পরিতোষ হালদারের ‘সমীরণ রায় সিরিজে’র একগাদা কবিতা
.
১.
সমীরণ রায়
.
.
সমীরণ রায় বলে বসল― সে ৫৩ বছরে মারা যাবে। জাস্ট ৫৩। পারিবারিক সূত্র মতে তার জন্মদিন―
১৪ এপ্রিল, রাত ১২.০০।
সমীরণ আমার বন্ধু। চেহারায় দর্শনিকতার ছাপ থাকলেও খুবই স্মার্ট। বই পড়ে, কবিতা লেখে। ধারালো কথায় মানুষকে হাসায়। কষ্ট সাজিয়ে রাখে, যার ফাঁক-ফোকর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তোলে। কলেজ জীবনে খুব কারো প্রেমিক হতে না পারলেও ডার্কসাইটের হিরো ছিল
সম্প্রতি ওর সাথে গল্প করতে করতে রাত হয়ে যায়। ১১.৫৯ মিনিটে আমরা চা খেতে থাকি, সাথে একটি করে প্যারাসিটামল। এভাবে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি।
পড়ের দিন ভোরে ওকে বলি― সমীরণ তুই ৫৩ পার হয়ে গেলি। সে আমার দিকে সোজা তাকিয়ে বলে―
ঠিক ৫৩ বছরে বয়সে কোনো মানুষই মরে নাকি!
.
.
২.
দাঁড়াতে পারি, যদি তুমি স্বরূপে এসো।
আর
সামনে থেকে এলে, মনে রেখ আমি ফিরবো না।
নিসর্গ ডাকছে, আমি যাই...
আপাত গন্তব্য : ঝিঝিবন
এক... দুই... তিনজন
হিজিবিজি ঝিঝিবন
আরেকজন― মিস্টার সমীরণ রায়। পকেটে স্মৃতি নিয়ে হাঁটে। দেখা হলে অন্ধকার বিলিয়ে দেয়।
সে এখন হুহুজন।
৫৩ বছর পার করে এসে বলে― চল কাঁদি...
.
.
৩.
সব পথ অপেক্ষা করে, কখন আমরা যাবো আমাদের আকাশে আকাশে ধ্বনিত হেমন্ত ঋতু।
শিশিরের শেষ সোমবার যেন।
রোদ ছিল ফেলে যাব... বকুল ও তার ঝুপঝুপ-
শুরু ও প্রথম শব্দের শ্রমণ।
তবু কত সামনে তুই... ৫৩ পেরোনো লম্বা সরলরেখা।
দুই হাতে মেঘ, হিংসার মতো কতগুলো ছায়া।
যেন শৈশব যেন বিবাহপূর্ব কোনো বিষণ্নতা।
সমীরণ দাঁড়া, আমি কী তোর তালে হাঁটতে পারি।
.
.
৪.
অথচ মানিয়ে যায় তোর উর্ণি ও উবাচ-খেলা।
তুই ছিলি চিঠির মতো। আমরা পড়তাম― প্রথমে আমার ভালোবাসা নিস, পর সমাচার এই যে... তারপর কত কথা, আমাদের সমস্ত ব্যকুলতায় ভরা ছিলি তুই। তোর কাছে জীবন ছিল, যাকে উড়িয়ে দিয়েছ। কবিতা― সেও ষড়যন্ত্রকারী। তবু অফুরন্ত সময়, ৫৩ পার হয়ে গেলে কে আর মরতে চায় বল।
তুই এখন শরীর, নাম : সমীরণ
তুই আশরীর, নাম : সমীরণ
বিষণ্ন কেন, চল আকাশ দেখি...
.
.
৫.
যেতে যেতে দিন যায়― আজ ছুটি, আজ রাঙা রোববার।
বর্ণমালার ঝরে, আমি, নির্জন ও সমীরণ।
আমরা ছাড়িয়ে-ছড়িয়ে-হারিয়ে গেছি, সে কবে কত দিনের কথা।
এখন তুণফুলের সাথে সন্ধ্যা নামে, ও রাত... দাঁড়িয়ে থেক, আমরা আসিতেছি,
সমীরণ-আমি―
অণু ও মানের সাথে অসংখ্য ছায়া।
যেন ডাকবাংলো, যেখানে আশ্রয় নিতে পারে হীম, মৌলি ও মানুষের মৃত কোলাহল।
অথচ―
শুয়ে আছি ঘাসে, সমীরণ তুই আজ অন্ধকার।
.
.
৬.
সমীরণের ভেতর গজিয়ে ওঠে বন, হতাশা আর সিন্ধুনদ।
তবু গাছ হতে চায়। তার অভিযোজন বাড়ে, সালোক-সবুজের ভরে যায় শরীর।
সে সময় নিয়ে আসে, বাতাসে ভাসিয়ে দেয় দৃক।
ডাক দেয়- আইস আমরা আকাশে প্রতিপাখি উড়িয়ে দি।
একসাথে সাতটি হেতালগাছ হই।
সমীরণ সত্যিই গাছ হয়ে গেল, মাথায় অজস্র পাতা, পাতায় বর্ণের গান, গানে রাগ টরি।
তবু সন্দেহ, কখন সে মানুষ হয়ে যায়...
.
.
৭.
সমীরণ যায়... শব্দ থেকে হীম অব্দি একটি সরলরেখা
তারপর বন-জঙ্গল-শহর পেরিয়ে আবার নিঃসঙ্গ।
কোথায় সময়...
হীমঘরে নাকি গুহায় নাকি ১০.১০-এ আটকে থাকা সুইজ ঘড়িতে।
ওল্ডটেস্টামেন্ট থেকে উঁকি দেয় রং।
একদিকে ছায়া, অন্যদিকে মমিদের পিতৃভূমি।
তবু ডাকে― ও সময়...
দেখে, কিছু মৃতঘড়ি একটা সুপারসনিক বিমানে উঠে দ্রুত হারিয়ে গেল।
.
.
৮.
ছুঁইয়ে দেখি― তোর শরীর ও অতিশরীরে কতটা বসন্ত লেগে আছে।
বাইরে নিমপাতার নির্জন, আমাদের ঝিরঝির বহিয়া যায়।
চল... গলির এপাশে অপেক্ষা দাঁড়িয়ে আছে।
সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে আছে...
দূরে রাত নামে, পাখির ডানায় ভিন্ন ভিন্ন দেশ, ভিন্ন স্বদেশ।
নাকি পথ না অন্ধকার।
কে যেন চিৎ-কারে বলে― যে আসে সে তুই, যে যায় সেও তুই।
কাল চা খেতে এসে একবার দেখা― তুই মূলত সমীরণ।
.
.
৯.
সমীরণ চল পাহাড়ে গিয়ে বসি। যেখানে প্রজাপতির সাথে উড়ে যাবে ইহ। অসংখ্য জিরাফ তার সীমা থেকে আকাশ দেখবে আর ছড়িয়ে দেবে করুণাধারা।
সংসারও মৌন খোঁজে, সমস্ত ঋতুর গায়ে লেখা বাতাসের গান। যোগ ও বিয়োগে সংখ্যা ছেড়ে যাবে মান।
আমরা মূলত মেঘ, ঘুরে ঘুরে বৃষ্টি নামাই আর জলের চিহ্নে নিয়ে যাই টাপুর-টাপুর।
পাহাড় ডাকে―
আয়― তুই ও তোর বন্ধু, দুজন― সমীরণ।
আয়―
তোর শরীর থেকে নেমে যাবে নিম ও নির্বানকলা।
.
.
১০.
অপেক্ষা পেরিয়ে দেখি তোর পায়ে গতির ছোঁয়া। দাঁড়িয়ে আছি, আমাকে অতিক্রম করে যা।
সমীরণ তুই একটা ছায়া, যার অসংখ্য দৌড়।
তোকে অনুবাদ করি- সিগারোটের ধোঁয়ার মতো গোল তারপর অনন্ত গোলাকার।
কোথায় তুই, কাছে, নাকি দূরে...
আকাশে কতটা নীল পোতা, বলেছিলি জানিস।
সমুদ্র জানো, উষ্ণ ও উড়াল জানো।
শুধু পাশের মানুষ কে কোথায় থাকে জানোনা।
দেখ―আমিও রচনারেখা, মুখস্ত বিদ্যার মতো গড়গড় করে ভুলে থাকিস―
কেন !
0 মন্তব্যসমূহ