একটি জীবনবেদ--একটি চর্যা কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ 'দেও'||হারাধন বৈরাগী


একটি জীবনবেদ--একটি চর্যা কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ 'দেও'||হারাধন বৈরাগী

দেও।কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের নদীকাব্য।
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ ত্রিপুরার সন্তকবি মিলনকান্তি দত্ত ।কবি পদ্মশ্রী মজুমদার এই সময়ের ত্রিপুরার সাহিত্য আকাশের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।তিনি শুধু কবি নন।কবিতা ও গল্পে সমান পদচারণা ।ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষায় সমান দক্ষ ।এই প্রতিস্রুতিবান ত্রিকালদর্শী এই কবির ত্রিপুরার পুন্যতোয়া দেওনদীর উপর আযৌবন সখ্যতার কিংবা সহবাসের সখ্যতা থেকে উঠে আসা ক্ষারপানিই যেন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের নিখাদ উচ্চার।কবি মিলন কান্তির কথায় '---নারী ও রমনী, জায়া ও জননী খণ্ড গৃহস্থালি ও কবিতার অখণ্ড চিরপদার্থ যেন আলাদা করা যায় না।পদ্মশ্রীর সত্যার্থী উচ্ছারণে,-'তোমার বুকে এত জল! গহীন জলে নাওকে তবু ভাসতে দিলে কই? 'তবু'এই শব্দবেদ প্রস্থানের মহাপথে পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়।'

এই কাব্যগ্রন্থে ,নদীর সঙ্গে কবির অন্তরাত্মার অভেদ্য সহবাস,যা থেকে কবিকে আলাদা করা যায় না।আলাদা করা যায় না কবির সহবাস শ্রীহট্টীয় মানুষের জীবনবেদ থেকে, নদীর জীবন-কান্নার ক্ষারপানি থেকে।

দেও ত্রিপুরার উল্লেখযোগ্য নদী।কুহকিনী জম্পুই সীমানাপুরের কাছে যেখানে শির নত করেছে,সেখানে‌ই শাখানসুন্দর হাত বাড়িয়েছে প্রেমিকাকে উদাত্ত আহ্বানে।আর সেখান থেকেই দেওনদ উৎপন্ন হয়ে উত্তরাভিমুখে সর্পিলাকার পথে বিবিধ ছোট-বড় ভূমিরূপ কর্তনপূর্বক এক সুদীঘল উর্বরা উপত্যকার জন্ম দিয়ে পশ্চিমাভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। অবশেষে শাখানত্লাং পর্বত কর্তনপূর্বক এক সুবিশাল উপত্যকায় মনুগঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে।এই মনুগঙ্গার পাড়েই আবাহমান কাল ধরে শ্রীহট্টীয় মানুষের বসবাস। শ্রীহট্টীয় লোকজীবন লোকসংস্কৃতিতেই আধারিত দেওমনুসঙ্গমের জল।আর এই সঙ্গমের জলেই কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের আশৈশব বেড়ে ওঠা।

এই নদীর সাথে জড়িয়ে আছে কত কথা। 1709-1715 খৃঃ আসামের মহারাজ রুদ্রসিংহের দুই রাজদূত রত্ন কদলী ও অর্জুন দাশ বৈরাগী উদয়পুর যাত্রাকালে ,উত্তর ত্রিপুরার লালজুরীর কোন এক স্থান থেকে দেওনদীতে বাঁশের ভেলায় চড়ে মনুসঙ্গমে যান। বর্তমানে দেওমনুসঙ্গমের হালাইমুড়াতেই কবি পদ্মশ্রীর কবিতাঘর।এমন নদী দেও কবির মগ্নচৈতন্যে ধরা পড়েছে তাই ভিন্ন জীবন আঙ্গিকে ।আযৌবন দেওপাড়ে বেড়ে ওঠা কবি পদ্মশ্রী জীবন আধারিত শ্রীহট্টীয় বারমাস্যা লোকাচারের বেদীতে।তবু যেখানে শ্রীহট্টীয় নরনারী লোকাচারকে জীবনবেদের মতো মান্য করে চলে, সেখানে কবির দৃষ্টি লোকশিক্ষা আধারিত,কার্যকারণসম্পর্কিত,আত্মবিশ্লেষণের নিরিখে মৃন্ময় থেকে চিন্ময়ে। তাই তিনি বলতে পারেন স্বনির্বাচিত বিশুদ্ধ উচ্চারে-

"দেও আমাকে প্রথম দেখিয়েছে শরীর জুড়ে বন্যা আসা"
"দেওনদী আমাকে দেয় সময়ের প্রথম পাঠ, জল"(দেও-১)

"দেওনদীতে শুরু ,দেওনদীতেই শেষ।শুধু ত্রিকালপ্রবাহী/এই নদীর কোন আদি নেই,অন্ত নেই,অবিরাম/ব‌ইছে এই শহরের সমস্ত পাপ ও পুণ্য,সুখ ও দুঃখ।"(দেও-২)

"বিসর্জনে কি শুদ্ধ হয় বারোয়ারি প্রতিমা?"(দেও-৩)

"কেউ নদী হতে পারেনি মাটির কাছাকাছি নেমে আমাকে/ছুঁয়েই বাষ্প হয়েছে সব,-----"(দেও-৪)

"---আমি দেখি সে বয়ে চলে/কথা বলি,সে-ও বলে,ছাদ থেকে নামার আগে/দেওনদীর বুক ভরা স্রোতে ভাসিয়ে দেই সুখ-দুঃখ সব।"(দেও-৫)

"তীরে ফিরতে চাই।------/তবু ফেরা হয় না চারদিকে এতো জল/জল আমার বৈঠা বেয়ে ওঠে, সাঁতার জানি না/শুধু জানি একদিন দেওনদীর ভাটার টান/আমাকে তীরে ফেরাবেই।"(দেও-৬)

"রাতে অনেক বৃষ্টি হল। পাহাড় বেয়ে উজানের সমস্ত জল ভরে দিল গর্ভ; আমার এলোচুল ভিজল/চোখে জল,বুকে জল,গর্ভে জলের/ক্রমাগত ঢেউ নিয়ে আমি এখন বর্ষার ভরাল দেও।"(দেও-৭)

" সমস্ত কথা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে,অস্পষ্ট /হচ্ছে মায়া শব্দ।---বেশ শুনতে পাচ্ছি যেন পাড়ভাঙার শব্দ,/তীরের নরম বালি আর উর্বর পলিমাটির মায়াজাল/পেরিয়ে প্রতিদিন একটু একটু এগিয়ে আসছে দেও।"(দেও-৮)

"তুই ,ভাসিয়ে নিয়ে যা/আমার যতো ভার।"(দেও-৯)

"---সারারাত/জেগে থাকি তোর মুখ/চেয়ে,তুই কি আমার/সেই আকাঙ্ক্ষার দেও?"(দেও-১০)

"--ত্রিকাল/প্রবাহী এই স্রোতস্বীর কাছে বড় তুচ্ছ/ক্যালেণ্ডার জীবন।"(দেও-১২)

"মরশুমের প্রথম বৃষ্টি দেওনদী গা ভরে নিচ্ছে/কোন বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় সমস্ত পাপ-পুণ্য"(দেও-১৩)

"তিনদিন ধরে জলের মেশিন খারাপ ,/জল সরবরাহ বন্ধ, তৃষ্ণার্ত মানুষ/ছুটছে দেওনদীর দিকে।--ঢেউ ঢেউ মায়া নিয়ে /পুরো দেওনদীটাই আমার কোলে/আর কোন তৃষ্ণা নেই জীবনের কাছে"(দেও-১৫)

"কবে থেকে রোজগার করছি অথচ/কিনতে পারিনি কিছুই না চোখের জল/না দেওনদীর জল না তোমার হৃদয়/--দেও নদীর তীরে বসে আছি ঠায়/মুঠোয় পারানির কড়ি,কড়ি দিয়ে/কিনে নেব একটি পারাপর।"(দেও-১৬)

কেন এই শহরের সমস্ত প্রাণীর ফুসফুস/অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করে?/তবে কি দেও বিষকন্যা? প্রতিদিন/গলায় ঢেলে দিচ্ছে বিষ জীবনের নাম করে!"
"সভ্যনাগরিকের মতো গলায় ঢালি জল,/দেওনদীর জল, এছাড়া কোন বিকল্প নেই।"(দেও-১৭)

"-- পোষাক/ আর মুখোশের আড়ালে হাঁসফাঁস মানুষ/নদী নেই জীবনের কোথাও"(দেও-১৮)

"দেওনদী,সে তো নদী‌ই।না-জোয়ার,না-ভাঁটা/বুকে তার কলাগাছের ভেলা/বেহুলা-লখাই,ভেসে চলেছে অনিবার্য/মনসামঙ্গলের দিকে।"(দেও-১৯)

"সাঁতার জানি না।পেরোতে পারিনি দেও"
"---তাই, তীরে বসে আছি/চুপ। হাতছানি নয়,নৌকো আসবে"(দেও-২০)

"উল্টোরথের সাথে ফিরে আসে সব মেলা,জিলিপি/তালপাতার সেপাই, ভেঁপু আর মন-কেমনকরা/নীল নীল মেঘরঙ আষাঢ়ের বিকেল/শুধু ফেরে না দেও।"(দেও-২১)

"জানো‌ই তো সবচেয়ে ভালবাসি ঘুমোতে/
প্রায়‌ই তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারি না,/তুমি অভিমান করো মুখে কিছু না বলে/গাল ঝুলিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াও;/বুকের কোথা‌ও চিন-চিন কষ্ট হয়।বরং/ দেও নদীকে বলি ঘুম পাড়িয়ে দাও--"(দেও-২২)

"ভেবেছিলাম তীরে বসে/দু'জন মিলে গুনব ঢেউ;/
দু'জন মিলেই গুনছি/কিন্তু হিসেব মিলছে না।"(দেও-২৩)

"তোমার বুকে এতো স্রোত/তবু আমার স্বপ্নে দেখা/ নদী হলে ক‌ই?"(দেও-২৪)

"কোল ভরে দিয়েছ দেওনদী/তাই আছি পাশাপাশি/ব্যবধানে সমান্তরাল"(দেও-২৫)

"যেতে যেতে দেখি/দেওনদীর তীরে শ্মশান,মফস্বল/কবে আসব এখানে?"
"পায়ে পায়ে শেষ হবে মফস্বল পথ,/ব্যবহৃত শরীর ও মন,/পুড়ে যাওয়া জীবনের সমস্ত ছাই/দেওনদী গর্ভ পেতে নেবে/ভালো-মন্দ বিচার না-করেই/ঠিক আমার মায়ের মতো।"(দেও-২৬)

"আজ বারুণী।চাল খই কলা বাতাসা/ হাঁসের ডিম, ধূপ আর উলুধ্বণিতে/ দেও আজ গঙ্গা।মায়েরা সন্তানের মাথায়/তেল-সিঁদুর দিয়ে তাকে প্রথমবারের মতো/জলে নামিয়ে কাটিয়ে নিচ্ছেন জলের দোষ।"(দেও-২৮)

"--দেওনদীতে নাইতে গিয়ে/কখন হারিয়ে গেছে পরিচয়ের আংটি"
"যে মাছটি গিলে খেয়েছিল পরিচয়ের আঙটি/দেওনদীর বুকে বারবার জল ফেলেও/ তাকে ধরা যায়নি"(দেও-২৯)

"দেওনদীতে বিষ প্রয়োগ অব্যাহতঃপ্রশাসন নির্বিকার/এই সংবাদ শিরোনামে অভ্যস্ত এই শহরের মানুষও/নির্বিকার--"(দেও-৩১)

"আসুক প্রলয়,দেওনদী আজ জয় করুক/সকল পরাজয়।"(দেও-৩২)

"---গতবছর গোলায় গেছে অনিলের ছোট মেয়ে,দেওনদীর শহরের/মানুষের মুখে মুখে ফেরে সে-কথা,/বছর ঘুরতেই আবার গর্ভবতী মায়া/অনিলের স্ত্রী ছেলে কোলে লাকড়ি ধরে দেও নদীর বন্যায়,--"(দেও-৩৩)

""কার্তিকে হঠাৎ বৃষ্টি, কুয়াশার বদলে ঢল।"
"দেওনদী লগ্ন ছাড়াই চলেছে এবার গোপন অভিসারে।"(দেও-৩৪)

"আজ দীপাবলি দেওনদীর বুকে আলোর মেলা/দুই তীরে শ্রীহট্টীয় বসবাস, কলাগাছের /ছোট্ট ভেলায়  জ্বেলেছে চৌদ্দ বাতি,/পথ দেখবেন চৌদ্দ পুরুষ।"(দেও-৩৬)
"দেও নদীর তীর ধরে হাঁটলে কাঞ্চনপুর নাকি যাওয়া যায/--শুধু কাঞ্চনপুর কেন/দেওনদীর তীর ধরে হাঁটলে যাওয়া যায়/অসীম শূন্যতায়/
যেখানে সুখ ও দুঃখ/ উৎসারিত হচ্ছে সমান দাড়ি পাল্লায় /"(দেও-৩৭)

"শীতজল দেওনদীকে এক অদ্ভুত রহস্যে মুড়ে দেয়,/যে রহস্যের কথা জানে শুধু পরিযায়ী পাখিরা"
পঁচিশে বৈশাখে ষোল‌আনা বাঙালি সেজে/ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিশুটিকে বলি/টেগোরের হ্যাপি বার্থ ডে?--"(দেও-৩৮)

"--দেও নদী শুধু জানে কতটুকু অন্ধকারে ঝাপ দিলে মেলে না ঠাঁই।/কতটুকু অন্ধকারে জন্ম নেয় ডহর"(দেও-৩৯)

"দেওনদী তিরতির মিশে যায় মনুতে আমরণ"(দেও-৪১)

"আজ আশ্বিনের সংক্রান্তি/শ্রীহট্টীয় ভাষায় আট- আনাজের সংক্রান্তি/দেওনদী শহরের শ্রীহট্টীয় মানুষ/আরও একবার খুঁজবে শেকড়"
"----ধান আর সবজি ক্ষেতে চালতা পাতার ' টগা' আর/ কৃষকগিন্নীদের উলুধ্বনিতে/বসুন্ধরা আজ গর্ভবতী/"(দেও-৪৩)

"বড় সুখে আমার স্নায়ু বয়ে যাচ্ছে অবচেতনার দিকে /তুই দেওনদী আমার ইতিরেখা"(দেও-৪৬)

সত্যি পদ্মশ্রী জানেন,যত‌ই নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনবোধ কার্যকারণের দাঁড়িপাল্লায় তুলেন না কেন,যত‌ই বোধ-অবোধের গহনে বিচরণ করেন না কেন, শ্রীহট্টীয় চর্যা তার‌ও শেকড়ে প্রোথিত।এ থেকে নিজেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।তাই তিনিও অবশেষে পরাভুত সৈনিকের তকমা গায়ে জড়িয়ে ইতি চান,একদিন,জীবনের আলোর পথে,শ্রীহট্টীয় জীবনবেদ অনুসারী বারমাসের তেরপার্বনের লোকাচার আচ্ছাদিত দেওনদীর ডহরের অবগুন্ঠিত লহরের‌ই ঘোরে‌র ভেতরে---------।সুখপাঠ্য হৃদয়ছোঁয়া এই কাব্যগ্রন্থ।পড়ুন ও পড়ান।শুভেচ্ছা কবিকে।

দেও-পদ্মশ্রী মজুমদার
স্রোত প্রকাশনা হালাইমুড়া কুমারঘাট ঊনকোটি ত্রিপুরা।পিন-799264 মোবাইল 9436167231
email:srot gobinda@rediffmail. com, baibari 15@gmail. com
বিনিময় ১০০ টাকা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ