ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ (১৫) শব্দের মূল ও ক্রিয়ার মূল// মানবর্দ্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                   (১৫) 
   ♦শব্দের মূল ও ক্রিয়ার মূল♦


আজ আসরে বসে ওরাই কথা শুরু করল। ওরা মানে ঐশী ও হিয়া 
---- দাদুভাই, গত দু-তিন দিন ধরে তুমি যে মাঝেমধ্যে শব্দের মূল আর ক্রিয়ার মূলের কথা বলছ তা তো ঠিকমত বুঝতে পারছি না! একটু ভাল করে ভেঙে বুঝিয়ে দাও না দাদুভাই! ঐশী বলল।
একই সঙ্গে হিয়াও বলল,
---- 'মূল' জিনিসটা  কী তা-ই তো ঠিকমত বুঝতে পারছি না! 
---- শীতকালে মুলা তো ঠিকই খাও। সবজি হিসেবে খাও, সালাদ হিসেবেও খাও। কিন্তু মূল চিনতে পার না! মূল থেকেই তো 'মুলা' শব্দের উৎপত্তি। 
ঠাট্টার ছলে দাদুভাই দুই নাতনিকে একথা বললেন।
---- মুলা তো ভাল করেই চিনি। কিন্তু সবজি মুলার সঙ্গে ক্রিয়া ও শব্দের মূলের সম্পর্ক আবার এল কীভাবে? সব তো নিউরনের এ্যান্টেনার এপর দিয়েই যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছি না! হেঁয়ালি ছেড়ে সহজ করে বল তো দাদুভাই। 
 হিয়া অবাক হয়ে বলল।
দাদুভাই দুজনের চোখে-মুখে প্রশ্নের পাহাড় দেখে বললেন,
---- একটু ভেবে দেখ, এই পৃথিবীতে, এই বস্তুজগতে যত জিনিস আছে তার সবকিছুরই মূল আছে। 'মূল' শব্দটির মানে হল : গোড়া, শিকড়, উৎস, আসল, উৎপত্তিস্থল, সৃষ্টির স্থান। 
গাছের যেমন শিকড় বা গোড়া আছে তেমনই বস্তুজগতের সবকিছুর শিকড় বা গোড়া আছে। সেটি যে আসল বস্তু তা বোঝা খুব সহজ। গাছের দু-চারটা ডাল কাটলে কিছুই হয় না! কিন্তু গোড়া কেটে দিলে গাছ মরে যায়।

সবকিছুর গোড়াটি জানতে হয়, মূল জিনিসটি চিনতে হয়। শিকড়টি ভাল করে না-চিনলে জানা-বোঝা পরিপূর্ণ হয় না। মনে কর, আমরা যে জামাকামিজ পরেছি কিংবা দালানে বাস করছি-- এর উৎস কী? জামাপ্যান্ট তৈরি হয়েছে কাপড় থেকে। কাপড় তৈরি হয়েছে সুতা থেকে। সুতা এসেছে তুলা থেকে। আর তুলার মূল উৎস গাছ। এই দালানের উৎস হল মূলত মাটি। কারণ, বালু এক প্রকার মাটি, ইটও তৈরি মাটি পুড়িয়ে। আর সিমেন্ট তো ক্যামিকেল যুক্ত মাটিই। এজন্যে সাধারণ মানুষ এবং আমাদের দাদা-নানার বয়সীরা এখনও সিমেন্টকে 'বিলাতি মাটি' বলে।  এভাবে আমরা প্রতিটি বস্তুর মূল চিনতে পারি।

তোমরা তো বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা কর। বিজ্ঞানও কিন্তু একই কথা বলে। বিজ্ঞানে মৌলিক পদার্থ বলে একটি কথা আছে। এই মৌলিক পদার্থের সংখ্যা মাত্র একশ' আঠারোটি। অথচ পৃথিবীতে বস্তু আছে লক্ষকোটি। এর সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা যাবে না! বিশ্বসংসারে এত অগণিত বস্তু সৃষ্টি  হয়েছে এই মৌলিকগুলো দিয়ে। এগুলোর একটির সঙ্গে অপরটির কিংবা দুইয়ের বেশির মিশ্রণের ফলে। মৌলিক শব্দের মতই অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন মৌলিক পদার্থ। আবার এক ভাগ অক্সিজেনের সঙ্গে দুই  ভাগ হাইড্রোজেনের মিশ্রণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে জল। এরকমভাবে তিন-চারটি মৌলিক পদার্থের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে যৌগিক পদার্থ-- মানে বিশ্বের সমস্ত বস্তুজগত। ঠিক এভাবেই কোনও মৌলিক শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দ বা অন্যকিছু যোগ করে সৃষ্টি হয় সাধিত শব্দ। রসায়নশাস্ত্রে যা যৌগিক পদার্থ তা-ই  ভাষাবিজ্ঞানে সাধিত শব্দ। সাধিত শব্দ মানে হল তৈরি করা শব্দ। আরেক দিন না-হয় তোমাদের সাধিত শব্দের গল্প বলব।

ভাষার শব্দসৃষ্টির রহস্যও এরকম। শব্দেরও শিকড় আছে-- উৎসমুখ আছে। তাকেই বলা হয় মূল। বাংলা ভাষায় যত শব্দ আছে-- হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বড় আকৃতির অভিধানে যত শব্দ পাওয়া যায় তার সবগুলোরই মূল আছে-- কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। শব্দের এই মূলকে খুঁজে বের করতে হয়। ভাষাবিজ্ঞানীরা শব্দ বিশ্লেষণ করে তা আমাদের জানান।

ভাষাবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন, মূল দুই রকমের। ক্রিয়ার মূল ও শব্দের মূল। গাছের মূল আছে কিন্তু সব গাছের মূল একরকম নয়। তোমরা লক্ষ করবে, আম-জাম-কাঁঠাল গাছের মূল একরকম আর নারিকেল-সুপারি-তাল গাছের মূল আরেক রকম। তাই গাছপালা নিয়ে যারা গবেষণা করেন, সেই উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা গাছের মূলকে নানাভাবে ভাগ করেছেন। নাম দিয়েছেন, স্তম্ভমূল, ঠেসমূল, শ্বাসমূল, ভাসমান মূল-- ইত্যাদি আরও কত কী! তোমরা তো উদ্ভিদবিজ্ঞানে সেগুলো পড়। ঠিক এভাবে ভাষাবিজ্ঞানীরাও মূল নির্ণয় করেছেন। তারা লক্ষ করেছেন, ক্রিয়াপদের মূলগুলোর রূপ বা চেহারা একরকম আর অন্যান্য শব্দের মূল অন্য রকম। এই দুই প্রকার মূলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল-- ক্রিয়ার মূলের অর্থ নেই কিন্তু শব্দের মূলের অর্থ আছে।

লক্ষ করলে বোঝা যায়, শব্দ বা ক্রিয়ার মূল অংশটি আচ্ছাদিত বা ঢাকনা দেওয়া অবস্থায় থাকে। এর রূপটি অনেকটা সুগার কোটেড ক্যাপসুলের মত। আরও সহজ করে বললে যেকোনও ফল বা সবজির বীজের মত। মনে কর নারিকেল নামক ফলটির কথা। এর ওপরে থাকে একটি ছোবলার ভারি আবরণ! তার ভেতরে শক্ত কাঠজাতীয় আচ্ছাদন। এদুটি ভেদ করলে পাওয়া যায় সুমিষ্ট জল ও সুস্বাদু শাঁস! নারিকেলের মতই শব্দ বা ক্রিয়াপদের নীরস বাকল ছাড়ালেই এর মূল পাওয়া যায়। লক্ষ করবে, সবখানেই মূল বস্তুটি থাকে গোপনে এবং আড়ালে। গাছের শিকড়ও থাকে সাধারণত মাটির গভীরে-- চোখের আড়ালে। আমরা মানিব্যাগে যখন টাকা রাখি তখন খুচরোগুলো সামনে থাকে কিন্তু হাজার টাকার নোটটি সযত্নে থাকে গোপন পকেটে। কী বল তোমরা?

এতক্ষণ ঐশী ও হিয়া মন্ত্রমুগ্ধের মত দাদুভাইয়ের কথা শুনছিল। দাদুভাই একটু থামায় হিয়া বলল,
---- আমরা শব্দের খোসাগুলো ছাড়াব কী করে? আর কীভাবে বুঝব, কোনটা খোসা কোনটা শাঁস?
---- খোসা আবার কীভাবে ছাড়াবে-- পেঁয়াজ-রসুনের খোসা যেভাবে ছাড়ায় সেভাবে! খোসা ছাড়িয়ে আম-কলা খেতে পার আর শব্দের খোসা ছাড়াতে পারবে না? 
দাদুভাই একটু ঠাট্টা-তামাশার মাধ্যমে গুরুগম্ভীর পরিবেশটা হালকা করলেন। ঐশী ও হিয়ার মনোযোগ ফিরিয়ে এনে আবার কথা শুরু করলেন,
---- শব্দ নিয়ে চিন্তা ও চর্চা করলে তোমরাও শব্দকে বিশ্লেষণ করে এর মূল বের করতে পারবে। এটা তেমন কোনও কঠিন কাজ নয়। শব্দের শেকড়টি কোথায় লুকিয়ে আছে তা খুঁজে বের করতে হয়। যেমন ধর একটি শব্দ 'অনতিদূরে'। এটির মূল আমরা খুঁজে বের করব। এই শব্দটি ভাঙলে বা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় : অন+অতি+দূর+এ= অনতিদূরে। এখানে প্রথম দুটি অংশ 'অন' এবং 'অতি' উপসর্গ হিসেবে মূল শব্দের সামনে যুক্ত আছে। তৃতীয় অংশটি 'দূর' মূল শব্দ। শেষের অংশটি 'এ' বিভক্তির চিহ্ন। এভাবে সাধিত শব্দকে বিশ্লেষণ করতে হয়। ক্রিয়ার মূল  নির্ণয়ের পদ্ধতিও একই রকম। যেমন-- √কর+অনীয়= করণীয়। এখানে 'কর' ক্রিয়ার মূল বা ধাতু বা ক্রিয়াপ্রকৃতি। আর 'অনীয়' হল প্রত্যয়।

তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, একটি বিষয়েরই তিনটি নাম! এরকম শব্দের যে মূল, তারও তিন নাম-- শব্দমূল, নামশব্দ ও শব্দপ্রকৃতি।
আমার মনে হয় কি জান? বাংলা ব্যাকরণের প্রকৃতি-প্রত্যয় বিষয়টি ভাষাবিজ্ঞানীরা খুব ভালবাসেন। আমরা যেমন অতিআদরের শিশুকে মা এক নাম ধরে, বাবা আরেক নাম ধরে, দিদা অন্য নামে ডাকে-- ঠিক তেমনই। আমি জানি, তোমাদেরও প্রত্যেকের তিন-চারটি করে নাম! 

একথা শুনে ওরা হেসে উঠল। ঐশী বলল,
---- আমাদের তো দু-তিনটি করে নাম।একটি ডাকনাম, একটি স্কুলের খাতায় ভাল নাম আর বন্ধুদের দেওয়া  এক নাম। কিন্তু মেঘদূত ও রোদদূতের তো চারটি করে নাম : অনম, গান, শাস্ত্রজিত এবং মেঘদূত। আর গল্প, তুলতুলি, শুদ্ধজিত ও রোদদূত। 
একথা শুনে দাদুভাই হেসে বললেন,
---- শিশুকালে আমাদের সবারই বোধ করি অনেকগুলো নাম থাকে। বড় হলে তা ফুলের মত ঝরে যায়। টিকে থাকে একটি-- বড় জোর দুটি-- ডাকনাম ও সনদি নাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ