীক্ষার সময় লুকিয়ে পড়তাম। হাইস্কুলেও এক বড় লাইব্রেরি ছিল। আজ ভেবে অবাক হই, গ্রামের স্কুলের লাইব্রেরিতে কত বিচিত্র বই ছিল আর আমি বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ক্লাসিক লেখা পড়ে ফেলেছি হাইস্কুলে থাকার সময়।যে শিক্ষক লাইব্রেরির দ্বায়িত্বে ছিলেন, তিনি একবার আমার প্রয়োজনীয় বইটি থাকা সত্বেও দিতে চাইলেন না। সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভর বৃষ্টি’ –এই বই দুটি প্রথমে দিতে চান নি। হয়তো ভেবেছিলেন যে আমি হয়তো ঐ বই দুটি পড়ার উপযুক্ত নই। বলা বাহুল্য শেষ পর্যন্ত তিনি দিয়েছিলেন। আর ক্লাশে পড়াশুনার একটি সুখ্যতি ছিল,তাই আপত্তি করেন নি। তখনকার সময়ে কোন পত্র-পত্রিকা পাওয়া যেতনা গ্রামে। আমার সহপাঠী এক বন্ধুর বাড়িতে যেতাম। ওর বাড়িতেই প্রথম দেশ, নব কল্লোল, শুকতারা ইত্যাদি পত্রিকা দেখি ,সেই বন্ধুর বাবা আমাকে পত্রিকাগুলি পড়তে দিতেন। আজও মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা। স্কুলের পড়াটুকু ছাড়া কেবল গল্প, উপন্যাস , রহস্য গল্প এমন কি অনুবাদ গল্পও পড়ার সুযোগ হয়েছিল। ডক্টর জেকিল এবং মিস্টার হাইড এবং এমন বেশ কিছু অনুবাদের বই পড়েছ্ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, বীরু চট্টোপাধ্যায় –সব মনে নেই আজ । মনে পড়ে , ছুটির দিনে সারাটা বিকেল শুধু পড়া! শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের তুঙ্গভদ্রার তীরে পড়তে পড়তে মনে হতো আমি বাস্তব থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। নীহার রঞ্জন গুপ্তের কালো ভ্রমর বা স্বপন কুমার এর বই পড়ে ভয়, রোমাঞ্চ, এক আশ্চর্য আনন্দ পেতাম। তখন কবিতার বই বলতে নজরুল বা সুকান্তের বই পড়েছি, কিছুটা রবীন্দ্রনাথ। এগুলি স্কুল থেকে উপহার পেয়েছি, তাই পড়েছি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছিলাম।
প্রশ্ন :২
আপনি ত্রিপুরার মানুষ। ত্রিপুরাকে বাদ দিয়ে দুর্গাপুর কেন আছেন?
ব্রজকুমার সরকার : হ্যা, আমার জন্ম এবং বৃদ্ধি ত্রিপুরায়। কিন্তু জীবিকার জন্য নানা জায়গায় থেকেছি, প্রথমে শিলচরে কিছুদিন, পরে চাকরি নিয়ে মণিপুরে ছিলাম প্রায় তিন বছর। তারপর আবার আগরতলায় এবং অবশেষে সেই চাকরী ছেড়ে পশ্চিম বঙ্গের দুর্গাপুরে এসে থিতু হয়েছি।চাকরী জীবনের অধিকাংশ সময়টা দুর্গাপুরেই কেটেছে, তাই এখানেই থেকে গেলাম, কিন্তু ত্রিপুরাকে বাদ দিইনি। ত্রিপুরা আমার মনে-প্রাণে আছে এবং থাকবে। ত্রিপুরার সাথে আত্মার যোগ, তাই যেখানেই থাকিনা কেন, ত্রিপুরার প্রতি শেকড়ের টান অনুভব করি।
প্রশ্ন :৩
আপনার সম্পাদিত ত্রিষ্টুপ। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে ভূমিকা বলুন।
ব্রজকুমার সরকার : আমি যতটুকু বুঝি, লিটল ম্যাগাজিন এর একটি চরিত্র থাকে। কিছু লেখা সংগ্রহ করে ছেপে দিলেই লিটল ম্যাগাজিন হয় না। তাই লিটল ম্যগাজিন এর সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা থাকে, দ্বায়বদ্ধতা থাকে । কেন লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করব, আমার কি উদ্যেশ্য এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ইত্যাদি বিষয়ে স্পষ্ট ধারনা থাকা দরকার। আর লিটল ম্যগাজিন কোন আর্থিক লাভের উদ্যাশ্য নিয়ে সাধারনত কেউ শুরু করেনা, এর স্থায়ীত্ব নিয়েও যথেষ্ট সংশয় থাকে, অর্থের অভাবে সেটাকে নিয়মিত প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। অর্থাৎ একটা অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাজ করে যেতে হয়। ফলে অনেক ম্যাগাজিন এর অকাল মৃত্যু ঘটে। তবুও লিটল মেগাজিন থেমে থাকেনা, মৃত্যুর সাথে এর জন্মও চলতে থাকে। এটি একটি continuous process বলা যায়। তাই এটাকে আন্দোলন বলে মনে করা যেতে পারে। আর যে কোন আন্দোলনেরই একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকে।
কোন নবীন কবি বা লেখকের জন্য লিটল ম্যাগাজিন একটি মূল্যবান মাধ্যম। কোন নবীন লেখকের পক্ষে বানিজ্যিক পত্র পত্রিকায় লেখা ছাপানো সম্ভব হয় না। আর একজন নবীন লেখককেও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হয়। কাচা লেখাতো কোন বাণিজ্যক পত্রিকায় ছাপা হয়না, কারণ বাণিজ্যিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ব্যবসায়িক লাভের জন্য, এখানে নির্দিষ্ট পাঠক রয়েছে, তাই সেই পাঠকের প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই বাণিজ্যক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
তাহলে যারা লিখতে চান ,তারা কোথায় লিখবেন? লিটল ম্যাগাজিন একমাত্র মাধ্যম যেখানে নবীন লেখকেরা লেখার সুযোগ পান। তাই দেখা যায়, আজকের যারা জনপ্রিয় বা বিখ্যাত হয়েছেন, তারা লেখা শুরু করেছিলেন লিটল ম্যাগাজিনেই। অবশ্য লিটল ম্যগাজিন এর ও নানা গুণমানের হয়।সবার লেখা সব পত্রিকায় ছাপা হবে এমনটা আশা করা যায় না। অন্যদিকে পাঠকের কথাও মাথায় রাখা দরকার। পাঠকও নানা রকম হয়। সাধারন পাঠক যেমন আছেন, তেমনি সিরিয়াস পাঠকও আছেন। লিটল ম্যগাজিন যেমন লেখক তৈরী করে, তেমনি পাঠকও তৈরী করে। এভাবেই সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক লিটল ম্যাগাজিন রয়েছে বা ছিল যেগুলি সাহিত্যের ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা নিয়েছে, আমরা স্বীকার করি। লিটল ম্যাগাজিন বলতে এই আলোচনায় সাময়িক সাহিত্য পত্রিকা গুলিকেও যুক্ত করতে চাই। যেমন ভারতবর্ষ, বঙ্গদর্শন, ভারতী, প্রবাসী,সোমপ্রকাশ… –এই জাতীয় পত্রিকাগুলিকে সাময়িক পত্রিকা বললেও আদতে লিটল ম্যাগাজিন এর চরিত্র বহন করে। সেগুলিও কালের নিয়মে একদিন বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু তাদের গুরুত্ব আজও অম্লান। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘কবিতা’ তো আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পৃষ্টপোষক ছিল। আধুনিক বাংলা কবিতাকে মর্যাদার আসনে স্থাপন করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু তার সুযোগ্য সম্পাদনার মাধ্যমে। তাই লিটল ম্যাগাজিন এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ন।কবিতা পত্রিকা ছিল বলেই আজ আমরা জীবনানন্দ কে পেলাম, একথা বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। অবশ্য তিনি প্রগতি এবং পূর্বাশায়ও লিখেছেন। অর্থাৎ কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং বুদ্ধদেব বসু-এই দজনের অবদান অনস্বীকার্য।
এই প্রসঙ্গে ত্রিষ্টুপ এর বিষয়ে দুচারটি কথা বলা প্রয়োজন। এই পত্রিকাটির জন্মলগ্ন থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমী বলে দাবী করতে পারি। পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে চেষ্টা করেছি। এলোমেলো ভাবে লেখা ছেপে প্রকাশ করতে চাইনি। শুরুর দিকে কিছুটা অসুবিধা হলেও পরবর্তী কালে একটি নির্দিষ্ট উদ্যাশ্য ও ভাবনা নিয়েই প্রকাশ করছি। প্রথমত বাংলা সাহিত্যের অনালোচিত বা অনালোকিত প্রতিভাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই ত্রিষ্টুপ এর প্রধান উদ্যেশ্য।অনুবাদের মাধ্যমে প্রাদেশিক সাহিত্যের সাথে পাঠককে পরিচিতি করানো হল আর একটি উদ্যেশ্য। তাই ত্রিষ্টুপ প্রধানত বিষয় ভিত্তিক সাহিত্য পত্রিকা। আগামী দিনে ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্ব ভারতে বাংলা ভাষাচর্চার বা বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটি সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরার লেখক বন্ধুদের সহযোগীতা চাই, এই আবেদন রাখছি।
প্রশ্ন:৪
কবিতা আপনার নিকট বেঁচে থাকার আয়ুধ। কবিতার জন্য আপনি ছুটে যেতে পারেন হাজার মাইল। কবিতার জন্য আপনার যাপনচিত্র শুনবো দাদা।
ব্রজকুমার সরকার :
প্রকৃতপক্ষ্যে তাই। কবিতা ছাড়া জীবন ভাবতেই পারিনা। কবিতা জীবনের সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে এটা ছাড়া জীবন অসম্পুর্ন মনে হয়। তবে জীবন, জীবনের মতো চলে, কবিতা এতে আলো জ্বেলে রাখে, তাই দেখতে পাই পথের দিশা, এটা মনে হয়।
এই যে আমরা দুজন দু হাজার মেইল দূরে বসে আছি, কিন্তু যুক্ত হয়ে আছি , সেটা তো কবিতার কারণেই। আর এই যুক্ত থাকার জন্যই ছুটে যাই এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আমরা যারা লেখালেখি করি, যে প্রান্তেই বাস করি না কেন, একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, a sense of belongingness যেন টের পাই, সেটা কিন্তু এই কবিতা বা সাহিত্যের জন্যই। কবিতার যাপন তো ঠিক দেখানো যায় না। কবি বা লেখক ও সামাজিক জীব, তাকেও সমাজ-সংসারে থাকতে হয়, সাংসারিক বা সামাজিক কাজে যুক্ত থাকতে হয়, তবুও সৃজনশীল ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। সকাল থেকে রাত , সারাক্ষণ কিছু না কিছু কাজেই থাকি, কিন্তু কবি সত্ত্বা বা লেখক সত্ত্বাকেও ভূলতে পারিনা। তবে চাইলেই লেখা যায় না। তার জন্য একটা নিজস্ব সময় দরকার হয়। ভাবনা কাজ করে ঠিক, পারিপারশ্বিক জগত নানা ভাবে আমাকে প্রভাবিত করে, জীবনকে ছুঁয়ে থাকে নানা অনুভুতি, অনুভব, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। জীবনের গূঢ় অনুভবই কবিতা , জীবন ছাড়া কবিতা হয় না। নিছক কল্পনাও কবিতা নয়, আবার কল্পনা ছাড়াও কবিতা লেখা যায়না। কবিতা আসলে কি -তা সংজ্ঞায়িত করা মুশকিল। তবু নিজেকে আবিস্কার করি কবিতার ভেতর, নিজেকে খনন করে চলি , এভাবেই কবিতার ভিতর আশ্রয় খুঁজে পাই প্রতিদিন।
প্রশ্ন-৫ :আপনি মূলত বাংলাভাষার একজন কবি।আপনার সহধর্মিণী একজন সমকালীন মণিপুরী ভাষার কবি।ছোটবেলা থেকে মণিপুরী সংস্কৃতি আপনাকে টানতো।তাই হয়তো কবিতা সহধর্মিণী সব মিলে ত্রিপুরার মিশ্র আবহ আপনার জীবনকে কবিতাকে অন্যরকম করেছে। এই যাপনের কৌশল কুশল জানবো?
ব্রজকুমার সরকার :
প্রধানত বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করি, ইংরাজী ভাষায়ও কিছুটা, আর অনুবাদ কর্ম। এই সব নিয়েই সাহিত্যের একজন কর্মী বলেই পরিচয় দিতে চাই। নিজেকে ‘আমি অমুক কবি’ বলতে কেমন যেন লাগে। দীর্ঘদিন ধরে লিখছি। পাঠক ,সমালোচক – তাদের মুখে ‘কবি’ শুনতেই ভাল লাগে,নিজে বলতে ভাল শুনায় না। কারণ আমার মনে হয় , কবি বলে নিজেকে জাহির করা মানায় না। হ্যা আমার সহধর্মিনী এন রঞ্জিতা মণিপুরি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন, এবং তিনি বাংলা ভাষার একজন নিবিষ্ট পাঠক।
মণিপুরি তার মাতৃভাষা, তিনি মনে করেন বাংলা ভাষা তার ধাত্রীভাষা।তিনি মণিপুরি কাব্য সাহিত্যকে বাংলা ভাষার পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সচেষ্ট, অনুবাদের মাধ্যমে মণিপুরি কবিতাকে বাংলা ভাষার পাঠকের সামনে উপস্থিত করে চলছেন। হ্যা ছোটবেলা থেকেই মণিপুরি সমাজ-সংস্কৃতির সাথে পরিচয়, আমাদের প্রতিবেশি মণিপুরি জাতিগোষ্টির বসবাস, ফলে ছোট বয়স থেকেই মণিপুরি সংস্কৃতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে, এটা যেমন সত্য, তেমনি তাদের সাথে মেলা মেশা, বন্ধুত্বের কারণে মণিপুরি সমাজকে বুঝতে, উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে। মণিপুরি ভাষা একটি সুপ্রাচীন ভাষা, তাদের সংস্কৃতিও খুব সমৃদ্ধ। আমিও তাই সেই সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে চেয়েছি, জানতে চেয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি মণিপুরি সাহিত্যের , সংস্কৃতির স্পর্শে এসে। ত্রিপুরায় মিশ্র সংস্কৃতি ত্রিপুরাবাসীকে নিশ্চয় প্রভাবিত করে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, সামাজিক জীবন-যাপনে। দীর্ঘকাল ত্রিপুরার বাইরে বাস করলেও আমার শিকড় ত্রিপুরার সাথে যুক্ত। এছাড়া নানা জায়গায় বসবাসের ফলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। হয়তো একারণেই আমার জীবন-যাপন, কবিতা, চিন্তা-ভাবনা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে আপনার ।ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে একটি বৃহৎ পরিসরে নিজেকে দেখতে চাই। কবির কোন দেশ নেই, সমগ্র বিশ্বই কবির দেশ । কবিতার ভুবনে আমি নিজেকে আন্তর্জাতিক মানুষ হিসাবেই গন্য করি।
প্রশ্ন-৬:
ত্রিষ্টুপ, সমতট দুটো লিটল ম্যাগাজিন দুর্গাপুর ও ত্রিপুরা দু'জায়গা থেকে বের হয়।ত্রিষ্টুপ এখন প্রকাশনাও।একজন সম্পাদক ব্রজকুমারকে একজন কবি অতিক্রম করে নয়, পরস্পর, পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে তা অনস্বীকার্য কিন্তু গ্রন্থ নির্মাণেও ত্রিষ্টুপকে সামনে রেখে কাজ করছেন।পরস্পর পরস্পরকে কিরকম সহযোগিতা করেন আপনি ও আপনার স্বপ্ন- দু'জনের সাক্ষাৎকার এ বিষয়ে চাই?
ব্রজকুমার সরকার :
খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। একজন ব্যক্তি যখন লেখক/কবি এবং সম্পাদক হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করেন, তিনি প্রকাশক হিসাবেও সেই দ্বায়িত্ব পালন করতে সক্ষম-একথা বিশ্বাস করি। সেই মানুষটি যদি নিজ নিজ ভূমিকা যথাযত পালন করেন, তাহলে কোনো সংঘাত আসেনা। একজন সৃজনশীল কবি বা লেখক তো অন্য কোনো সম্পাদকের কাছেও যান বা যেতে হয়। অন্যদিকে পাঠক বা লেখকও সম্পাদকের কাছে ,প্রকাশকের কাছে যাবেন, এভাবেই পরস্পর পরস্পরের কাছে যুক্ত থাকেন। লেখক যখন সম্পাদক কিম্বা প্রকাশক হোন, তখন তাকে অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব পালন করতে হয়। বাংলা সাহিত্যে বা বিশ্ব সাহিত্যে এমন অনেক নিদর্শন আছে। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় ,একজন লেখকের পক্ষে তা অধিক লাভবান ,কারণ তিনি যেমন সাহিত্যে পারঙ্গম হবেন ,তেমনি প্রকাশক হিসাবেও সফল হবেন বলে আমার ধারনা। পত্রিকা সম্পাদনা বা প্রকাশনা চালনার কাজটি একজন ভাল লেখকই দক্ষতার সাথে করতে সক্ষম । তিনি যেমন সাহিত্য বুঝেন, তেমনি তাকে প্রকাশনা ব্যবসায়ের বিভিন্ন টেকনিকও জানতে হবে, বাজার-অর্থনীতি সম্পর্কে ধারনা থাকা চাই। শুধু বই ছেপে দিলেই প্রকাশক হওয়া যায় না। আর নিজে ভাল লেখক হলেই চলবে না, প্রতিষ্টান চালাতে হলে অভিজ্ঞ , পারদর্শী লোকের পরামর্শ , সহায়তা প্রয়োজন। অন্যদিকে সম্পাদকের বা প্রকাশকের নির্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিকল্পনা থাকা চাই। কেন পত্রিকা বা বই প্রকাশ করছি, তা যদি না জানি বা না ভাবি,তাহলে কোথাও পৌছানো যাবেনা। ব্যক্তিগত ভাবে আমার উদ্যেশ্য ও পরিকল্পনা স্থির করেই আমি কাজ করছি, সম্পাদক বা প্রকাশক হিসাবে। ত্রিষ্টুপ একুশ বছর ধরে প্রকাশ করে আসছি, নানা বাধা বিপত্তি থাকা সত্বেও অনেকটাই নিয়মিত ভাবে করছি। আমার স্বপ্ন হলো একটি ভাল, মননশীল সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করা, ত্রিষ্টুপ প্রকাশনীর ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র সামর্থ অনুযায়ী ভাল বই পাঠকের সামনে উপস্থিত করা।
সম্প্রতি ত্রিপুরায় ত্রিষ্টুপ প্রকাশনীর সহযোগী প্রতিষ্টান হিসাবে ত্রিষ্টুপ পাবলিকেশন শুরু করেছি আর এর সাথে যুক্ত আছে সমতট নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা। আগামী দিনে ত্রিষ্টুপ সাহিত্য পত্রিকাটি একযোগে দুর্গাপুর এবং আগরতলা থেকে প্রকাশ করতে চাই। ত্রিপুরার লেখক বন্ধু এবং পাঠকদের সহযোগীতা প্রার্থনা করছি।
প্রশ্ন-৭ :
ত্রিপুরার সাহিত্য আগামী সংখ্যা ত্রিষ্টুপ কিরকম হবে সংখ্যাটি?
ব্রজকুমার সরকার :
আমার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছে, ‘ত্রিপুরায় সাহিত্য ‘বিষয়ে ত্রিষ্টুপ এর একটি পূর্নাঙ্গ সংখ্যা প্রকাশ করা। এই সংখ্যায় যেমন বাংলা সাহিত্যের আলোচনা থাকবে, তেমনি ককবরক, মণিপুরি ,চাকমা ইত্যাদি সাহিত্যের আলোচনাও থাকবে। ত্রিপুরার সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত-সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু বাংলাভাষার বৃহৎ পাঠকের কাছে তা অনেকটাই অজানা। ‘ত্রিপুরার সাহিত্য ‘না বলে’ত্রিপুরায় সাহিত্য’ বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। ত্রিপুরার সেই ঐতিহ্যকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌছে দিতেই ত্রিষ্টুপ এর আগামী সংখ্যাটি প্রকাশ করতে সচেষ্ট। কাজটা কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ, সন্দেহ নেই। তাই লেখকদের সহায়তা প্রত্যাশা করি।
প্রশ্ন -৮:কাজ করতে গিয়ে কোথাও প্রতিবন্ধকতা হয়?
ব্রজকুমার সরকার :
হ্যা , কাজটা সঠিক ভাবে করতে হলে প্রতিবন্ধকতা আসবেই। ত্রিষ্টুপ এর আগামী সংখ্যাটির জন্য আমি অনেক লেখককে অনুরোধ করেছি। কিছু লেখা এসেছে, অনেকেই এখনো পাঠাতে পারেন নি। আশা করি তারা শ্রেষ্ট লেখাটি পাঠিয়ে ত্রিষ্টুপ কে সমৃদ্ধ করবেন।কিছু মূল্যবান রচনা যেগুলি গ্রন্থভুক্ত হয়েছে, তা থেকে বাচাই করে পূনর্মূদ্রন করতে চাই। আমিও যোগাযোগ করে যাচ্ছি।
প্রশ্ন -৯ :অনুবাদের মাধ্যমে সকল সেরা সাহিত্য পরস্পরের নিকট নিয়ে যাওয়া দরকার।সেই কাজ করার লোক সীমিত।আগামীদিনের পরিকল্পনা বলবেন এ বিষয়ে?
ব্রজকুমার সরকার :
এটা সত্যি যে অনুবাদ খুব গুরুত্বপূর্ন কাজ। অনেকে এটাকে খাটো চোখে দেখেন যা অজ্ঞতার পরিচয়। অনুবাদ হচ্ছে বা হয়েছে বলেই বাংলা সাহিত্য এত সমৃদ্ধ। বিশ্ব সাহিত্যের প্রসঙ্গে যদি বলি- ইউরোপিয়ান সাহিত্য অনুবাদের ফলেই বাংলা সাহিত্য এত সমৃদ্ধ হয়েছে। কবি সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর অবদান অনস্বীকার্য। ইংরাজী ছাড়াও ফরাসী, গ্রীক,স্পেনিস ইত্যাদি এবং প্রাচীন পারসিক সাহিত্য –এর সাথে অনুবাদের মাধ্যমেই আমাদের পরিচয় ঘটে। অন্যদিকে ভারতীয় প্রদেশিক সাহিত্যের সাথে পরিচিত হওয়াও সমান জরুরী। তবে আক্ষেপের বিষয়, অনুবাদকের অভাব। ইদানিং আমরা কিছু ভাল অনুবাদক পেয়েছি যারা নিরলস ভাবে প্রদেশিক সাহিত্যকে তুলে ধরছেন। কথা সাহিত্যে শ্যামল ভট্টাচার্য মূল্যবান অনুবাদের কাজ করেছেন। সাহিত্য একাডেমি এবং ন্যাশনেল বুক ট্রাস্ট কিছু ভাল কাজ করছে, যদিও তা পাঠকের কাছে পৌছে দিতে পারছে না। ত্রিষ্টুপ প্রকাশনীও সাম্প্রতিক কালে অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। মণিপুরি, অসমীয়া, হিন্দী, সাওতালী ভাষার বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ত্রিষ্টুপ প্রকাশনী থেকে।আগামী দিনেও সেই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চলছে।
প্রশ্ন-১০ :
কবিতা চিরকাল সুন্দরের কথা বলে।কবিতা বিরহের।কবিতা প্রেমের।কবিতা দ্রোহের।কবিতা আমাদের যাপনচিত্র বলেই আমি বলি।আপনার কবিতাও সুন্দরের সৃষ্টি। প্রকৃতির উপস্থিতি। প্রেম ও দ্রোহকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে হালফিলের ব্রজকুমার থেকে অপাংশু গোবিন্দ কেউ-ই নন।আপনিও নন।একটু বলবেন?
ব্রজকুমার সরকার :হ্যা ঠিক। যা সত্যি,তাই,শিব,তাই সুন্দর। কবির কাছে যে সৌন্দর্য ভাবনা, তা একজন বিজ্ঞানীর কাছে তা পৃথক। উভয়েই সত্যকে উপলব্ধি করেন, সত্যের অন্বেষণ করেন। কবি সেই শাশ্বত সৌন্দর্যের কথা বলেন, পরম সত্যের সন্ধান করেন। আর একজন বিজ্ঞানী বাস্তবতার নিরিখে সত্যের অন্বেষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুই একমাত্র সত্য, তাই কবির চোখে মৃত্যুও সুন্দর।সেই সৌন্দর্যবোধ কবিকে প্রাণিত করে কবিতা রচনায়। সেই সৌন্দর্য কিন্তু জীবন থেকেই আসে, প্রকৃতির মধ্যেই বিরাজ করে। তাই জীবনের গূঢ় উপলব্ধির মাধ্যমেই প্রেম,অপ্রেম,বিরহ,বেদনা,যন্ত্রনা –সব প্রকাশিত হয়। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে জীবন চলেনা, সাহিত্যও রচনা সম্ভব নয়।মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ, তাই সাহিত্যের জন্মলগ্ন থেকেই প্রকৃতির উপস্থিতি আমরা দেখি। আমরা সবাই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতএব ,তাকে বাদ দিয়ে কবিতা যেমন হয় না, তেমনি মানুষের জীবনে প্রেম ও দ্রোহ অনিবার্য ভাবে জড়িয়ে থাকে, কবিতায় থাকবেনা, সেটা কী সম্ভব? প্রকৃতি বলতে কেবল নিসর্গ, পাহাড়,সমুদ্র ইত্যাদি নয়। প্রকৃতির ভেতর যে অপার রহস্য, সেটার সন্ধ্যান করেন কবি।
প্রশ্ন-১১ :
আরো একটি বিষয় ,কোন অঞ্চলের কবিতাকে, সাহিত্যকে এককভাবে কোন বিশেষ জায়গায় পৌঁছানো অসম্ভব। কবিতাও সমবেত অংশীদারিত্বেরই স্ফুরণ। কি বলবেন বিষয়টি নিয়ে?
ব্রজকুমার সরকার :
কবিতাকে কোন ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ করা যায় না। প্রকৃত কবির কাছে সমগ্র বিশ্বই তাঁর দেশ। আর অমুক জায়গার কবি, ত্রিপুরার কবি বা পশ্চিমবঙ্গের কবি বলে কিছু হয় না। আমরা যারা বাংলাভাষায় কবিতা লিখি বা সাহিত্য চর্চা করি, আমি মনে করি আমরা সবাই বাংলাভাষার কবি বা লেখক। মননশীলতায়,ভাবনায়, স্থানীয় গন্ডির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, বৃহৎ প্রেক্ষাপটে নিজেকে স্থাপন করতে হবে। ,বিশেষ জায়গায় পৌছতে হলে সমবেত প্রচেষ্টার দরকার আছে বৈকি। লেখালেখি নিশ্চই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল, কিন্তু তাও সর্বাংশে সত্যি নয়। লেখকরা সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন আড্ডা, আলাপচারিতা করে থাকেন- এই আড্ডা থেকেও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। কোন ব্যক্তি যদি ঘরের চার দেওয়ালে বসে কবিতা লেখেন, তা কতটা কবিতা হয়ে ওঠবে, সন্দেহ আছে। নিজেকে অমুক জায়গার কবি বলে পরিচিতি দেবার চেষ্টা সঠিক ভাবনা হতে পারেনা। বাংলা সাহিত্যে অনেক লেখক কলকাতা থেকে অনেক দূরে থেকেও নিজেকে প্রতিষ্টিত করতে পেরেছেন, সেটা সৃজন ক্ষমতার কারনেই হয়েছে। কে কোথায় থাকেন, তার উপর সাফল্য নির্ভর করে না বলেই মনে করি। তবে আজকাল সাহিত্যেও ক্ষমতা প্রদর্শনের খেলা চলে, তাই অনেক প্রতিভাবান লেখক যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন না, সেটা ত্রিপুরাই হোক বা পশ্চিমবঙ্গেই হোক, একই রকম অভিজ্ঞতা। আজকাল সব ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কলকাতা, তাই ক্ষমতার বিকন্দ্রীকরন প্রয়োজন এবং সেটা সমবেত প্রচেষ্টায় সম্ভব হতে পারে। তবে এই নিয়ে আক্ষেপ করার দরকার নেই। নিষ্টার সাথে নিজের কাজটি করে যেতে হবে, নিজেকে ক্রমশ উন্নীত করে যেতে হবে, নিজের শ্রেষ্ট লেখাটি লিখে যেতে হবে, একদিন সুধী পাঠকের কাছে পৌছানো যাবে, সেটা মৃত্যুর পরও হতে পারে। পুরস্কার প্রাপ্তীকে সাফল্যের মানদন্ড বলে মনে করার যৌক্তিকথা নেই। কত বড় ,মহৎ লেখক কোন পুরস্কার পান নি, কিন্তু সাহিত্যে তাদের স্থান পাকা হয়ে গেছে। না না করেও বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যে অনেক প্রতিভাবান লেখক ,সেটা ত্রিপুরা,আসাম বা পশ্চিমবঙ্গের হোক, সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান নি। তাই বলে তারা ব্যর্থ নন, তারা পাঠকের অনুগ্রহ পেয়েছেন, মননশীল পাঠক পেয়েছেন, সেটাই তো বড় প্রাপ্তী। অন্যদিকে অনেক পুরস্কার প্রাপক হারিয়েও গেছেন। কোন পুরস্কারের প্রত্যাশা করে তো সবাই লিখতে আসেন না। তবু এর প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি।তাই যোগ্য লেখক পুরস্কার পেলে আনন্দ হয়।
প্রশ্ন-১২ :
কেউ কেউ বা কোন কোন আন্দোলনের প্রবক্তা বলেই দেন এই আমরা সাকুল্যে চারজন,পাঁচজন কিংবা ছয়জনই ত্রিপুরার লিজেন্ড। আমি এমন প্রবাদবাক্য মানি না।আপ্তবাক্যকে তুড়ি মেরে কাজ করে স্রোত। তারই ফলাফল আজকের তরুণদের পদচারণা। যদিও তরুণদের কথা মুখে বললেও অনেকেই তরুণদেরকে পথ বাৎলে না দিয়ে ভুল নির্দেশে গতিপথ বদলেও অঙুলিনির্দেশ ছিলো।তাতে সাহিত্যের উপর প্রভাব পড়ে।কেউ কেউ বীতশ্রদ্ধ হয়ে সাহিত্য, কবিতা থেকে পলায়ণও করে বসেন।এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী মনোভাব কবিতা থেকে কবিকে দূরত্বে নিয়ে যায় বলেই মনে হয়।কারণ কবিতা লেখতে এসে রাজনীতি করাকেই প্রাধান্য দিলে সাহিত্য সংস্কৃতিও কেমন ভোট ভোট হয়ে যাচ্ছে না?
ব্রজকুমার সরকার :
বিষয়টা বিতর্কমুলক। এ নিয়ে কিছু বলতে চাইনা।এইটুকুই বলব যে, কেউ যদি নিজেকে শ্রেষ্ট বলে দাবী করেন, তিনি করতেই পারেন, এটা ব্যক্তিগত ব্যপার। আপনি এতে বিচলিত বোধ করবেন কেন?আপনি যদি সৃজনশীল লেখক হোন, আপনি কে কি বলেছেন, সেদিকে না তাকিয়ে নিজের কাজটি করে যাবেন, হতাশ হবেন কেন? আত্মবিশ্বাস রাখুন, নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকুন। তবে তরুন লেখকরা অভিজ্ঞতা কম বলে বিভ্রান্ত হতে পারেন। তাই বলে পলায়ন করবেন কেন? অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত আর নিজের কাজটি করা উচিত। কেউ তো কারোর অঙ্গুলী নির্দেশে লিখেন না। নিজের পথ নিজেকেই বেচে নিতে হয়। কবিতা লিখতে এসে রাজনীতি কারা করেন? যারা চটজলদী কিছু পাবার প্রত্যাশা নিয়ে কবিতা লিখতে আসেন, তারাই। এইসব ব্যপার সব জায়গায় হচ্ছে। এনিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই বলেই বিশ্বাস করি। এরপরও বলি- আজকাল এই ধরনের রাজনীতি সব জায়গায় দেখা যায়, শুধু সাহিত্যে নয়, সংস্কৃতির সব শাখায় এটা দেখা যায়।প্রতিষ্টা পাবার জন্য কেউ কেউ নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারেন। তাই বাঙালীর সংস্কৃতি আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। গোবিন্দ, আপনি একজন কবি এবং প্রকাশক, সেটা জানি। আপনি আপনার আদর্শ মেনে এগিয়ে চলুন, সেটাই প্রত্যাশা করি।
প্রশ্ন-১৩ :
নানান পরিকল্পনা নিয়েই আপনি প্রকাশনায় এসছেন।আপনার গ্রন্থ নির্মাণের পর্যায়ক্রমিক স্তরবিন্যস্তের কথাগুলো বলবেন দাদা।গ্রন্থ আমাদের নিকট শুধু পাঠ-ই নয়।গ্রন্থ আনে সমমানসিকতা।গ্রন্থ আমাদের চেতনার খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার পাশাপাশি নান্দনিক দিকও আছে।সে সকল স্তর থেকে স্তরান্তরে আপনার নিজস্ব ভাবনাগুলো বলবেন।
ব্রজকুমার সরকার :
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে। নিজের লেখালেখি ছাড়াও পত্রিকা সম্পাদনার সাথে যুক্ত আছি দু ‘দশকের অধিক সময়। ত্রিষ্টুপ প্রকাশনী শুরু হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। প্রথম থেকেই একটি ভিন্ন রকম কাজ করতে চেয়েছি। একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেই এগিয়েছি, কতটা সফল হয়েছি তা এখনি বলা যাবে না। তবে বই নির্বাচনের বিষয়ে আমরা একটু ভেবে চিন্তেই করি। যা খুশী প্রকাশ করতে চাইনি,চাইবোও না। পান্ডুলিপি নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রচ্ছদ ভাবনা, কাগজের গুণমান, ছাপা, বাঁধাই, ISBN, অন্যান্য আইনগত বিষয়- এবং সর্বোপরি পাঠকের হাতে পৌছানো , সে সব স্তরগুলি একটি সিরিয়াসলি করার চেষ্টা করি। হ্যা, বই একবার পড়ে নিলেই তার কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায় না। তাই বিষয় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ।লেখক নয়, লেখাটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। সবার আগে ভাবা দরকার লেখাটির গুণমান। যে বইটি প্রকাশ করবো তার কোন উপযোগীতা আছে কিনা এবং থাকলে কাদের এটা উপযোগী। সেই অভিষ্ট পাঠকের প্রয়োজনও ভাবার বিষয়। অন্যথা, বই ছেপে ঘরে রেখে দিয়ে কি লাভ? একটি প্রকাশনী সংস্থার গ্রন্থ তালিকা দেখলেই বুঝা যায় সেটি কেমন প্রকাশক। তাই প্রকাশককেও সাহিত্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্রকাশনায় নান্দনিক দিকটিও খুব গুরুত্বপূর্ন। আমরাও প্রচ্ছদ ভাবনায় খুব সিরিয়াস। এছাড়া বই এর ভেতরে লেখা সাজানো, ফরমেটিং , দৃষ্ট নন্দন অক্ষর(ফ্রন্ট) ইত্যাদিও মনোযোগের বিষয়। পাঠকের পক্ষে পাঠ করা সহজ হবে, এমন ভাবেই ছাপা প্রয়োজন। যথেষ্ট space রাখা দরকার। প্রতিটি অধ্যায়কে কিভাবে সাজানো হবে, সেটাও প্রকাশকের নজরে থাকবে। অভিজ্ঞতা থেকেই এইগুলি শিখেছি।
প্রথম দর্শনে বইটি পাঠকের ভাল লাগা খুব প্রয়োজন। আর সময়োপযোগী চিন্তা ভাবনা দরকার। ব্যক্তিগত ভাবে আমি দেশ -বিদেশের নানা বই এর প্রচ্ছদ, লেখক পরিচিতি, পুস্তক পরিচিতি ইত্যাদি বিষয়গুলি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষন করি ও চেষ্টা করি সেই সব মাথায় রেখে বইটি সর্বাঙ্গীন সুন্দর করে প্রস্তুত করতে। প্রকাশনীর মর্যাদার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই বই প্রকাশ করতে চাই, নিছক অর্থের প্রয়োজনে যা খুশী বই প্রকাশ করতে চাইনা। আর বিপননের বিষয়টাও গুরুত্বপুর্ণ। আজকাল অনলাইন এর মাধ্যমে সহজে পাঠকের কাছে পৌছানো যায়। ত্রিষ্টুপ এর এই সুবিধা রয়েছে।
প্রশ্ন-১৪:
সাহিত্যের উপর আপনার নানা সময় নানা রকম পরীক্ষা নীরিক্ষা আছে।সেই নিরিখে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে আপনার কোন অভিজ্ঞতা কিংবা নির্দেশ থাকলে বলবেন।
ব্রজকুমার সরকার :
প্রাপ্তী-অপ্রাপ্তীর কথা ভাবছি না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলতে যা বুঝায়, আমার নিজের লেখার ক্ষেত্রে তেমন না থাকলেও আমি চালু-কবিতা লিখিনা, লিখতে চাইনি। কবিতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, সেই সব আমি খোঁজ রাখি, পড়ি। নিজের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যকে স্বীকার করেই নতুন করে লিখতে চেষ্টা করি। সময়ের সাথে সাথে সাহিত্যের ভাষাও পালটে যায়, সেটা সব ভাষা সাহিত্যেই ঘটে। আট দশকের কবিরা নতুন কাব্য ভাষা তৈরী করেছে, তারা সেই নতুন কাব্য ভাষায় কবিতা লিখেন, অনেকে তাদের কবিতা দূর্বোধ্য বলেন, কিন্তু এতে কোন পরোয়া করেন না তারা, ওরা কোন প্রাপ্তীর কথা কখনো ভাবেন না। আজ অনেক তরুন কবি তাঁদেরকে অনুসরন করেন, এক নতুন ধারার কবিতা আমরা পেয়েছি। বারীন ঘোষাল বা স্বদেশ সেন যে ধারা শুরু করেছিলেন, আজ ধীমান চক্রবর্তী, রঞ্জন ঘোষাল, প্রনব পাল, স্বপন রায় প্রভৃতি কবি বন্ধুরা যথেষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, এখন সেই ‘নতুন কবিতা’ –এ একটি ঘরাণা তৈরী হয়ে গেছে, জনপ্রিয় হয়েছে। আমি সেরকম ভাবে না লিখলেও চেষ্টা করি নতুন করে ভাবতে, নতুন ভাবে লিখতে যা অনেক ক্ষেত্রেই চালু কবিতা থেকে আলাদা বলেই মনে হবে ।হয়তো সেই কারণেই আমার পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বললেন আপনি। যাই লিখিনা কেন, সেটা কবিতা হয়ে ওঠতে হবে। প্রভাত চৌধুরী যেমন বলেন-আপ ডেটেড কবিতা। সময়ের সাথে সাথে নিজেকেও আপ ডেটেড রাখা প্রয়োজন। এখন তো কেউ রবীন্দ্রনাথের মত লিখবে না। জীবনানন্দ দাশের মতোও না।ভাবনায়, নির্মাণে, প্রকরণে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা দরকার। সেটা কতটুকু করতে পেরেছি, আমি নিজে বলতে পারব না। এক সময় আমেরিকায় কবিতা নিয়ে অনেক আন্দোলন বা পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে, বাংলা ভাষায়ও কিছুটা সেরকম চেষ্টা হয়েছে,এর প্রভাব তো আছেই। আমাদের একটি গ্রুপ পত্রিকা আছে-‘ভিন্নমুখ’,২১ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পত্রিকায় সাধারনত ‘নতুন কবিতা’ –ই প্রকাশিত হয়।সেই অর্থে আমিও এর সামিল, এইটুকু বলতে পারি।
প্রশ্ন-১৫:
তরুণদের জন্য আপনার জার্নি থেকে সহজ একটি পথ বাৎলে দিন যে মানচিত্র খুললে পৃথিবীর যে-কোন তরুণ তাকে কবি হিসেবে তৈরী করতে একটি পথ তার সামনে থাকবে।
ব্রজকুমার সরকার :
আরে বাবা! সে কীভাবে করব? আমি কোন গুরুদেব নই, হতেও চাইনা। কবিতার পথ মসৃন নয়, খুব কঠিন এবং প্রহেলিকাময়। কোন বিশেষ ব্যক্তিকে সামনে রেখে কবি হওয়া যায় না। এমন কোন সহজ জার্নি নেই যাকে অনুসরণ করলে কবি হওয়া যায় বা কোথাও পৌছানে যায়। একজন কবিকে প্রথমত একজন মননশীল পাঠক হতে হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। তাঁর পাঠ অভিজ্ঞতাই তাকে চালিত করবে তাঁর গতিপথ। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখলেও বিশ্ব সাহিত্যের খোঁজ রাখাটা জরুরী। আর আবহমান বাংলা সাহিত্যের পাঠক হলে তিনি নিজেই বুঝতে পারবেন তিনি কোন পথে যাবেন। নিজেই নিজের রাস্তা খোঁজে নেবেন তার পঠন-পাঠনের মাধ্যমে, সঞ্চিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সেই জন্য প্রয়োজন সমকালের সাহিত্যের সাথে নিবিড় যোগাযোগ। আমার তো মনে হয়, ভাল কবি হতে চাইলে, ভাল পাঠক হওয়া দরকার। এটাই সহজ পথ। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন-যত মত, তত পথ। একজন সৃজনশীল ব্যক্তি সেই পথের সন্ধান করেন যেখানে হেঁটে গেলে নতুন কিছু পাবেন। আমেরিকান কবি Robert Frost এর একটি কবিতা আমাকে খুব inspire করে। তার খানিকটা, সবাই জানেন, তবু বলছি-
“….. Two roads diverged in a wood, and I-
I took the one less travelled by
And that has made all the difference”
প্রশ্ন :১৬
কী লিখি, কেন লিখি
ব্রজকুমার সরকার:
প্রশ্নটা যদি এমন হয়- ‘কেন লিখি, কি লিখি’, তাহলে মনে হয় প্রশ্নটা অধিক অর্থবহ হয়। কেন আমি লিখি বা লিখতে চাই, না লিখলে কি ক্ষতি হবে, সেটাই তো প্রথম মনে আসার কথা। কারণ মূখ্যত ,কেন আমি লিখি, সেটা পরিস্কার না হলে, পরের প্রশ্নটা আসতে পারছে না।এরপর আসছে ,আমি কি লিখি বা লিখতে চাই। প্রসিদ্ধ লেখক আনিসুর রহমান এক জায়গায় লিখেছেন-
“লেখালেখির জীবন গোবেচারার জীবন। তারপরও কিছু বোকাপ্রজ মানুষ কেন লেখে? কথাটার মধ্যে খটকাও অনেক। যখন আমরা দেখি জাঁদরেল আমলা, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ঠিকাদার, অধ্যাপক, উজির, নাজির, উকিল, ব্যারিস্টার, বিচারপতি মুকতার এরকম অনেকেই তো লেখালেখি করে খাচ্ছে। পদ পদবী পুরস্কার খ্যাতি লাভ করছে। তাহলে লেখালেখির জীবন গোবেচারার হবে কেন? মোক্ষম প্রশ্ন।
এবারে আরো কয়েকটা প্রশ্ন জুড়ে দিই। সক্রেতিস হুদাহুদি কেন তার কথা প্রচার ও প্রকাশের জন্যে হেমলক খেয়ে মরতে গেল আর কেন বলে গেল- I to die, You to live? খামোখা গো না ধরে বিচারের রায়ের শর্তে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিলেই তো পারতো। তাহলে প্রাণটাও রক্ষা পেত, আরো অনেক কিছু প্রচার ও প্রকাশের সুযোগ থাকত। কিন্তু তাতে সক্রেতিস আর সক্রেতিস থাকতেন না। সত্য পরাজিত হত, মিথ্যার জয় হত।
লেখালেখির উদ্দেশ্য হচ্ছে- I to die; তার মানে লেখকের জীবন ফালাফালা, জীবনের নিঃশ্বাস বাজি রেখে এ পথ। একই সঙ্গে You to live অর্থাৎ জীবনের জয় দেখানো। সক্রেতিস কথাটা বলে চলে গেলেন, কিন্তু আলোর মশাল জ্বেলে গেলেন সত্য ও জ্ঞানের নিরন্তর অভিষেকে।
আমাদের লেখালেখির দর্শনটা কী? আমার কেন যেন মনে হয় সক্রেতিসের শেষ কথাটা উল্টে আমরা করে নিয়েছি- I to live, You to die; এটাই দুর্ভাগ্যক্রমে আজকের দর্শন। “
কেন লিখি-এই প্রশ্নের উত্তরে আনিসুর রহমান আরও লিখেছেন সত্য প্রকাশ। এই সত্য প্রকাশে ভীত ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ, নজরুল , কাঙাল হরিনাথ , হুমায়ুন আজাদ এবং আরও অনেক লেখক। চর্যাপদের কবিরাও দেশান্তরিত হয়েছেন সত্যপ্রকাশের দ্বায়ে। বর্তমান ভারতেও দেখছি অনেক লেখক,সাংবাদিক সত্যপ্রকাশের দ্বায়ে প্রতিষ্টানের কূনজরে পড়েছেন, জেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু ‘সত্য’ কী, এটা একটি মহার্ঘ প্রশ্ন। সত্য কথাটির ধারনাও পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে। ‘মৃত্যু’ ছাড়া অন্য সত্য কিছু নেই, এটা আমার ধারনা।
অন্যদিকে, এই প্রশ্নটার উত্তর ব্যক্তি নির্ভর। সবাই সত্য প্রকাশের জন্য লিখেন না। কেউ টাকার জন্য লিখেন,কেউ খ্যাতির জন্য,কেউ নিজের তৃপ্তির জন্য , অনেকে পাঠকের জন্য লিখেন বা কেউ কেউ অমরত্ব লাভের জন্যও লিখতে চান। হয়তো আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। একজন লেখক , তিনি কবিতাই লিখুন বা গল্প-উপ্ন্যাস বা প্রবন্ধ যাই লিখুন , যে কারণেই লিখুন, তার তো একজন পাঠক চাই। কে সেই পাঠক? এই পর্যায়ে এসেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি সামনে এসে যায়- কি লিখি? কেন লিখি প্রশ্নের জবার দেওয়া হয়ে গেলেই প্রশ্ন আসে কি লিখি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ কাহিনী, দিনলিপি, কেচ্ছা-কাহিনী নাকি কবিতা,পদ্য, কাব্য? আমার লেখার পাঠক কে, কজন আমি জানিনা। কে পড়ছে তা জানাই যথেষ্ট নয়। কবি হয়তো ভাবেন তারা কিভাবে পড়ছে, কতটুকু বুঝছে। গুণগত ধারণা মাথায় রেখে বলা যায় যে পাঠক সম্পর্কে একটা মিথ্যা ধারনা পোষন করেন লেখক। বেশির ভাগই দেখা যায় যে যাকে কবিতার বই উতসর্গ করা হয়েছে তিনি কবিতা বুঝেন না, বা পড়েন না। কবিরাও বা অন্য কবির কবিতা কতটা মনযোগ দিয়ে পড়েন, তাতে সন্দেহ জাগে। একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময়টা পেরিয়ে যাবার পড় সাধারণত কেউ আর ফিরে পড়েন না। অন্যভাবে বলা যায় কবি নিজেই তা বারবার পড়েন, নিজেই নিজেকে আচ্ছন্ন, প্রভাবিত করে রাখেন। তিনিই তার শ্রেষ্ট পাঠক। অবশ্যই এই ধারনার ব্যতিক্রম আছে, সবাই এক রকম চিন্তা করবেন,এটা বলা মুর্খতা।
নিজেই জন্য কবিতা লিখি, এ প্রত্যয়ের পর একজন অনুসন্ধিতসু পাঠক পেলেই ও বিস্মিত হই, অনুরক্ত হই । এই প্রসুংগে এটাও বলতে চাই ,সবাই পাঠক নন, কিছু একটা পড়লেই পাঠক হয় না। লেখকের মত পাঠককেও মননশীল ও সচেতন ,দীক্ষিত হতে হয়। নিজেকে দীক্ষিত পাঠক হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকি সর্বদা।
আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, আমি কেন লিখি? এর উত্তরে বলব- আমি নিজেকে প্রকাশ করার জন্যই লিখি। নিজেকে খনন করে আবিস্কার কবি নিজেকেই। জীবনের বিচিত্র পথে নানা অভিজ্ঞতা, নানা ভাবনা, প্রতিনিয়ত আমাকে সেই অন্বেষনে চালিত করে, জীবনের গূঢ় রহস্য উন্মোচত হয় , নানা ঘাত-প্রতিঘাতে যে অনুভব, অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়, যা আমাকে , আমার ভেতরের আমিকে প্ররোচিত করে লিখতে। আর তার জন্য কবিতা মাথায় জারিত হয়, প্রসুত হয় এবং এর মধ্যেকার সমস্ত লালন পালন বৃদ্ধি মস্তিস্কে চলতে থাকে। এই মধ্যে চলতে থাকে পড়াশোনা। নিজেকে উন্নীত করার প্রচেষ্ঠা। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে আমার জীবনবোধ, যা আমি কবিতা নির্মানে প্রকাশ করতে সচেষ্ঠ থাকি। আমার মনে হয়, নিজেকে প্রকাশ করার শ্রেষ্ট মাধ্যম কবিতা। জীবনের গভীরতম অনুভুতিগুলি গদ্যের চেয়ে কবিতায় প্রকাশ করা অধিকতর সুবিধাজনক। এটাও মনে হয়, কবিতা সাধারন মানুষের কাছে কখনই গ্রহনীয় নয়, প্রয়োজনীয় হিসাবে গন্য নয়। কবিতার উপযোগিতা নিয়েও হাজার তর্ক হতে পারে। সেটা শুধু কবিতা কেন, চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তাই। সব শিল্প সবার কাছে উপযোগী নাও হতে পারে। কবিরা এসব ভেবে কবিতা রচনা করেন না। সবচেয়ে কঠিনতম, জটিলতম ও মহার্ঘ শিল্প মনে হয় কবিতা। সেই শিল্প গুণের মাধ্যমেই সত্যের অন্বেষণ এবং নিজেকে আবিস্কার করার জন্যই কবিতা লিখি, নির্মান করি আমারই স্থপতি।
কবি শুধু কবিতা লেখেন যা তার নিজের কাছে সার্থক। তাই বলে কবি শুধু কবিতা লিখবেন, তাও স্বীকার্য নয়। একজন কবি , কবিতা ছাড়াও প্রবন্ধ লিখতে পারেন, গল্প -উপন্যাস , অনেক কিছুই লিখতে পারেন, যদি তার সামর্থ থাকে। এভাবেই তো আমরা অনেক মহৎ কবিকে পেয়েছি যাঁরা উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ লিখেছেন, কেউ কেউ গল্প-উপন্যাস ও অন্যান্য গদ্য লিখেছেন। নিজের কথা বলতে হয় যদি, তবে বলি, আমি তো জনপ্রিয়, বিখ্যাত লেখক নই। সাহিত্য-শিল্পকলা নিয়ে যেটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি বা অর্জন করার চেষ্ঠা করছি, তা যৎসামান্য। তবু চেষ্টা করি প্রবন্ধ লেখার, আমি মনে করি , কবিতায় যা প্রকাশ করতে পারছিনা,বা সম্ভব হচ্ছে না, তা প্রবন্ধের ভিতর প্রকাশ করা সম্ভব। তাই প্রবন্ধের মাধ্যমে নিজের চিন্তা-ভাবনাকে প্রকাশ করি।
পরিশেষে একটি কথা বলে রচনাটির ইতি টানছি। বিস্ময়, আনন্দ এবং বেদনার জন্য লিখি। কবিতা লিখে যাওয়া আমার পরম দায়!
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দাদা। আগামীদিন আপনার সহযোগিতা চাই নানা বিষয়ে।চাইবো সহচার্য।লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা থেকে প্রকাশনার নানা ধাপে আপনি সাথে থাকলে কাজে উৎসাহিত হওয়া সম্ভব। ধন্যবাদ আপনাকে আবারও।
ব্রজকুমার সরকার
----------অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই, শুভ কামনা ও ভালবাসাও। আমি কোনো সেলিব্রেটি নই। আবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই সাক্ষাতকারটির জন্য। হ্যা নিশ্চই পাশে আছি। সীমিত আমার সামর্থ, তবু আমার সহযোগীতা, সহমর্মিতা আছে এবং থাকবে। ভাল থাকুন। কবিতার জয় হোক, মানুষের জয় হোক।
২৬:১০:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ