♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥(১০)♣'কার'-এর কারিগরি♣
স্বরবর্ণের ছোট্ট রূপকে
ব্যাকরণে 'কার' কয়,
'কার' দিয়ে বাংলা বানান
সহজ-সরল হয়।
আমরা সবাই জানি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অতুলনীয় প্রতিভাবান ছিলেন। স্মৃতিশক্তি তাঁর প্রবল ছিল। একবার শুনলে,দেখলে বা পড়লেই তাঁর মনে থাকত। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিশুকালে হেঁটে কলকাতা যাবার সময়ই রাস্তার মাইলপোস্ট দেখেই তিনি অংকের সংখ্যাগুলো শিখে গিয়েছিলেন-- এরকম জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। তাঁর সম্পর্কে আরও জনশ্রুতি আছে যে, স্বরবর্ণের 'কার' চিহ্নগুলো শিখবার আগেই তিনি তাঁর বাবার কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কলকাতায় শিবচরণ মল্লিকের পাঠশালায় পড়ার সময় ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর বাবাকে চিঠিতে লেখেন-- "ববর চরণ নমসকর। টক পঠও। ন হইল ভত মরণ।" এচিঠি লেখার সময় তাঁর 'কার' চিহ্ন এবং যুক্তবর্ণ শেখা হয়নি। শিশু বিদ্যাসাগরের এই চিঠিতে 'কার' যুক্ত করলে তা এরকম হবে-- "বাবার চরণে নমস্কার। টাকা পাঠাও। না হইলে ভাতে মরণ।"
শিশুকালে লেখা ঈশ্বরচন্দ্রের এই চিঠিটি পড়লে 'কার' চিহ্নের গুরুত্ব বোঝা যায়। কারের কারিগরি না-জানলে বাংলা ভাষার অধিকাংশ শব্দই তৈরি করা যায় না। 'কার' ছাড়া বেশির ভাগ বাংলা শব্দের বানান শুদ্ধ করে লেখা যায় না। তাই সব বাংলাভাষী শিশুকে স্বরবর্ণ লিখতে শেখার সঙ্গে সঙ্গেই 'কার' শেখাতে হয়। স্বরবর্ণ ও কার-শেখানো তাই পাশাপাশি চলে। মেঘদূত ইতোমধ্যেই 'কার' শিখে ফেলেছে। সে এখন একটু বড় হরফের বই গড়গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। রোদদূতকে এখন স্বরবর্ণের পাশাপাশি 'কার'গুলো শেখানোর চেষ্টা চলছে।
---- আচ্ছা দাদুভাই, 'কার' তো আমরা চিনি। কিন্তু এগুলোকে 'কার' বলা হয় কেন? জানতে চাইল শুভ। কাব্যও তখন শুভর কথায় সায় দিল। হিয়া ফোঁড়ন কেটে বলল,
--- তোরা দুজন আস্ত গাধা! আমরা সবাই জানি, স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে 'কার' বলে।
দাদুভাই তখন হিয়ার উদ্দেশ্য হাততালি দিয়ে বলল,
---- হিয়া ঠিক বলেছে। স্বরবর্ণের ছোট্ট বা সংক্ষিপ্ত রূপকেই বাংলা ব্যাকরণে 'কার' বলা হয়। এগুলো হল স্বরবর্ণের প্রতীকী চিহ্ন বা স্বরচিহ্ন। যেমন, আ-কার (া), হ্রস্ব-ই-কার (ি) ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে, এগারোটি স্বরবর্ণের মধ্যে দশটার স্বরচিহ্ন আছে। এগুলো হল এরকম :
★ আ-তে আ-কার-- (া)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের ডানে বসে।
★ হ্রস্ব-ই-তে হ্রস্ব-ই-কার ( ি)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের বামে বসে।
★ দীর্ঘ-ঈ-তে দীর্ঘ-ঈ-কার ( ী)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের ডানে বসে।
★ হ্রস্ব-উ-তে হ্রস্ব-উ-কার (ু)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের নিচে বসে।
★ দীর্ঘ-ঊ-তে দীর্ঘ-ঊ-কার ( ূ)
এটাও ব্যঞ্জনের নিচে বসে।
★এ-তে এ-কার ( ে)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের বামে বসে।
★ ঐ-তে ঐ-কার ( ৈ)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের বামে বসে।
★ ও-তে ও-কার ( ো)
এটা ব্যঞ্জনবর্ণের দু'পাশে বসে।
★ ঔ-তে ঔ-কার ( ৌ)
এটাও ব্যঞ্জনবর্ণের দু'পাশে বসে।
★ ঋ-তে ঋ-কার (ৃ)
এটা ব্যঞ্জনের নিচে বসে।
স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ 'কার'গুলোর চেহারা দেখিয়ে দাদুভাই বললেন,
---- এগারোটি স্বরবর্ণের মধ্যে দশটির সংক্ষিপ্ত রূপ বা স্বরচিহ্ন আছে। কিন্তু প্রথম স্বরবর্ণ অ-এর কোনও সংক্ষিপ্ত রূপ নেই। মনে রাখতে হবে এই স্বরচিহ্নগুলো কেবল ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়। এগুলো কখনও ব্যঞ্জনবর্ণের ডানে, কখনও বামে বসে। আ-কার ( া), এ-কার ( ে), ও-কার (ো) এরকম। ব্যঞ্জনবর্ণগুলো যেন এই কারগুলোকে কোলে তুলে রাখে। কখনও ডান কোলে, কখনও বাম কোলে, আর কখনও দুই কোলেই। আবার কয়েকটি কার পায়ে ধরে ঝুলে থাকে। যেমন, উ-কার ( ু), দীর্ঘ-ঊ-কার (ূ) এবং ঋ-কার (ৃ) । এগুলো মেয়েদের নূপুর কিংবা পায়ের আঙুলের আংটির মত। কেবল তা-ই নয়; কারগুলো কখনও নতুন বৌয়ের মত মাথায় ঘোমটাও দিয়ে রাখে। এটা অনেকটা মুসলিম নারীদের মুখমণ্ডল ও মাথা ঢেকে রাখার পোশাক নেকাবের মতও বলা যায়। একথা বলে দাদুভাই একটু হাসলেন এবং সবার সঙ্গে মজা করে বললেন,
---- ঘোমটাই হোক আর নেকাবই হোক-- এই কারগুলো যেন ব্যঞ্জনবর্ণের পোশাক বা অলংকার হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। নিচের এই কারগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়।
যেমন, হ্রস্ব-ই-কার ( ি), দীর্ঘ-ঈ-কার (ী), ঐ-কার (ৈ) এবং ঔ-কার (ৌ)। তাই মজা করে আরও বলা যায়, কার বা স্বরচিহ্নগুলো তিন রকম :
★ কোলে-ওঠা 'কার'
★ ঘোমটাপরা 'কার' এবং
★ পায়েধরা 'কার'।
এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনে ঐশী জানতে চাইল,
---- দশটি কারের চেহারা ও চরিত্র তো বুঝলাম। কিন্তু প্রথম স্বরবর্ণ অ-এর 'কার' নেই কেন?
দাদুভাই মুচকি হেসে বললেন,
---- এখানেই 'কার'-এর কারিগরি এবং কারসাজি! অ-কারেরও কার আছে তবে তা দেখা যায় না। সেটি অদৃশ্য 'কার'। অ-কারটি কথা বলার সময় উচ্চারণে বোঝা যায়। মানে শোনা যায় কিন্তু দেখা যায় না। যেমন, তোমার ছোট ভাই শুভকে যখন নাম ধরে ডাক তখন অ-কারটি উচ্চরিত হয়। অর্থাৎ 'শুভ' বললে ভ-য়ের পর একটি 'অ' উচ্চারিত হয়। সেটিই অদৃশ্য অ-কার। তা শোনা যায় কিন্তু দেখা যায় না। আমি বাজার থেকে এলে তোমাদের দিদন যখন জিজ্ঞেস করে-- মাছের দাম কত হল? তখনও কিন্তু 'কত' এবং 'হল' বললে অদৃশ্য অ-কার হয়।
---- "এবার বুঝেছি, বুঝেছি", বলে চারজন পাড়াতুতো নাতি-নাতনি সশব্দে বলে উঠল।
---- ঠিক আছে। এবার তোমাদের বাড়ির কাজ এবং 'কার' নিয়ে একটি ধাঁধা দেব। সামনের সপ্তাহে এর উত্তর লিখে আনবে।
# দশটি 'কার' দিয়ে দশটি করে শব্দ লিখে আনবে।
# আর ধাঁধাটি হল :
"কাঁকনবালা নাম তার
চন্দ্রবিন্দু দিয়া ক-য়েতে আ-কার
পাঁঠার ঠ্যাং কাটিয়া ঠ-য়েতে আ-কার।
লতার প্রথম বর্ণ ল মিশাইয়া
ইহাতে যাহা হয়, দিয়ো পাঠাইয়া।"
0 মন্তব্যসমূহ