ইলা মিত্র // ভি ভি নিউটন

ইলা মিত্র।  নাচোলের রানী, তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী,একজন বাঙালি মহীয়সী নারী, সংগ্রামী কৃষক নেত্রী, বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একজন সংগ্রামী নেত্রী, ভোগ করেছেন পাকিস্তান সরকারের অমানুষিক নির্যাতন। পশ্চিমবাংলার পার্লামেন্টের চারবার নির্বাচিত মেম্বার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁঁচবারের সিনেট সদস্য,শিক্ষক নেত্রী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী। 

১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর ইলা মিত্র কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় ইলা মিত্র ছিলেন ইলা সেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বৃটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউন্টেন্ট জেনারেল। পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার বাগুটিয়া গ্রামে।

১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ইলা মিত্র ছিলেন বাংলার জুনিয়র এ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায়ও  ছিলেন পারদর্শী।

১৯৪০ সালে  প্রথম বাঙালি মেয়ে যিনি  জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। 

১৯৪০ সালে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার উদ্যোগে বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেয় 'ফাউন্ড কমিশন'। এই কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষীদের সরাসরি সরকারের প্রজা করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুইভাগের মালিকানা প্রদান করা। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের আন্দোলনের জন্য কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে হাটের 'তোলা' ও 'লেখাই' সহ নানা কর আদায় করা হতো। এসব বন্ধের জন্য আন্দোলন জোরদার হয়। চল্লিশের দশকে এসব আন্দোলনেও ইলা মিত্র নেতৃত্ব দেন।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে  সমগ্র বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এসময়কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মরিয়া হয়ে ওঠে শোষিত কৃষকেরা। তিনভাগের দুইভাগ ফসল কৃষকের এই দাবি নিয়ে বেগবান হয় তেভাগা আন্দোলন। 

১৯৪৩ সালে  ইলা মিত্র  কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হলেন। হিন্দু কোডের  বিরুদ্ধে ঐ বছরই মহিলা সমিতি আন্দোলন শুরু করে। ১৮ বছর বয়সে ইলা মিত্র ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন।

১৯৪৪ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে  স্নাতক শ্রেণিতে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৪৫ সালে ইলা সেনের বিয়ে হয় দেশকর্মী কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সাথে। রমেন্দ্র মিত্র মালদহের নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র ও বিশ্বমায়া মিত্রের ছোট ছেলে। বিয়ের পর বেথুনের তুখোড় ছাত্রী ইলা সেন হলেন জমিদার পুত্রবধূ ইলা মিত্র। 

১৯৪৬ সালে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ পাশ করেন। 

 ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন ইলা মিত্র।

 ১৯৪৬ সালে  দিনাজপুরে কমরেড হাজী দানেশের প্রচেষ্টায় সূচিত হয় এক যুগান্তকারী তেভাগা আন্দোলন।কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি প্রান্তিক চাষীদের সংগঠিত করে আন্দোলনকে জোরদার করতে থাকে। পার্টি থেকে রমেন্দ্র মিত্রকে গ্রামের কৃষক সমাজের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা থেকে নিজ গ্রাম রামচন্দ্রপুর হাটে পাঠালে স্বামীর সাথে ইলা মিত্র সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন।

১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে কমিউনিস্ট পার্টি দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজ করতে এগিয়ে আসে। এসময় ইলা মিত্র নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধ্বস্ত হাসনাবাদে পুনর্বাসনের কাজে চলে যান।  নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করছিলেন। ইলা মিত্রের এই সাহসী পদক্ষেপ সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হবার পর ইলা মিত্রের পরিবারের জমিদারি অঞ্চল রামচন্দ্রপুর হাট পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার বর্তমান চাপাই নবাবগঞ্জ জেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভারতে চলে যায়। কিন্তু ইলা মিত্রের শাশুড়ি পুর্ব পাকিস্তানে  থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ইলা মিত্র ও তাঁর স্বামী  রমেন্দ্র মিত্র পূর্ব-পাকিস্তানেই রয়ে গেলেন। পাকিস্তান হবার পরও তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে। পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক স্থানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন হয়। মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হলে তারা কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করে। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পার্টির শীর্ষ স্থানীয় হিন্দু নেতাদের প্রায় সকলকেই দেশ ছাড়া করা হয়। সরকারের এই দমননীতির ফলে কমিউনিস্টও কৃষক আন্দোলনের নেতারা আত্মগোপন করে কাজ করতে থাকেন। ইলা মিত্র এবং রমেন্দ্র মিত্রও নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে আত্মগোপন করে থাকেন।
কমিউনিস্ট  রমেন্দ্র মিত্র  আগেই জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ও মোহ ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িছেন।  স্বামীই ইলা মিত্রকে  আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন।

 ১৯৪৮ সালে ইলা মিত্র ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান প্রসবের জন্য তিনি গোপনে কলকাতায় যান। পুত্র সন্তান জন্মের মাসখানেকের মধ্যে ফিরে আসেন নাচোলে। 

১৯৪৯ সালে ইলা মিত্রের  নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়। সবাই মিলে জোতদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে জোতদার, মহাজনদের দল।

১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রহনপুর থেকে গ্রেফতার হন ইলা মিত্র। তার ১ দিন পর নাচোলে নিয়ে যাওয়া হয়। যাত্রাপথে পুলিশ ইলা মিত্রকে নির্মম নির্যাতন করে। একটা সেলের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইলা মিত্রকে। চলে নির্মম অকথ্য অমানুষিক নির্যাতন। সেলের মধ্যে আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়নি। নির্যাতন করতে করতে অজ্ঞান করে ফেলা হয়।

১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি যখন ইলা মিত্রের  জ্ঞান ফিরে এলো তখন  দেহ থেকে রক্ত ঝরছিল। রক্তে কাপড়-চোপড় ভিজে গেছে। এরপর ইলা মিত্রকে  নবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি নবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে ইলা মিত্রকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।  সেখানকার জেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

১৯৫৩ সালে ইলা মিত্রকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।  ঢাকা ছিল উত্তপ্ত। কমরেড ইলা মিত্র ও তার সহযোদ্ধারা তখন ছাত্র জনতার চোখে অত্যন্ত সম্মানের পাত্র। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। 

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নির্দেশে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। ইলা মিত্র  কলকাতায় চলে যান। সুস্থ হয়ে তিনি কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৬২ সালে কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে  পশ্চিমবাংলার মানিকতলা আসন থেকে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬২ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরন করেন।

১৯৬৭ সালে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন।পশ্চিম বাংলার বিধান সভার কমিউনিষ্ট পার্টির ডেপুটি লিডার হন।

১৯৭০ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরন করেন।

১৯৭১ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরন করেন।

১৯৭১ সালে  ইলা মিত্র ও তাঁর স্বামী রমেন মিত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভবে জনমত গড়ে তোলেন।মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সদর দপ্তর ছিল কলকাতায় ইলামিত্রের বাড়ী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পশ্চিম বাংলার বিধান সভায় বক্তব্য রাখেন। শরনার্থী শিবিরে খাদ্য সরবরাহসহ প্রতিটি কাজে বিশাল ভুমিকা রাখেন।

১৯৭২ সালে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন  কমিউনিস্ট পার্টির  ডেপুটি লিডার হন।

১৯৭২ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরন করেন।

১৯৭৮ সালে  মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। 

১৯৬২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে তিনি পাঁচবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন।

 ইলা মিত্র বেশ কয়েকটি রুশ গ্রন্থ অনুবাদ করেন।জেলখানার চিঠি,হিরোশিমার মেয়ে,মনে প্রাণে-২ খণ্ড,
লেনিনের জীবনী,রাশিয়ার ছোট গল্প।

হিরোশিমার মেয়ে বইটির জন্য তিনি 'সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু' পুরস্কার লাভ করেন। এ্যাথলেটিক অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরস্কার লাভ করেন।  ভারত সরকার তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বতন্ত্র সৈনিক সম্মানে "তাম্রপত্র পদক" এ ভূষিত করে সম্মানিত করে। কবি গোলাম কুদ্দুস তাকে নিয়ে 'ইলা মিত্র' কবিতায় লেখেন "ইলা মিত্র স্তালিন নন্দিনী, ইলা মিত্র ফুচিকের বোন"।

২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় কমরেড ইলা মিত্র  মৃত্যুবরন করেন।

২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবদানের জন্য ইলা মিত্র ও তাঁর স্বামী রমেন মিত্রকে  " মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী " সম্মাননা দেয়া হয়।

বাংলাদেশের চাপাই নবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থানার কেন্দুয়া পঞ্চানন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্মুখে ইলা মিত্রের স্মৃতি স্তম্ভ করা হয়েছে। 


বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোহর জেলার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার বাগুটিয়ার ১১৬ নং মৌজার ২৪৪৫ নং দাগের উপর বাড়ীসহ মোট ৮৪ বিঘা জমি সব অন্যের দখলে আছে। চুন সুরকীতে তৈরী বাড়ীটি বেহাল দশা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ