প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত /১০০ কবির নির্বাচিত কবিতা/২৪/১২/২০২০

প্রতিদিন বাংলাভাষা. স্রোত 
১০০ কবির নির্বাচিত কবিতা
২৪/১২/২০২০


বিকাশ সরকার
ব্ৰাত্য কবিতার চর
 
সেইসব কবিতা, আকাশে ওড়ে তারা,
             প্ৰজাপতিদের কাছে কত ঋণ
তাহারা আপন হবে কি আমার?
             আত্মীয়স্বজন হবে কোনোদিন?
সকালের দিকে মিষ্টি থাকে সেইসব
             দুপুরের দিকে তারা হয়ে ওঠে তাড়ি
উপমার গাছপালাময় জঙ্গলের দিকে
             যেন এক ছমছমে কবিতার বাড়ি
আসলে অলীক খামার সেটা, জানি
             পুকুরপাড়ে বসে চাল ধোয় মধুদিদিমা
আসলে নেমে আসছে কী রক্তপায়ী নীল
             নামছে মেঘ আর রক্তারক্তি বাতাসের কিমা
নেমে আসে কালো-কালো যত বকগুলি
             ডানায় ডানায় খেলে কত ঘন অন্ধকার
তবু রাত হতে দেরি আছে এই অরণ্যের
             এখন ফুটেছে উঠে নদীতীরে হলুদের পাড়
সেখানে বিকেল ঠেঁটে নিয়ে নেমে আসে
             কবিতার সবুজাভ দিকভ্ৰষ্ট কত কবুতর
নিশীথ আসে, কবিতাজোনাকিগুলি আলোকিত
             করে রাখে একা এক বাবুইয়ের ঘর
 
 
আমি এক ছুতোরের ছেলে, কবিতা লিখেছি বলে
             অনেকেই দিব্য রেগে টং
তারা বিস্তর অভিশাপ দেয়, বলেছে জোকার
             বলে আমি যেন গেঁয়ো এক সঙ
‘কলম ধরেছ কেন বাছা, সিধা ঠোকো
             জংধরা বাঁকানো পেরেক'
এইসব বলে তারা শিকে বেঁধে, কাবাব বানাবে বলে
             ছুড়ে দেয় আগুনের সেঁক
আমি চুপ করে থাকি, বসে থাকি মধুবনীতীরে
             বিবিক্ত একটি খিন্ন রাবারবাগানে
পাথরে ঘুমিয়ে থাকি, তারপর ফের জাগি
             দলছুট দুখি সব পাখিদের গানে
কুল ও ডুমুর খসে পড়ে জলে
             নদী আমাকে ধরে ছন্দ শেখায়
তারপর বেতফল খসে পড়ে
             নদী আজ ঘাড় ধরে আমাকে ডোবায়
ডুবে যাই, ডুবে থাকি এই এক পাহাড়িয়া ঝোরা
             সবুজ শেওলা দাঁতে খুঁটে খেলা করে মাছ
জলের অনেক নীচে যেন আরও কত বন
             আরও কত শোকাকুল চিরহরিৎ গাছ
গাছের ভিতরে গাছ, কোটরে গহিনবাড়ি
             যেন এক ছন্দোবদ্ধ কুহকের বাট
তার পরে মায়াখাল, জোনাকিপাহাড়
             তারপর আমাদের সাপ্তাহিক হাট
 
 
রায়খুড়ি হাটে বসে স্বপ্ন বিক্ৰি করে
             মদ বেচে কানা খলিফার মেয়ে
তখন একটি নধর শীতল সাপ
             উঠছে উঠছে তার সসপ্যান বেয়ে
 
আসলে জাগিনি; পাথরেই পড়ে আছি
             আদতে আমি তো এক পাথরপ্ৰতিম
নাকি ঠিকঠাক পাথরও নয় এইসব
             রাবারবাগানজুড়ে লক্ষ লক্ষ সাপেদের হিম
কুণ্ডলীপাকানো শীত, যেন নড়েচড়ে  
             আমি রক্তরসমজ্জায় ঠিক টের পাই
যেন বিধবা যৌনতা, রায়কাকিমার
             যেন বেরিয়ে আসবে কত খুড়তুতো ভাই
আসলে গান গায়নি কোনো পাখি
             ঠুকরে চলেছে শুধু ডিমভরা শীত
আমিই ভেবেছি শুধু চারপাশে গিটারসেতার
             কী মধুর মৃত সব পাখিসংগীত
 
 
জাগিনি জাগিনি; জাগলেই কারা যেন
             চেঁচিয়ে বলবে দেখো ‘জোকার জোকার'
অতএব আরেকটু দিব্য শীতঘুম হোক
             আরেকটু স্বপ্ন আর জোনাকিপাহাড়
ততক্ষণে বাঁকানো কবিতাগুলি সোজা করি
             বংশগত হাতুড়ির ঘা মেরে মেরে
আরেকটি জ্বলন্ত স্বপ্নের দিকে চলে যাই
             জীৰ্ণ ক্লিষ্ট সব পুরাতন স্বপ্নগুলি ছেড়ে
স্বপ্নদালানের সেই পরাবাস্তবের ছাদ
             যেখানে নেমেছে কত উদ্ভিন্নযৌবনা তারা
ছাদেই ঘুমোব কিছুদিন চুপিচুপি
             স্তন থেকে খসে যত আছে বিষময় পারা
সে এক বিস্ময় বলা চলে, মায়াবিজোছনা
             অন্ধকারে প্ৰেতিনীরা কোলাহল করে
সুস্তনী তারা, সুনিতম্বিনী, চকচকে ঠেঁট
             এ ওর মাথাটি কেটে সেঁটে দেয় ধড়ে
এ ওর স্তন নিয়ে কাড়াকাড়ি করে
             কেটে আনে এ ওর লবণাক্ত ভুরু�
তখন নিখাদ ঘুম আসে কুয়াশার মতো
             এইবার জীবনের আরেকটি স্বপ্ন হবে শুরু�
 
 
‘জাগিনি জাগিনি; হে প্ৰিয় অধ্যাপকগণ'
             তবু তারা অকারণ টীকা লিখে চলে
কঠিন সমস্ত ভাষ্য লেখে ঘৰ্মকবিতার
             বিমার দালালকে ঘরে আসতে বলে
ট্ৰাংকভরা থিসিসপেপারগুলি নিয়ে
             তারা চড়ে বসে অপাৰ্থিব ট্ৰেনে
ঘুমের ভিতর, বহুবার, আস্ত রেলগাড়ি
             আমি থামিয়েছি চেনখানা মাঝপথে টেনে
তারপর গগঁ্যা ও গখের সাথে চলে গেছি
             ধ্যানমগ্ন গুমফার অতিনীল সামচি পাহাড়ে
চষেছি পপির খেত, ফড়িঙের পিঠে চেপে
             চলে গেছি জঙ্গলমাখানো এক মরণের পাড়ে
রেতি বনে র্যাবোঁর পায়ের ক্ষতে
             দেখেছি মলম লাগায় তাঁর হাবসি রক্ষিতা
জটদানদীর পাড়ে নগ্ন অ্যালেন
             খুঁচিয়ে চলেছে বাঁশে কবিতার চিতা
আমি মায়ের আঙুল ধরে চলে যাই  
             ঢাল বেয়ে আদিমপ্ৰবৃত্তিময় পেটকাটি মেলা
ঘুমের সাগরতীরে ভাসাই ভাসাই
             শুধু অশিক্ষিত স্বপ্নমাখা রহস্যের ভেলা
 
 
জাগিনি, মাননীয় হে অধ্যাপক; তবে ঘুমিয়ে রয়েছি
             সমস্ত শীতে তাও এতটুকু সারসত্য নয়
রয়েছি পরাবাস্তবে, কিছুটা কোমায় যেন
             চারদিকে জীবনের ভীতিগ্ৰস্ত জয়-পরাজয়
নিজেই নিজের শিরা টিপে দেখি
             যেন সাপের শীতল রক্ত ছোটাছুটি করে
অনেক পরে স্পন্দন পাই, তারপর ফের চুপ
             স্তব্ধতা ছেয়ে আছে হৃদয়ের গভীর ভিতরে
শুধুই স্বপ্নময় সব, রায়খুড়ি, হাট,
             খলিফার ডাঁশা মেয়ে, হাঁড়িয়াবাজার
সাপের ফণায় পা ঝুলিয়ে আনমনে বসি
             গন্ধ পাই কড়া এক হৃদিপদ্ম মারিজুয়ানার
সে কোন বনবিটে ঢুকেছি বাতাসের সাথে
             খসেছে কবিতার পুরুষ্টু সবুজ যত পাতা
মেঘ ছুঁয়ে আছে শ্ৰেষ্ঠ সব কবিতার গাছ
             শুধু অন্ধকারে কেঁদে মরে রুলটানা খাতা
যত ফুল ঝরে পড়ে, সেসব পঙক্তিমাত্ৰ
             যেন আরও কত তরতাজা নিষাদ-অক্ষর
উড়ছে পাখির দল মেঘেরোদেজলে
             ভিজে আছে মায়াচুম্বী কবিতার ঘর
জীবনমুখর বৃষ্টি নামে পাতার ওপর
             ছন্দ-অনুপ্ৰাস নামে অন্ধকার খাতার ওপর
বেনো জল সরে গেলে প্ৰতীকের খেতখানি জাগে
             যেন জেগে উঠছে ব্ৰাত্য এক কবিতার চর



বিবিধের দায় ।। বীরেন মুখার্জী

অনুচ্চারিত শব্দের ভেতর নিহিত ছিলে—
কিন্তু ঠিক জানতে, নিজস্ব সৌকর্য গড়তে হলে
চূর্ণ করতে হবে প্রচল বিশ্বাস, সেখানেও
দিতে হবে ‘মৃদু টোকা’ নিদেনপক্ষে;
..
বিকালের ‘গজারি নন্দন’ ছেড়ে উঠে আসো
ওহে শূন্যতা, পায়ে মেখে দুরন্ত উচ্ছ্বাস; আর
এই ধারণায় ভিত্তি দাও পুনর্বার...
.
কেননা, কিছু মর্দন আমাকেও বিচলিত করে হঠাৎ
কেননা, পরিত্যক্ত ‘বনসরোবরে’ কবিই মুরারী!
..
..

৮ ডিসেম্বর ২০১৯


একবার পাশে দাঁড়ান / অপাংশু দেবনাথ 


এই শীতে ওরা রাত কাটায় মাটিতে শুয়ে,
অনেকেই ঘর ছেড়েছেন বহুদিন হলো।
জন্মদার মুখ দেখেনি কতটা দিন
কতদিন চুমু খায়নি সন্তানের মুখে।
কেউবা কোলের শিশু নিয়ে প্রহর গুণে শিশিরের চাদর গায়ে।

দিন গড়িয়ে পড়ে ভুল ও মিহি প্রতিশ্রুতির অন্তরালে।
উজ্জ্বল চোখগুলো কেমন নিস্প্রভ হয় নির্ঘুম প্রহরে,
এ শহর ঘুমিয়ে গেলে জেগে থাকে ওরা ফুটপাথে।

একদিন এক শ্রেণিকক্ষ থেকে আরেক পাঠগৃহে, 
জীবনের পাঠ দিতে দিতে আজ ক্লান্ত এইসব শিক্ষাশ্রমিকেরা।
অসংখ্য সন্তানের ভার বহন করে অপারগ আজ,
নিজেরই রক্তকান্না মুছে দিতে নয়নে নয়নে।

একবার পাশে দাঁড়ান,
একবার কাছে গিয়ে জানতে চান
এখন কেমন আছে ওরা।
কতটা ঘোলাটে জল বয়ে যাচ্ছে তাদের বুকের ভেতর।
কতদিন জ্বলেনি উদভ্রান্ত-উনুন

একবার সহৃদয় স্পর্শ রেখে জানুন,
কি করে নদীতে প্লাবন বইবে আবার।

মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো  
চৈতন্য ফকির 



চরিত্র শব্দের ভেতর শুধু তুলসীপাতা থাকে এমন নয়।
আপেক্ষিক তত্ত্বের নিহিত শক্তির নিকট
মানুষের তৈরী কিছু মনুবাদ অথবা আরো পিচ্ছিল সরীসৃপ কিছু মতবাদ ছাড়া আর কি।
তাতেই লাফালাফি শেয়ালের টগবগে কৌতূহল।
সকল যন্ত্রণা কিছু আবেগ থেকে উৎলে উঠে
মিশে যায় তরঙ্গে। 
তরঙ্গ মিলে যায় অসীমান্তে।
সীমান্ত অতিক্রম করে এক-একটি ধাপ নামলে উঠলে
পা পিছলে না পড়া হাতির পায়ের সংখ্যা শূন্য। 
এমন মাটির নিকট ভূমিষ্ট লেখাগুলো 
জীবনচক্রের সংকট মোচন কিংবা রাগ মোচনের অন্তিমকালেও
উঠে যেতে পারে পরিকার জল।
জলের আপাত এই নিম্নগতিই চমকে উঠে বিদ্যুৎ 
চলকে উঠে বিশল্যকরণী। 
লাগাতর ভুল বলতে বলতে
ভুল শব্দের প্রতিশব্দ হয়তো শুদ্ধতর হয়ে যায় গড্ডালিকায়।
মাটির নিকট নিজস্ব ভুল রেখে 
ভূমিষ্ট পতাকা বুকে রাখি।
বুকের কার্ণিশে সামান্য চড়ুই
অবিরত কোশল কিচিরমিচির শব্দ চরিত্রপুরাণ লেখে।
কারো চরিত্রই তুলসীপাতা নয়।
সুচতুর সকল শব্দের মতো এটাও
আপেক্ষিক এক সমীকরণ মাত্র। 
তথাপি অদূরেই সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বুড়োটা বুড়োরা 
লেখে জেলাসি উপাখ্যান।
বুড়োদের রতিবেগ যদিও ভীমরতি বলে মাফ শব্দ আরোপ করা আছে
তাও বুড়োশালিকের ঘাঢ় থেকে একদিন 
উত্তোরীয় কেড়ে নিতে
আসছে নতুন ধারাপাত। 


০২:১১:২০২০
রাত:০৮টা ৫০মি
কুমারঘাট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ