ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ:১১:বহুরূপী-- অ // মানবর্দ্ধন পাল
অ-এর একই অঙ্গে
কত রূপের আভরণ
কখনও বর্ণ, কখনও শব্দ
বহুরূপী এর আচরণ।
দাদুভাই আজ গল্পের আসরের শুরুতেই বর্ণমালার প্রথম বর্ণটি নিয়ে কথা আরম্ভ করলেন। বললেন,
---- 'অ' বর্ণটি তো তোমরা চেন এবং লিখতেও পার।
একথা শুনেই কাব্য চোখেমুখে বিরক্তি ভাব এনে দাদুভাইকে বলল,
---- তুমি কি আমাদের মেঘদূত ও রোদদূতের মত ছোট ভেবেছ? আমরা কি ওদের মত প্লে গ্রুপে পড়ি? এখন তুমি আমাদের অ-আ শেখাচ্ছ? এসব তো আমরা আরও পাঁচ বছর আগেই শিখেছি। আর দিদিরা শিখেছে নয়-দশ বছর আগে! এসব ফাঁকিবাজির গল্প করলে কিন্তু আমরা খেলতে চলে যাব।
শুভর কণ্ঠে খুব উষ্মা এবং অভিমান।
দাদুভাই ওকে শান্ত করে বললেন,
---- আমি তোমাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ঠাট্টামস্করা ও ইয়ার্কি-ফাজলামি করি বটে কিন্তু এখন মোটেই তা করছি না। আগে তো আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। তারপর ঠাট্টা না কি কাজের কথা তা বুঝতে পারবে।
এবার সবাই বেশ নড়েচড়ে বসল।
দাদুভাই বলতে শুরু করলেন,
---- অ-কে আমরা স্বরধ্বনি বা স্বরবর্ণ হিসেবেই জানি। এটি যখন কেবল শোনা যায় তখন ধ্বনি আর যখন এটি ছবির মত দেখা যায় তখন তা বর্ণ।
---- এসব তো আমরা অনেক আগেই জেনেছি দাদুভাই! সবাই একযোগে বলে উঠল-- শুভ, কাব্য, ঐশী এবং হিয়া।
---- এসব জেনেছ ঠিকই তবু আরেকটু ঝালাই করে নিলাম। স্বরধ্বনি বা বর্ণ যা-ই বলি-- অ বহুরূপী বলে ভাষায় এর তেলেসমাতি অনেক। শুরুতেই বলতে হয়, অ এমন শক্তিশালী স্বরধ্বনি যে প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং উচ্চারণে শক্তি যোগায়। বলা যায়, 'অ' না-থাকলে ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণই করা যেত না! রক্ত যেমন আমাদের দেহে গোপনে থাকে এবং ভেতর থেকে শক্তি যোগায় তেমনই অ স্বরধ্বনিটি প্রতিটি ব্যঞ্জনে সুপ্ত থেকে উচ্চারণে প্রাণশক্তি দান করে। প্রতিটি ব্যঞ্জনে অ ধ্বনিটি আত্মগোপন করে থাকে বলেই তা উচ্চারিত হয় এবং আমরা শুনতে পাই।
যেমন ক্+অ= ক, চ্+অ= চ, ট্+অ = ট, ত্+অ = ত, প্+অ = প ইত্যাদি।
অ বাংলা স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণ। এটি বাংলা প্রথম স্বরধ্বনির দৃশ্যমান বা লিখিত রূপ। এর উচ্চারণস্থান কণ্ঠ। বাকযন্ত্রের কোথাও বাধা না-পেয়ে গলার ভেতর থেকে অ ধ্বনি উচ্চারিত হয়। আমরা আগেই জেনেছি, অ-ধ্বনির 'কার' অদৃশ্য মানে দেখা যায় না।
'অ' বর্ণটির আরও কারিগরি আছে। সম্বোধনসূচক অব্যয় পদ হিসেবেও আমরা এটি ব্যবহার করি। অর্থাৎ কাউকে ডাকার সময় এটি ব্যবহার করি। যেমন, "অ ভাই, কেমন আছ?" কিংবা "অ শুভ, ঘরে আয়।" এখানে অ-কে আমরা কাউকে ডাকার জন্য শব্দ বা বাক্যের অংশ পদ হিসেবে ব্যবহার করছি। আবার কখনওবা মনের দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্যও ব্যবহার করি। যেমন, " অ আল্লাহ রে", "অ আমার কপাল"!
এপর্যন্ত বলে দাদুভাই একটু থেমে শুভ ও কাব্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,
---- তোমরা দু'জন কি এই কথাগুলো বুঝতে পারছ? তোমরা তো ছোট তাই বুঝতে একটু অসুবিধা হতে পারে। তোমাদের দিদিরা ঠিকই বুঝতে পারছে-- তাই না?
তখন সবাই বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
---- আমরা সবাই বুঝেছ পারছি।
---- আচ্ছা, বেশ! কাব্য, তুমি বল তো কী বুঝেছ? দাদুভাই জানতে চাইলেন।
কাব্য বেশ গম্ভীরভাবে দাদুভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
---- আমরা অ-এর নানান রূপের কথা জানলাম।
এটুকু বলেই কাব্য চুপ! ওকে চুপ থাকতে দেখে ঐশী বলল,
---- অ-এর অনেক রূপ। তাই এটি বহুরূপী। অ কখনও ধ্বনি, কখনও বর্ণ, কখনও শব্দ আবার কখনও সম্বোধন পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহার হয়। তা-ই উদাহরণ দিয়ে তুমি আমাদের বুঝিয়েছ।
---- বেশ বেশ! চমৎকার করে বলেছ তুমি। খুব ভাল বুঝেছ। দাদুভাই ঐশীকে ধন্যবাদ দিলেন।। সবার মনোযোগ আবার ফিরিয়ে আনতে দাদুভাই সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
---- এবার গতকালের দুটি প্রশ্নের উত্তর কী লিখেছ সবাই খাতা দেখাও।
খাতা খুলতে-খুলতেই সবাই চীৎকার করে একসঙ্গে ধাঁধার উত্তরটি বলে উঠল,
---- কাঁঠাল, কাঁঠাল, কাঁঠাল!
সবার চোখেমুখে বেশ আনন্দ এবং বিজয়ের হাসি! কিন্তু পরের প্রশ্নটির উত্তর দেখতে চাইলে সবাই বেশ কাচুমাচু করছে। ঐশী এবং হিয়ার মধ্যেও জড়তা। শুভ তো খাতাই দেখাতে চাইছে না! একরকম জোর করেই দাদুভাই সবার খাতায় একবার চোখ বুলালেন। তিনি দেখলেন, কেউ দশটি 'কার' দিয়ে দশটি করে শব্দ লিখতে পারেনি। বানান ভুল তো আছেই! বোঝা গেল, চার জন নাতিনাতনির মধ্যে দুর্বল সিং হল শুভ আর দারা সিং হল হিয়া। দাদুভাই ওদের খাতা দেখে এ-ও বুঝলেন যে, ওরা একে অপরের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে জোড়া বেঁধে লিখেছে। শব্দগুলো প্রায় একরকম। কেউই ঐ-কার, ঔ-কার এবং ঋ-কার দিয়ে পাঁচ-সাতটির বেশি শব্দ লিখতে পারেনি! কেউ তো লিখেছে মাত্র দুচারটি করে!
দাদুভাই বললেন, আজ শেষবেলায় দশটি 'কার' দিয়ে দশটি করে শব্দ আমি তোমাদের অর্থসহ লিখে দেব। এবার 'অ' নিয়ে আরেকটু কথা মন দিযে শোন।
---- অ-এর কারিগরি কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অামরা একটু আগে জেনেছি,
★ অ বাংলা ভাষায় প্রথম স্বরধ্বনি ও প্রথম স্বরবর্ণ।
★ অ সম্বোধনসূচক পদ যা দুঃখ ও ক্ষোভ বোঝাতে আমরা ব্যবহার করি।
এবার আরও জেনে রাখ যে, 'অ' বর্ণটি আমরা গ্রামবাংলায় সম্মতিসূচক অব্যয় পদ হিসেবেও ব্যবহার করি। সম্মতিসূচক মানে "রাজি আছি" বা "ঠিক আছে" অর্থে। যেমন, তুমি কি বাজারে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকে দেয়-- অ। এই 'অ' মানে হ্যাঁ। শব্দটি পরিবর্তন হয়েছে এভাবে : হ্যাঁ > হ > অ। জীবন্ত ভাষার ধর্মই হল সময়ের ব্যবধানে শব্দের পরিবর্তন হওয়া।
★ অ-এর আরেকটি রূপ হল-- এটি একটি না-বোধক অব্যয় পদ। না, নেই, নয়, নহে, নহেন ইত্যাদি অর্থও 'অ' ব্যবহার করা হয়। কোনও শব্দের আগে 'অ' যুক্ত করে আমরা 'না' অর্থ কিংবা 'অভাব' অর্থ বোঝাই। যেমন,
অসুখ মানে-- নেই সুখ বা সুখের অভাব। অবুঝ মানে-- নেই বুঝ বা বুঝের অভাব। অমানুষ মানে-- মানুষ নয়। এই 'অ' বর্ণটি যখন কোনও শব্দের সামনে বসে তখন তাকে বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ বলে। বাংলা, সংস্কৃত ও বিদেশি-- এই তিন প্রকার উপসর্গ মিলে এদের সংখ্যা ষাটটি। তোমাদের সুধীরস্যার ব্যাকরণের ক্লাসে তা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দেবেন। শুভ আর কাব্য এখন অবশ্য এসব বুঝতে পারবে না। তবে নামগুলো মনে থাকলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
'অ' বর্ণটি যেমন শব্দের সামনে বসে তেমনই কখনও আবার শব্দ বা ক্রিয়ার মূলের পরেও বসে। পরে বা শেষে বসলে তাকে বলা হয় প্রত্যয়। যেমন, কর্+অ= কর। ( তুই কর)। জিত্+অ= জিত। বাক্যে প্রয়োগ করলে মনে কর, "পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের জিত হয়েছে।" ক্রিয়াপদের শেষে যুক্ত হয়েছে বলে এই অ-গুলো প্রত্যয়। আরও বিশেষভাবে বললে কৃৎ প্রত্যয়।
একটু থেমে দাদুভাই আবার বলতে শুরু করলেন,
---- তোমরা এখন হয়তো অনেক এসবের কিছুই বুঝবে না। তবু বলে রাখি, 'অ' বর্ণটির বহুরূপ এবং কারিগরি এখানেও শেষ নয়। বাংলা শব্দের উচ্চারণেও এর তেলেসমাতি অনেক! অ কখনও স্বভাবিক 'অ' উচ্চারণ হয় আবার কখনও 'ও' উচ্চারণ হয়। কোনও শব্দের সামনে অ থাকলে এবং তা না-বোধক অর্থ বোঝালে সেই অ-এর উচ্চারণ স্বাভাবিক হয়। যেমন-- অমিল, অসুখ। এখানে দুটো অ না-বোধক বোঝাচ্ছে বলে এর উচ্চারণ স্বাভাবিক। মানে 'ওমিল' নয়, অমিল; 'ওসুখ' নয় অসুখ। আর সামনের অ-এর অর্থ যদি না-বোধক না-বোঝায় তবে এর উচ্চারণ হবে 'ও'। যেমন-- অতি, মতি। এদুটো শব্দের উচ্চারণ 'ওতি' ও 'মোতি'। এখানে সামনে অ উচ্চারণে 'ও' হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, এই অ যেন উ হয়ে না-যায়। অর্থাৎ 'উতি' এবং 'মুতি' না-হয়। অনেকে এটি উচ্চারণ করতে ভুল করে।
উচ্চারণে এরকমভাবে ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত মাঝের এবং শেষের 'অ' ধ্বনিও 'ও' হয়ে যায়। যেমন-- কলম ও চরণ-এর উচ্চারণ : 'কলোম' এবং 'চরোন'। এরকমভাবে বাহিত ও নিহিত শব্দ দুটোর উচ্চারণ : 'বাহিতো' এবং 'নিহিতো'।
তোমরা তো এই শহরের বাংলার নামজাদা অধ্যাপক জামিল ফোরকানস্যারের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। অনেকে তাঁকে দেখেছ। তাঁর আবৃত্তি এবং বক্তৃতাও শুনেছ। বাংলা উচ্চারণে তিনি ওস্তাদ। তোমরা যখন কলেজে উঠবে তখন উচ্চারণের বিষয়টি তাঁর কাছ থেকে ভালভাবে বুঝে নিতে পারবে।
একথা বলে দাদুভাই আজকের মত গল্পের আসর শেষ করলেন এবং বললেন,
---- আজ আর তোমাদের দশটি 'কার'-এর দশটি করে শব্দ লিখে দেব না। একদম সময় নেই-- এখনই বেরুতে হবে। সামনের দিন শুরুতেই আমরা দশটি 'কার' দিয়ে দশটি করে শব্দ লিখব। তোমরাও সবাই মিলে মনোযোগ আরেকবার চেষ্টা কর।
0 মন্তব্যসমূহ