সাম্প্রতিক বাংলা গদ্য কবিতার ছন্দ
তৈমুর খান
----------------------------------------------------------------------
সাম্প্রতিক বাংলা গদ্য কবিতার ছন্দ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়। বাংলা গদ্য কবিতার ছন্দ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের প্রথমেই মেনে নিতে হবে যে, এটি প্রথাগত ছন্দের (অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত) মতো কোনো গাণিতিক নিয়মে বাঁধা নয়। এর ছন্দটি হলো 'অন্তর্লীন' (internal rhythm) এবং 'জৈব' (organic rhythm)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'পুনশ্চ' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা গদ্য কবিতার যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিলেন, সাম্প্রতিককালের কবিরা তাকে আরও বহু দূর নিয়ে গেছেন। আজকের গদ্য কবিতার ছন্দ মূলত দাঁড়িয়ে আছে কবির নিজস্ব কণ্ঠস্বর, বলার ভঙ্গি, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং ভাবপ্রকাশের তীব্রতার ওপর।
সাম্প্রতিককালের এই গদ্য কবিতার ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উদাহরণসহ আলোচন করলে আমরা বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারব।
সাম্প্রতিক গদ্য কবিতার ছন্দের মূল ভিত্তি
প্রথাগত কবিতায় যেমন মাত্রা গণনা করে পর্ব ভাগ করা হয়, গদ্য কবিতায় তা হয় না। এখানে ছন্দের মূল কারিগর হলো:
১. বাক্যবন্ধ ও যতি (Phrasing and Pauses): কবি কোথায় থামছেন, কোথায় শ্বাস নিচ্ছেন এবং বাক্যটিকে কতটুকু দীর্ঘ বা হ্রস্ব করছেন—এর ওপর ছন্দ নির্ভর করে। এই থামাটা ব্যাকরণগত যতির চেয়েও বেশি আবেগগত যতি।
২. কথ্যরীতির চলন (Cadence of Colloquial Speech): সাম্প্রতিক কবিতা ভীষণভাবে মুখের ভাষার কাছাকাছি। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে কথা বলি, তার নিজস্ব একটা ঢেউ বা দোলা আছে। গদ্য কবিতা সেই স্বাভাবিক কথার 'চলন' বা 'লয়' (gait/cadence) ব্যবহার করে।
৩. পুনরাবৃত্তি ও সমান্তরালতা (Repetition and Parallelism): একই শব্দ, শব্দবন্ধ বা বাক্যের কাঠামোর পুনরাবৃত্তি গদ্য কবিতায় এক ধরনের শক্তিশালী 'বিঁট' (beat) বা স্পন্দন তৈরি করে। এটি পাঠকের মনে একটি ধ্বনিগত অভিঘাত সৃষ্টি করে।
৪. চিত্রকল্পের বিন্যাস (Arrangement of Imagery): একের পর এক চিত্রকল্পের দ্রুত বা ধীর আগমনও কবিতার গতি ও ছন্দ নির্ধারণ করে।
উদাহরণ ও বিশ্লেষণ:
আমরা সাম্প্রতিককালের কয়েকজন বিশিষ্ট কবির লেখার উদাহরণ দিয়ে এই ছন্দের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা করব।
উদাহরণ ১: জয় গোস্বামী
জয় গোস্বামী তাঁর দীর্ঘ কাব্যিক জীবনে ছন্দের নানা ভাঙাগড়া করেছেন। তাঁর সাম্প্রতিক গদ্যধর্মী লেখাগুলোতে এক ধরনের প্রবহমানতা বা 'স্রোত' দেখা যায়। তাঁর ছন্দটি তৈরি হয় দীর্ঘ বাক্যের একটানা প্রবাহ এবং হঠাৎ ছোট বাক্যের ধাক্কায়।
নমুনা:
"যেভাবে বৃষ্টি পড়ে, সেভাবে তোমার কথা মনে পড়ে। রাস্তা ভিজে যাচ্ছে, গাছের পাতা ভিজে যাচ্ছে, ট্রামের ছাদ ভিজে যাচ্ছে, আর আমার মনের ভেতর একটা পুরোনো ছাতা খোলার শব্দ হচ্ছে। তুমি নেই, অথচ এই শহর জুড়ে তোমার না-থাকার একটা ভিড় জমে আছে।" (কাল্পনিক উদাহরণ, কবির শৈলী অনুকরণে)
ছন্দ বিশ্লেষণ:
এখানে লক্ষ করুন, প্রথম বাক্যটি একটি উপমা দিয়ে শুরু হচ্ছে যা একটি সুর তৈরি করে। পরের দীর্ঘ বাক্যটিতে "ভিজে যাচ্ছে" শব্দবন্ধের পুনরাবৃত্তি একটি দুলুনি বা 'রিদম' তৈরি করছে (রাস্তা ভিজে যাচ্ছে / গাছের পাতা ভিজে যাচ্ছে / ট্রামের ছাদ ভিজে যাচ্ছে)। এটি গদ্যের মতো সাজানো হলেও পড়ার সময় আমরা এই পুনরাবৃত্তির ঝোঁক অনুভব করি। শেষের বাক্যটি আবার একটি আবেগের ঘনত্ব তৈরি করে ছন্দটিকে ধীর করে দেয়। এই যে কথার 'ঢেউ'—এটাই এর ছন্দ।
উদাহরণ ২: শ্রীজাত
শ্রীজাতর কবিতায় এক ধরণের নাগরিক কথ্যভঙ্গি এবং আপাত সরলতা থাকে। তাঁর গদ্য কবিতার ছন্দটি মূলত 'কথোপকথনের ছন্দ' (conversational rhythm)। যেন কবি পাঠকের খুব কাছে বসে নিচু স্বরে কথা বলছেন।
নমুনা (কবির 'উড়ন্ত সব জোকার' বা সমসাময়িক গদ্যভঙ্গির অনুকরণে):
"মনখারাপের কোনো নির্দিষ্ট স্টেশন নেই। ওটা যেকোনো প্ল্যাটফর্মে হুট করে নেমে পড়তে পারে। তুমি হয়তো ভাবছ ব্যান্ডেল লোকাল ধরবে, ভিড় ঠেলে জানলার ধারে বসবে, কিন্তু দেখবে তোমার পাশে এসে বসেছে একরাশ মেঘলা আকাশ। টিকিট চেকার এলে তুমি মেঘের দিকে আঙুল দেখাও, সে হাসে।"
ছন্দ বিশ্লেষণ:
এই অংশটি পড়লে মনে হয় না কোনো কবিতা পড়ছি, মনে হয় কেউ গল্প করছে। কিন্তু এর ভেতরেও ছন্দ আছে। বাক্যগুলো ছোট ছোট, দ্রুত লয়ের। "হুট করে নেমে পড়তে পারে"—এই অংশে 'হুট' শব্দটির ব্যবহার গদ্যের গতিকে হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। এখানে ছন্দটি তৈরি হচ্ছে বাক্যের দৈর্ঘ্যের বৈচিত্র্য (sentence length variation) এবং আটপৌরে শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে। পাঠক শ্বাস নেওয়ার জন্য যেখানে থামছেন, সেটাই এর যতি।
উদাহরণ ৩: বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সাম্প্রতিক তরুণ প্রজন্মের শৈলী
সাম্প্রতিক তরুণ কবিদের গদ্য কবিতায় অনেক সময় এক ধরণের অস্থিরতা, খণ্ডন (fragmentation) এবং দ্রুত লয় দেখা যায়। শহরের কোলাহল, বিচ্ছিন্নতা এবং ডিজিটাল যুগের দ্রুততা তাদের ছন্দে প্রভাব ফেলে।
নমুনা (সাম্প্রতিক গদ্যরীতির অনুকরণে):
"স্ক্রল করছি। নিউজফিড। যুদ্ধ। বিড়ালের ভিডিও। আবার যুদ্ধ। তোমার লাস্ট সিন টুডে অ্যাট ৯:৩০ পিএম। একটা মেসেজ টাইপ করে মুছে ফেলা। শহরটা আসলে একটা ডিলিটেড মেসেজের ডাস্টবিন। আমরা সবাই রিসাইকেল বিন-এ অপেক্ষা করছি।"
ছন্দ বিশ্লেষণ:
এখানে ছন্দটি 'স্ট্যাকাটো' (staccato) বা বিচ্ছিন্ন। ছোট ছোট শব্দ বা শব্দবন্ধ—"যুদ্ধ", "বিড়ালের ভিডিও"—যেন এক একটা দ্রুত ধাক্কা। এই ছন্দটি আধুনিক জীবনের অস্থিরতার প্রতীক। এখানে প্রথাগত কোনো দোলা নেই, বরং আছে এক ধরনের যান্ত্রিক দ্রুততা এবং হঠাৎ থেমে যাওয়া। "স্ক্রল করছি"—এই ক্রিয়াপদটিই কবিতার গতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
এই গদ্য ছন্দ হলো মুক্তির ছন্দ:
সাম্প্রতিক গদ্য কবিতার ছন্দকে বলা যেতে পারে 'মুক্তির ছন্দ'। এটি পয়ার বা মাত্রাবৃত্তের শিকল ভাঙা ছন্দ। কিন্তু মুক্তি মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। একজন দক্ষ কবি গদ্যের এই আপাত স্বাধীনতাকে ব্যবহার করেই পাঠকের হৃদয়ে দোলা দেন।
এই ছন্দ বোঝার জন্য কান তৈরি করতে হয়। শব্দগুলো কীভাবে সাজালে তা গদ্য হয়েও গদ্যের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি সাধারণ বাক্য হঠাৎ করে মন্ত্রের মতো বেজে ওঠে—সেটাই সাম্প্রতিক গদ্য কবিতার ছন্দের আসল রহস্য। এটি বাইরের কোনো কাঠামো নয়, কবিতার ভেতরের স্পন্দন।
0 মন্তব্যসমূহ