♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
(০৯)
♣সপ্তসুর ও সপ্তস্বর♣
খুবই কাকতালীয় বিষয় মনে হয় আমার কাছে-- সুরের জগতে মূল সুরের সংখ্যা সাতটি এবং বাংলা স্বরবর্ণে মৌলিক স্বরের সংখ্যাও সাতটি!
ঐশী এবং হিয়া দুজনেই গান জানে। ওরা ত্রিতাল সঙ্গীত নিকেতনে সপ্তাহে দুদিন গান শেখে। স্কুলের রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তি, বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানে ওরা গানও গায়।
---- আচ্ছা, তোমরা দুজন তো নিশ্চয়ই সপ্তসুরের কথা জান, তাই না?
দাদুভাই জিজ্ঞেস করলেন।
---- হ্যাঁ, জানি তো! সা রে গা মা পা ধা নি-- এই সাতটি হল সঙ্গীতের মূল সুর। দাদুভাই, তুমি আজ আমাদের গানবাজনা শেখাবে না কি-- মুখে হাসির ঝিলিক এনে ওরা প্রশ্ন করল।
---- আমি তো অসুরের দলের বেসুরো মানুষ! আমি কি সুরের দেশের পথঘাট চিনি নাকি? কিন্তু সুর ও স্বর শব্দ দুটি খুব কাছাকাছি কি না তাই তোমাদের কাছে জানতে চাইলাম।
গানের জগতে সাতটি সুরের কথা তোমরা জান। এর পূর্ণ নামও জান-- সরভ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যমা, পঞ্চম, ধৈবত এবং নিষাদ। কী ঠিক না? ওরা আমতা-আমতা করল!
আচ্ছা, শুভ ও কাব্য বল তো, সাতটি মূল রঙের সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণ নাম?
শুভ সবগুলো না-পারলেও কাব্য এক নিশ্বাসে বলে দিল-- বেনীআসহকলা।
---- বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল।
---- খুব ভাল। তোমরা সবাই এগুলো জান। তবে এর সঙ্গে জানা দরকার সুর ও রঙের জগতের মতই বাংলা মৌলিক স্বরবর্ণও সাতটি। এগারোটা স্বরবর্ণের মধ্যে এই সাতটি মৌলিক স্বরবর্ণও ভালভাবে চিনে রাখা প্রয়োজন। এগুলো হল-- অ আ ই উ এ ও এবং অ্যা।
---- আচ্ছা দাদুভাই, অন্য স্বরবর্ণগুলো তাহলে মৌলিক নয় কেন আর নতুন আরেকটি 'অ্যা' আবার এল কোত্থেকে? জানতে চাইল ঐশী এবং হিয়া।
---- আমাদের ভাষার পণ্ডিত, যাদের আমরা ভাষাবিজ্ঞানী বলি, তারা গবেষণা করে দেখেছেন, আমাদের স্বরবর্ণের দীর্ঘ স্বরগুলো বর্ণমালায় থাকলেও সেগুলোর কোনও আলাদা বা বিশেষ উচ্চারণ নেই। মানে হ্রস্ব স্বর ও দীর্ঘ স্বরে বানানে ভিন্নতা থাকলেও উচ্চারণে কোনও পার্থক্য নেই। হ্রস্ব-ই বা হ্রস্ব--ি কার কিংবা দীর্ঘ-ঈ বা দীর্ঘ- ী-কারে বানানে ভিন্নতা আছে কিন্তু উচ্চারণে কোনও তফাৎ নেই। যেমন, 'ইক্ষু' এবং 'ঈশ্বর' শব্দের 'ই/ঈ' আমরা একরকমভাবে 'ই' উচ্চারণ করি। বানানে 'ঈ/ী-কার থাকলে কখনও তা টেনে লম্বা করে উচ্চারণ করি না। হ্রস্ব-উ/ু-কার এবং দীর্ঘ-ঊ/ূ-কারের ক্ষেত্রেও একই রকম। যেমন, 'উৎসব' এবং 'ঊষা' শব্দ দুটির উচ্চারণেও আমরা হ্রস্ব-উ এবং দীর্ঘ-ঊ-এর কোনও পার্থক্য করি না। তাই ভাষাবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ স্বর বাদ দিয়ে শুধু হ্রস্ব স্বরকেই ( ই, উ) মূল স্বর হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এটুকু বলে দাদুভাই শুভ-কাব্য এবং ঐশী-হিয়াকে একটু চিন্তা করে বুঝে নেবার সুযোগ দিলেন। তারপর দাদুভাই বললেন,
---- তোমরা এরকম শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই বুঝতে পারবে, দীর্ঘ স্বরগুলো আমরা কথা বলার সময় ব্যবহার করছি না। তাই ভাষাবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ স্বরগুলো বাদ দিয়ে কেবল হ্রস্ব স্বরগুলো মৌলিক স্বরধ্বনি হিসেবে রেখেছেন। এভাবে 'এ' এবং 'ও' হয়েছে মৌলিক স্বরধ্বনি। কারণ এদুটো স্বরধ্বনিরও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য স্বরের সঙ্গে মিলে না।
---- কী কঠিন মনে হচ্ছে? দাদুভাই নাতি-নাতনিদের কাছে জানতে চাইলেন। ওরা মুচকি হেসে ডানেবামে মাথা ঝাঁকাল।
---- আরেকটু মন দিয়ে শোন। আজ অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করব। বাজারে না-গেলে তোমাদের দিদন রান্নাঘরে হরতাল ডাকবে।
--- 'ঐ' এবং 'ঔ' স্বরবর্ণ দুটোকে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা বলেন যুগ্ম স্বরধ্বনি। তারা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দুটো করে স্বরধ্বনি মিলে 'ঐ' এবং 'ঔ' স্বরবর্ণ দুটোর সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, ও+ই= ওই= ঐ। আর ও+উ= ওউ = ঔ। তাই বলা যায়, ঐ আর ঔ হল যমজ স্বর-- যমজ ভাই-বোনদের মত। যুগ্ম শব্দের অর্থও হল দুই। তাই ধ্বনিবিজ্ঞানীরা ঐ এবং ঔ-কে যুগ্ম স্বরধ্বনি বলেছেন। অনেকে এই দুটোকে অন্য নামেও ডাকেন। কেউ বলেন যৌগিক স্বর, কেউ যুক্ত স্বর, আবার কেউ সংযুক্ত স্বরধ্বনি। যে-নামেই ডাকি না কেন, দুটো স্বরধ্বনি যুক্ত হয়ে ঐ এবং ঔ-এর সৃষ্টি হয়েছে বলে তা মৌলিক স্বরধ্বনি নয়।
একটু থেমে দাদুভাই আবার বলতে শুরু করলেন,
---- এখন বাকি রইল আরেকটি মৌলিক স্বরধ্বনি 'অ্যা'। এটি আমাদের উচ্চারণে আছে কিন্তু এগারোটি স্বরবর্ণের মধ্যে নেই। এটিকে অনেক ধ্বনিবিজ্ঞানী "বাঁকা-এ" বলেও আখ্যায়িত করেছেন। 'একটি' এবং 'একটা'-- এই শব্দ দুটি যদি আমরা পাশাপাশি উচ্চারণ করি তবেই এদের তফাৎটা বোঝা যায়। 'একটি' বলার সময় এ-এর স্বভাবিক উচ্চারণ হচ্ছে কিন্তু 'একটা' বলার সময় আমরা 'এ' ধ্বনিটি একটু বাঁকা করে উচ্চারণ করছি-- 'এ্যাকটা'।
হিয়া যখন সেদিন বলল, "এবার বৈশাখী মেলায় মেলা মানুষ এসেছে।" এই বাক্যে কিন্তু সে পরের 'মেলা' শব্দটা বাঁকা করে 'ম্যালা' উচ্চারণ করেছে। তাই শব্দ দুটির অর্থও হয়ে গেছে ভিন্ন! প্রথম 'মেলা' মানে 'সম্মিলন' আর পরের 'মেলা' (ম্যালা) মানে 'অনেক'।
তাই বাঁকা-এ-এর (অ্যা) অস্তিত্ব স্বরবর্ণে দেখা না-মিললেও উচ্চারণে এর অস্তিত্ব আছে। একারণে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা 'অ্যা'-কে মৌলিক স্বরধ্বনি হিসেবে গণ্য করেছেন। পৃথিবীর সকল উন্নত ভাষাতেই এরকম মৌলিক স্বরধ্বনি আছে। যেমন ইংরেজিতে Bat 'বেট' নয়-- 'ব্যাট'।
দাদুভাই আজ বর্ণমালার গল্প শেষ করতে গিয়ে বললেন,
---- সাত সংখ্যাটি বোধ করি সত্যি সৌভাগ্যের প্রতীক। এজন্য আমরাও ইংরেজদের মত "লাকি সেভেন" বলি। পৃথিবীতে সাতটি মহাদেশ, সাতটি মহাসাগর, সাতটি মহাশ্চর্য বস্তু , সাতটি রঙ, সাতটি সুর এবং মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যাও সাতটি। এই সপ্ত সুরে, সপ্ত রঙে এবং সপ্ত স্বরেই এই বাংলায় আমাদের সাত পুরুষের বসবাস। আর এই পৃথিবীতে সাতের জয়জয়কার।
একথা বলেই দাদুভাই হাসতে-হাসতে উঠে পড়লেন।
0 মন্তব্যসমূহ