কী লিখি কেন লিখি তরুণ মুখোপাধ্যায়

কী লিখি কেন লিখি 
তরুণ মুখোপাধ্যায় 


কী লিখি কেন লিখি 
তরুণ মুখোপাধ্যায় 

কবে কীভাবে লেখক হলাম বলা মুশকিল। তবে লেখালেখি কবে শুরু করেছি মনে আছে। তখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। সম্ভবত ক্লাস থ্রি /ফোর। বাড়িতে বাবার মুখে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কবিতা আবৃত্তি শুনি,পড়িও, তখন ভারত জুড়ে সাজো সাজো রব, চীন ভারতের যুদ্ধ, সংবাদপত্রও রেডিও জুড়ে শুধু খবরের উত্তেজনা। নেহেরু প্যাটেল এই সব নাম কানে আসে। উত্তেজনা জাগে, হঠাৎই স্কুলের খাতায় লিখে ফেলি 
'ভারত আজিকে হয়েছে স্বাধীন 
চারিদিকে বীরত্বের উল্লাস 
কিন্তু আজিকে দুষ্ট শত্রু চীন 
ভারত করিছে আক্রমণ। '
রাতারাতি বন্ধুদের কাছে হীরো হয়ে যাই। 
এ ওকে ডেকে বলে, জানিস, তরুণ কবিতা লেখে। কথাটা পল্লবিত হয়ে ক্লাসের স্যার ধনঞ্জয় বাবুর কানে যায়। যাঁকে যমের মতো ভয় করতাম,-- কী  লিখেছিসরে?  খাতা নিয়ে আয়, ভয়ে ভয়ে যাই, স্যার মন দিয়ে পড়েন তারপর সস্নেহে বলেন, বা; বেশ লিখেছিস, লিখে যা। তবে ছন্দটা জানতে হবে বুঝলি। তোর কবিতাটি একটু শুধরে দিই, লাল কালিতে উনি ' ভারত করিছে আক্রমণ ' লাইনের শেষ শব্দ কেটে বসালেন 'গ্রাস ',বললেন, দ্যাখ কেমন মিল হলো, যা;।
  এরপর বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলাম সেখানে স্কুল ম্যাগাজিনে কবিতা দিতে হবে। লিখলাম" বীর সাতারু মিহির সেন "। সেই পাড়ায় ( মুর্শিদাবাদ জেলার খাগড়ায় কেরানি বাগানে)  পুজোর সুভেনিরে লিখলাম কবিতা -- মনে নেই। বিষয়টা এই, গ্রামের শান্ত সুন্দর প্রকৃতির জীবন চাই। কৃষক হতে চাই। যদ্দূর মনে আছে এর পিছনে করুণা নিধান বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতার (ছুটব আমি সরল প্রাণে পর্ণকুঠির হতে)
প্রভাব ছিল। কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল ম্যাগাজিনে এরপর কবিতা, গল্পও লিখেছি। কোন কোন স্যার সন্দেহ করতেন টুকে দিলাম কিনা। আমাদের বাংলা পড়াতেন সঞ্জয় ধর, সুগত ব্যানার্জি। ওঁরা লেখার ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিতেন। নানা বই পড়তে বলতেন। সেই সময় বহরমপুরে কবি সুশীল ভৌমিক ছিলেন,মুখ্যত " ওঁর পরামর্শ নিতাষ্ট কবিতা লিখতে। কোন শব্দ যথাযথ, কোন ছন্দ ঠিক হলো এই সব দেখে দিতেন। উনি যখন সারগাছি স্কুলে গেলেন ও থাকতেন, প্রতি রবিবার সেখানে যেতাম। মনে আছে, কোন এক রবিবার বাস ধরতে যাচ্ছি, শুনলাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আসছেন "কল্পনা সিনেমা হলে।অনুষ্ঠান হবে। খুব ভিড়।আমি এক বন্ধুকে বললাম, আজ সুশীলদাকে আমার একগুচ্ছ কবিতা দেখাবো, তাই থাকতে পারবো না। কবিতার চেয়ে কাউকে  বড় স্থান কখনো দিইনি।

  কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত 'আমার মতন বয়সে কত মানুষ মহামানব হয় ' কবিতা পড়ে অনেকে প্রশংসা জানান।আমাদের স্যার শক্তিনাথ ঝা ডেকে বলেন, চমৎকার লিখেছ। গভীর ভাবনা ও বোধ আছে,লেখো। স্যারের সঙ্গে আজো যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। বিশ্বসাহিত্যের দিগন্ত ধ্বনি উন্মোচিত করেছিলেন, ও কলেজ জীবনের শেষে হঠাৎই লিখে ফেলি দীর্ঘকবিতা --" যে নিঃসঙ্গতায় আমি আত্মঘাতী " বন্ধুদের পরামর্শে এক ফর্মার পুস্তিকাকারে তা বের করি ১৯৭৭ -এ। এটাই আমার প্রথম কাব্য। এই কাব্য আমাকে শুধু মুর্শিদাবাদ নায় কলকাতায়ও পরিচিত করেছে। বহুগুণী ব্যাক্তি সাধুবাদ জানিয়েছেন। সৈনিকের ডায়েরি পত্রিকার সম্পাদক ও কবি অভিজিৎ ঘোষ মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেছেন। নাম না জানা এক কলেজ ছাত্রী ডাকযোগে চিঠি পাঠিয়ে মুগ্ধতা জানায়। বলে, এই নিঃসঙ্গতায় আপনি একদিন সিদ্ধি লাভ করবেন। কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে এসে যখন হস্টেল পাচ্ছি না, তখন একটি সূত্রে কবি তরুণ সান্যালের কাছে যাই। উনি বলেন ঠাঁই হবে না। প্রণাম করে কবিতার বই দিয়ে বলি, স্যার পড়বেন। বলেন, বেশ, মতামত এক সপ্তাহ পরে দেবো, এসো,তাই যাই,যেতেই সাদরে ডেকে বলেন, এমন কবিতা যে লেখে সে হস্টেল পাবেনা, এটা কি হয়?  আমার অগিলভি হস্টেলে ভর্তি হয়ে যাও,  এম এ পড়ার সময় কফি হাউসে ঘুরতে যেতাম, ( কফি খাওয়ার পয়সা ছিল না) , ওখানে তিনতলায় ছিল 'কলকাতা' পত্রিকা অফিস। জ্যোতির্ময় দত্ত, উৎপলকুমার বসু, শম্ভু রক্ষিত আসতেন।গল্প হতো।তো উৎপল বসুকে আমার সবেধন নীলমনি 'কবিতার বইটি উপহার দিলে উনি প্রীত হন।"কলকাতা" পত্রিকায় বিনা পয়সায় আধপাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন ছেপে দেন। মফস্বলবাসী এক কবির ওইটুকুই অর্জন, সাফল্য। 
 প্রধানত প্রেমের কবিতা লেখায় আমি স্বচ্ছন্দ স্বতঃস্ফূর্ত হই। সেক্ষেত্রে অবশ্যই কোন নারীর অলক্ষ্য প্রেরণা থাকে। সে একজন মাত্র নয়। সেই অর্থে গুরু কেউ নেই। নজরুল ও সুকান্ত ভট্টাচার্য যৌবনে প্রিয়,ছিল, পরে এলেন জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু, তারও পরে সুনীল - শক্তি - আলোকরঞ্জন - শরৎকুমার এবং চল্লিশের অরুণকুমার সরকারের কবিতায় প্রাণিত হয়েছি। অধ্যাপনায় যুক্ত হয়ে আমার কবিসত্তা চাপা পড়ে গেছে ( ৩৫/৩৭টি কাব্যগ্রন্থ লিখেও)। প্রাবন্ধিক /সমালোচক রূপেই আমার এখন পরিচয় -- এ যেন আমার জীবন নিয়ে আধখানা গান গাওয়া। না ; সরকারি কোনো স্বীকৃতি / পুরস্কার পাইনি। ছোটপত্রিকাগুলিই বারংবার আমাকে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করেছে। ধন্য হয়েছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ