হারাধন বৈরাগী
জন্ম:১১ অক্টোবর,১৯৬৪। জন্মস্থান তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ উপবিভাগের দিরাই থানার জটি গ্রাম।দেশভাগের পর ক্রমাগত ডাকাতের আক্রমণে পিতৃহারা স্বজনহারা পিতার সাথে উদ্বাস্তু হয়ে মাত্র এক বছর বয়সে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর জেলায় আগমন।বর্তমানে ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষাবিভাগের আধিকারিক হিসাবে কর্মরত। নেশায় সাহিত্য সাধক। কবিতা গল্প ও গদ্যে সাবলীল বিচরণ। "হাসমতি ত্রিপুরা", "হৃদি চম্প্রেঙ", "খুমপুই পাড়ায়"-কাব্যগ্রন্থ। "খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই" ত্রিপুরার জনজাতি জীবনের আদিহৃদিমালা একটি ব্যতিক্রমী গদ্যগ্রন্থ।
"হৃদয়ে রাইমা"-আত্ম উপন্যাস,"বুরাসা"-গল্পগ্রন্থ, "গোবিন্দ ধরের নদী,নদীর গোবিন্দ"-কাব্যআলোচনা গ্রন্থ।
সমকালীন ত্রিপুরার পনেরজন কবির কবিতা (যৌথসংকলন), ব্যাটিং জোন(অখণ্ড বাংলার নির্বাচিত অণুগল্প সংখ্যা-যৌথসংকলন ) । নীহারিকা নির্বাচিত ত্রিপুরার তরুণ কবিদের কবিতা(যৌথসংকলন)। ৫৪জন গল্পকারের ২১৬টি অণুগল্প (যৌথসংকলন)।তবু ভালোবেসে যাবো-যৌথ প্রেমের গল্প-সংকলন, ত্রিপুরার সাম্প্রতিক ছোটগল্প-যৌথ সংকলন,অষ্টমীর শাড়ির ক্যানভাস-যৌথ অনুগল্প সংকলন,
মধুমঙ্গল বিশ্বাস সম্পাদিত 'এক লাইনের কবিতা' -যৌথ সংকলন, ত্রিপুরার একশ গল্পকারের অনুগল্প-যৌথ সংকলন,নিয়মিত লিখে চলেছেন এপার অপারের সমসাময়িক বিবিধ পত্রসাহিত্য ও লিটলম্যাগাজিনে।
অসম্ভব-জঙ্গল-আউলিয়া।ভালোবাসা-জঙ্গল,জনজাতি,জুমজীবন,জীবন-নিকষ।
উজান মাছমারারিজার্ভফরেস্ট
১/
উত্তরে জুরী রিজার্ভ ফরেস্ট
দক্ষিণে কাঞ্চনপুর
পুবে জম্পুই পাহাড়
পশ্চিমে বালানল
মাঝখানে সুগভীর জঙ্গল
দেওলা ডহরের ঘোর।
২//
ঠেলে ঠেলে পথ করে
এই জঙ্গলে এসেছিল বাবা
শ্বাপদ বিপদ সব করেছিল দোসর
একটি বটের ঝুরির কাছে
করেছিল আস্তানা
বুরাসার ভয় ছিল সামনের দরজা
পেছনে ব্রহ্মদস্যির।
রাতের গভীরে ছিল স্বাপদের হানা।
৪/
উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্টের/
গভীরে গেলে /
বৃক্ষরা আমাকে জড়িয়ে ধরে/
একটি আওয়ালগাছ মাথায়/
হাতবুলিয়ে আদর করে।/
জড়িয়ে ধরে ভীষণ কান্না পায়/
তারও একটা অঙ্গ দেখি আমারই মতো/
চুরী করে নিয়ে গেছে কোনও চোরা শিকারি।/
৩/
আমার বাবার নাম বনমালী
মায়ের নাম কুসুম
আমার পিসির নাম কুসুম হওয়ায়
বামুন বিয়ের পিঁড়িতে মায়ের
নামাকরণ করে প্রভাসিনী
মা নিজেকে আজো কুসুমই মনে করেন।!
৪/
বসন্ত পা ফেলছে আবারো জঙ্গলে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট জুড়ে/
চমকাচ্ছে চামলের মৃতপত্র/
বাঁশের শীর্ণঝাড়ে
ডলুচোঙার দমকাড়া গন্ধ
মোহাবিষ্ট,গোটা রিজার্ভ ফরেস্ট!
৫/
চারদিকে অম্লজানের হাহাকার/
ভারী হয়ে উঠেছে জঙ্গলের বাতাস/
অসহায় আমার আত্মজ!/
চোখের উপর নেচে উঠেছে এক বন্ধ্যানারী/
চারপাশে শুধু গার্বেজ আর ডাস্টবিন/
ফাঁকে কিছু ওয়াটারবিয়ার আর অর্কিড।/
কে যেন ভেতর থেকে প্রশ্ন করে/
গর্ভে তো তোর অজস্র মনিমানিক্য/
তবে বোমেরাং কি তোর শুধুই মস্তিষ্ক!/
৬/
উড়ছে গোধূলি,উড়ছে গোধূলি---
সন্ধ্যাটা হেলে পড়ছে তারুমবনে
চারপাশে নেমে আসছে আলোআঁধারি।
ফুলের গন্ধ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সন্ধ্যার গন্ধ
ফুলের চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে সন্ধ্যার চোখ
ফুলের মুখ থেকে সন্ধ্যার মুখ।
ফুলের চোখে নেমে এসেছে ফোঁটা ফোঁটা জল
চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাল-ঝোনাকি
ডাকে আয়,লুকোচুরি নয়,প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
রাতের ষ্টেশন থেকে ভেসে আসছে-- শেষ হুইসেল
কানে কানে বাতাসের ফিসফিসানি
এখন কেন্দ্রগামীতা ছাড়া আর কোন খেলা নেই।
৭/
শহরের শ্বাসকষ্টগুলো ক্রমশ
হামাগুড়ি দিচ্ছে বয়সন্ধির গাঁয়ের দিকে
যেখানে শ্রাবন-বালক বালিকারা
কুড়িয়ে নিচ্ছে আঁজলা ভরে !
৮/
অবশেষে স্বৈরিনীচাঁদ
নেমেছে নৈশবিহারে
রক্তবরণ
শিরাউপশিরায় ছড়িয়ে চলেছে!
তুই কিপটেপনা ঝেরে ফেলে দে
মোঙ্গলীয় জঙ্গলের নাভিচরে
তোকে উপুর করে দে!
৯/
মাঝেমধ্যে পেছনে তাকাই
নিঃসঙ্গ মানুষটির মতো
তাকে স্পর্শ করতে চাই।
নদীর উজানে পায়ের চিহ্নে হাঁটি
দুধারেই জঙ্গল দুধারেই পাহাড়
ফিসফাস কথাশুনি লতাপাতার।
চোখের উপর ভেসে ওঠে
জুম টঙঘর নিভানো উনুন
প্রণয়কাঁটা কার্পাসফুল–
স্পর্শ করি একে একে সকল বকুল!
১০/
ঘরের অসুখ
শরীরে পাংশুটে দুর্বলতা
কোভিড নেগেটিভ
রক্তে নাকি লোহার অভাব
আজ যেন বাড়াবাড়ি
ডাক্তার পথ্য দিয়েছে ঢেঁকিশাক
এখানে ট্রাইবেলবাজার ছাড়া
এ অমিয় পাওয়া দুষ্কর।
মলমাস বিশুদ্ধ মতে
এমাসে শাকখাওয়া বারণ!
চারিদিকে ফিসফিসানি
মা আনন্দময়ীর আগমন
এবছর নাকি পূজা নিষ্ফলা!
নদীর এপারে সোরগোল উদ্বাস্তু সমস্যা
ওপারে কোভিডের বাড়াবাড়ি
এই অশনিসংকেতে মুখভার গোটাবনস্থলী
বিপ্লবীরা সকলেই তার স্মরণাগত।
শিউলি ঝরতে শুরু করেছে
নদীর চরে কিংবা তৈছার পারে
মুখ তুলে চেয়ে আছে অগুন্তি কাশফুল
ফুলের মাঝে যেন কামনার অতৃপ্ত চাউনি
ফুলের মাঝে যেন বেদনার শুকনো হাসি!
পশ্চিমে শৈলশিখর পেছনে
সূর্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে
নীচে নদী জঙ্গল স্কুলবাড়ি জংলীবস্তি
উপত্যকার উপরে ঝুলছে মিহি কুয়াশাচাদর
মাঝারি বৃষ্টির পর
নদীও শুরু করেছে ফিসফিসানি
পাতায় পাতায় খুসখুস কাশি
উত্তুঙ্গ জম্পুই যেন নীলাভ নারী
চোখে জল মোঙ্গলতনয়ার
হাটখোলা দরজাগুলো অনেকদিন ধরে বন্ধ
পরিযায়ীদের এখন আর দেয়না হাতছানি
ট্রাইবেল বাজারে
এসময় বাঁশকরুল আর ঢেঁকিশাক
নিয়ে রোজ আসত মিত্তিঙ্গাছড়ার মোঙ্গলী
ভাত শুঁটকি নুন দিয়াশলাই তার নিত্য-খুশির হাঁড়ি
তার দেখা নেই
তিপরাভূমি ধর্মঘট
ট্রাইবেল বাজার ফাঁকা
চারদিকে থমথম আবহাওয়া
মোড়ে মোড়ে ত্রিপুরাবলের টহলদারি।
অদূরে একটা নিয়নবাতি
টুংটাং কাঁচের আওয়াজ,মাতালকন্ঠ
পাশেই দাঁড়িয়ে লীলাময় পুলিশফাঁড়ি!
১১/
পাহাড় দিন দিন পাহাড় হতে চলেছে/
সমতল দিন দিন সমতল---/
পাহাড়ের সাথে সমতলের বিবাহ হলে /
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!/
একটা ধর্ম নীল হতে চলেছে/
একটা ধর্ম লাল---/
একটার সাথে আরেকটার বিবাহ হলে/
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!/
একটা জঙ্গল একটা সমতলকে/
রক্ত দিলে সমতল বেঁচে ওঠে/
একটা সমতল একটা জঙ্গলকে রক্ত দিলে/
জঙ্গল জেগে ওঠে/
একটা জাত আরেকটা জাতকে রক্তদিলে/
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!/
এক বাড়ির ক্রোমজোমের সাথে আরেক বাড়ির/ ক্রোমজোম চুম্বন খেলে জন্ম নেবে/
হোমোস্যাপিয়েন্স/
একজন পুরুষবাদীর সাথে একজন/
নারীবাদীর বিবাহ হলে জন্ম নেবে
হোমোস্যাপিয়েন্স!/
এই সরলতত্ত্ব একবিংশ শতাব্দীর/
একজন মানুষ জানে/
জানে একবিংশ শতকের একজন বরক/
একটা দেশ চলছে দেশের দিকে/
একটা পৃথিবী চলছে পৃথিবীর দিকে/
একটা দেশের সাথে পৃথিবীর বিবাহ হলে/
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!/
একজন নারী চলছে নারীর দিকে/
একজন পুরুষ চলছে পুরুষের দিকে/
একটা ধর্ম চলছে ধর্মের দিকে/
একটা পাহাড় পাহাড়ের দিকে/
একটা সমতল সমতলের দিকে/
বরক চলছে বরকের দিকে/
মানুষ চলছে মানুষের দিকে/
মানুষ ও বরকের মিলন হোক/
একথা বিশ্বাস হোক/
মানুষ অমানুষ বরক অবরক ধর্ম অধর্মের মিলন/ হলে জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!/
হোমোস্যাপিয়েন্সের গর্ভেই /
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স/
কেউই চায় না/
একজন মানুষ নিঃসঙ্গ হারিয়ে যাক মঙ্গল গ্রহে/
একজন মানুষ হয়ে যাক নিঃসঙ্গ ফরেস্টার/
একজন বরক উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট।/
১২/
আমার কৈশোরে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টও কিশোর ছিল/
আমার যুবকবেলা উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টও ---/
তার চোখে মুখে ছিল এক অদ্ভুত সারল্য/
লতাপাতায় বুনোফুল মৌপাখি,মৌপোক/
এখন আমি প্রৌঢ়,উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টও---/
সরল বৃক্ষগুলি এখন আর কোথাও নেই/
নেই ফুল-ফল পাখি ও সংগীত/
আমার চোখে এখন আলোআঁধারি/
মুখে দেঁতোহাসি/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টেরও/
ফরেস্ট তবে আমার মতো বেড়ে উঠলো কেন!/
১৩/
আমার বাবা ছিলেন শ্রীভূমি,মা-- কুমিল্লা/
আমি--,সিলেটের জাতক/
একটি জীবনদায়ী পরিযানের ঢেউএ /
আমি উজানের দেশে /
উজান মাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট!/
আমার ডাল-পালা ফুল-ফল পাখি ও সঙ্গীত/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট।/
এই ফরেস্টের পাশ দিয়েই বহতা মহাকাল দেও/
মনুর সাথে সঙ্গম শেষে কুশিয়ারায় মিশেছে।/
আমার গোরস্থান কি তবে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট নয়?/
আমার অন্তঃশয্যা দেওনদ নয়?/
১৪/
সন্ধ্যা নেমে এলেই কোলাহল থেমে যায়/
ক্রমশ ঘনীভূত আঁধারে ডুবে যায় /
সমগ্র রিজার্ভ ফরেস্ট।/
কোথাও কোথাও ফুটে উঠে ভৌতিক আলো/
নিশাচরেরা নেমে আসে জনপদপদে।/
রাতের নেশা পান করে /
চুর চুর হয়ে ওঠে একটি বুড়ো বটতলা/
অতপর পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটি ছড়ার/ গোঙানি সারা রাত শোনা যায়।/
ভোর হতে না হতেই জেগে ওঠে পাতার পাখিরা/
কিচিরমিচির জুড়ে দেয় শাখায় শাখায়/
উত্তুঙ্গ পাহাড় ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে/
নীলাভ আলোর রোশনাই।/
১৫/
মোঙ্গল-রাত ঝুঁকে পড়েছে /
উজান মাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্টের বুকের উপরে/
চারপাশে আউলা বাতাসের ছল/
ফুটে উঠছে ছল-ছলম জঙ্গলের নাভিফুলে!/
১৬/
উজানমাছমারার বুকে ঝুলে আছে /
একখণ্ড প্রগাঢ় শূন্যতা /
কড় কড় শব্দে চিবুচ্ছে ঝর্ণার উচ্ছলতা ----!/
১৭/
দিকে দিকে সোরগোল উঠেছে/
ভেসে উঠেছে সকল রিজার্ভ-ফরেস্ট/
বাতি আছে বাতি নেই/
বৃক্ষ আছে বৃক্ষ নেই/
জানালা আছে জানালা নেই/
কিছুই দেখা যায় না!/
এবার পুরজন জ্যোতিশী নগরনারী/
সকলের কপালে চাঁদোয়ার ফুটেজ!/
অসম্ভব বন্যাকবলিত এই রাজধানী শহর/
এবার থেকে আর গোঙানির পরিভাষা নেই !/
উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট /
আর ঘোলাটে নেই-পনচোখা ছড়া/
মং হেংগরঙ শিঙা সারেন্দার নেশা /
ডুঙ্গুরের নারকেলকুঞ্জ নিয়ন-জোসনা।/
রাজধানীর ব্রুইফাংগুলি ছাঁটা হয়েছে/
হরিগঙ্গা বসাক রোডে আর মেলা নেই/
আগের কোন আলোআঁধারি নেই/
চকচক করছে সকল আলোর বন্যা!/
বটতলার পুরোনো ব্রুইফাঙের/
মাথার উপর সাটানো হয়েছে রাজছত্র/
পুরোনো অন্ধকারের আর ঢাকনা নেই/
যেখানে ঢেকে রাখা হতো সকল উন্মাদনা।/
রাজছত্রের উপর দিয়ে উড়তে উড়তে/
এখন অনায়াসেই যাওয়া যায়/
দেখা যায় কিরাতের সকল উদরপ্রদেশ/
শিকার করতে একটা তীরই যথেষ্ট!/
ফকফকা দেখা যায় সব/
পূর্ণিমার জঙ্গলের মতো/
তিলকপাড়া থেকে পিলাকছড়া/
নুনছড়া থেকে ভালুকছড়া/
ডাক্তার-দুয়ার থেকে আন্দারছড়া/
খয়েরপুর থেকে কমলাপুর--/
প্রজারা তুলতুলে বুকের উপর/
ইচ্ছে মতো চলাফেরা করতে পারে/
কোথাও অতিমারী নেই!/
পথের সকল জঙ্গল ন্যাচারেল-পার্ক/
আগের মতো আড়াল নেই/
সিপাহীজলা ছাড়া বাঘ নেই/
পোষমানা হয়ে গেছে সকল রিপু।/
আবছায়া-আলিঙ্গন নেই কোথাও/
ভয়ডরের দুপাশেই ঘরবাড়ি/
নদী ও নারী--/
কোন ভ্রমণেই আর নেই মানা !/
প্রদেশজুড়ে এতো সিগনাল-পোস্ট/
তবে নদী বেয়ে দিবারাত্রি/
নেমে আসছে কেন এতো ঘুম/
চোখের উপর নেমে আসছে/
দুর্ভেদ্য পর্দার পর পর্দা--/
এতো আইম্মানি উঠছে কেন/
রিজার্ভ থেকে পাড়া/
সীমানা থেকে অন্তঃপুর--/
পোষমানা মায়ারা ফিরে যাচ্ছে/
মিয়ানী রিজার্ভের দিকে/
ফরেস্ট থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে/
অন্তঃকোষীয় মূর্চনা।/
এতো সব স্বর-গ্রাম!/
জঠরে অমিমাংসিত আগুন নিয়ে/
হরিগঙ্গা বসাকের বুকে/
লুটিয়ে পড়েছে কিরাতের জ্ঞানমা!/
অথচ সঙ্গম থেকে নীরব দূরে/
জঙ্গল থেকে ,পাড়া থেকে,শহর থেকে/
সিঁথিমউড়ের মতো রেখে আসছে/
কেউ কেউ হিমায়িত উষ্ণতার বস্তা।/
১৮/
আমার বাপ-কাকার সহপাঠী ছিল সন্তোষ দাস/
সুনামগঞ্জের এক দারোগার ছেলে/
আমাদের জটির বাড়িতে এসে দিনের পর দিন/
থাকতো,দুধকলা খেত/
ঘনঘন ডাকাত পড়তো বাড়িতে।/
বাড়ির মেয়েদের একটা কামরায় নিয়ে যাচ্ছে/ দেখে এক ডাকাত নাকিস্বরে বলে বসল/
কেউ মেয়েদের গায়ে হাত দিস না।/
স্বর বুঝে আমার দাদুর মাথা চড়ে গেল/
সহসা এক ডাকাত বুজালি দিয়ে আমার দাদুকে!
১৯/
আমার দাদুর গোরস্থান শ্রীভূমির জটিগ্রাম
আমার দাদীর উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট।/
বাপ-কাকা-কাকী,ভাই-বোনের/
গোরস্থানও দাদীর পাশে।/
গোটা বাড়িটাই এখন আমাদের কবরস্থান/
মৃতমথ ও শূন্যতার এক হাহাকার বাগান।/
আমার গোরস্থান আমার সাথীর গোরস্থান/
হাহাকার করবে তো একদিন এই শূন্যতা জুড়ে?/
২০/
আমার নাড়ির সাথে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের/
নাভি জুড়ে আছে।/
আমি আজো যাই সেখানে
আমার পর আমার বংশধর কী
যাবে তো সেখানে?/
২১/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের
গালিচায়/
শুয়ে আছে একটি নিঃসঙ্গ বোতল/
ধূনি জ্বলছে/
মাক্তই পুড়ছে/
আকাশ ঝুলে পড়েছে মাথার উপর।/
২২/
বৃক্ষের মগডালে ঝুলছে/
প্রতিশ্রুতির উল্থিত লিঙ্গগুলি/
পুষ্পবতি নিষ্পলক---/
এলিয়ে রয়েছে ভৈরবতলায়/
উল্কাপাতের প্রত্যাশিত/
সুড়সুড়ি নাভি থেকে শিরায়/
শিরা থেকে উপশিরায---!/
২৩/
আদিমতাই তোমার পরিচয়
তোমার শরীর তোমাকেই চায়?
রাত নেমে এলেই নিশাচর ডাকে
একটা নীল-আলো সন্তর্পণে
নেমে আসে জনপদ পদে।
দখিনের জানালা খোলা
হাওয়া দ্রুতলয়ে ঢুকে ঘরে
জেগে ওঠে আদিম কলোনী
প্রথম প্রেমের মরা চুমুক দেয়
মদের গেলাসে।
২৪/
একটা মুক্তদরজা থেকে /
বন্ধ দরজার দিকে /
ওরা মুরগির মতো ছুটছে
শ্লোকমালা আওড়ে চলেছেন ব্যাসদেব।
২৫/
মেলার ভেতর বসেছে আরেক মেলা /
গাঙ্গিনীকুণ্ডপাড়ে যজ্ঞের আড়কাঠি/
ঝুলে আছে কুয়াশার বৈদিকচাঁদর /
আলোআঁধারির আল্পনায় আঁকা/
গোটা উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট।/
কদমা কমলা বাতাসা জিলিপির /
আতপগন্ধে ম ম বনস্থলী/
ভোমরা যেন জঙ্গলের বাতাস/
শীতকাতর গাছগুলো নেশাগ্রস্থ !/
২৬/
চোখ মেলতেই তুমি/
তোমাকে দেখেই প্রথম কান্না পায়/
উজানমাছমারা রিজার্ভ পাড়ায়!/
এখনও দেখছি তোমাকেই/
এখনও কান্না পায় আমার/
মাখছি তোমার সকল আগুনরেণু/
মধুপ রেণু মেখে যেমন উড়ে--যায়/
তুমিও থাকো অধীর প্রতিক্ষায়।/
এমন কান্না পায় কেন?/
কেন এতো আগুন নিয়ে/
তাকাও আমারই দিকে/
আর নিঃশেষে সমর্পন করি/
আমার যা কিছু মুক্ত-বন্ধ-অহম/
বাসন্তী,তোমারই আল্পনায়/
তিয়াস আর মেটে না---/
এক প্রোটোটাইপ কলোনী পাড়ায়/
চক্রবর্তীছড়ার পাড়ে এসেও দেখি/
বাক্য থেকে বাক্যান্তরে,এখানেও তুমি/
বগলামুখি ,বিবসনা দেবী আমার!/
আমারই প্রতিক্ষায়---/
আর নিশিলাগা ঘোর দিয়ে/
তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি /
কত অছিলায় তন্নতন্ন/
আলোছায়া করেছি/
কিছুই রাখিনি,কান্নাজলে/
সকলই সমর্পন করেছি!/
ফিরতে চেয়ে দেখি/
কুড়িয়ে বাড়িয়ে ধনুর্ধর আমি/
মুহুরী নদীর পাড়ায়/
আমার সকল নির্জনতার বাঁকে--/
ফের এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি/
ডাকছো সেই আগুন আল্পনায়/
জাম্পুই সাখান শেরমুন রঘুনন্দন/
ফেংফুই কালাঝারির পরাঅপরায়/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে/
খুমপুইপাড়ায়,তৈনানী থেকে বাইখোড়ায়/
ফেনীর জোয়ারভাটায় /
জীবনের সকল সমর্পনরেখায়/
আজও জীবন জুয়াড়ি আমি/
প্রেয়সী-তোমারই অনন্ত মুদ্রায়।/
২৭/
উজানমাছমারা,রিজার্ভ ফরেস্টের বুকে/
আর,উদাস জঙ্গল নেই/
মাতাল বাতাস নেই/
নেই তিপরাই-বাঁশির কুহক!/
একদিকে রাণীর মা'র বাজার/
অন্যদিকে লালজুরি বাজার/
মাঝখানে হৃদয়-যোজক স্বস্তিসমিতি পথ/
সমগ্র জঙ্গল জুড়ে শোনা যায় দিনরাত/
দেও ও জুড়ি পাগলীর খলবল/
মাঝেমধ্যে ধুপধাপ নামে ধ্বস!/
২৮/
বাবা পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে/
এসেছেন এই কিরাতপুরে/
আর এখানে এসে থিতু হোন /
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট।/
তারও আগে চাটগাঁ থেকে পরং করে/
এসেছেন বাবার বয়সী মনাচাকমা।/
একখণ্ড অনাবাদী জমি কিনেন বাবা /
তার কাছ থেকে থোক টাকার বিনিময়ে।/
একটি নাগেশ্বর গাছের উপর উঠে/
দক্ষিণে একটি গামাই গাছ/
একটি কড়ই গাছ থেকে পশ্চিমে
একটি আওয়াল গাছ/
আঙুল দিয়ে চৌহদ্দি দেখান মনাকাকা।/
জমি আবাদ করতে শুরু করলে/
মাঝেমধ্যে ময়ালসাপপুড়া হাতে নিয়ে/
বাবার কাছে এসে বসতেন মনাকাকা/
আর ছাঁই ছাড়িয়ে টুকরোগুলো/
মুখে পুরতে পুরতে বলতেন/
তার দেজগাঙ কর্ণফুলির কথা।/
বাবাও মুড়ি মুখে ছুঁড়তে ছুঁড়তে/
বলতেন তার দেশগাঙ সুরমানদীর কথা।/
দুজনেরই শ্বাস উঠতে দেখতাম/
সহোদরের মতো-বুকচাপা।/
২৯/
বসন্ত পা ফেলছে আবারো জঙ্গলে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ জুড়ে/
চমকাচ্ছে চামলের মৃতপত্র/
বাঁশের শীর্ণঝাড়ে /
ডলুচোঙার দমকাড়া গন্ধ/
মোহাবিষ্ট গোটা রিজার্ভ ফরেস্ট!/
৩০/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে
দূরে নও তুমি/
দোলকের গান থেকে পদাবলী থেকে/
অনেক যোজন-তোমার অপার অবয়ব/
চকিত হরিনী,চামল-রিঠার জঙ্গলে/
উড়াও রোজ সুন্দিফুল।/
পরিযায়ী যুবকের অঙ্কশায়িনী থেকে/
কোন ছুৎমার্গ নেই কখনও/
গরীমা নেই সতীচ্ছদ নিয়ে/
গর্ভ-কেশরে ধারণ করো কাঙ্ক্ষিত বকুল/
ধর্ষণ নেই তবু জিনলিপির ভেতরে/
আগাছা নেই,পতনের বুদবুদ নেই/
বারংবার তাই ঘুরে ফিরে আসি তোমারই কাছে/
ঘন্টাপোকার মতো লাভডাব ওঠে সমগ্র রেংদিল/ জুড়ে,তুমি শুধু তুমি/
বনলতায়,শুধু তুমি--/
আর সমর্পণ করি
আমার যা কিছু মুক্তবন্ধ অহম
বাসন্তি ,তোমারই ঔরসে ।/
৩১/
মেলার ভেতর আরেক মেলা/
উত্তরায়ণ বুঝি ঘনীভূত /
শীত ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু/
ফাগুনমাস সমাগত/
প্রতিস্রুতির প্রলম্বিত ছায়া।/
মন্ত্রে ঘর্মাক্ত গাঙ্গিনীকুণ্ড/
বিসর্জিত অস্থির উপর/
ব্রাহ্মনের বলিবজ্র।/
লৌকিক মানুষ/
নিরত মস্তক মুন্ডনে/
পেছনের মুন্ডটির চুলে /
ঝুলে আছে দৈবনাপিত।/
৩২/
নিজেকে দেখতে
এখন আর আয়না লাগে না
উজানমাছমারা রিজার্ভফরেস্টেই
ফুটে ওঠে আমার চেহারা !
৩৩/
সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উঠে আসছে নিঃশ্বাস/
আলোর সঙ্গমে আগুন জেলে/
চলে যাচ্ছে পাশ ফিরে সহগমনের লঙ্গাই রিভার/
মানুষ নামের ভুল আস্তাবলে/
ছড়িয়ে পড়ছে পৃথকত্তবাদীদের লিফলেট।/
ধুলো উড়ছে বন থেকে বনাঞ্চলে/
বন থেকে চরাচরে, পাহাড় থেকে সমতলে/
শিবির থেকে শিবিরে।/
ধুলো উড়ছে তোমার আমারই চোখে।/
ভাইয়ের পাশ থেকে ভাই/
ভাইয়ের পাশ থেকে বোন/
পাশ ফিরে চলে যাচ্ছে জলের কপট অন্ধকারে।/
ধূলোর রেণু উড়ছে,উড়ছে ফুলকি/
থোকায় থোকায় ফুটে উঠেছে ভেরেণ্ডার ফুল/
থোকায় থোকায় জ্বলে উঠছে জঙ্গলের চোখ/
থোকায় থোকায় জ্বলে উঠছে /
তোমার আমার চোখ/
জ্বলে উঠছে দাবানল /
স্মৃতির পাখিরা ঠোঁটে করে নিয়ে যাচ্ছে /
মরকের মিহি ওম/
মেঘ হয়ে নেমে আসছে জনপদ পদে।/
সাইরেন তবে কি বাজিয়ে দিয়েছে/ পৃথকত্ববাদীদের শেষ শাটল/
নাকি বনিতা চলেছে/
মহড়া শেষে ভাইয়ের পাশে এসে বুক পেতে দেবে/ ফের তার ভাই/
ভাইয়ের পাশে এসে-- ফের তার বোন/
বুকে হাত রেখে বলবে এই নে স্মৃতি তুই খা/
এই নে মজ্জা তুই খা/
এই নে মগজ তুই খা/
এই নে বাস্তুভিটা,এই নে /
যাপনের সকল উষ্ণতা/
শরীরে ধরিস-গায়ে মাখিস তুই/
ভালোবাসা-নে তুই নিংড়ে নিয়ে যা!/
সহোদর কে কার উনুনে হাত রাখে সন্তর্পনে/
কে কার হাঁড়ির রাত /
কেরে নিতে চায় সহমরনের রাতে/
কে কার প্রেমিকার সাথে রাতকাটানোর/
শলা-পরামর্শে মেতে উঠে!/
তুমি কি জানো,সহোদর /
তুমি কি জানো সহোদরা?তুমি জানো?/
৩৪/
শীতের মাঠে ফিরে গেলেই/
ঘাসগুলি-শিশিরের মতো চমকায়/
এক অনালোকিত গুহা থেকে/
বাদুরেরা উড়ে এসে ঘাসের ডগায়/
বিন্দু বিন্দু স্পটিক রেখে যায়/
শুয়ে আছেন বাবা শীতার্তখাটিয়ায়/
আজানুলম্বিত ভূমি জুড়ে হিমের পার্বণ/
আপ্রাণসোহাগে মা জাগাতে চাইছেন ওম।/
৩৫/
শেষরাতের ছায়া নেমে যাচ্ছে/
রহস্যময়ী নদীর দিকে/
ক্ষীনালোকে ফুটে উঠছে নকশিকাঁথা/
মনে হয় উঠোন যেন ফুটফুটে বৃষ্টিপাতা।/
৩৬/
আমাদের বাড়ি ছিলো পাকিস্তান/
আমার পূর্ব পুরুষ ছিলো ধর্মান্ধ/
এই থেকে আমার বাবা মা আমিও/
সহসা শেকড় উপড়ে গেলো/
তোমার দরজা দিয়ে মাথা/
গলিয়ে দিতেই টের পেলাম/
আমি অসম্ভব ধর্মনিরপেক্ষ।
৩৭/
ওগো জঙ্গলের প্রতিমা/
যখনই তোমার কাছে আসি/
দেখি চিরায়ত-- রূপের মাঝে /
পাষাণপাগলছেলেরা বনভোজনের ফাঁকে/
রেখে যায় কিছু অসমাপ্ত আঁকিবুকি।/
পাতা কেউটের মতো--চোখে চোখ রাখি/
দেখি চিরায়ত ছড়ছেড়ে বেরিয়ে আসছো তুমি/
পাষাণে জাগছে প্রাণের স্পন্দন/
পরতে পরতে মর্মর কম্পন/
পাখপাখালি গেয়ে ওঠেছে গান।/
৩৮/
পাখিগুলি উড়ে যায় /
কোথায় যায় কে জানে/
প্রতিদিন- শব্দগুলি/
ঠোঁটে করে নিয়ে যায়।/
পাখিগুলি উড়ে যায়/
ফুরিয়ে যায় গানগুলি /
৩৯/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের/
নাভি জুড়ে শুয়ে আছে আমার শূন্যতা/
শুয়ে আছে আমার ভিটেমাটি/
গভীরে গেলেই টের পাই/
আমার বাবার আত্মা মাটির কনায়/
আজো শষ্যের গান গায়।/
৪০/
সন্ধ্যা নেমে এলেই কোলাহল থেমে যায়/
ক্রমশ ঘনীভূত আঁধারে ডুবে যায় /
সমগ্র রিজার্ভ ফরেস্ট।/
কোথাও ফুটে উঠে ভৌতিক আলো/
নিশাচরেরা নেমে আসে জনপদপদে।/
রাতের নেশা পান করে চুর চুর হয়ে ওঠে/
চুর চুর হয়ে ওঠে একটি বুড়ো বটতলা/
অতপর পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটি ছড়ার/ গোঙানি সারা রাত শোনা যায়।/
ভোর হতে না হতেই জেগে ওঠে পাতার পাখিরা/
কিচিরমিচির জুড়ে দেয় শাখায় শাখায়/
উত্তুঙ্গ জম্পুই ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে/
নীলাভ আলোর রোশনাই।/
৪১/
মাঝেমধ্যে কবিতার জন্য কবিতাঘাট যাই/
মাঝেমধ্যে কবিতায় কবিতায় দেওলা হয়ে ওঠে/
দেওসঙ্গম।ঝড় ওঠে কবিতার।/
কবিতার কৈলাস থেকে আসে অমলকান্তি/
কবিতার কৈলাস থেকে পরিযায়ী গল্পকার দেবব্রত।/
পানিসাগর থেকে রসরাজ এক অনার্যপুরুষ।/
আমি হারাধন যাই কাঞ্চনপুর থেকে/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে।/
দেবব্রতের টান আমি ভুলতে পারি না/
সেলিমের টান ভুলতে পারি না/
ভুলতে পারি না জয়বাংলা ডাক্তার সত্যেন্দ্রের টানও।/
ভোলা যায়?যাদের হাতে একদিন খোদিত/ দেওভ্যালির কবিতার মুখ, আমারই মুখ যেন/
যাদের হাতে একদিন দেওভ্যালির চক্ষুদান।/
আমারই চক্ষুদান যেন।/
ইদানিং এসব ছিঁড়ে ফেলতে চাই/
বারংবার টান মারি,পারি না,পৈতা ছিঁড়ে যায়/
চুটকি ছিঁড়ে না,নক্ষত্র ছিঁড়ে না,হে কবিতা/
হে ঈশ্বর,এ কোন ডিঙ্গায় ভাসালে তুমি।/
আস্ত ডুবে যাই,ফের ভেসে উঠি!/
এই থেকে মনে হয়
কাঞ্চনপুর যেন আমার আসমানের চেয়েও উচুঁ।
অমলটাকে ধরে রাখা গেল না/
হঠাৎ কি যে হল তার /
উড়ে গেল মনুঘাট/
উড়ে গেল ছাওমনু/
মাঝখানে করমছড়ার কমল মাড়িয়ে /
অবশেষে কৈলাসে থিতু।/
কৈলাসে কি ভালো আছে অমলকান্তি?/
ভালো থাকলে কি আর আমার সাথে/
গোবিন্দের সাথে পদ্মশ্রীর সাথে/
গোপালের সাথে দেখা করতে/
ঝুলা নিয়ে আসে কুমারঘাট? /
মাঝেমধ্যে আমাদের নিয়ে রাতাছড়ায়/
আলালউদ্দিনের বাড়ি গিয়ে গিলে আসে কবিতা?/
অবশ্য কৈলাস থেকে খালি হাতে আসে না/ অমলকান্তি!/
ঝুলাভর্তি নিয়ে আসে ছড়া ও কবিতা।/
শুধু আমিই থাকি শুন্যতায় মোড়া/
মনিকাঞ্চনের দেশে থেকেও আমার শূন্য ঝুলি।/
কাঞ্চনপুর মনিকাঞ্চনের দেশ/
পারি মাধুরীর দেশ।/
কেবল স্থানীয় কেউ মনিকাঞ্চন মেলাতে পারে না।/
মাঝেমধ্যে পরিযায়ী জুহুরীরা আসে,জড়ো করে/ ঠোঁটে ঠোঁটে কবিতার দেওলাদানা।/
তারপর ঠোঁটে করে উড়ে উড়ে চলে যায়/
সাজায় নিজের গেরস্থালি,ঘর করে/
কবিতার সাথে।/
শুখা মরশুমে জলের অভাব হলে/
ধুকতে থাকে গোটা দেওভ্যালি/
ঝুলা নিয়ে উড়ে আসে চরকবাই'র অভীক/
বিশালগড়ের অপাংশু সঙ্গমের গোবিন্দ-পদ্মশ্রী/
আর গৈরীকারা,আরো আসে জানা অজানা কবি লেখক ভ্রমণবিলাসী।/
সকলের সাথে দেখা হয় না/
স্মরণাগত হতে কেউ কেউ চায় না/
স্মরণাগত না হলে কি দেখা হওয়া যায়?/
তুমিই বলো অমলকান্তি?/
ছুঁড়ে দিলাম তোমার কাছে সেলিমের সংপ্রশ্নও/
"কবিতা কি প্রকৃতই জাগিয়ে তোলে?/
যদি না তোলে, তবে সেটা কী?"/
আমি বলি কবিতা আদৌ জাগিয়ে তোলে না/
কবিতা কবির বুদ্ধি বাড়ায় /
জাগিয়ে তুলে ছলচাতুরি!/
কাঞ্চনমার্গে থেকেও শুধুই বুক চাপড়ে মরি/
ধূলোঝড় উড়ছে গোটা বনস্থলী/
ধূলো উড়ছে পাহাড় থেকে/
ধূলো উড়ছে সমতল থেকে/
ধূলো উড়ছে আমারই চোখে।/
শূন্যঝুলা নিয়ে মাঝেমধ্যে ছুটে যাই /
যদি কিছু নিয়ে আসতে পারি/
কবিতার জারিজুরি -ছলচাতুরী।/
বেশ ছিলাম তো আমি/
ইদানিং এক বেমোতে ভুগছি/
পেঁচারথল পেরোতে গেলেই বুকটা ধুকপুক করে/
আস্ত শাখানপাহাড়টাই বিশাল বিশাল মেশিনে/
গিলে চলেছে।আর কটাদিন বাকী একে একে/
গিলে খাবে লংতড়াই, আঠারোমুড়া বড়মুড়া/
বেলকম জম্পুই কালাঝারি/
নদীর যতো জারিজুরি।/
ধূলিধূসর সকল পাহাড়তলি/
রেণু রেণু ধূলিঝড় উড়ছে বাতাসে।/
যেতে যেতে কেঁপে উঠি,শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে/
মারিজুয়ানা খেয়ে চিৎপটাং হয়ে যেন/
গোটা শাখানপাহাড়!/
অরণ্যপুরুষ অরণ্যনারীদের দেখা নেই কোথাও/
সবুজের শ্বাস নেই,সর্বত্রই অম্লজানের হাহাকার।/
হন্যে হয়ে তাকিয়েও দেখতে পাইনি আমার/ রাঙাচুলিকে,মলিরুং কিংবা মেডোনা ডারলংকে।/
বইবাড়ি গিয়ে দেখি একই রোগে আক্রান্ত কবি/ সমরও।নদীহীন শহর কবেই বুঝি ধর্মনগর।/ অম্লজান নাকি নেই কোথাও।দলাদলি খেয়ে/ কবেই খেয়ে ফেলেছে কবিতার ঘরবাড়ি।/
রজ-বীর্য-ঘাম-লালা-থুথু সর্বত্র ছড়ানো-ছিটানো/
কানাঘুষো,আক্রান্ত গোটা ধর্মতলি।/
চারদিকে রটনা চলেছে/
শহর থেকে দূরে বাউণ্ডুলে কবি সমর/
অম্লজানের খোঁজে ঘুরপাক খায়/
এক বাগান থেকে আরেক বাগানে /
বাগান নাকি তার শৈশব/
বাগান নাকি তার আঁতুরঘর/
চায়ের শাখা এখনও নাকি ভরপুর অম্লজানে।/
চোখেমুখে চকমকি,তার শ্মশান আলো করে/ একদিন সবুজ চোখে তাকাবে চায়ের পৃথিবী।/
পায়ে পায়ে বেড়ে উঠবে চা-গাছগুলি।/
চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিরাতের বনস্থলী/
আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে গোবিন্দের বইবাড়ি/
শ্বাস তুলে আমার প্রিয় বাঁশপাতা ছড়ার মতো/
আর কতদিন,শাখানের রাই আমার গেরস্থালি।/
ইদানিং শুনতে পাই আমাকে মঙ্গলে যেতে হবে/
তার আগে একজন নারীকে মঙ্গলে পাঠানো হবে/
নারী নাকি পৃথিবীর প্রথম শষ্যের জননী।/
তুমিই বলো অমলকান্তি /
শষ্যশ্যামলা স্বয়ম্ভু চিৎভূমি ছেড়ে/
রুক্ষ উষর উপলখণ্ডাবৃত প্রাণহীন মঙ্গলে/
নারী কি হতে পারবে একাকি গর্ভধারিণী?/
৪২/
ইদানিং সন্ধ্যা নেমে এলেই/
বটের ছায়ায় জেগে ওঠে তিনটি চুলাইভাটি/
জড়ো হয় রিজার্ভের কিছু রাতপাখি/
সারাটা রিজার্ভ শূন্যতায় মুড়ে যায়/
ক্রমশ ঘনীভূত আঁধারে /
দানা বাঁধে সন্দেহ ও অবিশ্বাস।/
দানাগুলি পাখির চোখের মতো/
ঠিকরে পড়ে মেঝেতে।/
তারপর ঠোঁটে করে নিয়ে নিয়ে যায়/
রাতের পাখিরা ।/
জঙ্গলে বেড়ে যায় আগুনের আঁচ!/
৪৩/
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের গভীরে/
জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে
কিছু ভাসন্ত মানুষ/
ফোকরাবেড়ার ফাঁক গলে চাঁদ
আনচান করে বিছানায়/
ম্রিয়মান জোসনায় বুনোশরীর কুয়াশাকাতর/
জাড়িত স্বপ্ন নিয়ে
ঘুমের মাঝে হাতরায় নারীর কাদাদেশ!/
মোটাভাত-কাপড়ের ঘামগন্ধ আলোকবর্ষ দূর!/
৪৪/
পুরোনো বট কিংবা /
ব্রুইফাংগুলি আজ আর অবশিষ্ট নেই/
নেই নাগেশ্বর সুন্দি গামাই গর্জনের ছায়া/
নল-খাগড়া খাল জলা ডোবা নালা।/
মুলি মিত্তিঙ্গা ডলুবাঁশের ঝাড়/
চোখে পড়ে না কোথাও!/
ছিন্নমূল দাদুর সাথে নাতি যায় না/
দোয়েল কিংবা কুড়া শিকারে।/
যৌথ ভাইবোনের চোখ-মুখে/
গমগম করেনা শৈশব/
স্বপ্ন আঁকে না রূপকুমার ও কেশবতী।/
দাদির লাগানো কাঁঠাল ও আমগাছগুলি
ফলবতি নয় আজ আর।/
নির্জনতার চাদরে ঢাকা পড়েছে সুপারি গাছ/
নিশিকুটুম্বরা আসে বৈনারীর মতো ।
আগাছায় ঢাকা পারিবারিক গোরস্থান/
একটা হাওয়াল গাছের ডালে বসে/
উঁকিঝুঁকি করছে দুঃস্বপ্নের কাক।/
জমির বুক ভেঙে একটি যৌথনালা
বহতা উজানমাছমারা ছড়ার দিকে।
শুধু পারিবারিক পুকুরে/
জারমনির ডালপালার ফাঁকে চড়ে ডাহুকপাখি/
আর পরিত্যক্ত ভিটির ছিন্নপত্র জুড়ে/
বুক ঘসটাতে ঘসটাতে /
এক জোড়া সোনাঘুঘু খুটে খায় বুনো বীজ।
৪৫/
প্রতিদিন নিজেকে লুকাই/
প্রতিদিন নিজেকেই মিথ্যে বলে যাই/
এ কোন দোষের নয়।/
যেন একটা নদী শাখাপ্রশাখা নিয়ে সমুদ্রে চলেছে/
যাবে সমুদ্রেই যাবে/
ঘুরে ফিরে যাবে নিজের কাছেই।/
একটা ঘোড়াও ছুটে চলেছে তার গন্তব্যে/
ঘোরাটাকে সকলেই চেনে/
চৌদ্ধপুরুষ ধরেই চেনে/
ঘোড়ার খুরে উড়ছে ধুলো বালি ছাই।/
পরতে পরতে সকলেই নজরে রেখেছে/
কেউ বা ধুলোবালি মাখছে/
কেউ ধুলোর রেণু কুড়াচ্ছে/
কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে/
কেউ আবার মোটাও হচ্ছে।/
ঘোড়া সকলের সাথেই চোখবন্ধী খেলছে।/
এমন খেলায় যেন কোন দোষ নেই/
এমন খেলায়/
খেলতে খেলতে মেরে ফেললে /
খেলতে খেলতে মরে গেলে/
যেন কোন অপরাধ নেই।/
ধুলি অন্ধ করে দিলেও দোষ থাকে না/
ধূলি বন্ধ্যা করে দিলেও দোষের নয়।/
ঘোড়া উপরওয়ালা/
ঘোড়া তলাওয়ালা/
উপরওয়ালার উপর যেমন কেউ নেই/
তলাওয়ালার তলেও কেউ নেই।/
৪৬/
পাহাড়ের ভেতর আরেক পাহাড়
নীলাভ রঙ মেখে দিয়েছে বুঝি
কেউ সর্বাঙ্গে তার!
মংচুয়াং থেকে হিজগ পাহাড়
যতদূর দেখা যায় ততদূর
বৃষ্টিকাতর অরণ্যনারী আমার।
৪৭/
সূর্যের শেষ আলো নিভে গেলেই ক্রমশ/
গানরেঞ্জে চলে আসে সমগ্র দেওউপত্যকা।/
কোথাওবা মোঙ্গলীয়-আলোয় ফুটে ওঠে/
রাতের কুহক-ইশারা!/
কখনওবা নোটিশছাড়া/
বারান্দায় এসে দাঁড়ায়/
মহিষ-মেঘের ছায়া।/
কেবল ব্রাহ্মরাতে জেগে ওঠে/
শাক্যমুনি বৌদ্ধবিহার/
শোনা যায় অভয়প্রার্থনা।/
গানপয়েন্ট থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে/
নদী ও তার অববাহিকা/
জেগে ওঠে মনের পাখিরা/
আলো ফুটতে থাকে জম্পুই-পাহাড় থেকে।/
৪৮/
বর্ণমালা নেমে এসেছে /
গাইরিং থেকে/
চোখ ভরে উঠেছে তারায়/
জুম জঙ্গল উপল/
তাকে পথ ছেড়ে দাঁড়ায়।/
এবার ঝিরি ছড়া নদী পেরিয়ে/
ঝাঁপ দেবে মোহনায়/
রোদ তাপ আর নিম্নচাপে/
এখন সে মেঘলা আকাশ।/
৫৯/
বনপথ পেরোতে গিয়ে
ভাবছি,এই বুঝি হারিয়ে যাচ্ছি
হারছি না,স্বভাবে অভাবী হয়ে
মৃত্যুফাঁদ মনে হচ্ছে পথ।
শরীরে অগ্নিকুণ্ড লুকিয়ে
দৌঁড়ে যাচ্ছি বাতাসের দিকে
কে কাকে বরণ করবে জানিনা
আলোক আশায়-করছি
অশ্রুপাত।
–++++++++
0 মন্তব্যসমূহ