♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (০২) ♣বর্ণ ও বর্ণমালা♣ //মানবর্দ্ধন পাল


♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
              (০২)
       ♣বর্ণ ও বর্ণমালা♣

দাদুভাই জানালার ধারে খাটের ওপর বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। সকালের নাস্তা খেয়ে মেঘ ও রোদ এসে বলল,
--- দাদুভাই, কাল তুমি-না বলেছিলে আমাদের বর্ণমালার গল্প শোনাবে! কই শোনাও!
শিশু এবং পিঠাপিঠিদের ওই এক স্বভাব! বড়টি যা বলে ছোট তার প্রতিটি শব্দের প্রতিধ্বনি করে। এভাবে দুজনেই ভাঙা রেকর্ডের মত বলল একই কথা।
দাদুভাই পত্রিকার পাতা থেকে ওদের দিকে চোখ তুলে মুচকি হেসে বললেন, --- হ্যাঁ, শোনাব তো।
--- তাহলে শোনাও।
--- মাকে গিয়ে বল তোমাদের বইয়ের ব্যাগ দিতে।
একদৌড়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ওরা স্কুলব্যাগ নিয়ে হাজির। দাদুভাই রোদের ব্যাগ খুলে ওর স্লেট-পেন্সিল, বই ও মেঘের ব্যাগ থেকে খাতা-কলম  বের করে সামনে রাখলেন।
পড়ার প্রস্তুতি আঁচ করতে পেরে মন খারাপ করে মেঘ বলল,
--- দাদুভাই, গল্প শুনতে কি খাতা-কলম লাগে?
বর্ণমালা কি কোনো ফুলপরীর নাম, দাদুভাই? --- রোদ বলল।
--- বর্ণমালা মানে বাংলা ভাষার বর্ণগুলো দিয়ে গাঁথা যে মালা। এমালাও অনেক রঙিন ফুল দিয়ে গাঁথা মালা বা মালঞ্চের মতই। লিখে মনের কথা বলার জন্য আমরা কলম দিয়ে যে ছবিগুলো আঁকি তা-ই এক সঙ্গে বর্ণমালা। আলাদা করে প্রতিটি একেকটি বর্ণ। লেখা যদি একটি ফুল হয়  তবে পাপড়িগুলো একেকটি বর্ণ। লেখা যদি একটি ছবি হয় তবে বর্ণ হল সেই ছবির একেকটি তুলির আঁচড় বা পেন্সিলের দাগ।  তুলির অনেকগুলো আঁচড় বা পেন্সিলের দাগ দিয়ে আমরা যেমন একটি সম্পূর্ণ ছবি আঁকি তেমনই বর্ণের পর বর্ণ সাজিয়ে আমরা লেখি। এই দেখ, তোমার খাতায় আমি একটি কার্টুন আঁকছি।
ভাল করে তাকিয়ে দেখ-- বলে দাদুভাই মেঘদূতের খাতায় কয়েকটি দাগ দিয়ে একটি কার্টুন আঁকলেন।
রোদদূত এক টানে খাতাটি নিয়ে বলল---
এই মিকি মাউসের কার্টুনটি আমার।
--- ঠিক আছে, ঠিক আছে। আগে শোন। এই-যে কয়েকটি দাগ দিলাম-- এগুলো হচ্ছে বর্ণের মত। আর দাগগুলো দিয়ে যখন মিকি মাউস হয়ে গেল তখন তা হল বর্ণমালা। এভাবে বর্ণের মালা গেঁথে আমরা লেখি। লেখা মানে কথার ছবি আঁকা।

মেঘ এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। এবার সে কথা বলল,
--- দাদুভাই, আমি তো বর্ণমালা চিনি। বাংলা-ইংরেজি দু-প্রকারই চিনি-- লিখতেও পারি। একদুইও পারি। রোদদূত কিছুই পারে না!
--- ঠিক আছে। এখন সে শিখে যাবে। তুমি ওকে শিখিয়ে দেবে। এখন তুমি রোদের স্লেটে বড় করে একটা 'অ' লিখে দাও। সে ওটার ওপর হাত ঘুরাতে থাকুক।

মেঘ রোদের স্লেটে চট করে একটা বড় 'অ' লিখে রোদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
--- ভাই, তুমি এটার ওপর বারবার লেখতে থাক।

মেঘদূত এখন আর আগের মত জিদমর্জি করে না। অনেক শান্ত হয়ে গেছে। সে দাদুভাইকে তার বিদ্যার দৌড় ও কৃতিত্ব দেখিয়ে বলল,
--- দাদুভাই, বর্ণমালা দুই প্রকার-- স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ। আমি সব চিনি তো-- লেখতেও পারি! কিন্তু আমরা বারবার বর্ণবর্ণ বলছ কেন? 'বর্ণ' মানে  তো রং! এই আমার হাতের বর্ণ দেখ, কত ফর্সা। আর তোমার গায়ের রং তো কালো বর্ণের। তাহলে লেখার এই ছোটছোট ছবিগুলোকে আমরা বর্ণ বলছি কেন? বইয়ের পাতায় তো ওগুলো সব এক বর্ণের-- কালো রঙের। তাহলে তো নাম 'কাজলি' হলেই ভাল হত।
--- তুমি ঠিকই বলেছ দাদুভাই। বর্ণ মানে যে রং তা একদম সত্যি। কিন্তু তার পরও অনেক কথা আছে। মন দিয়ে শোন। 
একটি শব্দের অনেক অর্থ থাকে। একটি শব্দকে একেক সময় আমরা ভিন্ন-ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করি। যেমন ধর-- আমি তোমাকে বললাম, লুডু তোমরা কীভাবে খেল? 
তুমি বলবে--- চাল দিয়ে।
আচ্ছা। এবার জিজ্ঞেস করলাম-- 
শুভদাদাদের ঘরের ওপরে কী?
--- তুমি বলবে, টিনের চাল।
আবার যদি বলি, তোমার দিদন কী দিয়ে ভাত রাঁধে?
তুমি বলবে--- চাল দিয়ে।
তাহলে লুডুর চাল, ঘরের চাল আর ভাতরাঁধার চাল কি এক হল?
একথা শুনে মেঘ আর রোদ আমার দিকে হাসিমাখা চোখে তাকাল।
মেঘ বলল--- না তো, দাদুভাই! 

তাহলে বুঝলে তো, একই শব্দের অনেক অর্থ থাকে। বহু অর্থে শব্দকে আমরা ব্যবহার করি। আমার কাছে ইয়া মোটা একটা বই আছে-- তার নাম অভিধান।  তাতে দেখেছি, আমরা যাকে 'চাঁদ' বলি-- তোমরা ডাক 'চাঁদমামা'-- তার একশ' ষাটটি নাম আছে! আর আমরা যাকে 'এষণা' বলে ডাকি-- তোমরা দু-ভাই 'মা' ডাক-- এই 'মা' শব্দের  একটি অর্থ কিন্তু 'চাঁদ'। সবার মা-ই তো চাঁদের মত সুন্দর। তা-ই না!

একারণে বর্ণ শব্দটির অর্থ যেমন 'রং' এর আরেক অর্থ হল 'প্রকাশ'। আমরা এই বর্ণগুলো বহু রকমভাবে জোড়া দিয়ে এবং সাজিয়ে মনের কথা প্রকাশ করি। তোমরা চিপস্ কিনতে গিয়ে নাম মনে না-থাকলে দোকানিকে প্যাকেটের রং এর ওপরের ছবির বর্ণনা দাও। ঠিক না? বর্ণনা দেওয়া মানে প্রকাশ করা। এই 'বর্ণনা' শব্দটির  মধ্যেও কিন্তু 'বর্ণ' শব্দটি লুকিয়ে আছে। তোমরা-যে সেদিন আমার কাছে চিড়িয়াখানা দেখার বর্ণনা করলে তাতে কিন্তু সেখানে যা দেখেছ তা-ই প্রকাশ করেছ। একারণে বর্ণের একটি বড় অর্থ 'প্রকাশ'। 

এতক্ষণ হাত ঘুরাতে-ঘুরাতে রোদদূতের আর ভাল লাগছে না। সে অধৈর্য হয়ে স্লেট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
--- এই নাও দাদুভাই, তোমার 'অ'। 
তাকিয়ে দেখি অ-কে আর চিনবার উপায় নেই! মেদ জমতে-জমতে 'অ' অজগর হয়ে গেছে।

(ধারাবাহিক রচনা চলছে)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ