প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত
ত্রিপুরার অণুগল্প সংখ্যা
হারাধন বৈরাগী
সুবোধবাবু
আমার পাশেই ভাড়া থাকতেন,১০৩২৩শের শিক্ষক সুবোধবাবু,স্ত্রী আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে।
ভারমুখ-মাঝেমধ্যে তার সাথে চোখাচোখি হতো
মনে হতো তিনি আমাকে এরিয়ে বেশী সচ্ছন্দ।
কথা বললে বলতেন,নিজে থেকে বলতেন না।
ছেলেটি বিকেলবেলা একটা বেবী সাইকেল চালাতো।কিংবা ব্যাট বল নিয়ে সাথীদের সাথে খেলতো। মাতিয়ে রাখতো সারাটা বিকেল। তার বাবা যে ১০৩২৩শের একজন--।তাকে নিয়ে যে ভূভারত সরগরম ।নিস্পাপ কিশোরটি বুঝতো বলে মনে হতো না।অবশ্য না বুঝারই কথা।
বলটা মাঝেমধ্যেএসে ঝাঁপিয়ে পড়তো আমার উঠোনে।গেটের দরজা ঠেলে এসে ,সে বলটা নিয়ে যেতো।গেটে ঠুংটাং শব্দ হতো। আমার বিকেলের ভাত ঘুম ভেঙে যেতো। একদিন ছেলেটিকে বলি গেটে এভাবে শব্দ করিস না বাবা। আমার ঘুম ভেঙে যায়।ছেলেটির জবাব,মাফ করবেন জেঠু ,কত চেষ্টা করি।বলটা মারলে হঠাৎ হঠাৎ আপনার উঠোনে চলে যায়।একটাইযে আমার বল।আমি কি করি।আমি তাকে আর কিছুই বলিনি।বলতে পারিনি।
মনে মনে বলি,সাবাস বাবা সাবাস!বড়ো হলে নিজের বল মাঝেমধ্যে অন্যের কোর্টে চলে গেলেও নিয়ে আসতে পারবে তুমি।
দিন যতো গড়াচ্ছিল সুবোধবাবুর সাথে দূরত্বও
যেন ততই বাড়ছিল।
বলের মতোই মাঝেমধ্যে গড়াচ্ছিলেন তিনিও।গড়াতে গড়াতে একদিন টাল সামলাতে পারেননি।গাড়ির চাপা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন।অবশ্য বার কয়েক ধরেও এনেছেন বল।সহসা একদিন আমার পাশ থেকে চলে গেলেন অনেক দূর,বলের পিছু পিছু।বল ধরতেই পারছেন না।আমিও এগিয়ে যাচ্ছি না।
তিনি এখনও ধরতে পারেননি বল।আর ফেরতও আসেননি।অবশ্য এখন আর নিছক বলের পিছু নন তিনি।তার চোখের নিশানায় এখন সন্তানের ভবিষ্যত আর বলের মাঝের আলোআঁধারি।
শুনেছি,এখন তার গিন্নী গাঁয়ের পাড়ায়-- ফেরি করেন কাপড়।শিক্ষক ঘরণী।পাড়ার কৃষকঘরণীর পাশে তিনিও পেরে উঠেননি।শুনেছি লসে আছেন।
সুবোধ বাবু ই-রিকসা চালান।মাঝেমধ্যে দেখা হলেও মুখোমুখি হইনা।হতে পারিনা।তিনি আগে যেমন এরিয়ে যেতেন।আমিও যেন এখন তাকে এরিয়ে যাই।মুখোমুখি দাঁড়াতে পারিনা।দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে পারিনা সুবোধ বাবু আপনি কেমন আছেন?আমি জানি তিনি কেমন থাকতে পারেন!জেনেই তো খালাস আমি।আমি আর কী করতে পারি!
0 মন্তব্যসমূহ