♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
(০৫)
♣স্বর ও ব্যঞ্জনের কথা♣
বর্ণমালা ভালভাবে
চিনতে হবে ভাই---
নইলে ভাষা-বানান লেখার
কোন উপায় নাই।
একই সঙ্গে উচ্চারণও
শিখে নেওয়া চাই।
দাদুভাই আজ মুখেমুখে একটি ছড়া বানিয়ে বর্ণমালার গল্প শুরু করলেন।
--- নানান রঙের ফুলগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে সুতোয় গাঁথলে যেমন মালা বা মালঞ্চ হয় তেমনই বর্ণগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী সাজালে হয় বর্ণমালা।তোমাদের আগেই বলেছি-- ধ্বনি হল আওয়াজ। কিন্তু ভাষার গল্পে ধ্বনি মানে মুখ থেকে বের হওয়া আওয়াজ বা শব্দ। এই শব্দ কিন্তু 'সাউণ্ড'। 'ওয়ার্ড' অর্থে নয়। এজন্য এই ধ্বনি হল বাগধ্বনি। মানে কথার আওয়াজ। মুখ থেকে বের-হওয়া শব্দ। কানে শোনার উপযুক্ত এই ধ্বনি যখন দেখা যায় অর্থাৎ ছবি হয় বা আকার-আকৃতি পায় তখন আমরা তাকে বর্ণ বলি। ধ্বনি ও বর্ণের কথা পাশাপাশি বা একই সঙ্গে বলতে হবে। এরা-যে কয়েনের এপিঠ-ওপিঠ। একেবারে যমজ ভাইবোনের মত।
পৃথিবীর সব ভাষাতেই মানুষের মুখের আওয়াজ বা ধ্বনিগুলো দু-রকম : স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি। তাই বর্ণগুলোও দু-রকম : স্বর ও ব্যঞ্জন। একথা শুনেই রোদদূত বলে উঠল,
--- সর আমি খুব পছন্দ করি। দুধ থেকে সর হয়। মা আমাকে প্রতিদিন সর খেতে দেয়। কথার পিঠে ফোঁড়ন দিয়ে মেঘদূত বলে, আমি সর খাই না। খ্যাঁকখ্যাঁক লাগে।
একথা শুনে অন্য সবাই হেসে উঠল। ঐশী আর হিয়ার হাসি তো থামতেই চায় না! ওদের হাসি শান্ত করে আবার দাদুভাই বলতে শুরু করলেন,
--- রোদ মিথ্যে বলেনি। সে তো ওই একটা সরই চেনে। আমাদের ভাষায় একই উচ্চারণের এরকম অনেক শব্দ আছে। কিন্তু বানান আলাদা এবং অর্থও আলাদা। যেমন--
সর মানে দুধের ওপরের থকথকে নরম অংশ।
শর মানে ধনুকের তীর।
স্বর মানে মুখের আওয়াজ, বাগধ্বনি।
ষড় মানে ষষ্ঠ বা ছয়। তাছাড়া আরও একটি 'স্মর' আছে। এর উচ্চারণ 'শরো'-- অর্থ "স্মরণ কর'। সর্ বা সর (শরো) শব্দটি আমরা ক্রিয়াপদ হিসেবেও ব্যবহার করি। যেমন, তুই সর বা তুমি সর। বাংলা শব্দের কী জাদু তাই না!
আর এখানে বলে রাখা ভাল-- 'ব্যঞ্জন' শব্দটিরও কিন্তু দুটি অর্থ আছে। একটি আমরা জেনেছি-- ধ্বনি ও বর্ণের গল্পে বাংলা ব্যাকরণে ব্যবহার হয়। এর সাধারণ অর্থ হল-- রান্নাকরা তরকারি। সেটা নিরামিষ সবজি হতে পারে আবার আমিষ মাছ-মাংসও হতে পারে। আমরা অনেক সময় দাওয়াত খেয়ে বলি-- 'সপ্তব্যঞ্জন' দিয়ে পেট ভরে খেয়েছি। এর মানে কিন্তু সাতটি ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে খাইনি-- সাত রকমের তরকারি দিয়ে খেয়েছি। আমাদের গ্রাম অঞ্চলে এই শব্দটি একটু পরিবর্তন হয়ে সাধারণ মানুষের উচ্চারণে হয়ে গেছে-- বেজুন বা বেনুন। অর্থাৎ ব্যঞ্জন>বেজুন।
একটু থেমে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দাদুভাই সকলের মনোযোগ আছে কি না লক্ষ করলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন,
---- স্বরধ্বনিগুলো হল স্বাধীন। এরা উচ্চারণের সময় কারও ওপর নির্ভর করে না। এগুলো স্বনির্ভর। ঐশী, তুমি বল দেখি-- তোমাদের বইয়ে স্বরধ্বনির সংজ্ঞায় কী লেখা আছে?
ঐশী গরগর করে বলে গেল :
---- যে-ধ্বনি অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া উচ্চারিত হতে পারে তাকে স্বরধ্বনি বলে।
---- ঐশী ঠিকই বলেছে। স্বরধ্বনির উচ্চারণে অন্যধ্বনির সাহায্য লাগে না। এর মানে হল, অন্য কোনও স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনের সাহায্য না-নিয়েই তারা উচ্চারিত হতে পারে। যদি তোমরা অ বা আ-ধ্বনি টেনে লম্বা করে বল তবে বিষয়টি বোঝা যাবে। যেমন :
অ------------- অ, আ--------------আ। এভাবে উচ্চারণ করলে বোঝা যায়, এখানে আর অন্য ধ্বনি নেই। সকল স্বরধ্বনির ক্ষেত্রেই একথা সত্যি। আরও একটি কথা বলতে হবে। স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখের ভেতর কোথাও আটকায় না। অবাধে মানে মুখের ভেতরে কলকব্জায় বা মুখের ভেতরে উচ্চারণের যন্ত্রপাতিতে কোনও বাধা ছাড়াই উচ্চারিত হয়। কিন্তু ক খ উচ্চারণ করলে তা হয় না। যেমন :
ক--------------অ, খ-------------অ।
দেখ, এখানে ক ও খ বলতে একটি করে অ উচ্চারিত হল। তাই এগুলো স্বরধ্বনির সাহায্য না-নিয়ে নিজে উচ্চারিত হতে পারে না। তাই এগুলো ব্যঞ্জনধ্বনি। সকল ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রেই একথা সত্য। এজন্যই বলেছি, ব্যঞ্জনধ্বনি স্বাধীন নয়-- অবাধও নয়। মনে কর, স্বরধ্বনি হল তোমাদের মত-- যেমন খুশি হাঁটতে-চলতে পার। কিন্তু বুড়োরা তো লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না! কিংবা মনে কর কাব্যর বন্ধু পূর্ণর যখন পা ভেঙে গিয়েছিল তখন ওকে কিছুদিন ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। এটাই হল অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা! লাঠি বা ক্র্যাচের ওপর ভর করে যেমন হাঁটা যায় তেমনই ব্যঞ্জনবর্ণগুলো স্বরবর্ণের ওপর ভর করে থাকে এবং তাকে সবসময় সঙ্গে নিয়ে চলে। উচ্চারণের বেলায় স্বরবর্ণের সাহায্য ছাড়া ব্যঞ্জনের অস্তিত্বই থাকে না। এখানে ওদের গলায়-গলায় মিল। তবে ব্যঞ্জনের ভেতর স্বরবর্ণটি কখনও সুস্পষ্টভাবে থাকে আবার কখনও অস্পষ্টভাবে। তা উচ্চারণ শুনলেই বোঝা যায়। দুটি শব্দ ভাল করে লক্ষ কর। যেমন :
মত-- এর উচ্চারণ কখনও 'মত্' আবার কখনও 'মতো'।
কাল-- কখনও 'কাল্', কখনও 'কালো'।
এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ যে, প্রথম উচ্চারণে স্বররর্ণ অস্পষ্ট কিন্তু পরের উচ্চারণে স্বরবর্ণ সুস্পষ্ট। শেষের দুটো বলার সময় একটি করে 'ও' যুক্ত করছি। বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা প্রথমটির নাম দিয়েছেন "ব্যঞ্জনান্ত উচ্চারণ" আর পরেরটির নাম "স্বরান্ত উচ্চারণ"।
স্বর+অন্ত= স্বরান্ত। শেষে স্বরধ্বনির উচ্চারণ সুস্পষ্ট থাকলে। আর শেষের স্বরবর্ণের উচ্চারণ অস্পষ্ট হলে তা হয় ব্যঞ্জনান্ত। ব্যঞ্জন+অন্ত= ব্যঞ্জনান্ত।
তোমরা তো জানই অন্ত মানে শেষ। আজকের মত আমার গল্পও এখানেই শেষ। তোমাদের মনে রাখার সুবিধার জন্য একটি ছড়া বলি--
জেনে রাখা প্রয়োজন আর তা এখনই
মুখের আওয়াজকে বলা হয় ধ্বনি।
ধ্বনি হল দু'রকম স্বর ও ব্যঞ্জন
জেনে নাও ভাল করে সময় এখন।
ব্যঞ্জন পরাধীন যদি বলতে হয়
স্বর ছাড়া বলা যাবে না নিশ্চয়।
স্বর সূর্যের মত নিজের আলোয় চলে
ব্যঞ্জন চাঁদের মত ভাষাবিজ্ঞান বলে।
0 মন্তব্যসমূহ