সন্দীপ দত্ত : কলিকাতা লিটলম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

সন্দীপ দত্ত…জন্ম ২৪ জুলাই ১৯৫১
মৃত্যু ১৫ মার্চ ২০২৩

প্রতিষ্ঠাতা : কলিকাতা লিটলম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র।



লিটল ম্যাগাজিনের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি 

গোবিন্দ ধর 

প্রথাগত বিষয়-আশয়ের বাইরে সব মানুষের ভাবনা চিন্তা প্রসারিত হয় এমন নয়।যে সকল মানুষের মধ্যে সময়ের থেকে ভাবনা এগিয়ে যেতে চায় সন্দীপ দত্ত সেই মানুষের মধ্যে বিরলতম একজন।
লিটল ম্যাগাজিনকে এক উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন সন্দীপ দত্ত। ছোট পত্রিকাকে তিনি লিটল ম্যাগাজিন বলতেই ভালোবসতেন।লিটল ম্যাগ বললে তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করতেন।
আজ আকাশ হঠাৎ ফাল্গুনের শেষে আকাশ কালো হয়ে উঠে।অকাল কালবৈশাখী নেমে আসে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়।ঠিক তখনই আমাদেরকে শূন্য করে তিনি অন্য কোথাও ঝড়ের কাছে লড়াই থামিয়ে দিলেন।প্রয়াত হলেন লিটল ম্যাগাজিনের অশ্বারোহী সন্দীপ দত্ত। কিন্তু তিনি নেই এই ভাবা সহজ নয়।
কতভাবে যে তাঁর নিকট ঋণী আমরা।কত সময় যে আমাকে তিনি দিয়েছেন। অথচ আমি কি সবটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি?জানি না।উত্তর পূর্ব লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে তাঁর সাথে সাতবার আমার এক মঞ্চে বসার সুযোগ হয়েছিলো।
২০১৬ সালে স্রোত আয়োজিত আন্তর্জাতিক লিটল ম্যাগাজিন উৎসবে তাঁকে আগরতলায় আমন্ত্রণ জানাই।এসেছিলেন।
পৃথিবী যখন গভীর দুঃসময়ে করোনা নামক ভাইরাসের সংক্রমণে সংকটে তখন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা 'প্রতিদিন বাংলাভাষা.স্রোত 'আত্মপ্রকাশ সামজিক মাধ্যমে ইউটিউবে আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে তিনি বলেছিলেন 'এই সংকট কেটে গেলে ছোটকাগজ মুদ্রিত মাধ্যমে প্রকাশিত হলেই ভালো।পাশাপাশি অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাও সময়ের প্রয়োজনে প্রকাশিত হতে থাকুক' কথাগুলো বলেছিলেন।
তারপর ২০২১সালে ত্রিপুরা প্রকাশনা মঞ্চ আয়োজিত তিনদিনব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলার উদ্বোধক হিসেবে তাঁকে আমরা পেয়েছি।গত বছর কলকাতায় স্রোত প্রকাশনার বই উৎসব ও দক্ষিণারঞ্জন ধর স্মৃতি স্রোত সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানেও তাঁকে পেয়ে আমরা ধন্য হয়েছি।অনুষ্ঠান ছিলো চারতলার ওপর। তিনি এই চারতলার ঘরে আমাদের ছোট এক ঘরোয়া বই প্রকাশ অনুষ্ঠানেও টালিগঞ্জে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
একজল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক ও লিটল ম্যাগাজিন কর্মীর কতটুকু বিনয় ও অহংকার থাকা জরুরী সন্দীপ দত্ত তাঁর জীবন দিয়ে সেই কাজটিই করে গেছেন।আমরা তাঁর দাসুনুদাস অথচ তাঁকেই অনুসরণ করতে পারিনি!
তাঁর প্রতিষ্ঠিত লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রেও দুবার তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ। 
তাঁর লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে একটি বই স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত। পাঠকের নিকট বইটি আদৃত হয়েছে। 
কিন্তু কদিন থেকে নানা অসুস্থতায় তিনি হাসপাতালে ছিলেন।
সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি আর শরীরে নেই। পড়ে আছে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র।
অংশুমান কর:"যে-কাজ সরকারের করার, সেই কাজ করে গেছেন একা, ব্যক্তিমানুষ হিসেবে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখেছি অন্য অতিথিরা যখন গাড়ি ছাড়া আসতেই চাইছেন না, উনি হাসিমুখে লোকাল ট্রেনে চেপে চলে এসেছেন। ব্যক্তিগত ভাবে যে স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়েছি ওঁর কাছে, ভোলার নয় তা। প্রকৃত অর্থেই উনি ছিলেন লিটল ম্যাগাজিনের অভিভাবক। ভুলে যাব না, চমৎকার কিছু কবিতাও লিখেছেন এই মানুষটি। যে-শূন্যতা তৈরি হল ওঁর প্রয়াণে, তা পূরণ হওয়া খুব খুব কঠিন।"

জন্ম ১৯৫১ সালে ৮ এ টেমার লেনের পৈতৃক নিবাস।সেখানেই প্রায় ১লক্ষ বই, লিটল ম্যাগাজিনের এই সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে ১৯৭৮ সালে লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্র।যা গবেষক, সন্ধানী পাঠকের আশ্রয় ও ভরসার জায়গা। তাঁর সংগ্রহশালা কিন্তু শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয় ভারতের সমস্ত রাজ্যে, প্রতিবেশি বাংলাদেশসহ বিদেশেও সমাদৃত। 
তিনি সম্পাদনা করেছেন 'পত্রপুট','হার্দ্য','উজ্জ্বলউদ্ধার' এর মতো লিটল ম্যাগাজিন। তাঁর সম্পাদিত ইংরেজি লিটল ম্যাগাজিন,,'অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস'। প্রকাশিত বই 'লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা','স্ল্যাং ল্যাঙ্গুয়েজ','ভুবনেশ্বরী ','বিবাহমঙ্গল','বহতা',।তাঁর সুচারু সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে 'বাংলা ভাষা বিতর্ক','জন্মদিন ',এছাড়াও স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত 'বিষয় যখন লিটল ম্যাগাজিন 'সংকলনটি পাঠকের নিকট বিশেষভাবে আদৃত।
আমার প্রতিষ্ঠিত 'উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র'টি আরো সমৃদ্ধ ও লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভাবনাময় হয়ে উঠার পরামর্শ দিতেন।তাঁর নিকট যখন যে আবদার করেছি মুক্তমনে তিনি তাতে সায় দিয়েছেন,পরামর্শ দিয়েছেন। বিশাল উচ্চতায় থেকেও তিনি সকল লিটল ম্যাগাজিন শ্রমিকদের জন্য ভাবতেন।এখানেই সন্দীপ দত্ত একজন বিকল্প মানুষ।একই সাথে তিনি একজন কবিও।


শুধু সহিতত্ত্ব ও ছোট পত্রিকার জন্য, সময়ের পত্রিকাগুলো সংরক্ষণের  জন্য একজন মানুষ কি বিপুল পরিমাণ শ্রম ও জীবনীশক্তিকে অকাতরে নিবেদন করতে পারেন!!সন্দীপ দত্ত তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ! লিটল ম্যাগাজিনের সার্থক পরিচয় ও প্রতিবাদ,প্রতিরোধ ও যথার্থ মূল্যায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল একজন দেশপ্রেমিক সৈনিকের মতো।অবিস্মরণীয় তাঁর এই  জয়যাত্রার পথ ও পাথেয়।লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন থেমে থাকবে না। সন্দীপ দত্তও সকল লিটল ম্যাগাজিন শ্রমিকের নিকট পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন এই প্রত্যাশা  তো অবান্তর হবে না।

সকল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক কর্মীদের দায়িত্ব ঘরে ঘরে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি গঠন করে সন্দীপ দত্তের অসম্পূর্ণ সংগ্রহশালাকে আরো মানুষের নিকট ছড়িয়ে দেওয়া।তখন তিনি নিশ্চিত খুশি থাকবেন।

১৫:০৩:২০২৩


"সন্দীপদা, তোমার অভাব কোনদিনই পুরণ হবে না।
বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অবসান ঘটলো এক অবিস্মরণীয় যুগের......
   আমাদের ছোটবেলায় ময়দানে বইমেলায় একটি মানুষকে দেখতাম কাগজের টুপি পড়ে বুকে ফেস্টুন ঝুলিয়ে প্রচার করতেন "বই চিনে বই কিনে বই পড়ুন।"
 স্বভাবতই তাকে ঘিরে কৌতূহলের অন্ত ছিল না, জেনেছিলাম সেই মানুষটির নাম সন্দীপ দত্ত। পরে পরে আরো যত জেনেছি তত অবাক হয়েছি তার সুবৃহৎ কর্মকাণ্ড দেখে। তখন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ঠিক সেই ভাবে বুঝতাম না, পরবর্তীতে লিটল ম্যাগাজিন করতে এসে বুঝেছি এই মানুষটি প্রায় একাই আমাদের চলার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা যদি ছোট ছোট চারা হই তাহলে সত্যিকারের  এক ছায়াগাছের স্নেহচ্ছায়া থেকে আজ বঞ্চিত হলাম।
    দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন, অবশেষে ৭৩ বছর বয়সে কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের প্রাণপুরুষ  সন্দীপ দত্ত। রেখে গেলেন তার স্ত্রী, একমাত্র পুত্র মনসৃজ ও অসংখ্য অনুরাগীদের।
        ১৯৫১ সালে ৮ - এ টেমার লেনের পৈত্রিক নিবাসে তার জন্ম হয়। এই ঠিকানাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র' যা তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। প্রায় এক লক্ষ লিটিল ম্যাগাজিনের এই সংগ্রহশালা হয়ে ওঠে গবেষক সন্ধানী পড়ুয়াদের ভরসা স্থল। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের লিটল ম্যাগাজিন রয়েছে এখানে। তিনি ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য। সন্দীপ দত্ত সম্পাদনা করেছেন 'পত্রপুট',  'হার্দ্য', 'উজ্জ্বল উদ্ধার' প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন। তাঁর সম্পাদিত ইংরেজি লিটল ম্যাগাজিন হল 'অল ইন্ডিয়া  লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস'। তাঁর রচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে 'লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা', 'স্ল্যাঙ্গুয়েজ', 'ভুবনেশ্বরী', 'বিবাহমঙ্গল', ও 'বহতা'। তাঁর সুচারু সম্পাদনায় প্রকাশিত সংকলন গ্রন্থ 'বাংলা ভাষা বিতর্ক', ও 'জন্মদিন'।
    এইতো কদিন আগে রামপুরহাট শহরে আমাদের অনুভূতির ডানা পত্রিকা আয়োজিত সারা বাংলা কবিতা উৎসবে যখন তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে আসার অনুরোধ জানাই, তখন তিনি বলেন ওখানে লিটল ম্যাগাজিনের জন্য কি করছো? সেই মুহূর্তে সদুত্তর দিতে না পারলেও পরে তাঁকে জানাই স্থানীয় জিতেন্দ্রলাল মহকুমা গ্রন্থাগারে আমরা একটি ক্ষুদ্র লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা তৈরি করতে চাই। এবং তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান এই সংগ্রহশালা উদ্বোধন করতে। সেই সুযোগ আমরা ছাড়িনি তাঁর হাত দিয়েই রামপুরহাট তথা বীরভূমে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা উদ্বোধনের কাজটি সেরে রাখি যদিও আজও সে কাজ সে কাজ সম্পূর্ণ করে উঠতে পারিনি। মঞ্চে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন তাঁকে বক্তৃতার জন্য  হাতে মাইক তুলে দিতে যাই তিনি বলেন না আমি উঠে গিয়ে পোডিয়ামে বক্তৃতা দেব। বারবার আশ্চর্য হয়েছি তাঁর অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি দেখে... বোলপুরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, রামপুরহাটে কবিতা উৎসবে বক্তৃতা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় দর্শক আসনে বসে থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের মত ক্ষুদ্র সৈনিকদের ভরসা যুগিয়ে চলা ও প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর মত আর কাউকে দেখিনি। ইদানিং সময়ে রামপুরহাটে লিটল ম্যাগাজিন মেলা আয়োজনের ভাবনায় তাঁর নামটি সবার প্রথমে উঠে আসে৷ এ বছর আমরা তাঁকে 'জীবনকৃতি সম্মান' দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই সুযোগ আমরা আর পেলাম না। তবে যদি কোনদিন এ আয়োজন সম্পূর্ণ করতে পারি সেদিন মঞ্চটি তাঁর নামেই উৎসর্গীকৃত হবে।
 যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততদিন লিটিল ম্যাগাজিনও থাকবে, আমার বিশ্বাস লিটল ম্যাগাজিন যতদিন থাকবে ততদিন শ্রী সন্দীপ দত্ত আলোক দিশারী হয়ে, অমর হয়ে থাকবেন আমাদের সকলের হৃদয়ে। তাকে শেষ প্রণাম জানাই ব্যথাদীর্ণ হৃদয়ে...
 "সন্দীপদা, তোমার অভাব কোনদিনই পুরণ হবে না।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ