প্লেটোর সাহিত্যবিচার।শিবনারায়ণ রায়,প্রবন্ধ সংগ্রহ-১

প্লেটোর সাহিত্যবিচার।শিবনারায়ণ রায়,প্রবন্ধ সংগ্রহ-১

কিংবদন্তী অনুসারে প্লেটো প্রথম যৌবনে কবি ছিলেন।গুরু সক্রেটিসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সে-সব কবিতা  নাকি পুড়িয়ে ফেলেন। গ্রিক কাব্যসঙ্কলনে তাঁর লেখা বলে প্রচলিত কিছু কিছু টুকরো কবিতাও পাওয়া যায়।এ কিংবদন্তী সত্য কি না,এসব কবিতা যথার্থই প্লেটোর রচনা কি না,তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে।এ বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন,তাঁর  নানা দার্শনিক রচনা থেকে এ বিষয়ে নি:সন্দেহ হওয়া যায় যে এই ঘোর কাব্যবিরোধী দার্শনিক প্রকৃতির দিক থেকে অনেকখানিই কবিদের সমধর্মী ছিলেন।ফলে কাব্যপ্রেরণা বিষয়ে তাঁর  বিবরণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্পর্শ পাওয়া যায়।দেবতায়-পাওয়া ইত্যাদি আদিম-ধারণা-কল্পনা বাদ দিলে এ কথা বোধ হয় সব সাহিত্যিক এবং সাহিত্যরসিক স্বীকার করবেন যে সাহিত্যসৃষ্টির মূলে এমন এক শক্তি সক্রিয়, যার উপরে কোনও হুকুম খাটে না।এই শক্তিরই নামকরণ  করা হয়েছে প্রেরণা।আধুনক কালে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্ররা এ শক্তিকে পর্যন্ত নিজেদের তাঁবেদার করার চেষ্টা করেছে।ফলে যদিও সে সব দেশে বছরে বছরে কেতাব ছাপা হয়েছে বিস্তর,কিন্তু সাহিত্য-প্রেরণা এসেছে শুকিয়ে।।যাঁরা জাত-সাহিত্যিক,তাঁরা হয় দেশ ছেড়েছেন(যেমন  টমাস মান কি ইভান বুনিন),নত আত্মহত্যা করেছেন(যেমন মায়াকোভস্কি),নয় কারাগারে, দাসশিবিরে কি গ্যাসচেম্বারে প্রাণ দিয়েছেন।তবু অসীম ক্ষমতা সত্ত্বেও কোনও রাষ্টশক্তি আজ পর্যন্ত খাঁটি শিল্পী-সাহিত্যিকের প্রেরণাকে পুরোপুরি মুঠোয় আনতে সমর্থ হয়নি।এসব অভিজ্ঞতা প্রেরণা বিষয়ে প্লেটোর বিশ্লেষণ কে স্পষ্টই সমর্থন করে।

প্রেরণার উৎস যে কি তা আমরা আজও জানি না;তবে এটুকু আমরা জানি যে তা শুধু সমাজ এবং রাষ্ট্রের আয়ত্বের বাইরে নয়,শিল্পী-সাহিত্যিকের নিজেরও তার উপরে বিশেষ কোনও হাত নেই।এই হাত-না-থাকা দু অর্থে সত্য।অত্যন্ত সংযমী লেখকও যখন ভিতরকার তাগিদে লিখতে বসেন,তখন সে লেখা শেষ পর্যন্ত কি রূপ নিয়ে গড়ে উঠবে আগে থেকে সেটি তাঁর  পক্ষে নিশ্চিত করে জানা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত,সৃষ্টিপ্রেরণা যতক্ষণ সক্রিয় ততক্ষণ তার দাবি অস্বীকার করার সামর্থ্য সে প্রেরণার অধিকারীর নেই।এ দিক থেকে শিল্পী-সাহিত্যিক প্রেরণার অধিকারী হয়েও প্রেরণার দাস।লেখকের মনে যখন লেখার প্রেরণা আসে,তখন তাকে লিখতেই হবে,কাগজ-কলম না পেলে অন্তত মনে মনে,অন্তত মুখের ভাষায় তার সে প্রেরণাকে প্রকাশ করতে হবে।এ না হওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই,অন্য কাজে মননেই,অন্য চিন্তার অবসর নেই।

কিন্তু প্রেরণাই তো সাহিত্যের একমাত্র সূত্র নয়।সার্থক সাহিত্যসৃষ্টির জন্য সুকঠিন সংযমেরও প্রয়োজন আছে।প্লেটো এ দিকটি একেবারে অবহেলা করেছেন।শিল্পকর্মের অনুশীলন যে সাহিত্যিকের পক্ষে প্রেরণার চাইতে কম আবশ্যিক নয়,পরবর্তীকালে বৈজয়ন্তীয় এবং রোমান আলঙ্কারিকেরা এ সত্য বিশদ বিচার-বিশ্লেষণের দ্বারা প্রমাণিত করেন।প্রেরণার উপরে সাহিত্যিকের হাত নেই,কিন্তু আত্ম*রতির উপরে অন্য মানুষদের মতো তাঁরও পুরোপুরি হাত আছে।আত্মপ্রস্তুতি সচেতনপ্রয়াসসাপেক্ষ।তার নানা দিক আছে-- সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার দুটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।সব শিল্পই মাধ্যমনির্ভর, এবং মাধ্যমকে বশে না আনতে পারা পর্যন্ত সে মাধ্যমে সৃষ্টি অসম্ভব।বশে আনার অর্থ সে মাধ্যমের বিচিত্র সম্ভাবনা বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সে সব সম্ভাবনাকে প্রকাশের উপায়রূপে ব্যবহার করার সামর্থ্য অর্জন করা। সাহিত্যের মাধ্যম ভাষা।ভাষা তো সকলেই ব্যবহার করে,কিন্তু ভাষার মধ্যে কতখানি প্রকাশের শক্তি নিহিত আছে তার খোঁজ শুধু সাহিত্যশিল্পী রাখেন।সে খোঁজ  পাবার জন্য তাঁকে গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়।

  (প্লেটোর সাহিত্যবিচার।শিবনারায়ণ রায়,প্রবন্ধ সংগ্রহ-১)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ