ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ (১৪)হ্রস্ব-ই-দীর্ঘ-ঈ-র অন্তরালে // মানবর্দ্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
               (১৪)
♦হ্রস্ব-ই-দীর্ঘ-ঈ-র অন্তরালে♦

    
       হ্রস্ব-ই ও দীর্ঘ-ঈ 
       এবং এদের 'কার'
      ভাষা ও বানানে করে 
       অনেক উপকার।

অ এবং আ-এর বৃত্তান্ত জেনে ঐশী ও হিয়া বেশ খুশি বলে মনে হচ্ছে। আজ  ওরা এসেই দাদুভাইকে বলল, 
---- দাদুভাই, অ এবং আ-এর পর আজ কি আমাদের হ্রস্ব-ই-এর গল্প শোনাবে?
---- হ্যাঁ, আজ হ্রস্ব-ই-এর কথাই বলব। তবে আজ গল্পের শুরুটা করবে তোমরা দুজন মিলে। 
একথা শুনে ওরা দুজন একটু ভাবনায় পড়ে ইতস্তত করতে লাগল। আমাদের গল্পকথা কী করে যেন পৌঁছে গেছে খেলতে-থাকা রোদদূতের কানে! সে ছুটে এসে বলল,
---- আমি তো এখন হ্রস্ব-ই ও দীর্ঘ-ই লিখতে পারি। হ্রস্ব-ইতে ইঁদুর হয় আর দীর্ঘ-ঈ-তে ঈগল হয়।
একথা শুনে সবাই হেসে উঠল। আর দৌড়িয়ে চলে গেল সে।
 দাদুভাই ঐশী ও হিয়ার মনে সাহস যোগাতে গিয়ে বললেন,
----এই আসরের শুরুতেই আমরা স্বরধ্বনি ও বর্ণমালার গল্প বলেছিলাম। সেখানে হ্রস্ব-ই-এর প্রসঙ্গ এসেছিল। সেখান থেকেই শুরু কর। বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেললে একে অপরকে সাহায্য করবে।
এই বলে দাদুভাই ওদের মনে সাহস যোগালেন। ওরা বলতে শুরু করল,
---- হ্রস্ব-ই হল বাংলা স্বরবর্ণের তৃতীয় বর্ণ। এটি স্বরধ্বনি ই-এর প্রতীক বা ছবি। দীর্ঘ-ঈ হল এগারোটি স্বরবর্ণের মধ্যে চার নম্বর বর্ণ। এটি দীর্ঘ-ঈ ধ্বনিটির প্রতীক। এই দুটি স্বরবর্ণেরই 'কার' আছে। হ্রস্ব-ই-তে হ্রস্ব-ই-কার (ি) আর দীর্ঘ-ঈ-তে দীর্ঘ-ঈ-কার (ী)। দুটো 'কার'ই ব্যঞ্জনবর্ণের মাথার ওপর নতুন বউয়ের ঘোমটার মত থাকে। তবে হ্রস্ব-ই-কার থাকে ব্যঞ্জন বর্ণের বাম পাশে আর দীর্ঘ-ঈ-কার বসে ডান পাশে।
---- বেশ বেশ! চমৎকার হয়েছে।
একথা বলে দাদুভাই হাততালি দিয়ে ঐশী ও হিয়াকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন,
---- এই দুটি বর্ণ সম্পর্কে আরও কিছু কথা জানা দরকার। 
ইট/ঈগল, ইতি/ঈশ্বর, ইক্ষু/ঈক্ষণ(দেখা, দর্শন), ইতিহাস/ঈশিতা(আটটি ঐশ্বর্যের অন্যতম যা), কি/কী, ইচ্ছা/ঈপ্সা (পাওয়ার ইচ্ছা, অভিলাষ, আকাঙ্ক্ষা) ইত্যাদি শব্দের বানানে ভিন্নতা থাকলেও উচ্চারণে কোনও তফাৎ নেই। তবে একথা মনে রাখতে হবে যে, আবৃত্তি, অভিনয়ের সংলাপ, গানের সুরের বিস্তার এবং কথাবার্তার বাকভঙ্গিতে কখনও-কখনও দীর্ঘ-ঈ-কার যুক্ত শব্দ একটু টেনে বলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন, কী সুন্দর ফুল; কী চমৎকার জ্যোৎস্না! কিংবা যদি  রবীন্দ্রনাথের "দূরে কোথাও, দূরে দূরে" গানটি যখন শুনি তখন লক্ষ করব, 'দূরে' শব্দটি টেনে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে এব্যাপারটি যত-না দীর্ঘ-ঊ-কারের জন্য তার চেয়ে বেশি দূরত্ব ভাবটি বোঝানোর জন্য। 
---- আমরা রবীন্দ্রনাথের এই গানটি জানি দাদুভাই। সঞ্জীবকাক্কু ত্রিতাল সঙ্গীত নিকেতনে আমাদের শিখিয়েছেন। 
ঐশী এবং হিয়া দুজনেই একথা জানাল।
---- তা হলে তো বিষয়টি তোমরা ঠিকই বুঝতে পেরেছ। তাই এবার আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই।

হ্রস্ব-ই এবং দীর্ঘ-ঈ-- দুটো বর্ণকেই আমরা প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহার করি। তোমরা তো জান, প্রত্যয় সবসময় শব্দের মূল বা ক্রিয়ার মূলের শেষে যুক্ত হয়। এদের 'কার' দুটোও একই রকমভাবে শব্দ ও ক্রিয়ার মূলের শেষে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ ও ভাব প্রকাশ করে।

ব্যাকরণবিদরা প্রত্যয়কে অনেক রকমভাবে শ্রেণিবিভাগ করেছেন। প্রত্যয় প্রধানত দুই প্রকার :
★ কৃৎপ্রত্যয় 
★ তদ্ধিতপ্রত্যয়। 
সহজ কথায় ক্রিয়াপদের মূলের শেষে যুক্ত হলে তাকে কৃৎপ্রত্যয় এবং শব্দের মূলের শেষে যুক্ত হলে তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। 
কৃৎপ্রত্যয়কে আবার দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে :
★ সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় 
★ বাংলা কৃৎপ্রত্যয়। 
তৎসম বা সংস্কৃত শেষে প্রত্যয় যুক্ত হলে তাকে কৃৎপ্রত্যয় বলে। আর বাংলা বা অতৎসম (অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি) ক্রিয়ার মূলের সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হলে বাংলা কৃৎপ্রত্যয় বলে।

তবে তদ্ধিত প্রত্যয় তিন রকম :
★ সংস্কৃত তদ্ধিত
★ বাংলা তদ্ধিত ও
★বিদেশি তদ্ধিত। 
শব্দটি সংস্কৃত ভাষার হলে এবং এর মূলের পরে প্রত্যয় যুক্ত হলে তা সংস্কৃত তদ্ধিত। বাংলা শব্দের মূলের শেষে প্রত্যয় যুক্ত হলে তা বাংলা প্রত্যয় আর বিদেশি শব্দের মূলের শেষে প্রত্যয় যুক্ত হলে তা বিদেশি প্রত্যয়।
প্রত্যয় বুঝতে হলে শব্দটির আগাগোড়া, ভিতরবাহির ভাল করে চিনতে হবে। প্রথম চিনতে হবে শব্দটির মূল। অর্থাৎ সেটির মূল বা শিকড় ক্রিয়া না কি অন্য শব্দ। মূলটি ক্রিয়া হলে এর সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হলে তা অবশ্যই কৃৎপ্রত্যয়। শব্দটি বাংলা হলে তা তদ্ধিত প্রত্যয়। তবে বাংলা শব্দের মূলের সঙ্গে বিদেশি প্রত্যয়ও যুক্ত হতে পারে।  তবে তা হবে বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়।
এটুকু বলে দাদুভাই একটু দম নিলে ঐশী বলল,
---- দাদুভাই, দু-চারটি উদাহরণ না-দিলে তো আমাদের গোবর-মাথায় ভাল করে ঢুকবে না। হিয়াও একথায় মাথা নেড়ে সায় দিল।
---- আমিও সেকথাই ভাবছি। তাই এখন পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক প্রকারের দুটো করে উদাহরণ দিচ্ছি। 
★ সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় :
√কৃ+তব্য= কর্তব্য; √চল্+অন্ত= চলন্ত
★ বাংলা কৃৎপ্রত্যয় 
√হাস্+ই= হাসি; √ফাঁস্+ই= ফাঁসি
★ সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় :
মনু+ষ্ণ= মানব; কুসুম+ইত= কুসুমিত 
★ বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়:
ঢাক+ই= ঢাকি; চোর+আমি= চোরামি
★ বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় :
বাড়ি+ওয়ালা= বাড়িওয়ালা ; গাড়ি+ ওয়ান= গাড়োয়ান। 
মনে রাখতে হবে, ক্রিয়া বা শব্দের মূল অংশটিকে বাংলা ব্যাকরণে 'প্রকৃতি' বলে। আর মূল অংশটি যদি ক্রিয়াপ্রকৃতি/ক্রিয়ার মূল/ধাতু হয় তবে এর রুটওভার চিহ্ন (√) দিতে হয়। কিন্তু শব্দের মূল/শব্দপ্রকৃতি/ নামপ্রকৃতি হলে তা দেওয়ার দরকার নেই। অর্থাৎ সহজ কথায়, রুটওভার (√) চিহ্নটি থাকলে তা ক্রিয়ার মূল ও তাতে প্রত্যয় যুক্ত থাকলে কৃৎপ্রত্যয় হয়। তা না-থাকলে তদ্ধিত প্রত্যয় হবে। কৃৎপ্রত্যয় যুক্ত শব্দকে বলে 'কৃদন্তশব্দ' এবং তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত শব্দকে 'তদ্ধিতান্ত' শব্দ।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই প্রকৃতি ও প্রত্যয় সম্পর্কে তোমাদের কিছুটা ধারণা হয়েছে।
একথা বলে দাদুভাই ফ্লাস্ক থেকে রঙ চা কাপে ঢাললেন এবং ফতোয়ার পকেট থেকে চকলেট বের করে দুজনকে দিলেন।
চকলেট মুখে পুরে ওরা আজকের আসর শেষ ভেবে উঠি-উঠি করছিল। কিন্তু দাদুভাই চায়ে চুমুক দিতে-দিতে ওদের বসতে ইঙ্গিত দিলেন এবং আবার বলতে শুরু করলেন। 
---- দেখ, এতক্ষণ আমি প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের মূল কথাগুলো বললাম। কিন্তু হ্রস্ব-ই এবং দীর্ঘ-ঈ-এর আরও কারিগরির কথা বলা হয়নি। প্রত্যয় হিসেবে যেমন ব্যবহৃত হয় তেমনি অন্যান্য কাজেও লাগে। বাংলায় ক্রিয়াপদ তৈরিতে 'ই' বর্ণটি বিভক্তির কাজ করে। যেমন : √বল্+ই= বলি; √কর্+ই= করি; √আছ্+ই= আছি।
তা ছাড়া কথায় জোর দেবার জন্যও আমরা শব্দের 'ই' যোগ করি। যেমন : আমরাই যাব। তারা খেলবেই। এই করোনাকালে তোমরা বেশ ভালই তো আছ।
এখানে লক্ষ কর, প্রথম বাক্যে সর্বনামপদে, দ্বিতীয় বাক্যে ক্রিয়াপদে এবং  তৃতীয় বাক্যে বিশেষণপদে 'ই' যুক্ত করে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।  

'ই' ধ্বনিটি আমরা বাকভঙ্গিতে অনিচ্ছা, অস্বীকৃতি বা না-বোধক ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করি। মনে  কর, তোমার বাবা এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে গোল্ডপ্লেটের একটি নেকলেস্ কিনে দিয়েছেন। তোমার ছোট বোন সেটি চাইল। তুমি বললে,
---- ই------ সখ কত!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ