কবি পুলিন রায় স্মারক সংখ্যা
পুলিন রায়, কবি, ছোটোকাগজ সম্পাদক ও সাহিত্য সংগঠক।
** পিতা : মৃত ললিত মোহন রায়,
** মাতা: মৃত প্রফুল্ল বালা রায়।
** জন্ম তারিখ: ১ জুন, ১৯৬৬।
** স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম -লক্ষীপ্রসাদ, ডাক: চতুল বাজার, ইউনিয়ন -দরবস্ত, উপজেলা : জৈন্তাপুর, সিলেট।
** বর্তমান ঠিকানা: গোপালটিলা, টিলাগড়, ২০ নম্বর ওয়ার্ড, সিটি করপোরেশন, সিলেট।
** শিক্ষা: ছাতারখাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লক্ষীপ্রসাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন। ১৯৭৯ সালে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে শিক্ষক পিতার পরলোকগমন। দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে ১৯৮১ সালে এসএসসি। অতপর তিন ভাই ও দুই বোনের সংসারের বড় ছেলে হিসাবে কঠোর জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জননীর প্রেরণায় একদিনও কলেজে না গিয়ে ১৯৮৫ সালে সিলেট এমসি কলেজ কেন্দ্র থেকে প্রাইভেটে এইচএসসি পাস। ১৯৮৫ এ এমসি কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অনার্সে ভর্তি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৯০ সালে বাংলায় মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ। ২০১০ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন।
** লেখালেখি: 'এখনো আসেনি সময়' শিরোনামে প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক দেশবার্তা'য়। প্রথম কাব্য 'স্বপ্ন যাবে সমুদ্রস্নানে'(২০০১, বিশাকা প্রকাশন, ঢাকা)। এরপর একে একে বের হয় 'কষ্টের নোনা জলে যাপিত সবুজ জীবন'(শ্রমজীবী শিশু-কিশোরদের জীবনভিত্তিক গদ্য, ২০০৪, উৎস প্রকাশন, ঢাকা), 'কালের পালকে আঁকা'(কাব্য, ২০০৬, উৎস প্রকাশন), 'ওরা সবুজ ওরা জীবন যোদ্ধা '(গদ্য, ২০০৮, উৎস প্রকাশন), 'সুঘ্রাণ ছড়ানো মৌনতা'(কাব্য, ২০১৬, ভাস্কর প্রকাশন, সিলেট) এবং 'পাখির ঠোঁটে বসতি' (কাব্য, ২০১৯, ভাস্কর প্রকাশন, সিলেট) এবং 'চিন্তার খেরোখাতা' (গদ্য, ২০২১ লেখক সমবায়, সিলেট)।
** সম্পাদনা : ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ভাস্কর সম্পাদনা। তিনপাতার ভাঁজপত্র হিসেবে ভাস্কর'র আত্মপ্রকাশ। টিউশনির টাকায় পরপর তিনটি সংখ্যা ভাস্কর বেরোয় বিজ্ঞাপন বিহীন। ভাস্কর প্রকাশের ৩২ বছর পেরিয়ে ৩৩ বছর চলছে। এ পর্যন্ত মোট ২৩ টি সংখ্যা বেরিয়ছে। ২০১৪ সালে কবি দিলওয়ার সংখ্য ভাস্কর (৩০০ পৃষ্ঠার) শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সহায়ক পাঠ্যভূকক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এছাড়া 'কল্লোল', 'অমিয়', 'কাব্যালোক' ও 'মনন' সম্পাদনা।
** পুরস্কার/সম্মাননা(ভাস্কর সম্পাদক হিসাবে) অর্জন :
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'চিহ্ন সম্মাননা'(২০১১), 'উৎস লেখক সম্মাননা', ঢাকা(২০১৫), 'সমুজ্জ্বল সুবাতাস সম্মাননা', বান্দরবান(২০১৭) 'মাকুন্দা সাহিত্য পদক', সিলেট(২০১৯) ও 'কোরাস সাহিত্য সম্মাননা' মৌলভীবাজার (২০১৯), সমধারা সম্মাননা (২০১৯), 'স্বপ্ন কথা সম্মাননা', কলকাতা(২০২৩)।
** সংগঠন: সভাপতি, সিলেট সাহিত্য পরিষদ; সভাপতি: লোকচর্যা, সিলেট; সভাপতি: অমিয় সাহিত্য পরিষদ; সাবেক সহসভাপতি: বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, সিলেট জেলা; সাবেক নির্বাহী সদস্য : সিলেট উদীচী; প্রধান উপদেষ্টা : প্রজন্মের সেতুবন্ধন সিলেট।
** বিদেশ: ২০১৮ সালে বাংলাদেশের চারজন কবির একজন হিসাবে ভারতের মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে 'ইন্দো-বাংলা পয়েটস মিট'এ গেস্ট অব অনার হিসাবে যোগদান।
** পেশাগত কর্মকাণ্ড: ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ সালের ৩১ অক্টোবর দৈনিক সিলেটের ডাক-এর স্টাফ রিপোর্টার, পাশাপাশি ১৯৯৪ এর অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় বছর খানেক শাহ খুররম কলেজে বাংলার শিক্ষক। ১ নভেম্বর ১৯৯৪ থেকে সরকারি চাকুরিতে যোগদান(উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসাবে বর্তমান ছাতক, সুনামগঞ্জ এ কর্মরত)। ২০১৬ সালে শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সিলেট জেলা এবং ২০১৯ ও ২০২২ সালে শ্রেষ্ঠ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সুনামগঞ্জ জেলা।
**সংসার: স্ত্রী রঞ্জু রানী রায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (স্বেচ্ছায় অবসরপ্রাপ্ত), দুই আত্মজের জেষ্ঠ্যজন অনিমেষ রায় পিয়াস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত অনার্সে এবং কনিষ্ঠ আত্মজ অনিরুদ্ধ রায় পরাগ এমসি কলেজ শিশু বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
** অন্যান্যঃ রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে বিভিন্নসময়ে অংশগ্রহণ। এছাড়া, ২০১৬ সালে ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে বের হয় "পঞ্চাশে পুলিন, পঁচিশে ভাস্কর" নামের সংবর্ধনগ্রন্থ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন '...এখন যৌবন যার যু্দ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়..." খ্যাত বরেণ্য কবি হেলাল হাফিজ।
**প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনা, জীবন সংগ্রাম এবং মায়ের প্রেরণা লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণ।
গল্প নয়
আমার সাইকেল জীবন
।। পুলিন রায় ।।
প্রায় তিন দশক পর বন্ধু স্বপনের বাইসাইকেলে ওঠে মনে পড়ে গেলো আমার ফেলে আসা জীবনের অনেক কিছু। একসময়(১৯৮৫-১৯৯০) বাই-সাইকেলের প্যাডেলেই ঘুরতো আমার জীবন। নয়/দশটা টিউশনি, অনার্সক্লাস এবং ছাত্র রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্য সাংগঠনিক কাজ সামাল দিতে এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। আমার ভাঙাচোরা বাইসাইকেল দিয়ে ঘড়ির কাঁটা মেপে চলতো একদিনও কলেজের বারান্দায় না গিয়ে প্রাইভেটে এইচএসসি পাস করা অনার্সকালীন জীবন।
একটু খুলে বলি সব।
১৯৭৯ সালে পরলোকগমন করেন আমার পিতা স্বনামধন্য শিক্ষক ললিত মোহন রায়। বাবা মারা যাওয়ায় মাথায় যেনো বাজ পড়ে। তখন আমি নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক অবোধ বালক। কোন রকমে ১৯৮১ সালে পাশ করলাম এসএসসি। এ ক্ষেত্রে আমাদের একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী পরমাত্মীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা-শিক্ষক দুর্যোধন বিশ্বাসের পরামর্শ ও সহায়তা স্মরণ করছি শ্রদ্ধায়। বাবা পরলোকগমনের পর সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় আমাকেই ধরতে হয় সংসারের হাল। এ সময় আমার দশ/এগারো বছর বয়সের ছোট ভাই নির্মলকে পেয়েছি জীবন সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে। এসএসসি পাশের পর সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লক্ষীপ্রসাদস্থ আমাদের গ্রামের বাড়িতে মা আর ছোট দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে সংসারের হাল ধরতে আমাকে করতে হয়েছে জীবনের কঠোর সংগ্রাম। দুমুঠো ভাতের জন্য, বেঁচে থাকার তাগিদে তখন এসএসসি পাশ আমাকে মানুষের ক্ষেতে কাজ করা থেকে শুরু করে করতে হয়েছে পান সিগারেট, পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাঙ ও মাছ ধরে বিক্রি করার কাজ। এরপর বড় বোনের দেওয়া দু'শ টাকায় ভর করে করেছি লাকড়ি এবং গলিতে বসে আটা-চালের ক্ষুদ্র ব্যবসা। এই ব্যবসায় সাফল্য আসায় ছোট ছোট ভাইবোনকে প্রাইমরি স্কুলে ভর্তি করি।
১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি আমি পল্লীগাঁ থেকে কাদামাটির শুঁদা গন্ধ গায়ে মেখে সিলেট শহরে আসি। গর্ভধারিণী জননী প্রফুল্ল বালা রায় তখন তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে নানাভাবে যুগিয়েছেন সামনে যাওয়ার প্রেরণা। এর আগে তুখোড় জীবনসংগ্রামের একপর্যায়ে একদিনও কলেজে না গিয়ে ১৯৮৫ সালে সিলেট এম সি (তৎকালীন সরকারি কলেজ) কলেজ কেন্দ্র থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি এইচএসসি। এই আইএ পাশের পেছনে প্রিয় অগ্রজ শ্যামানন্দ সরকারের রয়েছে দারুণ এক ভূমিকা। সম্ভবত ১৯৮৩ তে সম্পর্কিত এক কাকার বিয়ে উপলক্ষে তাদের বাড়িতে গেলে পরিচয় হয় তাঁর সাথে। আমরা প্রায় সারা রাত গল্প করে কাটিয়ে দেই। এসএসসি পাশ আমার জীবনকথা শুনে তিনি ইন্টার ক্লাসের বাংলা ও ইংরেজি মূল পাঠ্য বই এবং শ্রীকান্ত ও রক্তাক্ত প্রান্তর - এই চারটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। তিনি তখন এমসি কলেজে বিএসসি-র শিক্ষার্থী। আমার জীবনসংগ্রামের ফাঁকে বই চারটি পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ করে ফেলি। প্রাইভেটে আইএ দেওয়ার পেছনে এটাও একটা প্রেরণা। এছাড়াও জীবন চলার পথে প্রিয় এই মানুষটির বিপুল উৎসাহ প্রাপ্তি বর্ণনাতীত।
যাহোক, বিএ -তে ভর্তি হতে আসি তৎকালিন সরকারি (বর্তমান এম সি) কলেজে। সনদ ও ছবি সত্যায়িত করতে গিয়ে দেখা হয় শ্রদ্ধেয়া শামসুন্নাহার ম্যাডামের সাথে। ম্যাডাম আমার এসএসসি ও এইচএসসি'র সনদ দেখে অনার্সে ভর্তি হতে বলেন। এই প্রথম 'অনার্স' নামের একটি শব্দ প্রবেশ করলো আমার কর্ণকুহরে। কেননা আমি এতোই গেঁয়ো ছিলাম যে, এইচএসসি পাশের পরও কোন ধারণা ছিলো না স্নাতক পাস বা অনার্স কোর্স সম্পর্কে। আমার ধারণা ছিলো শুধু বিএ, বিএসসি বা বিকম সম্পর্কে। ম্যাডামের কথার কোন উত্তর না দিয়ে কেবল শুনে যাই তাঁর কথা। অনার্স সম্পর্কে আমার যে কোন ধারণা নেই সেটা তাঁকে বুঝতে দেইনি। ভর দুপুরের এক অলস সময়ে তিনি আপনমনে অনার্স এবং পাস কোর্সের ভালোমন্দ দুটো দিকই বলে গেলেন ক্ষণিককাল। এ ব্যাপারে আমার ধারণা হলো এই প্রথম। পরিশেষে ম্যাডামের সাথে ফ্রি হয়ে গেলে আমার জীবন সংগ্রাম ও প্রাইভেট এইচএসসি দেয়ার কথা একটু বলে ফেলি। ম্যাডাম সব শুনে জেদ ধরে বসলেন, 'তোমাকে দিয়েই হবে। তোমাকে অনার্স পড়তেই হবে'। হায়রে নিয়তি বিএ পড়তে আসা সেই বোকাসোকা 'গেয়ো' আমি একদিন ভর্তি হয়ে যাই অনার্সে, ঐতিহ্যবাহী এম সি (তৎকালিন সরকারি কলেজ) কলেজে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। শামসুন্নাহার ম্যাডামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা থাকবে আমৃত্যু। তাঁর সাথে দেখা না হলে, কিংবা তিনি সঠিকভাবে নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ না করলে হয়তো পড়াই হতো না অনার্সে। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে এসে ম্যাডামের শুভাশিস নিয়েছি পুনরায়। যা হোক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট সরকারি কলেজে(বর্তমান এম সি কলেজ) চান্স পেয়ে গেলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্সে। একসময় বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ স্যারের পরম সান্নিধ্য পেয়ে চলে এলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। স্যার তখন এই বিভাগের চেয়ারম্যান। আমার জীবন চলার পথে সফিউদ্দিন স্যারের প্রেরণা ও নির্দেশনা কতোটুকু তা জানি কেবল আমি। বিনম্র শ্রদ্ধা স্যারের প্রতিও। শ্রদ্ধা অন্যান্য স্যারের প্রতিও। বাংলা অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরই ঘুরে যায় আমার জীবনের মোড়। বাদ দিয়ে দিতে হয় ক্ষুদ্র ব্যবসা। সিলেটে বসবাসের লক্ষ্যে ও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে শুরু করতে হয় টিউশনি। কিন্তু টিউশনি পাবো কোথায়? আমার সব জেনেশুনে নিজের টিউশনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে পায়ের নীচে মাটি এনে দিয়েছিলেন পরম আপন, অগ্রজ রাজনৈতিক বন্ধু মো. নিয়াজ উদ্দীন। তারপর জোগাড় করে নেই আরো কয়েকটি টিউশনি। সিলেট শহরে থাকা, পড়াশুনা করা, বাড়িতে ছোট ভাইবোনকে পড়ানোসহ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়তে হবে তারও টাকা জমা করা- সব মাথায় নিয়ে নয়/দশটি টিউশনি চলতে লাগলো রুটিন মাফিক। সাথে কলেজের ক্লাস তো আছেই। পাশাপাশি তুমুলভাবে জড়িয়ে পড়ি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। রাজনৈতিক বন্ধুদের সাহচর্যেই একদিন আমার প্রায় ১৯ বছর বয়সে প্রথম কোন লেখা ছাপা হয়ে যায় সাপ্তাহিক 'দেশবার্তা' পত্রিকায়। ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়ি সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড, সম্পাদনা ও সাংবাদিকতার সাথে। লেখা ছাপা হতে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-সংকলন-
সাময়িকীতে। ঘনিষ্টভাবে যুক্ত হয়ে যাই সম্পাদনা এবং উদীচীসহ নানা শিল্প-সাহিত্য সংগঠনের সাথে। সময় মাপা এ সব কিছু মোকাবেলা করতে বাই-সাইকেলই ছিলো এক অনন্য।
কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||
কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||
কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||কবিতা||
পুলিন রায়ের কবিতা
এক.
শিস দেয়া দুপুর
শিস দেয়া দুপুর নদীচরে বিশ্রাম নেয়
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভগ্নদশা নদী
অসমাপ্ত ক্রিয়ার মতো ক্রন্দন করে।
বেসুরো এস্রাজ বাজুক না ওপারে
কিংবা এপারে
কোকিল কি ডাকলো?
বসন্তবাউরি বলে যাচ্ছেই বিরহকাত কথা
সদ্যজাত শিশুর কান্না-
ফুটন্ত সর্ষেফুলের ঘ্রাণ-
পল্লীবধূর সলাজ চাহনী
সাথে নিয়ে এগিয়ে যাই
শিস দেয়া দুপুরে।
কড়া রোদের ভাঁজে লুকিয়ে রাখি
সকল আহাজারি কিংবা
পাওয়া না পাওয়ার আখ্যান...
দুই.
প্রণয়বার্তা
এইখানে, এই শাপলার শিয়রে
মাথা রেখে
ঘুমিয়ে থাকবো অনন্তকাল।
পদ্মপাতায় রেখে যাবো
শিশিরভেজা প্রণয়বার্তা।
তিন.
পাশেই বাড়ি
পাশেই বাড়ি দিয়েছে কেউ দাড়ি?
হরিণচোখে তাকালে দেখি শূন্যতায় ঘুরে পৃথিবী।
আমি কি তবে পথভ্রান্ত পথিক?
উত্তাল হাওয়ায় ভেসে আসা শেওলার মতো নিরুত্তাপ জীবনের পাঠমগ্নতায় আমি হারিয়ে যেতে চাই না
জানি না ঠিক কোথা দিয়ে গেছে আসল পথ
লুকানো সিন্দুকে আটকে থাকা দিনে
রক্তগোলাপে লেখা হবে আদিম কামার্থ দৃশ্য
আমি চাই না এই নপুংসতা
মায়াবী পেলবতায় গড়ুক সৃষ্টির প্রতিমূর্তি
পাশেই বাড়ি
দিও না কেউ কমা কিংবা দাড়ি।
চার.
শুভ হোক
শুভ হোক জীবনের সবগুলো ক্ষণ
শুভ হোক মায়াবী স্বর্ণাভ বন্ধন। আগামীর পথচলা
শুভ হোক স্বপ্নের বীজবপনকাল
শুভ হোক ভালোবাসার ছন্দ-তাল
শুভ হোক আগামীর পথচলা
শুভ হোক প্রীতি আর প্রেমের নৌকো চলা
শুভ হোক সব চাওয়া-পাওয়া
শুভ হোক সুন্দরের গান গাওয়া
শুভ হোক প্রতিটি গোলাপ ফোটা
শুভ হোক তোমার ভাগ্যফোটা
'সমস্ত দিনের শেষে সন্ধ্যা নামলে'
সকল প্রাপ্তির রেশ মিলায়ে গেলে
থাকবে শুধু শূন্যতার আপার বিস্তার
তখনই শুভ হয়ে পূর্ণ হোক তোমার প্রত্যাশা।
পাঁচ.
হেমন্তের রোদেলা মাঠে
হেমন্তমাঠে এখন জনকলরোল
সোনার প্রলেপে মোড়া বিস্তৃর্ণ ক্ষেত
যেদিকে চোখ যায় কেবল সোনালী আমেজ
পাকাধানের শিল্পিত আবহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি
পাকাধানের সায়রে।
নদীর শিওরে যেমন বৃষ্টি ঝরে
তেমনি আমার মনেও অরিরল ঝরছে স্মৃতিবৃষ্টি
পাতাঝরার মতো বেদনার ক্ষীণরেখা বয়ে যায় হৃদয়ে
স্মৃতির ক্যানভাসে ভাসে বাল্যবন্ধু ইরফান, আজিজুর রহমান, ইনচান আলী, মটর, সিরাই, বশির আরো কতো ছবি
চাষীর ফসল কাটার দৃশ্যে হারিয়ে যাই
উদাস করা গান আর দূরে কোথাও
বাঁশির সুরে বিরহের আকুলতা
দূরে কোথাও রাখাল বালকের হৈহল্লা
দূরে কোথাও কান্নার ধ্বনি
হঠাৎ কানের পাশ দিয়ে চলে অজানা এক পাখি
ঘুঘুর গানে উন্মন হয় পরাণ
বাতাসে নড়ছে কেয়াপাতা
শুকনো পাতানাচ আর ধানকাটার শব্দে সচকিত হলে
বনজফুলের সুবাস নিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখি
প্রত্নইতিহাস।
দূরে দেখা যায় হিজলের বন
কলাপাতা সবুজ রঙে মন রাঙালে
দুপুরের রোদেরা এসে মুখ গুজে নেয় আমার বুক পকেটে।
বাতাস আলতো করে চোখে মুখে মাখিয়ে দেয় ফেলে আসা দিনের অঞ্জন।
দাঁড়িয়ে আছি পাকাধানের সায়রে হেমন্তের রোদেলা দুপুরে।
জীবনপাঠ
মুহিবুর রহমান কিরণ
অস্তিত্বের সাংঘর্ষিক প্রতিকূলতায় বিপন্ন যে জীবন , জীবনের অনন্য সাধারণ উৎকর্ষে নিযুক্ত করে তার অতুলনীয় শ্রম, মেধা ও সামর্থ এবং মহৎ অর্জনের অঙ্গীকারে যে হৃদয় ধারণ করে অপরিসীম ধৈর্য ; তার অনুপম বর্ণনায় কালজয়ী লেখকেরা সৃষ্টি করেন তাদের ধারনা লব্ধ চরিত্রের বিচিত্র রূপায়ন। কথা দিয়ে ভাষা দিয়ে নির্মাণ করেন জীবনের গল্প। তা পাঠে আমরা জীবন বোধের গভীরতাকে স্পর্শ করি। অন্তরে অনুভব করি জীবন ও জগতের বহুবিধ ভাবনা ও বাস্তবতাকে।
কিন্তু সেদিন একটা গল্প পড়লাম। না, এটা কোন কালজয়ী লেখকের শব্দ ও বাক্যের প্রাঞ্জল বর্ণনার পাঠ নয়। এটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বা সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা কোন ঔপন্যাসিক চরিত্রের জীবন কথন নয়। এটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা কোন কাহিনী নয়। সেদিন এদের কোন লেখা আমরা পাঠ করিনি।
আমরা পাঠ করেছি একটি জীবন, কোন বর্ণনা, উপমা বা কোন শব্দ দিয়ে নয়। পাঠ করেছি হৃদয় দিয়ে অসাধারণ জীবনের অনুবাদ। অনুভব করেছি এক প্রতিশ্রুত তরুণের জীবন- বীক্ষণ। দেখেছি অমানিশার অন্ধকার বিদীর্ণ করে এক অবিশ্বাস্য সূর্যোদয়।
যার গল্প পড়লাম তিনি সুপ্রিয় অনুজ কবি পুলিন রায়। তার এই জীবনের গল্প হতে পারে কোন জীবনের নব উজ্জীবন। হতে পারে কোন নবীন শিক্ষার্থীর আদর্শ পাঠ।
(লেখক: বাংলা সাহিত্যর অধ্যাপক।)
জনপ্রিয় সাহিত্যিক,'সিলেট সাহিত্য পরিষদ' সভাপতি,'ভাস্কর' সম্পাদক,মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পুলিন রায় দাদার ফেসবুক টাইম লাইনে 'জীবন কথা' শিরোনামে তাঁরই একটি লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রিয় এই মানুষকে নিয়ে একটি ছড়া লেখার ইচ্ছে জাগে।দাদার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ ছড়াটি প্রিয় পাঠক আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম---
দুখজয়ী বীর
গোলাম নবী পান্না
ধৈর্যের হাল ধরে পাল তুলে গেলে
সাফল্য তরী নিয়ে তীর দেখা মেলে।
এতে থাকে শ্রম আর নির্ঘুম রাত,
তাতেই রচিত হয় আলোর প্রভাত।
সে আলোয় পথ খুঁজে জীবনের বাঁকে
সফলতা পেতে যারা স্বপ্নটা আঁকে---
তাদের ভাগ্যে আসে সেই শুভ ক্ষণ
জীবন আলোয় ভরা রঙিন ভুবন।
এমন জীবন নিয়ে আলোকিত যিনি
আমরাও তাঁকে আজ প্রিয় নামে চিনি।
পুড়ে পুড়ে খাঁটি যেনো সোনার এ লোক,
তাঁকেই মডেল ভেবে অনেকের ঝোঁক---
এমনটা হতে পারা চাই তবে চাই,
ফিরে ফিরে আসে তাই তাঁর নামটাই।
পুলিন রায়ের খ্যাতি আজ মুখে মুখে
দুখজয়ী বীর হয়ে জাগে মহাসুখে।
সম্পাদনায়ও তাঁকে খুঁজে পাই
'ভাস্কর' দিয়ে তিনি মনে নেন ঠাঁই।
0 মন্তব্যসমূহ