#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (০৩) ♣ধ্বনি ও বর্ণ যমজ ভাই♣ // মানবর্ন্ধন পাল

#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                 (০৩)
  ♣ধ্বনি ও বর্ণ যমজ ভাই♣


বয়সে চার-পাঁচ বছরের তফাৎ হলেও মেঘ-রোদের খেলার প্রিয় সাথি শুভ ও কাব্য। আজ ন-টা বাজতে না-বাজতেই রোদদূত জানালায় মুখ গলিয়ে ডাকতে শুরু করেছে :
--- শুভদা, কাব্যদা! দাদুভাই বর্ণমালার গল্প বলবে। তোমরা শুনবে? শুনতে চাইলে তাড়াতাড়ি চলে এস।
জানালায় মুখ বাড়িয়ে ওদের জবাব : --- আসছি। শুনব।
শুভ : দাদুভাই তো আমাদের ঘরে আসতে দেবে না। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনব।
মেঘ : দাদুভাই বলেছে, মাস্ক পরে এলে আর দূরে-দূরে বসলে তোমরা সবাই ঘরে আসতে পারবে।
একথা শুনে শুভ ও কাব্য দৌড়ে গিয়ে বাসা থেকে মাস্ক নিয়ে এল। ইতোমধ্যে দিদন বসার ঘরের মেঝেতে বড় একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়েছেন। এই ফাঁকে রোদদূত দাদুভাইকে পাঞ্জাবির কোনা ধরে টেনে আনতে- আনতে বলল :
--- এই দেখ, কারা তোমার গল্প শুনতে এসেছে! 
দাদুভাই সবাইকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে তিন ফুট দূরে-দূরে বসতে বললেন। নিজে বসলেন এক কোনায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। 

--- আজ তোমাদের একটি ধাঁধা বলব। দেখি কে উত্তর দিতে পার!
"পঞ্চাশ সংখ্যাটিতে অর্ধশত হয়
এ-পঞ্চাশে করতে পারি বিশ্বসভা জয়।"--- কেউ তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল না বলে দাদুভাই ধাঁধাটা আবার বললেন।
এই ফাঁকে দুজনের দুই ছোট ভাইকে খুঁজতে গিয়ে ঐশী এবং হিয়াও এসে হাজির। ঐশী এইটে আর হিয়া নাইনে উঠেছে এবার। একই স্কুলে পড়ে ওরা। ওরাও বসে পড়ল পেছনে। কিন্তু কেউ এই ধাঁধাটির জবাব দিতে পারল না!
পঞ্চাশ দিয়ে আবার কীভাবে বিশ্বজয় করা যায়! সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
দাদুভাই ওদের কঠিন ভাবনা সহজ করে দিয়ে বাংলা বর্ণমালার সংখ্যার কথা বলতেই ঐশী ও হিয়ার চোখ খুলে গেল। তারপর একে-একে সবাই বুঝে গেল আমাদের প্রাণপ্রিয় ভাষার পঞ্চাশটি বর্ণের কথা। এই বর্ণমালায় লিখে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়ে জয় করেছিলেন বিশ্বসভা। এই বর্ণমালার বাক্যে বঙ্গবন্ধু প্রথম বক্তৃতা  দিয়েছেন জাতিসংঘে। এই বর্ণমালার মানরক্ষার জন্য ১৯৫২ সনে প্রাণ দিয়েছেন রফিক-শফিক-জব্বারেরা। এই রক্তমাখা বর্ণমালার গৌরবের জন্যই আজকের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এসবই তো আমাদের মাতৃভাষার পঞ্চাশটি বর্ণমালার অহংকার। তা-ই না?
একথা শুনে সবাই মাথা নাড়ল।

 এদিকে মেঘদূত রোদদূতের ওপর মাস্টারি করতে ব্যস্ত। কখনও হালকা করে লিখে, কখনও হাত ধরে ওকে 'অ' বর্ণটি শেখাতে চেষ্টা করছে। আর খুনসুটি তো আছেই।
 এ-আসরের একমাত্র রোদদূত ছাড়া আর সবাই জানে বাংলা বর্ণমালা দুভাগে বিভক্ত এবং তা পঞ্চাশটি।
★ স্বরবর্ণ  ★ ব্যঞ্জনবর্ণ
স্বরবর্ণের সংখ্যা ১১টি আর ব্যঞ্জন ৩৯ টি। কিন্তু তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, স্বর ও ব্যঞ্জন শব্দ দুটির সাথে কখনও 'ধ্বনি' আবার কখনও 'বর্ণ' শব্দ যুক্ত থাকে। অর্থাৎ বইয়ে কখনও লেখা হয় স্বরধ্বনি বা স্বরবর্ণ আবার কখনও লেখা হয় ব্যঞ্জনধ্বনি বা ব্যঞ্জনবর্ণ। তোমরা কি এটি লক্ষ করেছ?
--- হ্যাঁ দাদুভাই। আমাদের ব্যাকরণ বইয়ে স্বর বা ব্যঞ্জন শব্দের শেষে কখনও 'ধ্বনি' কখনও 'বর্ণ' শব্দটি গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে!
শুভ, কাব্য, ঐশী, হিয়া সবাই একবাক্যে একথা স্বীকার করল। কাব্য জিজ্ঞেস করল,
--- এরকম কেন দাদুভাই?
--- শোন। বাংলাভাষায় উচ্চারণ এক কিন্তু বানান ভিন্ন-- এরকম অনেক শব্দ আছে। যেমন ওই শব্দটি আমরা এভাবে লিখতে পারি : ধনি, ধনী ও ধ্বনি। এই তিনটি শব্দই শুদ্ধ কিন্তু  অর্থ আলাদা। অথচ বললে এবং শুনলে শব্দগুলো একরকম।
ধনি = বালিকা, সুন্দরী নারী।
ধনী = যার অনেক ধনদৌলত আছে। 
ধ্বনি = শব্দ; মুখ থেকে বের হওয়া শব্দের ছোট্ট অংশ। তবে 'ধ্বনি' বলতে রব বা ইংরেজিতে সাউন্ডও বোঝায়।
সহজ কথায় ভাষার গল্পে ধ্বনি বলতে  মুখ থেকে বের হওয়া শব্দের ছোট্ট অংশগুলোই বোঝায়। যখন আমরা কেবলই শুনি তখন তা ধ্বনি। অর্থাৎ ধ্বনি শুধু শোনা যায়-- দেখা যায় না। তাই ধ্বনি শ্রুতিগ্রাহ্য। আর বর্ণ কেবল দেখা যায় কিন্তু শোনা যায় না। অন্যভাবে বলতে পারি, ধ্বনি পড়া যায় না, ছোঁয়াও যায় না কিন্তু বর্ণ পড়া ও ছোঁয়া যায়। ধ্বনি ও বর্ণ দুইই অনুভবের-- প্রথমটি কান দিয়ে, পরেরটি চোখ দিয়ে অনুভব করতে হয়। তাই তুলনা দিয়ে বলা যায়, ধ্বনি হল রেডিয়োর মত যাতে গান-বাজনা-খবর শোনা যায়। কিন্তু  দেখা যায় না। আর বর্ণ হল টিভির মত। টেলিভিশনের শব্দ মিউট করে রাখলে যেমন শুধু দেখা যায় কিন্তু  কিছুই শোনা যায় না-- তেমন। তাই বর্ণ হল দৃষ্টিগ্রাহ্য বা দৃশ্যমান। 
এজন্য বর্ণ ও বর্ণমালার গল্প বলার আগে 'ধ্বনি' এবং 'বর্ণ' শব্দদুটির  
মর্মার্থ ভালভাবে বুঝে নেওয়া দরকার।
দাদুভাই দেখলেন, ততক্ষণে বাঁকাত্যাড়া হলেও রোদদূত 'অ' বর্ণটি মোটামুটি লিখতে শিখে গেছে। এই মুহূর্তে মেঘ-রোদের মা দাদুভাইয়ের জন্য চা আর সবার নাস্তা নিয়ে এসেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ