ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ(১৩)বহুরূপী-- আ // মানবর্ন্ধন পাল

#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                    (১৩)
          ♣বহুরূপী-- আ♣
    
    অ-এর মত আ-এরও আছে
     অনেক রূপের ভাষার গুণ 
     আ-এর ভেতর লুকিয়ে আছে 
     কত ভাব ও অর্থের  আগুন।

 দাদুভাই আজ নিজের জীবনযাপনের কথা দিয়ে গল্পের আসর শুরু করলেন। তিনি বললেন,
---- রাতে ঘুমাতে আমার দুইটা-আড়াইটা বেজে যায় বলে ঠিক ভোরে উঠতে পারি না! সূর্যোদয় দেখা প্রায় হয়েই ওঠে না! আমার ঘুম ভাঙে তোমাদের দুজনের  গলাসাধা এবং হারমোনিয়ামের আওয়াজে-- হিয়া ও ঐশীর দিকে তাকিয়ে দাদুভাই একথা বললেন।
ওরা হারমোনিয়াম দিয়ে গলা-সাধার দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সুরে, তালে ও মাত্রায় 'আ' ধ্বনিটি উচ্চারণ করে। কখনও এক মাত্রায় লম্বা করে টেনে -------------,  কখনও দু-মাত্রায়--আ-আ, আ-আ, কখনও তিন মাত্রায়-- আ-আ-আ, আ-আ-আ, কখনও চার মাত্রায়-- আ-আ-আ-আ, আ-আ-আ- আ আবার কখনও পাঁচ মাত্রায়-- আ-আ-আ-আ- আ, আ-আ-আ-আ-আ।
ঐশী আর হিয়ার হাতে এখন অনেক সময়। এই করোনাকালে স্কুল বন্ধ। বন্ধ গানের ক্লাসও। কিন্তু ওরা ভোরে নিয়মিত গলাসাধে।
দাদুভাই গলা-সাধার কাজে এই 'আ' ধ্বনিটির কার্যকরিতার কথা উল্লেখ করে আজ বর্ণমালার গল্পের আসর শুরু করলেন। তিনি বললেন,
---- দেখ, সুর ও সঙ্গীতের জগতেও বর্ণমালার 'আ' ধ্বনিটি কত গুরুত্বপূর্ণ। সারেগামার পরিবর্তে 'আ' ধ্বনিটি 'তান' করতে ব্যবহার করা হয়। গান শেখার প্রাথমিক পর্যায়ে গলার স্বরকে সুরে-ছন্দে-তালে সুযোগ্য করে তুলতে এই 'আ' ধ্বনিটি কত অপরিহার্য।  বাংলা ভাষায় এই ধ্বনিটির আরও অনেক রূপ! এর কারিগরি ও কারসাজির শেষ নেই! তাই এই ধ্বনিটির বহু রূপের কথা আজ তোমাদের বলি। সব কথা হয়তো এখনই সবাই ভালভাবে বুঝতে না-পারলেও অনেকটাই বুঝবে। কোথাও বুঝতে সমস্যা হলে বলবে অবশ্যই।

 আ-কে বর্ণমালার দ্বিতীয় বর্ণ বলেই জানি। আ-স্বরধ্বনিটির চোখে-দেখা রূপ এটি। বলা যায় এর মূর্তিমান ছবি বা স্বরূপ। ব্যাকরণের পণ্ডিতরা স্বরবর্ণের ওই চেহারাকে বলেছেন প্রতীক। এর স্বরচিহ্নকেও আমরা জানি আ-কার (া) বলে। এই ধ্বনিটির আরেকটি রূপ কান্নার শব্দের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে। শিশুরা যখন মায়ের বকুনি খেয়ে কাঁদে তখন এই 'আ' ধ্বনিটি বিচিত্র রূপে শোনা যায়। আমরা সবাই শৈশবে জেদমর্জি করে 'আ' বা 'অ্যা' ধ্বনি উচ্চারণ করে ম্যারাথন কান্না করেছি।এমন কান্নায় যত না-থাকে চোখের জল তার চেয়ে বেশি থাকে চীৎকার!
দাদুভাইয়ের একথা শুনে শিশুকালের কথা মনে করে সবাই মুচকি হাসল।

একটু থেমে দাদুভাই এবার বললেন,
---- কেবল সুরের সাধনা কিংবা শিশুদের কান্নার শব্দেই 'আ' ধ্বনিটির ব্যবহার হয় না। আরও অনেক রকম অর্থে আমরা এটি কাজে লাগাই। ওই বর্ণটিকে আমরা অব্যয় পদ হিসেবেও ব্যবহার করি। বর্ণ যখন 'শব্দ' হয়ে যায় তখন এর অর্থ থাকে। আর 'শব্দ' কথা বা বাক্যের মধ্যে থাকলে তা ব্যাকরণের ভাষায় 'পদ' হয়। এরকম শব্দ বা পদ হিসেবেও আমরা 'আ'-কে ব্যবহার করি।
'আ'-কে 'পদ' হিসেবে আনন্দ প্রকাশ করতেও আমরা ব্যবহার করি।  মাতৃভাষার প্রশংসা করে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় একটি গান লিখেছেন। জনপ্রিয় ও ভাষাপ্রেমের এই গানটি মাতৃভাষা দিবসে তোমরা সবাই গাও। আমরা যারা গাইতে পারি না তারাও কণ্ঠ মেলাতে চেষ্টা করি কিংবা ঠোঁট নাড়ি। "মোদের গরব মোদের আশা 
 আ মরি বাংলা ভাষা।"
এখানে 'আ' শব্দটি কবি বাংলা ভাষার গৌরবে আনন্দ প্রকাশ করতে ব্যবহার করেছেন। কিংবা তোমরা যখন গরমের দিনে ক্লান্ত হয়ে স্কুল থেকে ফিরে এসি-রুমে বস তখন মুখে আপনি ফুটে ওঠে-- আ কী আরাম! এটাও সুখবোধ ও আনন্দেরই প্রকাশ।

একথাগুলো বলার সময় দাদুভাই লক্ষ করলেন, শুভ ও কাব্য একটু উসখুস্ করছে। মনে হয় ওরা আজ ঠিক বুঝতে পারছে না। তাই আজ দাদুভাই ওদের ছুটি দিয়ে দিলেন। এবার ঐশী ও হিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
---- অস্কার পুরস্কার-পাওয়া বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের "হীরক রাজার দেশে" ছবিটি তোমরা দেখেছ। তাতে একটি জনপ্রিয় গান আছে : "আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।" আনন্দের প্রকাশ হিসেবে এই 'আহা' অব্যয় পদটির সংক্ষিপ্ত রূপ 'আ'-- আহা>আহ্>আ।

আবার দুঃখ-বেদনা-ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্যও আমরা 'আ' অব্যয়টি ব্যবহার করি। যেমন-- আ কী যন্ত্রণা! আ কী বিপদ! কিংবা রবীন্দ্রনাথ যখন গল্পের চরিত্রের সংলাপে বলেন-- "আ মরিয়া যাই! সোনা আমার, তোর কাকীমাকে এখনো ভুলিস্ নাই।" তখন একসঙ্গে বিস্ময় ও আনন্দের প্রকাশ ঘটে। কিংবা "আ মরণ আর কি?" "আ মরণ! পোড়াকপালি বলে কী!" রবীন্দ্রনাথের এই বাক্য দুটিতে ঘৃণা, লজ্জা ও রাগের সঙ্গে কটূক্তির ভাব প্রকাশ পেয়েছে। 

প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা ভাষায় এই 'আ' শব্দটি আরও বিভিন্নভাবে প্রয়োগ হত। বড় হয়ে যদি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স পড় তা হলে সেসব জানতে পারবে। তবে আ-এর বহু বিচিত্র রূপের মধ্যে এখন আরও দুয়েকটা বিষয় জানা দরকার। 

---- 'আ' বর্ণটি একটি উপসর্গও। পদের বিচারে উপসর্গ একধরণের অব্যয় পদ। তোমরা জান, আগেই বলেছি-- উপসর্গের কোনও অর্থ নেই এবং তা শব্দের পূর্বে বা শুরুতে বসে সেই শব্দটির অর্থ পরিবর্তন করে। অর্থাৎ উপসর্গগুলো যেন মসলার কাজ করে। মাছ-মাংসে ভিন্ন-ভিন্ন মসলা দিলে যেমন আলাদা-আলাদা স্বাদ হয় তেমনই একেকটি উপসর্গের গুণে শব্দ বা ক্রিয়ার মূল নতুন অর্থ ধারণ করে। একারণেই ব্যাকরণবিদরা বলেন, উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু এর অর্থদ্যোতকতা আছে।
একথা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই ঐশী বলল,
---- হ্যাঁ দাদুভাই, একথা আমাদের ব্যাকরণ বইতেও উপসর্গ অধ্যায়ে লেখা আছে। কিন্তু কথাটির অর্থ আমরা বুঝিনি। অর্থবাচকতা কী আর  অর্থদ্যোতকতাই বা কী?
---- কেন, ক্লাসে সুধীরস্যারকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে! তিনি সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন।
---- ওরে বাপরে! সুধীরস্যারের যা রাগ! একেবারে সাপের মত ফোঁস করে উঠে আগের অধ্যায় থেকে দুচারটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসবেন। তখন তো কেল্লা ফতে! না-পারলে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেবেন। তুমি একটু সহজ করে বুঝিয়ে দাও না দাদুভাই!
ঐশীর কণ্ঠে বিনয় এবং কাতরতা।

দাদুভাই ঐশীর চোখেমুখে বিরক্তি ও বিষাদের ছায়া লক্ষ করে বললেন,
---- ওই-যে রান্নার কথা বললাম, সেরকম। একই জিনিস বিভিন্ন মসলায় বিভিন্ন স্বাদ হয়-- ব্যাপারটি ঠিক সেরকমই। 
মনে কর দুধের কথা। এর একটি স্বাদ আছে। সেটিই মূল বা আসল স্বাদ।
কিন্তু এই দুধকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দই, ছানা, ক্ষীর, সন্দেশ, পায়েশ ও বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি বানানো যায়। সেসব  তৈরি করতে গেলে টুকটাক কিছু জিনিস মেশাতে হয়। যেমন দই বানাতে পুরনো দইয়ের 'বীজ' লাগে, মিষ্টি বানাতে ময়দা বা খাবার সোডা লাগে-- এরকম আর কি! অলংকার তৈরিতেও সোনায় পাইনের খাদ মেশাতে হয়! অর্থহীন কিন্তু প্রয়োজনীয় সেই খাদের মত জিনিসটাই বাংলা ভাষায় প্রত্যয় এবং উপসর্গ। এই উপসর্গ এবং প্রত্যয়ের বড় কাজ হল শব্দের মূল বা ক্রিয়ার মূলকে নতুন-নতুন অর্থে প্রকাশ করা। একটি উদাহরণ লক্ষ কর :
√লপ্+অ= লাপ। (প্রত্যয়যুক্ত)। 'লাপ' মানে কথা।
আ+লাপ= আলাপ (কথাবার্তা)
প্র+লাপ= প্রলাপ (অর্থহীন কথা)
বি+লাপ= বিলাপ (কান্নাযুক্ত দুঃখের কথা)
অপ+লাপ=অপলাপ (বাজে কথা)।
এই উদাহরণ গুলোতে আ, প্র, বি এবং অপ হল উপসর্গ। আলাদা বা স্বাধীনভাবে এগুলোর কোনও অর্থ নেই! কিন্তু যেই অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত  হল তখনই প্রকাশিত হল নতুন-নতুন অর্থ। খুব মজার ব্যাপার তাই না? ঐশী ও হিয়ার চোখেমুখে বিদ্যুৎ চমকের মত হাসির রেখা ফুটে উঠল।

একটু থেমে দাদুভাই আবার বললেন,
---- তোমরা দুজনই তো বিজ্ঞানের ছাত্রী। ব্যাকরণও কিন্তু বিজ্ঞান-- ভাষা বিষয়ের বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করে যদি বলি তা হলে বলা যায়, উপসর্গ ও প্রত্যয় হল অক্সিজেনের মত। তোমরা জান, অক্সিজেনের ধর্ম হল, নিজে জ্বলে না কিন্তু অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে। ঠিক সেরকম উপসর্গ ও প্রত্যয়ের নিজস্ব কোনও অর্থ নেই কিন্তু অন্য শব্দকে নতুন অর্থ দান করে। তাই ব্যাকরণের পণ্ডিতেরা বলেছেন, "উপসর্গের কোনও অর্থবাচকতা নেই কিন্তু  অর্থদ্যোতক আছে।' তাহলে 'অর্থবাচকতা' হল শব্দের সরাসরি অর্থ আর 'অর্থদ্যোতকতা' হল অর্থপ্রকাশের গুণ বা শক্তি যার ভেতরে আছে। 'আ' তেমনই একটি উপসর্গ। এর আলাদা এবং নিজস্ব অর্থ না-থাকলেও এর অন্তর্নিহিত গুণ বা শক্তিতে শব্দের মূল বা ক্রিয়ার মূলকে নতুন অর্থ দান করে।

লক্ষ কর, 'আ'-উপসর্গটি ক্রিয়ার মূল ও শব্দের মূলের আগে এভাবে যুক্ত হতে পারে। যেমন : √কর্+আ= করা; √ধর্+আ= ধরা; √মার্+আ= মারা; √পড়্+আ= পড়া। এগুলো হল ক্রিয়ার মূলের সঙ্গে 'আ' প্রত্যয় যুক্তকরা ক্রিয়াপদ। ঐশী ও হিয়া শোন। তোমরা যখন রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানটি গাও-- " পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে" কিংবা প্রেমের গান "তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে-আসা ধন" তখন ওই 'পাগলা' শব্দ ও 'আসা' ক্রিয়াপদের মধ্যে তো 'আ' প্রত্যয়ই লাগানো আছে।

কত বিচিত্র অর্থে-যে আমরা 'আ' প্রত্যয় ব্যবহার করি তার ইয়ত্তা নেই! আদর করে বলি-- পাগলা ছেলে, চোরা মনা, ছোঁচা মেয়ে। বিরাট বা বড় অর্থে বলি, বাঘা পণ্ডিত। নিন্দার্থে বলি, রোগা ছেলে। উজ্জ্বল অর্থে--  ঝকঝকা রোদ। কম অর্থে-- টিমটিমা আলো। অবস্থা বোঝাতে-- মেঘলা আকাশ, জলা ভূমি, জঙ্গলা বাড়ি-- এরকম আরও কত কী! বাংলা ভাষায় 'আ' নিয়ে আলাপন যেন অন্তহীন!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ