প্রশ্ন :১
লেখালেখি কখন থেকে শুরু করেছেন?
উত্তর :১
উদয়পুরে রমেশ স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ার সময়ে দেওয়াল পত্রিকার জন্যে কবিতা লিখে আমার লেখালেখি শুরু। সেটা ছিল ১৯৭৬ সাল। এরপর আরও চারটি বছর রমেশ স্কুলে থাকার সময়ে নানা বিষয়ে প্রচুর বই পড়া এবং স্কুলের অসাধারণ লাইব্রেরিটির এ-বই, সে-বই দেখা হয়েছে, যা আমার জীবনের অন্যতম ভিত্তি বলে আমি মনে করি। ১৯৭৯-৮০ সালে স্কুলে পড়াকালেই সহপাঠী শুভাশিস তলাপাত্রের সম্পাদনায় শ্রীগুরু প্রেস থেকে ছাপিয়ে পত্রিকা বের করি। পত্রিকার প্রথমে নাম ছিল "ক্রন্দসী"। দ্বিতীয় সংখ্যায় নাম হয় "একা নেই আর"। তৃতীয় সংখ্যার পর আর পত্রিকা বেরোয় নি। কলেজ জীবন শুরু হয়।
প্রশ্ন :২
লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় আপনি এরাজ্যে এক আন্দোলনের নাম।সেই স্বপ্ন কিরকম বুকে জারিত রাখেন?
উত্তর :২
লিটল ম্যাগাজিনের সাথে মনের ও প্রাণের সংযোগ একবার হয়ে গেলে এক অদ্ভূত পাগলামি জীবনকে চালনা করতে শুরু করে। আমারও তাই হয়েছে। স্কুল থেকেই পত্রিকা প্রকাশ করার উন্মাদনা আমাকে আজও জাগিয়ে রেখেছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে লিটল ম্যাগাজিনের সাথে জড়িয়ে আছি। সীসার লেটার প্রেস থেকে থেকে শুরু করে সিল্ক স্ক্রিন ও হাল আমলের কম্পিউটার ও অফসেট, সবই আমার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। চলছে, চলবে বাকি জীবন।
প্রশ্ন :৩
নিরন্তর সাধনারও আপনার দীর্ঘ জার্নি।এত প্রাণ কি করে পান?
উত্তর: ৩
চেতনা, বোধ ও সৃষ্টিশীলতা যদি প্রকৃত অর্থেই কারো প্রাণের সাথে কথা বলে, তবে প্রাণশক্তি আপনাতেই এসে যায়। আমি আন্তরিকভাবে কথাটাকে বিশ্বাস করি। তাই যখন যা কিছু ভাবি, তাকে বাস্তবায়িত করার জন্যে ঝাঁপাই, সেখানে সৃষ্টির উন্মাদনা আমাকে চালিত করে।
প্রশ্ন :৪
এ অঞ্চলের সাহিত্যে ভিন্ন সুর আমরা অনুভব করছি।বৃহৎ বাংলার বাংলা সাহিত্যের সাথে সুর মিললেও তার আছে নিজস্ব স্বর।আপনি কেমন দেখেন?
উত্তর: ৪
উত্তর-পূর্বের ছোট্ট এক রাজ্যে আমাদের বাস। এখানকার বাঙালি সাহিত্য ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির শিকড় পূর্ববঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত, প্রোথিত। স্বাধীনোত্তর ৭৫ বছরেও এখানকার ভিন্নতর কোনো সুর সর্বভারতীয় বা বৃহত্তর বাঙালি আঙিনায় বিশেষ রেখাপাত করতে পেরেছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না। আজও আমরা ভীষণ রকম কলকাতার মুখাপেক্ষী, সেখানকার যা-কিছু, তাকেই অনুসরণ করতে আজও আমরা বেশি ভালোবাসি। সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতির জগতে আমাদের আলাদা কোনো 'সিগনেচার টিউন' আজও আমরা তৈরি করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা।
প্রশ্ন :৫
সময় টপকে কেউ একক একনায়কতন্ত্র কায়েম করে সাহিত্য বলুন সংস্কৃতি বলুন রাজনীতি বলুন তিনিই শ্রেষ্ঠ হতে পারেন?
উত্তর: ৫
সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিতে একনায়কতন্ত্র বলে কোনো কথা নেই। কোনোদিন ছিলোও না। রাজনীতিতে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ক্ষমতার দম্ভ হয়তো কিছুদিন কেউ চালাতে পারেন। কিন্তু সেটা চিরস্থায়ী নয়। কাল সেই দম্ভকে একদিন ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এটাই ইতিহাস। আবার ইতিহাস এ কথাই বলে, প্রকৃত অর্থের সৃষ্টিশীলতা কালের প্রবাহে দাম পাবেই কোন একদিন।
প্রশ্ন:৬ কোন মুভমেন্ট কি এককভাবে তৈরী করা যায়?
উত্তর :৬
মুভমেন্ট এককভাবে তৈরি নিশ্চয়ই হতে পারে, তা হয়তো ততটা জোরদার কিংবা দূরগামী হয় না। কিন্তু ভিন্নতর ভাবনায় নিজের সৃষ্টিকে দাঁড় করাবার চেষ্টা পৃথিবীতে অনেকেই করেছেন, করছেন। হয়তো সেসবের ততটা প্রচার নেই। অনেক মানুষ সম্মিলিত হয়ে নির্দিষ্ট এক বা একগুচ্ছ ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে চাইলে, তাকে আমরা মুভমেন্ট বলবো, কিন্তু কেউ এককভাবে প্রচেষ্টা নিয়ে এগোতে থাকলে মুভমেন্ট কেন বলবো না, নিশ্চয়ই বলবো।
প্রশ্ন :৭
আমাদের সাহিত্যগুলো আরো কেন্দ্রীয়ভাবে এক দুটো বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিক্রি হওয়ার প্রস্তাব এসছিল প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনেই।কিন্তু তা আর হলো না?এই আক্ষেপ হয়?
উত্তর :৭
ত্রিপুরায় আমরা যে যা-ই লেখালেখি করি, তা বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে না। আসলে কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার, দেশ, যুগান্তর, আজকাল, কালিকলম, কৃত্তিবাস ইত্যাদির পুরো বাংলার উপর যে আধিপত্য কিংবা জনপ্রিয়তা ছিলো তা সময় পরিবর্তনের কারণে এখন ততটা নেই। এখন অনেকটাই স্থিমিত। মানুষ এখন অনেক বেশি মোবাইল- মুখো। অতএব সাহিত্যপত্রের খুব বেশি বিপনন হবে বলে আমার মনে হয় না। সম্মেলনে অনেক কথা হয়, বাড়ি ফিরে সেসব আমরা ভুলে যাই।
প্রশ্ন :৮
আমাদের এই অঞ্চলের প্রকাশকদের সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ভালোবাসার প্রকাশ সে না এক পাওনা আমাদের। কিন্তু এরকম ভালোবাসায় একটি প্রকাশনা হাউজ টিকিয়ে রাখা যায়?
উত্তর :৮
প্রকাশনা টিকিয়ে রাখা অধিকাংশ প্রকাশকের পক্ষে যুগে যুগেই কষ্টকর। হাতে গোনা কয়েকটি ভালো অবস্থায় আছে, ভালো থাকে। কিন্তু সার্বিকভাবে দেখতে গেলে, সবাই তো সৃষ্টির জন্যেই চিন্তাভাবনা করেন, অতএব দায়বদ্ধতা সবাই নিশ্চয়ই অনুভব করেন।
প্রশ্ন :৯
একটি গ্রন্থ নির্মানে বইয়ের বিষয়ের সাথে প্রচ্ছদ কতটুকু একে অন্যের পরিপূরক?
উত্তর :৯
বইয়ের প্রচ্ছদ অবশ্যই বইয়ের অঙ্গ। কোন এক সময়ে লেটার প্রেসে কাজ করার সময়ে লিনোকাট করে বহু প্রচ্ছদ আমি নিজেও করেছি। পরে সিল্কস্ক্রিনও করেছি অনেক। তারপর ফটোশপ, কালারপ্রিন্ট এমনভাবে সাম্রাজ্য বিস্তার করে নিয়েছে যে, এখন যে কেউ-ই প্রচ্ছদ করে নেন। এটা নিশ্চয়ই ভালো হয়নি। কোন এক ফটোশপ-এক্সপার্ট পাঁচটা ছবি কেটেকুটে দৃষ্টিশোভন কিছু একটা হয়তো বানিয়ে দেন, তা আদৌ বই বা পত্রিকাটির প্রচ্ছদ হলো কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে শিল্পীর হাতের রঙতুলির বিদায় আমাকে ব্যথিত করে। আগামীদিনে তা নিশ্চয়ই আবার ফিরে আসবে। বই কিংবা পত্রিকা ও তার প্রচ্ছদ, একে অন্যের পরিপূরক। বিষয়টা আছে, থাকবে।
প্রশ্ন :১০
কোন পথে আমাদের সময়।কোন পরামর্শ কিংবা আমাদেরকে পথ বাৎলে দেবেন?
উত্তর :১০
সময় সর্বদা পরিবর্তনশীল। এটাই সময়ের নিয়ম। আবার চলমান সময়কে মানুষ চিরকালই ভেবে এসেছে অস্থির, অভূতপূর্ব। পরামর্শ বা পথ বলে দেওয়ার কেউকেটা আমি নই। আমি কেবলমাত্র নিজের পথটা খুঁজে নেবার চেষ্টা করি।
প্রশ্ন :১১
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ কতটুকু প্রাসঙ্গিক?
উত্তর: ১১
রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনধারণে প্রাত্যহিক, আবশ্যিক। এই কথাটা ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি। রবীন্দ্রনাথের মতো মহীরুহ নানামুখী সৃষ্টিশীলতায় যে ভাণ্ডার আমাদের জন্যে রেখে গেছেন, তাতে প্রতিদিনই একটু-আধটু অবগাহন করলে এই সময়েও আমাদের শরীর থেকে কিছুটা ময়লা দূরীভূত হবে বলে আমি মনে করি। তাই প্রতিদিনই গান, কবিতা, লেখা কিংবা অন্যভাবে প্রতিদিনই আমি রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করার চেষ্টা করি।
প্রশ্ন :১২
তরুণদের জন্য কিছু বলবেন?
উত্তর :১২
তরুণদের জন্যে আলাদা করে কিছু বলার নেই। নিজের তরুণ বয়সের কথা হঠাৎ হঠাৎ ভাবলে আজও সেইসব পাগলামির জন্যে অবাক হই। সে পাগলামি এখন আর করতে পারবো না। পাগলামি করা তরুণদের ধর্ম। তা ওরা ওদের মতো করেই করুক। তাতে চাপিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।
প্রশ্ন :১৩
উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বৈচিত্র্যময় জীবনের জন্য জীবনমানের গুণগত উন্নতির জন্য প্রকৃত পক্ষে কি উদ্যোগ নেওয়া দরকার?
উত্তর :১৩
উত্তর-পূর্ব ভারতে আমার জন্ম ও জীবন কাটানো। জীবনটার অধিকাংশ দিনগুলো কাটিয়ে এখন আমার মনে হয়, উত্তর-পূর্বের কিছুই দেখিনি। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ইত্যাদি ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র, বরাক এখনও আমার অচেনা। একমাত্র আমি নই, অধিকাংশ উত্তর-পূর্ববাসীর ক্ষেত্রে এ কথা সত্যি। উত্তর-পূর্বের সাথে প্রকৃত অর্থেই কি আমরা একাত্ম হতে পেরেছি? বাইরে থেকে বৈচিত্র্যময়তার কথা বলে বলে তৃপ্তি অনুভব ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে?
প্রশ্ন :১৪
কি রেখে যেতে চান?যা ১০০ বছর পর চর্চা হবে?
উত্তর: ১৪
কবিতা ও গল্প দিয়েই আমারও লেখালেখি শুরু। দীর্ঘদিন সেসব করে তেমন কোনো ফসল উৎপাদন করতে পারিনি। তখন ভাবলাম, অতীত ও ইতিহাসের দিকে যাবো। তাই গত কুড়ি বছর ধরে সে পথে ঘুরছি। এই মুহূর্তে বিশ্বাস করি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এমন কয়েকটি বই রেখে যেতে পারবো যা আগামী ১০০ বছর পরও দরকার হবে। উদয়পুর, ত্রিপুরার পর একটু একটু করে বৃহত্তর ত্রিপুরা ও পূর্ববঙ্গের দিকে যাত্রা করছি, নিজের পরিসরটাকে বড় করার চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন :১৫
আপনার সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্যেশ নিজেদের প্রতিনিধিদের আর্থিক উন্নয়ন?নাকি সামগ্রিকভাবে ত্রিপুরার বইশিল্পকে বৃহত্তর পাঠকের নিকট শৈল্পিক উপস্থাপন করা?
উত্তর :১৫
এক দুটির কথা বাদ দিলে, ত্রিপুরায় প্রকাশন এখনও ব্যবসায়িক হয়নি। অ্যামেচার পর্যায়েই আছে। বই ছাপানোর আসল পয়সা উঠে আসতেই হিমসিম খেতে হয় সবাইকে। তাতে লাভ বা মুনাফার কথা ভাবটা আকাশকুসুম কল্পনা। অতএব প্রতিনিধিদের অর্থ প্রদানের ইচ্ছে থাকলেও তা বাস্তবে হোটচ খায়। কিন্তু প্রোফেশনাল ভাবনায় আসতে পারলে নিশ্চয়ই উন্নতি হবে, কাজের গুণগত মান বাড়বে। 'গুনগত মান ভালো না হলে বই প্রকাশিত হবে না', একথা যদি সমস্ত প্রকাশক একসাথে ভাবতে পারে, তবে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, প্রচ্ছদ, মুদ্রণ, বাঁধাই ইত্যাদি মিলে এক একটি ভালো বই ত্রিপুরার বাজারে আসতে পারে, জঞ্জাল নয়।
প্রশ্ন :১৬
আপনি একটি প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদক।সংস্থাটি বইপত্র আন্দোলনে সীমাহীন ভূমিকা ইতিমধ্যেই ইতিহাস।প্রকাশকদের সম্মিলিত এরকম সংস্থার মাধ্যমে একজন প্রকাশককে কিরকম সহযোগিতা করা যায়?
উত্তর: ১৬
এটা তো ঠিক, মূল ভারতের একটি কোণে ত্রিপুরার অবস্থান। আর, কলকাতা এখনও বাংলা বইয়ের প্রধানতম বিপননকেন্দ্র। প্রত্যন্ত ত্রিপুরা থেকে গিয়ে প্রতিটি প্রকাশকের পক্ষে কলকাতায় 'বাজার ধরা' নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের এতগুলো জেলা, পাশাপাশি বিহার, ওড়িশা, দিল্লী, মুম্বাই, আসাম কিংবা বাংলাদেশের বৃহত্তর বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়া নিশ্চয়ই আগরতলায় বসে সম্ভব নয়। তাতে কলকাতা-ই কেন্দ্র। সে ক্ষেত্রে সম্মিলিত ভাবনা ভাবা যেতে পারে।
প্রশ্ন :১৭
একজন প্রকাশক নিজেকে কিরকম তৈরী করা প্রয়োজন?
উত্তর :১৭
প্রকাশককে অবশ্যই পাঠক হতে হবে। বই সম্বন্ধে ধারণা, পড়াশোনা ও জ্ঞান না থাকলে বই প্রকাশ অসম্ভব। কর্মচারী নির্ভরতায় তা হয় না। প্রকাশককে স্বপ্নবিলাসী হতে হবে, নইলে ভিন্নধর্মী কিছু পাওয়া অসম্ভব।
প্রশ্ন :১৮
ত্রিপুরায় প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ কতটুকু?
উত্তর :১৮
ত্রিপুরায় প্রকাশনা শিল্প উজ্জ্বলতর হবে, ত্রিপুরার বই সারা পৃথিবীতে যাবে, সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম লেখকরা ত্রিপুরায় নিয়মিত আসবেন, এমন কথা নিশ্চয়ই আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এটা দেখায়, সরকারী অফিসে কিছু বই সাপ্লাই দিতে পারলে বইয়ের দাম উঠে আসে। সে কারণে বইয়ের দাম ধার্য করা হয় বেশি মাত্রায়। আর মাত্রা বেশি বলে অনেক 'প্রকৃত পাঠক' বইমেলায় বই উল্টেপাল্টে দেখে, না কিনে চলে যান। বইয়ের দামকে পাঠকের গ্রহণযোগ্য নাগালে যতক্ষণ আনা যাবে না, ততক্ষণ ক্রেতা বাড়বে না। আর ক্রেতার সংখ্যা বাড়াতে গেলে সুবৃহৎ অঞ্চলজুড়ে কাজ করতে হবে। কবে তা হবে জানি না।
প্রশ্ন :১৯
বই প্রকাশকের বিভিন্ন ধাপগুলো একজন প্রকাশক কিরকম মনোযোগের সহিত সম্পূর্ণ করেন?
উত্তর: ১৯
লেখক বা লেখকবৃন্দের দেওয়া পান্ডুলিপি কম্পোজ ও সুসজ্জিত হয়ে কম্পিউটার থেকে প্রুফ ইত্যাদির পর অফসেটজাত মুদ্রণ সম্পন্ন হলে বাঁধাই শেষে তা বাজারে আসে। ত্রিপুরায় প্রকাশিত সমস্ত বই সমস্ত প্রকাশকরা সমানভাবে গুরুত্ব সহকারে সৃষ্টি করেন, আমি তা বিশ্বাস করি না। বহু বইয়ের ফন্ট ও লিডিং, মার্জিন, বানান, ম্যাজারমেন্ট, ইলাসট্রেশান ঠিক থাকে না। বাইন্ডিং করার পরিকাঠামো এখনও ত্রিপুরায় গড়ে ওঠেনি। আসলে সত্যি কথা বলতে গেলে, লেখকের কাছ থেকে ভালো পরিমাণ টাকা নিয়ে বহু প্রকাশক 'বই' হিসেবে এমন সব লেখা হাজির করছেন, যা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের বই প্রকাশ প্রকাশন শিল্পকে বিপথে চালিত করছে। তাতে এক বা দুইজন প্রকাশকের হয়তো আপাত লাভ হচ্ছে, কিন্তু সার্বিকভাবে ত্রিপুরার প্রকাশন-যাত্রার ক্ষতি করছে।
প্রশ্ন :২০
বই নির্মানে লেখককে সন্তুষ্টির বিষয় থাকবে?নাকি প্রকাশক প্রকৃতপক্ষে একটি বইকে সামগ্রিকভাবে শৈল্পিক উপস্থাপন করতেই সচেতন থাকতে হবে?
উত্তর :২০
বই নির্মাণ প্রথমত লেখকের। অতএব তাতে সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি দুই-ই থাকবে। সেক্ষেত্রে প্রকাশকেরও বিশেষ ভূমিকা আছে। বইটি সাজাবার পর কোন বিষয়ের সংযোজন ও বিয়োজনের কথা অবশ্যই প্রকাশককে ভাবতে হবে। লেখক-প্রকাশক ছাড়াও কম্পোজিটর, ডিজাইনার, প্রচ্ছদ শিল্পী, ম্যাশিনম্যান ও বাইন্ডারের সম্মিলিত প্রয়াসে এক-একটি বইয়ের জন্ম হয়। অতএব একটি ভালো বই মানে তা শুধুমাত্র লেখকের নয়।
প্রশ্ন :২১
আপনি একটি প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদক।আপনার সংস্থার নাম বলুন।সংস্থাটি ত্রিপুরার বইপত্র আন্দোলনে কিরকম ভূমিকা নিচ্ছে?
উত্তর:২১
আমার প্রকাশন সংস্থা "অববাহিকা"। ট্যাগলাইন "ঐতিহ্যের শহরে উত্তরাধিকারের ভাষা"। আসলে গোমতী নদীর পাড়ে আমার বাস। ১৯২০ সালে আমার পিতামহ ঁপ্রসন্ন কুমার চক্রবর্তী রাজন্য ত্রিপুরায় চাকরি করতে এসে উদয়পুর শহরে গোমতী নদীর পাড়ে এ বাড়ি করেছিলেন। গত ১০০ বছরে নদীর ভাঙ্গনে বাড়ির আকার বিশাল থেকে ছোট্টতর হয়েছে। এ বাড়িতেই বাবা ঁননীগোপাল চক্রবর্তী জীবন কাটিয়েছেন। তিনিও ছিলেন সাহিত্য ও শিল্পের একান্ত অনুরাগী। আমি আমার প্রকাশনায় ২০০৬ থেকে বই ও পত্রিকা করছি। এখন অবধি ত্রিপুরার ইতিহাস বিষয়ক বই আমাদের সর্বাধিক। অন্য বইও আছে। আমি চাই প্রধানত অতীত ও বর্তমান নিয়ে কাজ করতে। সেটাই আমার অভিপ্রায়, আমার আন্দোলন।
প্রশ্ন :২২
একজন প্রকাশক কিরকম বই প্রকাশনা করলে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছতে পারেন?
উত্তর :২২
প্রকাশকের বই অবশ্যই নির্ভুল ও মানে ভালো হতে হবে। আবার পাঠকের চাহিদা অনুসারেও অনেক সময় অনেক বই করতে হয় পরিকল্পনা মাফিক। পাঠক-ই বইয়ের সর্বোচ্চ ও একমাত্র বিচারক। অতএব পাঠকের কথা অবশ্যই লেখক ও প্রকাশককে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন :২৩
বাংলা সাহিত্যের একজন সফল প্রকাশক,সফল সাহিত্যিক। তারপরেও বাংলাভাষা থেকে প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?
উত্তর: ২৩
নতুন প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ সরিয়ে ইংরেজি পড়ছে, এমনটা নয়। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের আধিক্য হলেও ইংরেজি বিষয়ে তেমন কোনো আলোড়ন আমি অন্তত চোখে দেখছি না। একটি চাকরি পাবার বাসনা থেকে এই ইংরেজি অনুরাগ। তা কেটে যাবে বলেই আমি মনে করি। মানুষ এখন বই পড়ে না, এটা বাস্তব, সত্যি। মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট-ই দিনের ধ্যানজ্ঞান। টিভি থেকে মানুষ সরতে শুরু করেছে। মোবাইল আর ফেসবুক থেকেও সরছে। কিন্তু বইয়ের প্রতি আবারও ভালোবাসা সৃষ্টি করার জন্যে সবাইকে সুচিন্তিতভাবে আবারও এগোতে হবে। বিশেষত অভিভাবক ও শিক্ষিত মানুষ আন্তরিকতার সাথে ভাবলেই তা হতে পারে, নইলে নয়।
প্রশ্ন :২৪
প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে কোন আক্ষেপ আছে?
উত্তর ২৪
প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ নেই, বললে মিথ্যে বলা হবে। কিছুটা আক্ষেপ তো নিশ্চয়ই আছে। প্রাপ্তির কথা বলতে গেলে, "চাঁদের পাহাড়" নামে শিশু-কিশোর একটি পত্রিকা ২০০৯ থেকে ১০১৭ অবধি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে শত শত শিশু-কিশোর ও বড়দের পাশে পেয়েছি। কর্মশালা, আড্ডা ইত্যাদি আয়োজন করেছি ছোটদের নিয়ে। সবই মুদ্রিত আকারে আছে। সেটা আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। এছাড়াও আমার বেশ কিছু বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া আমি নিয়মিত ফোন মাধ্যমে পাই ত্রিপুরার বাইরে থেকে এবং ত্রিপুরা থেকেও। সেটা আমার বড় প্রাপ্তি। আর আক্ষেপ যা, তা হলো, আমি মনে করি, আমার আশপাশের মানুষ আরও একটু বেশি বই কিনতে পারে, কেনেন না। তাতে আমারও কিছু বই বিক্রি হতে পারতো। হলে আমার প্রকাশন সংস্থা আরেকটু মুখ তুলে দাঁড়াতে পারতো। তা হয়না। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সে তো যুগে যুগেই চ্যানেল নির্ভর, সে চ্যানেল আমার ছিলো না, নেই-ও। সেটা আমার কোনো আক্ষেপ নয়। সেটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতা মেনে নিয়েই নিজের মতো করে কাজ করে যাবো, এটাই আমার অঙ্গীকার, স্বপ্ন, ভালোবাসা। ভালো থাকবেন।
------------------------------
পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী
লেক সিটি শপিং কমপ্লেক্স
রুম নং ৬০ (ভূমিতল)
উদয়পুর, গোমতী জেলা,
ত্রিপুরা।। ৭৯৯১২০
-----------------------------
মোবাইল ঃ ৯৪৩৬১৬৮৮০১
0 মন্তব্যসমূহ