রাধা দত্তের ছোটগল্প

নাসিমা বানু
রাধা দত্ত

অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে যতটা খুশি হয়েছিল প্রতীম ঠিক ততটাই বিমর্ষ হয়ে গেল পোস্টিং এর কাগজ টা পেয়ে।যে প্রতীম আজীবন রাজধানীর বাইরে যায়নি তাকে কিনা চাকরি করতে মেতে হবে উত্তর ত্রিপুরার এক অজ পাড়া গাঁয়ে ?প্রতীমের মা প্রজ্ঞা তো কেঁদেই আকুল, শুধু বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন চাকরি করতে হলে যেখানে পাঠাবে সেখানেই যেতে হবে। অতঃপর প্রজ্ঞাকে চোখের জল মুছে গোছগাছ শুরু করতেই হলো -ছেলে প্রথম বার বাড়ি থেকে বের হবে তাই সব গুছিয়ে তো দিতেই হবে,বিদেশ বিভুঁইয়ে কখন কি প্রয়োজন হয় বলা তো যায় না।জনান্তিকে বলে রাখি আগরতলা ছাড়া ত্রিপুরার বাকি সব শহরকেই অজ পাড়া গাঁ ভাবেন প্রজ্ঞাদেবী।

#প্রতীমের এই মুহূর্তে চাকরির খুব বেশি প্রয়োজন ছিল না, কারণ এখনও সে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র, কৌতুহল বশত ই টেট্ পরীক্ষায় বসে নিজের ভাগ্য যাচাই করে নিতে চেয়েছিল।যেহেতু বি এড ছাড়াই সেবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ ছিল। যাহোক প্রতীম ভালোভাবেই পাশ করে যায়। তারপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন, আচমকাই একদিন পোস্ট অফিস থেকে একটি হলদে খামে ভরে সুখবর টা আসে।প্রতীমের মা খুশিতে পুরো পাড়ার লোককে মিষ্টি মুখ করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতীম সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছিল, পড়াটা সম্পূর্ণ করবে নাকি চাকরিতে যোগ দেবে। কিন্তু বন্ধু বান্ধব থেকে আত্মীয় স্বজন , সবার ভোট চাকরিতে জয়েন করার পক্ষে গেল।কারণ সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন এই বাজারে সরকারি চাকরি হাতে চাঁদ পাওয়ার সমান।

## ঠক্ ঠক্ একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল প্রতীমের , কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে বুঝতে পারছেনা, চোখ খুলে বুঝতে পারলো সকাল হয়ে গেছে, কিন্তু এটা তো তার চির পরিচিত শয়নকক্ষ নয় ! কোথায় শুয়ে আছে সে? আবার চোখ বন্ধ করে ভাবতে মনে পড়ে গেল,আজ তার চাকরি তে জয়েন করার প্রথম দিন, বাড়ি ছেড়ে ,তার নিজের শহর আগরতলা ছেড়ে কৈলাসহরের কাছে একটা গ্রামে ঘর ভাড়া নিয়েছে।আর সেখানে ই এখন শুয়ে আছে সে। কম্বলটা সরিয়ে খাট থেকে নামল প্রতীম। ঠক্ ঠক্ শব্দ টা সামনের জানালায় হচ্ছে, আস্তে করে জানালাটা খুলে দিল প্রতীম। ওমা কি সুন্দর একটা পাখি জানালার কাঁচে ঠোকরাচ্ছিল। বাইরে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল প্রতীমের, গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যা কোনদিন দেখেনি সে, সেই অপরূপ সৌন্দর্য্য আজ ধরা পড়লো তার চোখে। তাই নিজের অজান্তেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ঘরের পাশেই একচিলতে জায়গায় সুন্দর করে সাজানো বাগানে রয়েছে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ । ফুল বলতে কয়েক রকমের জবা,বেলী, গাঁদা, অপরাজিতা,কুন্দ এসব দেশি ফুল,আর পেয়ারা,লেবু,ও আম গাছ রয়েছে একটা। তবে বেশ যত্নের ছাপ রয়েছে বাগানে, কোন গাছের গোড়ায় আগাছা অথবা জঞ্জাল নেই। কতরকম পাখি কিচিরমিচির করছে গাছে গাছে,প্রতিম কখনো এতো পাখি দেখেনি তাই সকলেই তার অচেনা। কিন্তু কাল রাত পর্যন্ত যে মনখারাপ ছিল সেটা যেন মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে প্রতীমের , মনে হচ্ছে এখানে না এলে বোধহয় অনেক কিছুই অজানা রয়ে যেত।
---কি ভাই রাতে ঘুম হয়েছিল তো?
প্রতীম পেছনে ফিরে দেখল ওর মালকিন মানে ওর ভাড়া বাড়ির মালকিন রমাদেবী।ফুলের সাজি হাতে দাঁড়িয়ে,কাল রাতে ভালো করে লক্ষ্য করে নি প্রতীম, মহিলা দেখতে বেশ সুন্দরী, রিটায়ার্ড টিচার উনি ,কিন্তু দেখলে বয়স বোঝা যায় না।
প্রতীম হালকা হেসে ঘাড় নাড়ে।
তা তুমি কি রোজ এই সময়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ো?
না আসলে একটা পাখি জানালার কাঁচে ঠোকরাচ্ছিল তাই ঘুম ভেঙে গেল।
ও একটা কাঠঠোকরা পাখি, তুমি চেনো?
-- না
অবশ্য চেনার কথা নয়, শহুরে মানুষ তুমি। ভদ্রমহিলার গলায় শ্লেষ ছিল না তাই প্রতীমের খারাপ লাগলো না কথাটা।
'ঠিক আছে ,চারপাশ একটু দেখে চা খেতে এসো'।

##আজ প্রথম দিন তাই একটু তাড়াতাড়ি ই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রতীম,কাল বিকেলে ই রমা দেবীর কাছে থেকে স্কুলের রাস্তা জেনে নিয়েছিল সে।বড় রাস্তা থেকে নেমে ছোট মাটির রাস্তা,দু পাশে ধান ক্ষেত, এখন অগ্রহায়ণ মাস ফসল কাটা শুরু হয়ে গেছে।প্রতীম খুব ছোট বেলায় বিশালগড়ে দাদুর বাড়িতে যাবার সময় এই দৃশ্য দেখেছে, কিন্তু প্রতীম বড় হবার পর মা আর গ্রামে যেতে চায় নি, এনিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া ঝামেলা হয়েছে প্রচুর, বাবা শিকড়ের টানে কিছু দিন পর পর বিশালগড়ের বাড়িতে চলে যেতেন এবং তিনি চাইতেন প্রতীমকেও নিজের পিতৃপুরুষের ভিটেতে নিয়ে রাখতে কিন্তু মায়ের এই ব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল , গ্রামের পরিবেশ ,ও মানুষজন কোনটাই ভালো লাগে না প্রজ্ঞার।প্রতীম কে নিয়ে তার মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল মা ওকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ,বা নিদেনপক্ষে সিভিল সার্ভিস অফিসার হিসেবে দেখতে চেয়ে এসেছেন বরাবর। অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ আছে ,প্রতীমের মামারা সকলেই মেধাবী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা,সে নিয়ে মায়ের চাপা গর্বও রয়েছে । কিন্তু প্রতীম তো বরাবরই মধ্যমেধার,প্রজ্ঞার উচ্চশা পূরণের মাধ্যম সে হতে পারে নি।
দূর থেকে স্কুলটা দেখা যাচ্ছে , প্রতীমের এবার খানিকটা নার্ভাস লাগছে, তবু ও স্মার্টলি ঢুকে। পড়ল। এটা একটা সিনিয়র বেসিক স্কুল অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত।
প্রতীমকে নিয়ে চারজন শিক্ষক ,এরমধ্যে একজন ইনচার্জ,সবার সঙ্গে পরিচয় পর্ব সেরে নিজের ক্লাস জেনে নিয়ে রেজিষ্টার হাতে ক্লাসে ঢোকার মুহূর্তে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছে প্রতীম। ক্লাস সেভেনের ইংরেজি ক্লাশ নিতে হবে রোল-কল সেরে সবাইকে বই বের করতে বলে। মনে মনে ভাবছে 'কি জানি ওদের কি অবস্থা, এ বি সি ডি থেকে না শুরু করতে হয়!
কিন্তু প্রথম পাতা পড়তে দিলে সবাই বেশ গড়গড় করে পড়ে দিল।
বাঃ তোমরা বেশ সুন্দর করে পড়তে পারতো
,কে শিখিয়েছে ?
-উত্তরে সবাই সমস্বরে বলে উঠল 'নাসিমা দিদি'
-উনি কি তোমাদের গৃহশিক্ষিকা?
-না না , ইস্কুলের দিদি।
এবার একটু থমকে যায় প্রতিম, পরিচয় পর্বে তো কোন দিদিমণি কে দেখে নি!!

#পরপর তিনটি ক্লাশ করে স্টাফরুমে এসে একটা বড় বেঞ্চে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে প্রতীম।এখন টিফিন আওয়ার, বাচ্চাদের কলতানে মুখরিত হয়ে উঠেছে খাওয়ার ঘর।
--স্যার আপনের টিফিন নেন
এইমুহুর্তে স্টাফরুমে প্রতীম একাই আছে, তাই কথাটা শুনে চোখ খুলে তাকালো, একজন মহিলা হাতে একটা থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
--এটা কি?
-আপনের খাওন। মহিলা সম্ভবত রাধুনীর সহযোগী ‌।
প্রতীম মহিলার হাত থেকে থালা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল ,একি !! থালায় ভাত একটা গোটা ডিম আর আলু ঝোলে মাখামাখি, অবাক চোখে মহিলার দিকে তাকাতে উনি বোধহয় কিছু বুঝতে পারলেন হেসে বললেন,--সব স্যারেরা দুফরে খায়।
প্রতীম এবার বুঝতে পারে এটা মিড ডে মিলের খাবার, কিন্তু সে খাবে কি খাবে না ভাবতে মনে হলো পেটে ছুঁচো ডন মারছে। তাই খেতে শুরু করে দিল। খেতে অবশ্য মন্দ লাগলো না।
খাওয়া শেষে থালা নিয়ে খাবার ঘরের দিকে
যাবার সময় দেখলো মাঠের কোণে একটা বট গাছের নিচে একটা মেয়ে বসে আছে তার তাকে ঘিরে আছে অনেক গুলো বাচ্চা। প্রতীমের ভীষন কৌতুহল হচ্ছে কারণ দূর থেকে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, মেয়ে টা কিছু বলছে আর বাচ্চা গুলো মন দিয়ে শুনছে।হাত ধুয়ে আসতে না আসতেই ক্লাসের বেল বেজে উঠল। সবাই দৌড়ে ক্লাসে ঢুকে গেল।

## নিজের ঘরে এসে ফ্রেশ হতে না হতেই দিদা মানে ওর মালকিন রমাদেবী এলেন,খাবারের থালা নিয়ে, উনি প্রথম দিন ই বলে দিয়েছেন ,প্রতীমকে রান্না করতে হবে না।
--প্রতীম আপত্তি জানালেও কোন লাভ হয়নি।
আসলে ওরা স্বামী স্ত্রী একা থাকেন। ছেলে বিদেশে থাকে, তাই প্রতীমকে পেয়ে ওদের একাকী জীবনের শূন্যতা খানিকটা ভরাট করে নিতে চান।
--কি খুব ক্ষিদে পেয়েছে বুঝি?
---না না খেয়েছি তো।
--তুমি খেতে পারলে ওসব?
--খারাপ লাগেনি। বলে হাসে প্রতীম।
-তা শিক্ষক জীবনের প্রথম দিন কেমন কাটলো?
-ভালোই ,ছেলে মেয়েরা বেশ সপ্রতিভ আমি অতটা আশা করিনি।
-আগে এরকম ছিল না জানো, নাসিমা র পরিশ্রম আর ধৈর্য্য এই স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের এই জায়গায় নিয়ে গেছে।
প্রতীম অবাক চোখে দিদার দিকে তাকাতে উনি বললেন -নাসিমা কে দেখনি বুঝি?
--কি ব্যাপার বলুন তো? ছাত্র ছাত্রীরা ও বললো নাসিমা দিদির কথা!
খাবারের থালা প্রতীমের হাতে তুলে দিয়ে রমা দেবী বললেন এখন তো আমার সময় নেই অন্য একদিন বলবো নাসিমা বানুর গল্প।

#আজ স্কুলে একটু তাড়াতাড়ি ই পৌঁছে যায় প্রতীম, আসলে সে নাসিমার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে , আজ মেয়েটার সাথে কি দেখা হতে পারে? ভাবতে ভাবতেই দেখে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ে কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে হেঁটে আসছে,স্কুলে ঢুকে মাঠের কোনায় বট গাছের নিচে বসে ওরা ,প্রতিমের ইচ্ছে করছে কাছে গিয়ে আলাপ করতে, কিন্তু ওর মুখচোরা স্বভাব ওকে এগোতে দেয় না। নাহ্ আজ বাসায় ফিরে দিদার কাছে জানতেই হবে এই মেয়েটির কথা।
বাড়ি ফিরে আজ দিদার ঘরে খেতে যায় প্রতিম।
--আজ কিন্তু আপনাকে নাসিমার গল্প শোনাতে হবে।
--বুঝতে পারছি তোমার খুব কৌতুহল হচ্ছে, ঠিক আছে তবে বলছি শোনো।
একটা চেয়ার টেনে বসে ধীরে ধীরে শোনাতে লাগলেন রমা দেবী।

# অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের কন্যা নাসিমার বাবার কয়েক বিঘা জমি আর ছোট বসত ভিটা ছাড়া কিছুই ছিল না। বাবার প্রথম সন্তান নাসিমা , এরপর আরো দুই ভাই বোন ‌। ছেলেমেয়েদের খাবার জোটাতেই হিমসিম খেতে হতো ইদ্রিস মিয়াকে, তাই লেখাপড়া করানোর ইচ্ছে থাকলেও স্কুলে ভর্তি করার সাহস ছিল না।অথচ নাসিমা শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতো লেখাপড়া শিখে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করার। 
দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নাসিমার মা একদিন ওকে রমাদেবীর বাড়িতে কাজের জন্য দিয়ে যায়,আর তাঁর কাছে আসার পর তিনি বুঝতে পারেন মেয়েটির লেখাপড়া শেখার অদম্য ইচ্ছের কথা।। তিনিই ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে ,প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হয়েছে সে। তার এই রেজাল্ট দেখে শিক্ষক রা যতটা পেরেছেন সাহায্য করেছেন, সিনিয়র বেসিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হলে রমা দেবীই ওর সমস্ত খরচ বহন করেন, এবং ততদিনে গ্রামের অন্যরাও নাসিমার ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী হয়ে উঠে। সবাইকে গর্বিত করে নাসিমা প্রথম বিভাগে দুটো লেটার নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকেও আশানুরূপ ফল হয়। কিন্তু পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হবার আগেই চাকরির অফার হাতে পেয়ে যায় নাসিমা,যে স্কুল থেকে তার লড়াই শুরু হয়েছিল সেই স্কুলেই পোস্টিং। তারপর ছয় সাতবছর এই স্কুলই হয় তার ধ্যান জ্ঞান। তার জন্মভূমি এই ছোট্ট গ্রাম থেকে অশিক্ষা আর দারিদ্র্য দূর করার জন্য ব্রতী হয় সে। তবে নাসিমার ভাই বোনেরা খুব বেশি লেখাপড়া করতে চায় নি ,তাই ভাইকে একটা অটো কিনে দিয়েছে আর বোনকে সেলাই এর কোর্স করিয়ে একটা দোকান করে দিয়েছে ।সেখান থেকে ওর ভালোই আয় হয়। বাবার পরিশ্রম লাঘব করার জন্য একটি ছোট মুদী দোকান খুলে দিয়েছে বাড়ির সামনে। এই সব কর্তব্য পালন শেষ করতে করতে ই একদিন কানাঘুষো শোনা যায় ওদের চাকরি নাকি চলে যাবে, ধীরে ধীরে সেই কানাঘুষো সত্যি হবার উপক্রম হয় এবং নাসিমা ও তার মতো আরো অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা একটা সংখ্যায় পরিণত হয়ে যায়।
কিন্তু নাসিমা তো লড়াইয়ে নেমেছিল--অশিক্ষা-অজ্ঞতার বিরুদ্ধে ছিল তার লড়াই। তাই সে থেমে থাকেনি চাকরি চলে যাবার পর বাবার দোকান চালানোর পাশাপাশি স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের টিফিন আওয়ারে এসে পড়ায়, তাদের খোঁজ খবর নিয়ে কার খাতা লাগবে ,কার কলম, অথবা পেন্সিল কিংবা বই সেসব যোগান দিয়ে যায়।নাসিমার আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই গ্রামে ড্রপ আউট ছাত্র নেই বললেই চলে। তাই সে স্কুলে এসে পড়ালেও স্কুল কমিটি কোন আপত্তি করে না।এছাড়াও সন্ধ্যা বেলায় নিজের উদ্যোগে চালায় বয়স্কশিক্ষা কেন্দ্র যেখানে অল্প অল্প লেখাপড়ার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার পাঠ দেয় নাসিমা। তার জীবনের একমাত্র ব্রত হচ্ছে -গরীব অনগ্রসর ও নিরক্ষর গ্রামবাসীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে সুন্দর ও নিরাপদ জীবন উপহার দেওয়া।

দিদার মুখে নাসিমার কথা শুনতে শুনতে প্রতীম মনে মনে কুর্নিশ জানায় নাসিমাকে। সে অবাক হয়ে ভাবে এভাবেও লড়াই করা যায় !! কারো প্রতি কোন অনুযোগ , অভিযোগ ছাড়া, নীরবে শুধু নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করে যেতে পারে কেউ??
ভাগ্যিস এখানে পোস্টিং হয়েছিল ! নয়তো শিক্ষাব্রতী শব্দটি বইয়ের পাতায় ই থেকে যেত হৃদয়ঙ্গম করতে পারতো না কোনদিন।


ছায়াবৃক্ষ

বাবার হাত ধরে চা বাগিচায় ঘুরতে যেতাম ছেলেবেলায়। বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠে কাজে যেতেন। সারা দিন চা বাগিচায় কাজ করতে হতো তাকে। ছুটির দিনে বিকেলে আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেত।মা রাগ করে বলতেন - ঘুরতে যাওয়ার কি আর কোন জায়গা নেই? সারা সপ্তাহ তো ওখানেই পড়ে থাকে। আমি বুঝতে পারতাম ওটা আসলে বাবার ভালোবাসার জগৎ। তাই বাবা আমাকে নিয়ে ওখানে ই যেত।পরম মমতায় গাছগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমাকে শেখাত কিভাবে গাছের যত্ন নিতে হয়। আমি একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম -এই চারা গাছের মাঝে মাঝে বড়ো গাছগুলো কেন লাগানো হয়েছে? বাবা বললেন, ওগুলো ছায়া দেয়, প্রখর রোদের থেকে চারা গাছ গুলো কে রক্ষা করে। সেদিনের সেই কথা গুলো আজ শ্মশান ঘাটে বসে মনে পড়ছে। বাবাকে নিয়ে বসে আছি।চিতা সাজানো হচ্ছে। আমি বাবার দেহ ছুঁয়ে বসে আছি। ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ছে , আমরা ভাই বোন চারজনের মধ্যে বাবার সঙ্গে বেশি ভাব ছিল আমার। আমি ছোট বেলা থেকেই খুব শান্ত স্বভাবের ছিলাম তাছাড়া শারীরিক ভাবেও আমি ছিলাম দূর্বল ।ম‍্যালেরিয়ায় ভুগেছি কয়েক বার, সেজন্য বাবা সবসময়ই আমাকে আগলে রেখেছেন।রোগাভোগা হলেও লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম, তাই বাড়ীতে সবাই আমাকে ভালো বাসতেন। ছোট চা বাগানের টিলাবাবু আমার বাবার রোজগার ছিল সীমিত, সেই সীমিত আয়ে মা সংসার চালাতেন নিপুণ হাতে, আমার এখনও ভাবলে অবাক লাগে মা কোন দিন কোন অনুযোগ করেন নি! আমাদের বাসায় সবসময় অতিথি অভ‍্যাগতের ভীড় লেগেই থাকত,মা তাদের আপ‍্যায়নে কোন ত্রুটি রাখতেন না, হাসিমুখে সবার সব আব্দার মেটাতেন, কি করে মা পারতেন সেই রহস্য শুধু মা জানেন। বাবা আমাকে নিয়ে খেতে বসতেন ,মা যতটুকু সম্ভব ভালো জিনিষ গুলো বাবার পাতে তুলে দিতেন বাবা সেগুলো আমার পাতে দিয়ে দিতেন, ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতাম, জিলিপি খেতে ভালোবাসতাম বলে বাবা জিলিপি কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিতেন, আমি খেয়ে যা থাকবে দিদি দাদা খাবে, পূজোর ছুটি কাটাতে আমরা মামাবাড়ি যেতাম,বাবা সেসময় ওভারটাইম করতেন বাড়তি খরচ মেটাতে। 
স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় জেলাতে প্রথম হলাম, আনন্দে বাবা কেঁদে ফেললেন। পরিবারের সবার ইচ্ছে আমি ডাক্তার হব,দাদা কলেজ যাওয়া বন্ধ করে বাগানে চাকরি নিতে চাইলে বাবা কিছুতেই রাজি হননি। দেশের বাড়ীতে যেটুকু জমিজমা ছিল, বিক্রি করে আমাকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে দেন। দিদির বিয়ের জন্য বাবা সেই জমিটা রেখেছিলেন। আমি মাকে কথা দিয়েছিলাম দিদির বিয়ের সব দায়িত্ব আমি নেব। জীবনে সব কথা রাখা সম্ভব হয়না আমি ও রাখিনি। 
আমি ডাক্তার হবার পর বাবা পুরো বাগানের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছেন, দাদা বাগানের পাশের স্কুলে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বাবার খানিকটা সাহায্য হচ্ছিল, কিন্তু বাবা তখন পর্যন্ত ওভারটাইম বন্ধ করেন নি, আমার পিজি কোর্সে ভর্তির জন্য টাকার প্রয়োজন ছিল তাই বাবা পরিশ্রম বাড়িয়ে দেন। এতো পরিশ্রম করে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়,মা আমাকে জানিয়েছেন সেকথা কিন্তু আমার তখন সেসব কথা ভাববার সময় ছিল না, আমি লেখাপড়া আর তৃণাকে নিয়ে ব্যস্ত,বাড়ীর লোকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল আস্তে আস্তে। আমি চাকরী পেয়ে দিল্লি চলে গেলাম, দূরত্ব আরো বেড়ে গেল, ইতিমধ্যে দিদির বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল। ছোট বোন তিথি একজনের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করল, আমাকে বাবা সব জানিয়েছেন, কিন্তু আমি তখন এফ আর সি এস করার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি,বলা বাহুল্য তৃণার বাবা সব ঠিক করেছেন, তাই বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বাড়িতে আসা সম্ভব হয় নি। 
দাদা স্নান সেরে আমাকে ডাকছে এবার মুখাগ্নি করতে হবে, আমার পা দুটো যেন ভারী হয়ে আছে, আমি উঠে দাঁড়াতেই পারছিনা কোন মতে উঠে দাঁড়িয়ে দাদার পিছু নিতে আমার হাতটা কেউ টেনে ধরলো আমি পেছন ফিরে দেখি দাদার ছেলে রনি, আমার দিকে না তাকিয়ে দাদাকে বললো -' বাবা ঠাকুমা বলেছেন তুমি একাই মুখাগ্নি করবে,আর যেন কেউ না করে।'
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম,মা একথা বলেছেন!!
আমি অসহায় চোখে দাদার দিকে তাকালাম,দাদা রনির দিকে তাকিয়ে আছে অপলক, আসলে রনির কথায় যে দৃঢ়তা ছিল সেটা ঠিক অবজ্ঞা করতে পারছেনা সে।

এখন রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে , বাড়িতে সবাই যে যেভাবে পেরেছে শুয়ে পড়ছে, আমি একা বারান্দায় বসে আছি, বাবা যে ইজিচেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন তার পাশের টুলে বসে আছি একা ছেলেবেলার স্মৃতি গুলো মনে ভীড় করে আসছে।
মনে হচ্ছে বাবা আমার পাশেই বসে আছেন, আস্তে আস্তে কথা বলছেন আমার সঙ্গে,"তোর ওপর আমার ভরসা বেশি অনু , তোকে বড় ডাক্তার হয়ে মানুষের চিকিৎসা ও সেবা করতে হবে" 
আমি বাবার হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিতে চাইলে তিনি হাত সরিয়ে নিলেন।তবে কি বাবা আমাকে মাফ করবেন না?
আমার কাঁধে কারো হাত পড়তেই চমকে উঠলাম, পেছনে ফিরে দেখি মা দাঁড়িয়ে, আমি তাকাতে মা হিস্ হিস্ করে বলল,"কেন এসেছিস? মানুষ টার সব রক্ত শুষে নিয়ে শান্তি হয়নি তোর?কি চাস তুই আমাকে মেরে ফেলতে?
আমি হতবাক। কি বলছ মা? আমি বাবাকে মেরে ফেলেছি?
তাই তো করেছিস। তোর জন্য কষ্ট পেতে পেতে তোর বাবা এত বড় অসুখ বাধিয়েছে,, বারবার তোকে ফোন করেছি কিন্তু তোর বৌ তোকে ডেকে দেয়নি। শেষ ক'টা দিন কথা বলেন নি বোবা চোখে শুধু তোকে খূজেছেন।বড় খোকা তোর হাসপাতালে চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম হয়তো তুই আসবি, কিন্তু তুই ক'টা টাকা পাঠিয়ে কর্তব্য পালন করলি, কে চায় তোর টাকা? দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে থেকেছি তোর বাবা আর আমি কখনো তোকে জানতে দিইনি তোর লেখা পড়ার অসুবিধা হবে বলে।পারবি ফিরিয়ে দিতে সেই দিন গুলো!
এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মা চলে গেলেন। আমি মাথা নিচু করে মার যাবতীয় অভিযোগ মেনে নিলাম, এছাড়া আমার কিছু করার নেই আমি এতবড় হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক,অথচ আমার পিতা প্রায় বিনা চিকিৎসায় চলে গেলেন,এ লজ্জা কোথায় রাখি।

ভোরের আলো ফুটতে বেরিয়ে পড়লাম কাউকে কিছু না বলে,চা বাগানের পথ ধরে হাঁটছি, দুদিকে চা গাছের চারা গুলো ছায়াবৃক্ষের আচ্ছাদনে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছে। প্রখর রোদে শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য বিশাল বৃক্ষ গুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এই প্রাচীন বৃক্ষ গুলো চিনতে পেরেছে আমাকে,আমি মাথা নীচু করে দ্রুত হাঁটতে থাকি। কারণ ওদের জানাতে চাই না আমি যে সমূলে উৎপাটিত করেছি আমার ছায়াবৃক্ষ।

রাধা দত্ত।
২০.১২.২০১৯

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ