পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় || রামকুমার মুখোপাধ্যায়
সত্তর দশকের একেবারে শেষ দিক। জীবিকা সংক্রান্ত একটি ইংরেজি মাসিক পত্রিকায় সাব-এডিটারের কাজ করি। যিনি সম্পাদনার মূল কাজ দেখতেন তাঁর নাম প্রিয়ব্রত চট্টোপাধ্যায়। ষাটের শেষ ও সত্তরের বেশ অনেকটা সময় নকশাল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। পুলিশ মারবেন বলে প্রিয়ব্রতদা ঘুরতেন আর প্রিয়ব্রতদাকে মারবে বলে পুলিশ ঘুরত। শেষে প্রভাবশালী বাবা ছেলেকে দিল্লির গোপন ডেরায় পাঠিয়ে রক্তারক্তি রদ করেন। প্রিয়ব্রতদা পুরোনো কলকাতাকে নতুন করে আবিষ্কারের জন্যে রাজপথ ছেড়ে গলি দিয়ে হাঁটতেন। বিবাদি বাগ থেকে ভবানীপুর, বৌবাজার, কলেজ স্ট্রিট ও শ্যামবাজারের প্রায় সব গলিই প্রিয়ব্রতদার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চেনা হয়ে যায়। একদিন প্রিয়ব্রতদা নিয়ে গেলেন প্রেস ক্লাবে। সেখানে দেখি আমাদের থেকে অনেক বড়ো একজন হাঁটুরে বসে আছেন। রাজনৈতিক কাজকর্মে আর 'জনযুদ্ধ'-এর প্রতিবেদক হিসেবে অবিভক্ত বঙ্গের নানা জায়গায় মাইলের পর মাইল হেঁটে গেছেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি 'পদাতিক'-এর কবি হন। ঘরে বসে 'পদাতিক'-এর পদ রচনা করেননি।
প্রেস ক্লাবে সেদিন আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপত্র 'লোটাস'-এর বিশেষ সংখ্যার প্রকাশ অনুষ্ঠান। পত্রিকার সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এসেছেন পাকিস্তান থেকে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মতো ওই উচ্চতার দুজন কবিকে দেখে মনে হচ্ছিল সত্যিই দুটো মহাদেশ ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। রাজ্য, দেশ এবং মহাদেশ অতিক্রম করে যে সামান্য কয়েকজনের নাম ওই সময়ে বৃহত্তর জগতে পোঁছে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বাংলাভাষার কবি সুভাষ ও উর্দুভাষার কবি ফয়েজ ছিলেন। দুজনের ক্ষেত্রেই কবিত্বের উচ্চতার সঙ্গে শারীরিক উচ্চতার বেশ একটা মিল ঘটেছিল। যাকে বলে মাথা ছুঁইছুঁই।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি কিন্তু সেদিন কিছু লেখা হয়ে ওঠেনি। আজ লিখতে গিয়ে ভাবলাম বেশ দেরি হয়ে গেছে। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিষ্ণু দে-র সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি, 'তুমি কি কেবল-ই স্মৃতি, শুধু এক উপলক্ষ্য, কবি ?... তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ...?' তাই ভাবলাম সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও তো শুধুই জন্মের দিনটুকু নন। তার চেয়ে আরও অনেকখানি বিস্তৃত তিনি। সে বিস্তার সময় আর পরিসর, দু' দিক থেকেই। তাই তাঁকে নিয়ে কিছু কথা এখানে লেখা।
সেদিন প্রেস ক্লাবে চেনা দু-চারজন মানুষের মধ্যে কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত ছিলেন। 'পরিচয়' পত্রিকায় যাতায়াতের কারণে আমাকে অমিতাভদা চিনতেন। আমি গেছি দেখে খুশিই হয়েছেন। অনুষ্ঠান শেষে আমি 'পরিচয়' দপ্তরে গেলাম। ততক্ষণে সম্পাদক দেবেশ রায় এসে গেছেন। প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানের কথা বললাম আর সে সঙ্গে অমিতাভদার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাও । দেবেশদা অনুষ্ঠানে কে কী বললেন সে কথা হাসি মুখেই শুনলেন। কিন্তু অমিতাভদা ঢোকা মাত্র মুহূর্তে সবকিছু কেমন বদলে গেল। অমিতাভদাকে দেবেশদা বললেন, 'তুই নাকি প্রেস ক্লাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলি?' তারপর দু-চার কথার পর সে এক প্রচণ্ড সোচ্চার কথা কাটাকাটির পর্ব। দেবেশদা বললেন, 'তোর যাওয়া মানে পরিচয় পত্রিকার যাওয়া।' ওদিকে অমিতাভদা চিৎকার করে বলছেন, 'সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনীতি আজ যা কিছুই হোক, সুভাষদা আমার প্রিয় কবি।' তারপর আর কিছু উত্তেজিত কথাবার্তায় পর অমিতাভদা রেগে 'পরিচয়' দপ্তর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বুঝলাম সাহিত্যিক দায় আর রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে দড়ি টানাটানি ঘটে গেল আর আমি নিজের অজান্তে হুইসেল বাজিয়ে সে খেলা শুরু করে দিয়েছি। অবশ্য একটু পরেই আমি 'পরিচয়' থেকে বেরিয়ে গেলাম কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমোতে পারিনি আমার জন্যে ওই রকম একটা বাকবিতণ্ডা ঘটায় । কয়েক বছর পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হই আর নানা অনুষ্ঠানে দেখাও হতে থাকে। তখন বুঝতে পারি এক সময়ে তাঁরই সম্পাদিত 'পরিচয়' দপ্তরে যখন তাঁকে নিয়ে ঘোর উত্তেজনা, তিনি বোধ হয় পুরোনো বন্ধু ফয়েজের সঙ্গে প্রেস ক্লাবে বসে প্রিয় পানীয় 'রাম' খাচ্ছিলেন।
উনিশশো তিরাশি-চুরাশি নাগাদ তাঁকে একটি অনুষ্ঠানের জন্যে আমন্ত্রণ জানাতে যাই। সে অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন আর রাতের খাবারও খেয়েছিলেন। মাছের পদটি বেশ পছন্দ হয়েছিল। মাছের প্রতি বিশেষ টান ছিল ওঁর। ততদিনে আমার বাঁকুড়ার বাড়িঘরের খবর জেনে গেছেন। বাটির মাছ পাতে তুলতে তুলতে বলেছিলেন আমাদের গ্রামের পুকুরে মাছ ধরতে যাবেন। বুঝেছিলাম বাটির নয়, পুকুরের মাছ তুলে খাওয়াতেই বেশি আনন্দ। সুভাষদার বাড়ি থেকে রবীন্দ্র সরোবর হাঁটা পথ। সোজা হিসেবে যাকে বলে দু' ছিয়ে। সেই সরোবরে মাছ ধরা থেকেই বোধ হয় ছিপের নেশা। নদীতে ছিপ ফেলে সুভাষদার মাছ ধরার ছবি হয়ত অনেকেই দেখেছেন। দিঘি, ঝিল, নদীর মতো বাইরের বড়ো জগৎটার প্রতি ওঁর বিশেষ টান ছিল আর ওই দীর্ঘ মানুষটার লম্বা ছিয়ের সঙ্গে পা মেলাতে গিয়ে অনেকেই হাঁপিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন।
১৯৮৯ সালের অগস্ট মাসে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে সাহিত্য অকাদেমি একটি 'মিট দ্য অথার' অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে। বিশিষ্ট লেখকদের উপর এই বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ইংরেজিতে একটা ফোল্ডার ছাপা হত। অনুষ্ঠান যেখানেই হোক, দিল্লি এবং তিনটি আঞ্চলিক দপ্তরের মাধ্যমে ভারতের নানা অংশে এগুলি বিতরণ করা হত। ফোল্ডারে লেখকের জন্ম, কর্ম ও লেখালিখির একটা সুনির্দিষ্ট পরিচিতির পাশাপাশি বিশেষ পুস্তকপঞ্জি এবং নানা বয়সের কিছু ছবি থাকত। এককথায় বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উপর লেখার জন্যে ওঁর বাড়িতে গেলাম। ওঁর বইপত্র পড়েছি এবং ওঁকে নিয়ে নানা সত্যমিথ্যে কথাও শুনেছি কিন্তু লিখতে গেলে নিজের কানে শুনে আর বইপত্র দেখে করা ভালো। সুভাষদা কথকদের মতো কথা বলতেন। তাতে খানিকটা জন্মভূমি কৃষ্ণনগরের আর খানিকটা উত্তর কলকাতার ধাঁচ থাকত। কৃষ্ণনগরের গোপাল ভাঁড়ের গল্প আর সিমলার মহেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতার পুরোনো কাহিনি ও কথা আজও বেশ জনপ্রিয় কথনের গুণে। সুভাষদা তাঁর প্রথম জীবন, স্কটিশ চার্চ কলেজের নানা ঘটনা, বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া, অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট আন্দোলন, খিদিরপুর ডকের শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করা, চট শ্রমিকদের সংগঠিত করা, বস্তিতে ঘরভাড়া করে থাকা, রাজনৈতিক কাজের সূত্রে গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেম, স্বাধীনতার আগে ও পরে জেলে যাওয়া, এই সব ঘটনা বেশ জমিয়ে বললেন। মনে হল রাজনীতি, প্রেম ও জেলখাটা---সবই সমান উপভোগ্য। কথার মাঝে বার দুয়েক বিড়ি খেয়েছিলেন।
পরের দিনও গিয়েছিলাম। সেদিন চাকরি জীবনের কিছু কথা বলেছিলেন। সুভাষদা মাঝেমাঝে চাকরি ছেড়ে দিতেন, কখনও আবার চাকরি সুভাষদাকে ছেড়ে যেত। কাজের জায়গায় তালা পড়লে রোজগার বন্ধ। তেমনই একটি অফিসে সন্ধেবেলায় জানতে পারলেন পরের দিন থেকে আর যেতে হবে না। সুভাষদা আমাকে শোনাচ্ছিলেন সে কথা। বললেন, 'বুঝলে, বাবা তো শয্যাশায়ী। রোজ বেশ কয়েকটা ওষুধ লাগে। ভাবছি কাল থেকে বাবার ওষুধ কিনব কেমন করে? ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছে এসে কান্নার শব্দ শুনতে পাই। দরজার কাছে এসে শুনি বাবা মারা গেছে। দুঃখ হলো আবার বাবার ওষুধ কিনতে হবে না ভেবে স্বস্তিও হলো।'
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা ছন্দ বিশেষজ্ঞ এবং আশুতোষ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। ছন্দ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথও অমূল্যধনের মতামতের গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অমূল্যধনের ছাত্র আর তাই শিক্ষকের জন্মের শতবর্ষে (১৯৯৮) সাহিত্য অকাদেমি তাঁকে মূল ভাষণটি দেওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানায়। যেমন শিক্ষক তাঁর তেমন ছাত্র। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সেদিন একটি অসাধারণ লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে সেটি শোনেন। তার দিন কয়েক পরে 'আজকাল' পত্রিকায় সেই লেখাটি ছাপা হয়। সেখানে সাহিত্য অকাদেমির সভার কোনো উল্লেখই ছিল না। আমার রাগ ও অভিমান, দুই-ই হয়েছিল। সুভাষদা তখন কানে কম শোনেন। তাই আমার সহকর্মী শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়কে বলেছিলাম গীতাদিকে ফোন করতে। গীতাদি ফোন ধরে শান্তনুকে বলেন যে, সুভাষ লেখাটির শেষে সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠানের কথা তারিখ সহ উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু খবরের কাগজ থেকে বলা হয় যে, ওই তথ্য থাকলে লেখাটি ছাপতে পারবে না। গীতাদি এও বলেন যে, 'ওরা লেখাটার জন্যে ছশো টাকা দেবে বলেছে। সুভাষের জন্যে ওষুধ কিনতে বেশ টাকা লাগছে। ছশো টাকা পেলে কাজে লাগবে। রামকুমারকে বোলো যেন আমাদের উপর রাগ না করে।' এটা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর বছর চারেক আগের ঘটনা।
সুভাষদা ২০০২ সাল নাগাদ শারীরিক নানা সমস্যায় পিজি হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। একদিন বিকেলে দেখতে যাব ঠিক করলাম। আমার স্ত্রী সুদীপ্তা ওই দিন ওদের ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়ছিল। ওকে ভবানীপুর থেকে নিয়ে, পিজি হাসপাতাল হয়ে, বাড়ি ফিরব ঠিক করলাম। কিছু ফলটল কিনে পিজিতে গেলাম। সুদীপ্তার সঙ্গে সুভাষদার পরিচয় করিয়ে দিলাম। সুদীপ্তার বাবার চেহারার সঙ্গে সুভাষদার বেশ মিল ছিল। দুজনেই প্রায় সমান লম্বা আর মাথার চুল একই রকম ঘন দুধসাদা । সুভাষদা সুদীপ্তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন আর সুদীপ্তা সুভাষদা ও বৌদির নানা খোঁজখবর নিল। সুভাষদা হাসপাতালে সারাদিন কী করে কাটাচ্ছেন, সুদীপ্তা তাও জানল। তারপর আমরা বাড়ি চলে গেলাম। সুভাষদাও এক সময় খানিক সেরে উঠে বাড়ি ফিরে গেলেন। তার চার-পাঁচ মাস পরে সুভাষদা আবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন। সেবারও দেখতে গেছি। কথাবার্তা বলে যখন উঠে আসছি, হঠাৎ সুভাষদা বললেন, 'এবার সুদীপ্তা আমাকে দেখতে এলো না?'
তার কয়েকদিনের মধ্যে সুভাষদা অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত হলেন। গীতাদিও ভর্তি হলেন হাসপাতালে। সুভাষদা কয়েকদিন পরে চলে গেলেন। দেহ কোথায় শায়িত রাখা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। গীতাদি চাননি রবীন্দ্র সদনে রাখা হোক। হয়তো রাগ-ক্ষোভ হয়েছিল। একই উডবার্ন ওয়ার্ডে একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী একই সময়ে ভর্তি ছিলেন। তাঁকে দেখতে কত বড়ো বড়ো বামপন্থী নেতা গেলেন অথচ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দরজাতে উঁকিও দিলেন না। গীতাদি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেছিলেন সুভাষকে সাহিত্য অকাদেমিতে নিয়ে যাওয়া হোক। কিন্তু সুভাষদা ততক্ষণে সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়ে রাজনীতির আঙিনায়। সেখানে কেই-বা আমাকে চেনে, কেই-বা আমার কথা শোনে!
সুভাষ মুখোপাধ্যায়েরও কিছু করার ছিল না। তখন তিনি আর পদাতিক নন, শববাহী গাড়িতে শায়িত। নিথর।
২ মার্চ ২০২২
আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স কনফারেন্স, জাপান, ১৯৮১
0 মন্তব্যসমূহ