রবীন্দ্র মননে,জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ
সন্দীপ সাহু
রবীন্দ্র মননে,জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ।
সন্দীপ সাহু
১.
কবিগুরু। বিশ্বকবি। আমাদের সমাজ সভ্যতার এমন কোনো বিষয় নেই, যা তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বিশ্বকবি হয়ে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ সম্পর্কে তাঁর মতামত নানা লেখায় ব্যক্ত করবেন না, তা কি হয়? তবে রবীন্দ্রনাথ নামটি উচ্চারিত হলেই প্রেম পর্যায়ের, প্রকৃতি পর্যায়ের, পূজা পর্যায়ের কবি হিসাবে সমাজ মননে এক শান্ত সৌম্য মূর্তি ভেসে ওঠে। এই রবীন্দ্রনাথই বেশি চর্চিত।
রবীন্দ্র মনন ভাববাদ ভিত্তিক। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণ শাসনের পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে অন্ধ ঈশ্বর বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের ওপর। ফলে সারা বিশ্বের পুঁজিপতি শ্রেণি রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রচার দিয়েছে বিশ্বব্যাপী। " The Song Offerings" নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছে। সারা বিশ্ব মননে রবীন্দ্রনাথকে আজ প্রেম পূজা প্রকৃতির কবি হিসেবেই প্রোথিত করা হয়েছে সচেতন ভাবেই।জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্র মননও একই কারণে চর্চিত হয়।
এর বাইরে অন্য আরেক রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন, যিনি দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণার কথা, রাষ্ট্রযন্ত্রের অমানবিক অত্যাচারে তাদের অসহায় মৃত্যুতে গভীর নাড়া খেতেন; সেই রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রচর্চায় আসে না। বরং সচেতন ভাবে পুঁজিপতি শ্রেণির সন্তোষ বিধানে, তা এড়িয়ে যাওয়া হয়।
পুঁজিপতি শ্রেণির সন্তোষের জন্য জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে রবীন্দ্র মনন আলোচনা করতে কলম ধরিনি। বরং এই বিষয়ক রবীন্দ্র মননের প্রাসঙ্গীকতা আলোচনার চেষ্টা করবো।
২.
রবীন্দ্র সমকালে দেশে জাতীয়তাবাদ
--------------------------------------
১৮৮৫ সাল। এলান অক্টাভিয়ান হিউম দরদী ভারতবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন জাতীয় কংগ্রেসের। প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ঐতিহাসিকরা এই কংগ্রেসকে বলে থাকেন বৃটিশ সরকারের সেপ্টিভাল্ভ। ভারতীয়দের ক্ষোভ বিক্ষোভকে যাতে প্রশমিত করা যায়। এই জাতীয় কংগ্রেস ছিল সমস্ত দেশপ্রেমিকদের একটি সাধারণ মঞ্চ। এতে ডানপন্থী বামপন্থী সবাই ছিলেন। এই মঞ্চকে ভিত্তি করে উন্মেশ ঘটে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের। কোপেনহেগেনে সেই সময় ব্যারিস্টার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অসহযোগ অহিংস আন্দোলন করে বিখ্যাত। তাঁকেই জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভার অর্পন করার জন্য জাহাজে করে আনা হল। তাঁর অতীত আন্দলোনের ট্র্যাকরেকর্ড বোধকরি বৃটিশ সরকারকে পুলকিত করেছিল। ফলে সেই সময়কার বৃটিশ গণমাধ্যমগুলি গান্ধীজীর বহুল প্রচার দেয়। বৃটিশ বুঝে যায় গান্ধীজীকে একমেদ্বিতীয়ম করতে পারলেই তাদের শাসন শোষণ দীর্ঘ মেয়াদী হবে। গান্ধীজীর নীতি ছিল আবেদন নিবেদনের নীতি। প্রথমদিকে দেশবাসী গান্ধীজীতে আস্থাশীল ছিল। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। যুব সমাজ চরমন্থী হয় ওঠে। ফলে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় দুটি ধারার সৃষ্টি হয়---
গান্ধীজীর নেতৃত্বে আপসমুখী ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের আবেদন নিবেদনের ধারা আর আপসহীন পূর্ণ সরাজের দাবিতে সসস্ত্র বিপ্লবী ধারা। দ্বিতীয় ধারার ধারাবাহিকতার সূচনা হয় শহীদ ক্ষুদিরামকে দিয়ে। এই ধারবাহিকতায় জীবন দেন মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ভগৎ সিং সহ অগুনতি যৌবন।
৩.
বিপ্লবীদের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব
----------------------------------------
রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাম্যবাদী আদর্শের বিশ্বাসী সক্রিয় কর্মী ও কবি সুকান্তসহ প্রায় সমস্ত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা প্রভাবিত ছিলেন। বৃটিশ বিরোধী সমস্ত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের প্রেরণার উৎস ছিলেন রবীন্দ্র সাহিত্য।
সুকান্তর লিখেছিলেন," এখনো স্বগত ভাবাবেগে,/মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।" "তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/ শান্তির ললিত বানী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।/তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।"(রবীন্দ্রনাথের প্রতি-সুকান্ত)।
জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের কাছে প্রেরণার উৎস ছিল রবি ঠাকুরের "বলাকা" ও "গীতাঞ্জলি"।সেন্ট্রাল জেলের দুটি পাশাপাশি সেলে ছিলেন ফাঁসীর আদেশ প্রাপ্ত দুই বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। দীনেশ গুপ্তের ফাঁসীর আগের দিন রামকৃষ্ণ গেয়ে শুনিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের গান " যে ফুল না ফুটিয়ে ঝরেছে ধরনীতে,/ যে নদী মরুপথে হারাল ধারা---/ জানি সে জানি তাও হয়নি হারা"(ক্ষণিকা)। দীনেশ গুপ্ত উত্তর উত্তর দিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের কথাতেই,"যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই,/ যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।"(যাবার দিনে)। ১৮০৭ সালে লেখা রবি ঠাকুরের "সুপ্রভাত" কবিতার দু'চরণ শহীদ ক্ষুদিরাম প্রথম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন বৃটিশ অহংকারের দম্ভে আঘাত হেনে ছিলেন ১৯০৮ সালের এপ্রিলে। সেই দু'টি চরণ হল "উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।"
শুধু বিপ্লবীরাই রবি ঠাকুরের প্রভাবিত তেমন ছিল, তেমনি ভাবে অহিংস রবি ঠাকুরও এই জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের একেবারে অস্বীকার করেননি গান্ধীজীর মতো। রবি ঠাকুর " পথ ও পাথেয়" প্রবন্ধে শহীদ ক্ষুদিরামকে মাথায় রেখে লিখেছিলেন," এই প্রকার দুশ্চেষ্টা অনিবার্য ব্যর্থতার মধ্যে লইয়া যাইবেই। তথাপি ইহাকে আমরা পরিহাস করতে পারি না।" রবি ঠাকুর আরো লিখেছেন," এক পক্ষে বড়ো বড়ো বেতন, মোটা পেনশন এবংলম্বা ছিল, অন্যপক্ষে আধপেটা আহারে সংসার মাত্রা নির্বাহ... এই রূপ অবস্থা টিকিয়া রায় তবে ইহাতে এক দিন না একদিন ঝড় আনিয়া উপস্থিত করিবে সন্দেহ নাই"। এই দ্বিতীয় উক্তিটি সসস্ত্র বিপ্লববাদকে স্পষ্টত স্বীকৃতি দেয়।
১৯৩০ সাল। জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী বিভূতীভূষণ দাশগুপ্ত পাটনা ক্যাম্প জেলে বন্দী। তাঁর কাছে ছিল রবি ঠাকুরের "চয়ণিকা" ও "গীতাঞ্জলি"। পাশের সেলে ছিলেন ফাঁসীর আদেশ পাওয়া শুকুল। তিনি বিভূতিভূষণকে অনুরোধ করলেন, " দাদা ওহি গানা খাইয়ে।" বিভূতিভূষণ জিজ্ঞাসা করলেন," কোন গান?" শুকুর বললেন,"ওহি যে রবীন্দ্রনাথ কা, মরণ হে মরণ..." শুকুরের হৃদয়ভরা আকুতি। বিভূতিভূষণ গাইলেন দরবারি কানাড়া সুরে। বিভূতিভূষণ পরে লিখেছিলেন," রবীন্দ্রনাথের নিয়ম হয়তো মানিনি, কিন্তু সেদিন সার্থক একটা গান গেয়েছিলাম। এমন গান আর কোনো দিন গাইনি।" মাস্টারদা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিষ্যা প্রীতিলতা এক জায়গায় বলেছেন, " রবীন্দ্রনাথ যেন এঁদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন
---কেবল তব সুখের পানে চাহিয়া/বাহির হনু তিমির রাতে তরণীখানি বাহিয়া।" শিষ্যার ইউরোপীয়ান ক্লাব অভিমানে আত্মবলিদানের পনেরো দিন পর "বিজয়া" নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি শুরু হয়েছে রবি ঠাকুরের "পরশমণি" কবিতার চরণ দিয়ে---"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে/ এ জীবন পুণ্য করো দহন দানে।" শিষ্যাকে স্মরণ করেছেন রবীন্দ্র কবিতা দিয়ে। এ রকম অজস্র দৃষ্টান্ত আছে যাঁরা রবি ঠাকুরের কবিতা গানকে তাঁদের প্রেরণার উৎস মনে করতেন। এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডর ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ।
৪.
রবীন্দ্র মননে জাতীয়তাবাদ
---------------------------------------
"Nationalism is a great menace. It is particular thing which for years has been at the bottom of India's troubles. And in as much as we have been and dominated by a Nation that is strictly political in its attitude, we have tried to develop within ourselves, despite our inheritance from the past , a belief in our eventual political destiny."
"The Naton, with all its parahpernalia of power and prosperity, it's flags andpious gyms, its blashphemous prayers, in the Churches and the literary mock thunders of its patriotic bragging, can not hide the fact that the Nation is the greatest evil for the Nation, that all its precautions are against it ...its one wish is to trade on the feebleness of the rest of the world ...The Nation has thriven long upon mutilated humanity."(Nationalism-- R.N.Tagor)
"মিথ্যার দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হোক,নিজের কাছে নিজেকে বড়ো করিয়া প্রমাণ করিতে হইবে এবং সেই উপলক্ষ্যে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতেই হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা পেট্রিয়টিজমের প্রধান অবলম্বন। গায়ের জোরেই, ঠেলাঠেলি, অন্যায় ও সর্বপ্রকার মিথ্যাচারের হাত হইতে নেশনতন্ত্রকে উপরে তুলিতে এমন সভ্যতার নিদর্শন তো আমরা এখনও য়ুরোপে দেখিতে পাই না।"(বিরোধমূলক আদর্শঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাবলী দশম খণ্ড)।
জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্র মনন, এই সমস্ত লেখায় স্পষ্ট প্রতিয়মান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এরকম ভাবলেন কেন? জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনার ভিত হিসেবে কাজ করেছে প্রথম মহাযুদ্ধের বিভীষিকা। তাঁর মনে হয়েছিল জাতীয়তিবিদী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য এই যুদ্ধ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমের ধনতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কে কতটা বাজার দখলে রাখতে পারবে তার জন্য এই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। জিগির ছিল জাতীয়তাবাদের। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদী সর্বোচ্চ মুনাফা। রবীন্দ্রনাথ এই বাহ্যিক জিগির টিকে ভেদ করতে পারেননি। ফলে মহাযুদ্ধে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের মৃত্যু বিভীষিকার মূল কারণ হিসেবে রবি ঠাকুর জাতীয়তাবাদকেই চিহ্ণিত করেছেন। তাই তিনি বলেছেন," Those who have faith in Man cannot but fervently hope that the tyranny of the Nation will not be restored to all its former teeth and claws, to its far reaching iron arms and its immense inner cavity, all stomach and no heart." (Nationalism--R.N.Tagor).ফলে রবি ঠাকুর ভেবেছিলেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শই মানবতার শত্রু।
পাশ্চাত্যেই প্রথম উদার মানবতাবাদী বুর্জোয়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। সামুর মৈত্রী স্বাধীনতার ধ্বজা তুলে ধরা হয়েছিল।এই বিপ্লবের ফলে সামন্তী সমাজ ব্যবস্থার পতন হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পত্তন হয়। উন্মেষ ঘটে জাতীয়তাবাদী আদর্শের। প্রথম দিকে বুর্জোয়ারা মানবতাবাদী আদর্শে নিজেদের চালিত করেছিল, ব্যবসার কারণে। এই মানবতাবাদী আদর্শ তুলে না ধরলে সামন্তি নাগপাশ থেকে ভূমিদাসদের মুক্ত করে শ্রমিকের পরিণত করা যেত না।
প্রত্যেক আদর্শেরই বিভিন্ন সূত্র আছে। উন্মেষ, বিকাশ, ক্ষয়ীষ্ণু ও বিলোপ।গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পত্তনের মাধ্যমে পু্ঁজিবাদও উন্মেষ ও বিকাশের স্তর অতিক্রম করে যখন ক্ষয়ীষ্ণু হয়ে পড়ে তখন তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয়তাবাদের আদর্শও ক্ষয়ীষ্ণু হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ তখন মানবতাবিদী আদর্শের আলখাল্লা খুলে ফেলে সর্বোচ্চ মুনাফার কিরণে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে।
মানবতাবাদী আদর্শ ভূলুণ্ঠিত হতে শুরু করে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উন্নীত হয় সর্বোচ্চ মুনাফার কারণে। ফলে সংঘটিত হয় মহাযুদ্ধের। রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী আদর্শকে ক্ষয়ীষ্ণু অবস্থায় দেখেছেন ইউরোপে। তার দ্বারাই তিনি প্রভাবিত হয়েছেন। তার মননে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ ধরা পড়েনি। উদার মানবতাবাদী বুর্জোয়া বিপ্লব না হলে জাতীয়তাবাদী আদর্শের জন্মই হত না। মানুষকে ভূমিদাসের কারাগারে জন্তুর মতো বাঁচতে হত। ইউরোপে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ক্ষয়ীষ্ণু সূত্রে পৌঁছলেও প্রাচ্যে তখন আমাদের দেশসহ নানা দেশে স্বধীনতার আকাঙ্খাকে ভিত্তি করে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ পর্ব চলছিল। রবি ঠাকুরের কাছে উন্মেষ পর্বের জাতীয়তাবাদ ও ক্ষয়ীষ্ণু জাতীয়তাবাদ এক হয়ে ধরা দেয়। এই কারণে রবি ঠাকুর জাতীয়তাবাদী আদর্শের বিরোধিতা করেছিলেন। যা বৃটিশ সরকারের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রবি ঠাকুর মনে করতেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শে ভারতীয়দের মুক্তি আসবে না, আসবে বিশ্বমানবতাবোধের জাগরণের মাধ্যমে।
"অধ্যাত্মবাদী মানুষ দীর্ঘকাল ধরে পূর্ণতা অর্জনের সাধনায় নিরত, এবং মুক্তির জন্য প্রতিটি সাচ্চা আকুতির তাৎপর্য হলো অধ্যাত্ম-মুক্তি।জাতীয় স্বার্থের নামে বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর নির্মান করার অর্থ ও মুক্তি পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সুতরাং শেষমেষ দেখা যাবে নেশন বা জাতী নিজেই নিজের জন্ম এক কারাগার বানিয়ে তুলেছে। ... ভারতবর্ষের সনাতন আদর্শ এই ধরণের উগ্র মনোভঙ্গীর বিরোধী; কারণ বিচ্ছিন্নতার পরিণতি নিরন্তর বিরোধ। সেজন্য আমার একান্ত প্রার্থনা, ভারতবর্ষ সমস্ত পৃথিবীর মানুষের সহযোগিতার আদর্শ প্রচার করুক।"(বিরোধমূলক আদর্শঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাবলীর দশম খণ্ড)"পূর্ব পশ্চিমের মিলনমন্ত্র উপনিষদ দিয়ে গেছেন।... এই মিলনের অভাবে পূর্বদেশ দৈন্য-পীড়িত, সে নির্জিব; আর পশ্চিম অশান্তির দ্বারা ক্ষুব্ধ, সে নিরানন্দ"(বিরোধমূলক আদর্শঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাবলীর দশম খণ্ড)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভাববাদী মনন চিন্তনের কারণেও রবি ঠাকুর জাতীয়তাবাদের স্বরূপ ঠিক মতো ধরতে পারেননি বলে এর বিরোধিতা করেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই সমকালের জাতীয়তাবাদী আদর্শ ভিত্তিক স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেননি। "চার অধ্যায়", "ঘরে বাইরে" ইত্যাদিতে রবীন্দ্র মননের এই দিকটার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই বৃটিশ সরকার রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ নেক নজরে দেখতো। রবীন্দ্রনাথের এই দৃষ্টিভঙ্গী বৃটিশ সরকারকে জাতীয়তাবাদী নানা আন্দোলন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।এরই বদান্যতায় বৃটিশ সরকার রবি ঠাকুরকে নাইটহুট উপিধিতে ভূষিত করেছিল। এই কথা বললে রবি ঠাকুরকে খাটো করা হয় না, বরং ধূর্ত বৃটিশ সরকারের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন না করলেও, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের তিনি অস্বীকার করেননি। তা আগেই উল্লেখ করেছি। তবে মানবতার অপচয় যেখানেই হয়েছে রবি ঠাকুর তাঁর প্রতিবাদ করেছেন। তাই জালিয়ানওয়ালাবাগের কাণ্ডের প্রতিবাদে সেই নাইট উপাধি ত্যাগ করেছিলেন।
৫.
বিশ্বমানবতার তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিকতাবাদ
------------------------------
রবি ঠাকুর তাঁর ভাববাদ ভিত্তিক পবিত্র সরল মনে বিশ্বাস করতেন সারা পৃথিবীর মানুষ মানবতাবাদী আদর্শে সামর্থ মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের আদর্শে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ হলে জাতীয়তাবাদী কারাগার ও পরশের ওপর আক্রমণ, মানব হত্যা ইত্যাদি চিরতরে বিলুপ্ত হবে। কিন্তু এই আদর্শ ভিত্তিক মানব বন্ধন এই বিশ্বমানবতার তত্ত্ব প্রচার ও ব্যক্তিগত আন্তরিক প্রার্থনায় করতে চেয়েছেন। কিন্তু সমাজ অর্থনৈতিক ভাবে বৈষম্যের কাঠামোয়ে বন্দী। এই বৈষম্য দূর করা ছাড়া মানুষের মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব স্থাপন সম্ভব নয়, তা রবি ঠাকুর তাঁর আধ্যাত্মিক মননের কারণে ধরতে
পারেননি। সুতরাং রবীন্দ্র মননের এই বিশ্বমানবতা তত্ত্বের সঙ্গে মার্কসীয় বিজ্ঞান সম্মত বিজ্ঞান ভিত্তিক সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এই মননের কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যখনই অন্যায় সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিবাদ তিনি করেছেন। ১৯৩৫ সালে ফ্যাসিস্ট ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমন করলে, সি এফ এণ্ড্রুজকে লেখেন ন্যায় নীতিহীন বর্বর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা করে। শুধু তাই নয়, "আফ্রিকা" কবিতার চরণে চরণে তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। আবার চীনে যখন বৃটিশরা দমন পীড়ন চালায় তখন, রবি ঠাকুর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, " বৃটিশ রাষ্ট্রনায়কগণ হরদম আমাদের এ কথা শোনাচ্ছেন যে চীনে ইংল্যাণ্ড আত্মরক্ষার সংগ্রাম করছে। জিজ্ঞাসা করতে পারি কি কারা সংঘর্ষের সূত্রপাত করল?...কেন বলপ্রয়োগ করে চীনের জনগণের হাত থেকে হংকং ছিনিয়ে নেওয়া হলো?... মূলে ইংরেজরাই আক্রমণকারীর ভূমিকা গ্রহণ করে; এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাদের প্রতিরোধাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত এই মিথ্যা জিগির তোলা উচিৎ নয়।"(মডার্ণ রিভিউ,জুলাই ১৯২৭)। মুসোলিনির ছলনায় রবি ঠাকুর এক সময় মুশোলিনিকে ভালো শাসক ভাবতেন। বন্ধু মনীষী রমরমা রোলাঁ ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পর রবি ঠাকুর নিজেকে সংশোধন করেছেন। মুসোলিনির বিরুদ্ধেপ্রতিবাদে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন বিশ্ববুদ্ধিজীবীরদের সঙ্গে। আবার একই ভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেখানে যা কিছু ভালো হয়েছে, তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। "রাশিয়ার চিঠি"-তে বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার প্রশংসা ছত্রে ছত্রে বর্ণনা করে বলেছেন যে রাশিয়া না আসলে তাঁর শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান দেখা হতো না। আবার পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে রাশিয়ার লাল ফৌজোর বীরত্বের খবরে খুশী হতেন। অসুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন খোঁজ নিতেন, লাল ফৌজ কতটা অগ্রসর অগ্রসর হচ্ছে। যদি লালফৌজের খারাপ খবর পেতেন, তিনি মনে মনে দুঃখ পেতেন। সুতরাং আমৃত্যু হৃদয় সংবেদি বিশ্বকবি রবি ঠাকুর আন্তর্জাতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্রিয় সচেতন মননের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এসবেরই ভিত্তি ছিল বিশ্বমানবতাতত্ত্ব। অনেকে এই বিষয়টিকে রবি ঠাকুরের আন্তর্জাতিকতাবাদ বলে প্রচার করেন। এই বিশ্বমানবতার তত্ত্বকে ভাববাদী সহজ সরল পবিত্র মননের ভাববিলাস বলা যেতে পারে।
৬.
পরিশেষে
---------------------------------------
ভাববাদ ভিত্তিক জীবন দর্শনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে সমাজ জীবন, রাজনীতিকে তিনি তাঁর আধ্যাত্ম মননের পবিত্রতা দিয়ে বিচার করেছেন এবং আত্ম উপলব্ধিজাত জ্ঞানের দ্বারা সমস্ত বিষয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। কোনো সমস্যায় পীড়িত হয়ে, সমাধানের পথ না পেয়ে, সেটাকে বিধির বিধান মনে করে হতাশার সঙ্গে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। "চিরকালই মানুষের সভ্যতায় একদল অখ্যাত লোক থাকে, তাদের সংখ্যাই বেশি, তারাই বাহন; তাদের মানুষ হবার সময় নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত।... জীবনযাত্রার জন্য যতকিছু সুযোগ সুবিধা সব কিছুর থেকেই তারা বঞ্চিত। তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে---উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।" এই "রাশিয়ার চিঠি"-রই আরেক জায়গায় বলছেন,"আমার এই দরিদ্র প্রজাগুলোকে দেখলে ভারি মায়া করে---এরা কোনো মতে একটুখানি ক্ষিদে ভাঙলেই আবার তখনি সমস্ত ভুলে যায়। সোশ্যালিষ্টরা সমস্ত পৃথিবীর ধন বিভাগের কথা বলে সেটা সম্ভব কি অসম্ভব জানিনে। যদি একেবারেই অসম্ভব হয় তাহলে বিধির বিধান বড়ো
নিষ্ঠুর, মানুষ বড় হতভাগ্য।" সুতরাং দরিদ্রর দরিদ্রতার সমাধান আত্মভাবনায় না পেয়ে, এর কারণ বিধির নিষ্ঠুরতা ভেবে, তাকে মেনে নিয়েছেন গভীর অসহায়তায়।
উপরের আলোচনাকে ধান ভানতে শিবের গীত মনে হতে পারে। কিন্তু এই ভাববাদ ভিত্তিক জীবন দর্শন ও আত্মভাববিলাসের কারণেই,রবীন্দ্র মনন বিজ্ঞান নির্ভর সমাজ মনস্ক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবে, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতবাদ কোনোটারই স্বরূপ ধরতে পারেননি। তবে সুখের কথা তৎকালীন জাতীয়তাবাদী দেশপ্রাণ বিপ্লবীগণ, তাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে রবি ঠাকুরকে তাঁদের মননে লালন করেছেন,এবং মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে আগুন-পথে হেঁটে, বৃটিশকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছেন।
পরিশেষে বলা যায় রবীন্দ্র মনন যেমন জাতীয়তাবাদ প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ওনার "সোনার ফসল" বিপ্লবীদের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় প্রেরণা দিয়েছে। এবং আগামীতে তাঁর বিশ্বমানবতার তত্ত্বকে মার্কসীয় বিজ্ঞান নির্ভর communism-এর আদর্শের ভিতে দাঁড় করিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীরা সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ গড়ে তুলবেন।
সমাপ্ত।
0 মন্তব্যসমূহ