রামেশ্বর ভট্টাচার্য এর কবিতা

রামেশ্বর ভট্টাচার্য এর কবিতা 

শরীর জুড়ে নামছে বৃষ্টি
রামেশ্বর ভট্টাচার্য

কাল ছিলে তুমি গোলাপি আভায় মশগুল
আজ হলে তুমি নীলাম্বরী আকাশ
বিদ্যুৎ ঝলকে হাসলে তুমি লাজে
তবু দুঃখমীন ভরা বুকের মাঝে
একদিন দেখো ভাঙবে মনের ভুল ।

সাহসী হলে ছুঁয়েছ তুমি কুন্তল
আকাশ থেকে নেমেছে হিমানী চাঁদ
নাভিতলে ভরে আছে মায়াবী গোপন জল
গর্ভবতীর বুকের ভেতর হঠাৎ মেঘ, পরমাদ ।

শিয়রের কাছে ছিলেন বসে কিছুক্ষণ
মনে হল সময় স্থির, অনন্ত চিরকাল
বুকের ঘন চুলে কাটলে ইলিবিলি
শরীর জুড়ে নামছে বৃষ্টি, সন্ধে বা সকাল ।

কানাগলি খুঁজে পথ যে হারায়
কোথায় ত্রিবেণী সঙ্গম
হামাগুড়ি দিয়ে পথ যে মাড়ায়
হারিয়েছে সে সংযম ।

চকাস চুম্বনে মেলেছে ডানা আকাশ শব্দময়
নীবার ধানে টইটুম্বুর গর্ভ-হিরণ্ময় ।

কোথায় হবে যে দেখা, বিন্দাস শান্ত প্রহর
একলা ঘরে শুনছি কথা, বাৎসায়নের রীতি
আর, এক লহমায় খুলছে গায়ের চাদর
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই, উদাস মতিগতি ।

এবার কলসি থেকে ছলকে উঠে কৃষ্ণা গাভীর ক্ষীর
কন্দরসে ডুবছে যেন জানুর গভীর
পরাঙ্মুখীর বুকে বাজে পরকীয়া বাঁশি
উথালপাতাল হৃদয়-রাধা, কৃষ্ণ যে ভাগচাষি ।

***   ***   ***

হৃদয় জুড়ে
রামেশ্বর ভট্টাচার্য

যারা চেয়েছিল আগুন, তাদের
ফিরিয়ে দিয়েছি সব শীতল মার্বেল

যদি খেলাচ্ছলে খুলে ফেলো সব আভরণ
তাহলে এসো ঝাঁপ দেই রূপসায়রে

চাকমা বালিকা যদি মাছরাঙা পাখি
হয়ে উড়ে যায় ভাংমুনের দিকে, তবে

এলোমেলো জীবনে কী লাভ ? ছন্দপদ্যের
শাসনে নদী তো ফিরেই যাবে মোহনায়

জীবনের টানে, শুধু কি মেঘের কাছে
মধুময় মন্দক্রান্তা ভাসে ? শুক্লা

যামিনীরও একদিন তো বিরাম আছে
রতির শেষে, দেখো অনন্ত যতিতে

তবু ম্রিয়মান যে, তাকে জাগিয়ে দিতে
সব আগুন, হৃদয় জুড়ে জ্বেলেছো যোগমায়া ।

***   ***   ***

অহল্যা
রামেশ্বর ভট্টাচার্য

তুলো বীজের মতো ছড়িয়ে পড়ছে
যে মৃদু হাওয়ায়, কানাকানি হলে
তার কথাও শোনা যায় । হিরণ্ময়
গর্ভ থেকে যে উঠে এসেছে, তার হাতে
গুঁজে দাও স্বপ্নের শোকগাথা ।
অনন্ত নক্ষত্রের পথে হাঁটতে হাঁটতে
তোমার কাছ থেকে শুনে নেবো ইদিপস ।

সে সিঁড়ি নেমে গেছে কৃষ্ণপক্ষের
দিকে, সে-দিকে প্রতিরোধের ছায়া
ফেলেছে মণিপুরের দ্রোহী রমণীরা

তুলোবীজের মতো ছড়িয়ে পড়ছে
চারিদিকে, হে প্রেম, হে দ্রোহ

লোকটাক জলের গভীর থেকে
উঠে আসছে সব মীনকেতন ।

***   ***   ***

চরাচর
রামেশ্বর ভট্টাচার্য

একদিন নদীও সরে যাবে বহুদূর
জেগে উঠবে চরাচর । একদল
মানুষ আরেক দলের দিকে তাকিয়ে
তাক করে আছে রাইফেল, মাঝখানে
উড়বে বিবর্ণ পতাকা, এই বৃষ্টিহীন
রাতে জেগে দুই কবি, তারা জানে
বর্ণমালার মেঘ নেমে আসবে
মুহুরী নদীর তটে

মানুষের জটলা থেকে নদীর
দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে
বিছানায় ফেলে গেছে চুলের কাঁটা
আয়নায় লেগে আছে লাল টিপ

এখানে নদী বা নারী কাছাকাছি ছিল সারারাত

***   ***   ***

মেধাবী বালকের স্বপ্ন গদ্য
রামেশ্বর ভট্টাচার্য

তিতাসের পার থেকে যে বালক অবাক
বিস্ময়ে ছুটে আসছে পাহাড়ের দিকে,
রূপালি মাছের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেলেছে
জলের ভেতর থেকেও মীন কেবলি পিয়াসী হয়,
বুকের ভেতর ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে
রেখে জেগে থাকে নিশিদিন, যে জাগে
আর জাগিয়ে রাখে,
ভালোবাসার তাঁকে, জয়ী হয়
বা তর্কযুদ্ধে হেরে যায়, শব্দশৈলীতে
শানিত করে নেয় কবিতাকে, প্রেয়সীর নম্রনত
মুখের দিকে তাকিয়ে যে শঙ্খচিলের স্বপ্ন দেখে
ভালোবাসো তাঁকে
এমন বিষণ্ন দিনে শুধু তাঁকেই ভালোবাসা যায়
তিতাসের পার থেকে ছুটে এসে যে বালক
কলেজ লেকের জলে নীল আকাশ দেখেছে ।*

*কবি অনিল সরকারকে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ