#রবীন্দ্রনিন্দা: খোঁজখবর এবং...
শ্রদ্ধেয় মানবর্দ্ধন (Manbardhan Paul) স্যার তাঁর অনামির_খেরোখাতায় "রবীন্দ্রনিন্দা: খোঁজখবর" শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন --- এটি যে সর্বৈব মিথ্যা এ সম্পর্কিত একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি চার পর্বে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। স্যারকে এজন্য অভিবাদন জানাই। বিষয়টি আমাকেও ভাবিত করেছিল এবং আমিও লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু স্যারের মতো পাণ্ডিত্য বা পড়াশোনা কোনটিই আমার নেই বলে তা আর হয়ে ওঠেনি।আমার আজকের লেখা স্যারের লেখার সূত্রেই।
রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন এটি প্রথম জনসমক্ষে আসে ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে। পরবর্তীতে এই আগুনে ঘি ঢালেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল এম এ মতিন। এবং এটি নতুন কিছু নয়। সম্ভবত ফরহাদ মজহারও এমনটি বলেছিলেন। অনেকে আবার জাতীয়সঙ্গীত পরিবর্তনেরও স্বপ্ন দেখেছিলেন।পাকিস্তান আমলে এমন অভিযোগ হরহামেশাই হতো।
কট্টর পাকিস্তানপন্থী বাদই দিলাম -- একজন উদার পাকিস্তানপন্থী হিসেবে বিবেচিত খন্দকার আবদুল হামিদের মতো মানুষেরাও রবীন্দ্রবিরোধীতা করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে মতিনরা,আবদুল হামিদরা,ফরহাদরা কারা? তাদের চেতনার, রাজনৈতিক আদর্শের শেকড় কোথায় প্রোথিত? এরা আসলে দ্বিজাতিতত্ত্ববিশ্বাসী। যদিও উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগতভাবে তীব্র হওয়ার সাথে সাথে এরা দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা ভুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদেই প্রাণিত হয়েছিলেন কিন্তু এই ঘোর তাদের বেশিদিন টেকেনি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের মাদকতা কেটে যাবার পর,নতুন বাস্তব পরিস্থিতিতে এক গভীর স্বপ্নভঙ্গের ভেতর এরা আবার তাদের মূল জায়গায় ফিরে যেতে শুরু করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সার্বিক হতাশা, হারানো পাকিস্তানের জন্য স্মৃতিবিধুরতা এবং ভারত বিরোধিতার পুরোনো অভ্যাসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কয়েকবছর বিশৃঙ্খলভাবে পথ হেঁটে ১৯৭৬ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পতাকার নিচে এসে এরা জড়ো হতে শুরু করে।
জাতিগত অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্ক থেকেই যদি একটি জাতির জীবনে জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় তাহলে জিয়াউর রহমানের সময়ে কী এমন অস্তিত্ব হারানোর সংকট তৈরি হয়েছিল যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছেড়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন পড়লো? আসল কারণ ঐ দ্বিজাতিতত্ত্ব! ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে তথা হিন্দু মুসলমানদের সমন্বয়ধর্মী ঐতিহ্যের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা এদেশের লোকজ সংস্কৃতির ব্যাপারে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ এদেরকে শঙ্কায় ফেলে দেয়।
তাদের মনে হতে থাকে হিন্দুদের সঙ্গে একত্রভাবে মুসলমানদের বিকাশ অসম্ভব। যে কারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত তাদের সহ্য হয় না, তাদের কাছে মনে হতে থাকে রবীন্দ্রচর্চা আসলে হিন্দুপ্রীতিরই নামান্তর। বাঙালি জাতীয়তাবাদে তারা হিন্দু হিন্দু গন্ধ পান এবং সেই শঙ্কা থেকেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উদ্ভাবন এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। আপনি আজকের লেখার শেষাংশে যথার্থই লিখেছেন প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, নিন্দা ও গুজব-ছড়ানোর লোকের অভাব নেই এদেশে। একদল হীন রাজনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘ দিন ধরে সংগঠিতভাবে গুজবের জাল বিস্তার করে যাচ্ছে গোপনে ও সন্তর্পণে।এখন তা চলছে প্রকাশ্যেই!
আর এব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের নীরবতা যেন কুম্ভকর্ণের নিদ্রা!
স্যার, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সরকারের নির্লিপ্ততার কারণও কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ঐ রাজনীতি। অর্থাৎ একদল রাজনৈতিক স্বার্থে অপপ্রচার করে যাচ্ছে আর আরেকদল রাজনৈতিক স্বার্থেই বোধকরি হজম করে যাচ্ছে। সত্যিই তো! আমরা কী পেরেছি ৭২ এর সংবিধানে পুরোপুরি ফিরে যেতে? আসলে কষ্ট পেয়ে লাভ নেই,সবই যেন ক্ষমতার বলয়ে আচ্ছাদিত এক অমীমাংসিত রহস্য। আর তাইতো সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরানো,পাঠ্যবই পরিবর্তন করা,তেঁতুলতত্ত্ব... ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্ষমতা সুসংহত করতে একজন সদ্যপ্রয়াতের কাছেই আমরা যেমন করে সমর্পিত হয়েছিলাম...মনে নেই? এবং ভবিষ্যতেও যে হবো না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?
হ্যাঁ,অবশ্যই সময় এসেছে সকলেরই উচিত এই গুজব ও অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়েতোলা। নইলে একসময় এই পচা শামুকেই পা কাটতে পারে এবং তা থেকে হতে পারে গ্যাংরিন-- জাগতে পারে পা কেটে ফেলার আশংকা!
0 মন্তব্যসমূহ