প্রসঙ্গ:আলিয়া।। মণ্টু দাস
বেশ কয়েক দিন ধরে 'আলিয়া'শব্দটি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠাকুমা আলিয়ার খুব যত্ন নিতেন। তুষ কমে গেলে দিতেন। বেশি বাতাস দিলে তাকে কিছু দিয়ে আড়াল করতেন। আমি ছোটবেলা এসব দেখেছি।আলিয়া হচ্ছে আগুন সংরক্ষণ করার একটা ব্যবস্থা। এটি একটি শ্রীহট্টীয় আঞ্চলিক শব্দ।সাধারণত পুরানো লোহার কড়াইয়ে ধানের তুষ দিয়ে তাতে একটি টিকি জ্বালিয়ে রাখা হতো।টিকি জ্বলে তুষে আগুন ধরত।এই আগুন বাইরে দেখা যায়না। ভেতরে ভেতরে জ্বলে। এই সংরক্ষিত আগুন থেকে বাড়ির সকল কাজ হতো। রান্নার চুলা জ্বালানো, তামাকের ছিলিম ধরানো, সিগারেট- বিড়ি খাওয়া। বাইরে থেকে কেউ এলে আগুন ছুঁয়ে ঘরে ঢোকা ইত্যাদি। বিশেষ করে আতুড় ঘরে 'আলিয়া'জ্বালানো বাধ্যতামূলক ছিল। এখনো কোথাও কোথাও এই প্রথা রয়েছে। সেসময়
ম্যাচলাইট কিংবা দিয়াশলাই এর কোন প্রয়োজন পড়তনা। আগুন সংরক্ষণের এ এক প্রাচীন পদ্ধতি। পুরনো দিনের মানুষরা এভাবে আগুন সংরক্ষণ করত।সে সময় ম্যাচ এত সহজলভ্য ছিলনা। বয়কট আন্দোলনের সময় অন্যান্য জিনিসের সাথে ব্রিটিশের ম্যাচকেও বর্জন করা হয়েছিল। বিকল্প হিসেবে জাপানি ম্যাচ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এগুলো সহজে জ্বলতনা। আমি অনেক সময় ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন করলে ঠাকুমা রাগ করে বলতেন --'ইতা বিটিশর বানাইল'। ব্রিটিশ কী সেটা জানতাম না। এটা বুঝতাম ঠাকুমা ওদের পছন্দ করেন না। বড় হয়ে বুঝেছি দাদু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
সে যাহোক আলিয়া প্রসঙ্গে আসা যাক। 'আলিয়া' আমাদের বাড়িতে স্বযত্নে সংরক্ষিত হতো। গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে 'আলিয়া'থাকতো। সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানুষ আগুন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে। খ্রীষ্টপূর্ব উনিশ হাজার বছর পূর্বে মানুষ আগুনের ব্যবহার আয়ত্ব করেছিল। এক সময় কাঠে কাঠে ঘষে আগুন জ্বালানো হতো। আবার পাথরে পাথরে ঘর্ষণ করে আগুন জ্বালানো হতো। আগুন আবিষ্কার সভ্যতার ইতিহাসে এক চুড়ান্ত ইতিবাচক ঘটনা। তাই আগুন সংরক্ষণ খুব জরুরী ছিল। ঠাকুমার কাছে কত পুরনো বিষয় দেখতাম।
তিনি বহু পুরানো দিনের মানুষ। প্রথম- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলতেন। ছত্রিশ বাংলার জলের কথা বলতেন। মনিপুরেরলোগতাগহ্রদেরজলেশ্রীহট্ট-কাছাড়ের নিম্ন অঞ্চল ভাসিয়ে দিয়েছিল।বৃষ্টি ছাড়াই জল।ঠাকুমারা আশ্চর্য হয়েছিলেন । এত জল কোথা থেকে আসে।পঁচানব্বই বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন । আলিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে বারবার ঠাকুমার কথা মনে পড়ে।
0 মন্তব্যসমূহ