ফেনীনদীর প্রত্নকথা ও মানুষের উপাখ‍্যান:অশোকানন্দ রায়বর্ধন

ফেনীনদীর প্রত্নকথা ও মানুষের উপাখ‍্যান


( ফেনী একটি নদীর নাম । এই নদী ভারত-বাংলাদেশ এই দুটি রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডকে ভাগ করে বয়ে চলেছে ।এর দুপারের বিস্তীর্ণ জনপদ ও তাকে কেন্দ্র করে মিথ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনীতি জনজীবনকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে । নিষ্ঠ গবেষণার মাধ‍্যমে তুলে আনা বহু মণিমাণিক‍্যকে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করছেন লোকগবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধন )


ফেনীনদীর প্রত্নকথা ও মানুষের উপাখ‍্যান

একটি বহুল প্রচারিত বাংলা প্রবাদ ‘ভাগের মা গঙ্গা পায়না’ ৷ প্রবাদটির মধ্য দিয়ে মায়ের অসহায়ত্বের যন্ত্রণাটিই ব্যক্ত হয়েছে ৷ একাধিক পুত্রকন্যার মা শেষ বয়সে কার কাছে থাকবেন, কার যত্ন-আত্যি পেয়ে শেষ দিনগুলো কাটিয়ে জীবনের পরিসমাপ্তি টানবেন তা নিয়ে  অধিক সন্তানের মায়েদের ক্ষেত্রে  থাকে অনিশ্চয়তা ৷ থাকে টানা পোড়েন ৷ একজন একজনের উপর দায়িত্ব অর্পনের অছিলায় মাকে কাটাতে হয় নিঃসঙ্গ জীবন ৷ এমনকি তাঁর মৃত্যুকালীন সময় ও পরবর্তীকালের পারলৌকিক কার্যাদিও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়না সেই ভাগাভাগির কারণেই ৷ সেই অর্থেই গঙ্গা পাওয়া অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটেনা ‘ভাগের মায়ের’ ৷ গঙ্গা যেমন একটি নির্দিষ্ট নদীর নাম তেমনি পরবর্তীকালে তার অর্থবিস্তারের ফলে সমস্ত নদীকেই গঙ্গা নামে অভিহিত হতে দেখা যায় ৷ সেই হিসেবে গঙ্গাকে যেমন পবিত্র নদী হিসেবে মান্য করা হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কতিক আচার-আচরণ পালন করা হয় তেমনি গঙ্গা অববাহিকা থেকে দূরবর্তী স্থানে বসবাসসকারী লোকসাধারণ গঙ্গানদীকে সহজে কাছে না পাওয়ার কারণে ও দারিদ্র্যহেতু ব্যয়সংকোচের পরিকল্পনায় নিজেদের জনপদের নিকটস্থ নদীটিকে গঙ্গাতুল্য মান্য করে এবং লৌকিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় আচারসমুহ পালন করে থাকে ৷ ফলে যে কোন নদীই বৃহত্তর অর্থে ‘গঙ্গা’ ৷ এই গঙ্গা থেকেই উদ্ভুত বাংলাশব্দ ‘গাঙ’ ৷ নদী অর্থে ৷ সেকারণেই ত্রিপুরার নদীগুলোর স্থানীয় নাম—মনুগাঙ, দেওগাঙ, জুরিগাঙ, ধলাইগাঙ, মুহুরীগাঙ ইত্যাদি ৷ সাধারণত নদী অর্থে গাঙ,দরিয়া, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিনী, তটিনী,তরঙ্গিনী, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয় ৷ নদী শব্দের উৎস হিসেবে বলা হয় যে, যে প্রবাহিনী নাদ অর্থাৎ গম্ভীর ধ্বনি সৃষ্টি করে প্রবাহিত হয় তাই নদী ৷ নদী শব্দের পুংলিঙ্গে বলা হয় ‘নদ’ ৷ নদ বা নদীর বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ পুরুষবাচক ‘নদ’ শব্দটি সৃষ্টি করেছেন ৷ উভয়ে মিলে নদ-নদী ৷

নদী, জীবন ও লোকজীবন :

পৃথিবীর সমস্ত আদি সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক ৷ নদীকে কেন্দ্র করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা ৷ যেমন— নিলনদের তীরে মিশরিয় সভ্যতা, ইরাকের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে সুমেরিয় সভ্যতা, হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর তীরবর্তী চিনসভ্যতা, ভারতের সিন্ধু নদীতীরবর্তী মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা ৷ এই নদীতীরবর্তী সভ্যতাসমূহ গড়ে ওঠা এবং শ্রীবৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল নদীতীরবর্তী উর্বরাভূমি এবং এই ভূমিতে চাষাবাদের অফুরন্ত নদীজল ৷ জীবনের অপরিহার্য পানীয়জলের উৎসও এই নদী ৷ তাছাড়া নদীগুলোর নাব্যতা থাকার ফলে প্রাচীন মানুষ যাতায়াতের সুলভ মাধ্যম হিসেবে নদীকে বেছে নিয়েছে ৷ তার ফলশ্রুতিতে নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বহু জনপদ ও ব্যবসাকেন্দ্র ৷ নদনদীর ছুটে চলার গতির সঙ্গে মানুষও তার চলার গতি মিলিয়ে নিয়েছে বহু প্রাচীনকাল থেকে ৷ পাহাড়-পর্বত থেকে নেমে আসা নদী যেমন সাগরে মহাসাগরে মেশার আকুলতায় ছুটে চলে তেমনি যেন মানবস্রোতধারা জীবনপ্রবাহ বয়ে ধেয়ে যায় অসীমের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় ৷ নদী ও জীবনের এক অদ্ভুত মিল এখানে ৷ এই নিরন্তর ছুটে চলার ধর্মে একে অন্যকে জড়িয়ে  ধরেছে সহোদরের মতো ৷ মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উত্থান-পতনের অমরগাথা বুকে নিয়ে নদী অবিরাম ছুটে চলে মোহনা পর্যন্ত ৷ 
          লোকজীবনে নদীর প্রভাব অসীম ৷ নদী একটি জাতির ঐতিহ্যের স্মারক, ধারক ও বাহক হয়ে থাকে ৷ জনপদের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ তাদের স্রোতধারার সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলে কিংবদন্তী, লোকগাথা,  লোকশিল্প, লোকসঙ্গীত, অন্যান্য লোকসাহিত্যের উপাদান, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ৷ নদী তার উৎস, অবস্থান, গতিপ্রকৃতি সব মিলিয়ে লোকজীবনকে সমৃদ্ধ করে ৷ এক একটি নদীকে ঘিরে নিবিষ্ট সন্ধানে উঠে আসে বহুবিধ লোক-উপাদান, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রত্নচিহ্ন ৷

ত্রিপুরার জনজীবন ও নদী :

ত্রিপুরারাজ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠী ও জনজাতির লোকজন সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছে ৷ ফলে এই রাজ্যে একটা মিশ্র সংস্কৃতির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে ৷ পার্বত্য নদীবিধৌত এই রাজ্যের জনগণ পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমে স্ব স্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারণ, লালন ও চর্চা করে আসছে তাতে অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিমন্ডলের সাথে সংযোগের পাশাপাশি নদী তার বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে ৷ রাজ্যের বিভিন্ন নদীর তীরেই জনপদ, শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে ৷ একসময় রাজ্যের প্রায় প্রতিটি নদীরই নাব্যতা ছিল ৷ পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল এই নদী ৷পার্বত্যভূমিতে উৎপন্ন কৃষিজ ফসল অর্থাৎ ধান, পাট, তিল, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি নদীপথেই নৌকাযোগে বিভিন্ন বাজারে তোলা হত ৷ অপেক্ষাকৃত সমতলভূমিতে পলিমাটিপুষ্ট উর্বর নদীতীরবর্তী অঞ্চলের ভূমিতে চাষবাস করে ফসল উৎপাদন করা হয়৷ নদীর জলে জলসেচের সুযোগও রয়েছে ৷ প্রায় প্রতিটি নদীই ত্রিপুরার পাহাড়-পর্বত থেকে সৃষ্টি হয়ে রাজ্যের পার্বত্য ও সমতলভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে ৷ কোনো কোনো নদী ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়েছে ৷ আবার কোনো কোনো নদী ত্রিপুরার অভ্যন্তর থেকে উৎপন্ন হয়ে নিম্নমুখে প্রবাহিত হয়ে রাজ্যের বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কোনো নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে ৷ ফলে বহু প্রাচীনকাল থেকেই নদীর মাধ্যমে এই দুই ভূখন্ডের মানুষের  পরিবহন ও পরিযায়নের মাধ্যমে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনও তৈরি হয়েছে ৷ ফলে রাজ্যের জনগণের যে লৌকিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সবকিছুতেই নদীর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও আশ্রয় রয়েছে ৷ ত্রিপুরার নদীকে কেন্দ্র করে রয়েছে লোকসঙ্গীত ৷ রয়েছে রাইমা সাইমা লোককাহিনির মতো নদীর উৎসকথা, বিজয়নদের তীরে গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজার সৈন্যদের বীরত্বব্যঞ্জক লড়াইয়ের গাথা, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা’র ধলাই নদীর পাড়ে কান্নার বিষাদগীতি, মনু নদীর তীরে সর্বস্ব হারানো রাজা অমরমাণিক্যের আত্মহননের কথা, অমরপুরের গভীর অরণ্যে গোমতীর তীরে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিরল প্রত্নচিহ্ন ইত্যাদি ৷ সময়ের প্রবাহে মানুষের বন কেটে বসত করার তাগিদে, সীমাহীন লোভের আস্ফালনে আজ রাজ্যের নদীগুলো তাদের নাব্যতা হারিয়েছে ৷ এমনকি তাদের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নের সম্মুখীন ৷ নদী যে লোকঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এবং জীবনস্বরূপা তা আধুনিক মানুষ ভুলতে বসেছে ৷ অথচ একদিন এই নদীগুলো জীবনপ্রবাহে প্রাণবন্ত ও বেগবান ছিল ৷ ছিল নদীর উদার উপাখ্যান ৷ যথাযথ সংগ্রহের ও সংরক্ষণের অভাবে নদীকেন্দ্রিক লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় বহু উপাদান কালগর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে ৷ অনেককিছু হারিয়েও গেছে ৷
   
            ত্রিপুরারাজ্যের ভূখন্ডের উপর দিয়ে যে সমস্ত নদী প্রবাহিত হয়েছে তার অনেকগুলোকে নিয়ে কিংবদন্তী, লোককথা ও ইতিহাস রয়েছে ৷ সমস্ত নদীকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত আলোচনা এখানে সম্ভব নয় ৷ ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তের যে নদীটি  পুরোপুরি ভারত ও বাংলাদেশের সীমানাকে চিহ্নিত করে প্রবাহিত হয়েছে সেই ফেনী নদীকে কেন্দ্র করে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস নেওয়া হবে ৷
ত্রিপুরা রাজ্যের প্রান্তিক নদী ও রাজন্য ত্রিপুরা এবং বর্তমান রাজনৈতিক ভূখন্ডের সীমানির্দেশক প্রাকৃতিক চিহ্ন হিসেবে ফেনী নদীর উল্লেখ পাওয়া যায় কিছু কিছু প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিসাহিত‍্যে ।

উৎস, গতিপথ  ও অধিবাসী  :

    ফেনী নদী ত্রিপুরারাজ্যের কালাঝারি পাহাড় থেকে ক্ষীণ স্রোতধারার আকারে প্রবাহিত হয়ে গোমতী জেলার করবুক মহকুমার জলেয়াতে আরো কিছু ছোটো ছোটো ঝর্না, ছড়ার জলে পুষ্ট হয়ে ফেনী নাম নিয়ে ২৩°২০’ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১°৪৭’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার উপর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমের আমলিঘাট পর্যন্ত ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণ সীমানাকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ২২°৫০’ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১°২৭’  পূর্ব দ্রাঘিমারেখাতে সন্দীপ চ‍্যানেলে ( বঙ্গোপসাগরে ) পতিত হয়েছে ৷ উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ফেনীনদীর দৈর্ঘ ১৫৩ কিলোমিটার ৷ এই নদী ভারতের ত্রিপুরারাজ্যের গোমতী জেলা এবং দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার পার্বত্যভূমির প্রান্ত দিয়ে এবং বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি পার্বত্যজেলার প্রান্ত ধরে প্রবাহিত হয়ে ত্রিপুরার  জনপদের পর  বাংলাদেশে প্রবেশ করে ওই দেশের ফেনী জেলা ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলাকে বিভক্ত করেছে ৷ পার্বত্য অঞ্চল ও সমভূমি এলাকায় ফেনীর দুইপারে বিস্তীর্ণ জনপদ, বর্ধিষ্ণু গ্রাম ও বাণিজ্যকেন্দ্র রয়েছে ৷ নদীতীরের ভূমিও খুব উর্বরা ৷ ফেনী নদীর উজান অপেক্ষা নিম্নাঞ্চলের জনপদ বহু প্রাচীনকাল থেকে ইতিহাসসমৃদ্ধ । ১৫৮০ থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ সময় এ অঞ্চল আরাকানী মগদের শাসনে ছিল । তাদের জন‍্য ত্রিপুরা ও গৌড়ের পাঠান রাজশক্তি তটস্থ থাকতে হত । মীরসরাইয়ে ত্রিপুরা ও গৌড়ের পাঠান ও মোগল সৈন‍্যদের সাথে আরাকানীদের বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে । পরবর্তীকালে ফকরুদ্দিন মোবারক শাহের সেনাপতি কদল খান গাজি ১৩৪০ খৃস্টাব্দে ফেনী নদী পার হয়ে মীরসরাই এলাকায় প্রবেশ করে ও আরাকানী সৈন‍্যদের পরাস্ত করে চট্টগ্রাম দখল করে । সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ও তার পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ ফেনী নদী পার হয়ে বর্তমান মীরসরাই যেই জায়গায় সেনাবাহিনী নিয়ে নামেন সেই স্থানের নাম হয় উমেদনগর ।১৩৪০ সালে রুকনুদ্দিন মোবারক শাহ ( ১৩৩৮–৫০ ) চট্টগ্রাম দখল করে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত করেন ।পরবর্তীতে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামে একাধিক সররাইখানা স্থাপিত হয় । তথ‍্যে জানা যায়, সে আমলে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছা পর্যন্ত অন্তত চারটি স্থানে সৈন‍্যরা বিশ্রাম নিত । স্থানগুলো হল, বুড়বুড়িয়া, মীর কা সরাই (বর্তমান মীরসরাই ), সীতাকুন্ড ও কদমরসুল । এভাবেই ফেনীনদী পেরিয়ে একটি রাস্তা  জোওরারগঞ্জ, মীরসরাই, সীতাকুন্ড হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছা যেত । এই রাস্তা 'ফকরুদ্দিনের পথ' নামে পরিচিত । আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ( ১৪৯৪–১৫১৯ ) ও তাঁর পুত্র নুসরত শাহের ( ১৫১৯–১৫৩৩ ) আমলে চট্টগ্রামের পশ্চিমাঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ ও তার পুত্র ছুটি খাঁ । এসময় এ অঞ্চল লস্করপুর নামে পরিচিত ছিল । সেসময়ে চট্টগ্রামের শাসনকেন্দ্র ছিল এই পরাগলপুর । পরাগল খাঁর পিতা রাস্তি খাঁও গৌড়ের রুকনুদ্দিন বারবাক শাহের আমলে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন । সুলতানি আমলের পর চট্টগ্রামের শাসনভার চলে যায় সুরবংশীয় নিজাম শাহ সুরের হাতে । তিনি জাফরাবাদ রাজ‍্য স্থাপন করেন । জাফরাবাদ ছিল মীরসরাইর পশ্চিমাঞ্চলের নদীতীরবর্তী স্থান । এই জাফরাবাদই পরবর্তীকালে শাসক নিজা শাহের নামে নিজামপুর পরগনা হিসাবে পরিচিত হয় । মধ‍্যযুগে নিজামপুর ছিল একমাত্র পরগণা যার সীমানা উত্তর-পশ্চিমে ফেনী নদী থেকে দক্ষিণে চট্টগ্রামের শহরতলি ( বর্তমান কাটগড় ) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । নিজাম শাহের রাজত্বের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ১৬১৬ সাল থেকে নিজামপুর নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় । পরবর্তীকালে জাফরাবাদ শহরটি ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে যায় । হনডেন ব্রুকের অংকিত মধ‍্যযুগের একটি মানচিত্রে ফেনী-সাগর সংগমে জাফরাবাদ নামে একটি বন্দরের উল্লেখ আছে । সে বন্দর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে । ফেনীনদীর নিম্নাঞ্চলে বাংলাদেশের ভেতর জেলাসদরও ফেনী নামে পরিচিত ৷ এই শহরও বেশ প্রাচীন ৷ ধারনা করা হয় ১৪০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম এ এলাকায় মানববসতি গড়ে ওঠে । প্রাচীনকালে এ এলাকা সমতট রাজ‍্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । স্কটল‍্যান্ডের অধিবাসী এবং বংটিশ ভারতের বিখ‍্যাত সমীক্ষক ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান । তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখেছেন, "বিকাল ৩টা নাগাদ আমি ফেনী বাংলা ত‍্যাগ করলাম । তারপর আরো ১২মাইল ভ্রমণের পর পৌঁছুলাম মীর খা সরাই । যাত্রীদের এখানেও থাকার ব‍্যবস্থা আছে ।" তিনি ১১মে চট্টগ্রাম ভ্রমণশেষে  ফেরার সময় মীর খা সরাইতে রাত্রিযাপন করেন এবং জোওরারগঞ্জ হয়ে লক্ষ্মীপুরের দিকে রওনা হন ।১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে মীরসরাই, ছাগলনাইয়া ও আমীরগাঁও এই মহকুমার গোড়াপত্তন হয় । এই মহকুমার প্রথম প্রশাসক ছিলেন কবি নবীনচন্দ্র সেন ।১৮৭৬ সালে মীরসরাইকে চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।১৮৭৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সংস্কার করে ফেনী জেলার প্রতিষ্ঠা করেন । এরপর ১৯৮৪ সালে ফেনী জেলার প্রতিষ্ঠা হয় । ফেনী নদীর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এই আলোচনা পরবর্তীতেও উল্লিখিত হবে । ফেনীনদীর পার্বত্য অংশের ভারতীয় অংশে ও বাংলাদেশের দিকেসাব্রুম ও রামগড় কিছুটা বর্ধিষ্ণু জনপদ । বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এ অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়ে যায় । ফেনীর দুইতীরে দীর্ঘকালব্যাপী মিশ্র জনবসতি রয়েছে ৷ জনজাতির জনগণের মধ্যে ত্রিপুরি, মগ ও চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকজনই তুলনামূলকভাবে বেশি ৷ বাঙালি অংশের মানুষজনের বসতি শুধুমাত্র বর্ধিষ্ণু জনপদ এবং বাণিজ্যকেন্দ্রেই বেশি ৷ সমভূমি অংশে বাঙালি জনগোষ্ঠীরই প্রাধান্য রয়েছে ৷

ফেনী নদীর উৎস নিয়ে সৃষ্টিকথা  :

ভূবিজ্ঞান অনুযায়ী ফেনী নদীর উৎস ও গতিপথ সম্বন্ধে যে চিত্র উপরে তুলে ধরা হয়েছে  তা আধুনিক কালের বিজ্ঞানসচেতন  মানুষের প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানলব্ধ তথ্য ৷ কিন্তু আদিম মানুষ কোনো বস্তু, প্রাণী বা বিষয়ের উৎস সম্বন্ধে একধরণের সৃষ্টিকথা লোকমুখে প্রচলিত রাখত ৷ এগুলোকে বলা হয় লোকপুরাণ ৷ ফেনী নদী সম্বন্ধেও এখানকার প্রাচীন অধিবাসীদের মধ্যে একটি লোকপুরাণ প্রচলিত আছে ৷ জনজাতীয় জনগোষ্ঠীভেদে কিঞ্চিৎ রূপান্তর আছে কোথাও কোথাও ৷ নোয়াখালি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সামান্য রূপান্তর ঘটিয়ে এই কাহিনিটি প্রচলিত ৷ 
        প্রাচীন এই লোকপুরাণ অনুযায়ী জানা যায় যে, এক জুমিয়ার দুটি কন্যা ছিল ৷ তারা ছিল মাতৃহীন ৷ জুমিয়া বাবা তাদের, মায়ের মতো আদর স্নেহ দিয়ে লালন পালন করত ৷ দুইবোনও বাবাকে যথাসাধ্য সাহায্য করত ৷ বাবা জুমে খেতের কাজে গেলে তারা তাদের টংঘরে রান্নাবান্না করে বাবার জন্যে খাবার  নিয়ে যেত জুমে ৷ বাবাকে খাইয়ে দাইয়ে টংএ ফিরত ৷ একদিন তারা দুবোন বাবার জন্যে খাবার নিয়ে রওনা হয়েছে কিন্তু পথে পড়ল হাতির পাল ৷ ওরা দলবদ্ধ হয়ে রামকলাগাছ খাচ্ছিল ৷ যতক্ষণ হাতির পাল সরে না যায়, দুবোন অপেক্ষা করতে লাগল ঝোপের আড়ালে ৷ এদিকে সারাদিনের পরিশ্রমে জুমিয়া ক্লান্ত হয়ে অপেক্ষা করছে খাবারের জন্যে ৷ বেলা যায় ৷ কিন্তু মেয়েরা আসছেনা ৷ ক্ষুধায় পিপাসায় কাতর হয়ে জুমিয়া টিলার উপর উঠে দেখতে লাগল চারিদিক ৷ কিন্তু মেয়েদের দেখা যাচ্ছেনা ৷ একসময় খাদ্য ও পানীয়ের জন্যে কাতর হয়ে জুমিয়া পাহাড়ের উপরেই মৃত্যুবরণ করল ৷ একসময় হাতির পাল সরে গেলে শেষবেলার দিকে মেয়েরা বাবার জুমখেতে আসে ৷ কিন্তু বাবাকে দেখতে পায়না তারা ৷ এদিকে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে আসছে ৷ অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক ৷ দুইবোন জোরে জোরে ডাকতে লাগল বাবাকে ৷ কিন্তু ওদের আকুল ডাক পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল ৷ বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে তারা পাহাড়ের মাথায় উঠে এল ৷ দেখল সেখানে তাদের বাবা পড়ে রয়েছে ৷ গায়ে হাত দিয়ে দেখল বাবার শরীর ঠান্ডা ৷ ওরা বুঝল ওদের বাবা মারা গেছে ৷ মাকে তো ওরা অনেক আগেই হারিয়েছে ৷ এবার বাবাকেও হারিয়ে তারা একেবারে অনাথ হয়ে গেল ৷ দুবোন পাহাড়ের চুড়োয় বসে দুজন দুদিকে ফিরে কাঁদতে লাগল ৷ ওদের চোখের জল গড়াতে লাগল পাহাড়ের চুড়ো থেকে দুইদিকে দুই ঢাল বেয়ে ৷ ওদের কান্নার অশ্রু থেকে জন্ম নিল দুটি নদী ৷ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা এই দুটি নদী দুবোনের নামে সৃষ্টি হয়েছে— কর্ণফুলী ও ফেনী ৷ কাহিনির শেষে বলা হয়, দুইবোনের বাবা যেহেতু খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মারা গেছে সেকারণে তাদের চোখের জলে সৃষ্ট নদী মানুষকে খাদ্য ও পানীয় যোগাবে ৷ ফেনী নদীর সৃষ্টিকথার এই কাহিনির মধ্যে  নারীজীবনের এক গভীর মর্মসত্য নিহিত রয়েছে ৷ বাপের বাড়িতে বোনেরা একসাথে বড়ো হলেও বিবাহের পর কে কোথায় সংসার করতে চলে যায় তা বলা যায়না ৷ দূরদেশে বিয়ের ফলে কদাচিৎ বোনে বোনে দেখা হয় বা মোটেই হয়না ৷ ফেনীপারের মানুষের মধ্যে একটা লোকপ্রবাদ প্রচলিত আছে—নদীএ নদীএ দেআ অয়, ভইনে ভইনে দেআ অয় না ৷ পাহাড়ের দুইধার দিয়ে বয়ে যাওয়া দুইবোন ফেনী আর কর্ণফুলীর মধ্যে আর কোনোদিন দেখা হয়নি ৷ যেমন হয়না বাস্তবজীবনে দুইবোনের মধ্যে ৷ সেজন্যেই তো নদী ও জীবন, নদী ও সংস্কৃতি আর নদী ও নারী এক অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন জুড়ে ৷ ফেনী নদীর লোকপৌরাণিক ব্যঞ্জনা জীবনবোধেরই প্রকাশ ৷

         ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ প্রাচীনকালে আধুনিক ফেনী অঞ্চল ছাড়া নোয়াখালির বেশির ভাগ ছিল নিম্ন জলাভূমি ৷ তখন ভুলুয়া ( নোয়াখালির আদিনাম)  ও জুগিদিয়া (ফেনী নদীর সাগরসঙ্গমে অবস্থিত)  ছিল দ্বীপের মতো ৷ ছাগলনাইয়া নামকরণ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন যে, ইংরেজ আমলের শুরুতে  (Sagor) শব্দটি ভুলক্রমে ( Sagol) নামে লিপিবদ্ধ হয়েছিল ৷ তাই ছাগলনাইয়া শব্দটি প্রচলিত হয়ে ওঠে ৷ উল্লেখ্য ইংরেজ আমলের পূর্বে কোনো পুঁথিপত্রে ছাগলনাইয়া নামের কোনো স্থানের নাম পাওয়া যায়না ৷’ কোনো কোনো গবেষকদের মতে, একসময় সাগরনাইয়ার আংশিক  এলাকা, সোনাগাজি ও ফেনী সদরের পুরোটাই বঙ্গোপসাগরের উপকূলের চরভূমি ছিল ৷ তখন সাগরের ফেনায় ঢাকা থাকত মোহনা অঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন নদীটি ৷ তার থেকে নদীর নাম হয় ‘ফেনী’ ৷ কেউ কেউ বলেন ‘ফেনী’ নামে কোনো রাজার নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নদীটির নাম হয় ‘ফেনী’ ৷ তবে ইতিহাসে তেমন কোনো রাজার নাম পাওয়া যায়না ৷
        সমুদ্রগুপ্তের আমলের শেষভাগে (375-414খ্রি.) চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়ান ভারত সফরকালে  চট্টগ্রামে আসেন এবং সমুদ্রতীরবর্তী এই অঞ্চলে কিছুদিন অবস্থান করেন ৷ তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে ‘ভুলুয়া’ নামে একটি বিখ্যাত জনপদ ও সমুদ্রবন্দরের কথা উল্লেখ করেছেন ৷ এই অঞ্চলে তাঁর অবস্থানহেতু তাঁর নামানুসারে কালক্রমে ‘ফা-হিয়ানী’ থেকে ‘ফেনী’ হয়েছে বলে কেউ কেউ বিশ্বাস করেন ৷

'ভুলুয়া'-র উদ্ভব ও ইতিহাস:

'ভুলুয়া' নামে প্রাচীন পূর্ববঙ্গে এক বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল । এই জনপদ ছিল ত্রিপুরার রাজাদের করদ রাজ্য । 'ভুলনা' দ্বীপ বা চরভূমি থেকে ভুলুয়া নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয় । এছাড়া মেঘনার এক শাখানদীর নামও ভুলুয়া । তৎসন্নিহিত অঞ্চল বলে এ অঞ্চলের নাম ভুলুয়া হয়ে থাকতে পারে । 'ভুলুয়া' নামের উদ্ভব সম্বন্ধে একটি চমকপ্রদ লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে । বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে সেনবংশের রাজা হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন ( মৃত‍্যু : ১১৫৯ ) । ছিলেন সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা । বিজয় সেন  সমগ্র বঙ্গভূমির রাজা ছিলেন । বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন মিথিলা রাজ্য জয় করে তার সমগ্র রাজ্যকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করেন । এগুলো হলো রাঢ় ( পশ্চিমবঙ্গ ), বাগড়ি ( দক্ষিণবঙ্গ ), বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ ) এবং মিথিলা । ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে মিথিলার রাজা আদিশূরের নবম বংশধর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন ।
এই আদিশূরের এক বংশধর বিশ্বম্ভর শূর একবার নৌকাবিহারে চন্দ্রনাথ তীর্থদর্শনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন । নৌকা চলতে চলতে একসময় মেঘনা নদীতে এসে রাত হয়ে যায় । অন্ধকারে নৌকার মাঝি-মাল্লা নদীর কুলকিনারা নির্ধারণ করতে পারছিল না । এর ফলে নৌকার যাত্রীগণ এবং রাজা বিশ্বম্ভর শূর ভীষণ ভয় পেয়ে যান । সবাই তখন ঈশ্বরের নামগান করতে শুরু করেন । এই দুর্বিপাকে কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় রাজা বিশ্বম্ভর শূর স্বপ্ন দেখেন, এক দেবী এসে তাঁকে অভয় দিচ্ছেন এবং বলছেন কিছুসময়ের মধ্যেই তাঁরা তীরের সন্ধান পাবেন । সেখানে মাটি খুঁড়লে এক পাষাণ মূর্তি পাওয়া যাবে । রাজা যদি এই পাষাণ মূর্তিকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তিনি এই অঞ্চলের রাজা হবেন । রাজা বিশ্বম্ভর শূরের বংশধররা পরম্পরাক্রমে রাজত্ব করবেন । হঠাৎ রাজার ঘুম ভেঙে গেলে তিনি উঠে দেখেন তাঁদের নৌকা একটা চড়ার মধ্যে আটকে আছে । তাড়াতাড়ি তিনি তীরে নেমে পড়লেন এবং মাঝিমাল্লা নিয়ে খোঁজাখুঁজি করার পর সেখানকার মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় রাজার স্বপ্নে দেখা সেই বিগ্রহটি । সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা মূর্তিটি সেখানে স্থাপন করেন । কিন্তু ভোরবেলা যখন সূর্য উঠল তখন দেখা গেল যে শাস্ত্র অনুযায়ী দেবদেবীর বিগ্রহপশ্চিম মুখী করে বসানোর নিয়ম থাকলেও এই মূর্তিটি রাতের অন্ধকারে ভুলবশত পূর্বমুখী হয়ে মাটিতে প্রোথিত করা হয়েছে । এটা দেখে সবাই 'ভুল হুয়া', 'ভুল হুয়া' বলে চিৎকার করে ওঠেন সেই ভুল হুয়া শব্দ থেকেই নাকি রাজ্যটির নাম হয় 'ভুলুয়া' ।

এক সময়ে ত্রিপুরারাজ্যের রাজাদের অনুগত সামন্তশাসকরা এই ভুলুয়ারাজ্য শাসন করতেন । সেসময়ে এ রাজ্যটি প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষাজনিত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল । এই রাজ্যের মধ্য দিয়ে আরাকানরাজ্যের সৈন্যদল ভাটি অঞ্চলে যাতায়াত করত এবং ব‍্যাপক লুটতরাজ চালাত । সে কারণেই ত্রিপুরার রাজাদের কাছে এই অঞ্চলটি সে সময়ে দখলে রাখা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল । বিশ্বম্ভর সুরের তিন চার পুরুষ পরে সম্রাট আকবরের আমলে ওই রাজ্যের সামন্ত রাজা ছিলেন লক্ষণ মানিক্য । তার রাজত্বকালে এই রাজ্যের মগদের ভীষণ উৎপাত ছিল । ইতিহাসবিদ মি. গ্রান্ট এই সম্পর্কে বলেন, ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে ভয়ানক জলোচ্ছ্বাসে এবং মগদের ভয়াবহ তৎপরতায় সমুদ্রতীরবর্তী এ রাজ্যটি প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে পড়েছিল । তখন লক্ষণমানিক্য সাহায্যের  আশায় খিজিরপুরের ভূঁইয়া ঈশা খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন । ঈশা খাঁ তাঁকে মোগল সম্রাটের দরবারে নিয়ে যান । মোগল সম্রাটের সহায়তায় তিনি তা়ঁর হৃতরাজ‍্য  ফিরে পান ।

এই লক্ষণ মানিক‍্যের মৃত্যু সম্পর্কে দু'একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে । কেউ কেউ বলেন, বাকলার রাজা রামচন্দ্র তাঁকে নিহত করেন । অন‍্য আরেকটি মত বলছে,১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মগদেরর বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধ সংগঠিত করে লক্ষণমানিক্য যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান ।

 সতেরো শতকে মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের নিয়ে আরাকানরাজ এই অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল । ফলে মোগল সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় । পরবর্তী সময়ে মোগলরা ভুলুয়ারাজ্য দখল করে সেখানে তাদের প্রশাসনিক তৎপরতাকে বিস্তারিত করে ।

১৭২৮ সালের সেটেলমেন্টে ভুলুয়া রাজ‍্যটি রাজা কীর্তিনারায়ণের নামে  রেকর্ড করা হয় । ১৭৮৮ সালে এই রাজ্যের চারআনা অংশ পাইকপাড়া পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের কাছে বিক্রি করা হয় । ১৮৩৩ সালে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করার জন্য পুনরায় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় । কিন্তু তিনিও পরবর্তী সময়ে তিনলক্ষ টাকার বিনিময়ে ভুলুয়া রাজ্যটি পাইকপাড়ার রানি কাত্যায়নীর কাছে বিক্রি করেন ।

আঠারো শতকে ভুলুয়া লবণের ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ১৭৮৭ সালে বাংলার বিভিন্ন জেলাগুলির পুনর্গঠন করা হয় । তখন সমগ্র বাংলাকে ১৪ টি জেলায় ভাগ করা হয় । এই ১৪টি জেলার মধ্যে ভুলুয়া নামে নোয়াখালী অঞ্চলে একটি জেলা ছিল । পরবর্তী সময়ে ১৭৯২ সালে ত্রিপুরা নামে একটি নতুন জেলার সৃষ্টি হয় এবং ভুলুয়াকে ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয় । ১৮২১সালে নোয়াখালী জেলার প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত ভুলুয়া ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল । সেই সময়ে শাহবাজপুর, হাতিয়া, নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, ত্রিপুরার কিছু অংশ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও মিরসরাই নিয়ে ছিল ভুলুয়া পরগনা । ১৮৬৮সালে ভুলুয়াকে নোয়াখালী জেলা নামকরণ করা হয় । প্রাচীন এই জনপদের অধিবাসীদের উত্তরপুরুষরা পরবর্তীসময়ে পূর্ববঙ্গের অন‍্যত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লেও পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে তাঁদের স্থানীয় ভাষায় 'ভুল্লাইয়া' বলে চিহ্নিত করা হত । দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়া এবং সাব্রুমে এই ভুল্লাইয়াদের উত্তরপুরুষ কিছু পরিবার এখনও রয়েছেন ।  এই নিবন্ধকারও তাঁদেরই উত্তরপুরুষ । প্রাচীন ভুলুয়ারাজ‍্যের অভ‍্যন্তরভাগ দিয়ে ফেনীনদী প্রবাহিত ।

ফেনী নদীর নামকরণে লোকভাষা  :

    ফেনী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মগ জনজাতীয়রা এই নদীর নাম তাদের দেওয়া বলে দাবি করেন ৷ তাঁরা বলেন, ‘ফোয়ে-নি-রে’ অর্থাৎ ‘গোসাপের আবাস’ বা ‘এখানে গোসাপ থাকে’ বলতে যে শব্দগুচ্ছ তাঁরা ব্যবহার করেন তা থেকে কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে ‘ফেনী’ শব্দটি এসেছে বলে এই জনগোষ্ঠীর জনগণ দাবি করেন ৷ পর্বতসংকুল ফেনী নদীর পারে ঝোপেঝাড়ে একসময়  প্রচুর গোসাপের আড্ডা ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে ৷ ফেনী নদীর উচ্চগতিতে পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের অংশে নদীর পাড় থেকে কিছুটা দূরে একটা পার্বত্য জনপদ রয়েছে যার নাম ‘গুইমারা’ ৷ স্থানীয় বাংলায় গোসাপকে ‘গুইল’ বলা হয় ৷ সম্ভবত এখানে গোসাপ বা গুইল মারা পড়ত বলে স্থানটির নাম ‘গুইলমারা’থেকে ‘গুইমারা’ হয়েছে ৷ শিকারে ধরা পড়া এবং মারা যাওয়া বন্যপ্রা‌ণীর নামানুসারে স্থাননামের উদাহরণ ত্রিপুরায় বহু রয়েছে ৷ যেমন— বাঘমারা, হাতিমারা, হাতিমরাছড়া, হরিণমারা, কাউয়ামারা ইত্যাদি ৷ গুইমারাও সেরকম একটি স্থাননাম ৷ 
     চাকমা ভাষাতেও ‘ফেনী’ শব্দটি পাই  প্রত্যাবর্তন অর্থে ৷ যেমন, চাকমা লোককাহিনি রাধামন-ধনপুদি পালায় রয়েছে— ‘দোমে বাজায় ধোল দগর/ ফেনী যেইয়ুং নুরনগর’ ৷ এখানে ‘ফেনী যেইয়ুং নুরনগর’ বলতে  নুরনগর ফিরে যাওয়ার কথা বোঝাচ্ছে ৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ফেনী নদীর উজান এলাকায়  ত্রিপুরা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চাকমা জনজাতির বাস রয়েছে ৷ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা একসময় চাকমা রাজাদের অধীন ছিল ৷ ত্রিপুরারাজ্যের রাজাদের সঙ্গে চাকমা রাজাদের বিবাদ-বিরোধের তেমন কোনো নিদর্শন ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়না ৷ চাকমা রাজারা সম্ভবত তাঁদের রাজ্যসীমা ফেনী নদীর পাড় পর্যন্ত রেখেছিলেন ৷ফেনী নদীর পাড় পর্যন্ত তাঁদের রাজ্যসীমা চিহ্নিত করে তাঁরা তাঁদের রাজ্যের অভ্যন্তরভাগে ফিরে গেছেন ৷ এই বক্তব্যের সূত্র ধরে এই নদীর নাম ফেনী বলে চাকমাগোষ্ঠীর জনগণের অনেকে মনে করেন ৷ ফেনী নদীর পাড়ে বাংলাদেশে দেওয়ানবাজার নামে একটি স্থান আজও রয়েছে ৷ 
    ইতিহাস, পুরাকথা, লোককাহিনি, লোকভাষা ইত্যাদির মধ্যে যেমন ফেনী নদীর নামকরণের বৈচিত্রময় উৎস খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি ফেনীপারের অনেক স্থাননামের সঙ্গে পৌরাণিক স্থাননামের সাজুয্য খুঁজে পাওয়া যায় ৷ যেমন, এই নদীর উজানভাগে বাংলাদেশ অংশে রয়েছে  অযোধ্যা, রামগড় আর ভাটির দিকে রয়েছে কালিদহ, চম্পকনগর ইত্যাদি নামের বহু প্রাচীন জনপদ ও বাণিজ্যকেন্দ্র ৷ আবার কিছুদূরেই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপর সীতাকুন্ড নামে একটি উষ্ণ প্রস্রবন রয়েছে ৷ শুধুমাত্র ফেনী নদীই নয়, নদীর দুইপাড়ে কাছে দূরে অনেক স্থানই  নানা নামমাহাত্ম্য বহন করে চলেছে ৷ যেমন একটু দূরে ভারতের দিকের পাহাড়টির নাম তুলসীটিলা ৷ আর  পাহাড়ের মধ্যে জোড়া পাহাড় ‘মামা-ভাগিনার টিলাকে নিয়েও রয়েছে মিথ ৷ এই পাহাড়কে স্থানীয় উপজাতীয়রা ‘রানির টিলাও বলে থাকেন ৷আর একটি জনপদ রয়েছে তার নাম ‘ঋষ্যমূক’ (স্থানীয় উচ্চারণে ঋষ্যমুখ) ৷ এমন অনেক পৌরাণিক অনুষঙ্গ জড়িয়ে রয়েছে ফেনিতীর ৷

ফেনী নদী  : প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিসাহিত্যে  :

মহারাজা ধর্মমাণিক্যের আমলে (1431-62খ্রি.) শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত দক্ষিণ পরগণার ঠাকুরবাড়ি গ্রামের অধিবাসী দুজন পুরোহিত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর বাংলা পয়ার ছন্দে রাজমালা রচনা করেন ৷ তাঁরা ধর্মমাণিক্যের আমন্ত্রণে তাঁর পূর্বপুরুষের কীর্তিকাহিনি  শোনার বাসনায় বাংলা হরফে একটি সংস্কৃত পুঁথি রচনা করেন ৷ তার নাম ‘শ্রীরাজরত্নাকরম’ ৷ এই পুঁথিতে লেখকের নাম বা রচনার কোনো সন-তারিখ উল্লেখ নেই ৷ তবে এর রচনাকাল 1462 খ্রি.র মধ্যে কোনো এক সময়ে হয়ে থাকবে ৷ সেই পুঁথির শেষাংশ অর্থাৎ দ্বাদশ সর্গের শেষভাগে রাজচন্তাই দুর্লভেন্দ্রর বয়ানে ত্রিপুরার সীমাবর্ণনা রয়েছে এইভাবে—
                                      দুর্লভেন্দ্র উবাচ
                অতিপ্রাচীনমেবেদং রাজ্যং ত্রিপুরসংজ্ঞিতম৷
                মহাদেবং বিহারার্থং ব্রহ্মণা নির্মিতং পুরা ৷৷ 94 
                ত্রিপুরেশবনং পুণ্যং-প্রসিদ্ধং সত্যকালতঃ ৷
                কিরাতনিচয়াস্তত্র নিবাসং চক্রিরে পুরা ৷৷ 95
                তে কালে বিপুলং রাষ্ট্রং কৃতবন্তো ধনুর্ধরাঃ ৷
                ভবানী কৃপয়া রাজন্ ত্রেতায়ামিতি শুশ্রূমঃ ৷৷ 96
                ব্রহ্ম-কিরাত-ভূভাগ পূর্বসীমা প্রকীর্তিতা ৷
                দেশস্তু কচ্ছলিঙ্গাখ্যঃ সীমাগ্নেয়ী প্রকীর্তিতা ৷৷ 97
                ফেনবতী নদী তস্যস্থিতা দক্ষিণ সীমনি ৷
                নৈঋত্যাং কচ্ছরঙ্গো হি তস্য সীমোচ্যতে জনৈঃ ৷৷98
( দুর্লভেন্দ্র বললেন—ত্রিপুর নামক রাজ্যটি অতি প্রাচীন ৷পুরাকালে ব্রহ্মা মহাদেবের বিহারার্থ এই রাজ্য  নির্মান করেছিলেন ৷ ৷94৷ সত্যযুগ থেকেই ত্রিপুরেশের পবিত্রবন হিসেবে এই রাজ্য প্রসিদ্ধ ৷ (অবশ্য) পুরাকালে কিরাতগণ এখানে নিবাস স্থাপন করেছিল ৷ ৷95৷ হে রাজন, ধনুর্ধর কিরাতেরা কালক্রমে এক বিপুল রাজ্য নির্মান করেন ৷ শোনা যায়, ভবানীর কৃপায় ত্রেতাকালে এই ব্যাপারটি সম্ভব হয়েছিল৷৷96৷ ব্রহ্ম ও কিরাতদেশে এর পূর্বসীমা বলে প্রকীর্তিত ৷ কচ্ছলিঙ্গ নামক দেশ এ রাজ্যের শুভ আগ্নেয়ী (পূর্ব-দক্ষিণ) সীমা বলে সুবিদিত ৷৷97৷ এর দক্ষিণ সীমায় ফেনবতী নদী প্রবাহিত ৷ কচ্ছরঙ্গ দেশের নৈঋত দিকে অবস্থিত বলে লোকত প্রসিদ্ধ ৷৷98৷ এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিণ সীমা নির্দেশক ‘ফেনবতী’ নদীটিই বর্তমানের ফেনী নদী ৷
         মধ্যযুগের কবিদের রচিত পুঁথিসাহিত্যে একটিবিশেষ নদীর জলধারা এবং খেয়া পারাপারের জন্যে ব্যবহৃত ঘাট হিসেবে ‘ফনী’ শব্দটির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় ৷ পঞ্চদশ শতকের শেষ ও ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রাম শাসন করেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (1494-1519খ্রি.) ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহ (1519-1533খ্রি.) ৷ এইসময় চট্টগ্রামে শাসক ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ ও তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ ৷ সেসময় চট্গ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল পরাগলপুরে যা লস্করপুর নামেও খ্যাত হয় ৷ এখানে রাজধানী স্থাপন করে লস্কর পরাগল খাঁ ও তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ প্রায় ত্রিশ বছরের বেশি সময় চট্টগ্রামে শ্রীকর নন্দী ৷ মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্যচর্চার এক প্রধান কেন্দ্র হয় ওঠেছিল তখন পরাগলপুর বা লস্করপুর ৷ প্রথমজন অর্থাৎ কবীন্দ্র পরমেশ্বর রচনা করেছিলেন পরাগলী মহাভারত এবং দ্বিতীয়োক্ত শ্রীকর নন্দী ছুটি খাঁর নির্দেশে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে মহাভারতের অশ্বমেধ যজ্ঞ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ৷ তাঁর এই অনুবাদকর্ম ছুটি খানি মহাভারত নামে বাংলাসাহিত্যে সমাদরের সঙ্গে আলোচিত হয় ৷ কবি শ্রীকর নন্দী পরাগলপুর বা লস্করপুরের পরিচয়প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন—

                                চাটিগ্রাম নগরের নিকট উত্তরে
                                চন্দ্রশেখর পর্বত কন্দরে ৷৷
                                চারুলোল গিরি তার পৈতৃক বসতি
                                বিচিত্র নিরমিল তাক কি কহিব অতি ৷৷
                                পরি বর্ণ বসে লোক সেনা সন্নিহিত
                                নানা গুণে প্রজা সব বসএ তথাত ৷৷
                                ফেনী নদী নামে এ বেষ্টিত চারিধার
                                পূর্বদিকে মহাগিরি পার নাহি তার ৷৷
                                লস্কর পরাগল খানের তনয়
                                সমরে নির্ভএ ছুটি খান মহাশয় ৷৷
          স্পষ্টই বোঝা যায় যে মধ্যযুগে লস্করপুর বা পরগলপুর নামের নগরটি ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল ৷ আর এই নদীর তীরের এই শহরটি একদিন বাংলা ভাষাসাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ৷
          সতেরো শতকের আর একজন কবি মির্জা নাথান-র ফার্সি ভাষায় রচিত ‘বাহারিস্তান-ই-গায়েবী’-তে ‘ফণী’ শব্দটি ফেনীতে পরিণত হয়ে গেছে ৷ আঠারো শতকের শেষভাগে কবি আলী রেজা বা কানু ফকির তাঁর পিরের বাসস্থান হাজিগাঁওর অবস্থান বর্ণনাকাল উল্লেখ করেছেন, 
                              
                                  'ফেনীর দক্ষিণে এক ষর উপাম
                                 হাজিগাঁও করিছিল সেই দেশের নাম’
       কবি মোহাম্মদ মুকিম তাঁর পৈতৃক বাসস্থানের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, ‘ফেনীর পশ্চিমদিকে যুগিদিয়া দেশে……’৷ এখানে লক্ষ্যণীয় যে এই কবিগণও নদীটির নাম বোঝাতে ‘ফেনী’রই ব্যবহার করেছেন ৷
        আনুমানিক 1712 খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ শিক পরগণার কৈয়রা গ্রামে সমসের গাজির জন্ম হয় ৷1784 খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী সমসের গাজির অধিকারভুক্ত হয় ৷ তখন থেকে  বারো বছর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বময় কর্তা ছিলেন ৷ সমসের গাজির জীবনের আকস্মিক উত্থান-পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর পর শেখ মনুহর গাজি নামে এক পল্লীকবি  রচনা করেন ‘গাজিনামা’ ৷ 1813 খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালির সেরেস্তাদার মৌলবি খবির মুদ্রিত করেন এই গাজিনামা ৷ এটি ত্রিপুরার ইতিহাসাশ্রিত কাব্যগ্রন্থ ৷ ‘গাজিনামায়ও সমসের গাজির গড় জগন্নাথ-সোনাপুর গ্রামের বর্ণনায় পাই—

                        দক্ষিণে ফেনী নন্দী       পূর্বে গিরি মুড়াবন্দী
                                         উত্তরেতে এহেন জলধি ৷
                       পশ্চিমে মলয়াপানি       তার মধ্যে ভদ্রাখানি
                                         মধ্যে যেন খিরুদের দধি ৷৷

      এখানেও সমসের গাজির গড়বন্দী গ্রামের সীমা প্রসঙ্গে ফেনী নদীর উল্লেখ রয়েছে ৷ ফেনীপারের এই বিদ্রোহী বীরের উত্থানে সেদিন ত্রিপুরার রাজসিংহাসন কেঁপে উঠেছিল ৷ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সমসের গাজির কেল্লা এবং বিশাল দীঘিটি আজও দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার পশ্চিম প্রান্তস্থ সীমান্ত গ্রাম আমলিঘাটে বিদ্যমান ৷ আমলিঘাট থেকেই ফেনী নদীর নিম্নগতির শুরু এবং প্রশস্ত জলপ্রবাহের রূপ ধরে দক্ষিণাভিমুখী হয়ে বাংলাদেশের সমতলক্ষেত্রের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ৷

        ফেনী নদীপ্রবাহের ভারতভূখন্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট ৷ আমলিঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী লোকালয় ঘিরে বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও লোককাহিনি জড়িয়ে রয়েছে ৷ আমলিঘাটের একপ্রান্তেই সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে এই অঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহের নায়ক সমসের গাজির দীঘি ও কেল্লার ধ্বংসাবশেষ ৷ কেল্লাটি আজ জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ৷ দীঘির বৃহত্তর অংশই কাঁটাতারের ওপারে, যার একাংশ বর্তমানে বাংলাদেশ ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত ৷ দীঘিটির তেমন সংস্কার নেই ৷ পাড় কেটে অনেকে চাষের জমি বানিয়ে ফেলেছে ৷ এই দীঘিকে কেন্দ্র করে লোককাহিনিও প্রচলিত ছিল একসময় লোকমুখে ৷ দীঘির পাড়ে তালিকা রেখে মানত করলে নাকি বাসন-কোশন পাওয়া যেত উৎসব অনুষ্ঠানে নেমনতন্নের কাজ সমাধা করার জন্যে ৷ দীঘির একটা কোনা থেকে একটা সুড়ঙ্গপথ সমসের গাজির কেল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে, যা এখন বনজঙ্গল ঘেরা এবং বাদুড়,চামচিকে, সরীসৃপের আবাসস্থল ৷ লোকপ্রচলিত কথা আছে, এই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে সমসের গাজির কেল্লার অভ্যন্তরের পর্দানসীন মহিলারা দীঘির জলে স্নান করতে আসতেন ৷
       সমসের গাজির এই দীঘিটির চারধারে যে উর্বর নিম্ন সমভূমি রয়েছে এবং যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশের চাষের ভূখন্ড তার নাম ‘কালিদহ’ ৷ এই কালিদহকে কেন্দ্র করেও একটি পুরোনো লোককথা প্রচলিত রয়েছে ৷ সেই অনুযায়ী জানা যায় যে এই কালিদহেই নাকি চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ডুবেছিল ৷ বছর চল্লিশেক আগেও এখানকার ভূমিতে প্রোথিত নৌকার গলুইয়ের মতো কিছু একটার ঊর্ধ্বভাগ দেখা যেত ৷ এটাকে ধারনা করা হত চাঁদ সওদাগরের ডুবে যাওয়া নৌকার গলুইয়ের অংশবিশেষ ৷ এই বস্তুটি 1974 সালে এই প্রতিবেদক এবং ত্রিপুরার বিশিষ্ট লোকগবেষক ড. রঞ্জিত দে প্রত্যক্ষ করেছেন ৷ গ্রাম্য ললনারা এখানে  দীর্ঘদিন ধূপ-দীপ জ্বালাতেন ৷ পাশের (বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত) গ্রামটির নাম চম্পকনগর ৷ বলা হয়, এখানে চাঁদ সওদাগরের বাড়ি ছিল ৷ আমলিঘাট প্রায় এক দেড় কিলোমিটার ফেনী নদীর উজানের দিকে নদীতে একটি গভীর খাত রয়েছে ৷ এখানে বিশাল এলাকা জুড়ে জলঘূর্ণির সৃষ্টি হয় ৷ জলের এই পাকের মধ্যে কিছু এসে পড়লে কুন্ডলী পাকিয়ে জল তা অনেক দূরে নয়ে ফেলে ৷ এই স্থানটিতে জলের গভীরতাও প্রচুর ৷ পঞ্চাশ-ষাট হাত লম্বা বাঁশ ফেলেও ঠাঁই পাওয়া যায়না ৷ এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় বলে মৎস্যশিকারীদের জন্যে লোভনীয় স্থান এটি ৷ এই জায়গাটির নাম ’মেরুকুম’ ৷ সন্নিহিত জনপদের নাম ‘মেরুপাড়া’ ৷ এখানে বিস্তৃত চরভূমি রয়েছে ৷ মেরুকুমের এই চরভূমিতে দাঁড়িয়ে বিকেলবেলার সূর্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত নয়নমুগ্ধকর ৷ লোকশ্রুতি আছে এখানেই নাকি মনসামঙ্গলখ্যাত বেহুলার বাবা সায়বেনের বাড়ি ছিল ৷ একসময় এই মেরুকুম পর্যন্ত সমুদ্রের জোয়ারের জল আসত ৷ ফেনী নদীর বাঁকে অবস্থিত এই মেরুকুম-আমলিঘাট-কালিদহ-চম্পকনগর ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে সত্যিই মনসামঙ্গলে বর্ণিত কাব্যিক পরিবেশ সৃষ্টি করে ৷ এই আমলিঘাটের পাশেই ফেনী নদীর পারে একটি নাতিউচ্চ পাহাড়ে রয়েছে একটি প্রাচীন শিবমন্দির ৷ এই মন্দিরকেও কেন্দ্র করে রয়েছে মিথ ৷ কথিত আছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বিখ্যাত শৈবতীর্থে যাওয়ার আগে ভক্তরা এখানে বিশ্রাম করতেন ৷ এই পাহাড়টায় প্রচুর বেলগাছ রয়েছে ৷ বলা হয় এই বেলগাছ আপনতেই গজায় ৷ কেউ লাগাতে হয়না ৷ কেউ কেউ বলেন খানে শিবপার্বতী বিশ্রাম করতেন ৷ প্রতি বছর শিবচতুর্দশীতে এখানে বিরাট মেলা বসে ৷ এটাও চন্দ্রনাথ শিবতীর্থের ক্ষুদ্ররূপ ৷

ফেনী নদীর পাড়ের লোকমেলা  :

      ফেনী নদীকে ঘিরে দুই পারের জনগণের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানও চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই ৷ বিবাহ-অন্নপ্রাশন ইত্যাদি পারিবারিক অনুষ্ঠান ও পুজো -উৎসবের ঘট পূর্ণ করা হয় ফেনী নদীর জলে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে ৷ ফেনী নদীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান বারুণীমেলা ৷ ফেনী নদীর গতিপথের তিনটি স্থানে জমজমাট মেলা বসে ৷ সেগুলো হল, ত্রিপুরার সাব্রুমে ও আমলিঘাটে এবং বাংলাদেশের শুভপুরে ৷ তবে দক্ষিণ ত্রিপুরার মহকুমাশহর সাব্রুমের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ফেনী নদীর বারুণীস্নান ও মেলা খুবই প্রাচীন ও প্রচুর লোকসমাগম হয় এখানে ৷
     প্রতিবছর চৈত্রমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে হয় বারুণীস্নান ৷ এদিন হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগণ নদীর পুণ্যসলিলে স্নানান্তে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করেন ৷ এই উপলক্ষে সাব্রুমের সীমান্ত নদী ফেনীর পাড়ে বসে মেলা ৷ নদীর দুই পাড়ে দুই জনপদ ৷ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম আর বাংলাদেশের রামগড় ৷ ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির বহু আগে থেকেই ফেনীর দুই পাড়েই এই উপলক্ষ্যে মেলা বসে আসছে ৷ ভারতভুক্তির পর সীমান্তে কড়কড়ির ফলে দুদেশের মানুষের অবাধে আসা-যাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা আসে ৷ কিন্তু বারুণীর দিন কিছুক্ষণের জন্যে সব বাধা যেন ছিন্ন হয়ে যায় ৷ দুই পাড় দুই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও যাঁরা তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা ওপারের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হন তাঁরা বারুণীর দিন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাতের কিঞ্চিৎ সুযোগ পান কিছুক্ষণের জন্যে ৷
          ঠিক এভাবেই একাত্তরের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা এদেশে এসে আর ফিরে যাননি, যাঁরা ফিরে গেছেন সবাই এদিন মিলিত হন প্রিয়জনদের সাথে এই বারুণীমেলাতে ৷ এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দূরদেশে বিয়ে হওয়া মেয়েরা ফেনী পারের গ্রামে বাপের বাড়িতে ‘নাইঅর’ আসে ৷ বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসে আর সেইসঙ্গে মেলাটাও সেরে নেয় ৷ সারাবছরের ঘরগেরস্থালির টুকটাক উপকরণ এই বারুণীমেলা থেকেই সংগ্রহ করে নেয় ৷ কিছুক্ষণের জন্যে দুপারের মানুষের মিলিত অশ্রুধারা ফেনীর জলে, মিশে ভাটির দিকে বয়ে যায় সমুদ্রের সন্ধানে ৷ ঐতিহ্যের শেকড়ের খোঁজে ৷ ফেনী নদী এভাবেই এই অঞ্চলের বাঙালিদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বুকে ধরে নীরবে বয়ে যায় ৷

মুক্তিযুদ্ধে ফেনীনদীতীরবর্তী অঞ্চল : এক নম্বর সেক্টরের অবদান 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


১৯৭১সালে যে রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থানের ফলে একটা জাতি গোষ্ঠী স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল, পেয়েছিল মুক্তির আনন্দ আর মায়ের ভাষায় কথা বলার স্বাচ্ছন্দ‍্য আঁচলের আশ্রয়, সেই জাতির নাম বাঙালি আর তাদের মুক্ত ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ । এই বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে বাঙালি জাতি গোষ্ঠীর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে তা সবারই জানা । যেহেতু বাংলাদেশ তথা তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ভারত ভূখণ্ডের দুটি প্রদেশ ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে একই জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করেন এবং তাদের ভাষা ও কৃষ্টি সংস্কৃতি একই ধারায় প্রবাহিত । সে কারণে এই দুই প্রদেশের মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তরিক সমর্থন ছিল । ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করার পরই মধ্যরাতে শুরু হয়ে যায় সে দেশের নাগরিকদের উপর উৎপীড়ণের স্টিম রোলার । বলবৎ হয় সামরিক আইন। ঢাকার রাজপথে শুরু হয়ে যায় পাক বাহিনীর তান্ডব । নবনিযুক্ত গভর্নর টিক্কা খানের নেতৃত্বে শুরু হয়ে যায় নির্বিচারে বুদ্ধিজীবী ও নিরীহ নাগরিকদের হত্যা । ভীতসন্ত্রস্থ নাগরিকরা প্রাণ নিয়ে কপর্দকশূন্য হয়ে আশ্রয় নেন ভারত ভূখণ্ডের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে । সেদিন স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ত্রিপুরাতে আশ্রয়গ্রহণ করেছিলেন । রাজ্যের জাতি উপজাতি সমস্ত অংশের মানুষ এক যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন ।

মূলত বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীরাই সর্বাগ্রে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত শহর রামগড়ে ঘাঁটি গড়ে তোলেন । সেকারণে সেদিন রামগড় লাগোয়া ফেনী নদীর উত্তর পাড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত শহর সাব্রুম হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ । এক নম্বর সেক্টর থেকে ফেনীসহ নোয়াখালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল । আজকের প্রজন্ম লক্ষ্য করছে ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সেই সময়ের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত স্থানে মুক্তি সেনা ট্রেনিং নিতেন, তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল,বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেওয়া হয়েছিল, সেসব স্থানে মুক্তিযুদ্ধ উৎসব পালিত হচ্ছে, স্মৃতিসৌধ তৈরি হচ্ছে, মৈত্রী উৎসব হচ্ছে । মুক্তিযোদ্ধারা এদেশে এসে শেষ স্থান ঘুরে দেখছেন, স্মৃতিচারণ করছেন অথচ ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর ও তৎসংলগ্ন হরিনা, বৈষ্ণবপুরের গ্রাম জনপদ যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং নিয়েছেন, যুদ্ধের অভিযান সংগঠিত করেছেন, আশ্রয় নিয়েছিলেন বেশ কয়েক হাজার শরণার্থী  অথচ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পরবর্তীকালে এই অঞ্চল প্রায় অনালোচিত রয়ে গেছে । যারা প্রায় এক বছর এখানে থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজ্যের অন্য ভূখণ্ডে পা রাখলেও সাব্রুম মুখো হননি কোনদিন । নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে এই প্রতিবেদক ব্রতী হয়েছেন ইতিহাসের সেই অগ্রন্থিত অধ্যায়কে উন্মোচনের উদ্দেশ‍্যে । কালস্রোতে বহু তথ্য হারিয়ে গেছে । অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন । অনেকের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে গেছে । তবু বিভিন্ন সময়ে গৃহিত সাক্ষাৎকার ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে এই শহরের প্রয়াত এবং জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত বরিষ্ঠ নাগরিক বিভিন্ন সময়ে যে তথ্য দিয়েছেন এবং উইকিপিডিয়া বাংলা পিডিয়া সদস্য তথ্যসমূহ কে একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের ইতিহাস তুলে ধরার একটা দুর্বল প্রয়াস নিয়েছেন এই প্রতিবেদক ।  এই এক নম্বর সেক্টর থেকে ফেনী ও নোয়াখালি জেলায় যে স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রেখেছিল সেই বিষয়ে এই নিবন্ধে আলোকপাত করা হবে । 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন এলাকা এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান এবং সেখান থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা হতেন । বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুমের হরিনাতে । "বাংলাদেশ যুদ্ধে এই এক নম্বর সেক্টরের এলাকা ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা ( রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি জেলা ) কক্সবাজার মহকুমা এবং নোয়াখালী জেলা ফেনী মহকুমার অংশবিশেষ ( মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত ) নিয়ে এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল এলাকার আয়তন প্রায় ১৮৬০৩.৪৭ বর্গ কিলোমিটার ।
সব সেক্টরের সংখ্যা ছিল পাঁচটি :- এগুলো হলোঋষ‍্যমুখ, শ্রীনগর, মনুঘাট, তবলছড়ি ও ডিমাগিরি । সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে ১০ জুন ১৯৭১ পর্যন্ত ) এবং মেজর রফিকুল ইসলাম ইপিআর ( ১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ) পর্যন্ত । 
সেক্টর অ্যাডজুটেন্ট :- ফ্লাইং অফিসার সাখাওয়াত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন এনামুল হক 
কোয়ার্টার মাস্টার :- নায়েক সুবেদার সোবহান এবং ইঞ্জিনিয়ার একেএম ইসহাক । সেক্টর মেডিকেল অফিসার :-  ডাক্তার রেজাউল হক 
সেক্টর ট্রুপস :-  নিয়মিত বাহিনী ২১০০ সৈন‍্য । এদের মধ্যে ১৫০০ইপিআর সদস্য, ৩০০জন সেনা বাহিনীর,২০০ পুলিশ এবং ১০০ জন নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য ।
গণবাহিনী :- ২০০০০ জন । এরমধ্যে ৮০০০ গেরিলা ছিল ১৩৭টি দলে সুসংগঠিত অ্যাকশন গ্রুপ । গেরিলাদের ৩৫ শতাংশ এবং সেক্টরের সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয় ।

সদর দপ্তর: হরিণা:

সাব-সেক্টরের সংখ্যা: ৫টি। এগুলো হলো ঋষ‍্যমুখ, শ্রীনগর, মনুঘাট, তবলছড়ি ও ডিমাগিরি।

সেক্টর কমান্ডার: মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে ১০ জুন ’৭১) এবং মেজর রফিকুল ইসলাম- ইপিআর (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ’৭১)।

সেক্টর এ্যাডজুটেন্ট: ফ্লাইং অফিসার সাখাওয়াত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন এনামুল হক।

কোয়ার্টার মাস্টার: নায়েক সুবেদার সোবহান এবং ইঞ্জিনিয়ার একেএম ইসহাক।

সেক্টর মেডিক্যাল অফিসার: ডা. রেজাউল হক।

সেক্টর ট্রুপস্: নিয়মিত বাহিনী- ২,১০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ১,৫০০ ইপিআর সদস্য, ৩০০ জন সেনাবাহিনীর, ২০০ পুলিশ এবং ১০০ নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য।

গণবাহিনী: ২০,০০০ জন। এর মধ্যে ৮,০০০ গেরিলা ছিল ১৩৭টি দলে সুসংগঠিত অ্যাকশন গ্রুপ। গেরিলাদের ৩৫% এবং সেক্টর ট্রুপসের সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়।

সাব-সেক্টরসমূহ

ঋষ‍্যমুখ সাব-সেক্টর:

মুহুরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এলাকাটির তিন পাশে ভারত। এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিওপির অবস্থান ছিল; যেমন- আমজাদহাট, পূর্বদেবপুর, দক্ষিণ যশপুর, ছাগলনাইয়া, চম্পকনগর, বল্লভপুর, ইত্যাদি। এই সেক্টরের ভিতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মহাসড়ক ও রেলপথ চলে গেছে। চট্টগ্রাম এলাকা থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এ সকল রাস্তা ব্যবহার করত।

আয়তন: ৩০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চু

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর: 

আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)।

তবলছড়ি সাব-সেক্টর:

অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।

আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার

সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)।

ডিমাগিরি সাব-সেক্টর:

৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারত সংলগ্ন ছিল।্

আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি।

মনুঘাট সাব-সেক্টর :

বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল । ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূখণ্ডে চলে যেতে পারত । এ অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ছিল । এছাড়া চেঙ্গী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত । 
আয়তন :-পাঁচটি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো । প্রায় ১২০০বর্গ কিলোমিটার । 
সাব-সেক্টর কমান্ডার :- যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান 
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :-  রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা । 
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ :- রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।
 উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ :- হেঁয়াকোর যুদ্ধ ( ২৭ জুলাই ), রামগড় আক্রমণ ( ১৩- 15 আগস্ট ), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি এম্বুস যথাক্রমে ( ১–২নভেম্বর ), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ ( ১০ ডিসেম্বর )
 এক নম্বর সেক্টরে মাত্র ৫ টি সাব সেক্টর গঠন করা হলেও এ অঞ্চলের কিছু এলাকা সাবসেক্টর বহির্ভূত ছিল । এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা । ( তথ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক– মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ ) ।

মুক্তিযুদ্ধে ফেনীনদীতীরে যে কয়টি লড়াই হয় তারমধ্যে শুভপুর ও রামগড়ের যুদ্ধ অন‍্যতম । এই যুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর এই দুটি সাব-সেক্টরের মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ শানিয়ে ফেনী জেলাকে মুক্ত করেন ।

মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুম-রামগড়:

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের এক বিশেষ অবদান রয়েছে । প্রথমত উল্লেখ্য যে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুম সন্নিহিত হরিনাতে ।এই এক নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ অর্থাৎ মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত । ২৫ শে মার্চের পর প্রথম দিকে রামগড়ে মুক্তিবাহিনী তাদের ঘাঁটি গেড়ে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শানাতে আরম্ভ করে । রামগড় স্কুলের মাঠে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হত । তারপর ২মে পাকবাহিনী প্রথম রামগড়ে হানা দেয় এবং তারা রামগড় তাদের দখলে নিয়ে নেয় । এরপরই মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় সাব্রুমের হরিনাতে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে অপারেশন চালানো হয় । এরপর থেকেই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজারে শরণার্থী সাব্রুমে আশ্রয় গ্রহণ করে । পঁচিশে মার্চ রাতে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর রামগড় বাগান বাজারের সেকান্তর মিয়া ওপার থেকে এম আর সিদ্দিকী জহুর আহমেদ ডক্টর নুরুল হাসান সহ আরো দুজন কে সঙ্গে নিয়ে রামগড় বাজার ঘাট দিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুম এর সে সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ও কালিপদ ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন । পরে তারা বিষয়টি শচীন্দ্রলাল সিংহকে জানালে তিনি দিল্লীতে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন । সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যবল দিয়ে সাহায্য করার বার্তা দেওয়া হয় । রামগড় ও সাব্রুমের মাঝখানে ফেনী নদীর উপর সে সময়ে একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয় । সেই সাঁকো দিয়ে এপারর থেকে যুদ্ধের গাড়ি, সৈন্য এবং  মুক্তিবাহিনী সে দেশে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানো হত ।  ৭ ডিসেম্বর নয়টা পঁচিশ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ের উপর বোমাবর্ষণ করে এরপর 8৮ডিসেম্বর ৯:৫০ এ পুনরায় দুটি বিমান পাক ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে । ৮ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে পাকবাহিনী রামগড় ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনীর ও মুক্তিপ্রাপ্ত জনগণ সেদিন রামগড়ে বাংলাদেশ পতাকা উড়িয়ে দেন । ৮ ডিসেম্বর রামগড়ে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় সে সময় সেসময় ভারতের পক্ষে তদানীন্তন ব্লক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী উদয়পুরের তরুণ সাংবাদিক স্বপন ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তারপর ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ বিজয় লাভ করে ।

শুভপুর যুদ্ধ :

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্গত শুভপুর মধুগ্রাম অংশটি শুভ পূর্ব রাধানগর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত শুভপুর-মধুগ্রাম মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর রেলওয়ে ও সড়ক ব্রিজটি এখানে অবস্থিত। শুভপুর ব্রিজকে নিজেদের  দখলে রাখার তাগিদে  মুক্তিবাহিনী এবং পাক হানাদার বাহিনীর মধ‍্যে দফায় দফায় যুদদ্ধ হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাই এই স্থানের গুরুত্ব । চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সমুদ্র বন্দর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ঢাকা চট্টগ্রাম রোড ধরে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সরবরাহ করা হত । তাই এর রণকৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি । তৎকালীন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের এবং যোগাযোগের পথ ছিল ছাগলনাইয়ার শুভপুর হয়ে । মুক্তিযোদ্ধারা স্থির করলেন শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দেওয়া গেলে পাকিস্তানি বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রবেশ ও যোগাযোগ করতে পারবে না । সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় । তেমনি ব্রিজটিও দখলে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী । শুভপুর ব্রিজ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে স্বীকৃত । চট্টগ্রামের যত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণও আশ্রয় নেন তারা এই শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় বি এস এফের সহযোগিতায় ব্রিজের ১০ নম্বর পিলারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে এ অংশ হানাদার মুক্ত হয় । এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ বাহিনী শুভপুর ব্রিজ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকিস্তান বাহিনী রামগড় দখল নেওয়ার পর শুভপুর ব্রিজ এর দক্ষিণ তীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । ৩ মে ১৯৭১ হরিনায় এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় । তারপরেই এখানে স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয় । চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করার জন্য শ্রীনগর, আমলিঘাট, সাব্রুম সীমান্তসহ অন‍্যান‍্য সীমান্ত দিয়ে হরিনা আসেন । এসব ভলান্টিয়ারদের দুসপ্তাহে ট্রেনিং দেওয়া হয় ত্রিপুরার হরিনা ইয়ুথ ক‍্যাম্পে, বগাফা ও অম্পিনগর সেনানিবাসে, আসামের হাফলং, তেজপুরে ও লায়লাপুরে, মেঘালয়ের তুরাসহ আরো কয়েকটি স্থানে । মুক্তিযোদ্ধারা শর্ট কোর্সে অটোমেটিক রাইফেল এল এম জি, এস এম জি, গ্রেনেড ও ২ ইঞ্চ মর্টার চালনা ও বিস্ফোরক ট্রেনিং নিয়ে জুন মাসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন । জুন মাস থেকে মেজর রফিক গেরিলাদের দায়িত্ব নেন ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হন । তাঁকে সাহায্য করেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক‍্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভুঁইয়া  (যিনি পরবর্তীকালে 'মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন )। সেসময় মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল সম্মুখযুদ্ধের কোম্পানি জেড ফোর্স । জেড ফোর্সে ছিলেন শওকত আলী,ক‍্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন ওলি,ক‍্যাপ্টেন হামিদ ,ক্যাপটেন শামসুর রহমান, ল‍্যাফটেনান্ট খালিদ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে ৩০০ এর কাছাকাছি সৈনিক একটি স্টুডেন্ট প্ল‍্যাটুন ( ছাত্রলীগের বিএলএফ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট ) জেড ফোর্স এর নিজস্ব হাইড-আউট ( হেডকোয়ার্টার ) ছিল এবার ত্রিপুরার এক উপলক্ষে রাজার পরিত্যক্ত বাড়ি 'পোয়াংবাড়ি'তে ।
১৯৭১সালের ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজ এর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই হয় যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ১০০ জন সৈন্য নিহত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট । তারা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের পরিকল্পনা ছিল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে কোথাও তারা অবস্থান নেবে । মুক্তিবাহিনী ও স্থির করে রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী যখন ব্রিজ অতিক্রম করবে তখনই তাদের বাধা দেওয়া হবে । তারা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি স্থানে অবস্থান নেয় । চারটে খন্ড খন্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, সুবেদার জালাল ও সুবেদার আবুল হোসেন । ১৮ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী ২ টি কোম্পানি ও বেশকিছু যানবাহনসহ শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে সকাল ১০ টার দিকে তারা শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে যখনই তার বন্ধুও ব্রিজের কাছে পৌঁছায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণ করে হঠাৎ আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিহত হয় । ভয়ে তারা পালিয়ে যায় । পরদিন তারা পুনরায় অধিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে । মুক্তিবাহিনী পুরো রাস্তা জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল । মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সামনে পড়ে তারা ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয় । তবুও তারা এগোতে থাকে । এক সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ গজ ।এই অবস্থায় ২০ দিন বিরুদ্ধে লড়াই চলে । যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৬০ জন সদস্য নিহত হয় । তাদের ১০ টি যানবাহন ধ্বংস হয় । যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী অধিকৃত গাড়ি থেকে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল দখল করে । মুক্তি বাহিনীর পক্ষে ৫-৬ জন শহিদ হন । যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি । ১৬ ডিসেম্বরও মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চট্টগ্রাম দখলে নেন ।

ফেনীনদীর তীরে বৈষ্ণবপুর, সাব্রুম-রামগড়, য়নুঘাট, আমলিঘাট, শুভপুরের এমন  বহু যুদ্ধেই ১ নম্বর সেক্টরের সৈন‍্যগণ, সীমান্তসংলগ্ন বি এস এফ পোস্টে কর্মরত সৈনিকগণ, বগাফা বি এস এফ ক‍্যাম্পের সৈনিকগণ  প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । সেসময়ের বিলোনিয়ার ও সাব্রুমের ছাত্র যুব নেতারাও বিভিন্ন ভাবে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে সাহায‍্য করেছিলেন ।
দুংখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আজ বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছে । এখানকার কবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধারা সামান‍্য একটু স্বীকৃতির জন‍্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ।

ফেনীকেন্দ্রিক সঙ্গীত  :  প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ

         এই ফেনী নদী একটি নবীন রাষ্ট্রের উত্থানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ৷ একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়  ফেনী নদীর পারেই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ৷ হরিনাতে গড়ে ওঠে বেস ক্যাম্প ৷ সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিসেনারা ফেনী নদী পেরিয়ে আক্রমন শানিয়েছিল সেদিন বাংলাদেশের করের হাটে, ছাগলনাইয়ায় ৷ ফেনীপারের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনি নিয়ে রচিত গ্রাম্য কবিদের কবিতা সুর করে গ্রাম্য হাটে বিক্রি করতেন লোককবিরা ৷ হাটে ফেরি করে বিক্রি করা হয় বলে অধুনালুপ্ত এই কবিতাগুলোকে বলা হয় ‘হেটো ছড়া’ বা’হেটো কবিতা’ ৷ প্রতিবেদকের কৈশোরে শোনা একটি হেটো ছড়ার বিস্মৃতপ্রায় কয়েক পংক্তি উদ্ধারের প্রয়াস নেওয়া গেল ৷

                  বলি বীরের কথা, শুনেন বার্তা, শুনেন দিয়া মন
                  স্বাধীন বাংলা পাইবার তরে এক হইলো জনগণ
                   হইলো মুক্তি যোদ্ধা ৷
                   হইলো, মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন যোদ্ধা বাংলার যুবদল
                   জয় বাংলা জয় বাংলা বলি চলিল সকল
                   নিল বন্দুক হাতে, 
                   নিল বন্দুক হাতে হরিনাতে ট্রেনিং দিবার পর 
                   দল বাঁধিয়া পার হইল ফেনী নদীর চর
                   গেল রামগড়েতে ৷
                    গেল রামগড়েতে, তারপরেতে শুভপুরে যায়
                     গ্রেনেড মারি সেইখানেতে ফেনীর পুল উড়ায়…..ইত্যাদি ৷

ফেনীর মাছ  : সংস্কৃতি ও জীবন:

নদী যেমন জীবনকে ধরে রাখে তেমনি নদীর বুকের সম্পদও জীবনের রসদ যোগায় ৷ নদীর মাছ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ৷ পূর্ববাংলার মানুষ অর্থাৎ বাঙালদের যেমন ইলিশ মাছ বিশেষ প্রতীক আর পশ্চিমবাংলার মানুষদের কাছে গলদা চিংড়ি সাংস্কৃতিক প্রতীক ৷ মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের খেলার দিন তা বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে ৷ ফেনী নদী একসময় দুই সংস্কৃতিকেই বহন নেজের বুকে ৷ ইলিশ মাছ আর গলদা চিংড়ি এখানে প্রচুর পাওয়া যেত ৷ এভাবে সংস্কৃতির সমন্বয়ের ধারা রক্ষার ক্ষেত্রে নদীর ভূমিকা ফেনী নদীছাড়া আর দেখা যায়না ৷

ফেনীনদী ও অর্থনৈতিক জীবন  :  সেকাল ও একাল

         রাজন্য আমলে ফেনীর তীরবর্তী অঞ্চলে  রাজারা তাঁদের রাজত্বের তদারকি করার জন্যে তখনকার সময়ের সমতল ত্রিপুরা অর্থাৎ চাকলা-রোশনাবাদকে ব্যবহার করে আসতেন ৷ সে সময়ে উদয়পুরের পরে রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল ক্রমান্বয়ে গভীর থেকে গভীরতর অরণ্য ছিল ৷ তখনকার সময় কুমিল্লা থেকে ফেনী হয়ে মুহূরীগঞ্জ স্টেশনে এসে তাঁরা নামতেন ৷ সেখান থেকে ফেনী নদীর উজান বেয়ে নৌকাযোগে তাঁরা আমলিঘাট ও ছোটোখিলের রানিগঞ্জ বাজারে নামতেন ৷ রানিগঞ্জ বাজারসংলগ্ন এলাকায় তাঁদের একটি ছোটো কাছারিবাড়িও ছিল ৷  কাছারিবাড়ির দুটি দালানের মধ্যে একটি বর্তমান প্রজন্মের মালিকদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে ৷ অন্যটি এখনও আছে ৷ তবে খুবই জরাজীর্ণ অবস্থায় ৷ রানিগঞ্জ কাছারিবাড়িতে তাঁরা খাজনা আদায়ের কাজ সারতেন ৷বিশেষ দিনে খাজনা আদায় উপলক্ষে এখানে ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠিত হত ৷এখান থেকে হাতির পিঠে চড়ে তাঁরা সাব্রুমে আসতেন ৷ সাব্রুমে একটি তহশিল কাছারি ছিল ৷ এই তহশিল অফিসটিও ছিল ফেনীনদীসংলগ্ন ৷ এই তহশিল কাছারিতে বসেই রাজারা তাঁরা ফেনীর উজানের পার্বত্য অঞ্চলের তাঁদের রাজপাটের তদারকি, খাজনাআদায় ও প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করতেন ৷ 
        ফেনী নদীর দুই তীরে তখন মূল্যবান বৃক্ষের গভীর অরণ্য ছিল ৷ শিলাছড়ি, ঘোড়াকাপা, মাগরুম,কাপতলি ইত্যাদি ছিল ঘন বনে ঢাকা ৷  ফেনীর দুইপারের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষজন এখান থেকে মূল্যবান কাঠ, বাঁশ,ছন ইত্যাদি বনজ সম্পদ কেটে নিয়ে যেত ৷  তা দিয়েই তারা বাসগৃহ ও গৃহস্থলীর সামগ্রী নির্মান করত ৷ ত্রিপুরা রাজ্যের এ অঞ্চলসংলগ্ন যে বৃটিশ অধিকৃত ভূখন্ড এবং ত্রিপুরার রাজাদের জমিদারি   ছিল সেই অঞ্চলের মানুষেরা এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে গাছ কাটার ফলে শুধু গাছের কাটা গোড়াটাই পড়ে থাকত ৷ ‘গোড়া কাটা’ থেকেই এখানকার একটি স্থাননাম গোড়াকাবা> ঘোড়াকাপা হয়েছে ৷ এই অঞ্চলে চাকমা জনজাতির বাস বহু প্রাচীনকাল থেকে ৷ ফলে এই স্থাননামের উপর চাকমাভাষার প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয় ৷ চাকমা ভাষায় ‘কাটা’ বে কেটে ফেলাকে ‘কাবা’ বলে ৷ সেই অর্থে ‘গোড়াকাটা’ থেকে ‘গোড়াকাবা’ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ৷ পরবর্তী সময়ে বঙ্গীকরণ হয়ে ‘ঘোড়াকাঁপা’ হয়েছে ৷ এই নামের পক্ষে যুক্তি হল ম্যালেরিয়াপ্রবণ এই এলাকায় জ্বরের প্রকোপে ঘোড়া পর্যন্ত কাঁপত ৷ যার ফলেই হয়ত রাজারা সেদিকে আর পা বাড়াতেননা ৷ সাব্রুম তহশিল অফিস থেকেই তাঁদের কাজকর্ম চলত ৷ একসময় ত্রিপুরার রাজারা ত্রিপুরার বনজসম্পদ বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কর আরোপ করা শুরু করেন ৷ ফলে ত্রিপুরার নদীপথের প্রায় প্রত্যেকটা সীমান্ত অঞ্চলের  ও অন্যান্য নদীর পাড়ে স্থাপন করা হয়েছিল ‘বনকর’ ঘাট ৷ সেসময়ে ত্রিপুরার দশটি বনকর ঘাট ছিল—
মুহুরীঘাট  2. গোমতীঘাট 3. হাওড়াঘাট 4. বুড়মাঘাট 5. সোনাইঘাট 6. খোয়াইঘাট 7. ধলাইঘাট 8. মনুঘাট 9. থালজুরিঘাট এবং 10. ফেনীঘাট ৷ 
এই বনকরঘাটগুলিতে তিনধরনের কর আদায়ের প্রচলন ছিল ৷ তার মধ্যে প্রকৃত বনকর অর্থাৎ বনজসম্পদ রপ্তানির অনুমতির জন্যে প্রদেয় সাধারণ কর ৷ ‘ছনখলা’ অর্থাৎ নদীতীরের অভ্যন্তরের বনভূমি থেকে ছন সংগ্রহ করে তা রপ্তানির জন্যে ঘাটের কাছাকাছি যে জায়গায় জড়ো করা হত সেই জায়গার ভাড়া বাবদ কর দিতে হত ৷ আর ‘খোতগারি অর্থাৎ রপ্তানিযোগ্য বনজসম্পদের মূল্য নির্ধারণের জন্যে ঘাটের কাছাকাছি নিয়ে আসার অনুমতি বাবদও কর সংগ্রহ করা হত ৷ 
        কর আদায়ের জন্যে ফেনী নদীর যে ঘাটটি ছিল তা ছিল আমলিঘাটে ৷ রাজন্যআমলে এই অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল এই আমলিঘাট ৷ যেহেতু ফেনী নদী ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের সীমারেখা ছিল সেকারণে বৃটিশ সরকারকে ঘাটের আয়ের ছয় আনা অংশ দিতে হত ৷ 1886 সালের পূর্ব পর্যন্ত একজন বৃটিশ অফিসার এই কর আদায় করতেন ৷ করের হার নির্ধারণের নীতি ছিল পরিবাহিত পণ্যসামগ্রীর আনুমানিক মূল্যের দশ শতাংশ ৷ ত্রিপুরার রাজার ভাগের দশ আনা অংশ রাজস্ব মহারাজার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হত ৷ ত্রিপুরারাজ্যের ভূভাগ থেকে তখন বনজসম্পদ ছাড়াও জুমে উৎপাদিত  বিশেষ বিশেষ প্রজাতির ধানের মধ্যে খাসা, বিন্নি, কাওনসহ পাট, তিল, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি ফেনী নদীপথে পরিবহন করা হত ৷ জুমে উৎপাদিত কার্পাস ও তিলের এক চতুর্থাংশ খাজনা হিসাবে মহারাজাকে দিতে হত ৷ ফেনী নদীতে অতীতে নাব্যতা ছিল ৷ মুহুরীগঞ্জ, ধুমঘাট থেকে প্রায়শই নৌকা উজানের দিকে আসত ৷পঞ্চাশ-ষাটের দশকেও ফেনী নদীতে নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে ৷ সেসময় শিলাছড়ি-ঘোড়াকাপা থেকে নৌকাভর্তি ধান, পাট, কার্পাস, তিল, সরিষা ইত্যাদি ভাটির দিকের হাটগুলোতে আসত ৷ ষাটের দশকের শেষ দিকেও হাটবারের দিনে ফেনী নদীর পাড়ের ত্রিপুরার মহকুমাশহর সাব্রুম ও বাংলাদেশের উপজেলাশহর ও বিখ্যাত গঞ্জ রামগড় বাজারের ঘাটে ত্রিশ চল্লিশটি করে নৌকা বাঁধা থাকত ৷ এই অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে কার্পাস ও তিলের খুব কদর ছিল ৷ নদীপথে কার্পাস প্রথমে নিয়ে যাওয়া হত নারায়ণগঞ্জে ৷ সেখান থেকে পাঠানো হত কোলকাতায় ৷ এই অঞ্চলের বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে ব্যবসার জন্যে ফেনী নদীর তীরবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে এসে পরবর্তীসময়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন অনেকে ৷ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালি ইত্যাদি অঞ্চলের বহু ব্যবসায়ী ব্যবসার সূত্র ধরে প্রায় এক-দেড়শো বছর আগে এসে ফেনীর উজান অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন ৷ যাঁদের উত্তরাধিকারীরা আজও এ অঞ্চলে বসবাস করছেন ৷পঁচাত্তর থেকে একশো বছর আগে বেশ কয়েকঘর মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী প্রথমে রানিগঞ্জবাজার ও পরে সাব্রুমে ব্যবসা করতে ৷ কেউ কেউ রামগড়েও ছিলেন ৷
        ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলের নদীগুলোর মতো ফেনী নদী দিয়েও প্রচুর পরিমানে বাঁশ, ছন রপ্তানি হত ৷ বিগত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফেনী নদী দিয়ে প্রচুর পরিমানে বাশ, ছন রপ্তানি হত ৷ প্রচুর পরিমানে বাঁশ নদীর উপর বিছিয়ে ভেলার মতো করে পর পর একসঙ্গে বেঁধে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হত ৷ এই বাঁশের উপর তখনকার সময় এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের এক অংশের রুটি-রুজি নির্ভর করত ৷ বাঁশের ব্যবসার উপর বৈষ্ণবপুর, সাব্রুম, মনুঘাট এবং আমলিঘাটের গ্রামীন অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হত ৷ যাঁরা নদীপথে এই বাঁশ পরিবহন করতেন সেইসব শ্রমিকরা দিনের পর দিন ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে খোলা আকাশের নীচে বাঁশের ভেলার উপর দিন কাটাতেন ৷ সেখানেই তাঁদের রান্নাবান্না, আহারনিদ্রা সারতে হত ৷ আশির দশকের শেষদিকে বাঁশবহনকারী শ্রমিকদের উপর উগ্রপন্থীদের চাঁদার জুলুম, দুপারের সীমান্তরক্ষীদের আর্থিক উৎকোচ গ্রহণের জন্যে  মারধর, বাঁশ ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি জোরজুলুম ও নদীর নাব্যতা কমে স্থানে স্থানে চড়া পড়ে যাওয়ার কারণে নদীপথে বাঁশ পরিবহন বন্ধ হয়ে যায় ৷ রাজ্য সরকারও রাজস্ব আদায়ের একটা উৎস থেকে বঞ্চিত হয় ৷ পাশাপাশি বন থেকে বাঁশ আহরণকারী  দরিদ্র পরিবারগুলির আয়ও প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়ায় ৷ একসময় ফেনী নদীতে লঞ্চও চলত ৷ আজ আর সেসব দেখা যায়না ৷
        এভাবেই দীর্ঘ শতাব্দী ধরে বয়ে চলা ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারা বহন করে একদিন প্রাণোচ্ছল ছিল ফেনী নদী ৷ কিন্তু কালের বিবর্তনে  আজ সেই ইতিহাস স্তিমিত  ৷ একদিন ফেনী নদীর জলে পুষ্ট তীরভূমির জমি থেকে ফসল উঠলে চাষার ঘরে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত ৷ নবান্নের উৎসবে মেতে উঠত জনপদ ৷ বেচা-কেনার তুমুল ধুম পড়ে যেত  দুপারের গঞ্জের হাটগুলোতে ৷ নৌকো বাঁধা থাকত সারি সারি নদীতীরের বাজারের ঘাটগুলোতে ৷ ছিল নানা প্রজাতির অফুরন্ত মাছের ভান্ডার ৷ একদিনের সেই রূপসী, জলচঞ্চলা ফেনী নদী আজ নিঃস্ব,  রিক্ত ৷ তার সমস্ত অতীত গৌরব হারিয়ে আজ উদার আকাশের নীচে শীর্ণ শরীর বিছিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণধারায় বয়ে চলেছে ইতিহাসের মূক সাক্ষী হয়ে ৷ অকাল বার্ধক্য গ্রাস করেছে তাকে ৷ সভ্যতার নামে মানুষের নির্বিচার
অত্যাচার, প্রকৃতির উপর আগ্রাসন আজ ফেনী নদীকে তার ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব সম্পর্কে  হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷  শুরুতে যে প্রবাদের উল্লেখ করেছিলাম তারই যেন বিপরীত প্রভাব পড়েছে ফেনী নদীর উপর ৷ ভাগের মা যেমন গঙ্গা পায়না তমনি ভাগের গঙ্গাও যেন কদর পায়না ৷ সীমান্ত নদী হওয়ার ফলে এই নদীকে দুপারের জনগণ যথেচ্ছ ব্যবহার করছে ৷ কোনো পরিকল্পনা নেই ফেনী নদীকে নিয়ে ৷ এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এই উপমহাদেশের মানচিত্র থেকে ফেনী নদী মুছে যাবে ৷ 
এতোসব দৈন্যতার মধ্যেও এক আশার আলোর সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে ৷ ত্রিপুরার সাব্রুম এবং বাংলাদেশের রামগড়ের মধ্যে ফেনী নদীর উপর তৈরি হয়েছে মৈত্রী সেতু ৷ 
৯ মার্চ ২০২১ দুপুর ১২:৩০ এ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে দুই দেশের সংযোগ সৃষ্টির নতুন দিগন্ত মৈত্রী সেতু উদ্বোধন করেন । ভারতের সাবরুম ও বাংলাদেশের রামগড়ের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী ফেনী নদীর উপর এই সেতু নির্মাণে ভারত সরকার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে । সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৯ কিলোমিটার । 
এই সেতু ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে । এর ফলে ত্রিপুরার সাব্রুম উত্তর-পূর্বের প্রবেশদ্বারে পরিণত হয়ে পড়বে । বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের একটি প্রতীকী নিদর্শন এই মৈত্রী সেতু । ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়ে এন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড ( এন এইচ আইডি সি এল ) এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তানিস আগারভাগ ইনপাকন প্রাইভেট লিমিটেড এর তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয় । ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রামগড় স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্তের পর ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী সেতু-এক নামে ফেনী নদীর উপর নির্মিত সেতুটির শিলান্যাস করেন ‌। ২০১৭ সালের ২৭শে অক্টোবর থেকে মৈত্রী সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২১ এর জানুয়ারি মাসে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয় । এই মৈত্রী সেতু উদ্বোধনের পাশাপাশি এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী সাব্রুম এর 'সুসংহত নিরীক্ষণ চৌকি'র ( আই সি পি ) ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন । ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার আইসিপি-র জন্য ৯০ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা দিয়েছেন । আইসিপি-র পরিকাঠামো নির্মানে ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে । জমি অধিগ্রহণে খরচ হবে ৯১ কোটি টাকা । পঞ্চাশ একর জমির উপর এই আইসিপি স্থাপন হবে । উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় আইসিপি হবে এটি । যাত্রীদের জন্য অত্যাধুনিক টার্মিনাল, থাকার জায়গা, পণ্য লোডিং-আনলোডিং এর সুবিধা, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সহ সমস্ত আধুনিক সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে এখানে । ইতোমধ‍্যে জমি অধিগ্রহণ হয়ে গেছে । মৈত্রীসেতুসংলগ্ন ভারতীয় ভূখন্ড পুরো নবীন পাড়া এবং ঠাকুরটিলার বহু বছরের প্রাচীন বাসিন্দারা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তাঁদের বাস্তুভূমি । দেশভাগের পর বাস্তুহারা হয়ে যারা একদিন এপারে এসে নবীনপাড়ায় নবীন বসতি গড়ে তুলেছিলেন এই প্রজন্মের পূর্বজরা । মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম ওপারের শরণার্থীদের ভাই বলে টেনে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজেদের বাসস্থানে তাঁরাই । আজ আর এক বৃহতের ডাকে সাড়া দিয়ে মৈত্রীর বন্ধনকে স্বাগত জানিয়ে চলে যাচ্ছেন আর এক নবীন পাড়ার উদ্দেশ‍্যে । তুলসিতলায় শেষবারের মতো প্রদীপটি জ্বালিয়ে, গলবস্ত্র হয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির চিতামঠে শেষ প্রণামটি সেরে অশ্রুসজল চোখে বাড়ির সদরদরজা পেরিয়ে চলে যাচ্ছেন সেদিনের কনেবৌ আজকের পরিণত গৃহিনীটি । পরবর্তী প্রজন্মের সুখ ও শান্তিই আজ তার মূল আশা । আজ একেবারে নির্জন হয়ে গেলেও এই জনপদ আবার একদিন কর্মচঞ্চল, কোলাহলমুখর হয়ে উঠবে । আবার জাগবে জীবন । এই আঁধারের শেষে ।

অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে এর নির্মান কাজ ৷ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সেতুর উপর দিয়ে দুই দেশের সংযোগ সাধিত হবে ৷ প্রকল্প রয়েছে এই সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের দ্বার উন্মোচনের ৷ তাতে হয়তো ফেনীর তীরবর্তী এই অঞ্চল আবার প্রণবন্ত হয়ে উঠবে ৷ তাতে কী ফেনী নদীর এই শরসয্যার মুক্তি ঘটবে?  আদৌ নয় ৷ এখনও সময় আছে ৷ সেতু নির্মানের পাশাপাশিযদি যথাযথপরিকল্পনার মাধ্যমে যদি নদীর ভরাট বালি অপসারণের মাধ্যমে   নাব্যতা ফিরিয়ে আনা যায়, যদি সীমান্ত নদী দিয়ে পণ্য পরিবহন করা যায় ৷ সেইসঙ্গে যদি এই নদীপথে প্রমোদভ্রমণের বা ভারত ও বাংলাদেশে ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত এনে সেখান থেকে নদীপথে অভ্যন্তরভাগে প্রেরণ করা যায় তাহলে মৃতপ্রায় ফেনী আবার জেগে উঠবে ৷ নিজের বুক পেতে দেবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি সমন্বয়ের লক্ষ্যে ৷ রূপায়িত হবে আগামী ইতিহাস ৷ তার জন্যেই ফেনী ‘নদীর জলে থাকি রে কান পেতে/কাঁপে রে প্রাণ পাতার মর্মরেতে' ৷ 
                          —-—————--——--0———————

সহায়ক গ্রন্থ ও অন্যান্য তথ্যপঞ্জী

১.শ্রীরাজমালা (ধন্যমাণিক্য খন্ড) —শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর

২.রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস—কৈলাসচন্দ্র সিংহ

৩.রাজরত্নাকরম— অজ্ঞাত
৪. বৃহৎ বঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সেন ।

৫..ত্রিপুরার ইতিহাস—ড.জগদীশ গণচৌধুরী

৬.চট্টগ্রামের ইতিহাস—আহমদ শরীফ

৭.নোয়াখালির মাটি ও মানুষ—ড. দীনেশচন্দ্র সিংহ

৮.রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম—ড. রঞ্জিত দে

৯.গাজিনামা—শেখ মনুহর গাজি

১০.আরণ্য জনপদে—আবদুস সাত্তার

১১.ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন

১২.ত্রিপুরার মগজাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন

১৩.চট্টগ্রামের ইতিহাস—উইকিপিডিয়া

১৪.নোয়াখালি জেলা—উইকিপিডিয়া

১৫.মীরসরাই উপজেলার পটভূমি—চট্টগ্রাম জেলা
     ( mirsharai.chittagong.gov.bd>site )
১৬. গাজীনামা – শেখ মনোহর
১৭. রাজমালা – ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী
১৮. রাজমালা – কৈলাশচন্দ্র সিংহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ