প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত

প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত 
ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা 
২২:১২:২০২০

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন 
দৌড় -এর জীবনসঙ্গী বিশেষ গদ্যসংখ্যা

আলোচনা :চিত্তরঞ্জন হীরা (কবি ও প্রাবন্ধিক) 


 মাননীয় কবি গোবিন্দ ধর-এর লেখাটির ভেতর বাইরে জড়িয়ে কবিতা। প্রতিটি পরত কবিতাময়। যাঁদের যাপন একত্রে সৃষ্টিভাবনায় তাড়িত, সে জীবনে সংঘাত আশার সম্ভাবনা সবসময় থেকেই যায়। সেই সংঘাতের বাইরে এতগুলো বছর কাটিয়ে দেওয়া কম কথা নয়। এক একটা লেবেলক্রসিং পেরিয়ে যখন জীবন আবার একটা সমান্তরাল রেখার মধ্যে এসে পড়ে মনে হয় এই তো পরিক্রমাটা শেষ হয়ে এলো। কিন্তু সে তো সহজে শেষ হওয়ার নয়। যতদিন বাঁচা, ততদিনই চাকার মতো চলতে থাকা। অসংখ্য ধন্যবাদ গোবিন্দবাবুকে এই সুন্দর গদ্যটির জন্যে।


খুব ভালো লেগেছে পদ্মশ্রী মজুমদার-এর লেখাটি। তিনি যেন শুধু কবি গোবিন্দ ধর-এর ঘরনি নন, এক স্বাধীন সত্তায় প্রবাহিত তাঁর জীবন। দেওনদী এবং মনুনদীর সঙ্গমস্থলে তাঁদের যৌথখামারটি।



ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আলোচনা 
আলোচনা :শ্যামল বৈদ্য

দোলনা
১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা 
সম্পাদক, প্রকাশকঃ গৈরিকা ধর 
প্রচ্ছদঃ গৌরব ধর 
হালাইমুড়া, কুমারঘাট, ঊনকোটি থেকে প্রকাশিত
মূল্য -৩০ টাকা।

সম্পাদক, প্রকাশক গৈরিকা ধর আমার কাছে সত্যি বিস্ময়! ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল মিষ্টি বছর দশকের মেয়েটি শিশুদের একটি কাগজ সম্পাদনা করছে! বলতেই হয় ‘ধন্যি মেয়ে’। যদিও প্রথম পাতায় এটা স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশেষ সহযোগিতায় রয়েছেন গোবিন্দ ধর এবং পদ্মশ্রী মজুমদার। এটাই তো স্বাভাবিক বছর দশ-এগারোর একটা বাচ্চা ছোটোদের একটা কাগজ সম্পাদনা করা কি চাট্টিখানি কথা? তবে শুধু সম্পাদনাই করুক গৈরিকা, প্রকাশক হবার দরকার নেই। এই কাজটা তার পিতৃদেবের হেফাজতে থাকলেই আমরা নিশ্চিন্ত বোধ করি। (যদিও মতামত একান্তই আমার ব্যক্তিগত।) 
সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছে গৌরব, মনে হয় বোন গৈরিকাকেই এঁকেছে সে মন দিয়ে। দোলনায় যে বালিকাকে দেখছি তা অবিকল গৈরিকার মতোই। গৌরবের প্রচ্ছদ করার হাতটা বেশ ভাল। শুরুতেই সম্পাদকের সাম্প্রতিক সাহিত্য প্রসঙ্গে ভাবনা আমরা জানলাম। দক্ষিণ ত্রিপুরায় গিয়ে সে কী কী কাণ্ড করেছে/দেখেছে তারই রোজনামচা।  
এ ছাড়া যারা লিখেছেন –
ত্রিপুরার ছড়াঃ বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, রণজিৎ রায়, জ্যোতির্ময় রায়, শচী চৌধুরী, অপাংশু দেবনাথ, গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার, অমলকান্তি চন্দ, অভীককুমার দে, গোপালচন্দ্র দাস, সুমিতা পালধর এবং দীপেন চক্রবর্তী। 
শিশুমহলঃ গৈরিকা ধর, দ্বৈপায়ন নাথ, অমিশা দাস এবং দিগঙ্গনা কর।  
উজ্জ্বল উদ্ধারঃ সেলিম মুস্তাফা। 
আসামের ছড়াঃ মৃদুলা ভট্টচার্য।  
বাংলার ছড়াঃ সুশান্ত নন্দী।  
বাংলাদেশের ছড়াঃ জয়দুল হোসেন, দেবব্রত সেন।  
শিশুদের সাহিত্য নিয়ে আমার জীবনে দুটো মজার ঘটনা আছে সেগুলি একটু বলে নেই। আমাদের গর্ব প্রবাদপ্রতিম শিশু সাহিত্যিক বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী আমার কাছে ‘ঝিনুক’-এর জন্য একবার গল্প চাইলেন। এই কম্মটি আমি তার আগে করিনি (যদিও তার পরও করিনি)। খুশিখুশি গল্প লিখে দিলাম। ক-দিন পর দেখা হলে বিমলদা বললেন, তুমি এ কী করেছ! শিশুদের গল্পে বিড়ি খাওয়া – একদম চলবে না। আক্কেলগুড়ুম হবার জোগাড়। অনেকদিন ভেবেছিলাম শিশুদের জন্য কী করে লিখতে হয় তবে? সম্পাদক লেখক সমীর ধর(দা) শিশুদের জন্য একবার একটা ছোট নাটক চাইলেন। ওনাদের চাওয়া মানে তো আদেশ, দিয়ে দিলাম। কিন্তু সেই ফোন করে বিরক্তি, ‘এ সব কী লিখেছ ভাই! শিশুরা লাফিয়ে লাফিয়ে বলবে, আমি হলাম পাখি, আমি হলাম চাঁদমামা --। তারা তোমার চোর পুলিশের কী বুঝবে?’ সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম শিশুসাহিত্য সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বলতে কিছু নেই। সেই গণ্ডমূর্খ লোকটি অন্যের লেখা নিয়ে বলবে তা যেন একটু বাড়াবাড়ি। 
শিশুদের কাগজে প্রথমেই সব বুড়োরা। বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘ঘুম’ অনবদ্য। ‘একটা পুকুর নাচছে দুপুর/একটা গাঁয়ের ছবি/একটা আকাশ বুকে রেখেই/ঘুমিয়ে পড়েন কবি’। ছন্দের কী জোর! রণজিৎ রায়ের ছড়াটা যেন বড়দের জন্য। জ্যোতির্ময় রায়-এর ছড়া ভাল লেগেছে। শচী চৌধুরী’র ছড়া মন কাড়ে। ‘মামার বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে আঁটা বেড়া/সেই বেড়াটা মিটিয়ে দিলে গন্ধরাজের চারা’। অমলকান্তি চন্দ লিখছেন, ‘খুকুমণি নাচে রোজ পায়ে মেখে আলতা/দূর থেকে উঁকি মারে এক ঝাঁক চালতা’। অভীককুমার দে’র ছড়াতেও মায়া ছড়ায়, ‘তুলতুলে তুলি সই/তুলোভরা গা/রংচঙে চুলের ঐ/রঙভরা ঘা’। ছোটদের জগতে বড়রাও বেশ মানানসই মনে হল।
শিশুমহলে গৈরিকা ধর লিখছে, ‘এখন আমি দোলনা রানি/আমি বসে দুলি/আমার কাছে সব আছে/রঙ বেরঙের তুলি’। দ্বৈপায়ন নাথ লিখছে, ‘নদীর তীরে বসত ঘর/বানায় কষ্ট করে/পুষ্ট জলের বন্যা এলে/ভাসায় একেবারে’। কুমারঘাটের ভয়ানক বন্যার স্মৃতি যেন শিশুমনে। অমিশা দাস লিখছে, ‘অতিরিক্ত গাছ কেটো না/পলিথিন করো বন্ধ’ বা দিগঙ্গনা কর-এর, ‘চারপাশেতে ফুলের মেলা/কতরকম ফুল/শাপলা, শালুক, শেফালি আর/ফুটছে পদ্মফুল’। প্রতিটি ছড়ায় একটা স্বর্গীয় অনুভূতি ছুঁয়ে যায়। শিশুদের জগৎ যেন আমাদের জগৎ থেকে অনেক সজীব ও নির্মল। সম্পাদককে বলব, বুড়োদের কমিয়ে এই শিশুদের আগামীতে আরও বেশি করে জায়গা দেবে। সেলিম মুস্তাফা’র ছড়াটিও দারুণ। ‘ঘোড়ায় চড়ে এলে যদি/ঘোড়ায় চড়েই পালিয়ে যাও/থাকতে পার/গাধায় চড়ে শহর যদি দেখতে চাও’। আসাম, বাংলা ও বাংলাদেশের ছড়াগুলিও ভাল। তবে জয়দুল হোসেনের ছড়াটি চমৎকার, ‘এক দেশের এক রাজা তার/খেয়াল-খুশি চমৎকার/জরুরি সব কাজের মাঝে/যেমন খুশি তেমন সাজে’। দেবব্রত সেনের ছড়া, ‘মেঘবালিকা দাপিয়ে বেড়ায়/মন কেমনের শ্রাবণ রাতে’। সব মিলিয়ে দারূণ একটি শিশুদের কাগজ উপহার দিল গৈরিকা ধর। তার পিতা মাতা এবং শুভানুধ্যায়ীদের আমার শুভেচ্ছা। একটা সুসম্পাদিত কাগজ মানতেই হবে। এগিয়ে যাও গৈরিকা, নেক্সট দেখা হলে আরও অনেক মারপিট, হইচই আমরা করব। একটা কথা কানে কানে গৈরিকাকে বলে রাখি, এ সব করতে গিয়ে পড়াশোনায় ঢিলে দিলে চলবে না কিন্তু। 

রসমালাই  
৯ম বর্ষ, পূজা সংখ্যা  
সম্পাদকঃ অমলকান্তি চন্দ
প্রচ্ছদঃ গৌরব ধর

সুভাষনগর কোয়ার্টার কমপ্লেক্স, কাঞ্চনপুর থেকে প্রকাশিত
বিনিময় – ৩০ টাকা। 
যারা লিখেছেন – 
ছড়াঃ চুনী দাশ, অশোক দেববর্মা, অমল চক্রবর্তী, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, গৌরী দেববর্মন মল্লিক, কিশোররঞ্জন দে, আনসার উল হক, হাননান আহসান, নিয়তি রায়বর্মন, জ্যোতির্ময় রায়, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, অনিলকুমার নাথ, গোবিন্দ ধর, রতন আচার্য, অপাংশু দেবনাথ, রীতা শিব, দিব্যেন্দু নাথ, আব্দুল হালিম, পদ্মশ্রী মজুমদার, এম রিয়াজুল আজহার লস্কর, অনুরাগ ভৌমিক, মিলু কাশেম, গোপেশ সূত্রধর, অমিত শীল, কৃষ্ণকান্ত দেবনাথ, মিঠুন রায়, প্রসেনজিৎ রায়, অমলকান্তি চন্দ, অভীক কুমার দে এবং গৈরিকা ধর।
অনুগল্পঃ সন্তোষ রায়, হারাধন বৈরাগী এবং বিল্লাল হোসেন। 
অমলকান্তি চন্দ একজন চেনা ছড়াকার। তাই তিনি তাঁর শিশুদের কাগজটি সাজিয়েছেন শিশুদের জন্য প্রচুর ছড়া এবং তিনটি অনুগল্প দিয়ে। গৌরব ধরের প্রচ্ছদটি মন্দ নয়। রসগোল্লা ছবিতে দেখেও মুখে জল আসে। প্রতীকী এই প্রচ্ছদে ময়রা বাচ্চাদের পাতিল থেকে রসমালাই দিচ্ছে। ‘রসমালাই’-এর ভেতরে এমন সাদা গোল্লা যে রয়েছে যা আমাদের পরিবেশন করবেন অমলকান্তি এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভাবতে অবাক লাগে এই কাগজটি নবম বর্ষে পড়ল, তার পর আমি হাতে পেলাম। দু-দু’টি শিশুদের কাগজ আগরতলার বাইরে বের হচ্ছে এটা কম কথা নয়। তা ছাড়া এই কাগজগুলিতে লিখছেন রাজ্যের এবং বহিঃরাজ্যের এবং বিদেশি লেখক কবিরাও। এই পাঠ নিশ্চয় আমাদের সমৃদ্ধ করবে। 
সম্পাদক ছড়া দিয়েই লিখেছেন তাঁর সম্পাদকীয়। ‘কাশফুল নেচে উঠে, নাচে কচি কলিরা, মালাই রস খেয়ে যা পাখি আর অলিরা’। 
চুনী দাশ লিখছেন, ‘পেঁজাতুলো মেঘগুলো/ভোরের আকাশে/পাল তুলে ডিঙা বায়/খুশির বাতাসে’। অশোক দেববর্মা’র ছড়া, ‘সূর্যি পাটে যেই না গেল/নিভল দিনের আলো/সারা ভুবন ঢাকল তখন/ সন্ধ্যাবেলার কালো’। কিশোররঞ্জন দে’র ছড়াটি বেশ মজার, ‘সোনামুড়ায় সোনা নেই সাব্রুমে broom/ধর্মনগর সিলেইট্টার শব্দ কল্পদ্রূম’। রবিঠাকুরের কবিতার লাইন ধরে ধরে ছড়া লিখেছেন আনসার উল হক, মন্দ লাগেনি আমার। হাননান আহসান, নিয়তি রায়বর্মন, জ্যোতির্ময় রায়, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, অনিলকুমার নাথ-এর ছড়া ভালো লাগে। রাজেশকে ইদানীং খুব ব্যস্ত? প্রতিটি লেখাতেই মনে হচ্ছে শেষ করার সময় পায়নি। গোবিন্দ ধর-এর ছড়াটি বেশ মজার, ‘তিড়িং/বিড়িং/নৃত্য করে/গাঙ ফড়িং।/ইটিং/চিটিং/গীত্য করে/আর মিটিং’। রতন আচার্য’র ছড়াও ভাল। অপাংশু দেবনাথ শব্দ নিয়ে বেশ মজার খেলা করেছেন।  রীতা শিব, দিব্যেন্দু নাথ, আব্দুল হালিম-এর ছড়াও ভাল লেগেছে। পদ্মশ্রী মজুমদার-এর ছড়াটি বেশ মজার, ‘বলল টিয়ে/সবাই মিলে/দাও না আমার বিয়ে’। এম রিয়াজুল আজহার লস্কর, অনুরাগ ভৌমিক, মিলু কাশেম, গোপেশ সূত্রধর, অমিত শীল, কৃষ্ণকান্ত দেবনাথ, মিঠুন রায়, প্রসেনজিৎ রায়, অমলকান্তি চন্দ, অভীক কুমার দে এবং গৈরিকা ধর সবার ছড়াই ভাল লেগেছে। সবার লাইন তোলে বলা মুশকিল তাই দেওয়া গেল না। 
অনুগল্প লিখেছেন সন্তোষ রায়, হারাধন বৈরাগী এবং বিল্লাল হোসেন। সন্তোষদা’র ‘সবুজস্বপ্ন’ গল্পটি ভাল। হারাধন বৈরাগী’র ‘রিংটোন’ গল্পও আমাদের ভাবতে শেখাবে। ‘মা, মায়ের পূজো এবং বাপুয়ার গোলক ধাঁধাঁ’ গল্পে বিল্লাল হোসেন একটি শিশুর কথা এঁকেছেন। তার প্রতি অমানবিক সমাজের চেহারাও দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে ভাল লেগেছে অমলকান্তি চন্দ-এর ‘রসমালাই’। গৈরিকা ছাড়া আর কোনও শিশু আছে কি না বোঝার উপায় নেই। আরও শিশুদের যুক্ত করলে ভাল লাগবে। তা ছাড়া চিঠিপত্রের একটা বিভাগ থাকলেও মন্দ নয়। রসে টইটম্বুর হয়ে উঠুক ‘রসমালাই’।


মনূতট 
সম্পাদক – গোপাল চন্দ্র দাস 
প্রচ্ছদ- মিলনকান্তি দত্ত
কুমারঘাট, ঊনকোটি
মূল্য – ৩০ টাকা

আলোচনা :শ্যামল বৈদ্য

দশম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ‘মনূতট’ লিটল ম্যাগটি এলাকার গুণী মানুষ গোবিন্দ ধর-এর জীবনকৃতি ও কীর্তির উপর আলোকপাত করেছে। এতদিন যা কিছু সামান্য ছায়ার আড়ালে ছিল সব কিছুই এখন পাঠকের নাগালে চলে এলো। গোবিন্দ ধরকে আমি যতটা প্রকাশক হিসাবে জানি ততটা কবি বা লেখক হিসাবে জানতাম না। বরং প্রকাশকদের ছেড়ে ঘনঘন লেখক কবিদের লাইনে ঢুকে পড়ার জন্য মাঝেমাঝে বিরক্তও হয়েছি। তিনি এই অধমকে সামান্য প্রশ্রয় ও গুরত্ব দেন বলেই আস্পর্ধা দেখিয়ে মাঝেসাঝে উপদেশও দিয়েছি। কিন্তু ‘শব্দশ্রমিক কবি গোবিন্দ ধর সংখ্যা’ পড়ে এমন কানমলা খেয়েছি আর কখনও এমন দুঃসাহস দেখাব বলে মনে হয় না। 
আমি যদি গোবিন্দ ধর-এর প্রকাশক সত্ত্বাকে ছেড়েও দিই, তার পরও তাঁর মসৃণ গমন পথে তিনি যা যা অতিক্রম করেছেন তা হল, অভিনয় (নাটক এবং যাত্রাপালা), যাত্রাপালা রচনা, নাটক রচনা, বিষয়ভিত্তিক গবেষণা, গল্প লেখা (অনু ও ছোটগল্প), বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য পুঁথির সাংগ্রাহক, অন্তত ছ-সাতটি লিটল ম্যাগ-র সম্পাদনা, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, প্রবন্ধ লেখা এবং সর্বোপরি তিন একজন কবি। কবিতাই তাঁর জীবনে মূল আশ্রয়, নিজেকে পরিচয় দেন ‘শব্দশ্রমিক’ বলেই। কম করেও ২৩টি পুরস্কার ও সম্মান তিনি পেয়েছেন জীবনে। গোবিন্দ ধর এমন এক ব্যক্তি যিনি ক্রমশ একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে অনেক নতুন লেখক কবির আশ্রয়ে পরিণত হয়েছেন। গোপালচন্দ্র দাস তাঁর ম্যাগাজিনে সাহিত্যে নিবেদিত প্রাণ এই মানুষটিকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করে সঠিক কাজ করেছেন। এইটুকু জীবনে এত কাজ যে করতে পারেন তাঁকে নিয়ে আলোচনা তো হবেই। বাংলাদেশে শুনেছি ৫০ উত্তীর্ণ অনেক সাহিত্যিক স্বজীবনকৃতি একটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য উদ্যোগী হন। তাঁর সাহিত্য ও জীবন সম্বন্ধে কে কী বলছেন তা ওই গ্রন্থ পড়ে জানা যায়। আমাদের রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গেও অবশ্য এর খুব একটা প্রচলন নেই। তবে এটা হলেও মন্দ হয় না; এই সংখ্যাটি পড়ে তাই মনে হল।
যারা লিখেছেন –
সেলিনা হোসেন, সঞ্জীব দে, বিদিশা সরকার, রণজিৎ রায়, অভীককুমার দে, দেবব্রত সেন, রঞ্জিত চক্রবর্তী এবং পদ্মশ্রী মজুমদার। 
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন – সঞ্জীব দে, গোপালচন্দ্র দাস, হারাধন বৈরাগী এবং মৌসুমী কর। 
ওপারের প্রখ্যাত লেখিকা সেলিনা হোসেন তাঁর লেখায় গোবিন্দ ধর-এর সাথে তাঁর পরিচয়ের দিনক্ষণ জানিয়েছেন। তার সাথে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন কবি ও প্রকাশক  গোবিন্দ ধর ও তাঁর সহধর্মিণী পদ্মশ্রী মজুমদারকে। সঞ্জীব দে ত্রিপুরার রাজ অন্দর থেকে গোবিন্দ ধর-এর সময় পর্যন্ত কবিতার পথচলা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। গোবিন্দ ধর-এর বিশেষ বিশেষ কবিতার উল্লেখ করে বিশ্লেষণও করেছেন। কলকাতার কবি বিদিশা সরকার ‘আরোগ্যজল বনাম স্রোত’ লেখাটিতে কবি ও প্রকাশক দুই সত্ত্বার মূল্যায়ন করেছেন। রণজিৎ রায় তাঁর লেখা ‘কবি গোবিন্দ ধরকে শুভেচ্ছা ও এগিয়ে যাবার শুভকামনা’ রচনায় কবিকে তোলে ধরেছেন। অভীককুমার দে-র রচনাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গোবিন্দ ধরকে নিয়ে ভবিষ্যতে কেউ গবেষণা করলে এই লেখাটি কাজে আসবে। এখানে আলোচিত সাহিত্যিকের প্রকাশিত গ্রন্থ, সম্পাদিত গ্রন্থ, ম্যাগাজিন থেকে সম্মান-সহ সব ইনফরমেশন দেওয়া আছে। ওপারের আরও এক লেখক দেবব্রত সেন-এর ‘প্রসঙ্গঃ বইপুত্র গোবিন্দ ধর, দেওনদী এবং চৈতন্য ফকির’ রচনা পড়ে এটা বোঝা যায় যে, গোবিন্দ ধর শুধু এই রাজ্যের তরুণদের কাছে নন বিদেশের অনেকের কাছেও অনুপ্রেরণা। রঞ্জিত চক্রবর্তী তাঁকে ‘কথাকর্মী’ হিসেবে নতুন অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন। ‘শব্দশ্রমিক’ ‘বইপুত্র’-এর মতো ‘কথাকর্মী’ বিশেষণটিও লেখক অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করেছেন। এই আলোচনায় অবশ্যই বিশেষ পাওনা পদ্মশ্রী মজুমদারের লেখা ব্যক্তিগত অনুভব ‘এক কবির নিঃশব্দ জীবন স্রোত’। কোনও স্ত্রী যখন তাঁর পতিদেবের কাজের মূল্যায়ন করেন তখন তা ডকুমেন্ট হিসাবে থেকে যায়। 
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সঞ্জীব দে, গোপালচন্দ্র দাস, হারাধন বৈরাগী এবং মৌসুমী কর। প্রতিটি সাক্ষাৎকারই ভিন্ন ভিন্ন কৌণিক রেখা ধরে গোবিন্দ ধরকে আমাদের সামনে তোলে ধরেছে। গৌরব ধরের আঁকা পিতার কার্টুনটি অবশ্যই খুব ভালো। এ ছাড়াও ম্যাগাজিনের সামনে পেছনে দু’টি ছবি দেওয়া হয়েছে যা দৃষ্টিনন্দন। পণ্ডিত ও সাহেব দুই চেহারাতেই গোবিন্দ ধর মানানসই। 
এই ম্যাগাজিনটি পড়লে গোবিন্দ ধরের সাহিত্যে অবদান যা কিছু আছে সব জানা যায়। জানা যায় তাঁর জীবন ও কঠোর সংগ্রামের কথাও। মূলত তাঁর প্রশংসক এবং গুণমুগ্ধরাই লিখেছেন এখানে। এত গুণ থাকা মানুষেরও কিছু ভুল থাকে। মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ কেউ কিন্তু সমালোচনা থেকে ছাড়া পাননি। গোবিন্দ ধর এখানে ছাড়া পেয়ে গেলেন। আমি বলব সম্পাদক মশাই এই দিকটা সচেতন ভাবে এড়িয়ে গেছেন। ত্রিপুরার সাহিত্য সমাজে গোবিন্দ ধর-এর সমালোচকও কমবেশি আছেন। তাঁরা আলোচনা করলে ওই দিকটা ওঠে আসত। এতে গোবিন্দ ধর যেমন উপকৃত হতেন এবং তাঁর পাঠকরাও আরও ডিটেলে জানতে পারতেন। যাই হোক এই ম্যাগাজিনটি এবং অন্যরাও রাজ্যের আরও লেখক-কবিদের নিয়ে আলোচনা করবেন ভবিষ্যতে। লেখার উৎকর্ষ নিয়ে এখানে আলোচনা করে লাভ নেই, সবাই গোবিন্দ ধরকে নিয়ে তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। গোপালবাবুকে বলব, যদি আবার এমন সংখ্যা হয় আর আমি বেঁচে থাকি, তা হলে গোবিন্দ ধরকে নিয়ে আমাকে লিখতে বলবেন।

দু’টি ম্যাগাজিন নিয়ে এ বারের আলোচনা। পাঠক বন্ধুদের কেউ কেউ তাঁদের ম্যাগজিন নিয়েও লেখার জন্য অনুরোধ করছেন। আমি আসলে ভালো ক্রিটিক নই। নিজের ইচ্ছে মতন মতামত দিই। তাই আমাকে কম জড়ালেই ভালো। যাঁদের কথা লিখছি তাঁদের কাছে আমার ঋণ ছিল, সেটা পরিশোধ করছি। 
 
বনতট
দ্বিতীয় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮ 
সম্পাদকঃ হারাধন বৈরাগী  
প্রচ্ছদঃ বাপ্পা চক্রবর্তী। 
শ্রীরামপুর, কাঞ্চনপুর, উত্তর ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত। 
মূল্য-৩০ টাকা

অরণ্যের ভিতর দিয়ে আলোর ঝলকানি হল প্রচ্ছদ। তবে হাতে আঁকা নয় বলেই মনে হল। ছিমছাম হাতে নিতে সবার ভালো লাগবে এমন একটি লিটল ম্যাগ ‘বনতট’। যারা লিখেছেন –
কবিতাঃ সন্তোষ রায়, সেলিম মুস্তাফা, জ্যোতির্ময় রায়, সুজিত দেব, রঞ্জিত চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ দেব, বাপ্পা চক্রবর্তী, গোপাল চন্দ্র দাস, অমরকান্তি সূত্রধর, দেবাশ্রিতা চৌধুরী, রাজেস চন্দ্র দেবনাথ, দিব্যেন্দু নাথ, পার্থ ঘোষ, গোবিন্দ ধর, সুবল চক্রবর্তী, অপাংশু দেবনাথ, তমা বর্মন, অমলকান্তি চন্দ, মৌলিক মজুমদার, সোমেন চক্রবর্তী, চিরশ্রী দেবনাথ, পায়েল দেব, অভীক কুমার দে, সঞ্জীব দে, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ, রাজীব মজুমদার, সুমন পাটারী, মাম্পি চন্দ, হারাধন বৈরাগী। 
গল্পঃ জাহিরুল ইসলাম।
অনুগল্পঃ হারাধন বৈরাগী। 
খুব দামী একটি সম্পাদকীয় কলাম। এটা একটা প্রবন্ধও হতে পারত। মিজোরাম থেকে ডিসপ্লেসড রিয়াংদের জীবন চিত্র নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করলেন সম্পাদক। সে কারণে সাধুবাদ হারাধনবাবুকে। অনেকগুলি ভালো কবিতা পড়লাম এই ম্যাগাজিনে। জ্যোতিরময় রায় লিখছেন, ‘পালক দিয়ে/পাখি লিখেছিলাম যেদিন/সেদিন আকাশ পেয়েছিলাম দোয়াত।’ সুজিত দেব লিখছেন, ‘আমি আছি এই দেহে/আজ আছি --- কাল আছি/দেহের বয়স বাড়ে/একদিন যেতে হবে – দেহ ছেড়ে।’ ভালোই লাগে এমন সব লাইন, ‘আট কুটুরী নয় দরজা -’ মানে দেহতত্ত্বের ভাবনার মিশেল। বিশ্বজিৎ দেব লিখছেন, ‘ন্যাটিক্যাল দূর থেকে তার কাছে আসি/খুঁটে নিই দানার সম্বল, কোটরের তাপ/সর্পভয়, কোন মুগ্ধতা ছাড়াই।’  দেবাশ্রিতা চৌধুরীর কবিতা ‘খুঁজে ফেরা’ এবং পার্থ ঘোষের ‘মুছে দাও জন্মদাগ আমার---’ ভালো লাগে। অপাংশু লিখছেন, ‘ঘাসের ডগায় লেগে থাকা রক্তের অক্ষর,/বর্ণগুলো ক্রমান্বয়ে বুকের ভেতর ছায়া ফেলে/মায়ার শরীরে ফিরে ফিরে ফিরে আসে সেই সুর।’ সোমেন চক্রবর্তী’র লাইন, ‘মায়ের কখনো আলতারাঙা পা দেখিনি/ফাটাচৌচির গিরিখাত গোড়ালি/ রৌদ্রতাপে লালচে পড়া চেহারা দেখেছি’। এই কবিতার মধ্যে আমরা আশ্রয় নিতে পারি সহজেই। মৌলিক মজুমদারের ‘হাতপাখা ও কালাশনিকভ’ কবিতা মুহূর্তে টেনে নিয়ে যায় আমাকে কবিতায়। ‘দোরে ঝুলে আছে কালাশনিকভ/ছেঁড়া ছেঁড়া পরাবাস্তবতার/সুনিপুণ শ্বাপদ ঘ্রাণ আসে’। আমাদের চেনা কবিতার ভুবন ছেড়ে মৌলিক অন্য পথ দেখিয়ে দিল। এগিয়ে যাও মৌলিক। চিরশ্রী দেবনাথের কবিতা, ‘কি কাঁচা ফলের মতো গনগনে রাগ ঠোঁটের ঘাটে ঘাটে/অন্তহীন এক বিকেল থেমেছিল আমার চোখের বাগানে সেই সময়’ ভালো লাগে। চিত্তরঞ্জন দেবনাথ লিখছেন, ‘ঋতুবতী মেয়েদের কোমরের নীচে মেঘ জমে/বড়মুড়ায় পরিমিত বৃষ্টি হয়, কাইপেঙ রমনী/ হেলানো সজনের ছালে সূতিকার শুশ্রূষা খোঁজেন।’ 
এমন  অনেক ভালো ভালো কবিতা ম্যাগজিনটিতে পাওয়া যাবে যা পড়ে পাঠক খুশি হবেন। সবার কবিতার লাইন উল্লেখ করতে পারলাম না বলে দুঃখিত। 
জহিরুল ইসলাম-এর গল্প ‘এটা জয়ার মাথার বেণ্ট’ পড়ে ভালো লেগেছে। একটা জয়া অবসেশন কাজ করেছে লেখকের লেখাটিতে। তবে গল্পের ধরন কিছুটা সাবেকি। হারাধন বৈরাগী’র অনুগল্প ‘আলোআঁধারি’ গল্প হয়ে উঠতে পারেনি। রুদ্রাণী আদিত্যদের নিয়ে যে গল্পের আবহ তৈরি হয়েছিল তা জমাট বাঁধল না। বানান ভুল থাকলেও পড়ে মনে হয়েছে ‘বনতট’ সুসম্পাদিত। ধন্যবাদ হারাধনবাবুকে এমন একটি কাগজ উপহার দেবার জন্য। 

          
 
মণিহার 
৩৬তম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং। 
সম্পাদকঃ নীলিমা দাশগুপ্ত   
প্রচ্ছদ পরিকল্পনাঃ দীপেন চক্রবর্তী। 
মাস্টারদা সূর্যসেন লেন, কুমারঘাট, ঊনকোটি থেকে প্রকাশিত। 
মূল্য-৩০ টাকা

মণি-রত্ন খচিত প্রচ্ছদ ইন্টারনেট থেকে নিয়েছেন দীপেন চক্রবর্তী। দেখতে মন্দ নয় বটে, কিন্তু একটা কথা বলতেই হয়। লিটল ম্যাগ শুধু লেখক কবি নয় শিল্পীও তৈরি করে। ইদানীং ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করার ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে।  
যারা লিখেছেন –
গল্পঃ পদ্মশ্রী মজুমদার।
কবিতাঃ চৈতন্য ফকির, অপাংশু দেবনাথ, হারাধন বৈরাগী, সঞ্জীব দে, অভীক কুমার দে, অমলকান্তি চন্দ, গোপাল চন্দ্র দাস, দিব্যেন্দু নাথ, মিঠুন রায়, রঞ্জিত চক্রবর্তী, নীলিমা দাশগুপ্ত, অনিতা ভট্টাচার্য, দীপাল দাস, উৎপল মল্লিক, দীপেন চক্রবর্তী এবং গৈরিকা ধর।
একমাত্র গল্পটি লিখেছেন পদ্মশ্রী মজুমদার। খুবই ছোটো গল্প, অনুগল্প বললেও মেনে  নেওয়া যায়। আজকাল খাপ দেখে পদ্মশ্রী তলোয়ার তৈরি করছেন বলে মনে হয়। লিটল ম্যাগে জায়গা না হলে অন্য কথাও যাবে। এত ফিতা দিয়ে মেপে দু-পৃষ্ঠা করার কী দরকার? তবে গল্পটা খুব ভালো এবং সে জন্য লেখিকাকে ধন্যবাদ। পর্নাকে বুঝতে গেলে এমন একজন স্বপ্নপুরুষ দরকার ছিল। আমার খুব ভালো লেগেছে, তবে আরও একটু বিস্তার দরকার। পাঠককে আশ্রয় দেবার মতো স্পেস নেই। 
ষোলো জন কবির কবিতা রয়েছে এখানে। কবি হারাধন বৈরাগী’র প্রব্যজ্যা কবিতাটি আমার খুব ভালো লেগেছে। প্রতিটি শব্দ এবং বাক্য আমাকে ছুঁয়ে গেছে। ‘প্রস্তর নির্মিত পথে ভ্রুক্ষেপহীন এক ঋষি/অনুসরণ করে চলেছে একদঙ্গল শিষ্য/সকলের হাতেই অমিয়পাত্র/আলিঙ্গনরত নিজেরই ছায়াবৃত্ত/কৃষ্ণময়বুকে করজোড়ে মোদিত হলে/ধ্বনি হয়- খরমের-খরধ্বনি!’ অনেকদিন পর একটি ভালো কবিতা পড়লাম। অপাংশু লিখছেন, ‘এই জীবনের কাছে খাপসহ তরবারি/বাজি রাখি, প্রয়োজনে খুলে নিও আলো।’ এই ‘আলো’ শব্দটা কেন অপাংশু? খটকা লাগে। সঞ্জীব দে’র কবিতা ‘সরোবরমুখী’ যৌনতা থেকে বের হতে চেয়েও পারল না।দিব্যেন্দু নাথ লিখছেন, ‘নিঃসৃত রাতের শেষে -/সযত্নে আবৃত, পাপড়ির নিভৃতে,/বিষাক্ত প্রেমের কালো ভ্রমর।’ মিঠুন রায় লিখছেন, ‘ভাবনাগুলি ইচ্ছে করেই গুছিয়ে নিচ্ছি/আর ভুল পথে হাঁটবো না বলে।’ কয়েকটা ভালো কবিতা যেমন আছে তেমনই কিছু দুর্বলও আছে। যেমন কবি উৎপল মল্লিক বা দীপাল দাস-এর আধুনিক কবিতার গড়ন, ছন্দ ও নির্মিতি নিয়ে আরও ভাবা দরকার। চৈতন্য ফকির ও গৈরিকা ধর একসাথে একই ম্যাগাজিনে লিখছে ব্যাপারটা দেখে আমার বেশ ভালো লাগে। যাক বেশ মজা পেলাম গৈরিকা’র কবিতা পড়ে।




মনুতট।দ্বাদশবর্ষ।উৎসব সংখ্যা।
সম্পাদক-গোপাল চন্দ্র দাস। সুন্দর প্রচ্ছদ।

আলোচনা :হারাধন বৈরাগী

শুরুতেই শ্রদ্ধেয় আমার স্যার অনিল কুমার চক্রবর্তীর কথায় উঠে এসেছে "কলকাতার কথা"শিরোনামে স্মৃতি আখ্যান।এই আখ্যান ১৯৫২থেকে ১৯৮০ অবধি তাঁর পড়াশোনা , জীবনসংগ্রাম ও বেড়ে উঠার কথা ও কাহিনী মঞ্জুরী।স্থান পূর্ববঙ্গের টাঙ্গাইল থেকে কলকাতা হয়ে কৈলাশহর।ঘটনায় জড়িয়ে আছেন ওই সময়কার বেশ কয়েকজন বিদ্গ্ধ কবি ,পণ্ডিত ও সন্তজন।উপস্থাপনায় লেখকের মুন্সিয়ানা নাড়িয়ে গেল আমাকে।সঞ্জীবদের" সিন্ধু থেকে হিন্দুস্থান" অল্পকথায় বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের  আলোকপাত।ভালো লাগলো নিবন্ধটি।সময় উপযোগী লেখা।।সঞ্জীব দর্শনের ছাত্র।দর্শনের আলোকে বৈচিত্রের মাঝে মিলন ও মহান গেয়েছেন। বিশেষ নিবন্ধ গোপাল চন্দ্র দাসের "মতুয়া মতবাদ ও অন্ত্যজ পতিতজন"পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। ইতিহাসের আলোকে অন্ত্যজদের নিয়ে খুলাখুলি আলোকপাত। এঁদের এত সংগ্রাম ও চিন্তাচেতনার কথা আগে আমার জানা ছিল না।যুগী -যোগী না যোগী-যুগী -এই ধারা ক্রমে একটু খটকা লেগেছে । টানটান লেখা।তাঁকে সাধুবাদ।কথাকার শ্যামল বৈদ্যের গল্প "জলাঞ্জলি"খুব ভালো লেগেছে।গল্পের ভেতরে অন্ত্যজ মৎসজীবির জীবন সংগ্রাম,শোষক ও শোষিতের চিত্র কল্প।লোভ ।গল্পের পরিসরে ধলাইনদীর বানের রপচিত্র দারুণ লেগেছে।গল্পের পরিণতি শুরুতে বুঝা না গেলেও মাঝামাঝি গিয়ে বুঝা গেছে।লোভের থেকে সাধনের হাতে নকুলবাশির পড়িণতি দেখে চোখে জল আসে।মনে হয় সাধন নয়,নদীর বান‌ই বুঝি নকুলবাশির পরিণতির জন্য দায়ী। দারুণ।গল্পটির ভাষা অন্ত্যজশ্রেণীর বুকের কথা।

রণবীর পরকায়স্থের ফুলের গন্ধ।মাটিমানুষের বুকের কথা।একটি লাউয়ের চারাকে কেন্দ্র করে পটলের জীবনের গল্প লেখকের মুন্সিয়ানায় দারুণ ভাবে উতরেছে।প্রথম থেকে গল্পটির মাঝে টান টান উত্তেজনা ‌পরিণতির দিকে পাঠককে টেনে নিয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে মোড় ঘুরে যায়।ভাবা যায় না পটল বেঁচে যাবে।লেখক মারতে মারতে বাঁচিয়ে রেখেছেন পটলকে। দারুণ।

বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর "দৃশ্য"কবিতাটি সময়ের অবক্ষয়ের তীর্যক বাঁকের দিকেই কবি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন বলে মনে হল। শুরুতেই "দৃশ্য পাল্টিয়ে গেলে অ-আ-ক-বর্ণমালাও পাল্টে যায়।/ -----।পদ্মশ্রী মজুমদারের "বৃষ্টি শেষের পরে"কবিতাটি মনে হয় একটি প্রাকৃতিক ঘটনার ছায়াচিত্র। কিন্তু ভেতরে অসম্ভব দুঃখব্যঞ্জনা পাঠক হিসেবে আমাকে ভীষণ আলোড়িত করেছে-।অল্প কথায় গভীর ব্যঞ্জনা।"বৃষ্টি হয়ে গেছে/জয়ন্তিয়া পাহাড়ে।/'-------কিছু মেঘ আর মেঘলা কথার ভেলা/কথারা ছুটি নিয়েছে কবে/শুধু রয়ে গেছে শব্দহীন বৃষ্টির ফোঁটা/'
কবিতাটি কবি অভীক কুমাররের নামেও ছাপা হয়েছে।এটা অসম্ভব মুদ্রণ প্রমাদ।আমি ধরে নিয়েছি কবিতাটি পদ্মশ্রীর।
জ্যোতির্ময় রায়ের কবিতা "আমাকে বিশ্বাস করুণ"কবিতায় কবির ছিন্নমূল আইডেন্টি ক্রাইচিস ছিন্নমূল মানুষের বুকের আর্তচিৎকারে উত্তরণ ঘটেছে। দারুণ লাগলো।চৈতন্য ফকিরের কবিতা "অসুখ বিসুখ"কবির মানসপ্রতিমা। 'ভালোবাসাময় শরীর আর প্রেমহীন শরীরের  কবিমানসরূপ। নির্মল দত্তের কবিতা,"প্যান্থার সিরিজ দুই"-সময়ের দ্রোহ বম।ধারালো কিরিচ যেন।তিনি যখন বলেন,"পুকুরটিকে ভরাট করতে হবে।/জীবনের আগে না পরে পরিবেশ-জানা নেই।/-বছর ধরে পুর‌আইনের মতো কচু আর কলমিশাক ছাড়া কোন আউটপুট নেই/!মৌসমী মণ্ডল দেবনাথের কবিতা "শরত-যাপন"নীলনদের তীরের কালো মানুষের যাপনমুখ, পৃথিবীর সকল কালো ও নিরন্ন মানুষের যাপনে উত্তীর্ণ।
পঙ্কজ মালাকারের 'অভয়' কবিতাটি ও ভালো লাগলো।"-'অভয় ?অভয়?অভয় তো অভয়ারণ্যে নেই,তাকে খুঁজে পাবে না আর পৃথিবীর কোন প্রান্তে।"সৌম্যদীপ দেবের কবিতা"বহমান স্রোতে"যৌবন ও বার্ধক্যের কেরিকাঠি মনে হয়েছে।যেতে নাহি দেব হায়,তবু যেতে দিতে হয়,এমন মূর্ছনা বুকে বাঁজে। বার্ধক্য একদিন অভিমানী হয়ে ওঠে বহতা সময়ের নৌকোয় দাঁড়িয়ে।-"তার স্রোতের টানে/ যে বয়ে যায় তাকে যেতে দাও/"।অনিতা ভট্টাচার্য্যের' "কনকচাঁপা" কবিতায় -শিউলিতলায় ছড়িয়ে আছে/ঝরানো ফুলের কোমল গালিচা/
------আজ সে দিশেহারা বড়‌ই ক্লান্ত/
---------------
নেশায় বুদ হয়ে চোখ দুটো টিকে থাকে/
কার কখন খসে পড়ে সুখের বুক--/
ভালো লেগেছে। রণজিৎ চক্রবর্তীর "কে আসল কে নকল"কবিতায়  -মনের সদর দরজায়/চিন্তার প্রহরী রাখলে/সেই ঠিক করে দেয়/কে আসল কে নকল/।সন্দীপ সাহুর "প্রপিতামহগণের সুর"কবিতায়-প্রপিতামহগণ যে সূর তুলে রক্ত মেখেছিলেন/সেই রক্তে এখন বিপরীত সুর/।উদাস বাউলের" হীরা"কবিতায় অভিলষিত হীরকসময়ের ক্ষারপানিমুখ ফুটে কবির চেতনায়।হীরকসময়ে আহত কবি বলেন-দিনের শেষে সূর্য ঢলতেই/ঝিল্লিদার বিন্দুর গোধূলি রং/।সুজিত দেবের "রক্তের রং টকটকে লাল" কবিতায়-রক্তের রং টকটকে লাল/জীবনের রং ধবধবে সাদা/পাতায় লেখো তার নাম/--একটাই জাত রক্তদান/। অমলকান্তি চন্দের ছড়া "ছোট্ট নুড়ি"খুব ভালো লাগলো।অমল একটার পর একটা ছন্দের পরীক্ষা চালাচ্ছে মনে হল।নিত্যনুতন রূপে রঙে তার ছড়া আমাদের ভাবায়। প্রসেনজিৎ রায় তার শ্রমিকের "ঘাম" কবিতায় তুলে ধরেছেন শ্রমজীবি মানুষের জীবন যন্ত্রণার রূপরং।-"খালি পেটে স্বপ্ন বারণ এ বিশ্বাসে আধপেটা উনুন চড়ে/।"

সেলিম মুস্তাফার কবিতা "দেখার অসুখ"
ছাপাখানার হরফ সমস্যার জন্য হৃদয় অঙ্গম করতে পারলাম না পুরোটা । কবিতাটি পড়ে যে টুকু বুঝেছি। বর্তমান একচোখা রাজসেবার প্রেক্ষাপটে লেখা কবিতাটি।কবি এখানে সরকারের দুঃস্থজনের জন্য দিস্তাভর্তি সহায়ক প্রতিশ্রুতির খতিয়ানের যেন কঙ্কালসার উপস্থাপন করেছেন অসম্ভব মুন্সিয়ানায়।যেন একটা সাংঘাতিক অসুখ কোন সরকারী সহায়তা খতিয়ানের পৃষ্ঠায় কেউটের মতো জড়িয়ে আছে। রাজনেতাদের দৌলতে আমাদের সচরাচর নজড়ে পড়ে যায়।যাদের নাম দুঃস্থতালিকায় উঠে তারা কী সত্যি দুখীজন?কবি ছুড়ে দেন সরকার কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের দিকে অন্তিম প্রশ্ন -দুঃখের তালিকায় যাদের নাম আছে/তারা কি‌ দুঃখী?-----সারাটাদিন ঘুরিসতো নিরক্ষরা গলি/আমার যে রক্তাক্ত হল কন্ঠ-আমার যে পঙ্গু হল পা-/
দেখেও দেখতে পেলি না!/যারা ঐ হলঘর সাজিয়ে বসেছে/তাদের মেনিফেস্টো কী?দুঃখ নিরসন।/
পাশাপাশি কবি একজন দুঃস্থ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উচ্চারণ করেন প্রতিবাদ ,সরকারের লোক কিংবা রাজনেতাদের নিজেদের স্বার্থে স্বপ্নের জায়মান জগতে তাদের পৌঁছে দেওয়ার মেকি প্রতিস্রুতির প্রচার সজ্জার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন-আমি চিৎকার করে বলি- না।/
এসব সত্যি নয়,এরকম হতে পারে না!/
তুই শুনতে পাস না,সুখের/কথা বলতে বলতে তোর গলা ফেঁসে যায়/চোখে ওঠে লাল,/তুই টের পাস না এই অসুখ-/এই দেখার অসুখ/তোর ও আমার/সমান সমান/বরাবর।

আসলে সরকারী দুঃস্থ সহায়ক বিবিধ প্রকল্পের খতিয়ানের তালিকায় যাদের নাম থাকে তারা অনেক ক্ষেত্রেই সহায়তা লাভের মানদণ্ডের কাছে অনুত্তীর্ণ।যারা আসল প্রাপক তারা দলবাজীর চোখে অপাংক্তেয়‌ই থেকে যায়।কবির প্রতিবাদ যেন সেদিকেই পাঠককে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায়।কবি শেষপর্যন্ত বলেন তোর যেমন দেখার অসুখ আমারও যেন ঠিক তোর‌ই মতো সমকক্ষতা সম্পন্ন দেখার চোখ।সমদেখার অসুখে অসুখী। খুব ভালো লাগল কবিতাটি।

কবি গোপাল চন্দ্র দাসের কবিতা অরণ্যের ডাক পাঠককে ভাবায়।এও এক সময়ের রেঙ।অরণ্য যেন অরণ্যের পথে হাঁটছে।নগর নগরের পথে।অরণ্যের প্রতি মেকি ভালোবাসা নগরবাসীর।নগরবাসীর অরণ্যের প্রতি মেকি দরদ দেখে কবি বিচলিত হন। তিনি উচ্চারণ করেন-গভীর অরণ্য ডাকে বন্ধুর মতো/ফরমাস নয় যেন অমায়িক আর্জি/------আমি চটপটে পৌরনাগরিক/শ্যাম্পেন ভোদকা গিলে আল্লাদীজীবন/ভাড়া করেছি সব সুখ/নেশায় বুদ হয়ে চোখ দুটি টিকে থাকে/কার কখন খসে পড়ে সুখের বুক।এ যেন নগর নাগরিকের আত্মকেন্দ্রিক জীবনের দিকে তীব্র শ্লেষ! আবার কবি বলেন- কৃত্রিম ফুল বাঁশের টব বেতের চেয়ার টেবিল/দেখতে গেলে সবই ভালোবাসা অরণ্যের প্রতি/বসতে গেলেই যতো গোল---/প্রকৃতির কায়া একা একা হাঁটছে/---সেখানে আকাশ এখন খিলখিল হাসে/সমতলের সমান ধারণা বুঝে/চিক্লা জোয়াই‍ং সুমো খাম চংপ্রেং বাজায়।/হয়তো এখন ফিরিয়ে দেবে রবীন্দ্র নজরুল।

কবি আলাল উদ্দিনের কবিতা-"শিরোনামহীন"সহজ কথায় অসম্ভব প্রতিবাদ। সরাসরি বলা।কবি এই পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক যে অধিকার, বিশেষত অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসা-মোটামোটি এমন আটপৌড়ে জীবনের শ্বাসবায়ুর জন্য প্রতিবাদ তুলেছেন মনে হল।কবি কোন রাখডাক না করেই বলেন-আমার ভাগের যেটুকু জল আলো বাতাস/সবটুকুই আমার /একমাত্র আমার।/--খাদ্য বস্ত্র---/আমাকে ফুল দিয়ে কি ভদ্রতা শেখাবে---/সাজানো প্রকৃতির বুকে /এতটুকু আঁচড় দিওনা/---বন্ধ্যা গাছেও জল ঢাল/ছায়া দেবে শীতল বাতাস অক্সিজেন তো দেবে?--দয়ার দান চাইনা কারো/একটা আত্মশুদ্ধ মন আমাকে ভিক্ষে দাও।/আমার ভিক্ষের বাটিটা বড়‌ই খাঁটি গো/বড়‌ই খাঁটি।

কবিতা লিখেছেন উত্তম দেবনাথ"নদীটা বন্ধ রেখো"।সুশান্তনন্দীর অনুসিরিজ-"সময়"কবিতায়-সময়ের স্রোত থেমে গেলে/বসন্ত অন্ত:সত্ত্বা হবে কিভাবে/।"পথ"--প্রতিটি পথেই তো চোরাস্রোত/আমি গন্তব্যে পৌঁছাই কি করে/।কবিতা আছে জাকির আহমেদের।"বন্যা"
-তুমি ভাসিয়ে দাও আমাকে। পরমাণু কবিতা।

আর আছে বিশেষ সাক্ষাৎকার।প্রাক্তন যাত্রাশিল্পী নলিনেশ ঘোষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদক গোপাল চন্দ্র দাস।ছোটদের কলামে আছে গৈরিকা ধরের পরমানু গল্প"পাখি "।অমিশা দাসের কবিতা "লুয়াক"
দিব্যেন্দু নাথের ভ্রমনচরিত "নীল পাহাড়ে ব্রু মেয়ের খোঁজে"ভালো লেগেছে। মুন্সিয়ানা আছে।তবে শিরোনাম অন্য কিছু হতে পারতো বলে মনে হয়েছে।জহর লাল দাসের অনুগল্প-"করোনার খোঁজে"। করোনা কালের ছবির ফুলকি। বিল্লাল হোসেনের অনুগল্প-অতিথি, ভালো লাগলো।জাতধর্মের দিকে তর্জনী নির্দেশ তার। অর্বাচীন পাঠকের কথা কলমে মিলন কান্তি দত্ত-দিব্যেন্দু নাথের আইলানারের আলোচনা করেছেন। নিখুঁত আলোচনা মনে হল।পরিশেষে বলবো। ছাপাখানার মারাত্মক মুদ্রণ প্রমাদ।একের কবিতা অন্যের উপর ছাপা হয়েছে।এক‌ই লেখা দু'বার‌ও হয়েছে।আমার ঝাটকা লেগেছে।এতো বড়ো উদ্যোগ আয়োজন শেষে যেন পোকায় কেটেছে।এ কাম্য নয়।সম্পাদকের পরিস্থিতি বুঝেই বলছি আগামী স‍ংখ্যায় এ থেকে উত্তরণ আশা করছি।লেখা নির্বাচনে সম্পাদকের আরো সচেতনতা চাই।আরো কঠোরতা চাই।

উদ্যোগ ও অধ্যবসায় কতটুকু হলে এমন করোনা সময়ে এমন একটি পরিসরে ম্যাগাজিন করা যায়!কবি গোপাল চন্দ্র দাস দুটি সাহিত্য পত্রের সম্পাদক।সৃষ্টিলোক ও মনুতট।এমন ভার ব‌ইতে পারেন কজন।ভাবলে অবাক হ‌ই।আমি উত্তরোত্তর কবির সফলতা কামনা করি।

ফোয়ারা রাতাছড়ার একটি সাহিত্য পত্র।সম্পাদক আলাল উদ্দিন।

আলোচনা :হারাধন  বৈরাগী


কথাবলা।প্রচ্ছদ।।

প্রবন্ধ,কবিতা,অনুগল্প,নিবন্ধ(স্থান নামের উপর আলোকপাত) ইত্যাদি দিয়ে সাজানো --অন্তর।কবি গোপাল দাসের প্রবন্ধ "অমর মরমী কবি রাধারমণ দত্ত"-সময় উপযোগী একটি নিবন্ধ আমাকে দারুণ ভাবিয়েছে। সিলেটের সহজীয়া কবি রাধারমণের আলোকিত অনালোকিত জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্যনিষ্ঠ‌ আলোকপাত ,এই ম্যাগটির বিশেষ অলঙ্কার।কবি গোপাল দাস যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন মনে হল।কবি গোপাল দাসের কাছে শ্রীরাধারমণকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও জানার আগ্রহ র‌ইল।দুষ্মন্ত দরবেশের "সতের মিঁয়ার হাওরে"র উপর আলোকপাত আমাকে কুহকময় করে তুলেছে।হাওরটি না দেখলে মন স‌ইছে না।কবি অপাংশু দেবনাথের কবিতা "হা‍ঁটতে হাঁটতে কবিতায়"শহরের অন্ত:সলিলা মুখচ্ছবি।শহরের অন্তর আলোকিত।"একদিন হাঁটতে হাঁটতে উঠে এলাম তোমার শহরে/-----আধমরা গাছেদের জীর্ণডালে আটকে আছে চৈলঘুরির সূতো/সন্ধ্যার অল্প অন্ধকারে গন্ধ ছড়ায় দেশী মদের ঠেক!/অপূর্ব কন্যাটির মতো বদলে যাচ্ছে শহরের অবয়ব/---পা-পথে হেঁটে যাওয়া মানুষটি কবি‌ই ছিল একদিন/ -খুব‌ই ভাবায়। পদ্মশ্রী মজুমদারের কোয়ারেন্টাইন সময়ের রেঙ।একটি কবিতা দিয়েই পুরো সিরিজ বুঝা যায়- "পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক/ চলে যাচ্ছে এক অদ্ভুত কোয়ারান্টাইনে।গোপেশ চক্রবর্তীর "জীবন্ত পাতারা" কবিতায়"তল্লাট ঘুরে ঘুরে হা-হুতাস করছে দাপুটে কাকতাড়ুয়া/আমাদের এখন রক্তে নিকোটিন কমানোর সময়----/শুধু দেওয়ালগুলো দেওয়ালের ভেতর খেলা করে!"ভালো লেগেছে।অমলকান্তি চন্দের 'পরীর মতো একটি মেয়ে' ছড়াটিকে পরী‌ই মনে হয়েছে।হামিদা বানু'র ছড়া 'অভিমানী পৃথিবী"মনে ধরেছে।বিপ্লব উরা‌ঙের কবিতা "হামার মা" জীবন ছোঁয়া লেখা।কবি অভীক কুমার দের কবিতা "অবস্থান" সরল কথায় আমাদের মুখদর্পণ! দিব্যেন্দু নাথের গল্প "আদিমার নাকের ফুল"মাটির কথা।মাটি দিয়ে লেপা।গল্পটির কিছু কিছু লাইন একটু লেগেছে। আরও নজর দিলে  ভালো হতো।বিল্লাল হোসেনের গল্প- কুকুর্মানুষে'র  ভিন্ন স্বাদ।বিজন বোসের 'অবিশ্বাস' কবিতায়-ওই দেখ করোনা/ডানে বায়ে মরো না।/-ভালো লেগেছে।,সঞ্জীব দে'র কবিতা 'এই দেশ কার?', জীবন যন্ত্রণার স্থির চিত্র।উদাস বাউলের 'অসহায়"কবিতায়- "চারদিকে পাতাহীন গাছ হাসে/বাতাসে--বিদ্রুপের বৃষ্টি/
----ভয়ে ভয়ে খুঁজে হাসির ট্যাবলেট।/ভালো লেগেছে।,রঞ্জিত চক্রবর্তীর 'বর্তমান'কবিতায় -আলোর চোখে রোদচশমা/, সুন্দর ব্যবহার।,জগদীষ দেবনাথের-বিদায় হ‌ও করোনা"কবিতায় -আর কতো মানুষ খাবে/
এবার বিদাও হ‌ও করোনা/" লাইন দুটি‌কেই কবিতা মনে হয়েছে।শাহিনুর চৌধুরীর 'আর্তনাদ 'কোরাস মনে হয়েছে। ,আজিজুর রহমানের"বৈষম্য"বক্তব্য ধর্মী লাগলো।।জ্যোতির্ময় রায়ের কবিতা "করোনা কালের পদ্য"সময়ের রেঙ বলে মনে হয়েছে।গৈরিকার পদ্য "ঘোড়া যায় টুক টুক"-মনে হয়েছে ঘোড়া ঠিকই এভাবে যায়।দিপ্সির কবিতার শিরোনাম 'কলম বেনামী দেশলাই' নাকি কলম বনাম দেশলাই,খটকা লেগেছে। কবিতাটি -দুগালে চপেটাঘাত মনে হল।উমার "খোঁজ"ভালো লেগেছে।অনিতা ভট্টাচার্য্যের' বিরহিনী'র শেষ লাইনের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি।মোর শব্দটির অবয়ব ধাক্কা দিয়েছে।

ভালো লেগেছে অহর্ণিশ মাস্টার অন্তিমের কবিতা"গোচরে আমি"।

দুষ্মন্ত দরবেশের" সমাজসেবক" গল্প ,না বিশেষ নিবন্ধ ,খটকা লেগেছে!

পরিশেষে বলবো,একটা সাহিত্যপত্র লালন করা একটি সন্তান লালনের মতো।একজন সম্পাদক এইভাবেই দেখেন তার লিটলম্যাগকে।যত ঝড়বৃষ্টি আসুক সন্তানকে আগলে রাখে পিতা।এই সংকটকালে দাঁড়িয়ে কবি আলাল উদ্দিনের এই ফোয়ারা প্রকাশ আমাকে অসম্ভব উদ্দিপ্ত করেছে। বেঁচে থাক ফোয়ারা। বেঁচে থাক অন্ত:সলিলা রাতাছড়া।কবিতা মা। গোবিন্দ আলাল উদ্দিনের জ্ঞানমা সোহাগীমা। আমার বিশ্বাস কবি আলাল উদ্দিন আগামী সংখ্যার সম্পাদনায় আরও যত্নবান হবেন। শুভকামনা।

"রসমালাই"
বাংলা ভাষার অন্যতম ছড়াকার চুনী দাশ সংখ্যা-১৪২৭বাংলা।। 
--------------------------------------------------------

আলোচনা :অপাশু দেবনাথ 

 সম্পাদকঃ ছড়াকার অমলকান্তি চন্দ।
নামাকরণঃ ছড়াকার কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী।
নামলিপিঃ কবি মিলন কান্তি দত্ত।
প্রচ্ছদঃ তরুণ চিত্রশিল্পী গৌরব ধর।

চুনী দাশ ৬০ এর দশকে এ রাজ্যে যারা ছড়া সাহিত্য সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেছিলেন তাঁদের অগ্রগণ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছি তিনি আমার শিক্ষক।  বীরেন্দ্রনগর দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ে একাদশ দ্বাদশে পড়বার সময় স্যারকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি।  দ্বীপন নামে সাহিত্য পত্রিকাটি বিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর প্রকাশিত হতো।  মনে পড়ে স্যার আমার কবিতা প্রথম দ্বীপনে প্রকাশ করেছিলেন।  সেই থেকে এখনো স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।  যেখানেই দেখা হয় পায়ে ধরে প্রণাম করার পর স্যার বলেন " এখন তো বড় হয়ে গেছো। এখন কি আর পায়ে ধরে প্রণাম করতে হয়?"
মুখে বলি "স্যার কি যে বলেন?" আর মনে মনে বলি ছেলেমেয়ে পিতামাতার কাছে শিশুই থাকে চিরকাল। আর আপনিও আমার পিতার মতো। 
আজ স্যারকে নিয়ে অমল বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করছে রসমালাইএর।এ কথা জেনে মন অজান্তেই উৎফুল্ল হযে উঠলো।  ভালো থাকবেন স্যার। আমার বিনীতশ্রদ্ধা জানবেূন।

বনতট- সম্পাদক হারাধন বৈরাগী,দোপাতা- সম্পাদক- দিব্যেন্দু নাথ, রসমালাই সম্পাদক- অমলকান্তি চন্দ 

আলোচনা :গোপালচন্দ্র দাস

আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ২০২০
রক্তক্ষরণের আরেক নাম লিটল ম্যাগাজিন। ভালোবাসতে পারেন,ঘৃনা করতে পারেন,এড়াতে পারবেন না। ঋণ বেড়ে যায় ভালোবাসার মানুষদের প্রতি।সাহিত্যের প্রতি। সাহিত্য কখনোই বিলাস নয়। আত্মবিলাপও নয় সাহিত্য। সাহিত্যের একজন অতি সাধারণ ছাত্র হিসেবে এতোটুকু বুঝি, যে কবিতা আপনাকে অনেক কিছু দেয় সে আপনার থেকে কেড়েও নেয় অনেক কিছুই। কবিতা এক অপূর্ব প্রেমিকা। তার সাথে যার প্রেম হয়, তাকে ভাবা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না সেই মানুষটির। সে কোনভাবেই তার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারে না। সে চায় তার প্রেমিক মানুষটি শুধু তাকে ঘিরে মনোনিবেশ করবে। তার ভাবনায় মগ্ন থাকবে অহোরাত।
অথচ এ সময়ে আমরা অনেকেই দু'কলম লিখে নিজেকে কবি বলে ভাবতে থাকি।আমি শুধু ভাবি সমস্ত জীবন ধরে যদি একটি পংক্তি লিখতে পারতাম তাহলে জীবন হয়তো সার্থক হত। আমি সেই পংক্তির জন্য অফুরান সময়  জেগে থাকতে রাজি  আছি। 
১২ জানুয়ারি ২০২০ বনতট-দোপাতা-রসমালাই এর সম্পাদক ত্রয় কবি হারাধন বৈরাগী,কথাশিল্পী দিব্যেন্দু নাথ ও ছড়াকার অমলকান্তি চন্দের উদ্যোগে কবিতা উপত্যকা কাঞ্চনপুরে হয়ে গেল এক নান্দনিক সাহিত্য উৎসব।
বাংলাদেশের কবিবন্ধু জাকির আহমেদ,পশ্চিমবঙ্গের কবি সন্দীপ সাউ ও কবি সুশান্ত নন্দী উপস্থিত ছিলেন। তাছাড়া উপস্থিত ছিলেন লোকগবেষক অশোকানন্দ রায় বর্ধন,কবি বিমল চক্রবর্তী,ঔপন্যাসিক দেবব্রত দেব  কবি সেলিম মোস্তফা কবি জ্যোতির্ময় রায় কবি সন্তোষ রায় কবি সমর চক্রবর্তী কবি গোবিন্দ ধর ঔপন্যাসিক শ্যামল বৈদ্য কথাকার জহর দেবনাথ গল্পকার পদ্মশ্রী মজুমদার প্রমুখ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগণ। 

উপস্থিত ছিলেন  কবি নিশিথ রঞ্জন পাল  কবি সাঁচিরাম মানিক কবি তমাল শেখর দে চিত্রশিল্পী কবি পার্থ ঘোষ বাপ্পা চক্রবর্তী  কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী  কবি অভীক কুমার দে ও তরুণ কথাশিল্পী জয় দেবনাথ প্রমুখ।

তাছাড়া ছিলেন কবি বিজন বোস  তরুণকবি দেবাশীস চৌধুরী কবি রোজি নাথ কথাশিল্পী রণিতা নাথ কথাকার চন্দন পাল ছড়াশিল্পী গৈরিকা ধর ও কবি সম্পাদক গোপাল চন্দ্র দাস।

অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো রাজ্যের এবং বহি রাজ্যের এমনকি বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের একটা মঞ্চে একটা প্রেক্ষাগৃহে এনে দাঁড় করিয়েছেন কাঞ্চনপুরের প্রিয় সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা আমি তাদের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা ও অভিবাদন জ্ঞাপন করি। 
বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল জগতে লিটল ম্যাগাজিনের গাছপালা  চিরহরিৎ, যা বিকল্প লেখালেখির সুলুক সন্ধান দিয়ে প্রাণিত করে সমগ্র সাহিত্যপ্রেমীদের।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ