♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
(০৮)
♣জ্যান্ত ভাষা ও মড়া ভাষা♣
মেঘ-রোদের মা-বাবা কোভিড হাসপাতালে কাজ করছে। ওদের টানা ডিউটি থাকলে মেঘ-রোদ চলে আসে মামার বাড়ি। টেস্টে মা-বাবার করোনা নিগেটিভ এলে ওরা চলে যায় ঢাকায়। ওরা এখন রাজধানীতে। এভাবেই চলছে ওদের করোনাকাল। ঢাকা টু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-- ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু ঢাকা। তাই এখন দাদুভাইয়ের আসরে চার জন শ্রোতা।
আজ ঐশী ও হিয়ার মধ্যে একটু ক্ষুব্ধ ভাব দেখা গেল। অভিমানের সুরে ঐশী বলল,
---- দাদুভাই, তুমি প্রতিদিন খালি প্যাঁচালই পারছ! এত কথা বলছ কিন্তু আমাদের ব্যাকরণ পড়াবে কবে? তোমার স্বরবর্ণের কথাই তো শেষ হল না! আগামি মাসেই তো স্কুল খুলে যাবে মনে হচ্ছে! দাদুভাই সে কথায় কান না-দিয়ে বেসুরো গলায় রবীন্দ্রনাথের একটি গান ধরলেন-- "শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে!/
সাঙ্গ হলে মেঘের পালা/শুরু হবে বৃষ্টি ঢালা-----।" বুঝলে কিছু? এবার সেই
অভিযোগ শুনে দাদুভাই বললেন,
---- আমি তো তোমাদের ব্যাকরণ পড়াচ্ছি না! আর ব্যাকরণ আমি জানিও না! তা পড়াবেন তোমাদের স্কুলের শিক্ষক। আমি তোমাদের সঙ্গে একটু-আধটু গল্পই করতে পারি।
এবার দাদুভাই মূল কথায় মোড় ঘুরিয়ে বললেন,
---- তোমরা আগেই জেনেছ, বিদ্যাসাগর পুরনো ষোলোটি স্বরবর্ণ থেকে চারটি বাদ দিয়ে বারোটি রেখেছিলেন। পরে পণ্ডিতেরা অকেজো লি-কে (৯) বাদ দিয়ে এগারোটা রাখেন। তবে স্বরধ্বনির যে সংজ্ঞা তোমরা জেনেছ তাতে কিন্তু ঋ-কে (রি) স্বরবর্ণ বলে মানা যায় না!
তবে সংস্কৃত ভাষার অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার করছি বলে সেভাষার বানানও আমরা মেনে নিয়েছি। নইলে ঋতুকে রিতু, ঋণকে রিন, ঋষিকে রিশিই আমরা লিখতে পারতাম! কিন্তু তা তো আপাতত হবার নয়! সংস্কৃত মড়া ভাষা হলেও সেভাষা আমাদের কাছে মহাজনের মত। আর আমরা যেন রায়ত। কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও আমরা কিন্তু ওই মড়া ভাষাটি থেকে অনেক নিয়েছি এবং তা আমরা কখনও পরিশোধ করতে পারব না! সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার নাড়ির সম্পর্ক আছে-- বলা যায় রক্তের সম্পর্কও। দুই ভাষাই একই ভাষাবংশের। সরাসরি মায়েঝিয়ের সম্পর্ক না-হলেও পৈঠদাদা বা বড়বাপের সঙ্গে আমাদের যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক তেমনই বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার সম্পর্ক।
---- আচ্ছা দাদুভাই, তুমি বারবার "মরা ভাষা, মরা ভাষা" বলছ কেন? তাহলে জ্যান্ত ভাষাও নিশ্চয়ই আছে?
---- হ্যাঁ, তা তো আছেই। তবে 'মরা ও মড়া' দুটি শব্দের বানানের প্রতি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। দুটি বানানই শুদ্ধ তবে অর্থ আলাদা। তাই যখন বলব তখন উচ্চারণ আর যখন লিখব তখন অর্থ ঠিক রেখে বানান লিখতে হবে।
মনে রাখবে, ব-য়ে বিন্দু র দিয়ে 'মরা' শব্দটি ক্রিয়াপদ মানে মৃত্যু হয়েছে এমন। আর 'মড়া' হল বিশেষ্যপদ মানে 'মৃতদেহ' বা শব'। যেমন--' মরা' মানুষ দ্রুত সৎকার করতে হবে। আর সে 'মড়া' সৎকার করতে গেল।
আশা করি এবার তোমরা পার্থক্যটি বুঝতে পেরেছ।
---- পৃথিবীতে মড়াভাষা যেমন আছে তেমনই জীবিত ভাষাও আছে। তোমরা জান, বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের মত ভাষা আছে। আবার অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়েছে। যে ভাষায় পৃথিবীর কোনও অঞ্চলের মানুষ আর কথা বলে না কিন্তু একসময় বলত সেই ভাষাই মৃত ভাষা। আর যেভাষা এখনও পৃথিবীর কোনও অঞ্চলে বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কথাবার্তা ও ভাব বিনিময়ে প্রচলিত আছে সেই ভাষাকে জীবন্ত ভাষা বলে। আমাদের এই ভারত-উপমহাদেশে সংস্কৃত, পালি, অবহঠট ও অনেক প্রাকৃত ভাষা মৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেসব ভাষায় লেখা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং উন্নত সাহিত্য রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থ বেদ-উপনিষদ বর্তমানে মৃত সংস্কৃত ভাষায় লেখা। বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক পালি ভাষায় লেখা। পালিও বর্তমানে মৃত ভাষা।
কিন্তু বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি ইত্যাদি জীবিত ভাষার উদাহরণ। পৃথিবীর উন্নত সব জীবিত ভাষারই কথ্য ও লিখিত রূপ আছে। তবে অনেক জীবিত ভাষার কেবল কথ্যরূপ আছে কিন্তু লেখ্যরূপ নেই। আমাদের দেশেও অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা আছে যেভাষায় কেবল কথা বলা হয় কিন্তু এর লিখিত রূপ নেই। যেমন গাড়ো, হাজং, চাকমা, মনিপুরী ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় কেবল কথা বলা যায় কিন্তু এগুলোর লেখার নিজস্ব বর্ণমালা নেই। লিখলে অন্য ভাষার বর্ণমালা ব্যবহার করে লিখতে হয়-- যেমন তোমরা কখনও ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে বাংলায় ম্যাসেজ লেখ! কিন্তু বাংলা পৃথিবীর অন্যতম জীবন্ত ভাষা। বাংলা ভাষার যেমন বিচিত্র কথ্যরূপ তেমনই উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত লেখ্যরূপ বর্ণমালাও রয়েছে। তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা পৃথিবীর অন্যতম সেরা ভাষা। সম্প্রতি পৃথিবীর সব ভাষার ওপর এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে উচ্চারণ ও প্রকাশভঙ্গির চমৎকারিত্বে বাংলা পৃথিবীর মধুরতম ভাষা! এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।
0 মন্তব্যসমূহ