কী লিখি কেন লিখি
আশিসকুমার বৈদ্য
কী লিখি কেন লিখি
আশিসকুমার বৈদ্য
কী লিখি?কেন লিখি?প্রশ্নটি ছোট হলেও এর উত্তর খুব একটা ছোট নয়।স্কুল-কলেজ জীবন থেকেই লিখছি।বিলোনীয়া বিদ্যাপীঠ স্কুলে পড়ার সময় প্রধান শিক্ষক অনন্তকৃষ্ণ ধর মহোদয় আমাকে সাহিত্যপত্র "কথাকও"-সম্পাদনার দায়ীত্ব দেন।এখানেই আমার প্রথম প্রবন্ধ"রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা" প্রকাশিত হয়।ঐ সময় আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র।অত:পর বিলোনীয়া কলেজে(বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ)ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে সাহিত্য সম্পাদক হলে কলেজের মুখপত্র "উদীচি" নবকলেবরে প্রকাশ করি।এই ম্যাগাজিনে আমার বড় গল্প "হৃদয়হীন পৃথিবীতে" প্রকাশিত হয়।আমার প্রথম কবিতাও উনিশশো বাহাত্তরে হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত সম্পাদিত "অগ্রণী"সাহিত্য পত্রে প্রকাশিত হয়।প্রতিকূল অবস্হার মধ্যেই আমার লেখা-লেখির সূত্রপাত ঘটেছিল।শৈশবে মাতৃ-পিতৃহীন হলে প্রান্তিক কৃষক পরিবারের একটি ছেলের সামনে যে সমস্যা গুলো আসে,আমার বেলাতেও সে গুলো এসেছিল।তীব্র ইচ্ছা শক্তি ও নিজের আবেগ,অনুভূতি,অভিজ্ঞতাকে অর্গল মুক্ত করার তাগিদে এবং সমাজের প্রতি দায়বোধে আমি লেখায় গতি সঞ্চার করি।আমি গল্প,প্রবন্ধ,কবিতা,কিছু একাঙ্ক নাটক লিখেছি।আমার লেখা কবিগুরুর ছেলেবেলা সম্পর্কিত প্রবন্ধ ত্রিপুরা রবীন্দ্র পরিষদ আয়োজিত নিখিল ত্রিপুরা সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল(তখন আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র)।আমার লেখা নাটিকা দ্বিতীয় স্হান লাভ করে।তখন থেকেই এ বিষয়ে আমি বেশি করে মনযোগী হই।আজ থেকে আড়াই দশক আগে আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয় ।একটির নাম নির্যাতিত মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ।একটির নাম প্রত্নরত্ন ভান্ডার পিলাক।অপরটি আমার কবিতা সংকলন-"একক অশ্বারোহী"।ত্রিপুরার ইতিহাস,ঐতিহ্য,স্হাপত্য-ভাস্কর্য,প্রত্নতাত্বিক সম্পদ আমাকে খুব টানে।বিষয় গুলোকে ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার বাইরে থাকা অনুরাগী পাঠক সমাজের সামনে বেশি করে তুলে ধরার বাসনা থেকেই আমি "পিলাক ও বক্সনগর সভ্যতা","উনকোটি ও দেবতা মুড়া ভাস্কর্যের রূপরেখা"র মতো বইগুলো লিখেছি।ত্রিপুরা সাহিত্য-সংস্কৃতি, স্হানীয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা,সার্বিক ভাবে স্বদেশের সম্পদ,সমস্যা,সংহতি চেতনাদি নানা বিষয় আসে আমার প্রবন্ধে ও গ্রন্হে।নাটক সমাজ চেতনা, গণশিক্ষা ও বিনোদনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।কিছু একাঙ্ক নাটক লিখেছি,সে গুলো মঞ্চস্হও হয়েছে।আমার লেখা"পরমত সহিষ্ণু লালন-হাছন-রাধারমন-হরিচরন"শীর্ষক বইটি সংহতি চিন্তা ও লোক সংস্কৃতির অভিমুখী অনুভবের ফলশ্রুতি। আমার লেখা "পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায়ের মানবতাবাদী জীবন সাধনা" শীর্ষক বইটি এ যাবৎ আমার সর্বশেষ রচনা।জীবনের চার পাশের মানুষ ছাড়াও আমি তাবৎ বিশ্বের মানব সমাজকে সাধ্যমতো অনুধ্যানে রাখার চেষ্টা করি।আমার লেখায় বেশি স্হান পায় সমাজ-বাস্তবতার দিকটি যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন নানাশ্রেণির মানুষ,বিশেষ করে নানা সঙ্কটে বিপন্ন মানুষ গুলো।#এখন আর একটি প্রশ্ন হলো-কেন লিখি?মন থেকে কিছু লেখার তাগিদ আসে বলেই লিখতে বসি।না লিখে পারিনা বলেই লিখি।লিখতে গেলে পড়তে হয়।পড়তে গিয়ে ভাবনার জগৎ সমৃদ্ধ হয়।এই সমৃদ্ধি লাভের আশাতেও লিখি।বই কিনে , বই লিখে কেউ দেউলিয়া হয়না,বরং সঞ্চয় বাড়ে।এই উপলব্ধিমূলেও লিখতে চাই।পড়ার ও লেখার অভ্যাস অব্যাহত রাখতেও লিখতে বসি।কখনো কখনো মনে হয় কেউ জোর করে বসিয়ে দিলেন।নিজের মনে উদ্গত ভাবনাগুলোকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করার বাসনাও লিখতে বসায়।মিত্রজনের প্রেরণাও হাতে কলম ধরিয়ে দেয়।আত্মপ্রসাদ লাভ,সৃষ্টির মাঝে বেঁচে থাকার অভিপ্সাও লেখার অন্যতম প্রনোদনা।লেখার জগতে লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ত্রিবেনী সঙ্গমে শুদ্ধ স্নানের,মিলন যজ্ঞে সম্মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষা থেকেও লিখি।কখনো কখনো অতশত না ভেবেই কলম ধরি।এইসব লেখা-লেখি কার কি কাজে লাগবে জানিনা।তবুও জীবনদেবতা মন্ত্রণা দিয়ে বলে-জীবনটা খুব ছোট।যতদিন সাধ্যে কুলোয় লেখো।পড়ো।মানুষের পাশে থেকে ভালবাসো।ভালবাসায় ভাল থাকো।
0 মন্তব্যসমূহ