দেওনদী, মহাকাল||সন্দীপ সাহু
উপন্যাসঃ দেওনদীর জল
ওপন্যাসিকঃ পদ্মশ্রী মজুমদার
প্রচ্ছদঃ গৌরব ধর
প্রকাশনাঃ স্রোত প্রকাশনা, হালাইমুড়া, কুমারঘাট,ঊনকোটি, ত্রিপুরা।
প্রকাশকঃ সুমিতা পাল ধর
পরিবেশকঃ অন্যপাঠ, কুমারঘাট,ঊনকোটি, ত্রিপুরা
মূল্যঃ ২০০ টাকা
আন্তর্জাতিক কোলকাতা গ্রন্থমেলা'২২ এ "স্রোত প্রকাশনা"-র স্টলে পদ্মশ্রী মজুমদারের লেখা উপন্যাস " দেওনদীর জল " উপন্যাসটি পাই। প্রথমে চোখে পড়ে প্রচ্ছদটি। প্রথম দেখায় প্রখ্যাত উপন্যাস " পদ্মানদীর মাঝি "- র কথা মনে হয়েছে। উপন্যাসটি কিছুটা এগুতে এগুতে " হাঁসুলীবাগের উপকথা "-র কথা একটু মনে হচ্ছিল। তাই হোক, প্রচ্ছদ রচনায় শিল্পী গৌরব ধর, তার পরিণত শিল্পী সত্তার ছাপ রেখেছেন। মে কোনো নদীই সমাজ সভ্যতার ধারক। আবার মহাকিলের অসীম তার দ্যোতনা বহন করে। প্রচ্ছদে দেওনদীর সত্তাটি সুন্দর এসেছে। উপন্যাসটি দেওনদী অঞ্চলের সকল মানুষকে উৎসর্গ করা হয়েছে। কথামুখ অংশে ঔপন্যাসিক সাহিয্যকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে একদম শেষে বলেছেন, " বর্তমান বইটি দেওনদীর কাছে আমার ঋণ স্বীকার।" এই ঋণ স্বীকার শুধু নদী নয়, নদীর মানুষগুলোর প্রতিও।
এরপর পেলাম কথাপৃষ্ঠা। কথামুখই মে কোনো গ্রন্থের প্রবেশদ্বার। কথাপৃষ্ঠা অভিনব। পড়লাম। আসলে এটি সেবিকা ধর লিখিত এই উপন্যাসের রিভিউ বলা চলে। সেবিকা ধর সম্ভবত ছদ্মনাম। এই ধরণের রিভিউ পড়ার পর নৈর্ব্যক্তিক ভাবে পাঠক মননের উপন্যাসে প্রবেশ, ক্ষুন্ন হতে পারে। পাঠকের স্বাধীন চিন্তন মনন ব্যাহত হতে পারে। এটি প্রকাশকের একটি কৌশলও হতে পারে সদর্থভাবে পাঠক মননে আগে থেকেই একটা ছাপ দিয়ে দেওয়া।
যে কোনো প্রাচীন অঞ্চলে একটা মিথ থাকে। এই মিথ দিয়েই উপন্যাসের শুরুটি খুবই আকর্শনীয়।
খনার বচন ও দেও লঙ্গাই মনু --- এই তিন নদী সম্পর্কিত প্রচলিত কাহিনি ছোট্ট পরিসরে রসতীর্ণ ভাবে পাঠককে দেওনদী সংলগ্ন অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিত করায়। পরিচিত করানো হয়েছে কুমারঘাট, দেওনদীর তীরের ছোট্ট শহরের সঙ্গে।এই অংশটি বেশ সুন্দর।
প্রথমেই পাই অবন্তীর কথা। অন্যতম মূল চরিত্রে।
দেওনদীর প্রতিটি স্রোত, প্রতিটি ঢেউ এই আঞ্ছলের প্রতিটি মানুষকে ধারণ করে। ধারণ করে এই অঞ্চলের কৃষ্টি সংস্কৃতি ও মননকে। সুতরাং এই উপন্যাস অনেকগুলো কেন্দ্রীয় চরিত্র ও তাদের ঘাত প্রতিঘাতকে ধারণ করে মহাকালের দিকে দৈওনদীকে অনুসরণ করে এগিয়েছে। অবন্তী শিক্ষিতা স্বাধীনচেতা। এইজন্যই অনিরুদ্ধ দত্তর ভালো লেগেছিল। অবন্তী এই অঞ্চলের সব কিছু নিয়ে একটা নামকরণ না করা প্রজেক্টে হাত দিয়েছে।
হ্যান্ডি নিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে পুজো, লোকসংস্কৃতি নির্ভর অনুষ্ঠানের ছবি তোলে। যুক্তিবাদী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় শাপে কাটা রুগীকে যথার্থ চিকিৎসার অধীন এনে বাঁচিয়। মানুষের সঙ্গে মেশে ওদের দু'জনের মধ্যেই একটা মিষ্টতা ছিল। ল পড়াকালীন অনিরুদ্ধ পুরুষতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। বাহিরমুখো চাকরি করতে চাওয়া অবন্তীকে ঘরের মধ্যে বাঁধতে চায়। অবন্তী দেওনদীর জলের মতো চিরন্তন স্রোত। স্পষ্ট জানায়, " আমি আমার মতো থাকবো। শো-কেসের পুতুল হয়ে নয়।" প্রত্যাখ্যান করে অবন্তী। সবাই তাকে বোকা মনে করে। প্রত্যাখ্যান করলেও নিভৃতে একাকী অবস্থায় অনিরুদ্ধ ঠিক তার মনে আসে। কিন্তু আটকে পড়ে না। একটা দ্বন্দ্বে রক্তমাংসে অবন্তী জীবন্ত হয়ে ওঠে।বয়ে চলে দেওনদীর মতো।
কমলিনী। অদ্ভুত সুন্দর অন্যতম মুখ্য চরিত্র। লাউগোঁসাইও। গোঁসাইরা তো নদীই হন। কোনো বন্ধনে আটকান না। সেই দিক থেকে লাউগোঁসাই অভিনব নয়। তার স্পর্শে স্বামীর অত্যাচারে অত্যাচিরত, ভাইয়ের সংসারে স্থান না পাওয়া কমলার দেওনদীর জল হয়ে যাওয়া, সত্যিই চরিত্রটিকে অনন্যতা দিয়েছে। অসীমতার আনন্দ কমলা গোঁসাইয়ের ঘরেই পায়, " গোঁসাইয়ের ঘরে ঢুকলেই কী এক আনন্দে ভরে যায়কমলার। ... যে ছন্দে এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি চলেছে অবিরাম, এ যেন সেই আনন্দ--- সেই ছন্দ। "
রাণীবালা, তার বড় ছেলে, বৌমা, ছোটো ছেলে ঠিকাদার কল্লোল, কল্লোলকে ঘিরে ঊষা ও শ্রাবণী, পাপ্পুর মা ইত্যাদি চরিত্রর ক্ষুদ্রতার গণ্ডীতে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনস্রোতে এগিয়ে চলেছে নানা ঘটনার স্রোতে। শ্রাবণীর ডুবে মরা ঘটনায় কল্লোলের মনপীড়া, জ্বরের ঘোরে নিজেকে শ্রাবণীর হত্যাকারী হিসেবে বার বার বলা। সেই বলা যাতে অন্যর কানে না যায় তার জন্য ঊষার সচেষ্ট হওয়া দারুন এক ত্রিকোন প্রেমের মনস্তত্ব সুন্দর প্রকাশ পেয়েছে।
পিপ্পুর মা-র মতো চরিত্রর গ্রাম বাংলায় অপ্রতুল নয়।
পাপ্পুর মা স্বামীর মৃত্যুর পর কীভাবে আজকের পাপ্পুর মা হলো, তা সত্যিই এক সংঘাতক্ষুব্ধ নদীজলের কথা। বেঁচে থাকার জন্য আপোষ করতে হয়েছে। তবুও বিবেকের তাড়নায় প্রতিবাদও করেছে, " ঢং নায় ঠিকউ কইরাম। আমি বিধবা। লুভে পড়িয়া তোমার লগ্ লইছি। স্বীকার কররাম। কিন্তু আমার লাগি তুমার চ্যালার লগেও ...!" প্রতিবাদ কোনো কাজে আসেনি। সাধুর ব্ল্যাকমেলিংয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সেই পাপ্পুর মা আন্দাজে হাড় চুরির কিনারা করে। ছেলের চাকরী, মেয়ের বিয়ে নানা সমস্যার সমাধান দেয়। এমন কি রাণীবালার অনুরোধে কল্লোলের প্রেম বাঁচাবার কাজও নেয়। বরষার দেও প্লাবিত হলে সব একাকার হলে সাপ মানুষ সবই এক হয়ে যায়। সাপের কামড়ের পাপ্পুর মা মরে। এও এক জীবন প্রবাহ।
বিমল, মীরা, পরিমল, সুধা এরাও ক্ষুদ্র সংসার গণ্ডীতে পরস্পরের সঙ্গে মাথা ঠোকাঠুকি করে দেওনদীর জলে ভেসেছে। মীরার হাড় চুরি, আবার হার ফিরিয়ে দেওয়া, বিমলের উচ্ছন্নে যাওয়া, বিষমাছ ধরে বিক্রি করা, মীরার ছেলের দেওর জলে ডুবে যাওয়া, মীরাকে সুধার দেখাশশোনা--- এ সবই একটা জীবনস্রোত। দেওনদীর জলে মিশে যায়।
শ্যামল চরিত্রটি দক্ষীণভারতে চাকুরিসূত্রে থাকলেও বাথটবে তার ছেলেকে চোদ্দপ্রদীপের সংস্কৃতি শেখায়। দাওনদীর জল দক্ষীণভারতেও প্রবাহিত হয়েছে।
শ্রীনিবাস চরিত্রটি কীভাবে নেতা হলো, কীভাবে দুর্নীতিতে জড়াল তা সুন্দর এসেছে। তবে তারও বিবেক একেবারে মরে যায়নি। অনৈতিক চাপে অসুস্থ হলে, একজন তার কাছে আসে। মেয়ের বিয়েতে শ্রীনিবাস তাকে সাহায্য করেছিল। তাই সে এই অসুস্থতার খবর পেয়ে দেখা করে প্রণাম করে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছে। তার মনে হয়েছিল, " যদি ক্ষমতার পুরোটাই সে এভাবে মানুষের কাজে ব্যবহার করত তবে কি আজ মানুষ আগের মতোই আসত তাকে দেখতে? তার আরোগ্য কামনা করত? মানুষের ভিলোবাসায় ভরে উঠত তার অসুস্থ জীবন। অসুস্থ হওয়ার কোনো দুঃখ তাকে স্পর্শ করতে পারত না। চোখ দু'টো ভরে উঠল শ্রীনিবাসনের।"
একদম শেষে ভরা বর্ষার জশষলে দেওনদীর প্লাবিত জলে সব একাকার সর্বত্র জল। অসীম মহাকাল যেন দেওনদীর জলে। অবন্তী এই বিস্তৃতি দেখে বুঝে উঠতে পারে না, কীভাবে সে দেওনদীর জলকে নিয়ে প্রোজেক্ট শেষ করবে।
এই উপন্যাসে ওই অঞ্চলের পুজো, পুজো কন্দ্রিক লোক সংস্কৃতি, নববর্ষ কেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি, বিভিন্ন ব্রতকথা(ভুলা-ভুলি,কর্মপুরুষব্রত,ইত্যাদি)সামগ্রিকভাবে সুন্দর এসেছে। সেই সঙ্গে খনার বচন, লাউগোঁসাইয়ের গান, আর ত্রিপুরার মহারাজ রত্নমানিক্যর কাহিনি দেওনদীয জলের স্রোতকে জীবন্ত করে প্রবাহিত করেছে।
উপন্যাস দর্শন-মননের রক্ত-মাংসের মূর্তরূপের আধার। শুধু আধার নয়, নিজেই দার্শনিক হয়ে সমাজ সভ্যতার রূপকে চেনায়। একটা অঞ্চলের জনপথ দার্শনিক হয়ে ওঠে ঔপন্যাসিকের মনন সমৃদ্ধ বোধের ঔজ্জ্বল্যে। ঠিক এই রকম অভিজ্ঞতা হলো কথাসাহিত্যিক পদ্মশ্রী মজুমদারের লেখা উপন্যাস " দেওনদীর জল" পড়ে।
0 মন্তব্যসমূহ