♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (০৭) ♣স্বরবর্ণ ও মাত্রাজ্ঞান♣মানবর্দ্ধন পাল


♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥                                         
                    (০৭)
    ♣স্বরবর্ণ ও মাত্রাজ্ঞান♣


          জানতে হবে বর্ণমালার
          বাহির-ভিতর---
          নইলে মায়ের ভাষা হবে
          নিতান্ত পর। 
দু-চার দিনেই নাতি-নাতনিরা মনে হচ্ছে বেশ উৎসাহী হয়ে উঠছে-- কৌতূহলীও। এখন ওদের আর ডাকতে হয় না। সময়মত ওরাই জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দেয়। আজ দাদুভাই স্বরবর্ণের গল্প একটু বিস্তারিতভাবে বলবেন বলে ভেবেছেন। কিন্তু দাদুভাইয়ের হঠাৎ খেয়াল হল, ভাষার গল্পই তো বলা হয়নি! তারপর তার মনে হল-- দেখা যাক ওদের মনে এবিষয়ে কোনও প্রশ্ন জাগে কি না! তখনই বলা যাবে ভাষার গল্প।
দাদুভাই বলতে শুরু করলেন,
---- ভাষার পণ্ডিতেরা বলেন, আমাদের বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন কালের ব্রাহ্মী লিপি থেকে।
---- কী লিপি? বর্মি লিপি?
শুভ জানতে চাইল। দাদুভাই বললেন,
---- না না, বর্মিলিপি নয়; ব্রাহ্মীলিপি। লিপি মানে হল লেখা। এটি হল প্রাচীন কালের একটি বর্ণমালার নাম। এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর এ-নামের একটি বর্ণমালা ছিল। সেই বর্ণমালা থেকে অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা বর্ণমালার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতসহ আশপাশের অনেক দেশে প্রচলিত বহু ভাষার বর্ণমালাও ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভব হয়েছে। যেমন, ক-বর্ণটি আদিকালে ছিল এখনকার যোগচিহ্নের (+) মত। এই ➕ চিহ্নটি এঅঞ্চলের মানুষ একজন থেকে আরেক জন হাতে লিখতে-লিখতে সেটি এখনকার 'ক' হয়ে গেছে। এই পরিবর্তন সকল বর্ণের ক্ষেত্রই সত্য। বর্ণের এই রূপ পরিবর্তন দু-হাজার বছরে ধীরে-ধীরে হয়েছে। সবার তো হাতের লেখা একরকম হয় না। আবার বর্ণের আকার-আকৃতি হাতের  লেখায় সবার সমান হয় না। কারও-কারও লেখায় কোনও-কোনও  বর্ণ একটু ছোটবড় বা বাঁকাত্যাঁড়া হয়ে যায়।  কারণ তখন মানুষ  হাতেতৈরি কালি দিয়ে ভূর্জপাতা বা তুলার তৈরি কাগজে লিখত। কালি তৈরি করতে পারার আগে কাঁচা পাতার ওপর শক্ত কিছু দিয়ে দাগ কেটে বর্ণ লিখত। পরে পাখির  পালক দিয়ে কলম বানাত। এখনকার নিবের মত সেই কলম সূক্ষ্মও ছিল না। সেই কালির রেখাও  সবসময় সমান হত না। নিব কালিতে চোবালে প্রথম দিকের বর্ণ আর শেষদিকের বর্ণ কিছুটা মোটাচিকন হত। তখন তো আর ছাপাখানা ছিল না!  ইংরেজরা হুগলির শ্রীরামপুরে এসে প্রথম বাংলা ছাপাখানা স্থাপন করে প্রায় দুইশ' বছর আগে। তখন থেকে  বাংলা বাংলা বর্ণমালা মোটামুটি সঠিক রূপ পায়। তোমরা মনে রাখবে, বাংলা ছাপা হরফের জন্য যিনি প্রথম সিসা দিয়ে বর্ণমালা তৈরি করেন তার নাম পঞ্চানন কর্মকার। পঞ্চাননের নামও বাংলা বর্ণমালা তৈরি ও ছাপাখানার ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। সিসা কেটেকেটে একই মাপের শতশত বর্ণ বানানো সহজ কাজ ছিল না।

একথা বলে দাদুভাই হিয়ার খাতা টেনে 'ক'-বর্ণের পরিবর্তনটি এঁকে দেখালেন। পরে তিনি বললেন,
 ----যাক, সেসব বড় হয়ে তোমরা বিস্তারিত জানতে পারবে।

একথা বলে হাজার-হাজার বছরে ব্রাহ্মীলিপি কীভাবে চেহারা ও রূপ পরিবর্তন করে বাংলা বর্ণমালা হল তার কয়েকটি ছবি দেখালেন। সবার সঙ্গে মেঘদূত-রোদদূতও ছবি দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

ওসব কথায় মেঘ-রোদের মনোযোগ ছিল না। থাকার কথাও নয়। তাই
 দাদুভাই মেঘকে পাঁচটি ফুল ও পাঁচটি পাখির নাম লিখতে বললেন। রোদকে বললেন, সুন্দর করে  একটি  অ লিখতে। ওদের কাজে ব্যস্ত রেখে দাদুভাই আবার বলতে শুরু করলেন, 
---- বাংলা ভাষার বর্ণমালা লিখতে গেলে প্রথমেই মাত্রাজ্ঞান থাকা দরকার। 'মাত্রাজ্ঞান' বলতে কী বোঝায় তা কি তোমরা জান? 
একথা শুনে সবাই চুপ করে রইল।
---- আচ্ছা, 'মাত্রা' শব্দের মানে কে বলতে পার?
হিয়া দ্বিধায় জড়ানো কণ্ঠে আমতা- আমতা করে বলল,
---- ওই-যে বর্ণের ওপরে যে ইয়ে মানে টান থাকে---। 
দাদুভাই হিয়ার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
---- তুমি বুঝেছ কিন্তু ঠিকমত বলতে পারছ না। শোন, 'মাত্রা' শব্দের সাধারণ অর্থ হল পরিমাণ। আর 'মাত্রাজ্ঞান' হল পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা। কিন্তু বাংলা ভাষা লেখার ক্ষেত্রে মাত্রা হল বর্ণের মাথার ওপর বসে থাকা ছোট্ট সরল রেখা। ওটি হল সীমানা রেখার মত। বর্ণের মূল অংশটি এই সীমানার ওপরে উঠতে পারবে না বা নিচেও নামতে পারবে না। অর্থাৎ লেখার সময় বর্ণগুলো যেন উঁচুনিচু বা বাঁকা-ত্যাঁড়া না-হয়! তবে সকল বর্ণে সমানভাবে 'মাত্রা' থাকে না। কমবেশি থাকে আবার কোথাও থাকেও না! তাই সবারই বিষয়টি জেনে নেওয়া দরকার।

আমরা সবাই জানি, বাংলা বর্ণমালায় ১১টি স্বরবর্ণ আছে। মাত্রার বিচারে এগুলো তিন রকম।
১) পূর্ণমাত্রা-- ৬টি-- অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ
২) অর্ধমাত্রা-- ১টি-- ঋ
৩) মাত্রাহীন-- ৪টি-- এ, ঐ, ও, ঔ। 
এগুলো ভাল করে দেখে রাখ। মাত্রা দিলে বা না-দিলে কিংবা মাত্রার হেরফের হয়ে গেলে এক বর্ণ অন্য বর্ণ হয়ে যায়! যেমন :
এ বা ও-এর ওপর মাত্রা নেই। কিন্তু তুমি যদি এদুটোর ওপর মাত্রা দিয়ে  দাও তা হলে ত্র  [ত+র-ফলা ( ্র) ] এবং ত্ত (ত+ত) হবে। এমন হলে তো বিড়ম্বনার শেষ নেই! এর নামই হল মাত্রাজ্ঞান। এই মাত্রার বিষয়টি কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যেও আছে। 'তত' লিখতে মাত্রা না-দিলে ৩৩ (তেত্রিশ) হয়ে যায়! আর "৬৬ নম্বর বাড়ি" লিখতে মাত্রা দিয়ে দিলে "ডড নম্বর বাড়ি" হয়ে যায়। কেমন বিড়ম্বনা এবার বোঝ! তাই সব বর্ণের ক্ষেত্রই মাত্রার ব্যাপারটি ভাল করে বুঝতে হবে। তাই সব বাঙালির কাণ্ডজ্ঞান যেমন থাকা দরকার তেমনই মাত্রাজ্ঞানও থাকা জরুরি। কথা বলতে কাণ্ডজ্ঞান চাই-- লিখতে গেলে মাত্রাজ্ঞান চাই। নইলে পদেপদে বিপদ!
আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ আছে---
 লেখনেওয়ালা যেমন-তেমন কিন্তু বুঝনেওয়ালার হবে ফাটাফাটি! এই প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প বলি শোন।
একথা বলতেই সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। মেঘ ও রোদ খাতা-কলম গুটিয়ে দাদুভাইয়ের দুপাশে গা-ঘেষে বসল।
---- লেখাপড়া না-জানা এক লোক গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত লোকটির কাছে গিয়ে অনুরোধ করে বলল,
---- আমার ছেলের কাছে একটা চিঠি লিখে দাও।
শিক্ষিত লোকটি বলল,
আমি তো আজ লেখতে পারব না!
---- কেন, কী হয়েছে? 
---- আমার পায়ে ব্যথা।
---- তুমি চিঠি লেখবে হাত দিয়ে। পায়ে ব্যথা হলে অসুবিধা কী?
---- দেখ, আমি তো হাঁটতেই পারি না!
---- তোমার হাঁটার দরকার কী?
---- দেখ, চিঠি লিখে দিলে তো তোমার ছেলের কাছে গিয়ে আমাকেই পড়ে শোনাতে হবে। সে তো আমার লেখা পড়তেও পারবে না-- বুঝবেও না!

লেখার সময় মাত্রাজ্ঞান না-থাকলে এমনই হয়।
সবাই হো-হো, হি-হি করে হেসে উঠল।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ