♥#ব্যাকরণের_বিন্দু-বিসর্গ♥০৬ ♣স্বরবর্ণের ইতিহাস ও ঈশ্বর♣


♥#ব্যাকরণের_বিন্দু-বিসর্গ♥০৬
   ♣স্বরবর্ণের ইতিহাস ও ঈশ্বর♣


      বিদ্যার সাগর তুমি
      বিখ্যাত ভারতে
      মাতৃভাষার বর্ণ সাজালে       
      লিখিতে-পড়িতে।
---- তোমরা কি বিদ্যাসাগরের নাম শুনেছ?
সবাইকে লক্ষ্য করে দাদুভাই এই প্রশ্নটি করলেন। ঐশী ও হিয়া প্রায় একই সঙ্গে জবাব দিল, 
---- হ্যাঁ দাদুভাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর মাতৃভক্তির কাহিনি আমরা পড়েছি।
---- তোমরা ঠিকই বলেছ। মায়ের প্রতি তাঁর খুবই টান এবং ভালবাসা ছিল। বিদ্যাসাগর মাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। একবার তিনি দামোদর নদ সাঁতরে পার হয়েছিলেন। তখন শ্রাবণ মাস। ভরা বর্ষাকাল। দামোদর নদে প্রচুর জল এবং প্রবল স্রোত। থইথই করছে দুই তীর। সোঁ-সোঁ শব্দে বয়ে যাচ্ছে ঢেউ আর স্রোত। এই অবস্থায় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার টানে সাহস করে তিনি পাড়ি দিয়েছেন। 
কথা শেষ না-হতেই হিয়া দাদুভাইকে জিজ্ঞেস করল, 
---- আচ্ছা দাদুভাই, তুমি দামোদরকে নদী না-বলে নদ বলছ কেন? নদী আকারে বড় হলে কি নদ হয়?
---- না, ঠিক তা নয়। ছোট হলেও নদ হতে পারে কিংবা আকারে বড় হলেও নদী হতে পারে। আসলে ব্যাপারটি হল নারী ও পুরুষের। নদ হল পুরুষ; নদী হল নারী। 
একথা শুনে সবাই হেসে খুন।
---- নদীর মধ্যে আবার নারী-পুরুষ আছে নাকি?
চাপাহাসি মুখে নিয়ে প্রশ্ন করল ঐশী। 
একথা শুনে ইঁচড়েপাকা শুভ হঠাৎ বলে উঠল,
---- নদনদী কি তাহলে বউ-জামাই? শুভর কথা শুনে আবার হাসির ধুম পড়ল গল্পের আসরে।
হাসির গমক শেষ হলে দাদুভাই সবাইকে শান্ত করে বলতে শুরু করলেন, 
---- তোমরা জান, তোমাদের বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে পুরুষ ও নারীবাচক শব্দের একটি অধ্যায় আছে। সেখানে পুরুষবাচক শব্দকে নারীবাচক এবং নারীবাচক শব্দকে পুরুষবাচক করার  নিয়ম আছে। যেমন, ছেলে > মেয়ে, মা > বাবা, ছাত্র > ছাত্রী, মুরগি > মোরগ--এরকম আর কি! তেমনই সংস্কৃত ভাষার নিয়ম অনুসারে চন্দ্র ও সূর্য হল পুরুষ-বাচক শব্দ। আবার পৃথিবী হল নারী-বাচক শব্দ। তেমনই নদ পুরুষ ও নদী নারীবাচক। যদিও বাস্তবে মানুষ বা পশুপাখির মত এগুলো নারী বা পুরুষ নয়।
তবে নদনদীর ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে-- ছোট বা বড় যা-ই হোক, তা নির্ভর করে নামের ওপর।  নারীর নামে নাম হলে হয় নদী আর পুরুষের নামে নাম হলে তা নদ হবে। যেমন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা--- এগুলো নারীর নামে নাম। তাই আকারে বড় হলেও এগুলো নদী। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র, কংশ, কপোতাক্ষ-- এসব পুরুষের নামে নাম। তাই এগুলো নদী নয় নদ। সেরকম পুরুষের নাম বলেই দামোদর নদ। --- এটুকু বলে দাদুভাই একটু থেমে সবার কাছে জানতে চাইলেন, বুঝতে পেরেছ  কি না। জিজ্ঞেস করলেন, 
---- এবার কি বিষয়টি তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে?
শুভ থেকে হিয়া পর্যন্ত ওরা চার ভাইবোন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

দাদুভাই আবার বিদ্যাসাগরের গল্পে ফিরে এলেন। তিনি বললেন,
---- বিদ্যাসাগরের আসল নাম--  ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিলেন। একবার পড়েই সব মনে রাখতে পারতেন। কলেজের পরীক্ষায় খুব ভাল ফল করেছিলেন বলে তাকে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি দেওয়া হয়। তাঁর গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। সমাজের মঙ্গলের জন্যও তিনি অনেক ভাল কাজ করেছেন। তিনি বেতনের বেশিরভাগ টাকা গরিবদুঃখিদের দান করে দিতেন। এজন্য লোকে তাঁকে দয়ার সাগরও বলত। বিদ্যাসাগর খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। একটি ধুতি পরতেন আর একটি সাধারণ চাদর গায়ে দিতেন। কিন্তু তিনি বেতন পেতেন অনেক টাকা! সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল থাকার সময় তিনি মাসে পাঁচ'শ টাকা বেতন পেতেন। এই টাকার অঙ্কটা শুনেই সবাই হা হা হি হি করে হাসির তুফান তুলল!
পাঁচ'শ খুবই তুচ্ছ টাকা মনে করে হাসি থামিয়ে হিয়া বলল,
---- এ-আবার বেশি কী? খুবই কম। আমাদের স্কুলে নাইন-টেনের বেতনই মাসে পাঁচ'শ টাকা! 
একথা শুনে দাদুভাই বললেন,
---- শোন, এটি ১৭৫ বছর আগের কথা! তখন জিনিসপত্রের দাম এত কম ছিল যে, তোমরা ভাবতেই পারবে না-- বিশ টাকাকেই বিদ্যাসাগরের সারা মাসের সংসারের খরচ চলে যেত। হিসেবে করলে দেখা যাবে, তখনকার ৫'শ টাকা এখনকার ৫ লক্ষ টাকার চেয়েও বেশি! তাই সবসময়ই তিনি গরিবদুঃখী মানুষকে সাহায্য করতেন। যাক সেসব কথা! বিদ্যাসাগর সম্পর্কে এখন তোমাদের সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলব।

আমাদের ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। পণ্ডিতেরা তাঁকে বাংলা গদ্যের জনক বলেছেন। জনক মানে হল পিতা। আমাদের জাতির জনক যেমন বঙ্গবন্ধু তেমনই বাংলা সুন্দর গদ্যভাষা সৃষ্টি করেছেন বিদ্যাসাগর। তাছাড়া আমরা এখন যে বর্ণমালা দিয়ে পড়ছি এবং লিখছি তা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সুন্দর ও সঠিকভাবে সাজিয়েছেন। বলা যায়, বিজ্ঞানের শৃংখলা দিয়েও। ঈশ্বরচন্দ্রের আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেউ দাড়ি-ছাড়া অন্য কোনও বিরামচিহ্নের ব্যবহার জানতেন না! তখন কমা, সেমিকোলন, প্রশ্নবোধক চিহ্ন, বিস্ময়চিহ্ন এসব কিছুই ছিল না! বিদ্যাসাগর অনেক বিদেশি ভাষাও জানতেন। তিনি ল্যাটিন ভাষা থেকে বিরামচিহ্নগুলো এনে বাংলা ভাষায় প্রয়োগ করেন। তাতে বাংলা ভাষার প্রকাশভঙ্গি সুন্দর  হয়। একটি উদাহরণ দিই। আমি লেখি, তোমরা পড়ে শোনাবে।
     ★ তুমি খাও।
     ★ তুমি খাও!
     ★তুমি খাও?
একই কথার শেষে তিনরকম চিহ্ন থাকায় তিনরকম অর্থ প্রকাশ করেছে। তাই না? শুভ ও কাব্য না-পারলেও ঐশী এবং হিয়া ঠিকমতই পড়তে পেরেছে। এটাও বিদ্যাসাগরের অবদান। 
---- আমাদের স্যারেরা তো এসব কথা কখনও বলেননি! হিয়া বলল।
---- বলেননি-- হয়ত বলবেন। তাছাড়া স্যারেরা তো ব্যাকরণ পড়ান। আর আমি তো গল্প বলি-- তোমাদের ভাষায় 'প্যাঁচাল'!

পুরনো স্বরবর্ণের বিষয়টি এবার একটু খোলাসা করেই বলি-- এই বলে দাদুভাই সবার মুখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ পরখ করলেন এবং আবার বলতে শুরু করলেন। 
---- এখন থেকে দেড়শ' বছর আগেও বাংলায় স্বরবর্ণ ছিল ষোলোটি আর ব্যঞ্জন চৌত্রিশটি। দুয়ে মিলে ছিল পঞ্চাশটি। অঙ্কের নিয়মে হিসাব ঠিক থাকলেও তখন স্বরে-ব্যঞ্জনে ছিল খিচুড়ি পাকানো! 
 ঈশ্বরচন্দ্রের আগে মদনমোহন তর্কালঙ্কার নামে সংস্কৃত ভাষার একজন পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর "শিশুশিক্ষা" নামে বাচ্চাদের একটি বই ছিল। তাতে ষোলোটি স্বরবর্ণ ছিল। সেবই তোমরা কেউ দেখনি কিন্তু আমাদের বয়সীরা সেটি অনেকেই দেখেছেন এবং পড়েওছেন।
এই বলে দাদুভাই সবাইকে পুরনো স্বরবর্ণের ছবি দেখালেন। ওরা এমন অবাক হল যেন আকাশ থেকে পড়েছে! তিনটি বর্ণ তো ওরা কেউ চিনতে পারল না! এগুলো হল, ঋৃ (দীর্ঘ ঋ), ৯ (হ্রস্ব-লি) এবং ৯্৯ (দীর্ঘ লি)। বিদ্যাসাগর মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ষোলোটি স্বরবর্ণ থেকে চারটি ছেঁটে ফেলে বারোটি রাখলেন। বাদ দেওয়া বর্ণগুলো হল, দীর্ঘ-ঋৃ, দীর্ঘ-৯্৯ অং এবং  অঃ। শেষের দুটি আসলে অনুস্বার (ং) এবং বিসর্গ (ঃ)। বিদ্যাসাগর এ-দুটোকে ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত করে দিলেন। বাংলা বর্ণমালার ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের এই কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নইলে তোমাদের বন্ধু লিলির নাম লিখতে নিরানব্বই (৯৯) লিখলেই চলত। কী মজা না!
বিদ্যাসাগরের এই পরিবর্তনের পর বিগত প্রায় দেড়শ' বছরে আমরা স্বরবর্ণ থেকে শুধু লি(৯)-কে বাদ দিয়েছি। কিছু শব্দ লিখতে ঋ তবু দরকার হয় কিন্তু লি (৯) তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। তাই বাঙালি ও বাংলাভাষীদের অবশ্যই বিদ্যাসাগরকে মনে রাখতে হবে। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালি থাকবে ততদিন তিনিও বেঁচে থাকবেন। মনে রাখতে বঙ্গবন্ধু ও বিদ্যাসাগর দুজনকেই। একজন জাতির জনক অন্যজন আধুনিক  ভাষা ও বর্ণমালার জনক।

আর একটি কথা!
তোমরা সবাই জান, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সনের ১৭ মার্চ। তাই এবার আমরা জাতীয়ভাবে তাঁর জন্মের শতবর্ষ পালন করছি। দেশে করোনাভাইরাস না-থাকলে ধুমধামের অন্ত থাকত না। একথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু খুব কম লোকেই জানি যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মসন ১৮২০। বঙ্গবন্ধুর জন্মের একশ' বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন। তাই এবছর বিদ্যাসাগরের জন্মের দুইশ' বছর। এদিনটাও আমাদের ঘটা করে পালন করা উচিত। 
কী বল তোমরা?
বাংলায় লেখি, বাংলায় পড়ি কিন্তু বিদ্যাসাগরকে চিনব না-- তা তো হতে পারে না! 
চল, এবার আমরা একটা কাজ করি।
কথা না-শুনেই শুভ মটু-পাতলু কার্টুনের ভাষায়  চীৎকার করে বলল,
---- আইডিয়া! 
---- ওই ফাজিল, তুই চুপ কর। দাদুভাইয়ের কথা শোন।
হিয়া ছোটভাই শুভকে কড়া ধমক দিল।
---- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সনের ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর। আমরা সবাই মিলে সেদিন তাঁর দুইশ' বছরের জন্মদিন পালন করব। তাঁর একটি বড় ছবি এনে সেখানে ফুল দেব ও তাঁর জীবনের কথা বলব। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখা একটা ছড়া দিলাম। এটি তোমরা সবাই মুখস্থ  করবে। স্কুল বন্ধ থাকলে সেদিন তোমরা বন্ধুদেরও দাওয়াত দেবে। সবাই মিলে আমরা সেদিন ঘটা করে বিদ্য্যাসাগরের জন্মের দুইশ' বছর পালন করব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ