সমীর রায়চৌধুরী স্মরণ সংখ্যা

সমীর রায়চৌধুরী স্মরণ সংখ্যা

এই সংখ্যায় যা যা আছে


ক.সমীর রায়চৌধুরীর ঝুরগল্প
খ.সমীর রায়চৌধুরীর অধুনান্তিক গল্প: 
গ.সমীর রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন 'উল্কা'
ঘ.সমীর রায়চৌধুরীর সাহিত্য মূল্যায়ঙ
★রবীন্দ্র গুহ
★মলয় রায়চৌধুরী
★প্রদীপ চক্রবর্তী
★অর্ক চট্টোপাধ্যায়
★বাসব রায়
★অমিতাভ গ্রহরাজ
★অলোক গোস্বামী
ঙ.একগুচ্ছ কবিতা
চ.সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা চিঠিপত্র 
ছ.সমীর রায়চৌধুরীর লেখা চিঠিপত্র
জ.প্রথম কাব্যগ্রন্হ "ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি"-র পাণ্ডুলিপি
ঝ.সমীর রায়চৌধুরী -কে নিয়ে স্মৃতিচারণ:মলয় রায়চৌধুরী 
--------------------------------------------------------
সমীর রায়চৌধুরীর "ঝুরোগল্প"

আমি ও সমীর 

আমি – সমীর, তুই আমার কে
সমীর – ছায়া
আমি – যখন আমার ছায়া নেই
সমীর – মায়া
আমি – সবর্ত্র বিরাজমান চেতনা আমিও
সমীর – আমি তার পরিচিত
আমি – তোর আড়ালে আমার স্বরূপ গোপন, তুই মিথ্যা
সমীর – তুই ব্রহ্ম তাই গোপন, আমি প্রকাশ্য তাই মায়া
আমি – আমি সবর্ত্র বিরাজমান চেতনায় সম্পৃক্ত
সমীর – ব্রহ্ম পৃথক নয় আমিও পৃথক নই, তোর সংলগ্ন, তুই উইকেট আগলে বল ফেস করছিস, আমি রানার, তুই হয়ে রান তুলছি
আমি – আমি ঋত
সমীর – তুই আর আমি মিলে সত্যানৃত
আমি – তুই ঋতত্ব খর্‌ব করছিস
সমীর – ওটাই আমার খেলা, তুই আর আমি মিলে তবেই কোয়ান্টাম ব্রহ্মাণ্ড
আমি – তুই আমার মাথার ওপর বসে থাকা ফিঙে, তুই বহিরাগত
সমীর – তুই যখন ঘুমিয়ে পড়িস আমি তোর স্বপ্ন হয় জেগে থাকি
আমি – আমি কবিত্ব
সমীর – আমি তার টাইটেল
আমি – আমি মরে গেলে তুই কি করবি
সমীর – আমার মৃত্যু নেই, আমি তোর ভূত ও অমরত্ব
আমি – ব্রহ্ম সত্য জগৎ সত্য 
সমীর – তা বলতে পারিস। তবে মিথ্যাই রহস্যময়। সত্য মিথ্যা নিয়েই তোর শিল্পসাহিত্য। ধর্ম খেলাধূলা ভাষা চাষবাস শিল্পসাহিত্য ম্যাজিক (যার বিবর্ধিত রূপ বিজ্ঞান) এই ষড়ত্ব।
আমি – ইন্দ্রজাল, গ্রেট এ্যাবাউট টার্ন
সমীর – সমীর শব্দের সঙ্গে তোর মূল অস্তিত্বের কোনো যোগ নেই, তবু ‘সমীর’কে অর্থবহ করে তুলতে হবে তোকে। 
আমি – তুই তাহলে কি আমারি চিহ্ন বিস্তার
সমীর – আমি তোর উশনা
আমি – আমার ডি এন এতে তুই নেই
সমীর – না তা মানছি, তবে আমি না হলে তুই অচল স্রেফ ঠুঁটো জগন্নাথ
আমি – তাই তো ছাপ্পান্ন ভোগের রন্ধনশালা 
সমীর – দারুময়, কাষ্ঠবৎ
আমি – পরাকাষ্ঠা
সমীর – আমি না হলে তুই নিরুপায়
আমি – তাহলে আমি মরলে তুই আমাকে বহন করবি
সমীর – হ্যাঁ তা ঠিক, তবে সেই সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য রচনার দায় তোর 
আমি – আজন্ম চুক্তি
সমীর – সভ্যতা বিস্তার, আমি আর তুই জগতের কাছে অভেদ্য
আমি – আমার একাকীত্বে তোর প্রয়োজন নেই 
সমীর – তোর সবর্জনীনতায় আমি অপরিহার্‍য
আমি – তুই আমার সম্বোধন
সমীর – মানুষ নিজেকে ছাড়া সব কিছুর মানবিকীকরণ করেছে নামকরণের মাধ্যমে।  তার নিজ নিজ নামগুলি ব্যতিক্রম
আমি – আমার পোষা বিড়ালের নাম আছে
সমীর – অবশেষ বিড়ালের নাম নেই, সে ঝাঁক হয়ে পরিচিত মার্জার, কার্‍যকারণে সীমায়িত
আমি – তুইও আমার মৃজ্‌, একটু বাড়িয়ে বললে উশনা

আশ্চর্য প্রদীপ 

“ভোর না হতেই হঠাৎ অরবিন্দর ফোন :
পেয়ে গেছি... ঘরের ঠিক বাইরে কার্নিশে মস্ত মৌমাছির চাক। দুটো স্ট্র যোগ করে পৌঁছে গেছি মৌমাছিদের মধুভান্ডে... টানছি... আমার ঠোঁট দুটো কাঁপছে মৌমাছিদের গুঞ্জনের স্পন্দনে... মিষ্টতার নির্ভেজাল স্বাদ... ফুলে ফুলে ওরা ছড়িয়ে দিয়েছে আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি... শব্দব্রক্ষ্মের বিজিবি ধ্বনিবার্তা... নিষিক্ত হওয়ার অর্গাজম... সেও তো গুঞ্জন স্পন্দন... চার মাত্রার ছকের মায়ানাচ...

মনে আছে নিশ্চয়ই, সূর্যের মাঝখানে জ্বলন্ত পিন্ড... তার তেজ বা তেজস্ক্রিয়া   চারপাশের ফোটোস্ফিয়ারে পৌছায় হাজার হাজার বছরে, অথচ সেখান থেকে পৃথিবীতে পৌঁছায় মাত্র আট পয়েন্ট থ্রি সেকেন্ডে...

সূর্যের বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই জানি... জানি কণা সংসারের জন্মলগ্ন ওই সূর্যে... আর কণা থেকেই তো আমরা পেয়েছি বর্ণমালা... 

পিন্ডকে আমরা বলতে পারি কোর এরিয়া, যেখানে হাইড্রোজেন জ্বলছে... আর বেরিয়ে আসছে প্রোটন... অথচ নিউট্রন সেখানে অনুপস্থিত... আর ফোটন কণা থেকেই তো বেরিয়ে আসছে ইলেকট্রন...

সমীরদা, আরও অনেক কথা আছে কণা সংসারের, সে বিষয়ে আপনিও অনেক কিছু জানেন... কাল ভোরে আবার সে সব নিয়ে কথা হবে...”

চন্দ্রমুখী হোমিও 

বন্ধুমহলে সোমেনের পরিচয় ডাক্তারবাবু। সারাক্ষণ হোমিওপ্যাথির বই নিয়ে পড়াশোনা করে। আর হোমিওপ্যাথি ওষুধের নামের মধ্যে আশ্চর্য সব ঝুরোগল্প লুকিয়ে আছে। আজ সকালেই সোমেন আমার কাছে যখন এসেছিল, কথায় কথায় সোমেনকে এই ব্যাপারটা নিয়ে উস্‌কে দিলাম। যে যে-লাইনে আছে, তার প্রাণের কথায় সেখানেই যাদুবাস্তবতা।
--আচ্ছা সোমেন, মানুষের যত অসুখ হয়, তার পরিত্যক্ত বা বর্জন থেকে নিয়ে কোনো ওষুধ আছে কি? এই ধরো যেমন মল পুঁজ থুতু এসব নিয়ে ওষুধ?                                                             সোমেনের মুখ মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।                                                                        --হ্যাঁ, আছে তো! যেমন যক্ষা রোগীর পুঁজ থেকে একটা ওষুধ আছে, নাম টিউবারকুলিয়াম।                
--তা দিয়ে কী হয়? কোন্‌ রোগ সারে?                                                                           --এই ধরুন মানুষের পছন্দ, পছন্দও তো একটা রোগ! ধরুন কোনো একজন মানুষের স্ত্রী বেড়াল পুষতে পছন্দ করে, কিন্তু তার স্বামী পছন্দ করে না। কিংবা ধরুন তার উল্টোটাও হতে পারে, স্বামী পছন্দ করে, কিন্তু তার স্ত্রী পছন্দ করে না।                                                                                                   --অর্থাৎ তুমি বলতে চাও, আখ্যানের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে পারে যক্ষা রোগীর পুঁজ!                        
--হ্যাঁ, তা তো হতেই পারে। যেমন ঘরে তোলা পুঁজি আর ফেলে দেওয়া পুঁজ।                                --হোমিওপ্যাথি তো জানে ইকোনমি। অতএব প্রয়োজন শুধু মিলিয়ন ডোজ।                                   --যেমন যে বেড়াল পছন্দ করে, মিলিয়ন ডোজ পড়লে তার পছন্দ বদলে যাবে। সে তখন হয়তো বেড়ালের জায়গায় কুকুর পুষতে চাইবে।                                                                                   --ধরো যদি শরৎচন্দ্রকে খাইয়ে দেওয়া যেত মিলিয়ন ডোজ, কিংবা যদি মিলিয়ন ডোজ খাইয়ে দেওয়া হতো দেবদাসকে, তাহলে কী হতো?                                                                কিছুটা ভাবতে সময় নিল সোমেন। তারপর বলল -- আমার মনে হয়, তাহলে দেবদাস আর পারুর বাড়িতে যেত না। কষ্ট করে তাকে রক্তবমিও করতে হতো না। আসলে রক্তবমি করার নাটকীয়তার প্রয়োজনই হতো না।                                                                                    --তাই! আর দেবদাস তাহলে কার নায়ক হতো?                                                        সোমেন আবার কিছুটা ভাবতে সময় নিল। তারপর ডাক্তারবাবুর মতো গম্ভীর গলায় বলল -- তখন দেবদাস হতো শুধুই চন্দ্রমুখীর...    

ডগমগপুর 

হাংরি মামলায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল। তিনি সেই সাক্ষ্যে বলেছিলেন, তিনি একবার মাত্র হাংরি বুলেটিনে লিখেছেন, আমন্ত্রিত লেখক হিসেবে।  কিন্তু আমার কাছে ফাইলের স্তূপের মধ্যে আমি খুঁজে পেলাম যে, সন্দীপন হাংরি  বুলেটিনে  লেখার জন্যে দেবী রায় অর্থাৎ হারাধনবাবুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভরে অনুনয় বিনয় করেছেন। হাংরি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই চিঠিটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। চিঠিটির পাঠ এইরকম : 
প্রিয় হারাধনবাবু, হাংগ্রি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম। প্লট, কনটেন্ট, ক্রাফট এসব বিষয়ে ডেফিনেশন চেয়েছেন। আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনেশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখবো। প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন।
১) ছাপলে সবকটি একসঙ্গে ছাপতে হবে – নইলে খাপছাড়া লাগবে।
২) শেষের তারিখটা রাখবেন।(লিখে, কেটে দিয়েছেন)
৩) ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে, দরকার মনে করলে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন।
‘অমৃত’তে আমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, দেখেছেন? নইলে পাবলিশারের কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যবস্থা করলে খুশি হই। ঐ বিজ্ঞাপনটাই ‘দেশ’এ বেরুবার কথা আছে – যদি বেরোয়, তার প্রুফটা কাইন্ডলি দেখে দেবেন। ‘আনন্দবাজার’এ লেখকদের কোনো বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি? তাহলে তারও একটা  কাটিং পাঠাবেন। 
সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাবো। আরও একমাস থাকবো বা ততোধিক। সহজে যাব না। শরীর ভালো। ছোটগল্পের আবার লেখা দিতে পারলাম না, সম্ভব হলে ক্ষমা করবেন। ভালোবাসা নিন।

সুনীলবাবুকে (হাজরা) প্রীতি জানাচ্ছি।
 ইতি --  

ডগমগপুর / ২৬-১১-১৯৬২ 
 সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

* হাংগ্রি জেনারেশনের একটা সিম্বল করবেন বলেছিলেন। কী হলো? পাঁচ নঃ পঃ করতে পারেন। 
* কমাগুলো ভেবেচিন্তে দিয়েছি, ঐগুলোই আসল জিনিস, যেন থাকে।
* শেষের তারিখটা যেখানে আছে, ওখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন।
* ‘অভিযান’ ‘পূরবী’তে হয়েছিল তো?
 
চিঠির বাঁদিকে মার্জিনের পাশে লিখেছেন : 
আগামী সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাবো। তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাংলো, রুম নম্বর ৫, Tikore, চূনার, মির্জাপুর – এই ঠিকানায় চিঠি দেবেন। ‘আক্রমন’ বানানটা কি – ‘ন’ না ‘ণ’? 
পুনশ্চ : লেখাটা প্রকাশ হবার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে। অনেক বাদ দিয়ে খুব নরম করে সব দিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই। 
(নোট : এই চিঠির সঙ্গে দশটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন। একটি কবিতা নিচে রাখা হলো।) 

বেশ্যা 

“বেশ্যার ঘরে আয়না থাকবেই, দেওয়াল-জোড়া আয়না, ছোট বড়, নানা সাইজের  দামি বা সস্তা আয়না, একেকটা কারুকার্য করা। খাদ্যদ্রব্য কদাচিৎ দেখেছি, তবে বাসন থাকে। কাচের, কলাইয়ের, কাঁসা ও পিতলের বাসন। বেশ্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কটি তথ্য এই হতে পারে যে, ১) সে উপহার পেতে ভালোবাসে ২) তার soul আছে ৩) তার লজ্জাহীনতা সত্যের মতো ৪) সে মৌলিক নির্বোধ ৫) সামনে কোনো সময় নেই, এমন মানুষ যদি ভাবা যায়, সে সেইরকম। 
তার সম্পর্কে একটি কথাই গভীরতর ভাবে ভেবে জানার। তার শরীর যখন একজন ভোগ করে, কী মানসিক অবস্থায় সে থাকে! লোক এলে সে সুখী হয়, বিরক্ত হয়,   ঘৃণাও করে। লোককে হিংসা সে কখনও করে না। যখন লোক তাকে উলঙ্গ করে, সে বিরক্ত হয়; একবার উলঙ্গ হলে স্বস্তি বোধ করে, আর তার সহজ লাগে। কিন্তু  বেশির ভাগ লোক একসঙ্গে উলঙ্গ হয় না, আলো নেভার আগে অন্তত আন্ডারওয়ার বা গেঞ্জি পরে থাকে। তার নগ্নতা সে দেখে, তাকে দেখতে দেয় না। তারপর কতকগুলি নিয়মকানুন তারা মানে, বেশ্যারা, সে সময় শয়তান তাদের সাহায্য করে  বা ঈশ্বর, সে জন্য তারা কদাচিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়”।

(নোট : এরপর আর এক প্যারাগ্রাফ তিনি লিখেছেন এবং কেটে দিয়েছেন, তাই তা আর উদ্ধৃত করা যাচ্ছে না।)     
এমনই ছিলেন আমার প্রিয়বন্ধু প্রয়াত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। 

ধ্বনিজন্মে আত্মীয়সভায় 

পাবলোর সঙ্গে পরিচয়ের পর ধ্বনিদখলের খেলা কিছুটা বুঝতে পেরেছি। পাবলো প্রথমেই জানতে চেয়েছিল, আমি কি হাঙরের প্রজনন ঋতুর গান শুনেছি? আমি তো এসবই শুনে বেড়াই। যেমন প্রত্যেক বছর কখনো হেমন্তের কখনো মান্না  দে’র পুজো সংখ্যার রেকর্ড কিনতাম। এবার যেমন কবীর সুমনের গানের  সিডি কিনেছি। আর  ‘ক্ষেপচুরিয়াস’ ব্লগে প্রত্যেক কবির নতুন নতুন শব্দে তার  ধ্বনি অহং জেনেছি।

ক্যানারি দ্বীপের গায়ক পাখি(ল্যায়ার বার্ড) প্রত্যেক প্রজনন ঋতুতে সঙ্গমের অধিকার পাওয়ার জন্য তার সঙ্গিনীকে নতুন গান শোনায়। তার নতুন গান মানে নতুন শব্দ। বহুদিন মানুষের মতো তারাও ঋতু মানে প্রকৃতির ঋতু শুধু বুঝত। আর বর্ষার গান শীতের গান হেমন্তের গান বসন্তের গান শুধু গাইত। নতুন প্রজন্মের সঙ্গিনীদের আর এই বস্তাপচা গান ভালো লাগে না। তারা চায় আরও নতুন অণ্বেষণ আরও নতুন শব্দ। যে দিতে পারবে সেই পাবে পিতৃত্বের  অধিকার। 

পাবলোর কাছেই প্রথম শুনি হাইওয়ে সাউণ্ডের কথা। ওঁর সঙ্গে এক বাঙালি ছোকরাকে দেখেছিলাম, তার নাম সমীর। ল্যায়ার ফার্মি ল্যায়ার বোসনের জন্য  নতুন গান বাঁধে। এবারে সে হাইওয়ে সাউণ্ড খুঁজে পেয়েছে। সে সারাদিন দেখে, তীব্র গতিতে নানা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে হাইওয়ে দিয়ে। সেই গাড়ির শব্দের স্বর সে তার গলায় তুলে নিয়েছে। আর এবার তবে মারকেল্লা! পাবলো বলেছিলেন, মন দিয়ে শোনো, এর কাছাকাছি আর কোনো পুরুষ পাখি ঘেঁষতে পারবে না।  ল্যায়ার বোসন মন দিয়ে শোনে, কেননা তার এমন শব্দ চাই, যা দিয়ে সে বুঝতে পারে যে, ল্যায়ার ফার্মি নিরাপত্তাকে কতটা চিনেছে। ল্যায়ার ফার্মির  অহং মানুষের মতো অহঙ্কার নয়। 

একী! ফার্মির গলায় এ কোন্‌ শব্দ? ল্যায়ার বোসনও শুনেছিল, কিন্তু ততটা গুরুত্ব দেয়নি। এতো হাইওয়েতে স্পিড লিমিট কম করা, আগের গাড়িটায় যাতে  ধাক্কা না লাগে, তাই পেছনের হাই স্পিড লিমিট গাড়িটায় ব্রেক কষার শব্দ। আর ব্রেক কষার শব্দ তো নিরাপত্তার নতুন আইডেনটিটি! সেই স্বরটাই তুলে  নিয়েছে ফার্মি। 

নিরাপত্তাকে এভাবে, এত গভীরভাবে চিনতে পেরেছে বলে বোসন আর ফার্মি  এবার নাচতে নাচতে সঙ্গমে মিলিত হয়। 

প্রতিদ্বন্দ্বী 

বনগাঁর জয়ন্ত আর উরুগুয়ের ফেদেরিকো অনলাইনে তাস খেলছে। বনগাঁর আকাশে যখন চাঁদ, ফেদেরিকোর নাগালে তখন সূর্য। খেলতে খেলতে পিঠ কুড়োচ্ছে। একই স্পেসে আলাদা সময়।
জয়ন্ত আয়নায় মুখ দেখে নিচ্ছে। ওর চোখের কোণে কালি। রাত জাগার চিহ্ন। ফেদেরিকো ফ্রেশ। দিন এখনও বাকি।
এই রাউন্ডে জয়ন্ত জিতেছে। পরের রাউন্ডের চয়েস ওর হাতে। মাঝে একদিন ফাঁকা, ভেবে নিচ্ছে...
--তোরা কী খেলা খেলছিস্‌, এই খেলার উদ্দেশ্য কী, -- প্রশ্ন করে অলোক। 
:  ব্রিজ, সেতু বন্ধনের খেলা, বলতে পারিস্‌ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা  
--ফেদেরিকো কি তোর প্রতিদ্বন্দ্বী?
: মহড়া, ফ্রেন্ডলি খেলায় মক্‌শ করছি টুর্নামেন্টের আগে
--তাহলে তো আটটা টেবিলে চারজন মিলে লাগাতার খেলতিস্‌ নিয়ম মতো 
: উত্তর জাপান আর দক্ষিণ ফকল্যান্ডকে নিয়ে!
--হ্যাঁ
: না, আমরা দুজনে খেলে বরং বুঝতে পারছি, খেলার উদ্দেশ্য এতো সোজা নয়...
--কেন?
: আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমারই আগের অবস্থান ও কীর্তি... আমারই বিগত কাল... 
--তাহলে ফেদেরিকো নিমিত্ত মাত্র! 
: বলতে পারিস, প্রতিদ্বন্দ্বী শেষমেশ সে নিজে, তার অতীতের সে... 

 
প্রস্রবণ 

চাইবাসায় ফিরে যাব। দু’দিন হয়ে গেল। শক্তি আর আমার ভালো লাগছে না। সোনুয়া থেকে রওয়ানা হবার সময় ফরেস্টার কুতুদাকে পেয়ে গেলাম। তিনি জঙ্গলের ভেতরের পথঘাট ভালো ভাবে চেনেন। লালমাটির রাস্তা। তবে পাকারাস্তা দিয়ে ফেরার চেয়ে অনেক কম সময় লাগে। জঙ্গল আর জঙ্গলের জীবনকে আরও কাছ থেকে জানা যায়। আমাদের জিপে তিনি উঠে গেলেন। তাঁর সাইকেলটিও গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো। ড্রাইভার ছাড়া খালাসীও রয়েছে।

আমাদের রুটে যেসব গ্রাম পড়বে, তার নামগুলো কুতুদা পরপর লিখে দিলেন। শক্তি  জেনে নিল কোথায় ভালো মহুয়া বা রসম্‌ পাওয়া যায়। গাড়ি রওয়ানা দিল। আমার স্বভাবমতো আমি কিছু লজেন্স সঙ্গে নিয়েছি। ওয়াটার বটলে জল আছে। পথে একুশটা গ্রাম। গ্রামগুলোতে মানুষ ঘনিষ্ঠ হয়ে পাশাপাশি ঘর বানিয়ে থাকে। কেননা, জল যেখানে পাওয়া যায়, সেখানেই মানুষ ভিড় করে। ফরেস্টার বললেন, এই অঞ্চলে প্রচুর প্রস্রবণ রয়েছে। বনবিভাগ সেগুলো দেখাশোনা করে। বেশিরভাগ প্রস্রবণ অর্জুন গাছের শিকড়ের জায়গা থেকে বেরিয়েছে। সকালের দিকেই প্রচুর জল পাওয়া যায়। তারপর বেলা যত বাড়ে, জল কমে যায়। অনেকটা কর্পোরেশনের টাইম কলের মতো।

পাঁচ ছ’টা গ্রাম পেরোনোর পর কুতুদা নেমে গেলেন। ড্রাইভার এবং আমাকে পরিষ্কার করে রুটচার্ট বুঝিয়ে দিলেন। ড্রাইভার অবশ্য বলল, “পুরানা সাহেবকো লেকর হম ইস রাস্তা সে লৌটে”। শক্তি আমার দিকে চেয়ে বলল, “আমাদের গায়ে প্রচুর  লালধুলো  জমেছে। তোয়ালেটা দিয়ে ভালো করে ঝেড়ে দে”। আমাদের দুজনের  চোখেই চশমা, এই একটা সুবিধে।

এই রুটের শেষ গ্রামটা আমার আর শক্তির চেনা। সেখানকার অনেক লোকজন আমাদের চেনে। কাছাকাছি ওরা সরকারী স্কিমে মাটি কাটার কাজ করে। শক্তি ইতিমধ্যে তার মহুয়া পেয়ে গেছে। গ্রামগুলো দেখতে দেখতে যেতে আমাদের ভালো লাগছে। প্রত্যেক গ্রামে একটা বা দুটো প্রস্রবণ। প্রস্রবণের জায়গাটা ছায়ায় ঘেরা। জলও তাই ঠান্ডা থাকে। 

শেষ গ্রামটার নাম তোন্তো। তার খুব কাছাকাছি পাকারাস্তা। পথে আমরা বেশ খানিকটা মাছ কিনলাম। প্রথমে আমরা গেলাম চাইবাসার মধুটোলার বাড়িতে। ওরা কিছুটা মাছ আমাদের ভেজে দিলেন। কথা বলার সময় শক্তি খুব দূরত্ব রাখছে। কেননা, ইতিমধ্যে খানিকটা মহুয়া তার পেটে গেছে। শক্তি এখন নিজেই এক অন্তঃপ্রস্রবণ। ওর কথাগুলোও এখন কবিতার ভাষায়। জল দিয়ে ভালো করে চোখমুখ ধুয়ে নিল। 

নিমডি যাওয়ার পথে আমরা একটা বড় পাউরুটি কিনলাম। আমি শক্তিকে বললাম, “সময়টা দেখতে দেখতে কেটে গেল। আমরা নিমডির বাড়িতেও ফিরে এলাম”। শক্তি    বলল, “সেদিন সেই যে লিখলাম না -- ‘দিন চলে যায় কালের পাতায়’ -- কিন্তু  আজ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসার সময় মনে হলো -- ‘দিন চলে যায় শালের পাতায়’... 

বহুতল 

অন্নপ্রাশনের সময় ‘স’ উঠল। ‘স’ থেকে ছোটকাকা বললেন সমীর হোক। অক্ষরে  জন্ম আমার শব্দ হলো সেদিন। রাশিনাম। মা বলেন, “রাশিনাম গোপন রাখতে হয়”।   ছোটকাকা মানতে রাজি নন। “রহস্যটা না বলেই হলো”। বড়দি বললেন, “কই?  আমার তো অন্নপ্রাশন হয়নি! মেয়েদের কেন হতে নেই? মেয়েদের কি অক্ষর ওঠে  না?” ছোটকাকা বললেন, “জেনে রাখ, বাংলা ভাষার সব অক্ষর পুরুষবাচক। ইনি-প্রত্যয় যোগ করলে স্ত্রীরূপ পাবি”। বামুন পরিবারের পুরুতমশাই বললেন, “শাস্ত্রের   নিদান”। তিনি জ্যেঠিমাকে বললেন, “আপনি তো সব জানেন। অনুষ্ঠানে নিষেধ নেই।  নিমন্ত্রণ খাওয়া দাওয়া আশীবার্দ নেওয়া সবই যেমন কে তেমন হবে। শুধু অক্ষর উঠবে না”। বড়দির দিকে মুখ করে বললেন... “তবে প্রত্যয়ে তুমিও শব্দ হবে... মায়ের জাত। এসব অনুষ্ঠান তো ভাষা শিক্ষার!”  

এসব কাহিনী আমার সম্পর্কে হলেও আমার রচনা নয়, মায়ের... মায়ের মুখে  বারবার শুনে মায়ে-পোয়ে। ছোটবেলায় যখন মায়ের কোল পুরোপুরি ছাড়িনি, হাঁটতে শিখেছি, আর একটু হেঁটেই বলতাম ‘কোলে করো’, সেই বয়সে যখন যার বাড়িতে  গিয়ে মায়ের মতো আদর ভালোবাসা পেয়েছি, তখন তাকেই ডেকেছি ‘মা’ বলে। আর  আসার সময়ে বলে এসেছি, “দুটো... তিনটে... হলো”। বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, শব্দের  এলাকা সম্প্রসারিত হচ্ছে বোধে অবোধে... সেই প্রথম ভাবনায় অগোচরে রহস্যের জন্ম ঘটেছে। মা’র কোল থেকে নেমেছি।

পরে দেখি পরিযায়ী পাখি... বদলির চাকরি... পরকীয়া প্রেম... পুণার বৌদি... ধানবাদের বৃষ্টি... সবই বাড়িঘর, ভিটেমাটির বাড় বাড়ন্তের সেই দুটো... তিনটে, এভাবে কতো যে বেড়েছে... রাশিচক্র থেকে ভ-চক্রে ঢুকেছি, ভূ... ভূত... ভদন্তে... ভান্তে রহস্যে ঢুকে পড়া। 

একদিন চাইবাসার নিমডি পাড়ার প্রতিবেশী মেয়ে মনোরমা এলো। একসময়ে আমার  বাড়ন্ত প্রেমের বাড়ন্ত বাড়ি... আশ্রয়... এবার দেখি সিঁথিতে সিঁদুর, বেশ গিন্নিবান্নি কথাবার্তা। ঢোকার মুখে ছেলেমেয়েদের জুতো দেখে বলল, “দ্যাখো তোমার ছেলেমেয়ের  এখন বাড়ন্ত বয়স, প্রতিদিন জুতো কিনতে হয়। তা কাপড়ের জুতো কিনবে, যেমন কেডস্‌, বড়টার ছোট হয়ে গেলে ছোটটাকে পরাবে”। 

যে ছিল আশ্রয়... সে এবারে সাশ্রয় শেখাতে এসেছে...। তারপর শিলিগুড়ির শ্বশুরবাড়ির গল্প বলল... বরকে নিয়ে আলাদা হয়েছে... খানিকটা জমি কিনেছে... বাড়ির খিড়কি দোরের দিকে বাগান করেছে...
 
শেফালির শুনে ভালো লাগল না, মা মুচকি হাসলেন, কেননা মা আমাকে প্রথম প্রথম  মনোরমার বাড়ি নিয়ে গেছিলেন। তারপর শেফালিদের বাড়িতে। এখনও মনোরমা প্রায়  আসে... কোথায় শিলিগুড়ি... কোথায় বারাসাত... আর কোথায় চাইবাসা...! সেবার  যাবার সময়ে যখন বলল, ‘চলি’, দেখলাম তার বয়স্ক চোখেমুখে এখনো প্রশ্রয় মুছে  যায়নি...
মাঝে মাঝে সে আসে ফেলে যাওয়া বাড়িটার রঙ ফেরাতে... 

বাদামতলার ভুবন 

...কেউ কেউ বলেন, এ জি বেঙ্গলের ভুবন। আবার কেউ কেউ বলেন, নন্দীগ্রামের ভুবন। শেষপর্যন্ত বাদামতলায় তিনি যে জমিটা কিনেছিলেন, তার একদিক দিয়ে  হাই-টেনশন বিদ্যুতের তার চলে গিয়েছিল বলে, ওই জমিটা কেউ কিনছিল না। শেষে ভুবনই কিনলেন।
   
ভুবন গল্প বলেন। গান শোনেন। কবিতা আওড়ান। সারক্ষণ মুখে মুখে কবিতা তৈরি  করেন। তাঁর দুই মেয়ে হবার পর দেখা গেল, কিছুতেই আর ছেলেপুলে হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এক বড় গাইনিকের শরণাপন্ন হলেন। অনেক পরীক্ষার পর ধরা পড়ল, ভুবনের স্পার্মে ক্যানসার হয়েছে। ডানদিক ও বাঁদিকের দুটো আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করে দেখা গেল, বাঁদিকের বিচিতেই তার এই রোগ হয়েছে।
 
ভুবন এখানে এসে থামেন। কেননা, গাইনিক তাঁকে বলেছিলেন, বিচির একটা ভালো বাংলা প্রতিশব্দ আছে -- ‘বৃষণ’। সেই থেকে ভুবনও তাঁর গল্পে বৃষণ শব্দটি ব্যবহার  করতেন।
  
ভুবনের ফার্স্ট স্টেজ আর বড় চাকরি, গাইনিকরা তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন টাটা ক্যানসার ইনস্টিটিউটে, পরবর্তী চিকিৎসা ও নিরাময়ের জন্য। ট্রেনে সারা রাস্তা গান গাইতে গাইতে গেলেন ভুবন। যেন কিছুই হয়নি। তারপর হাসপাতালে পৌঁছে দেখলেন, তাঁর ডাক্তার একজন পুরুষ, কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে রয়েছেন প্রচুর সুন্দরী  নার্স। তাঁরা অধিকাংশই মহারাষ্ট্র ও কেরলের মেয়ে। তবে একজন বাঙালিও ছিলেন। তিনি ভুবনের গানগুলো অনুবাদ করে অন্যদের বলে দিতেন।
 
ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, আপনাকে একটা বৃষণের মোহ ছাড়তে হবে ভুবনবাবু। ভুবন বললেন, আপনারা যা ভালো বুঝবেন, তাই করবেন। অপারেশন থিয়েটারেও গান গাইতে গাইতেই অ্যানেস্থেশিয়ার কারণে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। 

ঘুম যখন ভাঙল, যিনি প্রধান নার্স, তিনি বললেন, আপনার অপারেশন সাকসেসফুল, চিন্তা করবেন না! বিভিন্ন বিভাগ থেকে অন্যান্য ডাক্তাররা এসেও ভুবনকে দেখে নিজের নিজের মন্তব্য মেডিক্যাল চার্টে লিখে রাখলেন। যিনি গাছ গাছড়ার স্টেরয়েড নিয়ে কাজ করছেন, তিনি এসে বললেন, আপনি ফিরে গিয়ে নিয়মিত কাঁচা হলুদ আর আখের গুড় খাবেন। ঠিক কতটা খেতে হবে, তিনি তাঁর প্রেসক্রিপসনে লিখে দিলেন। আর যিনি প্রধান গাইনিক, তিনিও তাঁর ওষুধ লিখে দিলেন।

দশদিন পর ভুবন ছাড়া পেলেন হাসপাতাল থেকে। ইতিমধ্যে ভাবতে ভাবতে ভাবতে ভুবন মনে মনে তাঁর মনের মতো একটি কবিতাও সৃষ্টি করে ফেলেছেন। কবিতার শেষ দুটি লাইন -- “একটি আমার নিঃস্ব / আরেকটিতে সারা বিশ্ব”। 
 
ভুবনের চিকিৎসার যে ফলাফল, অর্থাৎ দুটি বৃষণের মধ্যে একটির বাদ যাওয়া এবং একটির থেকে যাওয়া, যেন মহাজগৎকথার সঙ্গে ভুবনের অস্তিত্বের মিলেমিশে যাওয়া!  

সম্রাট আকবর ও এ্যালেন গীনসবার্গ 

ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোথায় যে নিয়ে চলেছে ঘোড়সওয়ার... ঘোড়া ছুটছে অথচ ছোটার শব্দ নেই! মনে হচ্ছে, যেন চিনতে পারছি জায়গাটা। ঘোড়সওয়ার আমাকে এনেছে  সিকান্দ্রায়। এই তো সম্রাট আকবরের সমাধিক্ষেত্র! হঠাৎ জাঁহাপনার গম্ভীর স্বর – তোর সেই বেআদব সাহেব বন্ধুটার খাতায় ‘দীন-ই-ইলাহি’র ড্রইং তুই চাইবাসায়    দেখেছিলিস্‌... মনে পড়ছে? তখন জানতে চাস্‌নি কেন ড্রইংটা কোত্থেকে পেল? 
--“হুজুর, সে বলেছিল, ওটা এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে সে পেয়েছিল”।  
--“তুই তাকে বলিস্‌নি এটা ‘দীন-ই-ইলাহি’ ধর্মের লোগো, যা ধমর্গ্রন্থের প্রচ্ছদে   আছে? আর দেখ্‌ আমার এই আবাসের প্রত্যেক পাথরে ঐ একই ড্রইং রয়েছে”। 
--“হুজুর, ও তা হলে গোপন করেছিল। আমার মনে হয়, ও আপনার সিকান্দ্রায়   এসেছিল। অনেক বড় কবি, তাই আমি ওকে সন্দেহ করিনি। তাছাড়া হুজুর ও তো কৃত্তিবাসের দলে মিশতো, যারা আমার সেই সময়ের বন্ধু”।  
--“ড্রইংটা একটু ব্যাখ্যা কর, দেখি তুই কতটা মনে রেখেছিস্‌!”  
--“একটা বড়ো বৃত্তের মধ্যে একটা ছোট বৃত্ত... তিনটে মাছের শরীর আলাদা  আলাদা রয়েছে বড় বৃত্তে... আর তাদের একটাই মাথা যা রয়েছে বড় বৃত্তের মাঝখানের ছোট বৃত্তে। দুটো বৃত্তের কেন্দ্র একটাই। কেন্দ্রই মাছের চোখ। ‘দীন-ই-ইলাহি’ ধর্মের সারাৎসার। আমি কবিকে পাটনা যেতে বলেছিলাম। সেখানেই আমার মা-বাবা-ছোটভাই সেই সময়ে থাকত। আর অশোক রাজপথের খুদাবক্স লাইব্রেরিতে রাখা আছে ‘দীন-ই-ইলাহি’র পাণ্ডুলিপি। সে দেখে নিতে পারবে। তাতে তার সন্দেহ  দূর হবে। হুজুর, পরে কবি পাটনায় গিয়েছিল এবং আমার ছোটভাই তাকে খুদাবক্স  লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে কবি স্বচক্ষে সেই ড্রইং দেখে এবং ড্রইংয়ের ছবিও তোলে। তারপর আপনিও নিশ্চয়ই দেখেছেন ‘ইণ্ডিয়ান জার্নাল’ গ্রন্থে কবি ঐ লোগো  ব্যবহার করেছে। কিন্তু গ্রন্থসূত্র কোথাও দেয়নি। কেননা, তা হলে এটা ফাঁস হয়ে যাবে যে, ভারতের জ্ঞানভাণ্ডার কাদের দখলে এবং ভিনদেশিরা আসে সেই জ্ঞানভাণ্ডারের  হদিশ খুঁজে পেতে। অথচ বাংলা কবিতার ইতিহাস বলে, বাঙালি কবিরা নাকি বিট কবিদের দ্বারা প্রভাবিত!”  
--“হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলে, তা তুই খোঁজ নিয়েছিস?” 
--“হুজুর, সে তো হীনমন্য দালালগুলো স্বদেশের পক্ষ না নিয়ে আজও বিদেশিদের   তোল্লা দিয়ে যাচ্ছে... হুজুর, এটাকেই তো আমরা বলছি ঔপনিবেশিকতাবাদী আধুনিকতা...”  
--“আচ্ছা দেখছি আমি, কি বিহিত করা যায়! ওহে ঘোড়সওয়ার এই ছোকরাকে  কলকাতায় যেখান থেকে নিয়ে এসেছিস, সেখানে ছেড়ে দিয়ে আয়!”   
হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখি, আমি কলকাতাতেই আছি! সকাল হচ্ছে তখন...”

সমীর রায়চৌধুরীর অধুনান্তিক গল্প: 

মেথি শাকের গন্ধ
অনেক দিন পর আবার লোডশেডিং।

মুহূর্তে চারিদিক অন্ধকার। আলোয় অভ্যস্ত স্বভাব অস্বস্তিতে। যা-কিছু আমার বলার মতো বিষয়-সম্পদ জড়ো করেছি সব আড়াল হয়ে গেল।
টেবিল চেয়ার বেডরুম টিভি ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন শেফালি ঘরদোর বুকসেল্ফ সিলিং-ফ্যান কবিতার খাতা পাশবই…ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এ বাড়ির যা-কিছু দৃষ্টিগোচর, এই মধঊর্তে নিজের নিজের অবস্হান থেকে সেই উপস্হিতি এই অন্ধকারে নিভে গেছে। যে অবস্হানগুলো নিজের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে মহাবিশ্বে আমার জলজ্যান্ত থেকে যাওয়া।
ছোটোবেলায় মা অন্ধকার দিয়ে ভয় দেখিয়ে শাসনে রাখতেন…সে সময় ধারনা হয়েছিল…অন্ধকারে জুজুবুড়ি, রাক্ষস খোক্কোস শাঁকচুন্নি একানড়েরা থাকে…মা-র কথা না শুনলে খপ করে খেয়ে নেয়…তারপর মা যখন মামারবাড়ি পাণিহাটিতে নিয়ে যেতেন…রাঙাদিদু কাছে টেনে সবাইকে রাক্ষস খোক্কোস জয় করার রূপকথা শোনাতেন…আমরা নিজেরাই কেউ রাক্ষস খোক্কোস কেউ রাজপুত্র সেজে জয়ের খেলা খেলতাম…খেলতে খেলতে ভয় কেটে গেল…রাঙাদিদু স্বামীর ঘর করার আগেই বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে বিধবা হয়েগিয়েছিলেন…ছোটোছোটো কদমছাঁট চুল…ফরসা রং…রোগা রোগা হাত পা…পরনে থান কাপড়…সবাই বলত নেড়ি পাগলি…আমাদের রাগদুঃখ বাড়ত…সেই রাঙাদিদু হঠাৎ মারা গেলেন…পরের বার পাণিহাটিতে গিয়ে আর দেখা হল না…মা বললেন…অন্ধকারের দেশে চলে গেছেন…সেই প্রথম অন্ধকারের মধ্যে প্রিয়জনের বাসা তৈরি হল…তারপর এক এক করে মা বাবা ছোড়দি মেজো জ্যাঠা ন-কাকা বন্ধুবান্ধব কত প্রিয়জন সেই অন্ধকারে চলে গেল…
আজ রামতনুর আসার কথা। রামতনু কবি। এলে, বেশ জম্পেশ আড্ডা হয়। তবে এখন আর কলিংবেল বাজবে না। বিদ্যুৎ নেই। গেট খোলার শব্দের দিকে একটা কান রাখতে হবে।
রান্নাঘরের দিক থেকে শেফালি চিৎকার করে উঠল: যে যেখানে আছো সেখানেই থাকো…মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে আসছি…
শেফালির কন্ঠস্বর মিশে হঠাৎ আসা অন্ধকারের নিঃসঙ্গতা কাটল। কিন্তু শেফালি বহুবচনে সাবধান জানাল কেন ! আমি তো এঘরে একা !
আজ আবার কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশী। চাঁদ প্রায় নেই হয়ে দেরি করে উঠবে। দরজা জানলা খোলা থাকলে আশপাশ থেকে কিছু টুকরো আলো ঠিকরে আসে। কিন্তু মশার উপদ্রবের জন্য শেফালি বেকেল হওয়ার আগে থেকে ঘরদোর আঁটোসাঁটো বন্ধ রাখে। চুরির ভয়ের খিল ছিটকিনির চেয়ে এই বন্ধ আরও নিশ্ছিদ্র। আমাদের প্রতিবেশীরাও একই নিত্যের শামিল। এটা আবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা তাই লোকে যাতে মনে না করে নিজের এরিয়ায় তিনি বেশি কাজ করছেন তাই খুব একটা পাবলিক ওয়ার্ক এলাকায় হয় না। আর যাই হোক পার্টির এই সব নির্ভীক সততা আছে।
এই ব্রহ্মপুর খালপারের এলাকা স্টেট ইলেকট্রিসিটির আওটায় : ওপারে সি,ই,এস.সি.। ওপারের চেয়ে এদিকে লোডশেডিং বেশি তবে আগের তুলনায় কমেছে। এইসব নিয়ে এই অঞ্চলে আলোচনা হয়, বটতলা বাজারে, চায়ের দোকানে আর মহিলামহলে। কত রকমের কথা আর কথাকাটাকাটি বেরিয়ে আসে।
তবে একটা ব্যাপার সুখের। নিয়মিত লোডশেডিং হওয়ার ফলে জেনারেটরের ব্যবসা, মশার রকমারি ওষুধপত্তরের বিক্রিবাটা, মোমবাতি আর ব্ল্যাকে কেরোসিন ইত্যাদির ব্যবসা বেড়েছে। কিছু বেকার ছেলের তবু যাহোক হিল্লে হয়েছে।
অবশ্য রিটায়ারমেন্টের পর আমাকে জেনারেটারের লাইন কাটিয়ে দিতে হয়েছে। বাড়তি খরচ কমিয়ে আনতে। যদিও পথেঘাটে তত আলোর ব্যবস্হানেই। একটা স্হায়ী অন্ধকার এলাকায় আছে।
কতকটা বাল্মীকির আশ্রমের মতো, তাঁর আশ্রম ছিল তমসা নদীতীরে। এই তমসা নদীর তীর পর্যন্ত সুমন্ত্র রামচন্দ্রকে অনুগমন করেছিলেন। যেখানে লবকুশকে সঙ্গে নিয়ে সীতা থাকতেন। কবিতার জন্ম হয়েছিল এই নদীতীরে, আরও সহজ করে বলা যায় মানুষ নামের প্রাণীর কবিত্বের জন্ম এই তমসা তীরে। যে কবিত্ব এই প্রজাতির চালিকাশক্তি। বিজ্ঞানীরা অবশ্য ব্যাপারটাকে বলেন, দ্য গ্রেট অ্যাবাউট টার্ন। গন্ধ শব্দ স্পর্শ এভাবে একটা মাত্র বৈশিষ্ট্যের পথ না বেছে নিয়ে সবদিকে সচেতন হওয়ার মন। আর এই মনের প্রশ্রয় তমসাকে ভর করে।
একটা কিছুর শব্দ হল; না, রামতনুর আসার শব্দ নয়। রান্নাঘরে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ। শেফালি চেঁচিয়ে উঠল: মেথিশাক আর বেগুন দিয়ে মেথিবেগুন চাপিয়েছিলুম…পুড়ে না যায়, সামলাতে গিয়ে তেলের শিশি অন্ধকারে হাত লেগে র‌্যাক থেকে পড়ে গেল…চারিদিকে তেল আর কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে…সামলে আসছি…তুমি এদিকে এসো না…
সাবধান করে দিয়ে শেফালি ভালো করেছে…শেফালির দিকে এগোনোর রিস্ক নেব ভাবছিলাম। মেথিশাকের গন্ধ ভেসে এসে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার হদিস দিয়ে গেছে। যদিও একেবারেই কিছু দেখা যাচ্ছে না। বেশ জমাট অন্ধকার। সবকিছু একাকার হয়ে গেছে। আকারের যে হট্টোগোল আমার আকারটুকু সায় দিয়ে রেখেছে সেইসব কিছু অন্ধকারের মধ্যে লোপাট হয়ে গেছে। এই অন্ধকারে আমার সম্বল ওই মেথিশাকের গন্ধ আর শেফালির কন্ঠস্বর। মেথিশাক দিয়ে বেগুন না মেথিশাক দিয়ে শেফালির কন্ঠস্বরের ব্যঞ্জন, এই মুহূর্তে ঠিক কী বলা যাবে ! মেথিশাকের গন্ধে মেথিশাকের শরীর ছাপিয়ে এই জীবনের আরও কত কি যে ক্রমশ সেঁধিয়ে গেছে। ছোড়দি ভালোবাসত মেথি শাক দিয়ে শুকনো শুকনো কইমাছ । মা মেথি পাতা শুকিয়ে রাখতেন, ফোড়ন দেওয়ার জন্য কিংবা মুগডালে দিতেন।
সাহস করে চেয়ার ছেড়ে উঠেছি। সামনে টেবিল আছে জানি, তার দু পাশ দিয়ে দুটো আলাদা স্পেসের বাইলান, বাঁদিক ধরে এগোলে এক হাতের মধ্যে করিডরের দরজা। অন্ধকারের ভিতর কত পরিসরের অলিগলি। অন্ধকারের মধ্যে এক ধরনের ফাটল।
বাঁধন বলত, অন্ধকারের স্হানিকতা। স্পেস যেভাবে সম্পর্ক গড়ে। এগোচ্ছি। টেবিল ছাড়িয়ে ঠিক বেরোতে পেরেছি মনে হচ্ছে। দরজা হাতড়াচ্ছি। এই তো দরজা। আলতো ভাব রেখেছি চলাফেরায়। তবু দরজায় হাত ঠেকে ঠুক করে শব্দ হল। যা ভেবেছি ঠিক তাই। শেফালি ওই ক্ষীণ শব্দটুকুও শুনতে পেয়েছে। সে প্রতিবাদ জানায়—
:তোমায় তোমার জায়গায় স্হির থাকতে বলেছি না…মনে হচ্ছে আমার দিকে আসার সেই চেষ্টা করে যাচ্ছ…এসো না…ওখানেই থাকো…
—সাবধানে একটু একটু করে এগোচ্ছি
:তুমি তো বেশির ভাগ দিন এই সময়ে বাড়িতে থাকো না…আমি থাকি তাই আমার অন্ধকারে চলাফেরার অভ্যাস হয়ে গেছে…আমি চিনি জানি…
দরজা পেরিয়ে গেছি। ডানদিকে করিডরের দেয়াল ডান হাতে ঠেকছে। এবার বাঁদিকে এগোতে হবে। বাঁদিকের দেয়াল ধরে এগোলে হদিস পেয়ে যাব। প্রথমে খাবার ঘরের জানলা পড়বে তারপর খাবার ঘরের দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে সামনে ডাইনিং টেবিল। ডান হাতের দেয়াল ঘেঁঢ়ে ক্রকারি রাখার আলমারি। সেই আলমারি ছাড়িয়ে একটু এগোলে রান্নাঘরার দরজা। রান্নাঘরে দুদিক দিয়ে যাওয়া যায়। করিডর দিয়ে এগোনো যেত। কিন্তু সেখানে এই অন্ধকারে সব গোলমাল হয়ে যেতে পারে। বুকসেল্ফগুলো আর আয়না রাখা আছে। তাছাড়া দেয়ালের দুদিকে বিস্তর ছবি টাঙানো। বেমক্কা হাত লেগে কোনোক্রমে যদি পড়ে যায়। টাঙানোর পেরেক লাগানো হয়েছিল ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে দিয়ে। চেনাজানা শিল্পীদের ছবি টাঙানো হয়েছে।
প্রথম ফ্রেম রুনুর, রুনু মানে অমিতাভ ধর। পেন্টার এইট্টিস-এর শিল্পী। ওর ছবিতে কালো রঙের চমৎকার কাজ প্রচুর। বিড়লা অ্যাকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে। ছোটোবেলা থেকে ওর এই ছেচল্লিশ বছরের জীবনে তিনবার বাড়ি বদল হয়েছে। আমি যেমন বদলির চাকরির সূত্রে পাহাড় নদী পথঘাট প্রতিবেশী দখল করেছি বারবার। ওর স্মৃতির মধ্যে সেই সব বাড়ি বদল আর সেখানকার ঘটনার পরত থেকে গেছে। প্রথম বাড়ি ছিল খিদিরপুরে। তারপর চৌরঙ্গিতে নিউ ক্যাথের ওপারে।
প্রথম বাড়িতে প্রচুর পায়রা ছিল। খোলামেলা থাকত ছাদে। বেশ পোশ মেনেছিল। রুনুর সঙ্গে পায়রাদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন ছাদে গিয়ে তাদের সঙ্গে রুনু বহুক্ষণ সময় কাটাত। একদিন পাশের বাড়ির কাকিমা দুটো পায়রা চাইলেন। কেন যে…
মা বললেন,— কেউ কিছু চাইলে ভালো মনে দিতে হয়। বিশেষ করে যখন প্রতিবেশী চেয়েছে। মনে অসহ্য কষ্ট হল তবু মায়ের কথার জন্য —ম দিলাম।
হঠাৎ মা বললেন, — তোকেই কেটে দিতে হবে। কাকিমা পারবে না। তবে ছাল ছাড়িয়ে টুকরো করে নেবে।
— সে কী, কাকিমার পায়রা দেখে যেতে ইচ্ছে হয়েছে… আমি তো ওদের খাওয়াতে ভালোবাসি… ওড়াউড়ি দেখি… কোনো দিন কই খেতে ইচ্ছে হয়নিতো… ওদের সঙ্গে শুধু মিশতে ভালো লাগে…
মা বললেন, — গুরুজুন, ইচ্ছে হয়েছে যখন… দিলে আশীর্বাদ পাবে…
গিয়ে এক ঝটকায় কেটে দিয়ে এলাম — মনে থেকে গেল তাদের বিহ্বল পাখা ঝাপটানো… শেষ সময়েও উড়ে চলে যেতে চেয়েছিল…
আমার যে স্পর্শ ছিল ভরসার সেখানে অবিশ্বাস আর নিষ্ঠুরতাও মিশে গেল…
রুনুর পেন্টিঙে কালো রঙের সূক্ষ্ম কাজের মধ্যে লাল রঙের রক্তের ইশারা। কালো রং টুকরো টুকরো হয়ে ডানা মেলতে চাইছে। অসংখ্য আলগা স্মৃতির পরত। রুনুর মেমোরেবিলিয়া মানে স্মৃতিমন্হন সিরিজের। আমার প্রিয় ছবি। একদিন রাতে ঝোঁকের মাথায় রুনু আমাকে এই পরিসরের একটা ছবি ভালোবেসে দিয়েছিল।  প্রত্যেক ছবিই এমনই সব নানা ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়েই এই করিডরের দেয়ালের পেরেক অবধি পৌঁছেচে।
যেমন প্রকাশের কালো রঙের কাজ একেবারে আলাদা। ওই দ্বিতীয় পেরেকে… আর তৃতীয় পেরেকে বাঁধন দাশের আঁকা ছবি।
বাঁধনের কথা বেশি করে মনে পড়ছে আজ। মাত্র দুদিন হল সে মারা গেছে। অথচ এই সেদিন শান্তিনিকেতনের কলোক্যুইয়ামে কত কথা হল। ঘুরে ফিরে সেই স্হানীয়-লোকাল এইসব কথা কত সহজভাবে বোঝাতে চেয়েছিল আমাকে। বিশ্বায়নে স্হানীয়টুকুর গুরুত্ব যেন থাকে। যা আছে তার ওই কালো রঙের স্পেসে। আজ বাঁধন নিজেই আমার এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের কোনো এক অলিগলির পরতে। মাত্র আটান্ন বছর বয়সে বাঁধন চলে গেল। করিডরে রাখা তার পেন্টিং আজ আরও প্রিয়…
ফলে ওদিক দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। অন্য কোনো অঘটন যাতে না ঘটে। সাবধান হওয়াই ঠিক। তেলের শিশি ভেঙেছে, ঠিক আছে। ও তো পরিষ্কার করে নেবে শেফালি। আর সকালে তো কাজের মেয়ে আসবে। তাছাড়া মেথি শাকের গন্ধ খাবার ঘরের দিকেই বাড়ছে। যেভাবে গন্ধ ছড়িয়ে আছে সেপথ দিয়ে যাওয়াই সুবিধের হবে। রুনুর পেন্টিঙে যেভাবে কাকিমার মাংস রাঁধার আর পাখিদের উড়ে যাওয়ার গন্ধ মিশে আছে…
এখন আর আমার নিজেরই অন্ধকারের দেশে চলে যাওয়ার তত দ্বিধা নেই… সেখানে বাঁধন আছে শক্তি আছে… রাঙাদিদু মা বাবা ছোড়দি… সবাই তো সেখানেই… অন্ধকার এখন প্রিয়জনের সংসার…
তবু শেফালিকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না বলেই অন্ধকারে… কালো রঙের ঘরোয়া স্পেসে এভাবে ঘুরতে খারাপ লাগে না…
রুনু কেন দেবারতিকে বিয়ে করছে না… কত দীর্ঘ দুজনের ভালোবাসা… ও কি এই পৃথিবীতে মায়া বাড়াতে চায় না… কালীকৃষ্ণ এসব নিয়ে কত কথা রুনুকে বোঝাতে চায়… রুনু একটা নীল রঙের ওয়াটার কালার পেন্টিং দিয়েছে কালীকৃষ্ণকে… ছবিতে ফাংগাস যাতে না লাগে তার টিপসগুলোও দিয়েছে সেই সঙ্গে… কত ধরনের ফাংগাস আছে যারা এক-একটা রং এক-একটা স্পেস খেয়ে ফেলতে ভালোইবাসে…
এক জাবগায় গিয়ে নিশ্চই মেথি শাকের গন্ধের সঙ্গে শেফালির উপস্হিতির জৈব গন্ধ মিশবে। যেখানে এই মুহূর্তে অন্ধকারের হদিস রেখে আমাকে পৌঁছতে হবে। এ বাড়ির আর সব কিছুর মতো, যেগুলো আলোর মধ্যেই পরিচিত তার বাইরে। এ বাড়িতে আশ্রিত অন্ধকার আর তার অলিগলি এবাড়িরই আরেকটা দিক। যা আমাদের দুজনের নিজস্ব অন্ধকার।
শীতের সকালের দিকে যেমন, ব্রেকফাস্টের সময় ডাইনিং টেবিলের ডান কোনে একচিলতে চেনাজানা এবাড়ির নিজস্ব রোদ আসে। একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাচ্ছে এই অন্ধকারও সমান চেনাজানাখ চলতে ফিরতে, সঙ্গ নিতে কোনো অসুবিধে নেই। এই অন্ধকার নিজস্ব বিষয়-সম্পদের বাইরে নয়।
কালো রঙের কাজ…

( ছোটো গল্প এতাবৎ লেখা হয়েছে ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে। সমীরের এই গল্পের কেন্দ্র মানুষ নয়। এই গল্পের কেন্দ্র হল অন্ধকার। )





সমীর রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উল্কা

উল্কা :    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এখন শুধুই স্মৃতি তাই আপনার স্মৃতির পাতা ঘেঁটে কিছু বলুন আমাদের...
সমীর : আমিই সুনীলকে আইডেণ্টিফাই করি।সুনীল তখন কেউই না।সুনীলের সঙ্গে আমার যখন আলাপ হয় সুনীলও একটা ভেলভেলেটা আমিও একটা ভেলভেলেটা। সিটি কলেজের দেয়াল পত্রিকায় দেখলাম একটা কবিতা লিখেছে একটা ছেলে।বেশ ভাল লাগল কবিতা।ফলে আমি কবিতাকে ভালবেসে সুনীলকে খুঁজে বের করি।আমি সুনীলের থেকে এক বছরের বড় । আমরা একসাথে পড়তাম একই কলেজে।ওর বিষয় ছিল অর্থনীতি আমার বিষয় ছিল প্রাণিবিদ্যা।
উল্কা:      হাংরি আন্দোলনের ময়দানে আপনার চোখে কৃত্তিবাসের সুনীল কিভাবে ধরা দেন ?
সমীর :হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীল যতই উল্টো কথা বলে থাকুক বেঁচে থাকার সময় আমি দেখেছি সুনীল পরে হাংরি আন্দোলনের দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে কৃত্তিবাসকেও একটা আন্দোলন বলতে শুরু করল।কিন্তু প্রথম দিকে তা বলেনি প্রথম দিকে বলেছিল কৃত্তিবাস হচ্ছে প্রথম দিকে তরুণতম কবিদের মুখপত্র।অর্থাৎ সমস্ত তরুণ কবিদের মুখপত্র।কিন্তু সেটা আসতে আসতে ছোট হতে হতে সেটা চার পাঁচজন কবির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল।যেন তারাই কৃত্তিবাস!ক্ষমতার কাছে গেলে একটা স্তাবকতা পেয়ে বসে ক্ষমতার যা যা দুর্বলতা ক্ষমতার যা যা ভাল খারাপ সবই তো তাকে মেখে নিতে হয় তার মধ্যে মিশে যায় ফলে ক্ষমতার যা যা খারাপ সেগুলো সুনীলের মধ্যেও ছিল।
উল্কা :   ব্যক্তিগত সম্পর্ক … বন্ধুত্ব … সুনীল … সমীরদা , আপনি কী বলবেন?
সমীর : আমার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল।আমাদের সম্পর্ক ছিল পারিবারিক।শুধু দুঃখের বিষয় সুনীল একটু ভুল বুঝেছিল পরে গিয়ে।যখন আমি হাংরি আন্দোলন করলাম।তো সুনীল ভাবল যে আমি বুঝি কৃত্তিবাস থেকে আলাদা হয়ে গেলুম।তা তো আর নয়।কারণ তারপরেও সুনীল আমাকে একটা চাঁদার বই পাঠিয়েছিল যে কৃত্তিবাসের জন্য কিছু টাকা জোগাড় করে দিস।তো আমি কিছু টাকা পাঠিয়েছিলাম সুনীলকে এই বলে যে তোর ওই চাঁদার বইটা দিয়ে প্রচুর টাকা জোগাড় হয়েছে টাকাটা আমি পাঠাচ্ছি।

দার্শনিক -সাহিত্যিক, কবি সমীর রায়চৌধুরী মূল্যায়ণ

বাংলা সাহিত্যের ঈশা মসীহ : সমীর রায়চৌধুরী
#
রবীন্দ্র গুহ


পাটনার ইমলিতলার প্রসঙ্গ উঠলে সমীরের গল্প বলা থামতো না।

ইমলি কথাটায় আমারও কিঞ্চিৎ আকর্ষণ আছে।ইমলি বৃক্ষের পাতা খুব ক্ষুদে ক্ষুদে। আমার একটি কবিতার নাম --'ইমলি পাতায় হাতীর নাচন'। ইমলি গাছের ডালে পা ছড়িয়ে শাঁকচুন্নী 'হাঁহাঁ-হিঁহিঁ' করে।  আর তলায় নাচানাচি করে ভূতনিরা। সেই ইমলিতলায় প্রথম চোখ মেলে সমীর রায়চৌধুরী।  তার খানিক দূরে দরিয়াপুর।

দরিয়া মানে কি ? নদী।  এ-নদীতে জল নেই -- কিলবিল করে নাঙ্গা, খোঁড়া, ঠুঁটো-মানুষ, আধা-মানুষ -- আর খেঁয়ো-কুকুর-বিড়াল-শুয়োরের পাল।  মেয়েমানুষের কথা তো আসেই না, পুরুষরাও রেলে চড়েনি, ইস্কুলে যায় নি। সেই ইমলিতলার জাঁতিকলের যুবক কলকাতা এলো -- এখান থেকে মুম্বাই ফের কলকাতা।  কয়েকজন বন্ধু জুটে গেল - যারা নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলো। এইমাত্র মনে পড়ে গেল কয়েকজনের নাম -- কাঞ্চন মুখার্জী, দ্রোণাচার্য ঘোষ, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়। দ্রোণাচার্য পুলিশের গুলিতে মরলো।

লিডারগিরি বা আখের গোছানোর ধান্দা কোন কালেই ছিল না।  তাই রাজনীতি থেকে সরে এলো। যদিও সবাইকে সমীর নানা ভাবে উৎসাহিত করতো।  তারা তাঁকে পছন্দ করতো না।

- কিন্তু হাংরি আন্দোলনের তো ফাদার ফিগার ছিলে তুমি ?

- না, সে অর্থে মলয় ছিল হাংরির ফাদার ফিগার। যদিও মেনিফেস্টোতে 'নেতৃত্ব : শক্তি চট্যোপাধ্যায়' বলে লেখা হয়েছিল।

বুলেটিন বিলি হতো কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে।  যৌনরোগ তথা গুপ্তরোগের হ্যান্ডবিলের মত।  তাই নিয়ে কফিহাউসে খুব হাসাহাসি হত।  মজা হত। অন্যরা আড়ালে।  সমীরের পরিচিত।

- জানি, নিন্দুকদের দলের পাণ্ডা শরৎ-সুনীল।  মানে কৃত্তিবাসের মসিহস্তীরা।

- তুমিও তো কৃত্তিবাসের একজন ছিলে।  সুনীলের প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশক।  সত্যি করে বলো, প্রকাশনার খরচ  দিয়েছিল ?

- সুনীল।  ও একটা সংবাদপত্রের প্রুফ রিডার ছিল।  সেখান থেকে কিছু টাকা পেয়েছিল।

- তোমরা বরাবর বলে আসছ শরৎ-সুনীল-শক্তি তোমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসেছে।  এরকম সন্দেহের কারণ কি ?

- সুনীল-শক্তি খুব ভিনডিকটিভ ছিল।  ওরা সবাই চাইত - কোন পত্রিকায় আমার লেখা যেন ছাপা না হয়।  হ্যাঁ, ওদের নিজেদের মধ্যেও রেষারেষি ছিল। ভাঁড়ে দেশি মদ খেয়ে কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে শক্তি সহসা সুনীলের পোঁদে ক্যাঁক করে লাথি মারে।  দেশপ্রিয় পার্কে বসে আড্ডা দেবার সময় দুজনের মধ্যে তুমুল তর্কাতর্কি হয় এবং হাতাহাতি।

- কিন্তু শক্তি তো ভীরু-প্রকৃতির ছিল ?

- তা ছিল।  সব সময় ভাবত বন্ধুরা ওকে জাঁতিকলে ফেলবে।

- শুনেছি তোমার শালীর সঙ্গে শক্তির প্রেম ছিল।

- হ্যাঁ শক্তি খুব লোভী-স্বার্থপর ছিল। আমি যখন চাইবাসায় ছিলাম, শক্তি আমার কাছে দেড় বছরের বেশি ছিল।  আমার শালীর সঙ্গে প্রেম করতো। আমার পয়সায় মদ খেত।  আমার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে নানান পত্রিকায় কবিতা পাঠাবার জন্য ডাকটিকিট কিনত। অবশ্য, অনেক সময় ছোট ছোট পত্রিকায় টিকিট ছাড়াই কবিতা পাঠিয়ে দিত।  খামের মুখ খোলা থাকত। যেহেতু শক্তির কবিতা, সম্পাদকেরা বেয়ারিং চিঠি ছাড়িয়ে নিত।

কালখণ্ডের বাঙালির পতন কবে থেকে শুরু জানো ? - প্রশ্ন করল সমীর।
উত্তরও দিল সমীর - যেদিন থেকে বাঙালির মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সে সেরা বুদ্ধিজীবী।

বন্ধুদের একজন বলল - না, যেদিন জানা গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পেয়েছেন। বাঙালির মগজে বিস্তর স্বপ্ন হুমড়ি খেল।  অবচেতনায় হীনতা, অনাধ্যাত্ম, অতিপক্কতা। যাকিছু ঘটার তখন থেকেই ঘটেছে। এখন তলানিতে এসে ঠেঁকেছে।

আমরা ব্যাপারটা টের পেলাম সমীরের অবাক করে দেওয়া গদ্য 'আরেক রবীন্দ্রনাথ' পড়ে। কে ঔপন্যাসিক থেকে পেজ থ্রি সেলিব্রিটি হল সেটা কোন ফ্যাক্টর নয়, কবি হতে-হতে নেতা হয়ে যাওয়াটাও এই পতনের মুখে গরু গাছে ওঠার সামিল।

- এই সময়কার মানুষদের ব্যক্তিগত চরিত্রে গন্ডগোল আছে।  থাকবেই। এটাই খাঁটি অধুনান্তিক রিয়্যালিটি - ট্রু-ইজম। কি মনে হয় তোমার ?

- দ্যাখো রবীন্দ্র, আমি সেল্ফ মেড মানুষ, শৈশব কেটেছে মুসলমান পাড়ায়, কৈশোর অতিপিছড়ে বর্গের সাথে, চাকরিতে বন্ধু জুটেছিল মাদ্রাজি, গুজরাতি, হরিয়ানভি, পাঞ্জাবী - তারা সবাই আধা শিক্ষিত, তাই মানুষের দ্বিপাক্ষিক ব্যক্তিগত চরিত্রের গন্ডগোলটা বুঝি। সুতরাং আরোপিত কোন ব্যাপার নেই। খুব কাছের মানুষের যৌনাচার দেখেছি। অনটন, বিষয়ক্ষুধা দেখেছি। দিশাহারা হয়ে লক্ষ্যচ্যুত হতে দেখেছি। সেসব সাধারণ ঘটনা নয়।

- সেতো জীবন থেকে তত্ত্ব - আমরা চাইছিলাম সরাসরি শুখাখরা জীবনের এক্সপ্লোশন।

- তুমি নিশ্চই ইমলিতলা-দরিয়াপুরের পরিবেশের কথা বলছ ?

- ঠিক তাই। ইমলিতলার সীমানা-নকশা, খাদ-খোঁদল, আধন্যাংটা মানুষ, কীটপতঙ্গ - ধারাবর্ষণের দিন, উৎসবের দিন --

- অপেক্ষা করো। সবে তো 'মেথিশাকের গল্প' হল। গল্পের মধ্যে গল্প 'খুল যা সিমসিম' প্রাত্যহিকতার ফসল।  এই গ্রন্থে আছে ৩১টি গল্প। সবই জটিলতায় ঘেরা - লোভ, লিপ্সা, তুরিয়ানন্দ।  ক্ষমতার উৎসে যারা, তাদের বোলবোলা দিনকে দিন বাড়ছে।

- তার মধ্যে তুমিও তো আছো ? তোমার অবস্থান বদলায়নি ?

- না রবীন্দ্র, কোন কিছুর প্রতি আমার লোভ, লিপ্সা, মোহ নেই।

- তবু লোকে তো বলে তুমি ঘনঘন ভোল পাল্টাও। হাংরি করেছো, আবার অধুনান্তিকও করছ। পাটনায় থাকতে বামপন্থী সাহিত্য করতে।

- হ্যাঁ, আমি প্রগতি সাহিত্য করতুম।  সাম্যে বিশ্বাস করি। চিন্তা ভাবনায় কোনো বদল ঘটেনি। রাজনেতারা অনবরত বলে, মানুষ চায়, তাই মানুষের জন্য করছি। লেখক কি তা বলতে পারেন, মানুষ চায়, তাই এইসব ক্লিশে ব্যাপার-স্যাপার লিখছি ? আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, সংসারে যে জীবন ভালোবাসার জীবন, তা সংকট সৃষ্টি করে না, সংকটমুক্তির পথ দেখায়।

রাইজোমেটিক চলন-বলনের মাধ্যমে স্থান পরিসরের ফাটলে দাঁড়িয়ে সমীরের চরিত্ররা খাঁটি যুক্তিময়তায় দৃঢ় থেকেছে। ফলে, তারা হৃদয়ের এত কাছাকাছি। সমাচ্ছন্ন থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে ভালোবাসার ঐক্যে অবস্থাপন্ন।  নিজের মত অন্য আরো অনেকের মত সমীর তার আস্থা বিশ্বাসময়তা দিয়ে একটি প্রেক্ষিত গড়ে তোলে, এবং সে, সমীর, সেই প্রেক্ষিতের প্রতিনিধি।

তখনো সমীরের শরীর ততটা ভাঙেনি। বেশ শক্তসমর্থ। একদিন বললো, চলো মলয়ের ওখানে যাই। আমরা মলয়ের নাকতলার বাড়িতে গেলাম। জমিয়ে আড্ডা হলো ঘণ্টা তিনেক। সমীর বললো - ভাবছি, 'হাওয়া ৪৯'-এর একটা সংখ্যা বার করব- 'ভবিষ্যতের গল্প'। অসম্ভবকে ধরতে হবে। পতন ঘটলেও ক্ষতি নেই।

- কি রকম, একটু খুলে বলো ?

- ভবিষ্যতের মানুষ ও তার জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা বিষয়ে আজকের গল্পকারদের ভাবনাচিন্তার কিছু বাকফসল ও অবাক ফসল। প্রত্যেক গল্পকার নিজের মত করে ভবতরঙ্গের খুঁটি ধরে এগোচ্ছেন অনাগত ভবপরিসরের দিকে।

- তোমার ভাবনার কদর করছি। কাজটা কঠিন।

- তা তো বটেই।  'ভ' অক্ষরের অর্থময়তার উৎস কি জানো ? ভর ও ভরণ। ভক্ষ্য ও ভক্ষণ। লেখক সৃষ্টির কথাও বলতে পারে, বিনাশের কথাও বলতে পারে, আবার সতর্কতার কথাও বলতে পারে। মহাকাশে ঘর খোঁজার কথাও বলতে পারে।

আমরা লিখলাম - আমি, নবারুণ ভট্টাচার্য, নীলাঞ্জন চট্যোপাধ্যায়, অসীম ত্রিবেদী, মুর্শিদ এ এম, রামকিশোর ভট্টাচার্য, কামাল হোসেন।

সমীরের মাথায় আরো কতরকম পরিকল্পনা ছিল, যেমন - ভারতীয় বোধ ও চেতনার স্বরূপ। এমন সব তরুণ-লেখক খুঁজে বেড়াত যাদের ব্রহ্মাণ্ড ও কলাবিজ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞান আছে, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বিষয়ে চর্চা আছে। যারা সেই সব বিষয় নিয়ে লিখতে পারে। শুধু 'হাওয়া ৪৯' নয় অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদেরও উৎসাহ দিত।

প্রায়ই ফোন করে বলত - "গ্লোবালাইজেশন নিয়ে কি ভাবছ ? জটিলতা লক্ষ্য করনি ? সমাজ জীবনে কেওয়স ? যত মজা ততটাই দ্বন্দ্ব-বিরোধ। নতুনদের লেখায় এসব আনতে বলো। আমি ভাবছি এই নিয়ে একটা সংখ্যা করব। তুমি একটা গদ্য তৈরী কর, মলয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি।

মহাশূন্যে ঘর খোঁজার কথা বলল একদিন। অনেক হাঁ-মুখ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টলমল করছে অন্যপৃথিবী।

 - 'হাওয়া ৪৯' জট ছাড়াতে চায় অসত্য, অধর্ম ও না-ধারার। একদিন এসো না ; এই নিয়ে কথা হবে।

সমীরের মাথায় কত যে চিন্তা। বলত, যৌনতার লজ্জা, যৌনতার বাড়াবাড়ি এ-নিয়ে তো অনেক কথা হল। অন্য কিছু ভাবা যায় না ? ক্রমবিবর্তনের কথা ? স্বচরিত্রে বিশিষ্ট কিছু ? মনের মধ্যে মন, দুঃখচেতনা, আরোপিত বর্ণভেদ ? সমীর মূলস্রোতের বাইরে টেনে আনতে চেয়েছিল 'হাওয়া ৪৯' কে।

সমীর বিশ্বাস করত না আমাদের বাংলা-সাহিত্যে আদৌ কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। যদিও বাংলা সাহিত্যের আকাশ নক্ষত্র খচিত। আত্মহত্যা থেকে শুরু করে প্রেমে অস্থিরতা- দ্বন্দ্বউত্তেজনা- বিপজ্জনক মৃত্যু- শরীরী-তৃষ্ণা গতে বাঁধা। না, আবেগের কথা নয়, সময়ের দাপট বাড়ছে, তা মানতে হবে।

- জানো রবীন্দ্র, মাঝে মাঝেই আমাকে আরো একটা বিষয় খুব ভাবায় 'অবাস্তবের বাস্তবতা'- মানে, স্বপ্ন কল্পনা কিংবদন্তি। আমার কোনো কোনো স্বপ্ন ভয়ঙ্কর ভাবে বাস্তব। এই নিয়ে 'হাওয়া ৪৯'এর একটা সংখ্যা করা যায় না ?

- নিশ্চই যায়

খুব জোর দিয়ে বললাম বটে, কিন্তু অবাস্তবের বাস্তবতার মায়াজাদু আর জানা হল না। মসীলিপ্ত হয়ে রইল বাংলা সাহিত্যের বিপুল সম্পদ। বহুকাঙ্খিত বদলকরণের দিগন্তরেখায় আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে সমীর অদৃশ্য হল অবাস্তবের বাস্তবতায়।




দার্শনিক -সাহিত্যিক, কবি সমীর রায়চৌধুরী :মলয় রায়চৌধুরী 

প্রাচীন ও নবীনের প্রান্তসীমা ধ’রে

গভীরে প্রবেশ তাঁর ; মধ্যমণি যাঁকে

বিহঙ্গদৃষ্টিতে মেনে, রন্ধন স্বপাকে

প্রস্তুতির বেশি কিছু ব্যর্থতার জ্বরে

বিপন্ন যে কতবার ! কিন্তু এতে সুখ

গোপন করিনি, জানে শ্বেত পারাবত ;

উদ্ডীন, তথাপি খুঁজে অগ্রদানী ক্ষত

নিরস্ত হয়েছে । তুমি প্রতিমার মুখ

সম্যক আয়ত্ত করে এই নষ্টপ্রায়

সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাবণসম্মতি

অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত করেছো বান্ধব–

ঋষির পাণ্ডিত্যে তাই শিশুর সভায়

মানায় তোমাকে, তুমি স্পর্শগন্ধশ্রুতি

স্বয়ং স্বতঃসিদ্ধ — ক্ষান্ত হলে জনরব ।

( শঙ্করনাথ চক্রবর্তী, ‘সমীর রায়চৌধুরী’ )

 

সমীর রায়চৌধুরী একজন দার্শনিক-সাহিত্যিক ; কেবল ভাবুক বা কবি বা গল্পকার বা প্রাবন্ধিক বললে ওনাকে বোঝানো যায় না । ইউরোপে যেমন ছিলেন স্তেফান মালার্মে, উমবের্তো একো, এজরা পাউণ্ড, জাঁ পল সার্ত্রে, আতোয়াঁ আর্তো, আলবেয়ার কামু, মিলান কুন্দেরা, টি এস এলিয়ট, অলডাস হাক্সলি, জাঁ জাক রুশো, ফিয়োডোর ডস্টয়েভস্কি প্রমুখ, যাঁদের লেখায় আমরা তাঁদের বিশ্ববীক্ষা পাই । বাংলা সাহিত্যে উনিশ শতকের পর থেকে আমরা কেবল প্রাবন্ধিক বা গল্পকার বা কবি বা ঔপন্যাসিক পেয়েছি বলে সমীর রায়চৌধুরীর কাজকে বুঝে ওঠা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়নি — তাঁরা সমাজকে বুঝতে চেয়েছেন কেবল বাংলা ভাষাসাহিত্যের জ্ঞানের মাধ্যমে । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার যে বিশেষ সংখ্যা ওনার কাজ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাতেও দেখা গেছে কেউ-কেউ, অন্ধের হাতি দেখার মতন, কেবল একটি ডাইমেনশানকেই তুলে ধরেছেন, হয় তাঁর গল্প বা কবিতা বা শব্দভাবনা ; হাংরি আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে লিখতে দেখলুম না কাউকে, সম্ভবত হাংরি আন্দোলন ব্যাপারটাই এমন । দাদা, তাঁর গভীর পড়াশুনা আর ব্যাপক অভিজ্ঞতার দরুণ, ছিলেন মাল্টিডিসিপ্লিনেরিয়ান ।

অলোক গোস্বামী দাদার ছোটোগল্পের বই “খুল যা সিমসিম” আলোচনায় ( বোধ, মার্চ, ২০০৯ ) একটি ঘটনার কথা বলেছেন, “কফিহাউস থেকে বেরুনোর পথে এক প্রথিতযশা সাহিত্যিক বলেছিলেন, সমীর রায়চৌধুরী পড়েছি । তবে কী যে লেখেন, গল্পের আকারে প্রবন্ধ না প্রবন্ধের আকারে গল্প, বুঝতে পারিনি।” উমবের্তো একোর “দি নেম অফ দি রোজ” সম্পর্কে কয়েকজন আলোচক, বুঝতে না পেরে, এরকম কথাই বলেছিলেন ; এজরা পাউণ্ডের কবিতা সম্পর্কে এখনও এমনতর মন্তব্য ইনটারনেটে পাওয়া যায় । দাদা তাঁর ছোটোগল্পে অন্ধকারকে, জ্যামিতিকে, ভারসাম্যকে, সন্ত্রাসকে, ভয়কে কেন্দ্রচরিত্র দিয়েছেন, যখন কিনা বঙ্কিমচন্দ্রের পর থেকে গল্প লেখা হয়ে আসছে ব্যক্তিএকককে নিয়ে । দাদা তাঁর অন্তর্ঘাতী, ক্যাননভঙ্গকারী, সৃজনশীল রচনাগুলোয় যা ধরার প্রয়াস করেছিলেন তা হল “মানবেতিহসের প্রেক্ষিতে এই মুহূর্তের সংঘর্ষময় নবাঞ্চল”। তাঁর ইতিহাসবোধ কেবল সময়কেন্দ্রিক ছিল না । তাঁর পাঠবস্তুর শরীরেই জ্ঞানের বিকাশে অভিজ্ঞতার ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন, রৈখিক সময়ের একটিমাত্র ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, বস্তুত ‘সময়বোধ’-এ বিপ্লব আনতে চেয়েছেন, এবং চল্লিশ বছরের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষময় জায়গাটাকে ভরে তুলতে চেয়েছেন নবাঞ্চলের ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা দিয়ে, অভেদের সন্ধান দিয়ে  ।

১৯৬৩ সালে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার একটা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ‘জলছবি’ নামে, তা শেষ হয়েছে স্বমেহনের অবিকল বাৎসায়নি বর্ণনা দিয়ে, যা বহু পাঠক ধরতে পারেননি, সম্ভবত অতো আগে তেমন পাঠক গড়ে ওঠেনি :

“উরুসন্ধিতে সাবান বোলাতেই বুক ফুঁড়ে অসংখ্য বুলবুলি উঠে যায় ।

দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ায় । ক্ষিপ্ত মুঠোয় নির্মমভাবে সাপ ধরে ফেলে ।

শিরাউপশিরা ধমনিতে উষ্ণরক্ত টগবগ করে ওঠে । অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া

ছোটে সীমান্তের দিকে । একত্রিত অনিমেষ দ্রুত নিক্ষেপে শরীর ফুঁড়ে

ছিটকে বাইরে বেরোয় । একটা স্তব্ধ মুহূর্ত । বার্তা পৌঁছোয় ।”

যে ধরণের প্রশ্নাবলী সাধারণত বিতর্কমূলক দর্শনে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়, তা দাদা তাঁর কবিতা ও ছোটোগল্পে বুনে দিয়েছেন । দাদার কবিতা ও ছোটোগল্প কেউ-কেউ বুঝে উঠতে পারেননি তার কারণ বঙ্গসমাজের বর্তমান কালখণ্ডে অজ্ঞানতা ও শিক্ষাহীনতা হয়ে উঠেছে গর্ববোধের ব্যাপার । বাঙালির সমাজে পাড়ায় পাড়ায় কোমসোমোলদের চূড়ায় একজন করে ইলিয়া এরেনবুর্গ দিব্বি তাদের সাংস্কৃতিক মধ্যস্হতার পণ্ডিতিয়ানা চালিয়ে রাজত্ব করছিল, যখন দাদা হাংরি আন্দোলনের  পরে, নব্বুই দশকের গোড়ায়, পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরলেন। দাদা বুঝতে পারলেন যে এই কলকাতা, এই পশ্চিমবাংলা, তাঁর সিটি কলেজে পড়ার সময়কার, পাণিহাটিতে থাকার সময়কার, উত্তরপাড়ার বসতবাড়ির খণ্ডহরে থাকার সময়কার বাস্তবতার শহর ও রাজ্য নয়, এই বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন । যে সমস্ত পত্রিকা সে সময়ে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেগুলো তাঁর মনের মতো ছিল না, বেশিরভাগ পত্রিকা ছিল, আছে এখনও, বিশেষ-বিশেষ বৌদ্ধিক কমপার্টমেন্টে কিংবা গোষ্ঠীতে বিভাজিত ।

কলকাতায় ফিরে দাদা “হাওয়া৪৯” নামে একটি সাহিত্যিক-দার্শনিক পত্রিকা প্রকাশের তোড়জোড় করলেন, বন্ধুদের বাড়ি-বাড়ি গেলেন, কিন্তু কেউই আগ্রহ দেখালেন না । কোন বন্ধু ? যে বন্ধুর প্রথম কাব্যগ্রন্হ তিনি নিজের টাকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন, মানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ; যে বন্ধু তাঁর চাইবাসার নিমডি টিলার বাসায় টানা আড়াই বছর ছিলেন, মানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; যে বন্ধু মদ খাবার পরের দিন সকালে খাঁটি দুধ খেতে চান বলে দাদা তার জন্য বাড়ির সামনে দুধ দোয়াতেন, মানে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ; যে বন্ধু তাঁর বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বছর খানেক থেকে উপন্যাস লিখে অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন, মানে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় । দাদার প্রস্তাব শুনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, “হাঃ হাঃ, সমীর চিরকাল নতুন-নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে, ও কলেজের সময় থেকেই অমন।” বার্ধক্যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শরীর যখন ভেঙে পড়েছে, তখন ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন, “সবাই আমার কাছে আসে, শুধু সমীরটাই আসে না, ও কি পুরস্কার চায় না !”

বয়স্ক বন্ধুদের বাড়ি না গেলেও চলতো । দাদা লক্ষ করেননি যে তাঁর অবর্তমানে কলকাতায় ও পশ্চিমবঙ্গের জেলা সদরগুলোয় নতুন প্রজন্মের কবি ও লেখকরা দেখা দিয়েছেন, যাঁদের ভাবনাচিন্তা প্রায় দাদার সমান্তরাল, যাঁরা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক প্রথানুগত চলতি-আড্ডার গুমোট  নয়, ভাষাসাহিত্যের ক্যানন অস্বীকার করতে চাইছেন, যাঁদের পাঠবস্তু ট্র্যান্সগ্রেসিভ এবং অন্তর্ঘাতী । ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে দাদা প্রকাশ করলেন “হাওয়া৪৯” পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ।

১৯৪৯ সালে, যে-বছর দাদা ম্যাট্রিক পাশ করলেন, আমার বয়স ছিল দশ, আমাকে একটা ফিল্ম দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, দাদা পাটনার এলফিনস্টোন সিনেমা হলের মর্নিং শোতে ফিল্মটা আগেও কয়েকবার দেখেছিলেন, আর ভালো লেগেছিল বলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, ফিল্মটার নাম ‘দি উইজার্ড অফ অজ’, নায়িকা জুডি গার্ল্যাণ্ড, পরবর্তীকালে এই ফিল্মটার ডিভিডি কিনে আমি আমার স্কুলপড়ুয়া ছেলে আর মেয়েকে প্রায়ই দেখাতুম । ১৯৯০ সালে, অবসর নিয়ে যখন দাদা কলকাতায় ফিরলেন, তখন বলেছিলেন, গল্প রচনার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, আর ‘দি উইজার্ড অফ অজ’ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, সমাজের ভেতরের সংঘর্ষে ব্যক্তিজীবনের ব্যাখ্যার অতীত দুর্ঘটনাগুলো ওই ফিল্মের জাদুবাস্তব চরিত্রদের মতন হয়ে চলেছে । বস্তুত, তরুণ আর অতিতরুণদের কাছে, কলকাতায় এসে, দাদা দেখা দিলেন সাহিত্যের নবাঞ্চলের উইজার্ড হিসাবে । ২২শে জুন ২০১৬ তাঁর মৃত্যুর পরে ২৪ জুন তেইশটি পত্রিকা একত্রিত হয়ে কলকাতার অবনীন্দ্র সভাঘরে যে স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন, তা থেকেই তাঁর উইজার্ডরির জাদুবাস্তব খেলার সঙ্গে পরিচিত হই ।

১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলনেও দাদা ছিলেন উইজার্ডের ভূমিকায়, কেবল শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের আন্দোলনের প্রতি প্রত্যয় উৎপাদনের জন্যই নয়, অনেক সময়ে বুলেটিন ছাপার খরচ দেবার জন্যও নয়, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যে মননভূমি আগে থেকেই গড়ে তোলা দরকার সে-বিষয়ে পরামর্শের জন্যও । এখন সকলেই জানেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আইওয়া থেকে চিঠি লিখে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখকে হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য প্ররোচিত করছিলেন, কিন্তু দাদাকে তিনি তেমন কোনো চিঠি লিখছিলেন না । ওনারা শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু দাদা হাংরি আন্দোলনে ম্যাটাডরের মতন লাল চাদর নিয়ে ষেঁড়ো লেখকদের থামাচ্ছিলেন । অবশ্য বিবিসি থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ডোমিনিক বার্নের একটি রেডিও প্রোগ্রামের জন্য অসুস্হ শরীরে উৎপলকুমার বসু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তিনি একজন হাংরি আন্দোলনকারী, তার মাস কয়েক পরেই উৎপলকুমার বসু মারা যান ।

ওনারা তিনজনেই যখন আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী হলেন তখন দাদা বলেছিলেন, “অবাক হবার কিছুই নেই”। শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ যখন ছাড়া পাবার জন্য হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার  মুচলেকা লিখে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, তখনও দাদা বলেছিলেন, “ওরা সারাজীবন এই পরাজয়বোধ বয়ে বেড়াবে আর লেখালিখি করবে সেই ক্ষয়রোগের সমর্থনে।” একেবারে অব্যর্থ বলেছিলেন দাদা । দাদার বিরুদ্ধে একটা বাড়তি পেনাল কোডের সেকশান চাপানো হয়েছিল, তরুণদের বিপথগামী করার । চাইবাসার মতন ছোটো জায়গায় দাদার গ্রেপতারি বেশ অপমানজনক ছিল নিশ্চয়ই, দাদার শশুর একজন মোক্তার ছিলেন বলে, আর জেলা শাসক দাদার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলে, তাঁকে লকআপে ঢোকানো হয়নি।

এখানে একটা ঘটনা বলে নিই, নয়তো লিখতে বসে ভুলে যেতে পারি । বড়োজ্যাঠা-মেজজ্যাঠার পরপর মেয়ে হবার দরুণ ঠাকুমা, বংশধরের জন্য বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন । দাদাকে ঠাকুমা তাই খুব ভালোবাসতেন। হাংরি আন্দোলনে দাদা গ্রেপ্তার হয়েছেন শুনে ঠাকুমার সেইদিনই হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল আর মারা যান । ঠাকুমার মৃত্যুর কারণে হাংরি আন্দোলনের সময়ে বাবা আর জেঠা-কাকারা জেঠিমা-কাকিমারা সবাই উত্তরপাড়ায় একত্রিত হয়েছিলেন । বড়োজ্যাঠা ন্যাড়ামাথায় গিয়েছিলেন আমাদের মকদ্দমার প্রথম দিনে, আর কোনো ভাই ন্যাড়া হননি ।

ঠাকুমা, যাঁর নাম ছিল অপূর্বময়ী, আর ঠাকুর্দা যাঁর নাম ছিল লক্ষ্মীনারায়ণ, ওনাদের ছয়  ছেলে প্রমোদ, সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল, বিশ্বনাথ আর এক মেয়ে কমলা । বাবা ছিলেন তৃতীয়, রঞ্জিত, লাহোরে জন্মেছিলেন বলে মহারাজা রঞ্জিত সিংহের নামে ওনার নামকরণ । একান্নবর্তী পরিবারটিকে মোটামুটি একা বইতেন বাবা । নিম্নবিত্ত বলতে যা বোঝায়, তাই । থাকতুমও আমরা পাটনার অতিদরিদ্র পাড়ায় । দাদার শেষ কাব্যগ্রন্হের নাম “অপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয়”। উত্তরপাড়ার বসতবাড়ি খণ্ডহর হবার আগে, নকাকা-নকাকিমার সবে বিয়ে হয়েছে, তখন ওনারা সাবর্ণ ভিলার দুটো বিশাল ঘরে “অপূর্বময়ী  বিদ্যালয়” নামে বাচ্চাদের একটা স্কুল খুলেছিলেন ; স্কুলটা উঠে যায় ওনাদের দুজনের মধ্যে অবনিবনার কারণে, তখনকার দিনে তো কথায়-কথায় ডিভোর্স ব্যাপারটা ছিল না ।

দাদার প্রধান অবদান দুটি শতকের সাহিত্যিক-নান্দনিক বৈভিন্নকে দুই হাত দিয়ে টেনে নিজের বুকের কাছে এনে একটা সেতু গড়ে ফেলা, এবং সেকারণেই দাদা আগ্রহী করতে পেরেছিলেন আগের শতকের প্রভাত চৌধুরী, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের পাশাপাশি পরের শতকের অনুপম মুখোপাধ্যায়, তুষ্টি ভট্টাচার্য প্রমুখকে, অথচ দাদা কোনো সংবাদপত্র বা পাবলিশারের পেটোয়া লেখক ছিলেন না ; ওপরে শঙ্করনাথ চক্রবর্তীর কবিতাটা পড়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়ে থাকবে । দাদার এই ধরণের বক্তব্য যে, “শব্দের ভেতরে শব্দেরা পাশ ফিরে থাকে”, “একটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একাধিক বাক্য”, “গল্পেরা আমার মাধ্যমে জন্মায়, কলম থেকে নয়”, “তুমি নিজের পারিবারিক ইতিহাসের ভেতরে যেমন জন্মাও, তেমনই স্বদেশের ইতিহাসের ভেতরে” ইত্যাদি কথাগুলো তাঁর অভিজ্ঞতাসঞ্জাত ।

অভিজ্ঞতা জমেছে শৈশবে পাটনা শহরে অন্ত্যজপাড়া ইমলিতলায় থাকার সময় থেকেই । তাঁর সময়ের আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক কি এমনতর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন, তাঁদের শৈশবে ! ছোটোবেলায় দাদার একটা চোখ ট্যারা ছিল, ট্যারা চোখ সোজা করার জন্য ডাক্তার দেখাবার মতন টাকাকড়ি বাবার ছিল না কেননা ওনাকে কুড়িজনের একান্নবর্তী পরিবার চালানো ছাড়াও উত্তরপাড়ায় ঠাকুমার খরচ আর বসতবাড়ির ট্যাক্স পাঠাতে হতো ; বাবার দোকানে আড্ডা মারতে আসতেন এক বৃদ্ধ, যিনি ছিলেন বিখ্যাত চোখের ডাক্তার দুকখন রামের ( জগজীবন রামের বাবা ) কমপাউণ্ডার, তিনি আরেকজন বালকের ট্যারা চোখ সোজা করার প্রেসক্রিপশানের নকল এনে দিলে বাবা দাদার চশমা করিয়ে দিয়েছিলেন, গান্ধিছাপ গোল চশমা, ডাঁটিটা স্প্রিঙের ; দাদার ট্যারা চোখ বছর দুয়েকে সোজা হয়ে গেল কিন্তু বাঁ-চোখটা সারাজীবনের মতন খারাপ হয়ে গেল ।

ইমলিতলা ছিল অন্ত্যজ বিহারি আর অত্যন্ত গরিব শিয়া মুসলমানদের পাড়া ; এই পাড়ায় চোর-পুলিস খেলার সময়ে যেকোনো বাড়ির ভেতরে ঢোকা যেতো, কেউই বারণ করতো না, মসজিদের ভেতরে মাদুরের আড়ালে লুকোনো যেতো, যদিও বড়োজ্যাঠামশায় তা পছন্দ করতেন না। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে কানা গলি ছিল তার শেষে একটা বস্তি ছিল, বস্তিতে গাঁজা গাছের ঝোপ, ওই গাছের ফুল শুকিয়ে বউ-মরদরা ফুঁকতো, দাদার গাঁজা ফোঁকার হাতেখড়ি সেখানেই হয়ে গিয়েছিল, আমার আর মেজদারও । দাদার কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর বন্ধুরা গাঁজা ফুঁকতেন বলে মনে হয় না । দাদা আমাদের সঙ্গে নেপালে গেলে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে, হিপিদের জমায়েতে, গাঁজা হ্যাশিশ আর এল এস ডি নিয়েছিলেন, মোষের কাঁচা মাংসের পদ চাল-গমের মদ রাকসির সঙ্গে খেয়েছিলেন । নেপালের সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় দাদার ছবি ছাপা হয়েছিল । পরে দাদা নেপালি কবিলেখক আর হাংরি আন্দোলনকারীদের একটা যৌথ সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন, যার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন অনিল করঞ্জাই ।

কানা গলির শেষের বস্তিতে শুয়োর মেরে খাওয়া হতো, তাড়ি সহযোগে । সন্ধ্যাবেলায় গনগনে লোহা ঢুকিয়ে গর্তে ফেলা শুয়োর মারার আর্তনাদ পেলে দাদা পরের দিন বলতেন, চল শুয়োরের মাংস খাব তাড়ি দিয়ে, রান্নাঘর থেকে এলাচ নিয়ে নে, ফিরে এসে ফিটকিরি দিয়ে দাঁত মেজে নিস । সেই সব গরিব পরিবারের পুরুষ সদস্যরা চুরি-ডাকাতি-পকেটমারি করে সংসার চালাতো, তাদের কাউকে গ্রেপতার করার জন্যে পাড়ায় পুলিশ ঢুকলে দাদা বলতেন চল চল ছাদে চল ; ছাদে গিয়ে দেখতুম সন্দেহজনকরা গোলটালির ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে পেছনের আমবাগানে । পাড়ায় দাদার সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে একজনের বাবা পকেটমার ছিল, সেই বন্ধুও বাপের কাছে পকেট মারা শিখছিল, দাদা তাকে বদ্রি পাটিকমার বলে ডাকতেন । দাদা বাড়িতে এসে বলেছিলেন, বদ্রির কুঁড়েঘরে ইশকুলের মতন ব্যাপার, এ-পাড়ার আর অন্য পাড়ার অনেক ছোঁড়া শিখছে, দুআঙুলে পার্স তোলা, আধখানা ব্লেডে কাটা, এইসব ।

আমাদের বাড়িতে খাঁচাকলে ইঁদুর পড়লে বস্তির দুসাধদের দেয়া হতো, পুড়িয়ে খাবার জন্য । দাদা, মেজদা আমি শৈশবে ইঁদুরপোড়া চেখেছি । যদি জাঁতিকলে ইঁদুর পড়তো তাহলে দাদা ছাদে গিয়ে কিংবা মাঠে গিয়ে, ইঁদুরের ল্যাজ ধরে “চিল কা বাচ্চা চিলোড়িয়া” বলে ঘোরাতেন আর আকাশে চিলেরা পাক খেতে আরম্ভ করলে ছুঁড়ে দিতেন, একটা চিল ঠিকই ইঁদুরটাকে ধরে নিয়ে পালাতো । পরে আমি আর মেজদাও এই খেলা খেলেছি ।

ইমলিতলায় গুলি, টেনিসবলের ফুটবল, ড্যাঙগুলি, লাট্টুখেলায় দাদা ছিলেন ওস্তাদ, সাইকেলের টায়ারকে কাঠি মেরে মেরে গোলা রোডের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবার প্রতিযোগীতায় দাদা জিততেন প্রতিবার । কিন্তু কাঁইবিচি মানে পাকা তেঁতুলের বিচি আর কলকে ফুলের বিচি যাকে পাড়ায় বলা হতো কানায়েল, সেগুলো গর্তে ফেলার আর টিপ করে মারার খেলায় মেজদা জিততো । টেনিসবল নর্দমায় পড়ে গেলে গুয়ের ভেতর থেকে কাঠি দিয়ে বের করে আনতে হতো, আর বাড়ির কেউ দেখে ফেললে, সন্ধ্যায়, শীতকাল হলেও, চান করে গায়ে গঙ্গাজল ছেটাতে হতো । কম বয়সে পৈতে হয়ে গিয়েছিল বলে বকুনিটা বেশি করে খেতে হতো দাদাকে । বড়দি-ছোড়দির বিয়ে হয়ে যাবার পর সন্ধ্যার সময়ে গামছা পরে চৌকাঠগুলোয় গঙ্গাজল ছেটাবার আর শাঁখ বাজাবার কাজ ছিল দাদার ।

বাবা তাই দাদাকে একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন । দাদা পাড়ায় ফুটবল টিম গড়ে অন্য পাড়ার টিমের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতার আয়োজন করতেন । শিল্ডটা দাদা নিজে তৈরি করতেন, পিচবোর্ডকে শিল্ডের মতন কেটে তার ওপর ব্রুকবণ্ডের রাঙতা মুড়ে আর লাল রঙের রিবন সেঁটে । মাঠে খেলতে গেলে, এখন তার নাম গান্ধি ময়দান, একদিকের গোলপোস্ট হতো দাদার দুপাটি জুতো দিয়ে, অন্য দিকেরটা বিরজু নামে দাদার এক পাড়াতুতো খোঁড়া বন্ধুর, তার মা ছাতু বিক্রি করতেন । দাদা ফেরার সময় জুতো পরে আসতে ভুলে যেতেন আর পুজো পর্যন্ত বিনা জুতোয় থাকতেন, স্কুলও যেতে হতো খালি পায়ে, কেননা বাবা সকলের জুতো বছরে ওই একবারই কিনে দিতেন, মহালয়ার আগে । খালি পায়ে স্কুলে যাওয়া এড়াতে দাদা একজন জজের জুড়িগাড়িতে, পেছন দিকে যেখানে আর্দালি দাঁড়ায়, সেখানে বসে চলে যেতেন, জজ সায়েবকে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময়ে আর্দালির দাঁড়াবার জায়গা তো ফাঁকা থাকতো ।

ইমলিতলায় শাসনের ভার ছিল বড়োজ্যাঠার ওপর । ওনার খাটের তলায় শরকাঠির গোছা ছিল তা থেকে একটা টেনে বের করে হাতের চেটোয় মারতেন, শরকাঠি অবশ্য দুতিনবারেই ভেঙে যেতো । বড়োজ্যাঠা দাদার নাম ধরে হাঁক পাড়লেই দাদা আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে লাফ মেরে হুলাসবাবুদের বাড়ির ছাদে গিয়ে ওনাদের চারটে সিঁড়ির কোনো একটা দিয়ে নেমে পালাতেন, ফিরতেন বড়োজ্যাঠা অফিস চলে গেলে কিংবা ভুলে গেলে । দুটো বাড়ির মাঝের গলি ছিল অন্তত চার ফিট । হুলাসবাবু তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ নিয়ে একটা খেলা খেলতেন যা দাদার পছন্দ ছিল ; কুরুশকাঠির মতন একটা লোহার কাঠি যাকে ‘শ্রীরামশলাকা’ বলা হতো, সেটা কোনো একটা খোপে চোখ বুজে রাখা ; যেখানে-যেখানে  রাখা হতো সেই অক্ষরগুলোর সাহায্যে কোনো দোহা চিহ্ণিত করে ব্যাখ্যা করে হুলাসবাবু ভবিষ্যত বলতেন । এই খেলা নিয়ে “টিনিদির হাত” নামে দাদার একটা গল্প আছে ‘খুল যা সিমসিম’ গল্পগ্রন্হে ।

স্কুলের শেষ ধাপ পর্যন্ত, অর্থাৎ ম্যাট্রিকুলেশান অব্দি, দাদার পড়ার টেবিল বলতে ছিল একটা বড়ো মাপের প্যাকিংবাক্স, বাবার ফোটোগ্রাফির দোকান থেকে আনা, তার ওপর মায়ের পুরোনো শাড়ি পাতা । দাদাকে মেঝেয় বসে পড়তে হতো, রাতে লন্ঠনের আলোয় । লন্ঠনের কাচের ভুষো দাদাকে পরিষ্কার করতে হতো । কাচ ভেঙে গেলে দাদা বাতি জ্বেলে রসুন দিয়ে জুড়ে নিতেন যতো দিন চলে । মা ছিলেন রান্নাঘরের ইনচার্জ, সুতরাং মায়ের আদেশে দাদাকে কয়লা ভাঙতে হতো, বাতিল প্যাকিংবাক্সের কাঠ টুকরো করতে হতো উনোনের জন্য, অনেকসময়ে সকালে পোড়া কয়লা  বের করে উনোন সাজিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে হতো । পোড়া কয়লার সাদা অংশ আলাদা করে রেখে দিতে হতো যাতে তার সঙ্গে ফটকিরির গুঁড়ো মিশিয়ে বাবা বাড়ির সকলের জন্য দাঁতের মাজন তৈরি করে দিতে পারেন ।

মেজজ্যাঠা জামের ভিনিগারের ব্যাবসা আরম্ভ করার তোড়জোড় করে ছিলেন, যদিও চলেনি । আড়াই-তিন ফিটের এনামেলের গামলা জামে ভরে  দাদাকে তার ওপর লেফ্ট-রাইট করতে বলতেন, পরে আমিও করেছি । লেফ্ট-রাইট করার সময়ে দাদা একটা গান গাইতেন, “তুফান মেল, ইসকে পইয়ে জোর সে চলতে, অওর অপনা রাস্তা তয় করতে, সবহি ইসসে কাম নিকালে, বচ্চে সমঝে খেল, তুফান মেল”, কাননবালার গান সম্ভবত, স্মৃতি থেকে লিখছি ।

সন্ধ্যাবেলা পড়াশুনার শেষে বড়োজেঠিমা আমাদের গল্প বলতেন, ঠাকুমার ঝুলি, পঞ্চতন্ত্র, ইশপের ফেবল, আরব্য রজনীর খিচুড়ি বানিয়ে ওনার নিজস্ব গল্প । আমরা জাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনরা লন্ঠন ঘিরে ওনার গল্প শুনতুম । শুনতে-শুনতে দাদা লন্ঠন নিভিয়ে দিতেন, বলতেন, “আলো জ্বললে গল্পটা দেখতে পাবো না”। দাদার গল্পে যে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তব তার উৎস বড়োজেঠিমার অবিশ্বাস্য গল্পগুলো । দাদার গল্পগুলোয় জাদুবাস্তবতার আরেকটা কারণ হলো, যেকারণে দাদা তাঁর পত্রিকার নাম রেখেছিলেন “হাওয়া-৪৯” বা ঊনপঞ্চাশ বায়ু, তা হল এই যে পাটনা কলেজিয়েট স্কুল, যে স্কুলে দাদা পড়তেন, তা এক সময়ে ছিল পাগলাগারদ, সেই বিলডিং ভেঙে স্কুলের বিলডিঙ তৈরি হয়, পরে পাগলাগারদ রাঁচিতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় । স্কুলের ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে পাগলদের সম্পর্কে নানা আজগুবি কুহকের গল্প ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে আদান-প্রদান করতো, চোর-পুলিশ লুকোচুরির বদলে পাগল আর সুস্হমগজের খেলা খেলতো । অবসরের পর বাঁশদ্রোণীতে পাকাপাকি থাকার সময়ে দাদা এক মুসলমান চাবিঅলা, ঠেলাগাড়ির সবজিঅলা আর নাপিতের সঙ্গে বাড়ির বারান্দায় খোশগল্প করতেন আর তাদের কাছ থেকে যে জাদুবাস্তব জগতের আভাস পেতেন তা তাঁর গল্পে কাজে লাগতো। “তোমাদের বাড়ির রোদ”, এই অভিব্যক্তি দাদা পেয়েছিলেন তাঁর বাংলাদেশি কাজের-বউয়ের কাছ থেকে, যে রোদ, দাদার মনে হয়েছিল, একযোগে স্হাবর ও অস্হাবর সম্পত্তি । তেমনই বাড়ির নিজস্ব অন্ধকার, যা পাওয়া যাবে দাদার ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে ।

দাদার আরেকটি স্মৃতি ছিল পাণিহাটির রাঙাদিদুকে কেন্দ্র করে, যিনি কম বয়সে বিধবা হয়ে যাবার দরুন সংসারছাড়া হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে সবাই নেড়ি পাগলি বলতো, তিনি দাদাকে ভালোবাসতেন আর কোলে বসিয়ে নানারকম আজগুবি গল্প শোনাতেন । মামার বাড়ির ব্যানার্জি পাড়া রোডে যখন যার বাড়িতে ইচ্ছে খেতেন রাঙাদিদু, দাওয়ায় শুতেন, মাথা গোলমাল হলেও সমাদৃত ছিলেন, পাড়ায় পাড়ায় সারাদিন টোটো করে বেড়াতেন । উনি ছিলেন দাদামশায়ের কোনো ভাইয়ের স্ত্রী । নাপিত দেখলেই বেলতেন, ‘এই হারু, আমার মাথাটা ন্যাড়া করে দে দিকিনি’ ।

দাদার কাছে একটা খেলা শিখেছিলুম যা আমি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” স্মৃতিকথায় লিখেছি । একটা নীল মাছিকে মেরে, সুতোর একদিকে বেঁধে দাদা ছুঁড়ে দিতো গোপাল হালুইকরের জিলিপির পাহাড়ের ওপরে, সেই পাহাড়ে ভিমরুলের ঝাঁক । একটা ভিমরুল মাছিটাকে কামড়ে ধরে মিষ্টির বদলে ননভেজ খাওয়াই পছন্দ করতো, মুখ থেকে ছাড়তে চাইতো না, পেট না ভরা পর্যন্ত । দাদা অন্য প্রান্তটা ধরে ঘুড়ির মতন ওড়াতে-ওড়াতে ইমলিতলার এগলি-সেগলি দৌড় মারতেন, পেছনে পাড়ার ছেলেরা ।

গোলা রোড দিয়ে শব গেলে শববাহকরা ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ বলতে বলতে যেতো, যা শোনা যেতো ইমলিতলার বাড়ি থেকে । মৃতের আত্মীয় শবের সামনে হাঁটতে-হাঁটতে খইয়ের সঙ্গে তামার পয়সা ছেটাতো । শববাহকদের কন্ঠস্বর শুনতে পেলে দাদা বলতেন, “চল চল পয়সা লুটবো” । আমি আর মেজদা দাদার পেছন -পেছন দৌড়োতুম, আর পয়সা কুড়োতে-কুড়োতে ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ ধ্বনি তুলতুম । দাদা পয়সা জমিয়ে আলুকাবলি খেতেন বা সিনেমা দেখতেন, একেবারে সামনের শ্রেণির, যাকে তখন বলা হতো ছওআনিয়া, বা তখনকার চব্বিশ পয়সা। সিনেমা দেখা আমাদের বাড়িতে নিষিদ্ধ ছিল, বড়োজ্যাঠা আর ঠাকুমা পছন্দ করতেন না, সিনেমাকে বলতেন লোচ্চাদের তামাসবিনি । বয়স্করা লক্ষ্য রাখতেন যে তিনটে থেকে ছ’টা টানা তিন ঘণ্টা ছোটোরা কেউ বাড়িতে অনুপস্হিত থাকছে কিনা । দাদা একটা উপায় বের করেছিলেন ; একদিন প্রথমার্ধ উনি দেখে গেটপাসটা আমায় দিতেন দ্বিতীয়ার্ধ দেখার জন্য, পরের দিন আমি প্রধমার্ধ দেখতুম আর দাদা দ্বিতীয়ার্ধ । মরনিং শো দেখতে গেলে বাড়িতে কেউ টের পেতেন না । অমন একটা মরনিং শোতে দাদা আমাকে ‘উইজার্ড অফ অজ’ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন ।

দাদার জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটিতে, মায়ের মামার বাড়িতে, ব্যানার্জি পাড়া রোডে, এখন রাস্তাটার অন্য কোনো নাম হয়েছে ; দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কম বয়সে মারা যাওয়ায় দিদিমা ছেলে মেয়েদের নিয়ে বড়ো ভাই অনাদিনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে আশ্রয় পান । মায়ের বাপের বাড়ি, যার নাম “নিলামবাটি”, তা ছিল অনাদিনাথের বাড়ির উল্টোদিকে । পাণিহাটিতে দাদার নাম রাখা হয়েছিল বাসুদেব, সেখানে সকলে বাসু নামেই চেনে দাদাকে, মা-ও দাদাকে বাসু নামে ডাকতেন । পাটনায় আসার পর, জাঠতুতো দিদিরা দাদাকে মিনু বলে আদর করা আরম্ভ করেন, দাদা মীনরাশির জাতক বলে । সমীর নাম রাখা হয়েছিল জন্মছকে ‘স’ উঠেছিল বলে । জাঠতুতো দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলে ওনাদের বাড়িতে ভাইফোঁটা করতে যেতুম দুজনে, মেজদা যেতো না। ইমলিতলার বাড়িতে ভাইফোঁটা হতো তার আগের দিন, প্রতিপদে, সাবর্ণ চৌধুরীদের পারিবারিক সংস্কার রক্ষার খাতিরে ।

ইমলিতলায় দাদার জিভে বাংলা আর পাটনাইয়া হিন্দির খিচুড়ি তৈরি হচ্ছিল বলে দাদাকে ভর্তি করা হয় বাঙালি পরিবার পরিচালিত মহাকালী পাঠশালায় । দাদার জন্ম যদিও ১৭ আগস্ট, কিন্তু ভর্তির সময়ে পুরুত মশায় সতীশ ঘোষালের উপদেশে দাদার জন্ম তারিখ পাল্টে করে দেয়া হয়েছিল ১লা নভেম্বর, ১৯৩৩ । ইমলিতলার বাড়িতে জন্মদিন পালনের কোনো ব্যাপার ছিল না ; দাদার জন্মদিন পালনের কোনো ঘটনা দরিয়াপুরে চলে যাবার পরও ঘটেনি । জন্মদিন যে উৎসব হিসেবে পালন করা হয় সেই সাস্কৃতিক স্তরে ছিল না আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ।

মহাকালী পাঠশালায় পড়া শেষ করলে দাদাকে ভর্তি করা হয় পাটনা কলেজিয়েট স্কুলে । এই স্কুলে দাদা পাটনার খ্যাতনামা বাঙালি পরিবারের ছেলেদের পান, যেমন বিমানবিহারী মজুমদার, গোপাল হালদারের ভাই রঙিন হালদার, প্রভাতী পত্রিকার সম্পাদক মানিক ভট্টাচার্য, জহর রায়ের বাবা সতু রায়, নিরঞ্জন সেনগুপ্ত প্রমুখ । দাদার আগ্রহে একটা নাটকের দল গড়ে ওঠে, আর বন্ধুরা মিলে বড়দির শশুরের বিশাল জমিদারবাড়ির দালানে নাটক অনুষ্ঠান করতেন । দাদার পাটনার বন্ধুরা কিন্তু আমাদের ইমলিতলার বাড়িতে আসতেন না, ছোটোলোকদের পাড়া বলে।

ম্যাট্রিকুলেশানের পর দাদাকে কলকাতায় পড়তে পাঠাবার নির্ণয় নেন বাবা-মা, তার কারণ আমার মেজদা ( যাকে বড়োজেঠা এক বেশ্যার কাছ থেকে দেড়শো টাকায় কিনেছিলেন ) নিজের জন্মের কথা কোনো সূত্রে জানার পর, যাকে বলে “খারাপ হয়ে যাওয়া” তাই হয়ে যাচ্ছিল, বাংলায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মায়ের মামার বাড়িতে । মামারা দাদাকে সিটি কলেজে আই এস সি পড়ার জন্য ভর্তি করে দেন । মামার বাড়িতে ছোটোমামা ছিলেন মার্কসবাদে আকৃষ্ট, প্রচুর বই ছিল ওনার সংগ্রহে, নিজের সংগ্রহের শতাধিক বই দাদাকে দিয়ে দিয়েছিলেন । তাছাড়া ওই বাড়িতে বৈঠকখানায় ইংরেজি ও বাংলা বইয়ের একটি গ্রন্হাগার ছিল, পুরোনো আমলের পত্রিকা ছিল,  দেয়ালে টাঙানো ছিল উনিশ শতকের মনীষীদের ছবি, সেই ঘরে সন্ধ্যাবেলায় পাণিহাটির বয়স্করা একত্রিত হতেন দার্শনিক তর্কাতর্কির জন্য ।

মামার বাড়ির শিক্ষা আর পারিবারিক সংস্কৃতি দাদার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছিল । দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কারকারী স্যার রোনাল্ড রসের সহগবেষক, গ্রেট ব্রিটেনের সপ্তম এডোয়ার্ডের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন । পাণিহাটির কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন দাদামশায় । তাঁর নামে পাণিহাটিতে একটি রাস্তা আছে । ব্যাঙ্কে তাঁর ফোটো  ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত টাঙানো ছিল, পাণিহাটির মিলিউ পালটে যাবার পর ছবিটি ফেলে দেয়া হয়েছে । তাঁর সঙ্গে আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীর পরিচয় ছিল, এবং সেই সূত্রেই মা-বাবার বিয়ে । মায়ের নাম অমিতা। দাদা আর আমি দুই ভাই, নিজেদের কোনো বোন নেই।

মায়ের মামার বাড়ির শৃঙ্খলা দাদার ইমলিতলা চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না । তাছাড়া সেসময়ে ইলেকট্রিক ট্রেন আরম্ভ হয়নি, প্যাসেঞ্জার ট্রেনে শেয়ালদায় আসা-যাওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না । শেয়ালদা স্টেশানও হাওড়া স্টেশানের তুলনায় পুর্বপাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুতে ছিল ছয়লাপ, প্রতিদিন যাদের দুরবস্হা দেখতে-দেখতে দাদার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছিল । তাছাড়া ঠাকুমার পছন্দ ছিল না যে দাদা পাণিহাটিতে মায়ের মামার বাড়িতে থাকুন । দাদা চলে এলেন উত্তরপাড়ায় ঠাকুমার বারো ঘর চার সিঁড়ির খণ্ডহর সাবর্ণ ভিলায়, বেছে নিলেন চিলেকোঠার ঘর,  ঠাকুমাকে এড়িয়ে এই ঘরে সিগারেট ফোঁকা যেত। পাণিহাটিতে রাতে বাড়ি ফিরতেই হতো, তার কারণ মামারা কলকাতায় চাকরি করতে যেতেন আর ফিরতেন, তা যতো রাতই হোক, ট্রেন পাইনি বলে ওজর দেবার সুযোগ ছিল না । ঠাকুমা একা থাকতেন, তাই রাতে কলকাতায় থেকে গেলে তাঁকে যা হোক কোনো গল্প শুনিয়ে দিতে পারতেন দাদা । উত্তরপাড়ার বাড়িতে আদ্যিকালের একটা পেল্লাই বিছানা দাদাকে বরাদ্দ করেছিলেন ঠাকুমা, যার পায়াগুলো ছিল বাঘের পায়ের মতন ।

উত্তরপাড়ার বাড়ি থেকে প্রতিবেশী অমিত মৈত্র নামে একজনের সঙ্গে দাদা “লেখা’ নামে একটা পত্রিকা আরম্ভ করেন । সিটি কলেজের দেয়াল পত্রিকায় একজনের কবিতা প্রশংসনীয় মনে হওয়ায় দাদা আর্টস বিভাগে গিয়ে সেই ছাত্রটির সঙ্গে পরিচয় করেন । ছাত্রটির নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । দাদার সঙ্গে এই সময়ে পরিচয় হলো আনন্দ বাগচি, দীপক মজুমদার, শংকর চট্টোপাধ্যায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, শিবশম্ভু পাল, ফণীভূষণ আচার্য প্রমুখের , যাঁরা প্রায়ই ছুটির দিনে দাদার চিলেকোঠায় আড্ডা মারতে আসতেন । এনারা কেউ না কেউ দাদার জন্যে খাবার আনতেন ছুটির দিনে । কলেজের দিনে দাদা কলকাতার পাইস হোটেলে খেতেন, সাধারণত কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের পাইস হোটেলে বা শ্যামবাজারের পাইস হোটেলে । “কৃত্তিবাস” পত্রিকা আমি প্রথম দেখি দীপক মজুমদারের হাতে, শ্যামবাজারের পাইস হোটেল থেকে খেয়ে দাদা আর আমি বেরিয়েছি, ওনার সঙ্গে দেখা। দাদা ওনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দ্যান প্রখ্যাত কবি আর সম্পাদক হিসেবে ।

ইমলিতলার পরিবেশ থেকে মুক্ত করার জন্য দাদাকে সিটি কলেজে পড়তে পাঠানো হলেও পিসতুতো ভাই সেন্টু ওরফে অজয় হালদার দাদাকে কলকাতার সেই পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করাতে কার্পণ্য করলেন না । পিসেমশায় থাকতেন আহিরিটোলার শরিকি বাড়িতে, নিয়মিত সোনাগাছি যেতেন আর ধেনো মদ খেতেন। সেন্টুদার সঙ্গে পরিচয় ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, সম্ভবত কোনো মদের জমঘটে তাঁদের প্রথম আলাপ । দাদার সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় হলো । দাদার চিলেকোঠার ঘরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন আর দীপক মজুমদার গাইতেন হিন্দি ফিলমের গান । সেন্টুদা আর দীপক মজুমদারের তর্কাতর্কি হতো হিন্দি ফিলমের রেহানা, কুলদীপ নায়ার, সুরাইয়া, মধুবালার যৌনতা নিয়ে । একবার তর্কে হেরে যেতে যেতে সেন্টুদা হঠাৎ দীপক মজুমদারকে বলে ওঠেন “তুমি রেহানার ওখানে হাত দিয়ে দেখেছো নাকি !”

ও, হ্যাঁ, দাদার সম্পর্কে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল, ভুলে যাবার আগে লিখে ফেলি । বেনারসে কাঞ্চনকুমার মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে যোগ দিলে ওর বন্ধু হাংরি আন্দোলনের ছবি-আঁকিয়ে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়েছিল । এই ঘটনাটা নেপাল থেকে আমরা ফেরার পর । নেপাল থেকে অনিল আর করুণা একটা করে ‘রেড বুক’ কিনেছিল, আমিও কিনেছিলুম । সস্তায় পাওয়া যাচ্ছিল বলে ওরা দুজনে চিনে তৈরি লাল টকটকে মাও সে তুঙ কোট কিনেছিল । আমি আর দাদা কিনিনি, আমার রঙচঙে পোশাকের অ্যালার্জি আছে, আর বিহারের জাতপাতে আক্রান্ত মার্কসবাদ দেখে দাদা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল । বেনারসে অনিলের বাঙালিটোলার স্টুডিওতে কিংবা কাঞ্চনের বাড়ির গ্যারাজের ওপরের ঘরে বেনারসের নকশালদের জমায়েত হতো । বেনারসের বাঙালিটোলার পেইনটারদের সঙ্গে অ্যালেন গিন্সবার্গ আর পিটার অরলভস্কির পরিচয় হয়েছিল ।

একদিন একজন সাংবাদিকের কাছে ওরা জানতে পারলো যে অনিলের স্টুডিওয় পুলিসের রেইড হতে পারে আর হয়তো ওদের গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে । কলকাতায় নিয়ে যাওয়া মানেই মাঝপথে কোতল । অনিল দিল্লি পাড়ি মারলো আর  আমেরিকান বন্ধুনির সঙ্গে পালালো আমেরিকা, কাঞ্চনও আমেরিকা চলে গেল । করুণার বউ-ছেলে ছিল, ও এসে আমাদের পাটনার বাড়িতে লুকোলো । দাদার পরামর্শে করুণা চুল-দাড়ি কামিয়ে প্রায় ন্যাড়া হয়ে ধুতি-গেঞ্জিতে বিহারি সীতেশবাবু হয়ে গেল, আর দাদা করুণার জন্য একটা রঙিন মাছের দোকান খুলে দিলেন । মাসখানেক বাদে বউ-ছেলেকে পাটনায় ডেকে পাঠালো করুণা । বছর দুয়েক পরে অনিল দিল্লি ফিরলে করুণাও চলে গেল দিল্লি ; কাঞ্চন ফিরল কলকাতায় । নকশাল আন্দোলনের দরুণ বেনারসের বিশাল বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয় কাঞ্চনকে । অনিল আশির দশকে আইরিশ শিল্পসমালোচক জুলিয়েট রেনোল্ডসকে বিয়ে করেছিল । জুলিয়েট পরে অনিলের স্টুডিওতে গিয়েছিলেন, ওর লেখাপত্র আর পেইনটিঙ রেইডের সময় নষ্ট করে দিয়েছিল পুলিস, কিছুই উদ্ধার করা যায়নি ।

ওফ হো, আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল, এই সুযোগে বলে নিই । ১৯৬৮ সালে আমি অফিসের কাজে গিয়েছিলুম নাগপুর, সেখানে নভেম্বরের শেষে পরিচয় হল সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে । কয়েকদিন পরে ওকে বললুম, আপনাকে বিয়ে করার জন্য আপনাদের বাড়িতে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে । সলিলা বলেছিল, বড়ো মামার সঙ্গে । ওদের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলুম সলিলা রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় ছিল, ড্রইংরুমে শিল্ড আর নানা মাপের কাপ । বিয়েতে ওর মত আছে দেখে দাদাকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলুম আর বউদিকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলুম । পাটনায় বাবাকেও টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলুম । দাদা প্রথম ট্রেনেই চলে এলেন নাগপুর, সেসময়ে নাগপুরের প্লেন চালু হয়নি, হলেও দাদাকে চাইবাসা থেকে জামশেদপুর হয়ে কলকাতা গিয়ে নাগপুর পৌঁছোতে হতো । দাদা চক্রধরপুর থেকে সোজা পৌঁছে গিয়েছিলেন নাগপুর । সলিলার বড়োমামার সঙ্গে কথা বলে ফিরে গিয়েছিলেন । বিয়েও ঠিক হয়ে গেল ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮ । দাদা তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন আর বউদি, মেয়ে হনি আর দাদার শাশুড়িকে নিয়ে চলে এলেন । বাবা-মা এলেন না কেন, তখন টের পাইনি । ভেবেছিলুম প্রেমিক হিসাবে আমার কীর্তিকলাপ সম্পর্কে ওনারা রুষ্ট বলে হয়তো আসেননি । বউদিও তড়িঘড়ি চলে এসেছিলেন একই কারণে, আমার প্রেমিকত্বর সিরিজ শেষ করার জন্য । বিয়ের পর পাটনায় যাবার বদলে দাদা টিকিট কাটলো চক্রধরপুরের । চক্রধরপুর থেকে গাড়িতে চাইবাসা । চাইবাসায় গ্যাঁদাফুলে গ্যাঁদাশয্যা, খাটও এমন যে ক্যাঁচোর-ম্যাচোর আওয়াজ হয় । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম করার অভিজ্ঞতা ছিল খাটখানার । কয়েক দিন পরে পাটনা গেলুম। গিয়ে জানতে পারলুম যে মেজ জ্যাঠামশায় মারা গেছেন আর ওনার অশৌচ চলছে । অশৌচের মধ্যেই বিয়ে করে ফিরলুম আর যেদিন লোক খাওয়ানো সেইদিনই বউভাত হলো । দাদা সব চেপে গিয়েছিলেন যাতে বিয়েটা বানচাল হয়ে না যায় । মা সেন্টুদার হাতে একটা চিরকুট পাঠিয়ে দাদাকে লিখেছিলেন, “সিঁদুর পরিয়ে আনলেই হবে।” মানে, মাও চাইছিলেন যাতে বিয়েটা ফসকে না যায় ।

উত্তরপাড়ায় ফিরি । দাদা বি এস সি পাশ করে জার্নালিজমে ভর্তি হয়েছিলেন । বাবা ডেকে পাঠালেন পাটনায় । বাবার দোকানে আড্ডা মারতে আসতেন বিহার সরকারের মৎস্য দপতরের বিভাগীয় প্রধান মিস্টার ভর্মা । তিনি বাবাকে বলেছিলেন দাদাকে যদি ফিশারিজ ইন্সপেক্টরের চাকরিতে ভর্তি করতে চান তাহলে ডেকে পাঠাতে । দাদা পাটনায় ফিরলে চাকরিটা পেয়ে গেলেন । তাঁর নিয়োগে একটাই অসুবিধে ছিল যে তিনি বাঁচোখে দেখতে পেতেন না । মিস্টার ভর্মার সহৃদতায় ডাক্তারি পরীক্ষার সময়ে ডাক্তারই বলে দিয়েছিল কেমন করে চোখের চেকআপটা করাতে হবে । চাকরি পাবার পর দাদার পোস্টিং হল বিভিন্ন জেলা সদরে মিষ্টিজলের মাছ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের জন্য । তারপর বিহার সরকার পাঠিয়ে দিল কোচিতে, সামুদ্রিক মাছ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের জন্য ; এই সময়ে দাদা মাছ ধরার জাহাজে বেশ কিছুকাল আরব সাগরে কাটিয়েছিলেন ।

ফেরার পর দাদার পোস্টিঙ হল চাইবাসায় । দাদার বন্ধু বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ভাগলপুরে দাদার সঙ্গে একই মেসে থাকতেন, তাঁর বিয়ে হল চাইবাসায় মধুটোলা নিবাসী সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেজ মেয়ে ডলির সঙ্গে । দাদা চাইবাসাতেই চাকরি করেন জেনে মধুটোলা বাড়ির সদস্যরা বললেন, সময় কাটাবার জন্য মাঝে-মাঝে আসতে । দাদা কবিতা আর গল্প লেখেন, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জেনে ওই বাড়ির বড়ো মেয়ে মন্টি, যাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, তিনি দাদার প্রতি আকর্ষিত হন । দাদা আর মন্টি নির্ণয় নেন যে দুজনে যেমন আছেন তেমনই থাকবেন, পরিবার ভেঙে বেরোবার প্রয়োজন নেই । এই ঘটনাটি শক্তি চট্টোপাধ্যায় “কিন্নর কিন্নরী” উপন্যাসে বিস্তারিত লিখেছেন, সেখানে দাদার নাম শম্ভু আর শক্তির নাম পার্থ ।

উত্তরপাড়ার চিলেকোঠায় দাদার যে বন্ধুরা আড্ডা মারতে যেতেন, তাঁরা এবার চাইবাসায় দাদার নিমডির কুঁড়েঘরে আড্ডা মারতে যাওয়া আরম্ভ করলেন, প্রধানত হাটে সবুজ শালপাতায় করে হাড়িয়া খাওয়া, মহুয়ার মদ খাওয়া, যা তাঁরা সকলেই প্রথমবার চাইবাসায় খেলেন, আর আসেপাশের জঙ্গলে-ঝর্ণায় ঘুরে বেড়ানো । দাদার বাড়িতে কবি-লেখকরা প্রায়ই আসেন জানতে পেরে মধুটোলার বাড়িতেও তাঁরা খাবার আমন্ত্রণ পেতেন । দাদা নিমডি টিলার ওপরে একটা চালাঘরে একা থাকতেন বলে একাকীত্ব কাটাবার জন্য কলকাতা থেকে বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে থাকার জন্য ডেকে আনলেন । শক্তি তখন “কুয়োতলা” উপন্যাস লিখছিলেন । দাদা অফিসের কাজে বাইরে গেলে শক্তিকে মধুটোলার বাড়িতে অতিথি হিসাবে রেখে যেতেন । শক্তিকে মাসের পর মাস কলকাতায় অনুপস্হিত পেয়ে একবার সুনীল আর সন্দীপন চাইবাসায় গিয়ে দ্যাখেন নিমডির চালায় দাদা নেই, ট্যুরে গেছেন, ওনারা দুজনে মধুটোলায় গিয়ে শক্তিকে দেখে অবাক, দুজনের কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘কী রে, তুই এখানে ইস্টিশন পুঁতে ফেলেছিস !’

কৃত্তিবাস পত্রিকার ২৫ তম সংকলনে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ‘চাইবাসা চাইবাসা’ নামে একটা ছোটো গদ্য লিখেছিলেন, বেশ ইনটারেসটিং, তুলে দিচ্ছি এখানে । “বিশ্বস্তসূত্রে এই উড়োখবর আমরা পাই যে শক্তি চাইবাসার সেন্ট্রাল জেলে রয়েছে, তছরুপের কথাই আমি শুনি । এটা শুনে, তখন আমরা ছেলেমানুষ ছিলুম বলে, আমার ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের খুব মনোকষ্ট হয় । আমি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তির দুই বন্ধু, আমরা সেদিন রাত্রেই, সম্বলপুর প্যাসেঞ্জার ধরি । এটা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ । আমি নিই হাওড়ার চেনা দোকান থেকে তিনটে খালি সোডার বোতল, চাইবাসায় এক্সচেঞ্জ করার কথা ভেবে, এটা সুনীলও যুক্তিযুক্ত মনে করেছিল । সুনীল একটা ক্যাপস্টানের টিন নিয়েছিল, যা গরাদের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে ডোরাকাটা শক্তির হাতে ওর দেবার ইচ্ছে ছিল । টিনটা আমরা ট্রেনে খুলিনি । মাইরি ।”

“চাইবাসায় গিয়ে এবারও সমীরকে পেলুম না, ট্যুরে । কিন্তু শক্তি ? পরদিন  জেলে গিয়ে খবর নিলেই হবে এরকম ভেবে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে টিনটা ও ওপরে তিনটে সোডার বোতল রেখে, ডাকবাংলো ছেড়ে আমরা বেরিয়ে পড়লুম নদীর দিকে, চাইবাসার শ্মশানের দিকে শীতের রাত্তিরে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলুম গান গাইতে গাইতে । মধুটোলার কাছে ফটাস করে একটা বাড়ির দরোজা খুলে গেল, ‘এতো রাত্তিরে চাইবাসায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় কে রে’, বলতে বলতে শক্তি বেরিয়ে এলো । এখানে হঠাৎই মনে পড়ল, এই মধুটোলার রাস্তাতেই, ‘সাইকেল কি সাঁতার কেউ কখনো ভোলে ভাই’, বলে তড়াক করে সাইকেলে লাফিয়ে উঠে ঐ বাড়ির পাঁচ বোন ও তিন বন্ধুর সামনে সুনীল উলটে দড়াম করে রাস্তায় পড়ে যায় । যাই হোক সেদিন রাতে, নভেলে-পড়া যায় এমন মধ্যবিত্ত প্রবাসী বাঙালির লাল টালির বাড়ির মধ্যে বসে আমরা দুজনে আধ ঘণ্টার মধ্যে বুঝতে পারি যে শক্তি জেলে নেই । ক্যাপ্সটেনের টিন খুলতে আমরা ডাকবাংলোয় ফিরে যাই । ঐ বাড়ির দুটি মেয়ে সমীরের ও শক্তির বান্ধবী ( একজন পরে সমীরের স্ত্রী ) এটা বুঝতে আমাদের দু’দিন সময় লেগে যায় । এটা বুঝে, মধুটোলায় ওরা সান্ধ্য চা-পান করতে গেলে আমি ও সুনীল তখন সোডার বোতলগুলি ( তখন ভর্তি ) একের পর এক জ্বলন্ত হ্যারিকেন লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারি । সমীরের লেপ তোশক ও মশারিতে আগুন লেগে যায় । আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে রো-রো নদীর ওপারে গিয়ে আমাদের জীবনের প্রথম আদিবাসী রমণীর কাছে জীবনের প্রথম মহুয়া খাই । তার শারীরিক সৌন্দর্য ছিল ।”

“চাইবাসা থেকে ফিরেই আমি মায়ের কাছে কাশীতে চলে গেলুম । সম্ভবত ঐ একই ট্রেনে, ডুন এক্সপ্রেসে, সুনীলের চিঠিটাও আমার সঙ্গে যায়, কারণ হিসেবমতো ১৪/১/৬০ তারিখে আমি সেবার কাশী পৌঁছেছিলুম । যাই হোক, ঐ চাইবাসা পরে আমাদের তিনজনের লেখাতেই বেশ একটা ভূমিকা নিয়েছিল বলতে হবে । আমি সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী নামে গল্প লিখি, সুনীল যুবক যুবতীরা ও অন্যান্য । শক্তির লেখার এক অংশে চাইবাসা হাহাকারের মতো ছড়িয়ে রয়েছে।”

“চাইবাসা থেকে অদূরে পাহাড়ের ওপর হেসাডির ডাকবাংলোয় বড়ো প্যাঁচে পড়েই কবি তথা লেখক হিসেবে আমাদের ডি এফ ও শ্রীকমলাকান্ত উপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল । প্রমাণস্বরূপ  শক্তি ওঁর সামনে একটা ছোটো কবিতা রচনা করে, যার মধ্যে ‘ছুটে কে তুলিলে শালবন বাহুবন্ধন চারিধারে’ এরকম একটা লাইন ছিল । বস্তুত ছোটো ও বড়ো দলে চাইবাসায় আমাদের একাধিকবার যেতে হয়েছিল । শক্তি বারংবার গেছে । চাইবাসায় যাওয়ার জের আমাদের পরবর্তী জীবনেও বেশ কয়েক বছর ধরে চলে । ওখানে না গেলে আমরা হয়তো এরকম হতুম না । কী হতুম ? রাজা হতুম, আবার কী । রাজা হতুম কথার কথা । এতটা প্যাঁচে পড়তুম না ।”

শক্তি মধুটোলার বাড়ির মেয়ে শীলার প্রেমে পড়েন এবং তাকে শোনাবার জন্য অজস্র কবিতা লেখা আরম্ভ করেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই বাড়ির কিশোর সন্তুর চরিত্রটিকে নিজের কাহিনিতে ভূমিকা দিলেন, যে কাহিনিগুলোয় তিনি নিজেই কাকাবাবু । সুনীল চাইবাসাকে কেন্দ্র করে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে লিখলেন “অরণ্যের দিনরাত্রি”, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখলেন “জঙ্গলের দিনরাত্রি”, শক্তিও শীলার সঙ্গে প্রেম এবং চাইবাসা-হেসাডি-বেতলায় কাটানো অভিজ্ঞতা এনেছেন ‘‘কিন্নর কিন্নরী” উপন্যাসে।

চাইবাসার স্মৃতি নিয়ে দাদাকে একটা চিঠি ১৯৬৮ সালে লিখেছিলেন সন্দীপন, নসট্যালজিক, বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার অনুশোচনারও যেন আভাস একচিলতে ।

 

১৬/৯ বরানগর

৭১ কাশীনাথ দত্ত রোড, দোতলা

কলকাতা – ৩৬

প্রিয় সমীর,

অনেকদিন আগেই ঠিকানা লিখে ফেলেছিলুম, আমার মেয়ে জুলেখা টিকিটটা ছিঁড়ে নিয়েছিল । অর্থাৎ আমার মেয়ে বেঁচে আছে । ক’দিন আগে গিয়েছিলুম সুনীলের কাছে — মদ্যপানজাত মারামারির ফলে প্রহৃত ও গুরুতর আহত হয়ে বাড়িতে পড়ে আছে জেনে যাই, সন্ধের দিকে রিক্সা করে একটি ও.টি. পাঁইট এনে দুজনে খেলুম, তোমাকে নিয়ে কথা বলছি দেখলুম । সুনীল তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে বলল ও তোমার ঠিকানা আমি চেয়ে নিলুম । স্বাতী দিল্লিতে ।

তোমাদের একটি ছেলে হয়েছে শুনলুম । তুমি অনেকদিন কলকাতা আসোনি । চাইবাসার কথা মনে পড়লে তোমার কথা মনে পড়ে । তুমি সৎ-ব্যবহার করেছিলে যা মনে পড়ে । রো-রো নদীর ধারে বসে শ্মশানে গল্প মনে পড়ে । নিমডির বাড়ির উঠোনে তেল মেখে হাঁড়িয়া-খাওয়া মনে পড়ে । বেলাদের বাড়ি মনে পড়ে । মধুটোলা, বাজারের দোকানে চা ও সিঙাড়া  — কানপুরে অস্ট্রেলিয়া হেরে গেছে তোমাদের খবর দিলুম — হেসাডিতে এসে তুমি এক রাত্তির কাটিয়ে গিয়ে আমাদের ঋণমুক্ত করে গেলে — এসব ও অন্যান্য মনে পড়ে।

চাইবাসা আমার মনে ইমপ্রেশান রেখে গেছে যা মোছার নয় — তখন সরল ও ছেলেমানুষ ছিলুম । আজো তাই আছি । চাইবাসা ও তোমাকে একসঙ্গে মনে পড়ে ।

ভেবে দ্যাখো, এ-রকম হওয়া সম্ভব, এ-রকম মনে পড়া । বয়স ৩৫ হল, আজো ৩০-দিকে গড়াচ্ছি — ২৫এর দিকে । আমার হাংরি জেনারেশান-ফেশান মনে পড়ে না । তোমাকে ও চাইবাসাকে আজও মনে পড়ে ।

তুমি অ্যাকসেপ্ট করো বা না করো আমার বাস্তবিক কিছু এসে যায় না । কাফে খালি হয়ে গেলেই আমার মাথাও খালি হয়ে যায় না ।

শুভেচ্ছাসহ

সন্দীপন

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই চিঠির পাশাপাশি দেবী রায়কে হাংরি বুলেটিনে ছাপার জন্য পাণ্ডুলিপি পাঠাবার সময়ে ৯ জানুয়ারি ১৯৬৩ তারিখে যে চিঠি উনি লিখেছিলেন তা পড়লে পাঠক বেশি আনন্দ পাবেন বলে মনে হয় :-

প্রিয় হারাধনবাবু,

হাংগরি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম । প্লট, কনটেন্ট, ক্র্যাফ্ট — এসব বিষয়ে ডেফিনিশন চেয়েছেন, আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনিশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখব । প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন ।

ছাপলে সবকটি এক সঙ্গে ছাপতে হবে — নইলে খাপছাড়া লাগবে । ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে। দরকার করলে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন ।

অমৃত-তে আমার বইয়ের যে-বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছে, দেখেছেন ! নইলে পাবলিশার-এর কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যবস্হা করেন তো খুশী হই । ওই বিজ্ঞাপনটা দেশে বেরোবার কথা আছে — যদি বেরোয়, তার প্রুফটা কাইণ্ডলি দেখে নেবেন । আনন্দবাজারে কোনো লেখকদের বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি ? তাহলে তারও একটা কাটিং পাঠাবেন ।

সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাব । আরো এক মাস থাকবো না ততদিন । সহজে যাব না । শরীর ভালো । ‘ছোটোগল্পে’ আবার লেখা দিতে পারলাম না , সম্ভব হলে, ক্ষমা করবেন ।

 

পুনশ্চ : লেখাটা প্রকাশ করার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে । অনেক বাদ দিয়ে খুব নরম করে সবদিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই ।

*) হাংগরি জেনারেশনের একটা সিম্বল করতে বলেছিলুম, কী হল ! পাঁচ নয়া পয়সা দাম করতে পারেন ।

**) কমাগুলো ভেবে চিন্তে দিয়েছি, ওইগুলো আসল জিনিস, যেন থাকে ।

***) শেষের তারিখটা যেখানে আছে, সেখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন ।

****) ‘অভিযান’ পূরবীতে হয়েছিল তো ?

****) আগামী সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাব । তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাঙলো, রুম নং ৫, টিকোর, চুনার, মির্জাপুর — এই ঠিকানায় দেবেন । ‘আক্রমন’ বানানে কী ‘ন’ না ‘ণ’?


সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে প্রদীপ চক্রবর্তী

"ভাবুক ও তাত্বিক কবি সমীর রায়চৌধুরী প্রথমে , অধুনান্তিক কাল সময়ে দাঁড়িয়ে পোস্ট মর্ডার্ন কালখণ্ডের কবিতা নিয়ে বিস্তৃত লেখালিখি করেছেন | পাশে সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন , নব্বই দশকের কবি , রুদ্র কিংশুককে | প্রভাত চৌধুরী সেই অধুনান্তিক কবিতাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন , তাঁর কবিতা পাক্ষিক পত্রিকার মাধ্যমে বিস্তৃত ক্ষেত্রে |তিনি অসংখ্য তরুণ কবির কবিতায় , এই অধুনান্তিক চিহ্ন ও চিন্তনকে আবিষ্কার করেন এবং দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তাকে ছড়িয়ে দেন বিস্তৃত পশ্চিমবঙ্গের বাংলা কবিতায় | এই সীমা ভাঙন এবং ছড়িয়ে দেওয়াকে অনেকে মেনেছেন এবং অনেক তরুণ কবি প্রথমে মানলেও পরে সরে এসেছেন এই পথ থেকে | তবুও , এই সময়সংলগ্ন চিহ্নগুলো বহন করেছে বহু বছর ধরে , কবিতা পাক্ষিক | এবং এই ভাবনাকে জনপ্রিয় করার জন্য , কবি প্রভাত চৌধুরী কত গুলো ভাবনাকে সাংগঠনিক ভাবে ছড়াতে পেরেছিলেন নিজস্ব ক্যারিশমায় | তিনি বিভিন্ন জেলার কবিদের মধ্যে প্রথমেই বাছাই করে নিতেন কয়েকজনকে | যারা এই পথের প্রদর্শক হবেন | এবং তাদের মধ্যে দিয়ে অনেক তরুণ কবি নিয়মিত এই ধারায় লিখেছেন কবিতা ,  কবিতা পাক্ষিকে | এরজন্য প্রচুর সভা , অনুষ্ঠান , আলোচনাচক্র , বই প্রকাশ , সম্মাননা প্রদান প্রভৃতি নিয়মিত করে গেছেন তিনি | তরুণ কবিকে আত্মবিশ্বাসী করা , নিজের প্রতি প্রত্যয় প্রদান , আন্তরিক মেলামেশা , ও প্রকৃত নেতার মতো তাদের সবসময় পাশে থাকা থেকে বিরত হন নি | তিনি জানতেন বিতর্ক ও বিতর্কিত কথা না থাকলে , আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুটি শুকিয়ে যায় | কখনো বলেছেন , স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে , তিনিও আজ পোস্টমর্ডার্ন কালখণ্ডের কবিতা লিখতেন | কখনো বলেছেন , কবিতাপাক্ষিক নিছক লিটল ম্যাগ নয় , একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান | নতুন ধারার কবিতা লেখা হবে , যাবতীয় বস্তাপঁচা আধুনিকতার ভাষা ও ভাবনাকে বাদ দিয়ে | কবির মানসিকতা বদল হলো কবিতার নতুনত্বের প্রথম ধাপ |"



ভালোবাসা নিন । সুনীলবাবুকে ( হাজরা ) প্রীতি জানাচ্ছি।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

 

১৯৬২ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ ও পিটার অরলভস্কিও গিয়েছিলেন চাইবাসায় দাদার নিমডির কুঁড়েঘরে, ছিলেন দিনকয়েক । ওনারা গিয়েছিলেন চাইবাসায় উপজাতিদের তৈরি হাড়িয়া আর মহুয়া মদের কথা শুনে । দাদা ওনাদের তালশাঁস আর জাম খাইয়েছিলেন । ওনারা ওগুলোকেই ভেবেছিলেন মাদক । জাম খেয়ে জিভ বেগুনি হয়ে গিয়েছিল বলে আশঙ্কিত ছিলেন । পরে সন্ধ্যায় ওনাদের নিয়ে হাটে গিয়ে হাড়িয়া খাওয়ান দাদা আর দাদার ড্রাইভার গুলাব সিংকে দিয়ে সদ্য চোলাইকরা গরম-গরম মহুয়ার মদ আনিয়ে খাওয়ান । গিন্সবার্গ পাটনায় আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এপ্রিল ১৯৬৩ সালে ।

ইংরেজি ভাষার ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী ডেবোরা বেকার অ্যালেন গিন্সবার্গের ভারতে থাকা নিয়ে একটা বই লিখেছেন “দি ব্লু হ্যাণ্ড” নামে ; সেই বইতে তিনি হাংরি আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন অথচ তিনি কোনো হাংরি আন্দোলনকারীর সঙ্গে দেখা করেননি, তাঁর বইতে তিনি ব্লার্বে লিখেছেন যে বাংলা জানেন অথচ ইনডেক্স দেখলেই টের পাওয়া যায় যে বাংলার একটিও বই-পত্রিকা-বুলেটিন তিনি পড়েননি, তিনি কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গুলগল্প লিখেছেন । বলাবাহুল্য যে হাংরি আন্দোলনকে বিদেশি পাঠকের কাছে ফালতু প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন । গিন্সবার্গের সঙ্গে যে হাংরি আন্দোলনকারীদের পরিচয় হয়েছিল, তাদের সঙ্গে দেখা করেননি বা তাদের উল্লেখ করেননি । সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে হাংরি আন্দোলনের পৃথক সংগ্রহ দেখারও আগ্রহ হয়নি ডেবোরা বেকারের । দাদা সেসময়ে কলকাতাতেই ছিলেন, দেখা করেননি কেন তা এক রহস্য । অথচ ইতালির গবেষক ড্যানিয়েলা লিমোনেলা কলকাতায় এসে দাদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরি থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন । বিবিসির ডোমিনিক বার্নও দাদার সাক্ষাৎকার নিয়ে গিয়ে প্রচার করেছেন । ডোমিনিককে দাদা বলেছিলেন “আমি এক হাজার বছর বাঁচবো”।

দাদা মধুটোলার বাড়ির সেজ মেয়ে বেলাকে বিয়ে করেন । বরযাত্রী হিসাবে কলকাতা থেকে এসেছিলেন উত্তরপাড়ার চিলেকোঠার কবি-বন্ধুরা । বিয়ের পর দাদা নিমডি টিলার চালাঘর ছেড়ে রোরো নদীর ধারে একটা বাড়ি ভাড়া করেছিলেন । সেই বাড়িতে সন্তোষকুমার ঘোষ  এবং আরও অনেকে গিয়েছিলেন । কলকাতার কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এক্সকারশানে যাবার আগে দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন আর দাদা তাদের থাকার ব্যবস্হা করতেন । হাড়িয়া আর মহুয়ার মদের কথা শুনে অচেনা তরুণ কবি-লেখকরাও পৌঁছে যেতেন ।

একদিন পাটনায় আমি অফিস যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলুম, বাবা ডেকে পাঠিয়ে বললেন, মিনু একটা মেয়েকে বিয়ে করবে বলছে, তুই দেখেছিস ? আমি মধুটোলার বাড়িতে বারকয়েক গেলেও কাউকে তেমন লক্ষ্য করিনি ; মা মধুটোলার বাড়ি গিয়েছিলেন, বললেন যে উনি মেয়েটিকে দেখেছেন, ভালো সেলাই-ফোঁড়াই, রান্নাবান্নার কাজ জানে । দাদা দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা-মা’র সামনে, আমাকে বললেন, চারপাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে নে । বরযাত্রীদের জন্য সেনটোলায় একটা বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা হয়েছিল। বিয়ের পর দাদার বন্ধুদের আমরা জিপে করে জামশেদপুর স্টেশান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলুম, তখনও ওনারা সিল্কের পাঞ্জাবি আর জমকালো ধুতিতে  ।

হাংরি আন্দোলনে সবাইকে জেরা করেছিল ইন্সপেক্টার অনিল ব্যানার্জি, নকশাল আন্দোলনের সময়ে যাঁর বেশ নামডাক হয়েছিল, কিন্তু দাদাকে আর আমাকে জেরা করে একটা ইনভেসটিগেটিং বোর্ড । পুলিশ কমিশনার পি সি সেনের ঘরে কমিশনার ছাড়াও উপস্হিত ছিলেন ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার দেবী রায়, যাঁর ধারণা ছিল হারাধন ধাড়া তাঁকে অপমান করার জন্যই  দেবী রায় ছদ্মনাম নিয়েছেন, আর ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লিগাল রিমেমব্রানসার, চব্বিশ পরগণার ডিসট্রিক্ট ম্যাজিসট্রেট, স্বরাষ্ট্র দপতরের আধিকারিক, ফোর্ট উইলিয়ামের মিলিটারি অফিসার । বোঝা যাচ্ছিল যে আমাদের দুজনের বিরুদ্ধে বিশেষ করে অভিযোগ এনেছেন কলকাতার তদানীন্তন এলিটরা, যাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য আবু সয়ীদ আইয়ুব, সন্তোষকুমার ঘোষ এবং সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র মালিক । স্বরাষ্ট্র দপতরের আধিকারিক বোধহয় জানতেন না যে হাংরি বুলেটিন বেরোয় ফালি কাগজে, তাই জিগ্যেস করেছিলেন, “আন্দোলন চালাবার জন্য কোথা থেকে টাকা পান?” ফালি কাগজ কিনতে আর ছাপাতে পঞ্চাশ টাকা লাগে শুনে পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন “আপনারা সাহিত্য করছেন না দাঁতের মাজন বিক্রি করছেন ।”

হাংরি আন্দোলনে বন্ধুদের গোলমেলে ভূমিকার পর দাদা তাঁদের সঙ্গে সাহিত্যিক যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন করে ফেলেছিলেন । তাঁর লেখালিখির প্রথম পর্ব বলতে গেলে মামলার পর শেষ হয়ে যায় । পড়াশুনায় একাগ্র হন, পাটনা থেকে ইংরেজি বইপত্র নিয়ে যেতেন । বন্ধুরা কিন্তু কলকাতা থেকে পালাবার জন্য দাদার পোস্টিঙের জায়গাগুলোয় যেতেন, মজফফরপুর, দ্বারভাঙ্গা, ধানবাদ, দুমকা, ডালটনগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় । আমি ডেভিড গারসিয়া নামে একজন হিপি ও সুবো আচার্য আর সুবিমল বসাককে দুমকায় নিয়ে গিয়েছিলুম । দুমকার বিশাল বিহারি টাইপ বাড়িতে পায়খানা ছিল বেশ দূরে, আর পোশাক খুলে টাঁঙাতে হতো সামনের একটা কাঁঠাল গাছের ঝুলন্ত এঁচোড়ে, পায়খানায় দরোজা ছিল না, গাছটা আড়ালের কাজ করতো । তরুণরা যাতে তাঁর বাসায় দলবেঁধে যায়, দাদা একবার বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন। তাঁর লেখালিখির দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ হয় অবসরের পর কলকাতায় নিজের বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে পাকাপাকি থাকতে এসে,  যখন ‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করলেন ।

“কালিমাটি “ পত্রিকার ( ৯৩ নং )  জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে দাদাকে প্রশ্ন করেছিলুম, “তোমার কলেজজীবনের সময় থেকে দীপক মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, বিমল রায়চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার ঘোষ, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ পাটনা, উত্তরপাড়া, চাইবাসা, ধানবাদ, ভাগলপুর, দ্বারভাঙ্গা, মজফফরপুর, দুমকা ডালটনগঞ্জ ইত্যাদি বাসায় নিয়মিত যেতেন । তাঁদের স্মৃতিচারণামূলক লেখায় তোমার উপস্হিতির অভাব দেখা যায় । তা কি তুমি দীর্ঘ দিন বাইরে ছিলে বলে ? নাকি হাংরি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলে বলে ? অথবা তোমার ট্রাইবাল ইন্সটিংক্ট নেই বলে ?”

উত্তরে দাদা বলেছিলেন, “স্মৃতিচারণায় না থাকা স্বাভাবিক, কেননা অনেক তথ্য ও সত্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, নানা ধরণের পার্থিব ভীতি তাঁদের মনে কাজ করে, হিসেব করে লেখেন, বাদ দেওয়াকেই সহজ উপায় বলে মনে করেন । আবার হয়তো দীর্ঘ দিন বাইরে থেকেছি, কলকাতার কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারিনি । হাংরি আন্দোলন বা অধুনান্তিক চিন্তাভাবনা বা কোনো নতুন ধারণা আধুনিকতামনস্ক বন্ধুদের কাছে একটি বিশাল অন্তরায় । তাছাড়া, তাঁরা অনুগামী গড়ে তুলতে অধিক মনোযোগী । তাঁদের বেশিরভাগকে আবিষ্কারকের ভূমিকায় দেখি না, সংযোজনমনস্ক নয় ।”

লেখক-কবির কাজ সম্পর্কে দাদা বলেছিলেন, “চিন্তার মাধ্যমে ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য গড়া, প্রকাশময়তার সম্প্রসারণ ও ব্যাপ্তি ঘটানো, যার ফলে পূর্ব অবস্হান থেকে ভাষা আরও সমৃদ্ধ হয়ে নবাঞ্চলের সংযোজন করে নতুন প্রজন্মের ভাষা হয়ে উঠবে, সম্প্রসারণ মানেই তো অতিক্রম, আর কবি ও লেখকের প্রধান দায়বদ্ধতা ভাষার প্রতি, কেননা ভাষাকে উত্তরোত্তর সমাজের আরও যোগ্য করে তোলা । ভাষা বদলে গেলে সামাজিক প্রক্রিয়া স্বতঃপ্রভাবিত হয় । উনিশ শতকে যেভাবে প্রভাবিত হতো আজ আর সেভাবে সম্ভব নয় । বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখেরা নিজেদের লেখালিখির মাধ্যমে আইনকানুনকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, আজ যেমন অরুন্ধতী রায়কে দেখা যায় মেধা পাটকরের সঙ্গে আন্দোলন করছেন, নর্মদা বাঁধের উচ্চতা হ্রাস এবং সংলগ্ন জনবসতিগুলোর পুনর্বাসন সম্পর্কে, তাঁদের আন্দোলনের ফলে সমাজ রাষ্ট্র প্রভাবিত হয়েছে, আন্দোলন অনেকটা সফলতা পেয়েছে । মুশকিল এই যে, আজ রাষ্ট্র স্বয়ং প্রতিবাদীর ভূমিকা নেয় । যার ফলে কবি-লেখকের প্রতিবাদী ভূমিকাকে হজম করে নেয় বা বানচাল রাখে । ইনটারনেট আর ব্লগ ব্যবহার আজ অন্যতম উপায়, এবং কবি-লেখকরা আজ ঠিক তাই করছেন । আরেকটা কথা, বাংলা ভাষা ক্রিয়াভিত্তিক ভাষা, প্রত্যেক শব্দের একাধিক অর্থ । কেননা, ব্যক্তি, দাম্পত্য, সমূহ সবই সেই অর্থময়তার পরিসরে অন্তর্ভুক্ত, যেকারণে শব্দগুলির অর্থময়তার বীজমন্ত্রে যথেচ্ছ সম্প্রসারণের খোলা-সম্ভাবনা । মনুষ্যসমাজ বা মানবপ্রজাতি টিকে আছে তার চিন্তাচেতনার ও ভাষার উত্তরোত্তর সম্প্রসারণের মাধ্যমে ।”

দাদার লেখায় পরিসরের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছিলেন অরবিন্দ প্রধান তাঁর “পরিসরের ভিন্ন মন্তাজ : সমীর রায়চৌধুরীর ছোটোগল্প” ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) প্রবন্ধে । পরিসরের গুরুত্বের কারণেই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরোধীতা দেখা দিয়েছিল । দাদা দেখিয়ে ছিলেন যে এটি একটি দার্শনিক প্রতর্ক । কৃত্তিবাস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কতৃক ইতিহাসকে একরৈখিক অনুমান করার জন্য গলদটা গড়ে উঠেছিল । ভুলটা ঘটেছিল স্পেস বা ভাবনা পরিসরকে গুরুত্বহীন মনে করে, টাইম বা ঘটনার অনুক্রমকে অতিগুরুত্বপূর্ণ মনে করার ফলে । সময়কে একটিমাত্র রেখা বরাবর এগিয়ে যাবার ভাবকল্পনাটি, যিনি ভাবছেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, বহু ঘটনাকে, যা অন্যান্য দিকে চলে গেছে, বাদ দেবার অনুমিত নকশা গড়ে ফ্যালে । ফলে জসীমউদ্দিন বাদ যান, নজরুল বাদ যান । মাইলফলক কেবল একটা রাস্তাতেই থাকে না । সব রাস্তাতেই থাকে । তাবৎ মাইলফলক বরাবর একটা রেখা টানা যায় না । শ্রীরামপুরের প্রটেস্ট্যান্ট ইংরেজরা  একটিমাত্র রেখা বরাবর লাইনগুলোকে কল্পনা করতে শিখিয়েছিল, যার ফলে বহু মাইলফলক বাদ যেতো । দাদা এটা প্রমাণ করার জন্য প্রথমে ইংরেজিতে সম্পাদনা ও প্রকাশ করলেন “পোস্টমডার্ন বাংলা পোয়েট্রি” ও “পোস্টমডার্ন বাংলা শর্ট স্টোরিজ” এবং হিন্দিতে সম্পাদনা ও প্রকাশ করলেন “অধুনান্তিক বাংলা কবিতা”, যে সংকলনগুলোয় সেই মাইলফলকগুলোকে তিনি পুঁতলেন যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক একরৈখিক পথের বাইরের ।

দাদার কাছ থেকে আমরা জানলুম যে ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ডিসকোর্সটি ঔপনিবেশিক নন্দনবাস্তবতা বা কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়ালিটি দ্বারা তাড়িত বলে তা টাইম কেন্দ্রিক । কিন্তু হাংরি আন্দোলনের ডিসকোর্সটি স্পেস বা স্হান বা পরিসরলব্ধ, কেননা তা উত্তরঔপনিবেশিক টানাপোড়েন উপজাত । ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কাউন্টার ডিসকোর্সরূপে উদ্ভূত হয়েছিল উত্তরঔপনিবেশিক পরিসরের হাংরি আন্দোলন, যে আন্দোলনটি আরম্ভ করার প্রধান উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন দাদা । ইউরোপীয় ভাবনার ধারকবাহক হিসাবে যে নতুন ধরণের দার্শনিকতা জন্মেছিল, তাঁরা নিজেরা ছিলেন স্হানিক বা ভূমিক পরিসর থেকে উৎপাটিত ; এই যে পরিসরহীনতা, এটা একরৈখিক দর্শনে জরুরি ছিল । দাদা বললেন ,হাংরি আন্দোলনের আনা পরিবর্তন-প্রয়াস হল চিন্তাতন্ত্রের, সময়তাড়িত চিন্তাতন্ত্র থেকে পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার । ইংরেজরা আসার আগে প্রাকঔপনিবেশিক ভাবনা-পরিসরটি ছিল বিশেষ-বিশেষ মনন-প্রবৃত্তির এলাকা । দাদার বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিচলিত হয়েছিলেন, এবং তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় লেখা ১৯৬৬ সালের তাঁর এই সম্পাদকীয়তে, তখনও হাংরি মকদ্দমা আদালতে চলছে এবং কেস সাবজুডিস :

“অনেকেই প্রশ্ন করছেন বলে আমরা লিখিতভাবে জানাতে বাধ্য হলুম যে হাংরি জেনারেশান নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলনের সঙ্গে কৃত্তিবাস সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্কিত । ঐ প্রকার কোনো আন্দোলনে আমরা বিশ্বাস করি না । কৃত্তিবাসের নামও যুক্ত করতে চাইনি কখনো । ‘হাংরি’ নামে অভিহিত কোনো-কোনো কবি কৃত্তিবাসে লেখেন, বা ভবিষ্যতে অনেকে লিখবেন, কিন্তু অন্যান্য কবিদের মতোই ব্যক্তিগতভাবে, কোনো দলের মুখপাত্র হিসেবে নয় । সংঘবদ্ধ সাহিত্যে আমরা আস্হাশীল নই । পরন্তু বাংলাদেশের যেকোনো কবির প্রতিই কৃত্তিবাসের আহ্বান । হাংরি জেনারেশানের আন্দোলন ভালো কি খারাপ আমরা জানি না । ঐ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ বা পরিনাম সম্পর্কে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই । এ-পর্যন্ত ওদের প্রচারিত লিফলেটগুলিতে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি চোখে পড়েনি । নতুনত্ব প্রয়াসী সাধারণ রচনা । কিছু-কিছু হাস্যকর বালক ব্যবহারও দেখা গেছে । এছাড়া সাহিত্য-সম্পর্কহীন কয়েকটি ক্রিয়াকলাপ বিরক্তি উৎপাদন করে । পিজিন ইংরেজিতে সাহিত্য করার লোভ উনিশশো ষাট সালের পরও বাংলাদেশের একদল যুবক দেখাবেন — আমাদের কাছে তা কল্পনাতীত ছিল। তবে ঐ আন্দোলন যদি কোনোদিন কোনো নতুন সাহিত্যরূপ দেখাতে পারে — আমরা অবশ্যই খুশো হবো ।”

মনে রাখা দরকার যে হাংরি আন্দোলনে দাদাও চাইবাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আর এই মামলা চলাকালীন সম্পাদকীয়টি লিখছেন দাদার সেই বন্ধু যাঁর “একা এবং কয়েকজন” কাব্যগ্রন্হটি দাদা নিজের টাকায় “সাহিত্য প্রকাশক” নামে একটা সংস্হা খুলে ছাপিয়েছিলেন । সুনীল কেন এই সম্পাদকীয়টি লিখেছিলেন, দাদা গ্রেপ্তার হওয়া সত্বেও তা এখন কিছুটা আঁচ করা যায় । দৈনিক পত্রিকায় চাকুরি ও লেখা প্রকাশ ছাড়াও, মনে হয়, পুলিশের চাপ ছিল । শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় “নতুন কৃত্তিবাস” পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লিখেছেন যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে দিয়েছিলেন। আমার চার্জশিটের সঙ্গে সেই মুচলেকাগুলোর কপি পুলিশ দেয়নি বলে ঠিক জানি না, পুলিশ আমায় কেবল শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষের মুচলেকার কপি দিয়েছিল, সম্ভবত তারা মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিল বলে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অ্যালেন গিন্সবার্গকে লিখেছিলেন যে মোট ছাব্বিশজনকে পুলিশ জেরা করেছিল, অর্থাৎ হাংরি বুলেটিনে যাদের নাম ছিল তাদের তো জেরা করা হয়েই ছিল, দাদার সঙ্গে যাদের বন্ধুত্ব ছিল তাদেরও জেরা করা হয়েছিল, এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও । উৎপলকুমার বসুকে লেকচারারের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলে অ্যালেন গিন্সবার্গের সৌজন্যে তিনি লণ্ডনে একটি স্কুলে পড়াবার চাকরি পান ।

২ অক্টোবর ২০১৫ ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত, আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা অ্যালেন গিন্সবার্গের  চিঠি দুটি থেকে ব্যাপারটা কিছুটা স্পষ্ট হবে :

প্রথম চিঠি:-

৭০৪ ইস্ট ফিফথ স্ট্রিট, অ্যাপট ৫এ, নিউ ইয়র্ক

অক্টোবর ৬, ১৯৬৪

প্রিয় আবু সয়ীদ,

আপনার কাছে পাঠানো আমার চিঠিটি নিতান্তই বোকার মতো উদ্ধত এবং বুদ্ধিহীন হয়ে গিয়েছে এবং আমি দুঃখিত যে, সেটি আপনাকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করেছে । আমার লেখায় যে বিরক্তিকর অসম্মান প্রদর্শন এবং ধৃষ্টতা ফুটে উঠেছে তার জন্য আমার চুপ করে থাকাই শোভন, যেমন আপনার কী করা উচিত নয়, এসব ব্যাপারে অযথা নাক গলিয়েছিলাম, হয়তো লেখার গুণগত মান না বুঝেই । এবং এক অগ্রজকে বকাঝকা করা । আমি ক্ষমাপ্রার্থী, সেই সঙ্গে অজুহাত হিসাবে এটাও জুড়ে দিই যে, আমি অত্যন্ত দ্রুত লিখছিলাম — একই বিষয়ে, একই দুপুরে অনেকগুলো চিঠি — এবং অবস্হাটি আমি যেমনটা বুঝতে পারছি, আপনি যেমন ভাবছেন, অল্পববসী লেখকদের কাছে সেটি আর-একটু বেশি আশঙ্কাজনক । সম্ভবত আমার লেখার পর, এতদিনে অবস্হাটি অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে । কিন্তু আমি মলয়, এমনকি সুনীল গাঙ্গুলি এবং উৎপল বসুর ( শেষোক্ত দুই ব্যক্তির মনে হয় বিচক্ষণতা বেশি ) চিঠি থেকে যা বুঝতে পারছি, মলয় মানুষ হিসাবে আমার পছন্দের এবং ওর ইংরেজিদুরস্ত ম্যানিফেস্টোর প্রাণোচ্ছলতা আমার সত্যিই ভালো লাগে — আমার মতে যেকোনো ভারতীয় ইংরেজি গদ্যের চেয়ে বেশি বুদ্ধিদীপ্ত । যদিও আমি এটা বুঝেছি যে ছেলেটি অনভিজ্ঞ, আবেগপ্রবণ এবং ওঁর ম্যানিফেস্টোগুলির ছেলেমানুষি, কিংবা বলা ভাল, সারল্যের মধ্যেই তার আবেদন

( আসলে ব্যাপারটি নিছকই পছন্দ, রুচি বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল, এবং নিশ্চিতভাবেই এমনতর সাহিত্যসংক্রান্ত ঘটনা নয় যার মীমাংসা করতে পুলিশের সাহায্য নিতে হবে ); পুলিশের কাণ্ডকারখানা এমনই যে কেবল মলয়ই নন, তাঁর ভাই সমীর ( তরুণ দার্শনিক ) দেবী রায় এবং আরও দুই যুবক, যাঁদের সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি, শৈলেশ্বর এবং সুভাষ ঘোষ, এঁরা প্রত্যেকেই গ্রেপতার হয়েছিলেন । তারপর জামিনে ছাড়া পান । এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিসের তদন্ত, উৎপলের বয়ান অনুযায়ী, “যাঁদের গ্রেপতার করা হয়েছিল তাঁদের এর মধ্যেই চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং দোষ প্রমাণিত হলে সেটি তাঁরা খোয়াতেও পারেন ।” আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে এই “অশ্লীল সাহিত্যের ষড়যন্ত্র” ব্যাপারটায় ইন্ধন যুগিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, জনতা ও অন্যান্য বাংলা সংবাদপত্রগুলি । পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের আদালতের নির্দেশমতে ‘লেডি চ্যাটার্লি’ অশ্লীল আখ্যা পাওয়ায়, আমার সংগ্রহে রাখা টাইমস অফ ইনডিয়ার একটি খবরে জানানো হয়েছে, ‘অনেক বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিকের রচনার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনতে বহু মানুষ এগিয়ে এসেছে।’ বসু লিখেছেন, ‘একটি চাকরি খোয়ালে আর-একটি জোটানো অসম্ভব।’ গ্রেপতার হওয়া পাঁচজনকে আটক রাখা হয়েছিল প্রায় দু’দিন । উৎপল বসুকে আটক করে পাঁচ ঘণ্টা জেরা করে পুলিশ । আমি বুঝতে পারছি, সুনীলকেও পুলিশ জেরা করেছে । যতদূর জানি, পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে কিনা, সেটি এখনও স্হির করা হয়নি এবং সেই সিদ্ধান্ত অনেকখানি নির্ভর করবে এই তরুণ লেখকরা অগ্রজ এবং প্রতিষ্ঠিত লেখক, কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম) এর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে সমর্থন পাবেন কিনা, তার ওপর । আমি অবশ্য প্রত্যেকের কাছেই শুনেছি, কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এ-ব্যাপারে একেবারেই মুখ খোলেনি । এই লেখকদের রচনার গুণগত মান কেউ স্বীকার করুন বা না করুন, আপনার চিঠি থেকে যা প্রকাশিত হয়, তার চেয়ে আদত পরিস্হিতিটি কিন্তু আরও অনেক ভয়াবহ । ভারতে পুলিশি তদন্তের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার — তার অন্তহীনতা ও কাফকিয়ান নির্মমতা — যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, তাতে ব্যাপারটিকে আপনার মতো হালকা চালে আমি কিছুতেই দেখতে পারছি না । আপনার হয়তো মনে আছে, বেনারসে মাসের পর মাস আমায় লোক অনুসরণ করেছে, পুলিশ এসেছে, মার্কসবাদীরা হুমকি দিয়েছে, দশ দিনের মধ্যে ভারত ছাড়ো নোটিস এসেছে, অশ্লীল সাহিত্য বিলি করা ও তরুণদের নষ্ট করার ভিত্তিহীন অভিযোগে । দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বন্ধুদের মধ্যস্হতায় এবং ভারতীয় কনস্যুলেট থেকে নিউ ইয়র্কে পাঠানো চিঠির সাহায্যে সব সামাল দেয়া গিয়েছিল । সাহিত্যক্ষেত্রেও একবার এহেন সাংঘাতিক আইনি ব্যবস্হা চালু হয়ে যাওয়ার পরও তা দ্রুত খারিজ হয়ে যাবে, এমন আত্মবিশ্বাস আমার নেই, বিশেষ করে যেখানে তরুণ অরাজনৈতিক অনভিজ্ঞ উৎসাহীরা জড়িয়ে । ‘Fuck the Bastards of Gangshalik School of Poetry’ -র মতো একটি বাক্য নিয়ে অশ্লীলতা সম্পর্কে আপনার যা বিশ্লেষণ, তার সঙ্গে আমি একেবারে সহমত নই । এটা যে কোন ‘স্কুল’ তা আমি জানিও না । কিন্তু প্যারিস কিংবা কলকাতার কাফেতে, ত্রিস্তঁ জারার পুরোনো ম্যানিফেস্টোতে এটাই চলতি সাহিত্যভাষা — মুখের ভাষা এবং প্রকাশিত লেখাতেও । সাহিত্যে এই কায়দা, এই আবেগ, বুদ্ধিদীপ্ত হালকা বদমায়েসি, বিশ শতকের ‘গ্রন্হাগার পুড়িয়ে দাও’ চিৎকারের মতোই । আমি সত্যিই তেমন শকড হইনি, যখন ওনারা বলেছিলেন, জনসমক্ষে একজন মহিলা তাঁর স্তন অনাবৃত করে দিক । আপনার সত্যিই ব্যাপারটি আপত্তিকর মনে হয় ? বড়োজোর এটা আইনবিরুদ্ধ, এই পর্যন্ত । অনেকের কাছেই শুনেছি, গতবছর এডিনবরা ফেস্টিভালের উজ্জ্বলতম মুহূর্তটি ছিল ব্যালকনিতে এক সম্পূর্ণ নগ্ন মহিলার উপস্হিতি — আমি অবশ্যই ব্যাপারটা সমর্থন করি। তবে আমি নিজে বিশ্বের অপরপ্রান্ত থেকে এটি ‘প্রোমোট’ করতে আসিনি । আর আমার এটাও মনে হয় না যে, এই ধরণের ডাডামার্কা কাজকর্মের নেপথ্যের গভীরতম প্রেরণাটি কেবলমাত্র সস্তা আত্মপ্রচার । সেকারণেই আমার মনে হয়, এঁদের প্রতি আপনি সত্যিই অবিচার করছেন, এঁদের সাহিত্যকৃতিকে আপনি যতোই নিচু নজরে দেখুন না কেন । কারণ সাহিত্যগত মান নিয়ে নানাবিধ মতামত থাকবেই । মলয়, সুনীল বা বসুকে ফারলিংঘেট্টি চেনেনও না, কিন্তু ‘সিটি লাইটস জার্নাল’-এ ওনাদের অনুবাদ প্রকাশ করছেন । এশিয়া সোসায়টির শ্রীমতী বনি ক্রাউন টেক্সট যোগাড় করে দিয়েছেন । যতো অনুবাদ তিনি সংগ্রহ করেছেন, এই লেখাগুলিও তাঁর কাছে ততটাই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়েছে । এখানে KULCHUR পত্রিকাটিও — আভাঁগার্দ কাগজ হিসেবে যার বেশ নামডাক — তাতে আলোচ্য তিনটি ম্যানিফেস্টো ( গদ্য, পদ্য এবং রাজনীতি বিষয়ক ) চলতি বছরের গোড়ায় পুনর্মুদ্রণ করেছিল । এব্যাপারে আমার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও প্রয়োজন হয়নি ।

“অনুবাদ পড়ে আমি এটুকু অন্তত বুঝেছি, মলয় এবং অন্যান্য কবিদের, যাঁদের গ্রেপতার কিংবা জেরা করা হয়েছে, তাঁদের কবিতা এবং ম্যানিফেস্টো যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক । সুতরাং অন্য গোলার্ধের বাসিন্দা হয়েও এবং সাহিত্যের সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা স্বীকার করেও, আমি কবি এবং সমালোচক হিসেবে ( যেহেতু আমি এখানে কেরুয়াক, বারোজ, আর্তো, এবং মার্কিন কবিদের বিভিন্ন ধারার অপ্রকাশিত লেখার সম্পাদক এবং এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছি ) আমার মতামত প্রকাশ করবই, আমার নিজের বিশ্বাসে স্হির থাকার জন্য, এবং আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এঁদের কাজে আধুনিক জীবনের নানা চিহ্ণ সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে । এঁরা জিনিয়াস বা অসাধারণ, এমন দাবি না করেও বলা যায়, সমাজব্যবস্হার প্রতি তাঁদের যে মনস্তত্বগত অনাস্হা, সেটি তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন স্পষ্ট ও মৌলিক ভাষায় । অন্যদিকে, এঁদের সমসাময়িক এবং অগ্রজরা এখনই ধ্রুপদী ভক্তিভাব বা সামাজিক ‘উন্নত’ ভাবনা, মার্কসবাদ, মানবতাবাদ ইত্যাদি সম্পর্কেই অধিক আগ্রহী । আমার মনে হয় না এই লেখকদের ‘বিটনিক’ আখ্যা দেওয়া উচিত, বিট-অনুকারকও নয়, কারণ শব্দটাই অত্যন্ত কাগুজে বাঁধাধরা বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি মার্কিন ধারণা অনুযায়ী ‘বিটনিক’দের সঙ্গেও এটি খাপ খায় না ।

“আর কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) সম্পর্কে আমার কিছু ভীতি আছে, যেমন ১) সংস্হাটি সম্ভবত মার্কিন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ফাউণ্ডেশান ফাণ্ডগুলির সাহায্য পায় ; ২) আয়রন কার্টেন অন্তর্গত শাসনব্যবস্হার চেয়ে পশ্চিমী দুনিয়ার দমননীতির বিপজ্জনক দিকগুলি সম্পর্কে এরা কম সতর্ক । আমেরিকায় সারা বছর ধরে নাট্যশিল্প, বই, চলচ্চিত্র, কবিতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আইনি যুদ্ধ চলে, যার ফলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আভাঁগার্দ চিন্তাভাবনা প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছে । মার্কিন কমিটির মাথা মিস্টার এ. রাইখম্যান-এর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছিলাম । তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকায় কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এর কোনো অস্তিত্বই নেই, নিতান্তই কঙ্কালটুকু পড়ে আছে । আর এই বছর আমায় নিউ ইয়র্ক থেকে জন হান্টের যোগাযোগ করতে হয় প্যারিসের অলিম্পয়া প্রেসকে বাঁচানোর জন্য । গাফিলতি কিন্তু আছেই । আপনি যতখানি মঞ্জুর করবেন, তার চেয়ে আমার সমালোচনা খানিক বেশিই হয়ে গেল । বেশ — নিষ্পাপ বিবেক — অ্যালেন ।

“পুনশ্চ: আপনি সত্যিই একথা জোর দিয়ে বলছেন যে ম্যানিফেস্টোকে সাহিত্য বলা যাবে না এবং সেকারণেই ঘটনাটি সাহিত্যে দমননীতির উদাহরণ নয় ? সত্যি ???????????????

“আমি প্যারিসে অফিস এবং মিস্টার কারনিক দুজায়গাতেই চিঠি লিখব । আপনার নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, রাশিয়ানরা ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো, ভজনেসেন্সকিদের তৃতীয় শ্রেণির শিল্পী হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিল, যাদের কোনো সরকারি গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন নেই । এবং মার্কিন পুলিস এজেন্সিগুলির কাছ থেকে এই একই কথা আমাদের সম্পর্কেও শুনেছি ।”

 

দ্বিতীয় চিঠি:-

৭০৪ ইস্ট ফিফথ স্ট্রিট, এন ওয়াই সি-৯, অ্যাপ্ট-৫এ

১৩ অক্টোবর ১৯৬৪

প্রিয় আবু সয়ীদ,

“জঘন্য ! আপনার বাগাড়ম্বর আমায় বিভ্রান্ত করে তুলেছে, মাথা গরম করে দিচ্ছে আমার । আপনি প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, ‘আমার কোনও পদমর্যাদা নেই’, এসব কথার মানে কী? ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের উদ্যোগে চলা চতুর্মাসিক পত্রিকার সম্পাদক আপনি । আপনার নিজস্ব লেটারহেড রয়েছে । কমিটির ভারতীয় এক্সিকিউটিভদের তালিকা আপনার হাতের কাছেই আছে, ভারতে কমিটির ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কেও আপনি ওয়াকিবহাল । চিনের ভারত আক্রমণের সময় আমি কলকাতায় একটি বড়সড় সমাবেশে উপস্হিত ছিলাম, সেখানে আপনার সহসম্পাদক মিস্টার ( অম্লান ) দত্ত সাংস্কৃতিক বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছিলেন। যা হোক, মিস্টার বি. ভি. কার্নিককে আমি চিঠি লিখেছিলাম, যদিও আমার মনে হচ্ছিল যে, কলকাতা কমিটির কোনও সদস্য বা কমিটির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিরই কাজটি করা দরকার ছিল । আর বাগাড়ম্বর বলতে আমি বোঝাতে চাইছি ‘আপত্তিকর উপাদান’-এর কথা । মহাশয়, আপনি ও পুলিশই সেগুলিকে আপত্তিকর বলছেন । সেগুলি নিছক আপত্তিকর তকমা পাওয়া উপাদান মাত্র, প্রকৃত আপত্তিকর নয় । পরের দিকে যে বলেছেন ‘প্রশ্নাতীত আপত্তিকর’, তাও নয় । আমি আপনাদের আপত্তি তোলা নিয়েই প্রশ্ন করছি, তাই তা এতোটুকুও ‘প্রশ্নাতীত’ নয় । আসলে পুরোটাই হলো রুচি, মতামত ইত্যাদির ব্যাপার । পুলিশ তাদের নিজেদের ও অন্যদের রক্ষণশীল সাহিত্যরুচি চাপিয়ে দিচ্ছে জোর করে । আমার মতে এটি কালচারাল ফ্রিডাম বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারই বিষয় । আশা করছি, এ-বিষয়ে ইন্ডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম, বিশেষ করে সেটির কলকাতা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা-ও একমত হবেন । আমার আরও অদ্ভুত লাগে জেনে যে, এক্ষেত্রে কারওকে সাহায্য করা মানে নবীন লেখকদের বলা, তাদের মতাদর্শ থেকে পিছু হটতে, নিজেদের অবস্হান পালটাতে, ইত্যাদি । ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো প্রমুখের ক্ষেত্রে যেরকম করা হয়েছিল, সেরকমই একেবারে । এমনকী, তারা যে ‘ফালতু’ লেখক, সেটাও । আমি আপনাকে ফের রাগাতে চাই না । আপনি ক্ষুব্ধ হন এমনকিছু বলছি না । কিন্তু একটি কথা বলতেই হবে যে, বর্তমান ইশ্যু নিয়ে আমার-আপনার চিঠি আদান-প্রদান আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে ওই নবীন রুশ কবিরা কেন আপত্তিকর বা ‘ফালতু’, তা নিয়ে আমার সঙ্গে রুশ আমলাদের কথোপকথন । ‘দায়িত্বহীন, ‘নিম্ন মানের লেখা’, ‘নিম্ন রুচি’। ব্রডস্কির মামলার সময়ে, আপনার মনে থাকতে পারে, বিচারক প্রায় সারাক্ষণ ব্রডস্কিকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক কবে আপনার মর্ম স্বীকার করেছে।’ বেচারা মলয় — যদি ও একজন নিম্ন মানের লেখকও হয় — তা হলেও ওর জায়গায় আমি থাকলে আপনার সম্মুখীন হতে আমি ঘৃণা বোধ করতাম ।

“ওরা সকলেই সম্পূর্ণ বুদ্ধিহীন, জ্যোতি ( দত্ত ) যদি একথায় আপনার সহমত হয়, তাহলে ও আপনার আত্মগরিমা তুষ্ট করার জন্য সাধুতার ভান করেছে । দলের সবাই, ছাব্বিশজন যাদের জেরা করা হয়, সুনীল উৎপল বসু, সন্দীপন, তারাপদ তো আছেই, এরা ছাড়া অন্য যারা গ্রেপতার হয় সেই সব মধ্যমানের লেখকরা — যদিও মলয়ের নির্যাতনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের সপসপে মনোভাব দেখে মলয়ের অনভিজ্ঞতার প্রতি আমার মমত্ব জাগছে — এরা সবাই ফালতু এরকম দাবি করা আপনার পক্ষে বা জ্যোতির পক্ষে অসম্ভব । কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ও হাংরি আন্দোলনের সদস্যদের — এই মামলায় যারা সকলেই পুলিশের দ্বারা হেনস্হা হয়েছে — সমর্থন করেন, এমন কোনও বাঙালি লেখক বা সমালোচককে যদি আপনি না চেনেন, তাহলে আপনার মতামত সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে । নিজেকে একদম আলাদা রেখেও বুদ্ধদেব বসু তাদের গুণের স্বীকৃতি দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন বিষ্ণু দে ও সমর সেন । আমি শুধু মলয় নয়, সমস্ত সদস্যদের কথা বলছি ।

“এর পাশাপাশি আপনার আর একটি বিরক্তিকর বক্তব্যে আমি স্তম্ভিত, যে পশ্চিমের দমননীতির বিরুদ্ধেও কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম)কে  একইরকম ভূমিকা নিতে হবে । আপনি বলেছেন, ‘আমি পর্তুগাল, স্পেন ও পাকিস্তানের কথা ভাবছিলাম’। এখনও পর্যন্ত আমার শোনা আপনার বক্তব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর এটি । লরেন্স, ফ্যানিহিল, জেনে, বারোজ, মিলার, আপনাদের কামসূত্র, কোনারকের আলোকচিত্র — এসব ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে, বহুল-প্রচারিত আইনি মামলা চলছে, শায়েস্তা করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া ফ্রান্সে একাধিক সংবাদপত্র ও আলজেরিয় যুদ্ধবিষয়ক বই দমননীতির কোপে পড়েছে, পড়ছে । রাজনৈতিক কারণেই এই দমন । এমনকী কংগ্রেসও ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) এর কয়েকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যদিও তা নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবেই । কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) সম্ভবত আয়রন কার্টেন দমননীতির বিরুদ্ধেই সরব হতে পছন্দ করে, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধে নয় — আমার এ ধারণা আরও বেশি করে দৃঢ় হচ্ছে, বিশেষ করে আপনার প্রতিক্রিয়ার ধরণ-ধারণ দেখে । এই বিগত এক বছরেই নিউ ইয়র্ক শহরে চলচ্চিত্র, বই সম্পর্কে পুলিশি ধরপাকড় তো হয়েইছে, এমনকী কমেডিয়ানরাও ( লেনি ব্রুস-এর ঘটনা ) বাদ যাননি । আমার মনে হয়, আপনার এ-সম্পর্কে যতোটা জানা দরকার ততটা আপনি জানেন না । ভদ্রভাষায় বললে তাই দাঁড়ায় আরকী । যেমন, আপনি কি জানেন যে, ইংরেজি ভাষায় যে প্রকাশক ডুরেল, মিলার, বারোজ, নবোকভ, টেরি সাদার্ন, দ্য সাদে ও প্রাচ্য প্রণয়গাথা প্রকাশ করেছিল, সেই অলিম্পিয়া প্রেস ফরাসি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ? এ ব্যাপারে ফরাসি কংগ্রেস ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) কিছু করতে তেমন উৎসাহী ছিল, তা নয় । অলিম্পিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া এক আন্তর্জাতিক কেচ্ছায় পরিণত হওয়ায় একটু নড়েচড়ে বসে তারা একটি পিটিশন চালু করেছে । নিশ্চয়ই এটা জানেন যে, ভারতে লেডি চ্যাটার্লিজ নিষিদ্ধ ? ভারতীয় কমিটি কি এ বিষয়ে মাথা ঘামিয়েছে ? হাংরিরা তো হালের ।

“যা হোক, এসবই তত্ত্বকথা, আমার ক্ষোভ উগরে দেওয়া — মতের বিনিময় — ঈশ্বরের দোহাই, মাথা গরম করবেন না — মলয় ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে আনা পুলিশের অভিযোগ মনে হয় এখনও রুজুই আছে — মলয় লিখেছে যে ২৮ ডিসেম্বর বিচার শুরু হবে — এই অদ্ভুত পরিস্হিতি থেকে মুক্ত হওয়ার মতো প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকে কোনও সহায়তাই পাওয়া যায়নি এখনও অবধি — ও বলেছে, বোধহয় ওর কথাগুলো সত্যিই, যে, ‘আমাদের গ্রেপতার হওয়ার ফলে কবি ও লেখকরা এতোটাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, তারা প্রায় সকলেই তাদের লেখার ধরনটাই পালটে ফেলেছে ।’ অবশ্য ও যে লেখক দলকে চেনে, তাদের কথাই বলছে, ‘প্রতিষ্ঠিত’ বয়স্কদের কথা নয় । ও জানিয়েছে কংগ্রেসকে ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পায়নি ও । আপনিও এড়িয়ে গেছেন । আর ‘আমাদের গ্রেপতার হওয়ার পর আমাদের কোনো ম্যাগাজিন বা বুলেটিন আমরা ছাপাতেই পারছি না ।’ পুলিশের ভীতি । উৎপল বসু আজ একটা চিঠিতে লিখেছে, ‘ভীষণ বাজে খবর । আজ আমার কলেজ কর্তৃপক্ষ ( যেখানে আমি জিওলজি পড়াই ) আমায় পদত্যাগ করতে বলল । আমার কোনো যুক্তিই ওরা শুনতে নারাজ । আমার তো একরকম সর্বনাশ হয়ে গেল । ওরা টাইম পত্রিকা খুলে দেখিয়ে বললে, এই তো আপনার ছবি ও বক্তব্য । আপনার মতো কোনো লোক আমাদের এখানে থাকুন, এ আমরা চাই না…আমার চিঠিপত্র পুলিস ইনটারসেপ্ট করছে । আপনি আমার শেষ চিঠিটা পেয়েছেন ?…ইত্যাদি।’ এ একেবারে অসুস্হকর এক পরিস্হিতি । এরকমভাবেই সব চলতে থাকবে, এই ভেবে চিন্তিত হয়ে আমি আসলে প্রাথমিকভাবে তড়িঘড়ি, অতি দ্রুত চিঠি লিখেছিলাম । কারণ পুলিশি শাসনতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমার ভারতে থাকতেই হয়েছে ।এখন কিন্তু পরিস্হিতি যথেষ্ট সংকটপূর্ণ । প্রবীণ, দায়িত্ববান কোনও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হস্তক্ষেপ না করলে এর থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব নয় । বোধহয় ক্যালকাটা কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডমের প্রতি চিঠি আপনাকে উদ্দেশ করে লেখা আমার উচিত হচ্ছে না । যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতায় কংগ্রেসের ( ফর কালচারাল ফ্রিডাম ) দপতরে এ-বিষয়ে ভারপ্রাপ্তের হাতে দয়া করে চিঠিটি পৌঁছে দেবেন । আপনাকে রুষ্ট করে থাকলে মার্জনা করবেন । তবে চিঠিতে অন্তত আপনাকে কথাগুলি সোজাসুজি বলছি । এই মুহূর্তে আপনার-আমার মতানৈক্যের থেকেও পুলিশ পরিস্হিতিই প্রকৃত চিন্তার বিষয়।— অনুগত, অ্যালেন গিন্সবার্গ ।

“পুনশ্চ : আমার বিলম্বিত উত্তরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী । পিটার ( অরলভস্কি ) ও আমি গত এক মাস হারভার্ডে বক্ততৃতাদানে ব্যস্ত ছিলাম । আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই কেমব্রিজ থেকে ফিরেছি ।

দাদাকে সম্ভবত জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে দেখা করতে । আমরা দুজনে দেখা করেছিলুম । কিন্তু আইয়ুব সাহেব এ-ব্যাপারে মুখ খোলেননি, এমন ভাব করেছিলেন যেন দুটো ভিখারি ওনার ড্রইংরুমে ঢুকে পড়েছে । দাদাও জানতো না, আমিও জানতুম না যে গিন্সবার্গ আর আইয়ুব সাহেবের মধ্যে আমাদের কেস নিয়ে কথাবার্তা চলছে । ব্যাপারটা আমরা জানতে পারি পরে যখন দাদাকে আর আমাকে কলকাতায় র‌্যাডিকাল হিউম্যানিস্টের দপতরে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের ভারতীয় সচিব এ. বি. শাহ দেখা করতে বলেন । এ. বি. শাহ পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে জেনেছিলেন যে কলকাতার এলিটবর্গের কারা আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকেছেন । এ. বি. শাহ বললেন, তিনি কিছু করতে পারবেন না । এলিটবর্গের কলকাঠি ছাড়া তো জানার কথা নয় যে উৎপলকুমার বসু কোথায় অধ্যাপনা করেন, এবং তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত ।

অ্যালেন গিন্সবার্গের চিঠির জবাবে আবু সয়ীদ আইয়ুব ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ এই চিঠিটি লেখেন । চিঠিটির কপি পরে গিন্সবার্গই আমাদের পাঠিয়েছিলেন, জানাবার জন্য যে আইয়ুব সাহেব কতোটা ক্রুদ্ধ :-

Pearl Road

Calcutta

31 October, 1964

Dear Mr Ginsberg,

I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate, did not, however surprise me ; for I never thought the Congress had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeoisie’ or ‘respectable’.

If any known litteratur or intellectual had come under police repression for their literary or intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile work to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy language ( I hope you agree that the word ‘fuck’ is obscene and  ‘bastard’ filthy at least in the sentence ‘Fuck the Bastards of the Gangshalik School of Poetry’; they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avantgarde exhibition ! You may think your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.

It was of course foolish of the police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now) thus giving the publicity and some public sympathy — publicity is precisely what they want to gain through their pranks.

I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of American Beatnik poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language — a language of which you chose to remain totally ignorant.

With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

Yours sincerely

Abu Sayeed Ayyub

 

আইয়ুব সাহেব যখন এই চিঠিটা লিখছেন তখন পর্যন্ত চার্জ শিট দেয়া বাকি আছে, প্রদীপ চৌধুরীকে ত্রিপুরা থেকে গ্রেপতার করে কলকাতায় আনা বাকি আছে । আইয়ুব সাহেব দাদার “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি”  কাব্যগ্রন্হ তখনও পড়েননি, উৎপলের কবিতাও পড়েননি, তা তিনি স্বীকার করেছিলেন আমাদের কাছে । তিনি জানতেনই না যে উৎপলের চাকরি চলে গেছে, জানতেন না যে দাদাকে চাইবাসায় গ্রেপতার করা হয়েছিল, আর তখনও পর্যন্ত সাসপেন্ড রয়েছেন । কারা তাঁকে খবর যোগাচ্ছিল জানি না । যারা যোগাচ্ছিল তারাই আমাদের বুলেটিন, পত্রিকা ইত্যাদি কলকাতায় ছাপাতে দিচ্ছিল না । দাদার এক বন্ধু, অদ্রীশ বর্ধনের দাদা, নতুন প্রেস খুলেছিলেন বহরমপুরে, সিগনাস প্রিন্টিং নামে, দাদা সেখানে ছাপার ব্যবস্হা করে দেন তাঁকে বলে ।

অ্যালেন গিন্সবার্গ এবং আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিঠিগুলো পড়লেন তো ? এবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটি চিঠি পড়ুন, একটি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা, হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে, তাতে দাদার কোনো উল্লেখ নেই, অন্য চিঠিটা এক বছর পরে দাদাকে লেখা, যাতে লিখছেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না, বোঝাই যায় যে পরের দশকগুলোর কবিতায় আসন্ন বাঁকবদলের হদিশ পাননি, এমনকী তরুণীরাও যে বাঁকবদলের অন্যতম কারণ হবেন, তা আশা করেননি, নকশাল আন্দোলনের আগাম আঁচ করতে পারেননি  । পরের প্রজন্মের কবিদের সম্পর্কে তাঁর হিংসে তিনি লুকোননি, বোধহয় ভেবে দেখেননি যে চিঠিগুলো কখনও প্রকাশিত হলে ছবিটার ফ্রেমে ঘুণ ধরে যেতে পারে, কিংবা হয়তো ভেবেছিলেন যে বহুল প্রচারিত পত্রিকার গদিতে বসে সময়কে রৈখিকতার বাইরে যাবার তত্বকে হাপিশ করে দিতে পারবেন ।

15 June 1964

313 South Capital

Iowa City

USA

সন্দীপন,

নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় বসেছি, প্রচণ্ড হাওয়া, সঙ্গে ৫ ডজন বিয়ার ক্যান, পাশে সাঁতারের পোশাক পরা একটা ধলা মেয়ে, মাঝে মাঝে তার পাছায় টোকা মারছি পায়ের আঙুল দিয়ে, এ দৃশ্য কেমন ? অবিকল এই দৃশ্যের মাঝে আমি শুয়ে আছি । চিঠি লিখছি । কিন্তু আমি এ দৃশ্যের মধ্যে নেই । হাতের তালু গোল করে খুব ছোটো করে, চোখের কাছে আনছি — সবকিছু দূরে চলে যাচ্ছে । মেয়ের মুখও । খিদে নেই । তেষ্টা নেই । তবু বিয়ার খাচ্ছি । কারণ, এখানে বসে খাওয়া বেআইনি বলে, ঘরের মধ্যে খুব গরম । থাকতে পারিনি । ঘাসের ওপর গড়িয়ে গেলাম । একটা দূরন্ত খরগোশকে ধরার জন্য পাঁচবার ছুটে গিয়েছিলাম ।

কী ভালো লেগেছিল আপনার চিঠি পেয়ে । বিশেষত লাল পেনসিলের অক্ষর । যেন দুটো চিঠি পেলুম । গল্পটা আপনার ভালো লাগবে না জানতুম । গদ্য লিখে আপনাকে খুশি করতে পারব এমন দুরাশা আমার নেই । সত্যি নেই । কারণ, আপনি গ্রেট গদ্য লিখেছেন একসময়, এখন আর তেমন না । কিন্তু যা লিখেছেন, তার ধারে কাছে আর কেউ পৌঁছোতে পারেনি । আমি ওরকম গদ্য লিখতে পারি না । লিখবো না । কিন্তু ওই গদ্যই আমার প্রিয় পাঠ্য । আপনি পড়বেন, এই ভয়ে আমি সহজে গদ্য লিখতে চাই না । তবু, কখনও লিখি, হয়তো টাকার জন্য, টাকার জন্য ছাড়া কখনও গদ্য লিখেছি বলে মনে পড়ে না, লিখেছিলুম একটা উপন্যাস, সেটা ছাপার সম্ভাবনা নেই । আমার কবিতার জন্য আপনাকে ভয় করি না, কবিতার লেখার ক্ষমতার ওপর আমার বেশি আস্হা নেই, আপনি যেরকম কবিতা ভালোবাসেন, অথবা যাই হোক — আমি সেরকম কখনও লিখব না । আমি কবিতা লিখি গদ্যের মতো, ওরকমই লিখে যাবো । ও সম্বন্ধে আমার কোনো দ্বিধা নেই । শক্তি অসাধারণ সুন্দর বহু লাইন লিখেছে । আমার চেয়ে অনেক বড়ো, আমি ওকে শ্রদ্ধা করি । কিন্তু শক্তির কবিতা মুণ্ডহীন, আমি ওরকম লিখতে পারবো না, চাই না, কারণ আমি ওরকমভাবে বেঁচে নেই । বরং উৎপলের কবিতা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করেছে । কিন্তু এখানে এই শুয়ে থাকা, গাছের ছায়া মুখে পড়ছে — তখন মনে হয় কোথাও কিছু নেই, না কবিতা, না হৃদয় ।

প্রিয় সন্দীপন, দু’দিন পর আজ সকালে আবার আপনার চিঠি পেলুম । কি সব লিখেছেন কিছুই বুঝতে পারলুম না । কেউ আমাকে কিছু লেখেনি । শরৎ ও তারাপদ কফিহাউসে কি সব গণ্ডোগোলের কথা ভাসা ভাসা লিখেছে । সবাই ভেবেছে অন্য কেউ বুঝি আমাকে বিস্তৃত করে লিখেছে । কিন্তু আপনার চিঠি অত্যন্ত অস্বস্তিজনক । তিনবার পড়লুম, অস্বস্তি লাগছে। বিছানা থেকে উঠে কলের কাছে গেলুম, ফিরে এলুম টেবিলে, আবার রান্নাঘরে, ভালো লাগছে না, কেন আমাকে এরকম চিঠি লিখলেন ? আমি তো শুয়েছিলুম । আমি তো বিছানায় রোদ ও আলস্য নিয়ে খেলা করছিলুম । কেন আমাকে এমনভাবে তুললেন ?

সন্দীপন, আপনি অনেকদিন কিছু লেখেননি, প্রায় বছর তিনেক । তার বদলে আপনি কুচোকাচা গদ্য ছাপিয়ে চলেছেন এখানে সেখানে । সেই স্বভাবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায় হাংরির হাঙ্গামায় । আমি বারণ করেছিলুম । আপনি কখনও আমাকে বিশ্বাস করেননি । ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন । আমি শক্তিকে কখনও বারণ করিনি, কারণ আর যতো গুণই থাক, শক্তি লোভী । শেষ পর্যন্ত উৎপলও ওই কারণে যায় । কিন্তু আমি জানতুম আপনি লোভী নন । আপনার সঙ্গে বহুদিন এক বিছানায় শুয়েছি, পাশাপাশি রোদ্দুরে হাঁটার সময় একই ছায়ায় দাঁড়িয়েছি । সেই জন্য আমি জানতুম । সেইজন্যই বুঝেছিলুম আপনার লোভ আমার চেয়ে বেশি নয় । আমার ওতে কখনও লোভ হয়নি, হয়েছিল অস্বস্তি থেকে ঘৃণা । ইংরেজিতে রচনা ছাপিয়ে ইওরোপ আমেরিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করা আমার বিষম বদরুচি মনে হয়েছিল আগেই, এখানে এসে আরও বদ্ধমূল হয়েছি । হাংরির গ্যাঁড়াকলের প্রতি আরও ক্রুদ্ধ হয়েছি । অপরের কৌতূহল এবং করুণার পাত্র হতে আপনার ইচ্ছে করে ? হাংরি এখানে যে দুএকজন পেয়েছে, তাদের কাছে তাই । আমি এতোদিন দেশে রইলুম — অনেক সুযোগ এবং আহ্বান পেয়েছিলুম, কোথাও তবু একটি লাইনও ইংরেজি পদ্য ছাপাইনি । ছাপালে কিছু টাকা পেতুম, তবু না । কারণ সবাইকে বলেছি, আমি বাংলা ভাষার কবি, আমি শুধু বাংলাতেই লিখি, যে ভাষায় কথা বলে সাত কোটি লোক — ফরাসি ও ইতালির চেয়ে বেশি । এবং ফরাসি ও ইতালির চেয়ে কম উন্নত ভাষা নয় । আমার কাজ কবিতা লেখা, নিজের কবিতা অনুবাদ করা নয়, ও কাজ অন্যের । তোমার দরকার হলে বাংলা শিখে অনুবাদ করে নাও। এই ধরণের সূক্ষ্ম পিঠচাপড়ানির ভাব লক্ষ্য করেই আমি বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্হের কাজ, যে জন্য আমি এখানে এসেছিলুম, এক লাইনও করিনি ।

হাংরির এই ইংরেজির মতলব ছাড়া, বাংলা দিকটা আরও খারাপ । ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই । শর্টকাটে খ্যাতি বা অখ্যাতি পাবার চেষ্টা — অপরকে গালাগাল বা খোঁচা দিয়ে । আপনি মলয়কে এতো পছন্দ করছেন — কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে, আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে বিশ্বাস করেন না । আমি চলে আসার পরও আপনি হাংরির পৃষ্ঠপোষকতা করছেন — হিন্দি কাগজের জন্য আপনি কি একটা লিখেছিলেন — তাতেও হাংরির জয়গান । ভাবতে খুব অবাক লাগে — আপনার মতো অ্যাবস্ট্র্যাক্ট লেখক কি করে ইলাসট্রেটেড উইকলিতে ছবি ছাপাটাও উল্লেখের ব্যাপার মনে করেন । এগুলোই হাংরির গোঁজামিল । এই জন্যই এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকাতে বারবার দুঃখ পেয়েছি, দুঃখ থেকে রাগ, রাগ থেকে বিতৃষ্ণা । একটা জিনিস নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমি হাংরির কখনও প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিনি, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করিনি । পারতুম । করিনি, তার কারণ, ওটা আপনাদের শখের ব্যাপার, এই ভেবে, এবং আপনারা ওটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন কৃত্তিবাস বা সুনীলের প্রতিপক্ষ হিসেবে । সে হিসেবে ওটাকে ভেঙে দেওয়া আমার পক্ষে নীচতা হতো । খুবই । বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ক্ষতির কথা ভেবে নয়, আপনার অপকারের কথা ভেবেই আমি আপনার ওতে থাকার বিরোধী ছিলুম । এটা হয়তো খুব সেন্টিমেন্টাল শোনালো, যেন কোনো ট্রিক, কিন্তু ও-ই ছিল আমার সত্যিকারের অভিপ্রায় ।

এবারে নতুন করে কি ঘটলো বুঝতে পারলুম না । যে-ছাপা জিনিসটার কথা লিখেছেন সেটা দেখলে হয়তো বুঝতে পারতুম । এবং এটা খুবই গোলমেলে — যে চিঠি আপনি চারজন বন্ধুকে একসঙ্গে লিখেছেন, যেটা চারজনকে এক সঙ্গে পাঠানো যায় না, সেটা হারাধন ধাড়াকে পাঠালেন কি জন্য, বুঝতে পারলুম না । কিংবা আমার বোঝারই বা কি দরকার ? আচ্ছা মুশকিল তো, আমাকে ওসব বোঝার জন্য কে মাথার দিব্বি দিয়েছে এই আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা ? আমি কলকাতায় ফিরে শান্ত ভাবে ঘুমোবো, আলতো পায়ে ঘুরবো — আমার কোনো সাহিত্য আন্দোলনের দরকার নেই । মলয় আমার চিঠি কেন ছাপিয়েছে ? আমার গোপন কিছু নেই — বিষ্ণু দেকে আমি অশিক্ষিত বলেছি আগেও, কৃত্তিবাসের পাতায় ব্যক্তিগত রাগে, কারণ উনি ওঁর সংকলনে আমার কবিতা আদ্দেক কেটে বাদ দিয়েছেন বলে । কিন্তু মলয়ের সেটা ছাপানোর কি মতলব ? যে প্রসঙ্গে লিখেছিলুম সেটা ছাপিয়েছে তো ? আমি ওকে লিখেছি সম্প্রতি. ‘সামনে পেছনে বাদ দিয়ে, ডট ডট মেরে চালাকির জন্য আমার চিঠি যদি ছাপাও, তাহলে এবার ফিরে গিয়ে কান ধরে দুই থাপ্পড় মারব’। আপনার চিঠি সম্বন্ধেও তাই । আপনার চিঠি ওরা ছাপিয়েছে সেটাই খারাপ(*) — যা লিখেছেন, তা নয় । বেশ করেছেন লিখেছেন — আমি না পড়েই বলছি । ওটা আপনার, শক্তির বা আমার ঘরোয়া ব্যাপার — আর কার কি তাতে?  আপনার যা খুশি বলার অধিকার আছে ।

কিন্তু ওসব থাক সন্দীপন । আপনাকে কেউ মারবে না । কার অমন স্পর্ধা আছে ? যদি আপনি জায়গা দেন, আমি সব সময় আপনার পাশে আছি । অনেকে আছে । আপনার সঙ্গে কতো ঝগড়াঝাটি হয়েছে — কিন্তু এই দীর্ঘদিন নিরালায় ভেবে দেখলুম, আপনাকে বাদ দিয়ে আমাদের চলে না । এক হিসেবে আপনি আমার অপরাংশ, আপনার চরিত্রের অসংলগ্নতা, ভুল এবং জোচ্চুরি — সব কিছু আমার প্রিয় । যেন আমার না-পাওয়া জীবন । লেখক হিসেবে, ‘প্রতিভাবান’ এই শব্দটি যদি ব্যবহার করতে হয় — তবে আমাদের পুরো জেনারেশনে তন্ময় দত্ত ছাড়া — শুধু আপনার সম্পর্কেই আমি একথা ভাবি । আপনার ঐ সুখের সূক্ষ্ম শরীর কেউ ছোঁবে না — কলকাতা শহরে এমন কেউ নেই । না নেই । আপনি নরম ভাবে শুয়ে থাকুন রীনার পাশে, আপনি ওঁকে মঙ্গল গ্রহের গল্প বলুন ।

আমি কলকাতায় পৌঁছোবো ১৮ই আগস্ট । নানা কারণে এখানে এক মাস দেরি হয়ে গেল । দেরি হয়ে গেল আমারই বোকামিতে খানিকটা । জুনের মাঝামাঝি বা আগস্টের প্রথমে প্যারিসে একটা থাকার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কয়েক দিনের জন্য । আমি জুন মাসটা নষ্ট করেছি — সুতরাং আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই । এই ঠিকানায় আছি  জুলাইয়ের বারো তারিখ পর্যন্ত অন্তত, তারপর নিউ ইয়র্ক ও ইংল্যাণ্ড। এখানে থেকে এম এ পড়তে পারি আমি — আপনার মনে এরকম ধারণা এলো কি করে ? আমি কি সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়েছি ? কৃত্তিবাসে আপনার লেখা নিয়ে প্রচুর গণ্ডোগোল করেছি — তবু, এবার কৃত্তিবাসে আপনার লেখা না দেখে মন খারাপ লাগলো । এখান থেকে কোনো জিনিস নিয়ে যাবার হুকুম আছে আপনার কাছ থেকে ?

ভালোবাসা

সুনীল

(*) এটি চিঠি নয় । দেবী রায়কে লেখা — হারাধন ধাড়াকে নয় — নানা রঙিন পেনসিলে লেখা হাংরি বুলেটিনের জন্য গদ্য । বুলেটিনে এই গদ্যটি প্রকাশিত হয়েছিল । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবিরাম উপন্যাস লেখা আরম্ভ করলে আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাস প্রকাশ অসম্ভব করে দিয়েছিলেন । সেকারণে সন্দীপন আজকাল পত্রিকায় যোগ দেন । দাদাও কৃত্তিবাস পত্রিকায় লেখা পাঠানো বন্ধ করে দেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য দাদার কাছ থেকে কবিতা দাদার পোস্টিঙের জায়গায় গিয়ে নিয়ে আসতেন, তখন দাদার কবিতার ধারা কৃত্তিবাসের ধারা থেকে পালটে গেছে । এবার দাদাকে লেখা চিঠিটা পড়ুন :-

৩২/২, যুগীপাড়া রোড, দমদম

কলকাতা – ২৮

৯ নভেম্বর ১৯৬৫

সমীর,

মলয়ের ৫ তারিখের মামলার বিস্তৃত বিবরণ নিশ্চয়ই ওদের চিঠিতে জানতে পারবি, বা জেনে গেছিস । সে সম্পর্কে আর লিখলুম না ।

দুটি ব্যাপার দেখে কিছুটা অবাক ও আহত হয়েছি । তুই এবং মলয় ইত্যাদি ধরেই নিয়েছিলি আমি মলয়ের স্বপক্ষে সাক্ষী দেবো না — বরং অন্যান্যদের বারণ করব, কোনোরকম সাহায্য করবো না । তোর অনুরোধ ছিল ‘শেষ অনুরোধ’ — যেন আমি প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ অনুরোধ আগে প্রত্যাক্ষ্যান করেছি । মলয়ও কয়েকদিন আগে সকালে আমার বাড়িতে এসে বললো, ওর ধারণা আমি চারিদিক থেকে ওর সঙ্গে শত্রুতা করছি এবং অপরকে ওর সঙ্গে সহযোগীতা করতে বারণ করছি !

অপর পক্ষে, মামলার রিপোর্ট কাগজে বেরুবার পর — কফি হাউসের কিছু অচেনা যুবা, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাতে আসে । আমি নাকি খুবই মহৎ ব্যক্তি — হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কখনও যুক্ত না থেকেও এবং কখনও পছব্দ না করেও যে ওদের স্বপক্ষে সাক্ষী দিয়েছি — সেটা নাকি আমার পক্ষে পরম উদারতার পরিচয় ।

ওদের ওই নকল উদারতার বোঝা, এবং তোদের অন্যান্য অবিশ্বাস — দুটোই আমার পক্ষে হাস্যকর মনে হল । মানুষ কি স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে ভুলে গেছে ? আমার ব্যবহার আগাগোড়া যা স্বাভাবিক তাই । আমার স্ট্যাণ্ড আমি আগেই পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছি । আমি হাংরি জেনারেশন পছন্দ করি না ( সাহিত্য আন্দোলন হিসেবে ) । আমি ওদের কিছু-কিছু পাজি ব্যবহারে বিরক্ত হয়েছি । মলয়ের দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না — আমার রুচি অনুযায়ী এই ধারণা । অপরপক্ষে লেখার জন্য কোনো লেখককেই পুলিশের ধরার এক্তিয়ার নেই — একথা আমি বহুবার মুখে এবং কৃত্তিবাসে লিখে জানিয়েছি । পুলিশের বিরুদ্ধে এবং যেকোনো লেখকের স্বপক্ষে ( সে লেখকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক যা-ই হোক না ) দাঁড়ানো আমি অত্যন্ত স্বাভাবিক কাজ বলেই মনে করি । কারুর লেখা আমি অপছন্দ করি বলেই তার শত্রুতা করবো, কিংবা অন্য কারুকে নিবৃত্ত করবো তাকে সাহায্য করতে — এরকম নীচতা কি আমার ব্যবহারে বা লেখায় কখনো প্রকাশ পেয়েছে ? এসব ছেলেমানুষী চিন্তা দেখলে — মাঝে মাঝে রাগের বদলে হাসিও পায় ।

যাই হোক, আদালতের সাক্ষ্যতে আমি দুটি কথা বলেছি । মলয়ের লেখার মধ্যে অশ্লীলতা কিছুই নেই — এবং ওর লেখাটা আমার ভালোই লেগেছে । ধর্ম সাক্ষী করে আমি দ্বিতীয় কথাটা মিথ্যে বলেছি । কারণ, কয়েকদিন আগে মলয় যখন আসে — তখন আমি বলেছিলুম যে ওর লেখা আমি পছন্দ করি না । কিন্তু শ্লীল-অশ্লীলের প্রশ্নটি জেনারাল, এবং সেই জেনারাল প্রশ্নে আমি অশ্লীলতা বলে কিছুই মানি না । সুতরাং সেই হিসেবে মলয়ের লেখাও যে বিন্দুমাত্র অশ্লীল নয়, তা আমি সাক্ষীর পক্ষে উঠে স্পষ্ট ভাবে বলতে রাজি আছি । তখন মলয় আমাকে অনুরোধ করে, আমি যদি ওকে সাহায্য করতে চাই, তবে জজসাহেবের সামনে ওর কবিতা খারাপ লাগে এটাও যেন না বলি । আদালত তো আর সমালোচনার জায়গা নয় । বরং ওর কবিতা ভালো লাগে বললেই নাকি মলয়ের পক্ষে সুবিধে হবে ।

সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয়।(*) পড়ে আমার গা রি-রি করে । এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি — আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না— এসব কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না । মলয়ের তিনপাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই । মলয় যদি আমার ছোটো ভাই হতো, আমি ওকে কবিতা লিখতে বারণ করতাম অথবা গোড়ার অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করতে বলতাম । যাই হোক, তবু আমি বেশ স্পষ্ট গলাতেই দুবার বলেছি ওর ঐ কবিতা আমার ভালো লেগেছে । এর কারণ আমার কোনো মহত্ব নয় — আমার সাধারণ, স্বাভাবিক সীমাবদ্ধ জীবন । যে কারণে আমি আনন্দবাজারে সমালোচনায় কোনো বাজে বইকে ভালো লিখি — সেই কারণেই মলয়ের লেখাকে ভালো বলেছি । যাই হোক, সেদিন আদালতে দাঁড়িয়ে মনে হল, হাকিম এবং পুলিশপক্ষ এ মামলা ডিসমিস করে দিতে পারলে বাঁচে । কিন্তু মলয়ের প্রগলভ উকিল মামলা বহুদিন ধরে টেনে নাম কিনতে চায় ।

ডিসেম্বর ৮-৯ তারিখে পাটনায় আমেরিকান সাহিত্যের ওপর একটা সিমপোজিয়াম হবে । আমি তাতে যোগদান করার জন্য নিমন্ত্রিত হয়েছি । ঐ সময়ে পাটনা যাবো । আশা করি ভালো আছিস ।

সুনীল ।

(*) কবিতাটির নাম ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কবিতাটি প্রথমবার পড়েন । তার আগে তিনি কবিতাটি পড়েননি ।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কৃত্তিবাস’ দ্বিতীয় সংকলনের সম্পাদকীয় লেখার সময়েও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের প্রতি ঈর্ষাজনিত ক্ষতের কথা ভুলতে পারেননি । তিনি লিখেছিলেন, “অ্যালেন গিনসবার্গের প্রভাবেই কিনা জানি না, এই সময় কৃত্তিবাস লেখক গোষ্ঠীরই একটি অংশ হাংরি জেনারেশন নামে একটি আন্দোলন শুরু করে । প্রায় একই লেখক গোষ্ঠী হলেও, কৃত্তিবাস পত্রিকা ঘোষিতভাবে হাংরিদের সঙ্গে সম্পর্ক-বিযুক্ত থাকে, আমি নিজেও কখনো হাংরিদের দলে যোগ দিইনি । দু’এক বছরের জন্য হাংরি জেনারেশনের আন্দোলনের সোরগোল কৃত্তিবাসের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল হয়েছিল এবং তা একদিকে টাইম ম্যাগাজিন অন্যদিকে আদালত পর্যন্ত গড়ায় । আমি হাংরিদের থেকে সব সময়ে দূরে দূরে রইলেও অশ্লীলতার অভিযোগে যখন শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরীর বিচার হয়, তখন আমি তার পক্ষ সমর্থন করে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম ।”

হাংরি আন্দোলনের দেবী রায়, ত্রিদিব মিত্র, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় কারোর সঙ্গে গিন্সবার্গের দেখা হয়নি । দাদার সঙ্গে হয়েছিল ১৯৬২ সালে আর আমার সঙ্গে ১৯৬৩ সালে । হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে । বস্তুত কৃত্তিবাস গোষ্ঠীই গিন্সবার্গের দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এবং তাঁদের অনেকেরই কবিতায় সেকারণে এই সময় বাঁকবদল ঘটেছিল, যখন কিনা তাঁরা কবিতা লিখছিলেন পঞ্চাশ দশক থেকে । গিন্সবার্গের তোলা ফোটোও তাঁরা কৃত্তিবাস পত্রিকার কভারে ছেপেছেন । কোনো হাংরি বুলেটিনে গিন্সবার্গের অস্তিত্ব নেই ।

‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার হাংরি সংখ্যার জন্য নাসের হোসেন দাদাকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন, “হাংরি আন্দোলন চলাকালীন নানাধরণের ঘটনা ঘটেছে । এমনকি পরস্পরের সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটেছে । এই ঘটনার প্রভাবে মেইনস্ট্রিমের কিছু-কিছু ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কি বলবেন ?”

দাদা তার এই উত্তর দিয়েছিলেন, “দেখ, আমার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে সুনীল বাইরে থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ভাঙন ধরাতে সচেষ্ট ছিলেন । শক্তিকে নেতা করা হয়েছিল বলে সুনীল অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ছিলেন । আর প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশয় ভেতর থেকে ভাঙন ধরাতে চেষ্টা করেছিলেন এবং অনেকটা সফল হয়েছিলেন । এগুলি যে কেউ গবেষণা করলেই টের পাবেন ।”

দাদার জন্য তাই জরুরি ছিল কলকাতায় এসে “হাওয়া-৪৯” পত্রিকার মাধ্যমে নিজের দর্শনকে প্রতিরোধ হিসাবে এসট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতরূপে তুলে ধরা । এক সাক্ষাৎকারে ( চন্দ্রগ্রহণ, হাংরি সংখ্যা ) নাসের হোসেন দাদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হাংরি জেনারেশন থেকে আপনি অধুনান্তিক অবস্হানপন্নতায় গেলেন কীভাবে ? আমার ধারণা এ-দুটোর দূরত্ব বিস্তর।”

উত্তরে দাদা বলেছিলেন, “আধুনিকতা বা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে উত্তরঔপনিবেশিক অধুনান্তিকতায় যাত্রাপথ চিহ্ণিত করা তোমার পক্ষেও সহজ । দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও, স্বাধীনোত্তর চেতনা তারিখের কাঁটায় সায় দিয়ে বদলে যায় না । হাংরি আন্দোলন স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে ঘটেছিল ষাটের দশকে । এবং ক্রমশ ভেদের সনাক্তকরণ থেকে অভেদের সন্ধানে যাত্রার মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে প্যারাডিম শিফট বা বাঁকবদলের অনিবার্যতা । ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে বেরিয়ে আসার পরিস্হিতি । হাংরি আন্দোলন সবার আগে এই পরিস্হিতি অনুধাবন করতে পেরেছিল ; এবং আন্দোলনের অপরিহার্যতাকে উপলব্ধি করেছিল । কেননা এই ধরণের পরিবর্তন আন্দোলনের মাধ্যমেই সম্ভব । যার ফলে পরবর্তীকালে পর পর একাধিক আন্দোলন ঘটতে থেকেছে । স্বাধীনোত্তর পর্বে ঘটলেও, সেই আন্দোলনগুলির কাঠামো ছিল ঔপনিবেশিক আধুনিকতায় আক্রান্ত । আমরা এ-কথা বুঝতে পেরেছিলাম যে আগের কাঠামো থেকে যেভাবেই হোক বেরিয়ে পড়তে হবে । এবং সাহিত্যের প্রথম শর্ত আগের ভাষাকাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভাষার পরিমণ্ডল গড়ে তোলা । আমরা প্রত্যেকেই কবিতা-গল্প ইত্যাদিতে ভাষার পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট থেকেছি । যেমন মলয় তাঁর কবিতার নাম দিলেন ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’, শৈলেশ্বর ঘোষ দিলেন ‘ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা’, প্রদীপ চৌধুরী নাম রাখলেন ‘চর্মরোগ’, বাসুদেব দাশগুপ্ত তাঁর গল্পগ্রন্হের নাম রাখলেন ‘রন্ধনশালা’, সুবিমল বসাক তাঁর উপন্যাসের নাম রাখলেন ‘ছাতামাথা’, আমি আমার গল্পের নাম দিলাম ‘স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা অমলেট অবধি’, ‘জলছবি’, ‘অতিক্রম’, কাব্যগ্রন্হের নাম রাখলাম ‘জানোয়ার’ । প্রত্যেকের ভাষা, উপস্হাপনা, প্রয়োগ সম্পূর্ণ পৃথক । এগুলো ঠিক রাতারাতি ঘটেনি । বিষয়গুলোকে নিয়ে আমি ও মলয় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করেছি, আলোচনা হয়েছে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের ( হারাধন ধাড়া ) সঙ্গে । দেবী রায়ের কবিতা প্রথম থেকেই গঠন ও মেজাজ-মর্জিতে অভিনব । আমাদের পূর্বে যাঁরা লেখালিখি করেছিলেন তাঁদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না । ফালগুনী রায় তাঁর বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’ । হাংরি আন্দোলনের মধ্যেই এবং ষাট দশকের অধিকাংশ আন্দোলনের মধ্যেই অধুনান্তিকতার বীজ অন্তর্নিহিত ছিল । কেননা যে পরিবর্তন ঘটছিল তা সময়কেন্দ্রিক প্রশ্নময়তা থেকে পরিসরভিত্তিক অবস্হানপন্নতার দিকে তার চেতনার অভিমুখ ক্রমশ রচনা করছিল । এই প্রসেসটা এমন ছিল যে সেখানে প্রাধান্য ছিল গড়ে তোলার চেয়ে উঠে আসার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার স্বতশ্চল তাগিদ । হাংরি আন্দোলনের কোনো হেড অফিস/হাই কমাণ্ড/পলিটব্যুরো বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল না । ঠিক যেমন অধুনান্তিকতার কোনো কেন্দ্র থাকে না, অধুনান্তিক লেখালিখির চরিত্র একটি বিকেন্দ্রিক উপস্হাপনা । ফলে ষাট দশকের অন্যান্য সাহিত্য আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল না, অধুনান্তিক বীজ সেখানে নিহিত ছিল । হাংরি আন্দোলন থেকে অধুনান্তিকতায় পৌঁছে যাওয়া যেজন্য খুব স্বাভাবিক । হাংরি আন্দোলন ছিল সর্বাত্মক আন্দোলন । সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি জীবনচর্যার সবদিকেই এই আন্দোলন মনোযোগ দিয়েছিল । “হাওয়া ৪৯” পত্রিকার সংখ্যাগুলিতে বিষয়গুলির ক্রমান্বয়কে যদি লক্ষ্য করো, তাহলে দেখতে পাবে, সমস্ত দিকেই ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের গভীর অভিনিবেশ । ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কাগজে-কলমে মুক্তি পাওয়ার পর হাতেনাতে সেই মুক্তি প্রতিষ্ঠার দায় প্রবলভাবে অস্হির রাখে সমাজচিত্তকে । সঙ্গে থেকে যায় ঔপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া খেসারতগুলো । মাথাচাড়া দেয় আত্মবিচ্ছেদগ্রস্ত সত্তার নিজস্ব ভৌমতার অনিবার্যতা । অধুনান্তিকতা সেই সময়ে আমাদের পরিকল্পনায় ছিল না, যদিও তার বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছিল আমাদের ডিসকোর্সে । পরিবর্তনই ছিল আমাদের প্রধান লক্ষ্য । অধুনান্তিকতা উঠে এসেছে বোধের সমস্তরকম স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে । কোনো পরিকল্পনা থেকে উঠে আসেনি। আধুনিকতা বা মডার্নিজমের থেকে বেরিয়ে এসে তুমি যে জায়গাটায় পৌঁছোলে বা পৌঁছোচ্ছ, তার একটা নামকরণ দরকার এবং সেই ভিন্ন পরিসরটির নামকরণ করেছেন আলোচকরা । অধুনান্তিকতা একটি পরিসর ; অনেকে তাকে আন্দোলন ভেবে ভুল করেন ।”

‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাজানো বাগানের পরের স্টপ’ প্রবন্ধে ‘অধুনান্তিক’ শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন বহুভাষাবিদ প্রবাল দাশগুপ্ত ।

তাঁর “উত্তরাধুনিক প্রবন্ধ সংগ্রহ” গ্রন্হে দাদা একটা তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন, স্পষ্ট করার জন্য যে আধুনিকতার সঙ্গে অধুনান্তিকতার পার্থক্য কোথায়, তুলে দিচ্ছি এখানে :

আধুনিক অধুনান্তিক

যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়,                                       যুক্তিবিপন্ন, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে

সিঁড়ি-ভাঙা অঙ্কের মতো যুক্তি                                     মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা,

ধাপে-ধাপে এগোয়, কবিতার                                        আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু

আদি-মধ্য-অন্ত এই ভাবগুলো                                        হওয়া আর শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না

বজায় থাকে, একরৈখিক                                             দেওয়া, ছেতরানো, ক্রমান্বয়হীন, আবেগ

ক্রমঅগ্রসর, কেন্দ্রাভিগ, যুক্তির                                     যুক্তির দ্বৈরাজ্য কেন্দ্রাভিগ, যুক্তি ও

দিকে কবিতার অভিমুখ, আঁটো                                     আবেগের দ্বৈরাজ্যের দিকে কবিতার অভিমুখ,

সাঁটো, স্বয়ংসম্পূর্ণ ।                                                    এলোমেলো দেখায় ।

 

বদ্ধ সূচনা, বদ্ধ আঙ্গিক, বদ্ধ                                        মুক্ত সূচনা, মুক্ত আঙ্গিক, মুক্ত সমাপ্তি ।

সমাপ্তি ।

 

ডিসটোপিয়া ।                                                          হেটারোটোপিয়া ।

 

সুনিশ্চিত মানে, পরিমেয়তা ও                                       মানের নিশ্চয়তা এড়িয়ে যাওয়া, অফুরন্ত

মিতকথনের প্রতি গুরুত্ব, কবির                                     মানে, যা ইচ্ছে তা মনে করে নিতে পারেন

ঠিক করে দেয়া মানে, স্হাবর ।                                     পাঠক, মানের ধারণার প্রসার, প্রচলিত মত

অস্বীকার ।

তলে-তলে মানে, বাইরে মুখোশ।                                       যা আছে তা-ই, লুকোনোর কিছু নেই,

স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা ভিতর-বাহির

আলাদা নয় ।

 

‘আমি’ পাঠবস্তুর কেন্দ্রে, ‘আমি’র                                     একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব,

নির্মাণ, একক আমি, পূর্ব                                               ক্যানন থেকে বেরিয়ে যাওয়া, ক্যানন

নির্ধারিত মানদণ্ড, ক্যানন দাঁড়                                        ভেঙে দেওয়া, সীমা আবছা, সীমায় ভাঙন,

করানো, সীমা স্পষ্ট, আত্মপ্রসঙ্গই                                      মিশ্রতা, লিমিন্যালিটি, সংকরায়ন,

মূল প্রসঙ্গ, শুদ্ধতা, ‘আমি’র                                            সংকরত্ব ।

পেডিগ্রি ( কুলুজি )।

 

একক মালিকানা, স্পষ্ট মালিকানা,                                     মালিকানার রুবরিক, মালিকানার বহুত্ব,

শেকড় — গোপন গভীরে, কবিই                                       মালিকানা বিপন্ন, মালিকানা বিসর্জন,

টাইটেল হোলডার ।                                                       পাঠকই টাইটেল হোলডার, শেকড়

ছড়িয়ে পড়ে, রাইজোম্যাটিক ।

 

একরৈখিক, লিনিয়ার, লিনিয়রিটি,                                    প্লুরালিজম, বিদিশাগ্রস্ত বহুস্বরের আশ্রয়,

দিশাগ্রস্ত, একক গলার জোর, কবি                                     দিগ্বিদিকে গতিময়, ভাবুক, জগৎ

ধ্বনি মিল দেন, প্রগতি ।                                                আয়োজনের মেলবন্ধন উসকে দেন,

অ্যাক্টিভিস্ট ।

 

কবি একজন বিশেষজ্ঞ ।                                                 কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত

বৈশিষ্ট্য ।

 

শ্রেষ্ঠত্ব, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবি,                                       বিবেচন-প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা

একজনকে তুলে ধরা, হিরো, গুরু                                      সরিয়ে দেয়া, কবির বদলে সংকলনের

কবির গুণগান, একসময়ে একজন                                     গুরুত্ব, কবিতার প্রধান পাঠকৃতি বিচার্য,

বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ডনেম তৈরি, বিশেষজ্ঞ                                 সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলা, শ্রেষ্ঠত্ববোধক

সেন্সেলাইজেশান, আইকন ।                                             ফাঁস করে দেয়া, সার্বিক চিন্তা-চেতনা,

জেনেরালাইজেশান ।

 

কথা খেলাপ, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, শব্দার্থকে                                 কথা চালিয়ে যাওয়া, কথার শেষ নেই,

সীমাবদ্ধ রাখা, কবিতার জন্য কবির                                  শ্বব্দার্থের ঝুঁকি, কবিতাকে আত্মমনস্কতা

আত্মধ্বংস, কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন ।                               থেকে মুক্তি ।

 

বাদ দেবার প্রবণতা, এলিমিনেশন,                                     জোটবাঁধা, যোগসূত্র খোঁজা, শব্দজোট,

ঝকঝকে, ছাড়া-ছাড়া স্পষ্ট শব্দ ।                                      অর্থ-জোট, বাক্যজোট, উগ্র মতকেও

পরিসর দেয়া ।

 

একটিমাত্র মতাদর্শ, ইজম, তন্ত্র                                            বহুমতাদর্শের পরিসর, ভেঙে-ভেঙে

অনুযায়ী চলবে, হাইকমাণ্ড,                                                টুকরো ইজমের সমাজ অনুযায়ী

পলিটব্যুরো-নির্দেশিত ।                                                     প্রতিনিয়ত রদবদল, ক্রমাগত

পরিবর্তন, ভঙ্গুরতা, জীবন থেকে

উঠে-আসা ধারণা ।

 

নিটোল কবিতা, শক্তিমত্তার পরিচয়,                                     এলোমেলো কবিতা, বহুরঙা, শক্তি

গুরুগম্ভীর, কবিতার নির্দিষ্ট মডেল                                       জাহির করা মুশকিল, হালকা মেজাজ,

যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি,                                      নির্দিষ্টতার বাইরে, অপরিমেয় নাগাল ।

অনুভবের গভীরতার খোঁজ ।

 

কবিকে প্রকৃতির বাইরে সাংস্কৃতিক জীব                                 সব মানুষই প্রকৃতির অংশ,

মনে করা, নিসর্গবন্দনা ।                                                  ইকোফ্রেণ্ডলি কবি ।

 

প্রতীকের প্রাধান্য, প্রতীকের                                               প্রতীক এড়িয়ে যাওয়া, ভেঙে দেয়া,

চমৎকারিত্ব, প্রতীকের আহামরি,                                         যা বলার সরাসরি বলা ।

ঘুরিয়ে বলা ।

 

স্হিতাবস্হার কদর, পরিবর্তন শ্লথ।                                      পরিবর্তনের তল্লাশি, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপ

স্বীকৃত ।

 

নাক-উঁচু সংস্কৃতি, প্রান্তিককে অশোভন                                   সাংস্কৃতিক বিভাজন বিলোপ, অভেদের

মনে করা, শ্লীল ও অশ্লীল ভেদাভেদ,                                      সন্ধান, একলেকটিক, বাস্তব-অতিবাস্তব-

ব্যবধান তৈরি করা, ভেদের শনাক্তকরণ ।                              অধিবাস্তবের ব্যবধান বিলোপ ।

 

‘বড়ো কবি’ বলে দেবে কাকে কবিতা                                     যেমন ইচ্ছে হয়ে ওঠা কবিতা, বহুপ্রকার

বলে, ভালো কবিতা ও খারাপ কবিতা,                                   প্রবণতা গ্রাহ্য, কবি বেপরোয়া ।

বাইনারি বৈপরীত্য, উতরে যাওয়া

কবিতা, কবিতা হবে সমরূপী ।

 

খণ্ডবাদী, রিডাকশানিজম,                                                  কমপ্লেকসিটি, জটিলতা, অনবচ্ছিন্নতার

অবিচ্ছিন্নবোধ ।                                                               দিকে ।

 

কেন্দ্রিকতায় উদ্ভূত, গ্র্যাণ্ডন্যারেটিভ ।                                     প্রান্তিকতায় উদ্ভূত, মাইক্রোন্যারেটিভ।

 

পরমসত্য, অকাট্যসত্য, ধ্রুবসত্য ।                                        সাময়িক প্রত্যয়, তত্বের বহুবিধ

অনুশীলন ।

 

কবিতা বিষয়কেন্দ্রিক, কবিতা                                             কবিতা ফ্লাক্স থেকে জাত, কেন্দ্রিয়

দর্শন নির্ভর ।                                                                   বিষয়ের অনুপস্হিতি ।

 

কবিতার শিরোনামের গুরুত্ব,                                                 কবিতার শিরোনাম গুরুত্বহীন,

শিরোনামের সঙ্গে কবিতার দার্শনিক                                         না থাকলেও চলে, প্রান্তিক শব্দ, পথচলতি

বা ভাবগত সম্পর্ক, হিরো, গুরু,                                             অভিব্যক্তি ।

প্রতিভা, মাস্টারপিস, ক্ষমতার মসনদ

তৈরি, শব্দে মহিমাযোগ, মৌলিকতার

হামবড়াই ।

 

একটিমাত্র বার্তার বাহক ।                                                     একসঙ্গে বহুকন্ঠস্বর ও বহুবার্তা,

এমনকী বার্তাবর্জন ।

 

কবিতার লক্ষ্য অব্যর্থ, কবির                                                  কবিতার লক্ষ্য বহুত্ববাদী ।

ব্যক্তিসত্তার বিবেচন ।

 

আধিপত্যের প্রতিষ্ঠা ।                                                           আধিপত্যের বিরোধিতা ।

 

‘আমি’ যা বলব  সেটাই কবিতা,                                             ‘তুমি’ যা বলবে সেটাও কবিতা,

এককেন্দ্রিকতা, বৃক্ষশাখার মতন                                               বহুকেন্দ্রিক বা কেন্দ্রহীন পাঠবস্তুর

ইন্টারলিংকড ।                                                                   অজস্র উপাদান, সংজ্ঞার সীমা

ছাপিয়ে যায়, ঘাসের মতন ইন্টারলকড,

রাইজোম্যাটিক ।

 

ওপরের তালিকাটা থেকে স্পষ্ট হয় যে দাদার গল্প লেখার দ্বিতীয় পর্বে অধুনান্তিক জাদুবাস্তবতা এসেছে তাঁর বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি ও পাঠ থেকে সংগ্রহ করা  চিন্তাভাবনার হাত ধরে । বন্ধুদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে দাদা লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রায় দেড় দশক । প্রথম পর্বের গল্পগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের গল্পগুলোর ভাষায় ও কাঠামোয় পার্থক্য আছে । একইভাবে তাঁর প্রথম পর্বের কবিতা ( ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি, জানোয়ার, আমার ভিয়েৎনাম ) থেকে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের কবিতা ( মাংসের কস্তুরীকল্প, পোস্টমডার্ন কবিতাগুচ্ছ, বিদুরের খড়ম, নির্বাচিত কবিতা, আপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয় ) সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছে । ছোটোগল্পের যে সংজ্ঞা ইউরোপ থেকে এসেছিল, অর্থাৎ একটি হুইপক্র্যাক এনডিং থাকতে হবে এবং ব্যক্তিএককের কাহিনি হবে, তা দাদার গল্প লেখার প্রথম পর্বেও ছিল না।

রবীন্দ্র গুহ তাঁর ‘সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের ভূবন : গাণিতিক বহুকৌণিকতা ও উপভোগের প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধে ( কবিতা ক্যাম্পাস, নং ৭১, জানুয়ারি-জুন ২০১১ ) বলেছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ছোটো গল্পের প্রধান ধারক ভাষা ও আঙ্গিক । পৃথিবী জুড়ে যা কিছু লেখালিখি হচ্ছে তার মূল শক্তি বিষয় নয়, দায়বদ্ধতা নয়, আসল হচ্ছে কাঠামোটি । শাখা-প্রশাখা বিনোদনের উপকরণ সমৃদ্ধ হলেই গল্পটি উপভোগ্য হবে এমন নয় । ভাষার গুণে এবং সুঠাম কাঠামোর জন্য অনেক তুচ্ছ বিষয়ও ভাবনার স্তরে বিস্তর অতিরিক্ত ভাবনা ফুটিয়ে তোলে । যেমন আছে ‘মেথিশাকের গন্ধ’তে, ‘শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’-এ এবং ‘আলজাজিরা’তে । ‘মেথিশাকের গন্ধ’তে ডিটেইলিং নেই, আছে অতি সহজবোধ্য সংকেতময়তা । অন্ধকার তুলকালাম আড্ডা জমায় । ছায়ার পিছনে বিনম্র ছায়া । আড়ালে গোছানো কথাবার্তা । নির্জনতার মোড়ক উন্মোচিত হয় এইভাবে :-

 

‘অন্ধকারে জুজুবুড়ি, রাক্ষস, খোক্কোস, শাঁকচুন্নি, একানড়েরা থাকে — মা’র কথা না শুনলে খপ করে খেয়ে নেয়– তারপর মা যখন মামার বাড়ি পাণিহাটিতে নিয়ে যেতেন– রাঙাদিদু কাছে টেনে সবাইকে রাক্ষস খোক্কোস জয় করার রূপকথা শোনাতেন — আমরা নিজেরাই কেউ রাজপুত্র সেজে জয়ের খেলা খেলতাম– খেলতে খেলতে ভয় কেটে গেল — রাঙাদিদু স্বামীর ঘর করার আগেই বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে বিধবা হয়ে গিয়েছিলেন — ছোটোছোটো কদমছাঁট চুল — ফর্সা রঙ — রোগা হাত-পা — পরনে থানকাপড় — সবাই বলত নেড়ি পাগলি— আমাদের রাগ দুঃখ বাড়ত — সেই রাঙাদিদু হঠাৎ মারা গেলেন — পরের বার পাণিহাটিতে গিয়ে আর দেখা হল না — মা বললেন — অন্ধকারের দেশে চলে গেছেন — সেই প্রথম অন্ধকারের মধ্যে প্রিয়জনের বাস তৈরি হল — তারপর এক-এক করে মা বাবা ছোড়দি মেজোজেঠা নকাকা বন্ধুবান্ধব কতো প্রিয়জন সেই অন্ধকারে চলে গেল—-’ ( মেথিশাকের গন্ধ )

 

‘মেথিশাকের গল্প’তে অন্ধকারই প্রধান চরিত্র । অলোক গোস্বামী ‘খুল যা সিম সিম’ প্রবন্ধে ( বোধ, মার্চ ২০০৯ ) বলেছেন, “গল্পটিতে সমীর এই অন্ধকারকে, তার বহুমাত্রিকতা এবং ব্যক্তিত্ব সমেত তুলে ধরেছেন । পড়তে পড়তে বুঝি অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ জড়িয়ে আছে অস্তিত্ব-চেতনার সঙ্গে । যে অভিজ্ঞানগুলো মারফৎ কোনো ব্যক্তি নিজেকে সনাক্ত করে অন্ধকার নিমিষে সেসব অভিজ্ঞান হাপিস করে দিতে পারে । মুছে দিতে পারে পরিচিত ভূগোল । কেড়ে নিতে পারে সভাসামগ্রী । অর্থহীন করে দিতে পারে কোড অফ কম্যুনিকেশন, তছনছ করে দিতে পারে পারস্পরিক সম্পর্কক্ষেত্র ।

“অন্ধকারের স্বরূপসন্ধান যেহেতু সভ্যতার কাম্য নয়, তাই শেফালির মারফত সমাজ বহুবচনে বিধিসম্মত সতর্কবার্তা পাঠায়, ‘যে যেখানে আছ সেখানেই থাকো — মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে আসছি…’।

“কিন্তু অন্ধকারই তো পারে মনকে প্রশ্রয় দিতে, কল্পনাকে বিস্তৃত করতে । সেজন্যই সৃষ্টির আধার অন্ধকার । ভুলি কেমনে বাল্মীকির আশ্রমের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম তমসা, যা সমীরের ভাষ্যে, ‘কবিতার জন্ম হয়েছিল এই নদীতীরে, আরও সহজ করে বলা যায়, মানুষ নামের প্রাণীর কবিত্বের জন্ম কবিতার জন্ম এই তমসাতীরে । যে কবিত্ব এই প্রজাতির চালিকাশক্তি ।

“হতেই পারে অন্ধকার মৃত্যুর নিজস্ব এলাকা । তার জন্য সেই স্হান ভয়ঙ্কর হবে কেন ? মৃতের তালিকায় প্রিয়জনও তো থাকেন ।

 

‘এখন আমার নিজেরই অন্ধকারের দেশে চলে যেতে তত দ্বিধা নেই…সেখানে বাঁধন আছে…শক্তি আছে…রাঙাদিদু মা বাবা ছোড়দি সবাই তো সেখানেই…অন্ধকার এখন প্রিয়জনের সংসার…’

 

“আলোকে অন্ধকারের সাপেক্ষে রেখে সমীর বলেন,

 

‘শীতের সকালের দিকে যেমন ব্রেকফাস্টের সময় ডাইনিং টেবিলের ডানকোনে একচিলতে চেনাজানা এ-বাড়ির নিজস্ব রোদ আসে । একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাচ্ছে এই অন্ধকারও সমান চেনাজানা । চলতে ফিরতে, সঙ্গ নিতে কোনো অসুবিধে নেই । এই অন্ধকার নিজস্ব বিষয়-সম্পদের বাইরে নয় ।”

 

আরেকটি গল্পে অন্ধকারকে কেন্দ্রচরিত্র দিয়েছেন দাদা, ‘কালো রঙের কাজ : আঁধারের অবিনির্মাণ’। অন্ধকার সম্পর্কে দাদার গল্প দুটি আলোচনা কালে বিজ্ঞানের অধ্যাপক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘সমীর রায়চৌধুরীর ছোটগল্প : কয়েকটি বিজ্ঞানময় অবলোকন’ প্রবন্ধে ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) বলেছেন, “বিজ্ঞানে, অন্ধকার স্হানিক বা অস্হানিক দুইই হতে পারে ( আলো কেবল স্হানিক ) যে অন্ধকারের বিন্দুগুলি পরস্পরের সংযুক্ত নয়, সেই অন্ধকার স্হানিক । অস্হানিকে অন্ধকারের এক বিন্দু নড়ে-চড়ে উঠলে, অন্য এক বিন্দুতেও টান ধরে । কথক ও তাঁর স্ত্রী শেফালির মধ্যে সেই অস্হানিক অন্ধকার সেখানে যোগাযোগসূত্রটি হল রান্নাঘরে নির্মীয়মান মেথিশাকের গন্ধ।”

নীলাঞ্জন লিখেছেন, ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে লেখক শুরুতেই অন্ধকারের পরিসরে নিজের জড়ো করা সত্ত্বার ( Acccumulating self ) বর্ণনা দিয়েছেন :-

 

‘অনেকদিন পর আবার হঠাৎ লোডশেডিং । যাকিছু আমার বলার মতো বিষয় সম্পদ জড়ো করেছি, সব আড়াল হয়ে গেল। টেবিল চেয়ার বেডরুম টিভি ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন শেফালি ঘরদোর বুকসেল্ফ সিলিংফ্যান কবিতার খাতা পাশবই, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ-বাড়ির যাকিছু দৃষ্টোগোচর, এই মুহূর্তে নিজের নিজের অবস্হান থেকে সেই উপস্হিতি এই অন্ধকারে নিভে গেছে । যে অবস্হানগুলো নিজেদের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে এই মহাবিশ্বে আমার জলজ্যান্ত থেকে যাওয়া।

 

নীলাঞ্জন তারপর লিখেছেন, এর পরেই দেখি অন্ধকারের সঙ্গে আত্মীয়তা গঠনের চেষ্টা । অবশ্য তা হতেই পারে । ‘আমি আছি; এই বোধ যদি আলো হয়, তবে ‘আমি নেই’ এই বোধ অন্ধকার । দুই বোধই পাশাপাশি থাকে । কবির কাছে অন্ধকার এক গাঢ় তন্ময়তা ডেকে আনে । হয়তো বা তখনই উদ্ভাসিত হয় তৃতীয় নেত্র। দুই চর্মচক্ষুর কাজ ফুরোলেই, তৃতীয় নেত্র নড়েচড়ে ওঠে । লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন তমসা নদীর কথা । তমসা সামান্য পাল্টালে তামস, যার মানে অন্ধকার । আবার তামস উল্টে দিলেই ‘সমতা’ । অন্ধকারে সবাই সমান । সেই মনের ওপর ভর করেই লেখক এগোন । চেয়ার ছেড়ে উঠে, হাতের স্পর্শে অন্ধকারকে চিনে চিনে, অন্ধকারের ভিতর কতো অলিগলি, লেন বাইলেন টেবিলের দুইপাশ দিয়ে বেরিয়েছে । অন্ধকারে ভিতর ফাটলের সন্ধান পাচ্ছেন লেখক । আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরকার অন্ধকার । দুই স্নায়ুকোষের মধ্যবর্তী ফাটল, সেও এক অন্ধকার, বিজ্ঞানীরা যাকে বলেছেন Synaptic Cleft.

অভিজ্ঞতা ছেনে দাদা পেয়েছেন স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবের অন্তরালে কুহকী বাস্তবতার ইন্দ্রজাল, যেখানে ব্যক্তিক সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তব তার সত্যগুলোকে চিনে নিতে পারে, কয়েকটি গল্প সেই সময়ে লেখা যখন পশ্চিমবঙ্গে চলছে রক্তচোষার দিগ্বিজয়, যার দরুণ রাজনৈতিক সামাজিক সমালোচনা মুড়ে ফেলতে হয়েছে জাদুবাস্তবে, দ্বৈততার সংমিশ্রিত আদরায়। বাস্তব সমাজকেই দাদা গুরুত্ব  দিয়েছেন, আর দ্বিতীয় পর্বে লেখা তাঁর গল্পগুলোয় বাস্তবের ভাঁজে খুলে দিয়েছেন প্যাণ্ডোরার বাক্স । প্রচলিত কৃৎকৌশল বাদ দিয়ে দাদা তাঁর গল্পগুলোয় এমন এক আবহ সৃষ্টি করেন যা আপাত-অস্বাভাবিক, পার্থিব ও অপার্থিব এবং সময় ও পরিসরকে মিশিয়ে গড়ে তোলেন এক তৃতীয় স্হিতি, দুঃখ-কষ্ট-ভয়ের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন আনন্দময় পরিবেশের আকস্মিকতা । ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ গল্পে আরবি ভাষায় ছিল ‘ইফতাহ ইয়া সিমসিম’, দাদা তাই গল্পগ্রন্হের নাম রাখলেন ‘খুল যা সিমসিম’, ‘চিচিং ফাঁক’ নয়, কেননা ‘চিচিং ফাঁক’ শব্দবন্ধটির মধ্যে বিশাল পাথরের দরোজা খোলার ধ্বনিসাম্য নেই, গুহা সামান্য ফাঁক করে আলিবাবা আর চল্লিশটা চোর তাতে ঢুকতো না । নৃসিংহমুরারি দে তাঁর প্রবন্ধ ‘মূল সূত্রটাই যে অণোরণীয়ান’ ( কালিমাটি, নং ৯৩ ) প্রশ্ন তুলেছিলেন হিন্দি নামকরণ কেন । বস্তুত সিমসিম শব্দটি হিন্দি নয়, আরবি। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ বাংলায় গল্পটি লেখার সময়ে ইংরেজি ‘ওপন সিসেম’কে  ‘চিচিং ফাঁক’ করে দিয়েছিলেন ।

দাদার লেখায় জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ সম্পর্কে সর্বপ্রথম লিখেছিলেন রবীন্দ্র গুহ ( কবিতা ক্যাম্পাস, নং ৭১, জানুয়ারি জুন ২০১১ ) তাঁর প্রবন্ধ “সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের ভূবন : গাণিতিক বহুকৌণিকতা ও উপভোগের প্রতিক্রিয়া” প্রবন্ধে । রবীন্দ্র গুহর প্রবন্ধটি থেকে প্রাসঙ্গিক আংশটি তুলে দিই আপনাদের কাছে:-

“সহজ কথাটা সরাসরি বলাই ভালো, সৎ-সাহিত্যের দরোজাটা বাংলা সাহিত্যে খুলে দিয়েছে সমীর রায়চৌধুরীর পয়লা নম্বর গল্পবিশ্ব ‘খুল যা সিমসিম’। যাকে নিঃসঙ্কোচে বলা যায় রুবিক পৃথিবীর একটা মাল্টিক্রোম হাতছানি, অথবা আলো এখন বক্ররেখায় যায় । সমীরের ডায়াসপোরিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা পাই সোজাসাপটা সরলতা, অনুভূতির অসনাক্ত বিন্দুসকল ও কালের পরিবর্তনশীলতা । আরও পাই অজস্র কিংবদন্তি, রূপনির্মিতি, ক্ষেত্রজ জাদুবাস্তবতা ।

“আমরা যারা গদ্যের হিয়ায়, বাকশস্যে অফুরন্ত ইঙ্গিতময়তা প্রত্যাশা করি, শব্দের সম্পর্কায়ন ও দেহপুষ্টিতে যুগপৎ গুরুত্ব দিই, তাদের কাছে সমীর রায়চৌধুরী নামটির একটি একসেপশানাল গ্রামার আছে । সে শুধু সীমা ডিঙোয় না, ক্রিয়েটিভ প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত মোচড়ায় না, তার আনতাবড়ি অন্ধকারেরও একটা শৈলীগত অর্থ আছে । যা আপাত-অচ্ছুত মনে হলেও আদৌ অচ্ছুত নয় । সে এক আশ্চর্য জাদুসৌন্দর্যের ইশারা, যেখানে অন্ধকার ততোটা অন্ধকার নয়, শূন্যতা ততো গভীর শূন্য নয় । সমীরের কাছে অন্ধকারও একটা সম্পদ, শূন্যতাও মধুময়, শব্দ ও ধ্বনিময় । ‘বহুজাতিক ভুতের গল্পের খসড়া’ একটি খসড়ামাত্র নয়, বিশ্বায়নের হাজার বাস্তব মজার মধ্যে একটি অতিবাস্তব মজা । সমীরের লেখায় এই ঐতিহাসিক ধরতাইটা সত্য, অ্যাবসলিউট সত্য । জীবনে কতো দ্বন্দ্ব সংঘাত দুর্যোগ, কতো জ্যোৎস্না মেঘ কুয়াশা । অন্ধকারের ফাটল দিয়ে সব দেখতে পায় সমীর —উত্তরঔপনিবেশিক অন্ধকারের অংশীদার সমীর বনাম কার্তিক । কার্তিককে ভুতের গল্প লিখতে হবে । এর আগে ছোটোদের ভুতের গল্প লিখেছে অনেকগুলো । সে লক্ষ্য করেছে পাঠক আগের থেকে অনেক বেশি ভুতপ্রুফ, সহজে ভয় পায় না । তাই সে এনেছিল উপাদান-বিভোর রেডিমিক্স । কিন্তু তাতে যে শর্টহ্যাণ্ডের সংক্ষিপ্ত ছোঁয়া, সেখান থেকে ভুতের গল্প বানানো বেশ দুষ্কর, সেসব বাকমালা পড়তে পড়তে প্রায়শই অন্যকিছু দেখতে পায় । যেমন সে দেখতে পেল :-

 

‘অনির্বাণের কথাই হয়তো ঠিক । লাইফ সেভিং ড্রাগ এদেশে ওই গন্ধমাদন । আস্ত পর্বত । পর্বে পর্বে গল্পের ভাঁজ । বহুজাতিকে হনুমানের ঝামেলা নেই, সবাই সমান হন্যমান । যেখানে ভাঙা কার্নিশ কথা বলে কবির সঙ্গে । চৈত্রের দুপুরে কুয়োর গভীরে শুয়ে থাকে নির্জনতা ।’

 

বোধোদয়ের দোকান থেকে কার্তিক সেল্ফমেডের প্যাকেট নিয়ে আসে । এটা আশ্চর্য একটা প্যাকেট, প্যাকেটের মধ্যেই প্যাকেট, তার মধ্যে প্যাকেট, তার মধ্যে, তার মধ্যে । আরও ছোটো । আরও । কেবলই অনুমেয়র দিকে আরও ভুতভাবনের বহুব্রী ।

 

‘বড়ো প্যাকেট খুলতে না খুলতেই বেড়ে যাচ্ছে হতে-হবের ঝোঁক । আশশ্যাওড়ার মৌলিক গন্ধ । ছায়ারা খেলছে আনি বানি জানি না । সব কিছুই চাইছে হতে পারলে হয় । গড়ে উঠছে কুহককুহেলি । খসে পড়ছে নোনা ইঁট । এপ্রান্ত থেকে সেপ্রান্ত অবধি পোড়াবাড়ির ইতিহাসের আত্মবিলয়ের আতর । ভেসে উঠছে ভৌগলিক।’

 

‘রেডিমিক্সের প্যাকেট খুলতেই ছড়িয়ে পড়ছে আবছা, ক্রমশ আঁধারের তিথিমাপ বাড়ছে । কার্তিক খুঁজে দেখে মলিন না আবডাল । নক্ষত্র নিভিয়ে আসছে জোনাকি, দমকা হাওয়ায় ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুঃখু । জেগে উঠছে পোড়ো বাড়ির একদা । অনুসন্ধানী প্যাঁচা সন্ত্রস্ত চামচিকে আর ইঁদুরের বাসাবদলের চিরনির্মাণ ভেসে উঠছে ইহভৌতিক ছাপিয়ে । সন্দিগ্ধ খোঁড়া হয়ে হাঁটছে ।’

‘সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে আমতা-আমতা দোটানা । সিলিঙে ঠেকছে হতভম্ব, মাটিতে গড়াচ্ছে খটকা, বুজকুড়ি কাটছে তাজ্জব, অস্হির হয়ে উঠছে খামোকা, উঁকি মারছে তালগোল । জানলার কাছে ঝুলতে শুরু করেছে কাঁচুমাচু’

 

গল্পটি শেষ হয়েছে একটি অবিশ্বাস্য জাদুবাস্তব-অধুনান্তিক আবহে–

‘চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে হাড়গিলে নিশুতির হামা । বাড়ছে ভুতুড়ে পুঁজির রমরমা । পরস্পরের জায়গা বদল করছে খুঁটিনাটি আর খুঁতখুঁত । কার্তিক ভেবে দেখছে এবার কি সে ভীতির মধ্যে যাবে না ভয়ের অন্তরায় হয়ে উঠবে । প্যাকেট থেকে বেরোনো ক্রমউপদ্রবী আবছায়ায় সে একা । এই মুহূর্তে ছায়া-প্রচ্ছায়া দিশেহারা । জানলায় ঝুলছে কাঁচুমাচু । হতভম্ব ঠেকছে সিলিঙে । ছড়িয়ে পড়ছে অনুপস্হিতির অনুপ্রবেশ । এলোমেলো হয়ে পড়ছে চিন্তাজনিত । মাটিতে গড়াচ্ছে খটকা । বুজকুড়ি কাটছে তাজ্জব ।’

“স্বাধীনতার পরও ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হাতে অবাধ মৃগয়া ক্ষেত । তাবড় তাবড় ভারতীয় বণিকরা ভিন্নদেশীয় বন্ধুদের মদতে চমকদার সাবান, তেল, কেশকালা, দাঁতের মাজন তৈরি করছে । এইসব সামগ্রীর গুণ বিচারের জন্য কোনও কোনও বাণিজ্য সংস্হা দশ মিলিয়ন টাকা খরচ করছে বিজ্ঞাপন বাবদ । এদের সমবেত আক্রমণের ফলে আমজনতা পিতৃনাম ভুলতে বসেছে । ক্রেতারা বিগবাজারে বলিপ্রদত্ত । আজও কেউ বুঝলেন না ভোগবাদ একটি রোগ ।

“সে কলকাতাই হোক বা মুম্বাই বা শহর দিল্লি, মোড়ে মোড়ে বিশাল হোর্ডিং । বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন । কোলগেট, পণ্ডস, পেপসোডেন্ট -বিড়লা-টাটা-রিলায়েন্স-বাজাজ-হিন্দুজা-মহিন্দ্রা । কাগজে টিভিতে কতোরকম নখরা । গাজোয়ারি নয়, সব বুদ্ধির খেলা । এই বিজ্ঞাপনের খরচ তুলতে, কতো রকমের প্যাঁচ — কতোরকম ‘শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’ —’ওঁ হ্রী হ্রী শ্রী ওঁ লক্ষ্মীবাসুদেবায় নমঃ।” ক্রেতাকে বিব্রত না করে বাজার দখল করতে হবে । সে গল্প শোনায় পিনাকী । গল্পের নায়ক সুব্রত । কোম্পানির মাল্টিন্যাশানাল, কোম্পানিতে অনেক কবি-লেখক-ডকু ফিল্মমেকার একাধিক । সবাইকে টপকে অ্যাসাইনমেন্টটা পায় সুব্রত । অফিস থেকে ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে পুরীতে এসে হোটেলে ওঠে । সে খায় দায় আর লক্ষ্য করে কে কেমনভাবে টুথপেস্ট ব্যবহার করে । মুখশ্রীতে কেমন মহিমা খেলা করে । ব্রাশের ডিজাইন দ্যাখে, টিউবের প্যাকিং । ফেনা, গল্প, স্বাদ, মেজাজ । ব্রাশের আকার ছন্দ দ্যাখে । গাদা ব্রাশ-টুথপেস্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করে । এভাবেই সে পেয়ে যায় সূত্র । কেল্লা ফতে —

‘স্রেফ টুথপেস্টের টিউবের মুখটা এক মিলিমিটার বাড়িয়ে দিতে হবে । গোপন থাকবে এই কৌশল । দাম মাত্র দুটাকা কমিয়ে একটা ঝুটো মিতব্যয়িতার গিমিক ধরে রাখা হবে বাজারে । অধবা গোড়ার দিকে সঙ্গে একটা গিফট বা কুড়ি পার্সেন্ট এক্সট্রা পেস্টের ভড়ং । মনোযোগের কেন্দ্র সরিয়ে দিতে । তাহলেই ফর্টি পার্সেন্ট অতিরিক্ত টুথপেস্ট ড্রেনআউট হয়ে যাবে । কেননা টিউবের মুখের ডায়ামিটার আগের চেয়ে বেড়ে গেছে । স্রেফ এক মিলিমিটার ।’ ( শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন )

“কালখণ্ডের চমৎকার কৌতুক হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের বাজারায়ন তথা বিশ্বপুঁজিবাদ । একথা বোধহয় বাংলা সাহিত্যে আধিপত্যবাদীরা বুঝে ওঠার আগেই বুঝে ফেলেছিলেন কতিপয় গোত্রচিহ্ণহারা দ্রোহপুরুষ, যাদের মধ্যে অন্যতম সমীর রায়চৌধুরী । শৈলী বা প্রকরণ মেনে সমীর কখনও গল্প লেখেননি । তাঁর পাঠকাঠামোয় কারো প্রভাব নেই । একেবারেই ভিন্ন এবং তাৎপর্যপূর্ণ । স্তন্যপায়িনীর পৃথিবীতে চলতে চলতে আবার সেই জাদুবাস্তবতা — আছে আর নেই ।

“ভূখণ্ডের ক্ষয়, নিসর্গের ক্ষয়, এর মধ্যে জাদুবাস্তবতা খুব বাড়তি মনে হলেও ময়লা নয় । বিষয়টি আমাদের সাহিত্যে নতুন মনে হলেও বিশ্বসাহিত্যে নতুন নয় —

The term magic realism, originally applied in 1920 to a school of painters, is used to describe the prose fiction of Jorge Luis Borges in Argentina, as well as the work of writers such as Gabriel Garcia Marquez in Colombia, Isabel Allende in Chile, Gunter Grass in Germany, and Joh Fowels in England. These writers interweave, in ever shifting pattern, a sharply etched realism in representing ordinary events and descriptive details together with fantastic and dreamlike elements, as well as with materials derived from myth and fairy tales ( A Glossary of Literary Terms, M.H.Abrams)

“আমাদের জীবনে বাস্তবতা একাধিক । যেমন নিত্যবাস্তবতা, অদ্ভুত বাস্তবতা, রূঢ় বাস্তবতা, দিব্য বাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা । দুঃখ এবং সৌন্দর্যে ভরা এইরকম লাগামছাড়া বাস্তবতার জীব আমরা নাটকের কুশীলব, চিকিৎসক, সমাজসেবিকা, মিথ্যাবাদী, কবি, ভিখিরি, যোদ্ধা । সবার জীবনযাপনে পদ্ধতির পার্থক্য আছে । এই পার্থক্যের ব্যাপারে যিনি যতোটা সচেতন তিনি ততোটাই সার্থক বস্তুবাদী । সমীরের চোখ সরাসরি নিত্যসুন্দরের দিকে থাকলেও, মার্কেস এবং গুন্টার গ্রাসের মতো জাদু-ভেল্কি-মন্ত্র-তন্ত্র বাদ যায়নি । বিশ্বায়নের মজা বাদ যায়নি । যেভাবে কল্লোল যুগের লেখকরা নতুন ঘরানার সাহিত্য গড়ে তুলেছিলেন, নির্মাণ করেছিলেন নতুন ভাষার, তেমনি সমীর আনলেন কল্লোল পরবর্তী অধুনান্তিক টাইমস স্টাইল, প্রকৌশল । গদ্যভাবনার গুণমাহাত্ম্য ভিন্নমাত্রা পেল । বিজ্ঞজনেরা ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে তার পাঠবস্তুর মাপজোক করল, পরিসর পরিস্হিতি এবং মুক্ত সূচনা, মুক্ত সমাপ্তির লক্ষণ খুঁজল, বিবাদ সৃষ্টি করতে পারল না ।

“সময়ের ক্ষয়, আতঙ্ক, সন্ত্রাস, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বাতাবরণ মানেই উত্তরআধুনিক, একথা সমর্থন করেন না সমীর । তার চেনা-অচেনা শব্দসকল, সাবঅলটার্ন কথাবিশ্ব অধুনান্তিক বিশ্বায়নের সারবস্তু । সমীরের পাঠবস্তু ন্যারেটিভ নয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফর্মবর্জিত । তার রচনায় অদ্ভুত ভাষাবুলি ঝুড়িঝুড়ি, যেমন—

দিলফাড়, ঠাওর-ঠিকানা, মিল্লত, উড়ানমনস্ক, বুজরুকি, আলিশান, কাঁটোকা হার, দিল-জ্বালানি, হিট-রহস্য, দীর্ঘ জুম ফোকাস, ফিলিম, তুক মেলানো, বেপর্দা, কাঁইয়া, স্তনের ডৌল, জৈবতাপ, মনমর্জি, লালফুটকি, চিৎপুতুল, ঢালাউপুর ( ‘খুল যা সিম সিম’ গল্পগ্রন্হ থেকে )

‘গোলগল্প থেকে গালগল্প : একটি অর্বাচীন ডায়ালগ’ প্রবন্ধে ‘শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বাচন’ বিশ্লেষণকালে শাশ্বত সিকদার বলেছেন :-

“সমীরের লেখায় আমরা স্পষ্টত যা পাচ্ছি তা হল স্মৃতি আর কল্পনার দোলাচল । কোথাও বোঝার সঙ্জ উপায় নেই, কোনটা রিয়েল লাইফ ফিকশনের অংশ, কোনটা বাজিয়ে তোলা । সদ্য নোবেলপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক কোয়েটজির ‘এলিজাবেথ কোস্টেল্লো’ উপন্যাসেও আশ্চর্যভাবে বাস্তব ও মনগড়া চরিত্ররা মিলেমিশে থাকে । এর পরে, সমীর পাঠবস্তুর বাইরে থেকে সবজান্তা চালে বানোয়াট গল্প ফাঁদছেন না । পা ফেলছেন না নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরে । তিনি নিজে অংশগ্রহণ করছেন রচনার অন্তবর্তী ব্যবসাবিষয়ক প্রতিবেদনে । অনেকের স্বরের সাথে চালাচ্ছেন ইনটারাপ্টেড ডিসকোর্স । নিজের বৈচিত্র্যময় ডায়াস্পোরিক অভিজ্ঞতার লক্ষ্মীর ঝাঁপি খুলে তিনি বার করে চলেছেন একটার পর একটা রসদ ।

“আমাদের মনে হয়েছে, সমীরের সব গল্পই আসলে, একভাবে, তাঁর অলিখিত আত্মজীবনীর টুকরো অংশ । পাণিহাটীর শৈশব আর কর্মসূত্রে বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের দ্বৈত ডায়াস্পোরিক অভিঘাত সমীরের জীবনকে অনবদ্য সব অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ করেছে । সমীরের ভূগোল হয়েছে আশয়, তাই তাঁর ইতিহাসও হয়েছে সীমাহীন । আর তাই তাঁর গল্পে হাঁটাহাঁটি পা ঢুকে পড়েছে বিভিন্ন পরিসরের ভূগোল, ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষজনের ঘামের টাটকা গন্ধ । অবলোকন প্রতিভার জাদুতে বর্ণিত এইসব ঘটনাগুলোর চারপাশের অদ্যাবধি আলো-না-ফেলা অঞ্চলগুলো এসেছে প্রকাশ্যে । সমীর তাকে হিরের মতন শব্দের আলো ফেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা তরতরিকায় দেখেছেন ।”

দাদার গল্পের পাশাপাশি যে বিদেশি  লেখকদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে তাঁরা হলেন টমাস বার্নহার্ড, পিটার হাণ্ডকে, জন ফাউলস, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, জন বানভিল, মিশেল টোরনিয়ার, গিয়ানা ব্রাশচি, ইউলেম ব্রাকমান, লুইস ফেরন প্রমুখ — যাঁদের গদ্য একযোগে জাদুবাস্তব ও উত্তরাধুনিক । পরাবাস্তবের প্রভাবের কথা বলব না, কেননা দাদা পাণ্ডুলিপিতে যথেষ্ট কাটাকুটি করতেন এবং স্বগতলিখন লিখতেন না, লেখার আগে কাহিনিটি নিয়ে প্রচুর চিন্তা করতেন, বিভিন্ন রেফারেন্স বই ঘাঁটতেন । “হাওয়া ৪৯”-এর যে বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিটির বনেদে একটি গল্প বা কবিতাগুচ্ছ প্রসঙ্গক্রমে এসেছে দাদার চিন্তায়, যেমন জটিলতা, সংকরায়ন, অপর, অধুনান্তিকতা, উত্তরঔপনিবেশিকা, ইকোফেমিনিজম, সীমা, ভারতত্ব, ডায়াসপোরা ইত্যাদি। বস্তুত ম্যাজিক রিয়্যালিজম অভিধা এতো বেশি প্রয়োগ হয়েছে, বিদেশে তো বটেই, এদেশেও, যে এসকেপিস্ট ফিকশানকেও অনেকে জাদুবাস্তবের পর্যায়ে ফেলছেন, ফলে বিনোদনের জন্য বা বাজারকে সন্তুষ্ট করার জন্য যে অবজেকটিভ মেইনস্ট্রিম ফিকশান লেখা হচ্ছে. তাদেরও জাদুবাস্তব বলে চালানো হচ্ছে ।

জাদুবাস্তব এসকেপিস্ট ফিকশান নয়, বিনোদনের জন্য নয়, বাজার ধরার জন্য নয় । এই ফিকশান আমাদের জগতকে চিহ্ণিত করে এবং তাতে আমাদের অবস্হানকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ; সত্যগুলোর বার্তা পাঠায় অথবা তাদের অন্বেষণ করে । জাদুবাস্তব অত্যন্ত সিরিয়াস ফিকশান এবং তাতে গদ্যবিন্যাসের কাজ জরুরি । লেখক চেষ্টা করেন একটি বাক্যের মধ্যেই অতীত-বর্তমান ভবিষ্যতকে উপস্হাপন করতে । প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক বাস্তব থেকে এই বাস্তব পৃথক । জাদুবাস্তব ফিকশান চিন্তার পরীক্ষানিরীক্ষা নয়, দূরকল্পনামূলক নয়, তার বিশ্ববীক্ষা অবজেকটিভ মেইনস্ট্রিমের বাইরে ।

‘সিগারেটের তিরোভাব’ গল্পটি নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (কালিমাটি নং ৯৩), আমি প্রসঙ্গিক অংশগুলো তুলে দিচ্ছি :-

“এই গল্পে রয়েছে কথক ও তাঁর দৌইত্রী পিংকির মধ্যে স্নেহমধুর ভাবের আদানপ্রদান ও পিংকির দাদানের ( ঠাকুরদা ) মৃত্যু নিয়ে জেগে ওঠা সামাজিক পারলৌকিক সংস্কারবাহিত কিছি চিত্র । এই গল্পে সিগারেট দেহের বিকল্প হিসাবে দেখা দিয়েছে । দাদান অবিনাশবাবু ছিলেন চেন-স্মোকার । তাঁর মৃত্যু যেন সিগারেটের তিরোভাব । তাঁর সহসা মৃত্যুতে বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল, শোকের ছায়া নেমে এল। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের কাজ এগোতে লাগল। পিংকির মনে নানান প্রশ্ন । দাদুকে তার উত্তর যোগাতে হয় । পরদিন সন্ধ্যাবেলায় পুরোহিত এলেন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ব্যবস্হার জন্য । কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখে বিধান দিলেন —’ত্রিদোষ ঘটেছে । দানদক্ষিণা বেশি লাগবে । ষোড়শদান । আত্মাদেবতার তুষ্টি । বিশদভাবে অনুষ্ঠান প্রয়োজন।’

“এক দৃষ্টিতে দেখলে ( আধুনিকতাবাদী ) এসব হল পুরোহিত অং-বং-চং । অবসলিট শাস্ত্রে এসব পাওয়া যায় । পরলোক অস্তিত্বহীন । কিন্তু তৃতীয় তরঙ্গের পোস্টমডার্ন বিজ্ঞান জানাচ্ছে, এগুলো ওরকম হুশ করে কালো কাকের মতো উড়িয়ে দিলে চলবে না, বরং এর ভিতরেও ফেলতে হবে সন্ধানী সার্চলাইট । মৃত্যু নিয়ে ভাবনার শিখা উসকে দিয়েছেন কাহিনিকার সমীর রায়চৌধুরী । লিখছেন:-

‘কিছুকাল আগে মরে যাওয়া ভাবলে কষ্ট পেতাম । যত দিন যাচ্ছে মৃত্যু নিয়ে ভাবনা পাল্টাচ্ছে । বাবা মা ন-কাকিমা ছোড়দি কিছু প্রিয় বন্ধুবান্ধব আর এই দাদান মারা যাওয়ার পর, মৃত্যুর এলাকাকে ফাঁকা লাগে না । একা বলে মনে হয় না । মনে হয় মৃত্যুও বসবাসের যোগ্য ।’

“এককালে মৃত্যুর এলাকাকে ‘অমুত্র’ বলা হতো । আমি শব্দটির মধ্যে রস পাচ্ছি তাই একে ফিরিয়ে আনতে চাইছি :

‘পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে… ন এব ‘ইহ, ন ‘অমুত্র’ ( হে পাত্র, বৈদিক কর্মত্যাগ করা সত্বেও যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি ইহলোকেও পতিত হয় না, পরলোকেও নিকৃষ্ট শরীর প্রাপ্ত হয় না ) [ গীতা, ধ্যানযোগ ৬.৪০ ]

“পদার্থবিদ রিচার্ড ফেইনম্যান বলতেন, পদার্থবিদ্যার সমস্ত সমীকরণকে একটি মহাসমীকরণের মধ্যে পুরে ফেলা যায় । সেই মহাসমীকরণ হল Unworldliness = 0, সংক্ষেপে U = 0 এখন এই           Unworldliness এর বাংলা করছি ‘অমুত্র’ । এই সমীকরণের অর্থ পদার্থবিদ্যার সবকিছুই ইহসর্বস্ব ( Worldly) ; ইহলোকের বাইরে কিছুই নেই ; কিন্তু এই দৃষ্টিতে অধিবিদ্যার ( Metaphysics )             সম্ভাবনাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে । তৃতীয় তরঙ্গের পোস্টমডার্ন বিজ্ঞান কিন্তু তা চাইবে না । সে বলবে — ‘অমুত্র’ আছে । আছে তার নির্দিষ্ট গঠন । মৃত্যুর পর সেখানে যাওয়া যেতেই পারে । একে বলি প্রেতলোকের অসমীকরণ। গল্পকার সমীর রায়চৌধুরী আন্দাজ করেছেন এই অসমীকরণের অন্ধকারে দৃষ্টি চালিয়ে–

‘যারা মারা যায় তারা বোধহয় স্বজনের মৃত্যুর দ্বিধা সংগোপনে চুরি করে নিয়ে যায় । প্রেতলোকে আর খারাপ লাগে না।

এদিকে পুরুতঠাকুর বলেছেন, বৈতরণী, চতুর্ধাশান্তি, ষোড়সদান, ভোজ্যউৎসর্গ — শ্রাদ্ধানুকল্প — মনোময় কোশ — সে অনেক ব্যাপার ।’

“মনোময় কোশের পর হল বিজ্ঞানময় কোশ, যেখানে তৃপ্ত আত্মার বাস, যেখানে ‘ইহ’ (This) এবং ‘অমুত্র ( That ) — দুই পৃথক নয়, দুই জুড়ে সন্ধি হয়ে রচিত হয়েছে  ‘ইহমুত্র’ যা স্বামী বিবেকানন্দের প্রিয় শব্দ ছিল । এই ইহমুত্রই গোটা জগৎ । মনোময় কোশে এদের দুই খণ্ডকে আলাদাভাবে দেখা হয় । আলাদাভাবে দেখা হলেও এদের মধ্যে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় না, কোয়ান্টাম দর্শন এখানে কাজে লাগে । পিণ্ডদান কিংবা ভোজ্য উৎসর্গের পদ যেন এক একটি  Wave-packet । সেই পদগুলি, এক্ষেত্রে, গল্পকার জানাচ্ছেন, স্হির হল…

‘হিঙের কচুরি, বেগুনি, মোচার ঘণ্ট, কইমাছের ঝালদে, দই ইলিশ, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, এবং চা-সিগারেট’

“সিগারেট তাহলে পুরুপুরি তিরোহিত হচ্ছে না, চলছে মৃতকের সহানুকল্পে — অমুত্রের দিকে । তবু শ্রাদ্ধদিবসের দিনে অবিনাশবাবুর প্রিয় ব্র্যাণ্ডের সিগারেট প্যাকেট খুঁজে পাওয়া গেল না, কিনেও আনা হল না, ভোজ্য উৎসর্গের থালায় একটি পদ রিক্ত থেকে গেল

“এই না পাওয়া নিয়ে সমীর রায়চৌধুরীর গল্পে দ্বিতীয় এপিসোড । স্কুলে পিংকির জামার মধ্যে শুঁয়োপোকার প্রবেশ, শুঁয়ো ফোটানো ও পিংকির জ্বর, শুঁয়োপোকা বন্ধন ও প্রজাপতি মুক্তির প্রাণময় উপস্হিতি। সেই বন্ধন ও মুক্তি ক্রমশ ‘ইহ’ ও ‘অমুত্রে’ও ।

“ স্কুলে গিয়েছিল পিংকি, তার গায়ে শুঁয়োপোকা উঠেছে, গায়ে ফুটিয়ে দিয়েছে শুঁয়ো । পিংকির বেশ জ্বর । ডাক্তারবাবু এসেছেন। সন্না দিয়ে শুঁয়ো তোলা হয়েছে, মলম লাগানো হল । দাদুকে দেখে পিংকির তোড়ে কান্না– ‘শুঁয়োপোকা কেন স্কুলে গিয়েছিল ?’ জন্মদিনে পিংকিকে দাদু উপহার দিয়েছিলেন লতাপাতা আঁকা সবুজ জামা । সেইটি পরেই কি স্কুলে গিয়েছিল পিংকি ? উত্তর এখানে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যাই হোক না কেন — অন্তরালে দেখি সম-অভিযোজনের দোলা, পিংকি ও শুঁয়োপোকা একই বিন্দুতে পৌঁছোচ্ছে ।

“কথক, পিংকির দাদু, পিংকির কান্না থামানোর জন্য তার ডলপুতুল ন্যান্সির খোঁজ করেন । সেই পুতুল পাওয়া যায়, জুতোর বাক্সের ভিতরে উল্টোনো অবস্হায়, এবং কী আশ্চর্য, সেই পুতুলের বুকের নিচে — সেই আত্মার তৃপ্তিকর রিক্ত পদ — সিগারেটের প্যাকেট । লোভনীয় সিগারেট, তবু কথক, পিংকির দাদু সেই প্যাকেট খোলেন না শেষ পর্যন্ত — যেখানকার বস্তু সেখানেই ফিরে যাক । ওঁ নমো ।”

দ্বিতীয় পর্বের ফিকশনে দাদার ন্যারেটিভ কেতা হয়ে উঠেছিল সহজাতভাবে অন্তর্ঘাতী, পরাভবী এবং তাতে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্রতি খোঁচাগুলো মজার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যেমন, ওষুধের জন্য আমাদের দেশ সেই গন্ধমাদন পর্বেই রয়ে গেছে আর বিদেশ থেকে আনছে নানা ধরণের ক্যারদানি । একই ন্যারেটিভ কন্ঠস্বর প্রয়োগ করে তিনি বাস্তব এবং জাদুর মাঝে পর্যয়ানুবৃত্তি ঘটিয়েছেন, কিন্তু দুটির মাঝের পালাবদলকে এমনভাবে ন্যারেটিভে বুনে দিয়েছেন যে বোঝার উপায় নেই কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব। ফলে বাস্তব আর ইন্দ্রজালের বাইরে একটা তৃতীয় জঁর তৈরি করতে পেরেছেন, যেকারণে পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট তত্ত্বের মাধ্যমে বলা চলে যে তাঁর ন্যারেটিভের একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে । পর্যায়ানুবৃত্তির কারণে একটিমাত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কন্ঠস্বরকে প্রতিরোধ করে পাঠবস্তুগুলো । তাঁর ন্যারেটিভের কেতাটি সীমাগুলোকে অনুসন্ধানের পর লঙ্ঘন করে, সে সীমা রাজনৈতিক হোক বা ভৌগলিক হোক বা তাত্ত্বিক হোক বা বস্তুবর্গীয় হোক । সীমাগুলোকে ভেঙে তিনি উত্তরঔপনিবেশিক ভারতের সমাজ, গণতন্ত্র, ধর্মদ্বেষ, সন্ত্রাস, জাতিপ্রথা, দারিদ্র, দলীয় রাজনীতি, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ইত্যাদির সত্যগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন । পাঠকের মনে সন্দেহ চাগিয়ে তোলেন যে বাস্তবের বৈশিষ্ট্য যদি চূড়ান্ত না হয় তাহলে সত্য সম্পর্কে যাবতীয় অনুমানই ঝুঁকিআক্রান্ত। ক্ষমতা থেকে যাদের বঞ্চিত করা হয়েছে সেই ‘অপরদের’ বাকজগতকে প্রয়োগ করতে হয়েছে তাঁকে । ঔপনিবেশিক ও উত্তরঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রকরা, এদেশে হোক বা বিদেশে, ‘অপর’ সংস্কৃতিকে দাবিয়ে রেখে যে অবাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে তিনি তা উপস্হাপন করেছেন তাঁর ফিকশানগুলোয়।

১৯৯৯ সালে লেখা “খননকার্য” গল্পে কথকের মাসিমার শাবল হারিয়ে দিয়েছেন কোনো কবিবন্ধু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে । শাবল দিয়ে একজন  কবি কেঁচো খুড়ছেন, কেন, তাঁর কেঁচো কেন দরকার, কথক সেকথা পরে জানিয়েছেন যে খোঁড়াখুঁড়ি কবিদের কাজ, অর্থাৎ এক ধরণের কবি কেঁচোর সন্ধান করে পুরস্কৃত হন । কথক কবিবন্ধু সম্পর্কে তাঁর খোঁচাটি লুকোননি, স্ত্রীকে বলছেন :

‘তা বড়ো বড়ো নামকরা কবিবন্ধু থাকলে ওসব একটুআধটু হবে, দাড়িওয়ালা ভক্তিপ্রসাদকে তো বহুবার দেখেছ, একটু বেশি মদ খেতে ভালোবাসে, একবার বাড়ি এলে সহজে যেতে চায় না, সাহিত্য অকাদেমি আনন্দ পুরস্কার, অনেক সব প্রাইজ পেয়েছে, তুমি তো আগে দেখেছ, আর ওই ঝাঁকড়াচুল জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন পদ্যলেখার সবচেয়ে বড়ো প্রাইজ, খুব অসাধারণ সব লোক, একটু আধটু হুঁশ কম থাকে, কবি হলে ওসব হয়, অতশত তুমি বুঝবে না, পদ্য লিখলে বুঝতে, ব্যাপারই আলাদা । ওরা সব একধরনের অমর মানুষ ।’

মাসিমার লোহার শাবলের বদলে ভালো স্টেনলেস স্টিলের শাবল কিনে এনে দেবার পর মাসিমা জানান যে পুরোনো শাবলটা ওঁর শশুরমশায়ের, ওঁর স্মৃতির, বাড়ি তৈরির সময়ের অনেক গল্প আছে পুরোনো শাবলে, নতুন শাবল তা যত ভালোই হোক মাসিমার চাই না, পুরোনো শাবলের সঙ্গে তাঁর জীবনের গল্পও হারিয়ে গেল । অর্থাৎ অন্যের পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে কবিরা আগ্রহী নন, তাঁরা কেবল পদ্য লিখে প্রাইজ পেতে চান এবং ‘একধরনের অমর মানুষ’ হতে চান ।

১৯৯৩ সালে লেখা “টিনিদির হাত” গল্পে দাদা শৈশবের হুলাসচাচার ‘রামচরিতমানস’-এর প্রশ্নাবলীর খেলাকে এনেছেন এবং ন্যারেটিভে সংযোজন করেছেন বিভিন্ন মাত্রা, প্রেমের, হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, ছোটোলোক-ভদ্রলোক বিভাজন এবং ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাসের গুরুত্ব, যা ঔপনিবেশিক চাপ সত্ত্বেও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনে টিকেছিল । হুলাসচাচার ‘রমাচরিতমানস’ খেলায় একটি শলাকা দিয়ে বইতে নির্দেশ করলে হুলাসচাচা নির্দিষ্ট চৌপাই ব্যাখা করে ভবিষ্যত বলে দেন । বালক কথকের প্রতিটি ইচ্ছে পূরণ হয়েছে শুনে তার বন্ধ সুলেমানও খেলতে আসে, মনস্কামনা পূর্ণ হয় কিন্তু তার গাছে চাকা-চাকা ঘা দেখা দেয় । কথকের হিন্দু পরিবার মনে করে গোরুর মাংস খাবার কারণে হয়েছে ; সুলেমান মনে করা হিন্দুর গ্রন্হের খেলা খেলার জন্য হয়েছে । কথকের বাবা ঘায়ের ওষুধ দেন যা কথক ভুলিয়ে খাওয়ায় সুলেমানকে, খুদাবক্স ডাক্তারও ওষুধ দেন, আনোয়ারের দোকানে গিয়ে গোরুর মাংস খায় সুলেমান, টিনিদি আদর করে হাত বুলিয়ে দেন সুলেমানের মাথায় । সুলেমানের অসুখ সেরে যায় । বালক কথকের মনে সন্দেহ জেগে ওঠে যে এইগুলোর মধ্যে ঠিক কোন কারণে সেরে গেল সুলেমানের অসুখ ।

“টিনিদির হাত” গল্পটিতে জাদুবাস্তবতা হল ‘রামচরিতমানস’ এর রামশলাকা খেলা আর হুলাসচাচার ভবিষ্যৎবাণী প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অব্যর্থ হওয়া । গল্পটির মাধ্যমে দাদা দৈব ঘটনাকে বাস্তবের রূপ দিয়েছেন, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে উদ্ভাবনাকে গুলিয়ে দিয়েছেন, যার দরুন চাপ সৃষ্টি করেছেন বাস্তব সম্পর্কিত ধারনায় । ইউরোপের আনা বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর ‘আলোকপ্রাপ্তির’ আঠারো শতকী প্রভূত্ববাদী সংস্কৃতির চাপকে আক্রমণ করেছেন সনাতন ভারতীয় সাংস্কৃতিক আচরণের মাধ্যমে । আলোকপ্রাপ্তির ঔপনিবেশিক চাপ অনুগত করতে চেয়েছিল কেবলমাত্র বিজ্ঞান ও যুক্তির দ্বারা, যখন কিনা সাধারণ ভারতীয়রা যেযার সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের নিজস্ব সত্যকে বাতিল করতে চায়নি । ‘অপর’-এর দৃষ্টিতে দেখলে, যেটা দাদা তুলে ধরতে চেয়েছেন এই গল্পে, যুক্তিহীনতাও জীবনের বহু ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে, এবং বাখতিনের বক্তব্য ধার নিয়ে বলা যায় এক্ষেত্রে দেখা দেয় হেটেরোগ্লসিয়া বা বহু পরস্পরবিরোধী কন্ঠস্বর, ভারতের চিন্তাভাবনার সাস্কৃতিক বহুত্ব, নানাধর্মিতা, পারস্পরিক বৈভিন্ন্যকে ফিকশনটি আলোকিত করে ।

হাংরি আন্দোলনের আগে এবং হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার যে তিনটি কাব্যগ্রন্হ বেরিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে দাদাকে একটা বই বের করতে বলেছিলুম, কিন্তু বইগুলো উনি নিজের কাছে রাখেননি, কারোর কাছ থেকে সংগ্রহ করতেও পারেননি । বইগুলো হল “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি”, “জানোয়ার” এবং “আমার ভিয়েৎনাম”। আমি কৃত্তিবাস সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড থেকে দাদার কয়েকটা কবিতা তুলে দিচ্ছি যা থেকে স্পষ্ট হবে যে কৃত্তিবাসের লিরিকাল ধারা থেকে কীভাবে উনি ধাপে-ধাপে বেরিয়ে গেলেন ।

“ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি” পর্বের কবিতা ( দাদার মেয়ের নাম হণি, সেই সময়ের কবিতা ) কৃত্তিবাস পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল :

 

হণির ভিতর দিয়ে দেখা যায়

জাহান্নমে যাক গ্রহনক্ষত্রসমূহ ভেঙে পৃথিবীও যাক জাহান্নমে

লাথি মেরে সব ভেঙে চুরমার করে দিলে, কাল আমি সহাস্যবদনে

হাততালি দিয়ে মঞ্চে কোনোরূপ গ্লানিহীন নুরেমবার্গের আদালতে

তুড়ি মেরে কাঠগড়া মুঠোয় গুঁড়িয়ে তোমাদেরও পারতাম ভেলকি সুবিস্তারে ।

সৌরমণ্ডলের পথে তছনছ পৃথিবীর অন্ধকার ফেরি আবর্তন

কোনোরূপ রেখাপাত সম্ভব ছিল না গ্রন্হে হৃদয়ে মেধায়,

আমার শরীর ঘিরে ইহুদির হিন্দু শিখ মুসলিমের আততায়ী আদর্শের

ঘৃণ্য রক্তপাত–

আমাকেও জয়োল্লাস দিয়েছিল মূত্রপাতে পোষা রাজনীতি ।

তোমাদের আস্ফালনে বিনয়ী মুখোশ ঘিরে আমার হণির জন্মদিন

আমারই মুখোশ ধরে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে আর্ত চিৎকারে–

ধান উৎপন্ন হওয়ার গন্ধ এখন পেয়েছি শুঁকে কৃষকের উর্বর শরীরে

কুমারী মহিলাদের উজ্জ্বল মসৃণ দেহে বহুবার হাত রেখে উত্তরনিশীথে

পরাগ চমকে ওঠে, স্পর্শ করে নারীর সমগ্র দেহ জুড়ে

আশ্রয় ছড়ানো আছে প্রীত এক ধরণের মিহি রুখু বালি ।

ক্রমে এই সমস্তই নাভির ভিতরে আনে রুদ্ধ আলোড়ন,

জেগে ওঠে মৃগনাভি, চেয়ারে টেবিলে গ্রন্হে অম্লান মাঠের ভিতরে

ধু-ধু রিক্ত প্রান্তরের দিকে শাবক প্রসব করে রঙিন প্রপাত,

চারিদিকে ফলপ্রসূ হয়ে গেছে রাশিরাশি প্রতিহারি ধান—

#

মনে হয় বহুক্ষণ মাঠে মাঠে গড়াগড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে আসে নারী

ক্ষুধার্ত শিকড়গুলি ঢুকে যায় নীড় আস্বাদনে,

তখনই উৎপন্ন হওয়ার গন্ধ জাগে, কৃষকের উর্বর শরীরে

প্লুত আবছা আঁধারে তাই বারবার মনে হয় পৃথিবীর সহজ সুদিন

ফিরে এলো সুধাশান্তি

আমার হণির জন্য তোমাদের কাছে আমি ঋনী চিরদিন ।

 

এই কবিতাগুলো কৃত্তিবাস পত্রিকার কুড়ি নং সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল :-

ব্যক্তিগত ন্যাপথালিন

বাক্স খুললেই ভবঘুরে সুখ

ন্যাপথলিন তীব্র ন্যাপথলিন

ন্যাপথলিনের গন্ধে সংসার উন্মুখ

 

নিজস্ব ডেটল

ছুটে আসে হাসপাতাল অতিউগ্র তরল শেফালি

বুকে রাখা কোতোয়াল ভেদ করে তীব্র অশ্রুপাত

স্পর্শ করে লুকানো ডুমুর ।

হনির মুখশ্রীছবি আমাদের আবহাওয়া রিপোর্ট

আমাদের বুঁদ জলবায়ু

জারি রাখি উচ্ছন্ন মেয়াদ মৃত্যু বেহুঁশ টম্যাটো ।

ক্রমশ হারিয়ে যায় আমার একান্তপ্রিয়

টম্যাটোর লাল

ছুটে আসে হাসপাতাল, অতিউগ্র তরল শেফালি

ছুটে আসে তিন লক্ষ উন্মাদ কুকুর

নধর পালংশাক রেগে ওঠে হঠাৎ খুরপি লাগে বুকে–

মনে হয় বেশ আছি ছেলেপুলে নিয়ে সুখে ।

 

মৃতমন্ত্রীবিষয়ক নিধি

আমিও শকুন হয়ে দেখতে চাই না আর নানাবিধ মড়া

টক মিষ্টি ঝাল

ওরা সব ছিল কাল

আজ উঠে গেছে ঝাঁজ

হঠাৎ পথের মোড়ে পুলিশের পক্ষে ওই মৃত বৃদ্ধ রেখে

কিসের সুরাহা হবে ট্যাক্সিঅলা জানে

এই অবসরে আমি চলে যেতে চাই কোনো আবছা আকাশে

ঠুকরে দেখতে চাই টাটকা বিনোবা কতখানি ভেপসে উঠেছে ভেতরে

 

ঝ্যান্ত মানুষ ঠুকরে

দ্যাখা যায় গোপনীয় লাশ

দ্যাখা যায় বাগানের লুকানো পলাশ

এসোনা ঠুকরে দেখি তোমার প্রতিভা ।

 

হাংরি আন্দোলনের সময়ে প্রকাশিত হয় দাদার কাব্যগ্রন্হ “জানোয়ার”, টের পাওয়া যায় কেন তিনি কৃত্তিবাসের কোটর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, কৃত্তিবাসের লিরিকাল জগত থেকে উত্তরঔপনিবেশিক বাস্তবতায় আক্রান্ত হয়েছিল তার সংবেদ, তা “রবীন্দ্রনাথ” শীর্ষক এই কবিতাটিতে স্পষ্ট :-

১.

ঈশ্বরকে চিনে নেওয়ার জন্য আর আমার বেলপাতার দরকার নেই

কবিতাকে চিনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন নেই ‘মতো’ আর ‘যেন’র

জন্মভূমি স্বদেশ মাতৃভূমি চিনে নেওয়ার জন্য

দেশবাসীর এখন মানচিত্রের প্রয়োজন

সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য চিনে নেওয়ার জন্য

সমাজের দরকার পোশাক-পরিচ্ছদ

নির্ধারিত উর্দি ভাগাভাগি করে গা্য়ে চড়িয়ে মানুষ

অভিনেতা পুলিশ শুশ্রুষাকারী উকিল বিচারক আর নেতা হয়ে উঠছে

আমি কলতলায় ন্যাংটো স্নান করে দেখে নিচ্ছি আমার গোপন পবিত্রতা

শান্তি আর শৃঙ্খলার জন্য মানুষকে হত্যা করা প্রয়োজন

স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের জন্য কাঁদুনে গ্যাসের দরকার

আদর্শ আর ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন যুদ্ধ আর শান্তির শর্তাবলী

যে-কোনো ধারণার চেয়ে মানুষ আজ খাটো হয়ে পড়ছে

২.

শিল্প ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

দেশ ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

ধর্ম ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

ভাষা ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

সৌন্দর্য ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

সংস্কৃতি ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

ঐতিহ্য ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বপৃথিবী ভালোবেসেছিল রবীন্দ্রনাথ

সেই রবীন্দ্রনাথের জন্মমৃত্যুর পরেও তার সোনার বাংলা ভাগ হয়ে গেছে

সেই রবীন্দ্রনাথের জন্মমৃত্যুর পরেও তারই গান গেয়ে

একদল মানুষ আরেকদল মানুষকে খুন করছে

৩.

কংগ্রেস আর মুস্লিম লিগের ক্ষমতার চেয়ে

ধর্মান্ধ রাজনীতির বিশাল দাপটের চেয়ে

রবীন্দ্রনাথের ক্ষমতা অনেক অনেক কম

নজরুলকে মাসোহারা দিয়ে বিধানসভা চক্ষুলজ্জা ঢাকছে

দশ হাজার শান্তিনিকেতন খুলে রেখে পৃথিবীকে শান্ত রাখা সম্ভব নয়

দশ কোটি শান্তিনিকেতন খুলে রাখলেও

রাজনীতির হিংস্র বর্বরতা থামানো অসম্ভব

পঁচিশে বৈশাখ থেকে বাইশে শ্রাবণ অব্দি ছুটে গিয়ে দেখেছি

পৃথিবীর কিছুই সুরাহা হয়নি

মানুষকে ভালো করে তোলা আমার সাধ্যাতীত

বহুদূর পথ হেঁটে গিয়ে আমি পুনরায় ফিরে যাচ্ছি

আমারই অশ্লীল নিভৃত কোটরে ।

 

“জানোয়ার” এর পর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্হ “আমার ভিয়েৎনাম” । এখানে যে কবিতাটি তুলে দিচ্ছি, “পালামৌ — ১৯৬৬”, তা “আমার ভিয়েৎনাম”  পর্বের। কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য দাদা লেখা পাঠাচ্ছেন না দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দাদার কর্মস্হল ডালটনগঞ্জে গিয়েছিলেন কবিতা আনার জন্য । দাদা কবিতা লিখে দিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে জিপে করে দেহরি অন শোন স্টেশানে ছেড়ে দিয়ে আসেন । দাদা ইচ্ছাকৃতভাবে হাংরি আন্দোলনকারীরা সেসময়ে যে ধরণের কবিতা লিখছিলেন, যা ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, আমার আর সুবিমল বসাকের কবিতা পড়লে স্পষ্ট হবে, সেই ফর্মেই সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতাটি দিয়েছিলেন ।

 

পালামৌ — ১৯৬৬

পাঁচ হাজার কেঁচোর সঙ্গে মাটি খুঁড়ে ভেবেছিলাম

ঘুম ভেঙে উঠে দেখব সবুজ বিশাল ভারতবর্ষ

হঠাৎ সঞ্জীবচন্দ্র ডেকে উঠবেন সমীর পালামৌ সমীর

অথচ ভোটবাক্স নিয়ে আমি খুঁজে বেড়ালাম ভারতবর্ষের ভালোবাসা

আমার গোপন তকমার লোভে কৃষকের লাঙল থেকে

খুঁটে তুললাম প্রভূত ন্যাপথলিন

কেননা পৃথিবীর সবচেয়ে নগ্ন আর মজবুত স্ত্রীলোকের নাম ভিয়েৎনাম

এখন স্রেফ পাঁচ বস্তা চাল কিনে রেখে

আমি দুর্ভিক্ষের দায়দায়িত্ব সেরে নিচ্ছি

কয়েকটা ব্যাপারে কেবল মহিলার আধিপত্য সহ্য হচ্ছে না

আত্তিলার রক্তেও ছিল না একশো ভাগ নিরেট পৌরুষ

বুঝতে পারছি না কেন আমার গর্ভধারণের ইচ্ছে হয়

কেন আমার মসৃণ বুকে হাত রেখে মাঝরাতে হঠাৎ ককিয়ে উঠেছি

আমারই যৌনতার মধ্যে খুঁজে দেখেছি নিজস্ব গোলাবাড়ি একান্ত বীজধান

আমারই বীর্য থেকে স্রেফ আমারই শরীরে প্রসব চেয়েছি আমি

অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অভাবে মহিলাকে দিয়ে এলাম প্রেম আর কোকাকোলা

ঠিক এই কারণেই কোথায় কতখানি সমীর পরখ করতে

এক মহিলা থেকে ঘুরে বেড়ালাম অন্য শরীরের আনাচে কানাচে

আমার বাঁ-চোখ থেকে খুঁটে তুললাম তিনশো জোনাকির হঠাৎ জ্বলে ওঠা

গোলাপের চতুর্দিকে নিয়ন্ত্রিত কীটের উদ্বেগ অভিযান লক্ষ্য করে

আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার বিবেকের তলপেট

নিজের তৈরি বাস্তবিকতার সঙ্গে

পৃথিবীর বাস্তবিকতা মিলিয়ে দেখতে গিয়ে

আমি টের পেলাম আমার ব্যক্তিগত ছাপাখানা

কেননা প্রত্যেকবার একটা চৌরাস্তার কাছ-বরাবর এসে

আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাচ্ছি

বাম আর দক্ষিণ কমিউনিস্টদের খেল কসরৎ ঈর্ষা দেখতে

মার্কসের জরায়ু থেকে বের করে আনছি তিন লক্ষ সমীর

ভোরে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে কামরাজ পাতিল যেমন চোখে পড়া মাত্র

আমার মুখ তেতো হয়ে উঠছে

স্বপ্নের প্রথম শর্ত

মনে করো জেগে আছো তুমি

শব্দ আর শব্দ বিনিময়ে কবিতার ধর্ম হয়ে ওঠে

শপথের চেয়ে ঘৃণ্য কোনো পাপ নেই

প্রতিটি গলির মোড়ে অন্য এক প্রতিজ্ঞায় রুখে

এখন সাপের খেলা

ভ্রূ-আঁকা পেন্সিলে আমি মহিলার চোখের পাতায় লিখছি অশ্লীলতা, নার্সারি রাইম ।

 

কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে পাকাপাকি আসার পর প্রায় দেড় দশক পর দাদা যখন লেখালিখি  এবং ‘হাওয়া ৪৯’ পত্রিকার সম্পাদনা আরম্ভ করলেন তখন তাঁর কবিতাভাবনায় এবং কবিতা রচনায় বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে । তার প্রধান কারণ সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের সমাজের রাজনীতির সংস্কৃতির যে নতুন রূপের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, তার সঙ্গে তাঁর কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতার দুস্তর ফারাক অনুধাবন করতে পারলেন, প্রত্যক্ষ্য করতে পারলেন নবোদ্ভূত কেয়সকে, দেখলেন তার কেন্দ্রটি নিশ্চিহ্ণ । ফলত তাঁর কবিতায় কোনো ডমিন্যান্ট শৈলীর প্রভাব পড়ল না, কেননা কবিতার ক্র্যাফ্টকেই তুলে আনলেন কবিতার শরীরে ; তিনি ছবির সঙ্গে ন্যারেটিভকে এবং দার্শনিক বিবেচনা, প্রতিবর্তী ক্রিয়া, মুক্ত-সমাপ্ত পরস্পরবিরোধিতা, বুদ্ধিগত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, একই সঙ্গে একাধিক ঘটনা, দৃষ্টিভঙ্গীর পর্যায়ান্বন, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর, অসঙ্গতি, অপ্রত্যাশিত বাঁক, অর্থান্তর সৃষ্টিকারী ও আপাতবিচ্ছিন্ন চিন্তাপ্রবাহ মিশিয়ে দিতে লাগলেন । অনেক কবিতায় শৈলীটিকে ভঙ্গুর করে ফেলে তাকে ডায়েরির রূপ দিলেন । তাঁর কবিতাভাবনা পশ্চিমবঙ্গের তরুণদের মাঝে জলবিভাজকের কাজ করল ; একদিকে পরম্পরাবাদীরা এবং অন্যদিকে তাঁরা, যাঁরা কবিতার ক্র্যাফ্টকে কবিতারচনার প্রধান আগ্রহ করে তুললেন । কবিতায় “বিষয়”-এর মৃত্যু ঘোষণা করলেন, বললেন যে শিরোনাম হল কবিতার ‘রুবরিক’, তা কবিতাবিশেষের টাইটেল হোলডার নয় । প্রাগাধুনিক-প্রাকঔপনিবেশিক কবিতার মতন পরিসর তাঁর কবিতায় হয়ে উঠল শব্দমূল ও ধাতুকাঠামো সংক্রান্ত আগ্রহ । পাশাপাশি, যেমন তাঁর ছোটোগল্পে, তেমনই কবিতায় উঠে এলো বহুজাতিকতা ও ক্রনি পুঁজিবাদের দরুণ প্রভাবিত মানুষের অবদমন. মনোভঙ্গ, বিষণ্ণতা ; ব্যক্তিএককের বেদখল হয়ে যাওয়া চেতনা, পরিবেশ ও সংসার ।

“জীবনানন্দ : সূর্য ও তপতী” প্রবন্ধে দাদা লিখেছিলেন, “কবিতার লক্ষ্য অনুভূতিদেশ । অনুভূতির গভীরে আছে আদি স্বাগতম । আছে সর্বভূতেষু জাগরণস্পৃহা । অহং ব্রহ্মাস্মি চেতনার অপেক্ষমাণ বুদবুদ । কবি সে আসঙ্গ-যুক্ততার কাতরতাকে উসকে দেন । শব্দ যোজনার সেই কালিক চেতনাকে অতিক্রমণ কবির লক্ষ্য । ঈষৎ অনন্যসাধারণ উত্তরসমাজকে ত্বরান্বিত ত্বরান্বিত ও আরো বেগবান করে তোলার তিনি চেতনার অভিমুখের মশালবাহক । সমাজ যত বেশি একলষেঁড়ে হয়ে পড়ে, একলপ্ততার প্রয়োজন তত বাড়ে । বহুরৈখিকতা, ময়ূরপঙ্খী বর্ণময়তা সেখান থেকে মুক্তি দেয় ।”

 

তাঁর শেষ পর্বের কয়েকটি কবিতা এখানে তুলে দিই ।

এই কবিতা দাঁড়াতে চায় না   

কিছু কিছু শব্দের সকাল হয়ে আসছে

কিছু কিছু শব্দের রিপেয়ারিং চাই দরকার জোড়া লাগানো

কার সঙ্গে কিসের জোড়া সে-কথা পেয়ারিং শব্দের মধ্যেই আছে

প্রয়োজন প্যার মহব্বত পিরিত পেয়ার

পুরুষ প্রকৃতির তত্ত্বকথা না শোনালেও চলবে

 

ছন্দ     

প্রত্যেক শব্দের মধ্যে কিছু শব্দ পাশ ফিরে থাকে

প্রত্যেক শব্দের মধ্যে কিছু অক্ষর থেকে যায় স্বল্প উচ্চারণে

কিছু উপসর্গ প্রত্যেক ধাতুর সম্পর্কে থেকে যায় অর্থবিহীন

বুঝ আর অবুঝের মধ্যে বোঝাপড়া রাখে কার্যসাধিকা

নীলুদের সংসারে ছোটমাসি মুখ বুজে কাজ করে যায়—

জটিলতার কাছে সোপর্দ রয়েছে

গতির অরৈখিক নকশা

অংশ-প্রীতি, ঘুম

যেভাবে বিশৃঙ্খলা ছন্দের মুখোশ ।

 

নিজস্ব রোদের জন্য

নতুন বাড়িটিতে যেদিন প্রথম বিকেলের রোদ এসে

জীবনের খোঁজ নিয়েছিল সেদিন থেকেই এবাড়ির নিজস্ব রোদ

নিজস্ব হাওয়া বাতাস নিজস্ব মেঘলার জন্ম

সবকিছু যা একান্তই এবাড়ির

যেভাবে কিছু রোদ কিছু বৃষ্টি নিয়ে বেঁচে থাকা সংসার পাতে

 

যেভাবে স্হানিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায় মহাভাষ্য থেকে

যেভাবে ব্যক্তিগত রোদের কাতরতা নিয়ে একসময়

পশ্চিমের বারান্দায় অতসীলতাকে বাঁক নিতে দেখেছিলাম

দেখেছিলাম রোদের জন্য ঠাকুমার হাপিত্যেশ

এখনও মনে পড়ে যায় দ্বারভাঙ্গায় আমাদের ডাইনিং টেবিলে

চা পানের সঙ্গী এক চিলতে রোদ্দুর

স্কুলের ছুটির ঘণ্টার সঙ্গে চলে যাওয়া রোদের অন্য এক সম্পর্ক ছিল

যেমন কিছি কিছু ছায়ার সঙ্গে আমাদের নিভৃতের যোগাযোগ

 

যেভাবে কিছু রোদ কিছু ছায়া ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে জমা পড়ে

যেভাবে স্হানিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায় মহাভাষ্য থেকে ।

 

আয়নাঘর

ঘুম ভেঙে আয়নায় দেখি বাবার তিনকাল পেরোনো মুখ

রাতে খুলে রাখা দাঁতের ডিবে খুঁজছে…

ইসেবগোল খেয়ে ঘুমিয়ে ওঠা লোকটার শুকনো গলায় তেষ্টা…

কোঁচকানো গালে ছ-দিনের দাড়ি, ভুরুর বাড়ন্ত চুল চোখ ঢাকছে…

ফিটকিরির গুঁড়ো দিয়ে ঢিমেতাল মাড়ি শেষ যত্নে ধুয়ে নিচ্ছে…

সাদা পাথায় তিনটে কালো চুল দেখে নির্বিকার ফোগলা শূন্য হাসছে…

খুলে রাখা নাক কান চোখ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাঁর দলিলে নেই

 

বর্ণমালার ক্ষয়িষ্ণু অমৃতকণা ড্যাখে পরস্পর বর্ণগুলি মৌলকণা

করোগেটেড কপালের বলিরেখায় কেওসের চিহ্ণ…

ক’দিন বাদেই আসবে ডেটল না-রাখা টিনের কাঁচি চিরুনি…

ইমলিতলার ভ্যানওয়ালা লটারি পাওয়ার গল্প শুনিয়ে যাবে…

এমনই অনেক অনুভব ভব হয়ে উঠছে আয়নায় দেখা মুখের ভাঁজে…

 

পেছন ফিরে দেখি চিরযৌবন আর কবিতার খাতা নিয়ে সমীর–

শেফালির সঙ্গে বকখালিতে আজ ডেটিং

পরস্পরের ভূপ্রকৃতি বাস্তুতন্ত্র গিরিখাত আগ্নেয়মুখ চিনে নিতে এখনও বাকি…

কবিতার খাতা শেষ পাতায় লিখে রাখা ইজা

 

আয়নাঘরে পেছনের আয়নায় বাবা পিতামহের মুখ দেখছে…

প্রপিতামহ দেখছে প্রপৌত্রের মুখ

পাঁচ রাউণ্ডের শেষে শেষ ডিফেন্সে আমি গোলপোস্টে একা

নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে বিপক্ষের কর্ণার কিকের মুখোমুখি

গোলার সামনে দুই জার্সি জটলায় পজিশন নিচ্ছে

হেড-বেহেডে মাথার ওপর বল ঘুরছে ফিরছে

পক্ষ বিপক্ষ বুঝে উঠতে হিমসিম খাচ্ছি

ভয় এবার যদি পেনাক্টিকিকের হুইসল বাজে

আয়নাঘরের মাঠে…[

 রচনাকাল : জুলাই ২০১৬ ]

সমীর রায়চৌধুরীর গল্প-প্রবন্ধ “বাইরের কিছু নয়, ভেতরের কোনো উদ্রেক”: সমীর রায়চৌধুরীর ৩টি গল্পে বাস্তবতার যাপনচিত্র : অর্ক চট্টোপাধ্যায়
....................................................................
জাদুবাস্তবতা কি অধিবাস্তব না অতিবাস্তব ? বাস্তবতার অভাব না আধিক্য কোনটা নির্মাণ করে জাদুবাস্তবের আঁতুড় ? কিউবার সাহিত্যিক আলেহো কার্পেন্তিয়ার ১৯৫০-এর দশকে যে “মার্ভেলাস রিয়্যাল” এর কথা বলেছিলেন তা ছিল আদ্যপান্তভাবে রাজনৈতিক এবং প্রতিস্পর্ধী । কার্পেন্তিয়ার ইউরোপীয় বাস্তববাদের বাইরে বেরিয়ে এসে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার বয়ানের কথা বলেন যা তথাকথিত প্রথম-বিশ্ব-বহির্ভূত অরৈখিক বাস্তবতার যাপনচিত্র তুলে ধরতে পারবে । তাঁর লাতিন আমেরিকান “মার্ভেলাস রিয়্যাল” ইংরেজি ভাষায় লেখা ভারতীয় সাহিত্যে রেখাপাত করে সালমান রুশদির ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ ( ১৯৮১ ) উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে । অব্যাহত থাকে জাদুবাস্তবতার উত্তরঔপনিবেশিক রাজনৈতিক চালচিত্র । জাদুবাস্তবতা কোনো অধিবিদ্যক ( metaphysical ) বাস্তবো্ত্তীর্ণ পৃথিবীর রূপকথা নির্মাণ করে না । বরং বাস্তববাদ যেভাবে কায়েমী রাজনীতির পক্ষ নেয়, তার সমালোচনার প্রয়োজন থেকেই জাদুবাস্তবতার আয়োজন । ম্যাজিক এখানে বাস্তবকে বদলাতে সচেষ্ট । কুমকুম সাঙ্ঘারি লিখেছেন, “Marvellous realism must exeed mimetic reflection in order to become an interrogative mode that can press upon the real at the point of maximum conteradiction.” জাদু বাস্তবতায় জাদু, বাস্তবকে পুননির্মাণ করে আর বাস্তবতা জাদুকে তার রাজনৈতিক কুহক বিস্তার করতে দেয় ।
এই সংক্ষিপ্ত তাত্বিক অবতারণা সমীর রায়চৌধুরীর তিনটি স্বঘোষিত ‘অধুনান্তিক’ ছোটগল্পে বাস্তবতার ফ্রেমকে পর্যালোচনা করার জন্য । আমরা আগে থেকেই এই তিনটি গল্পে বিধৃত বাস্তবতাকে জাদুবাস্তবতা ধরে না নিয়ে দেখার চেষ্টা করবো কিভাবে এই গল্পগুলিতেবাস্তববাদ বা রিয়্যালিজমকে ভাঙা-গড়া করেছেন লেখক । বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক সমীর রায়চৌধুরী নিজের সাহিত্য সৃষ্টিকে নিজেই উত্তরাধুনিক এবং উত্তরঔপনিবেশিক লক্ষণাক্রান্ত বলে মনে করেছেন । এই ধারায় বাস্তববাদের রাজনীতিকে প্রশ্নচিহ্ণের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়তো স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত ।

মানুষবাজার

প্রথম আলোচ্য ‘মানুষবা্জার’ গল্পটি ডায়ালগের ফর্মে লিখিত বা ফর্মের দিক থেকে এক রাজনৈতিক প্রশ্নবোধক মোড তৈরি করে । লেখার বিষয়ে বাস্তবতার এক আধিক্য দেখা যায়, গল্পটি, বাস্তব যেখানে অ-বাস্তব ( non-real ) হয়ে ওঠে সেই সন্ধিক্ষণ-বিন্দুটিকে তুলে ধরে । পাটনা সচিবালয়ে রিক্সা করে পেনশন তুলতে যাওয়ার সময় কথক সুকুমারের দেখা হয়ে যায় স্কুলজীবনের বন্ধু শ্রীবাস্তবের ( নামটি লক্ষণীয় ) । এই শ্রী-বাস্তব
তাকে মানুষবাজারের বাস্তবের কথা শোনায় । এই বাস্তবতা অতীব মাত্রায় বাস্তব হওয়ার মাধ্যমেই অ-বাস্তব হয়ে ওঠে । অনভরকম জীবনের স্বপ্ন দেখা শ্রীবাস্তব বহু দিন আগে মুম্বাই চলে গেছিলো । এতদিন পর দেখা হওয়ায় সুকুমার জানতে পারে যে অনেকদিন যাবৎ মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এক্সট্রা সাপলাইয়ের কাজ করার পর শ্রীবাস্তব এখন রাজনৈতিক মিছিলের জন্য মানুষ সাপলাই করে । সুকুমার যখন জিজ্ঞাসা করে কোন রাজনৈতিক দলের মিছিল, সে জানায় সব দলকেই সে লোক জোগান দেয় কারণ মিছিলে হাঁটার এই এক্সট্রা লোকদের সংখ্যা নির্দিষ্ট ।একই লোকের দল সরকার পক্ষের মিছিলে হাঁটে ; আবার তারাই বিরোধীদের মিছিল আলো করে রাখে। শ্রী-বাস্তব যে সিস্টেমের বর্ণনা করে যায়, কিভাবে সে ‘লিঙ্কম্যান’দের সাহায্যে বেকার লোক ধরে ইত্যাদি — তার মধ্যে দিয়ে এক অরৈখিক অ-বাস্তবতার চিত্রায়ণ সম্পূর্ণ হয় ।
সমীর রায়চৌধুরীর কথক লেখক হওয়ায় তাদের কথোপকথন সাহিত্যের রাজনীতিকে যুক্ত করে সিনেমার এক্সট্রা আর রাজনৈতিক এক্সট্রা — এই দুই ধরণের অভিনেতার সঙ্গে । ‘অভিনয়’ বা পারফরমেন্সের ধারণাটির মাধ্যমে লেখক, সাহিত্যিকদের ‘মানুষবাজারের’ জগতের কাছে নিয়ে আসেন । শ্রীবাস্তব বলে : “তোদের লাইনে যেমন একজন লেখক আর টেক্সটের বক্তব্য এক নাও হতে পারে।” তাদের বিনিময়ে প্রকট হয়ে ওঠে মানুষের ভাষার আড়ালে নিজেকে লুকোনোর শৈলীর কথা যা মানুষবাজারে অভিনয়কে সর্বব্যাপী করে তোলে । দুই বন্ধুর ডায়ালগ এক উত্তর-রাজনৈতিক ( post-political ) বাস্তবতার ছবি তুলে ধরে যেখানে আদর্শ মৃত এবং মানুষ মুক্ত-অর্থনীতির বাজারের অদৃশ্য, অভিন্ন, ক্রমিক পণ্য-সংখ্যায় পর্যবসিত হয়েছে । ‘মানুষবাজারের’ এই উদ্বৃত্ব মানুষরা যতটা বাস্তব, ততই অবাস্তব । তারা সেই নিবেশপথ যার মধ্য দিয়ে বাস্তবতা আত্মবিনির্মাণ ঘটায় । এই গল্পটি তাই অতি-বাস্তবতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তাকে অ-বাস্তবের কাছে নিয়ে আসে ।  এই অপারেশন রাজনৈতিক বাস্তববাদ এমনকি তার সাহিত্যিক অভিনয়সুলভ ভেক ধরাকেও সমালোচনা করতে ছাড়ে না ।

মেথিশাকের গন্ধ

সমীর রায়চৌধুরী নিজেই লিখেছেন ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পের কেন্দ্র হল অন্ধকার।’ গল্পের শেষে একটি ছোট্ট নোটে তিনি জানিয়েছেন যে সচেতনভাবেই মানুষকে কেন্দ্রচ্যূত করে অন্ধকার নিয়ে গল্প লিখতে চেয়েছেন । বাস্তবতা যদি মানুষকে বাস্তবদ্রষ্টার ভূমিকা থেকে বিচ্যূত করে তবে এমন এক রিয়্যালিটি তৈরি হয় যা নন-হিউমান । এই নন-হিউমান রিয়্যালিটিই কি ‘মেথিশাকের গন্ধ’-র নব্যবাস্তবতা । লোডশেডিঙের নিকষ অন্ধকারের মধ্যে কথক রান্নাঘরে ব্যস্ত স্ত্রী শেফালির দিকে আস্তে আস্তে এগোতে চাইছেন । অন্ধকারে মেথিশাকের গন্ধই তাঁর গাইডিং থ্রেড । হাতড়াতে হাতড়াতে কথক স্পর্শ করে চলেছেন বাড়িতে অনেকদিন ধরে জমতে থাকা ‘বিষয়-সম্পদ’ । অ-মানবীয় এই সব জিনিসের বিবরণ এই গল্পের বাস্তবতাকে উত্তর-মানবতার ( posthuman ) ইশারায় বোধিত করেছে । অন্ধকারের স্পর্শ-গন্ধের মধ্যে মানুষ-কথকের স্মৃতি অন্ধকারকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছে । ছোটবেলায় বড়োরা বলতেন, অন্ধকারে দত্যি-দানো থাকে, আবার কোনো কাছের মানুষ মারা গেলে বলা হতো সে অন্ধকারের দেশে চলে গেছে । এইভাবে কথকের মানব স্মৃতিতে অন্ধকার ভয় আর উষ্ণতার যুগপৎ চিহ্ণ হয়ে উঠেছে ।
লোডশেডিঙের সূত্রে লেখক এই গল্পের অন্ধকারকে সমাজবিদ্যার চোখে দেখেছেন । স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের প্রসঙ্গ এসেছে, এসেছে তাদের ব্যবস্হা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের কথা । উঠে এসেছে অন্ধকারে চুরির ভয়ের কথা, লোডশেডিঙের রাজনীতি : “এটা আবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা, তাই লোকে যাতে মনে না করে নিজের এরিয়ায় তিনি বেশি কাজ করছেন, তাই খুব একটা পাবলিক-ওয়র্ক এলাকায় হয় না । আর যাই ওক পার্টির এসব নির্ভীক সততা আছে।” রাজনৈতিক স্যাটায়ারের হাত ধরেই স্পষ্ট হয়েছে আরেকটি বিদ্রূপ : “তবে একটা ব্যাপার সুখের । নিয়মিত লোডশেডিঙ  হওয়ার ফলে জেনারেটরের ব্যবসা, মশার রকমারি ওষুধপত্তরের বিক্রিবাটা, মোমবাতি আর ব্ল্যাকে কেরোসিন ইত্যাদির ব্যবসা বেড়েছে । কিছু বেকার ছেলের তবু যাহোক হিল্লে হয়েছে।”
‘তমসা নদীতীরে’ বাল্মীকির আশ্রমের উপমায় অন্ধকারের আর্থসামাজিক তথা রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি স্হান পেয়েছে তার মিথিকাল বাস্তবতা । এই প্রাতর্কিক অবতারণার মধ্য দিয়ে গল্পটি অন্ধকারকে সৃজনশীলতার দিকে নিয়ে গেছে ।

“কবিতার জন্ম হয়েছিল এই নদীতীরে, আরও সহজ করে বলা যায় মানুষ নামের প্রাণীর কবিত্বের জন্ম এই তমসা তীরে । যে কবিত্ব এই প্রজাতির চালিকাশক্তি । বিজ্ঞানীরা অবশ্য ব্যাপারটাকে বলেন, দ্য গ্রেট অ্যাবাউট টার্ন । গন্ধ শব্দ স্পর্শ এভাবে একটা মাত্র বৈশিষ্ট্যের পথ না বেছে নিয়ে সবদিকে সচেতন হওয়ার মন । আর এই মনের প্রশ্রয় তমসাকে ভয় করে ।”
এই অন্ধকার ইন্দ্রিয়জ । এখানে স্পর্শ-গন্ধের পাশাপাশি প্রখর হয়ে ওঠে শ্রবণ । শেফালির স্হির হয়ে থাকার সাবধানবাণী থেকে রান্নাঘরে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ — এই অন্ধকারের বাস্তবতা গভীরভাবে সংবেদী । অন্ধকার বর্তমান থেকে অতীতের দিকে স্মৃতির প্রসারপথ খুঁজে নেয় :
“বেশ জমাট অন্ধকার । সবকিছু একাকার হয়ে গেছে । আকারের যে হট্টগোল আমার আকারটুকু সায় দিয়ে রেখেছে সেই সবকিছু অন্ধকারের মধ্যে লোপাট হয়ে গেছে । এই অন্ধকারে আমার সম্বল ওই মেথিশাকের গন্ধ আর শেফালির কন্ঠস্বর । মেথিশাক দিয়ে বেগুন না মেথিশাক দিয়ে শেফালির কন্ঠস্বরের ব্যঞ্জন, এই মুহূর্তে ঠিক কী বলা যাবে ! মেথিশাকের গন্ধে মাথিশাকের শরীর ছাপিয়ে এই জীবনের আরও কতো কি যে ক্রমশ সেঁধিয়ে গেছে । ছোড়দি ভালোবাসত মেথিশাক দিয়ে শুকনো-শুকনো কইমাছ । মা মেথিপাতা শুকিয়ে রাখতেন, ফোড়ন দেওয়ার জন্যে কিংবা মুগডালে দিতেন।”
‘মেথিশাকের গন্ধ’ কথকের নিজের ভাষাতেই ‘অন্ধকারের স্হানিকতা’র কাইনি । স্ত্রী শেফালির বারন সত্বেও কথক অন্ধকারে নিজের বাড়ির স্হানিক পরিসরটিকেই পুনরাবিষ্কার করতে-করতে এগোতে থাকেন । এই পুনরাবিষ্কার তাঁর জীবনচর্যার  পুনরানুশীলনও বটে । দেওয়ালে টাঙানো ছবির কথা ভাবতে-ভাবতে তিনি ফিরে যান কয়েক দশক পিছনে, তাঁর জীবনব্যাপী বাড়ি বদলের ইতিহাসে । পুরোনো বাড়িতে আত্মপ্রকাশের নানা স্মৃতি ভর করে থাকে এই ইতিহাস । গুরুজনের ইচ্ছা পূরণের জন্য সাধের পায়রাদের কেটে ফেলার কষ্ট এসে মিশেছে এই অন্ধকারে । ছবিগুলো আঁকিয়েদের কথা বলে, তাদের ভাবনা-চিন্তার কথা বলে । বাঁধন দাশের ছবির প্রসঙ্গে উঠে আসে । ‘বিশ্বায়নে স্হানীয়টুকুর গুরুত্বের’ কথা । এই গল্প ‘স্পেস যেভাবে সম্পর্ক গড়ে’ তার দলিল । এই স্হানিক বাস্তবতার স্হানীয় রং বিশ্বয়নের ‘গ্লোকাল’ ( গ্লোবাল+লোকাল ) স্পেসের বাস্তবতাকেই যেন ধরতে চায়।
ব্যক্তিক ইতিহাসের আটপৌরে ঘরোয়া অন্ধকার কথকের কাছে জীবিত-মৃত ‘প্রিয়জনের সংসার’ । তিনি অন্ধকারে এগোতে এগোতে অপেক্ষা করে থাকেন কখন মেথিশাকের গন্ধ গিয়ে ‘শেফালির উপস্হিতির জৈব গন্ধ’-এ মিশবে । সেটাই তাঁর গন্তব্য । তাঁর ‘হদিশ’ । গল্পটি শেষ হয় বাড়ির অন্যান্য বিষয়-আশয়ের মধ্যে লালিত এই অন্ধকারকে গার্হস্হের অনিবার্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে । গল্পটি অন্ধকারকে অ-মানবীয় করে তুলতে পারে না, বরং তাকে মানুষের চোখ দিয়েই দেখে শেষ পর্যন্ত । অন্ধকার এখানে মানবায়িত হয়না কিন্তু প্রভাস পায় মানবদৃষ্টির আয়নায় । গল্পটি এখানে স্বঘোষিত উত্তর-মানববাদী ইশারাকে বিনির্মিত করে ফিরে আসে অন্ধকারের সঙ্গে মানব-সম্পর্ক স্হাপনের প্রেরণায় । এই গল্পের বাস্তবতা তাই কোনো সহজ সরল জাদু বা পরা-বাস্তবতা নয় । বাস্তবতা এখানে তার মানবীয়, অমানবীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, পৌরাণিক — এমন নানান স্তরের স্মৃতি-তর্পণকে আধার করে গড়ে ওঠে ।

গান্ধারী-পুং

বাস্তবতা কি তা-ই আমরা আমাদের চোখ দিয়ে দেখি ? শেষ আলোচ্য গল্প ‘গান্ধারী পুং’ এমনই এক প্রশ্ন উস্কে দেয় । লেখক-কথকের স্ত্রী শেফালির চোখে অস্বস্তুি শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে গল্প শুরু হয় । শেফালি ভাবেন চোখে বালি পড়েছে কিন্তু কথক বুঝতে পারেন “বাইরের কিছু নয়, ভেতরের কোনো উদ্রেক” । বাস্তবতাও কি এমন নয় ? বাইরের কিছু নয়, ভেতরের কোনো উদ্রেক ? লাফিং ক্লাব থেকে সদ্য বাড়ি ফেরা শেফালির চোখে যখন তাঁর স্বামী ‘টিয়ার্স ড্রপ’ দেন, তখন বাস্তবতা ইন্দ্রিয় থেকে অনুভূতির পথে হাঁটে আর হাসি-কান্নার ভারসাম্যে জীবনকে ছুঁয়ে যায় ।
গল্পটি মেডিকাল ডিটেইলিঙের মাধ্যমে যে শুধু বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠে তাই নয়, শেফালির চোখের সমস্যা, নেত্রনালিতে অবরোধ, এবং ক্রমশ এগিয়ে আসা অন্ধত্বের ব্যক্তি ইতিহাস বৃহত্তর  সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবেশ দূষণের সূত্র ধরে :
“চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সারা বিশ্বে আধুনিক উন্নয়নজনিত প্রদূষণের ফলে এখন প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ পরিবেশগত কারণে অন্ধ ; প্রতি বৎসর এই সংখ্যা উর্ধ্বগামী । অবশ্য এই পরিসংখ্যান কেবল সেইসব পেশেন্টকে নিয়ে যাঁরা চিকিৎসালয়ে গেছেন, চিকিৎসক দেখিয়েছেন । ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের পরিসংখ্যান নেই । এদেশে আর্থসামাজিক কারণে অধিকাংশ মানুষের বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার সামর্থ নেই । কিছু-কিছু  চিকিৎসক স্বয়ং এই ব্যাপারে তৎপর হয়েছেন । আজকের জীবনযাত্রা আর রাষ্ট্রব্যবস্হার কারণে মানুষ স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় ।”
লেখক গল্পের ভেতরে ন্যারেটিভকে থামিয়ে যেসব প্রাতর্কিক চিন্তাপ্রবাহ চালনা করেন তার আরেকটিতে স্হান পায় মহাভারতে গান্ধারীর অন্ধত্ব, মহাকাব্যিক যুগে মানুষ এবং প্রকৃতির নৈকট্য উত্তরঔপনিবেশিক সময়ে পরিবেশ বিজ্ঞানের মাধ্যমে সেই নৈকট্যের জরুরি পুনরুদ্ধার — ইত্যাদি নানা আইডিয়া । গান্ধারীর অন্ধত্ব বাস্তবতাকে ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার বাইরে সংবাহিত করে : “তিনি চাক্ষুষ দেখা থেকে সরে গিয়ে অনুভূতির দেখাকে শ্রেয় মেনে বেছে নিয়েছিলেন ।” অন্ধত্বের পপসঙ্গে স্মৃতিপথে চলে আসে অন্ধ কবি সুরদাসের কথা, যাঁর গানে দর্শকশ্রোতার অশ্রুপাত বাস্তবতাকে আবেগায়িত করে । ইন্দ্রিয়োত্তর এই বাস্তবতাকে ম্যাজিক রিয়্যালিজম বলার প্রয়োজন নেই । রিয়ালিটি যতোটা ইন্দ্রিয়ের বাইরে ততটাই শরীর ও মনের  ভেতরে । রিয়ালিটি এই দুইয়ের সংযোগস্হল ; ভিতর ও বাহিরের সংলাপকেন্দ্র ।
‘গান্ধারী-পুং’ বিভিন্ন অত্যাধুনিক চক্ষু চিকিৎসার ডিটেইলিঙে পৌরাণিক বাস্তবতার  এক বৈজ্ঞানিক তথা সাংস্কৃতিক অনুবাদকে তুলে ধরে :
“আমাদের প্রজন্মে জানতাম ‘ত্রিনেত্র’ একটি দার্শনিক…আধ্যাত্মিক টার্ম । অথচ আজ তা বিশ্বস্তরে পেটেন্টের অন্তর্গত চিকিৎসাবিজ্ঞানের টার্ম ; বাস্তব, চাক্ষুষ একটি যন্ত্র । রোগের কারণ হয়ে ওঠা নিত্যনতুন নিরাময় আবিষ্কার আজকের জীবনে বাধ্যবাধকতা ।”
শেফালির চোখ সেরে ওঠে । অধুনান্তিক গান্ধারী অন্ধ হয়ে যান না । আর তাঁর পুং কথক ‘কান্নাহাসি যখন একই সঙ্গে ঘটে’, ‘রোদবৃষ্টি বুননে’ সেই প্রবল অনুভূতির ‘রামধনু’ দেখতে পান । টিয়ার্স ড্রপ  তার লাফিং ক্লাব খুঁজে পায় আর অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পায় বহির্দৃষ্টিকে । এই দুইয়ের সন্মিলনে গড়ে ওঠে অনুভূতিপ্রবণ এক বাস্তবতা।
সমীর রায়চৌধুরীর গল্পগুলির বহুমাত্রিক বাস্তবতাও এমনই এক রোদবৃষ্টির রামধনু যেখানে ব্যক্তিবাস্তবতা সমষ্টির বাস্তবতাকে ছুঁয়ে থাকে । এই বাস্তবতা বর্তমান ও ভবিষ্যতের চেহারায় পপাচীন ও অতীতের নবরূপে প্রত্যাবর্তন চি্‌হ্ণিত করে । ব্যক্তিগত পরিসর এই স্তরায়িত বাস্তবতায় রাজনৈতিক হয়ে ওঠে । লেখক এই তিনটি গল্পে ম্যাজিক রিয়্যালিজমের কোনো প্রত্যক্ষ প্রকরণ বা উপাদান ব্যবহার করেননি ; বরং বাস্তববাদী ঢঙেই বলার চেষ্টা করেছেন গল্পগুলিকে । আখ্যান যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে লেখকের চিন্তাপপতর্ক দিয়ে সেখানে গল্পগুলির বাস্তববাদ ইডিওলজির উদ্রেকে তুলে ধরেছে এক রাজনৈতিক বিন্যাস । এই রাজনৈতিক বিন্যাস রিয়্যালিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে । এর ফলে এই বাস্তববাদের ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে প্রতি-বাস্তবতার ( anti-reality ) একাধিক প্রস্হানবিন্দু ।
( দমদম জংশন পত্রিকার জানুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত )

সমীর রায়চৌধুরীর মৃত্যুতে বাসব রায় বলেছিলেন :

সমীর রায়চৌধুরী মারা গেলেন। কে তিনি? না সুনীল-শক্তি-সন্দীপন-দীপকের বন্ধু, হাংরি খ্যাত মলয় রায়চেৌধুরীর দাদা। এমন নয় যে সমীর রায়চেৌধুরী অন্যদের পরিচয়েই পরিচিত। তাঁর নিজেরও কিছু উচ্চমানের লেখা আছে। হাওয়া ৪৯ নামে দুরন্ত একটা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাও করেছেন বেশ কিছুদিন। আনন্দবাজারীয় সাহিত্যের পাঠকরা অবশ্য সমীরকে শুধু সুনীল-শক্তির চাইবাসার বন্ধু বলেই জানেন। এর বাইরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন আত্মজৈবনিক লেখালিখিতে সমীরকে আবিষ্কার করা যায়। অ্যালেন গিনসবার্গের কাশী যাত্রায় সমীর সম্ভবত সঙ্গী ছিলেন কিছুদিন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে ওঠাবসা ছিল সমীরের, পরে চাইবাসায় চলে যান। জনশ্রুতি তাঁর বোনের সঙ্গেই প্রথম প্রেম শক্তির। তবে সমীর রায়চৌধুরীকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন হাংরির নকল গ্রুপ। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত খুব মোটা একটা বই আছে বাজারে। যার সম্পাদনা করেছেন সমীর চেৌধুরী। মজার ব্যাপার ওই বইটিতে হাংরির শেষকথা মলয় রায়চেৌধুরীর কোনো লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তাঁর দাদাই কি না সম্পাদক! সত্যটা হচ্ছে এই সম্পাদক সমীর চৌধুরী আজ মারা যাননি, অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্য থেকে। কেননা ওই বইয়ের সম্পাদক মলয়ের দাদা নন। এটাই মজা।
ইদানীং সমীর কিছুই লিখছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন গত ষাট বছরের বাংলা লেখালিখির এক আশ্চর্য দলিল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সব খবর রাখতেন। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি ধারালো হয়েও মলয় রায়চৌধুরী এই জায়গায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন (যদি তুলনা করতেই হয়), মলয় বেশ কয়েক বছর লেখালিখির বাইরে ছিলেন। সমীর রায়চেৌধুরীর মৃত্যু মানে ইতিহাসের ইতিহাসে চলে যাওয়া।
তাঁকে শ্রদ্ধা...

সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে অমিতাভ প্রহরাজ
.....................................................
প্রয়াত সমীর রায়চৌধুরী। নামটা অপরিচিত নয় কারোর। কৃত্তিবাসের বন্ধুদের সেই চাইবাসার অফিসার বন্ধু। হাংরি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা। এইসব পরিচয়েই চেনেন সবাই। লিটল ম্যাগাজিন গ্রহের কেউ হলে, হাওয়া ৪৯ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, বাংলা লেখায় পোস্ট মডার্ন থিওরি অধুনান্তিক নামে তত্ত্বটির প্রবর্তক।হয়তো এটাও জানতে পারেন এই অধুনান্তিক সাথে প্রভাত চৌধুরী, কবিতা পাক্ষিকের, তাঁর পোস্ট মডার্ন তত্ত্ব উত্তরাধুনিকের থেকে আলাদা। খুব ভালো লেখক জগতের মুচমুচে আড্ডার টপিক ছিলো এটা এককালে। কিন্তু এই মানুষটি কি, এবং লেখার জন্য বাংলা ভাষার জন্য কতোটা করা যায়, আপনারা তার বিন্দুবিসর্গ জানেন না। (দুজনের নাম যখন উঠলো বলিই এবার, কারন এই থ্রিলারে প্রচুর বিষ্ফোরক বিষফোঁড়ার মতো ঘটনা যা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন জগৎ আপনাকে যথেষ্ট শিক্ষিত মনে করেনা এই অজুহাতে জাস্ট চেপে রেখে দেয়, সেরকম অনেক কিছুই থাকবে। বলা প্রয়োজন এখন।) এই প্রভাতবাবুর কবিতা পাক্ষিক থেকে অনেকের বই বেরোচ্ছে পরপর। কবিতা পাক্ষিকের কবি হিসেবে স্ট্যাম্প গায়ে লাগাতে অনেকেই লোলুপ। এবং এককালে মর্যাদাপূর্ণ ডিগ্রীর মতো তাকে বহন করে বেরিয়েছেন, এবং সময় এলে জাস্ট পাতি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। শূন্য দশকের এক অতি ক্রুদ্ধ প্রতিভাবান লেখকই এই তালিকায় আছেন। কিন্তু ওসব অন্ধকারের কথা নয়। সমীরদার কথা বলছি, উনি ছিলেন এক নিঃশব্দ, এবং কেউ জানতে না পারা “ভিজিলান্তে” বা যারা নীরবে পাহারা দেয়, আছে বলে বোঝা যায় না। বাংলা কবিতার জগৎ ওনার চেয়ে ভালো বোধহয় কেউ জানতো না। অথচ অনেক তরুণ কবি কল্পনাতেও রাখতে পারবেন না যে সমীর রায়চৌধুরী ওর প্রত্যেকটি লেখা শুধু মনে দিয়ে পড়া নয়, নোট নিয়ে পড়েছেন, ভেবেছেন, আলোচনা করেছেন। উনি জানতেন ঢক্কানিনাদ কি পরিমাণ ক্ষতিকর। ২০১৪ সালে কোনো এক শীতের খুব সকালে, দুর্গাপুরে ঘুমোচ্ছি আমি, একটা ফোন আসে। ঘুমচোখে ধরতে শুনি “নমস্কার, আমার নাম সমীর রায় চৌধুরী। আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে। অসুবিধে নেই তো?” বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে উঠে পড়ি। তখন হাওয়া ৪৯ এর একটি বিশেষ সংখ্যা, সম্ভবত ২০০০ সালের পরের বাংলা কবিতা নিয়ে। তাতে কে চেয়েছিলেন মনেও পড়ছে না ঠিকঠাক। নাসের দা না যাই হোক, মোটমাট “সমীর দা তোমাকে চারটে কবিতা দিতে বলেছেন”। দিয়েছিলাম। সকালের ফোনটি ছিলো ওগুলির মধ্যে একটি কবিতা নিয়ে ওনার কিছু ধারণা ও কথা আর সেগুলি সম্পর্কে আমার কি মতামত, এবং আমার কি মনে হয় উনি কবিতা নিয়ে যা বলছেন সেগুলি সঠিক বা অন্যরকম কোনো দেখা। এইসব। বাকি জীবনে আমার সমীর রায়চৌধুরীর সাথে দেখাও হয়নি, কথা বহুদূর। ওই একটা সকালে ছোট্টো ফোন।

কাট টু গতবছর। সমীরদা মারা গেলেন। শংকরদার সিনেমা বোটমেন অফ হাই সিজ, যাতে আমিও ছিলাম, সমীরদা, মনীন্দ্র গুপ্ত, অরিত্র, সঙ্ঘমিত্রা শুভ্র দেবাদৃতা অনেকে ছিলো। তবে শঙ্করদার কাজটি ছিলো প্রসেসের দিক থেকেও ইউনিক তাই এদের মধ্যে একজন কি ভূমিকা, কি কি কথা বলেছে তা দেখার কোনো স্কোপ ছিলো না। স্ট্রিক্টলি। শঙ্করদার পোস্ট থেকেই জানতে পারি সমীরদা চলে যাওয়ার কথা। হাল্কা খারাপ লাগা বললেও অসত্যভাষণ হবে, কারন আমি তো ওনাকে চিনতাম না, পরিচয় নেই, হ্যাঁ লেখা পছন্দ করতাম খুব। তাই ফর্মাল খারাপ লাগা। তার পরের দিন সকালে ফেসবুকে এমন সার্কাস বা রঙ্গ অভিনীত হলো যা আমার একটি সিদ্ধান্ত কে আরো তাড়াতাড়ি কার্যকর করতে বাধ্য করলো। চলে গেছেন একজন কবি লেখক, তো একটা খারাপ লাগা এবং স্মৃতিচারণ জাতীয় লেখা, খুবই ফর্মাল আমি লিখলাম। আর সেটি ওই ওপরের ঘটনাটি কারন ওই একটি ছাড়া আমার আর কোনো স্মৃতি বানিয়ে বানিয়ে দুরন্ত প্রশংসায় ডুবিয়ে দেওয়া আমার আসে না। ফেসবুক ভর্ত্তি পোস্টের মধ্যে আমার তৎকালীন বন্ধু, গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক এ সময়ের স্ট্যাটাসও ছিলো। অসাধারণ আবেগতাড়িত একটা লেখা। যাতে এমনও ছিলো যে সমীরদা না থাকলে, সমীরদার ক্রমাগত প্রশয় ও সাহস না দিয়ে গেলে ওর লেখা ওর তত্ত্ব এগুলি কিছুই হয়তো হতো না। যখন সবাই রঙ্গ রসিকতা করছিলো তখন সমীরদা ওকে সবসময় যোগাযোগ রেখে গেছেন। আমার পড়ে বেশ দ্রব দ্রব অনুভূতি হলো। আমার বন্ধুটিকে এত আবেগ ও অকপট আমি আগে দেখিনি।

আর তার কিছু পরে সেই সার্কাস ঘটতে শুরু করলো। আমার স্ট্যাটাসটির নীচে কমেন্টে এক এক জন এসে লিখতে থাকলো যার মোদ্দা বক্তব্য ছিলো সমীরদা ওকেও ফোন করেছিলেন এবং ওই সংকলনে ওরও কবিতা ছিলো। একের পর এক। এমন কি আমার বন্ধুও। আমার অতি বিকট বিশ্রী লাগছিলো, এ কি??? আমি একটা স্মৃতিচারণা করেছি মাত্র কোনো সাফল্যের খতিয়ান দাখিল করিনি। মানুষকি খ্যাতির লোভে মিনিমাম মনুষত্ব্য যা একজন প্রয়াত মানুষের সম্পর্কে কথা বলার সময় রাখা উচিত সেটাও ভুলে যাচ্ছে? আমি কিছুই দেখিনি তখনো। কারন হঠাৎ দেখলাম আমার বন্ধুটির আবেগ ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ স্ট্যাটাসটি নেই। যাতে সমীরদার ভূমিকা তার লেখার জীবনে সেইসব লেখা ছিলো। সেটি কোন জাদুবলে বদলে গিয়ে দেখি এক জ্ঞানগম্ভীর প্যারাগ্রাফ হয়ে গেছে। যাতে সমীর রায়চৌধুরীকে লোকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচয়ে চেনে এটা লজ্জাজনক। উনি বাংলা কবিতার জগতে অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। উনি এবং প্রভাত চৌধুরী পোস্টমডার্ন তত্ত্বকে বাংলা কবিতার জগতে এনেছিলেন। এবং বন্ধুটির নিজস্ব তত্ত্ব র অনেক্টাই ঋণ আছে সমীররায়চোউধুরীর অধুনান্তিক ও প্রভাত চৌধুরীর উত্তর আধুনিকের কাছে। এইসব লেখার পরে নিউটনের সূত্রের মতো যা থাকে সব লেখার শেষে, যে আজকে শ্রীজাত অর্ণবদের হাতে বাংলা ভাষার এই দশা, ব্লা ব্লা ব্লা।

আমি বহুক্ষণ বিশ্বাস করতে পারিনি এটা কি আমি ঠিক দেখলাম? আপনাদের মনে হতে পারে সেই কর্দম অনুরাগে এই প্রসঙ্গ তুললাম। না, একেবারেই নয়। আজকে সমীর রায়চৌধুরী না থাকলে আমি এখন আপনাদের সামনে বসে এই যে ডাঁটের সাথে কাউকে পরোয়া না করে বাংলা লেখার জগতের কথা লিখছি, তার জায়গায় এক ফ্রাস্ট্রেটেড ব্যার্থ ভিজিলান্তে হয়ে ঘরে বসে মদ খেতাম আর আনন্দবাজারের মুণ্ডপাত করতাম। সমীরদা মৃত্যুর পরেও কাজ করে গেছেন যাচ্ছেন বাংলা ভাষার জন্য।আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিলাম যখন শঙ্করদা আমাকে ইন্টারভিউর একটি এডিটেড অংশ শুনিয়েছিলেন। তাতে আমাকে ও আরো কয়েকজন শূন্যকে নিয়ে আলোচনা ছিলো। কি দুরন্ত গভীরভাবে উনি আমার লেখার সাথে বাকি কয়েকজনের কম্প্যারেটিভ আলোচনা করে যাচ্ছেন যেন আমাকে আপাদমস্তক চেনেন। অনেকের প্রশংসা প্রচারের লোভে রুচিবোধ নষ্ট হয়ে যায়। আমার কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ একজন বিরাট বড়ো মানুষের দেওয়া ওই দায়িত্ব ওই সম্মান। সেটি সর্বসমক্ষে আনার কথা ভাবিও নি, আজও ভাবিনা। মিথ্যেবাদী বলে অপবাদ দিলেও ভাববো না। হ্যাঁ, দীপঙ্কর রঙ্গন বিশ্বরূপদা, এইরকম অল্প কিছু মানুষ দেখেছেন ক্লিপিংস আমার ল্যাপটপে। অনেকটাই দেখেননি। কারন সেগুলি আরো নানা সূত্র থেকে পাওয়া, যার মধ্যে প্রচুর প্রচুর কথা আমাকে বলে গেছেন উনি। বলা যায় এক আশ্চর্য উত্তরাধিকারের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আর কি মহৎ প্রাণ, তার মধ্যে আত্মসমালোচনাও রয়েছে, ওনার নিজের ভাবনার কোথায় ভুল হয়েছিলো তা নিয়েও কথা রয়েছে। আর বিস্ময়ের সর্বোচ্চ জায়গাটি পেলাম যখন বৈদ্যনাথ দা আমার বাড়িতে এলেন। কাঁটা দিচ্ছে গায়ে বলতে বলতে। বৈদ্যনাথদা সমীরদার শেষের তিরিশ বছরের একান্ত সঙ্গী ছিলেন। উনি মারা যাওয়ার আগে হাওয়া ৪৯ এর ভবিষ্যৎ সংখ্যাগুলিতে কি কাজ হতে পারে। তা নিয়ে এক বিস্তারিত নির্দেশ দিয়ে গেছেন বৈদ্যনাথদাকে। এবং তার মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ একটি অংশ ছিলো ওনাকে বলে গেছেন আমার সাথে যোগাযোগ করতে এবং আমাকে দিয়ে লেখাতে, সেগুলির কারন, আমার লেখা নিয়ে কথা ইত্যাদি। এই সমস্ত পর্ব, এই মহান মানুষটির এমন অসাধারণ ডেডিকেশান আমি জানতে পারছি যখন তখন উনি নেই। আজকে “লুনাটিকা” ও শারদীয়া মধ্যবর্তী একত্রে একটি মস্তো সাফল্য পেয়েছে। যার কথা লিখতেই আমি বসেছি। এবং আজকে সমীরদা হয়তো সবচেয়ে খুশী হতেন সেটি শুনলে। কারন এই সাফল্যটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, ব্যাক্তিকেন্দ্র থেকে শুরু হয়ে পরিধির দিকে ব্যপ্ত হয়ে গেছে। কেন্দ্রিকতা ভেঙে বেড়ে উঠেছে। আমার অন্যতম প্রিয়জন বিশ্বরূপ দয়ে সরকার এমনই এক আদর্শে বিশ্বাস করেন। সমীরদা এমনই এক স্বপ্ন দেখতেন বাংলা ভাষা নিয়ে। আর কে জানে কেন দুজনেরই অহেতুকী ভরসা আর স্নেহের পাত্র এই নরাধম। একজন তার মধ্যে প্রয়াত হওয়ার পরও আমাকে অকূলবিস্তারী স্নেহ ভালোবাসা শক্তি দিয়ে চলেছেন। এমন এক অবস্থায় আমি কি করে হেরে যেতে পারি???

লং লিভ আলিবাবা || অলোক গোস্বামী

২০০৩ তে শিলিগুড়ি থেকে শুরু করেছিলাম ‘গল্পবিশ্ব ’পত্রিকা সম্পাদনা করা। নামকরণেই মালুম হওয়াটা স্বাভাবিক যে ওটা ছিল গল্প পত্রিকা। তবে নিছকই গল্প ছাপাছাপিতে সীমাবদ্ধ ছিলনা সেই প্রচেষ্টা, গল্প সংক্রান্ত আলোচনাও প্রাধান্য পেত সেখানে। ‘ডার্করুম’ বিভাগে থাকতো লেখকদের গল্প বিষয়ক চিন্তাভাবনা। কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বর্হিবঙ্গের বাংলা গল্প চর্চার আলোচনাও। অর্থাৎ বাংলা ছোট গল্পের সাম্প্রতিকতম চিত্রটা তুলে ধরার কাজে আমাদের প্রচেষ্টা ছিল আন্তরিক।

তো, পরপর পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর ২০০৮ তে ষষ্ঠ সংখ্যার বিষয় বেছে ছিলাম-ব্যতিক্রমী সাহিত্য। কারণ হিসেবে সম্পাদকের কলামে লিখেছিলাম--“ব্যতিক্রমী সাহিত্য-এই অভিধাটির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের দীর্ঘ দিনের পরিচয়। এই তকমা কবে চালু হয়েছিল কে জানে! তবে এটি আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব যে গবেষক তথা আলোচকদের সে কথা বলা বাহুল্য মাত্র। কিছু লেখকের ক্ষেত্রে উক্ত  অভিধাটি প্রয়োগ করে  আমাদের  চিনিয়ে দিয়েছেন উনি/ওঁরা ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক। সাহিত্যের মূলস্রোতের বিপরীতে তাদের অবস্থান।

এই বিভক্তিকরণ আমরা  অর্থাৎ পাঠকেরা নির্বিচারে মেনেও নিয়েছি। এই বিভক্তিকরণের পদ্ধতি তথা  প্রয়োজনীয়তা নিয়ে  কখনই প্রশ্ন তুলিনি। পাঠকদের কথা বাদ দিয়েও বলা যায়, উক্ত লেখকদেরও যে এহেন বিভক্তিকরণে যে আপত্তি রয়েছে তেমন কোন প্রমাণ চোখে পড়েনি। অথচ প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল, কোনটা ব্যতিক্রমী সাহিত্য? কোন নিরিখে ব্যতিক্রমী--বিষয়,নাকি ভাষা,নাকি বাণিজ্যিক মাপকাঠিতে? নাকি ওই বিশেষণ চালু করার পেছনে থোড়-বড়ি-খাড়া সমৃদ্ধ বাজার চালু ফর্মুলাটিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো গূঢ় অভিসন্ধি রয়েছে!

এমন প্রশ্ন ওঠাটাও অস্বাভাবিক ছিলনা যে কোনটা তবে মূলস্রোতের সাহিত্য? যে নদীটির তীরে সাহিত্য সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিল সেই সরস্বতীই যখন লুপ্ত হয়ে গিয়েছে,যখন আদি গঙ্গার অপর নাম টালি নালা তখন ‘মূলস্রোত’ বিশেষণটিও কি নিছক শব্দ জঞ্জাল নয়?”

আমার মতো আরও অনেক পাঠকের সংশয় দূর করার জন্য ওই সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং গল্প। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ওরকম একটা আখাম্বা বিশেষণের জন্য শুধু এটুকুই যে যথেষ্ট নয় সেটা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম এমন এক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করার যার চিন্তা ভাবনা বাজার নির্দিষ্ট নয়। যিনি সাহিত্যের বিভিন্ন প্রবণতা  বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখেন। যিনি যতটা ভাবতে পারেন,ভাবিয়ে তুলতে পারেন তারচে’ও বেশী। আলোচনা প্রসঙ্গে যিনি কোনো ব্যক্তিগত অসূয়ার ধার ধারেন না। যার কাছে কোনো রচনাই অপ্রাসঙ্গিক নয়।

বন্ধুরা যথারীতি আমার ওই আকাঙ্খাকে মহতি আহ্লাদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা তাদের খোঁজে তেমন কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব ছিল না যা কিনা আমার ছিল। সমীর রায়চৌধুরী। আমি জানতাম  গল্পবিশ্বের ওই  সংখ্যায় সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা কতটা অনিবার্য।  

আমার এহেন প্রস্তাবনায় সেদিন অনেকেই ভ্রু কুঁচকে ছিলেন, হঠাৎ সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে কেন! কী লিখেছেন ভদ্রলোক? কী দাম আছে ওঁর কথাবার্তার? থান ইঁট মার্কা উপন্যাস আছে? ঝুলিতে মেডেল,আকাদেমী চেয়ার, পার্টি মেম্বরশিপ, এনি থিং?

যাদের হাংরি সংক্রান্ত কেচ্ছাতিহাস জানা ছিল তারা মুচকি হেসে বলেছিলেন,“উনি তো জাস্ট মলয় রায়চৌধুরীর দাদা! আর কী আছে ওঁর? কখনো সুনীল শিবিরে কখনও শৈলেশ্বর শিবিরে ব্যালেন্স করে চলেছেন.।”

না, তাদের বিস্ময় কিংবা ধ্যানধারণা আমাকে অবাক করেনি। এমন কী মন্তব্যগুলোও আহত করেনি। বরং স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। কেননা বছর বারো আগে আমি নিজেও তো ছিলাম ওই বিস্মিতের তালিকায়। ‘সমীর রায়চৌধুরী’--নামটার সঙ্গে আমার পরিচয়ও তো শুধু  মাত্র হাংরি সাহিত্যের ইতিহাস মারফতই হয়েছিল এবং যে পদ্ধতিতে হয়েছিল সেটাকে আদৌ পরিচয় বলা যায় কিনা সন্দেহ।

পরিচয়ের সুযোগটা ঘটলো নয়ের দশকের মাঝামাঝি। একটা পোস্টকার্ডে আচমকাই মলয় রায়চৌধুরী জানিয়ে ছিলেন,“ আমার দাদা কোলকাতার বাঁশদ্রোণীতে থাকেন। হাওয়া ৪৯ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। যোগাযোগ কোরো।”

বিশদ ঠিকানা থাকা সত্বেও তক্ষুনি যোগাযোগ করিনি। কিংবা বলা ভালো প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণ তিনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা। প্রথম আলাপেই মলয়ের অহঙের সুউচ্চ রেলিং পেরুতে পারিনি। নেহাৎ ওঁর কলম দক্ষতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খর্ব করতে পারিনি তাই সম্পর্কটুকু বজায় রেখেছিলাম। তাবলে মলয়ের দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে কেন! যিনি কিনা আবার উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মি ছিলেন  তাঁর অহঙ্কারও কি কম কিছু হবে? তাছাড়া  কি এমন লিখেছেন ভদ্রলোক যে গাল বাড়িয়ে চড় খেয়ে আসতে হবে!

কিন্তু  সময়ের দাবীকে কে-ই পেরেছে অগ্রাহ্য করতে? মাস কয়েক পর কোলকাতা যাবার সুবাদে ঢুঁ মেরেই বসলাম সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে। তাবলে আচমকা নয়। টেলিফোনে আগাম কথা বলে ওপারের কন্ঠস্বরকে রীতিমত স্ক্যান করে বুঝে নিতে চেয়েছিলাম, যাওয়াটা কতদূর সম্মানজনক হবে।

সপরিবারে এসেছি শুনে আমন্ত্রণটাও পেয়েছিলাম  সপরিবারেই কিন্তু ঝুঁকি নিতে পারিনি  কেননা বিভিন্ন লেখক দাদাদের সৌজন্যে জোটা পূর্ব অভিজ্ঞতা খুবেকটা সম্মানজনক ছিল না। সুতরাং নিশ্চিন্ত হতে পারিনি টেলিফোন এবং আমার কানের বিশ্বস্ততা বিষয়ে। একা একা গিয়ে ঢুঁ মেওে আসাটাই শ্রেয় বোধ করেছিলাম।

তখনও শহীদ ক্ষুদিরাম স্টেশান চালু হয়নি, মেট্রোর দৌড় টালিগঞ্জ অবধি। কোলকাতার অন্ধিসন্ধিও তেমন চেনা না থাকায় লাট খেতে খেতে হাজির হয়েছিলাম শ্রী রায়চৌধুরীর ব্রহ্মপুরের বাড়িতে। অনেক জমি এবং কিছু গাছপালাসহ দোতলা বাড়িটা দেখে মনে হয়েছিল ভদ্রলোক যথার্থই সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের উত্তর পুরুষ। গেট পেরিয়ে বেশ কিছুটা ভেতরে  ঢুকে  কলিং বেলে বাজানোর পর যিনি বেরিয়ে এসে ছিলেন তাঁকে দেখে আমার পূর্ব ধারণাটাই পাকাপোক্ত হয়েছিল। প্রায় ছ’ফুট,নির্মেদ,টকটকে চেহারা। গোঁফদাড়ি নিখুঁত কামানো। মাথা ভর্তি কালো চুলে এক চিলতে সাদার নিখুঁত আভিজাত্য।

স্বপরিচয় পেশ করতেই যে প্রশ্নটার সম্মুখীন হলাম সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

--ওরা কোথায়?

--কে! কারা?

--তোমার স্ত্রী,কন্যা? ওঁদেরও তো আসার কথা ছিল! 

--না, মানে ইসে, মানে হঠাৎ আমার পিসী......।

প্রস্তুতি বিহীন মিথ্যে যে কতটা অপ্রস্তুত করার ক্ষমতা রাখে সেটা সেদিন প্রতি পদে টের পেয়েছিলাম কেননা এরপরই মে  হাজির হয়েছিলেন শ্রীমতি বেলা রায়চৌধুরী এবং একই প্রশ্ন সহ।

এবারও একই রকম ভঙ্গীতে মিথ্যে সংবাদ পেশ করেছিলাম, তবে ততক্ষণে যেটুকু সপ্রতিভতা জোগার করতে পেরেছিলাম তার ওপর নির্ভর করে বলে ফেলেছিলাম,“আছি তো কয়েক দিন, আসা যাবে না হয় ফের একদিন।”

খোঁড়া অজুহাতটাকে  ল্যংড়াতে দিলেন না রায়চৌধুরী দম্পতি, নিমিষে লুফে নিলেন,“ ঠিক আছে, কবে আসবে বলো?

এরপর আর কথার খেলাপ করিনি। দিন দুয়েক পরই কপাল ঠুকে হাজির হয়েছিলাম স্ত্রী এবং চার বছরের কন্যা সহ। এবার ওঁদের দুজনের ঠোঁটেই চওড়া হাসি। শুরু হলো জম্পেশ গল্প গুজব। বিদায় নিয়েছিলাম নৈশাহারান্তে।

সেই শুরু। আমার সেই চার বছরের কন্যা  চব্বিশ বছুরে হওয়ার পরও সেই ধারা  বহমান ছিল। এই সেদিনও শোবার ঘরের বিছানার পাশে আমরা চারজন,মশারীর ভেতর বালিশ নির্ভর সমীরদা। আলোচনা যথারীতি গড়াচ্ছে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। সাহিত্য-সিনেমা-প্রেম-রাজনীতি, কী নয়! এবং যথারীতি সেদিনের আড্ডারও সমাপ্তি অধিবেশন বসেছিল ডাইনিং টেবিলে। শুধু দুটো বিষয়ে খানিকটা ভিন্নতা ছিল।

(১) সেদিন সমীরদা এসে বসতে পারেননি ডাইনিং টেবলে, দেখাতে পারেননি গৃহিনীপণার নমুনা।

(২) বিদায় কালে এসে দাঁড়াতে পারেননি বারান্দায়। ঘাড় উঁচু করে দেখতে পারেননি আমাদের বিদায় পর্ব।

কারণ সমীরদা তখন শয্যাশায়ী। 

থাক সেসব ব্যক্তিগত কথা। আপাতত ফিরে যাওয়া যাক সেদিনের কথায়। তো, সেদিন সমীরদা জানতে চেয়েছিলেন আমার লেখালিখি সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা বিষয়ে। নিজস্ব চিন্তার খানিকটা অংশ শেয়ারও করেছিলেন। বলাবাহুল্য সেসবের অনেকটাই আমার মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, মানুষটি ভিন্ন গোত্রের। মাথায় পোকা পোষেন এবং সেগুলো যাতে ঝিমিয়ে না পড়ে তাই  নিয়মিত খাদ্য জোগানও দিয়ে থাকেন। নিজস্ব ভাঁড়াড়ে টান পড়লে  অন্য মাথা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করেন। সেই সুযোগে কয়েকটি পোকা চালানও করে দিয়ে থাকেন সেই মাথায়। সেই মাথাওয়ালা মানুষটি যদি চালাক হয়ে থাকেন তবে রায়চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দি পেরুনো মাত্র সেই পোকাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিতে কসুর করেন না।

তবে সবাই পারে না। আমিও পারিনি। হয়তো পারতাম যদি না প্রথম আলাপেই তখনও অবধি সমীরদার একমাত্র প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, “সিগারেটের তিরোভাব” সংগ্রহ করে না  আনতাম।

যে কোনো গল্প কিংবা কবিতা সংকলনের পাতা উল্টে প্রথমেই নাম গল্প/কবিতাটি পড়ে নেয়ার অভ্যেস আমার চিরকালের। সেই রীতি অনুসারে প্রথম পড়েছিলাম ‘সিগারেটের তিরোভাব’ গল্পটি। গল্প নাকি ধাঁধা! এর নাম গল্প! কিসের গল্প এটি, সিগারেট ছাড়ার? নাকি শিশু মনস্তত্বের? নাকি মৃত্যুর!!!

গল্পটি যেহেতু সদ্য লেখা তাই এরপর পড়তে চেয়েছিলাম পুরোন গল্পগুলো। বুঝতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের বাঁক বদলের ধরণ।

সবচে পুরোন গল্প ছিল,‘স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা অমলেট অবধি।’ আমার ধারণা ছিল লম্বা টাইটেলের স্রষ্টা শুধুই সুবিমল মিশ্র কিন্তু এই গল্পটি প্রমাণ করে দিলো সেই ১৯৫৭ তেই নিয়ম ভেঙেছিলেন সমীরদা। সেই নিয়মভঙ্গ শুধু নামকরণে নয়, বিষয়েও। এখানেও সেই একই ধাঁধা, কিসের গল্প এটা? আসন্ন মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মায়ের ছবি খোঁজা দিয়ে গল্পটি শুরু হলেও অন্তিমে সেই প্রসঙ্গ বেমালুম উধাও। মাঝখানের পর্বে পাঠককে সঙ্গী করে দৌড়ে বেরিয়েছেন এ গলি-সে গলি,এই সময়-সেই সময়। অথচ পাঠান্তে আদৌ গল্পটিকে অবান্তর ভাবা অসম্ভব। বরং নামকরণের সার্থকতা বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে হয়। মেনে নিতে হয়,সত্যিই তো, যে কোনো স্মৃতির যাত্রা এক সময় অমলেট পর্বে এসেই থেমে যায়। বাকি পর্বটির দখল নেয় বর্তমান তথা জীবন। যদিও এই ভাবনার জন্ম  দিতে আমাকে আরও দীর্ঘ দিন সমীর সঙ্গ করতে হয়েছিল। সেদিন বরং ধাঁধিয়েই গিয়েছিলাম।

সপ্রতিভ মানুষ যেহেতু ধাঁধাঁ পছন্দ করে না তাই নিজেকে মুক্ত করতে পরপর পড়েছিলাম,‘টিনিদির হাত,’‘দ্বিতীয় সংখ্যা,’‘অতিক্রম’,‘সমরেশ কিভাবে অপেক্ষা করে,’‘মাথার ওপরে দাদা আছেন’। সব ক’টা গল্পেরই রচনাকাল পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক এবং সব ক’টা গল্পই আমাকে বাধ্য করেছিল ভাবতে, জন্মসূত্রে এবং জীবিকা সূত্রে বরাবর পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য জগত থেকে দূরে থাকা মানুষটি কিভাবে খুঁজে পেল সাহিত্যের এই নতুন ভাষা যা কিনা নির্দিষ্ট ভূগোলে আবদ্ধ থাকার বদলে আন্তর্জাতিকায় পৌঁছে গিয়েছে!

‘আন্তর্জাতিকতা’,এই অভিধাটি মাথায় এসেছিল,‘জলছবি’ গল্পটি পড়ে। কেননা সেই ১৯৬৩ তে যে ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছিলেন সমীরদা তার সঙ্গে ভারতবর্ষের পরিচয় ঘটেছে আশির দশকে, প্রায় কুড়ি বছর পর, মার্কেজের হাত ধরে। অত দিন আগে সমীরদা কিভাবে পেয়েছিলেন ওই কৃৎকৌশলের সুলুক সন্ধান!!

গল্পটি জন্ম দিয়েছিল অনেক ক’টি বিস্ময়ের।

প্রথম বিস্ময় জেগেছিল এই তথ্য জেনে যে,আপাদ মস্তক কবিতা পত্রিকা,‘কৃত্তিবাস’ নিয়ম ভেঙে সেই প্রথমবার গল্প প্রকাশ করেছিল এবং সেই নিয়মভঙ্গ ঘটেছিল,‘জলছবি’-র হাত ধরেই?

দ্বিতীয় বিস্ময়ের কারণ ছিল গল্পটির নির্বাচন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছিলেন গল্পটি! সত্যিই ভালো লেগেছিল! মনে হয়েছিল,ওই গল্পটি নিয়মভঙ্গের দাবী রাখে!

তৃতীয় বিস্ময় জেগেছিল এই ভেবে যে, সুনীলবাবু যদি সত্যিই গল্পটিতে আগাম বাঁক পরিবর্তনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করে থেকে থাকেন তাহলে নিজে,অন্ততঃ একটি গল্প, ওই ধারায় লিখলেন না কেন? সমস্ত প্লেটে ছোঁ মারা তো ওঁর প্রাচীন অভ্যেস! তবে কি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওটা তাঁর চায়ের কাপ নয়!

কিন্তু কে ঘোচাবে আমার ওইসব বিস্ময়! সমীর রায়চৌধুরীর মতো লেখকদের জন্য যেহেতু এ.টি.দেব কিংবা অসিত বাঁড়ুজ্জেরা থাকেন না তাই সব বিস্ময় ঘোচাতে খোদ ওঁরই শরণাপন্ন হয়েছিলাম।

না, প্রথমে নিজের লেখার স্বপক্ষে একটি কথাও বলেননি সমীরদা। বরং অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। শুনতে চেয়েছিলেন আমার কথা। সাহিত্য নয়, জীবনের নানান প্রসঙ্গে। খোস গল্প প্রিয় আমি সুযোগ পেয়ে ঝাঁপি খুলে বসেছিলাম। বাপের বয়সী মানুষটির মুখে প্রশ্রয়ের হাসি দেখতে পেয়ে কোনো রকম সেন্সরশীপের ধার ধারিনি। অনেক গল্পের শেষে সমীরদা বলেছিলেন,“ছোট গল্প এরকমই হবে।”

এহেন আলটপকা মন্তব্যে অবাক হয়েছিলাম।

--কি রকম!

--যেভাবে এতক্ষণ গল্প করলে। যেভাবে এতক্ষণ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে তুমি নিজেকে আমার কাছে পেশ করলে, ঠিক সেই ভাবে।

--তা কি করে হয়! উপন্যাস হ’লে তবু নাহয় কথা ছিল, ছোট গল্পে আবার তেমনটা হয় নাকি! গল্পের আদি-মধ্য-অন্ত থাকবে না?

--না থাকবে না। জীবন তো ওভাবে পর্বে পর্বে ভাগ হয়ে আসে না, তাহলে সাহিত্য কেন হবে?  সাহিত্য আর জীবন আলাদা নাকি! তাই সাহিত্যেও থাকবে  মুক্ত সূচনা আর মুক্ত সমাপ্তি। তোমার গল্প দিয়ে তোমাকে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন নেই বরং পাঠকৃতি দিয়েই পাঠক বুঝে নিক তার মতো করে। তুমি শুধু ভাবনার সংঘাতগুলো মেলে ধরো।

আরো অনেক অনেক কথা বলেছিলেন সমীরদা। অনেক কিছ্রুই অর্থ বুঝতে পারিনি। শুধু কানে বেজেছে, ‘পোস্ট মর্ডান,’পোস্ট কলোনিয়ালিজম,‘অরৈখিক’, ‘রাইজোমাটিক,’‘কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ভাবনা,’‘ক্যায়স,’ ইত্যাদি প্রভৃতি শব্দগুলো। শব্দগুলো আমার কাঁধে এতটাই বোঝা হয়ে চেপে বসেছিল যে ভার মুক্ত হ’তে ফোনে কথা বলেছি, ছুটে এসেছি কোলকাতায়। প্রকৃত শিক্ষকের  মতো  তিলে তিলে বুঝিয়েছেন সমীরদা। বোঝার সুবিধের জন্য  বিভিন্ন লেখা থেকে উদাহরণ পেশ করেছেন। না, একবারের জন্যও নিজের লেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। বরং এমন লেখকদের কোট করেছেন যারা কি না সমীরদার ভিন্ন শিবিরের লোক। যদিও সমীরদার কোনো নিজস্ব শিবির ছিল না কিন্তু ওই লেখকরা তেমনই মনে করতেন। অথচ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত  সমীরদার মুখে কোনো লেখক সম্পর্কে তাচ্ছিল্য সূচক কোনো মন্তব্য শুনিনি, তা  তিনি বা  তাঁরা যতই হাটুরে কিংবা বাজারে লেখক হোন কিংবা সরাসরি সমীর রায়চৌধুরী বিরোধী।

সমীরদার কথা শুনতে শুনতে ভেবেছিলাম, ধুর,আমি একা কেন ভেবে মরবো? আমার মতো তো আরও অনেকে আছেন যারা সাহিত্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। ঐকিক নিয়মের সূত্র মেনে আমার কাঁধের বোঝাটাকে আরও দশজনের কাঁধে চালান করে দিলে কেমন হয়?

বলা ভালো, গল্পবিশ্ব পত্রিকা আমাকে সুযোগ দিলো সেই পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করার। কিন্তু শুধু পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করলেই তো হবে না, সেটাকে সার্থকও করতে হবে। কিভাবে সম্ভব হবে সেটা? সর্বার্থে দীর্ঘ মানুষটিকে ক্রোড়পত্রের সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠায় আঁটানো কি চাট্টিখানি কথা!

প্রথম সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম--ক্রোড়পত্রে সমীর রায়চৌধুরীর কোনো গল্প মুদ্রিত হবেনা। কারণ ওঁর রচনা বিষয়ে যারা ওয়াকিবহাল নন তারা একটি কিংবা দুটি লেখা মারফৎ ওঁকে শনাক্ত করুক, তেমনটা আমার অভিপ্রেত ছিলনা। বরং পড়াতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর কথাবার্তা, সাক্ষাতকার এবং সমীর সাহিত্য বিষয়ে অন্যান্যদের চিন্তা ভাবনা। যদি কোনো পাঠক আকর্ষণ বোধ করেন তাহলে তিনি নিজ গরজেই খুঁজে নিয়ে পড়বেন সমীর রায়চৌধুরীর গল্প--চেয়েছিলাম এমনটাই। অর্থাৎ ভাবনা চালান।

বলাবাহুল্য আমার  পরিকল্পনাটাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কারণ সমীর ঘনিষ্ঠরা প্রত্যেকেই জানেন, রাশি রাশি লিখে সম্পাদকের হাতে গুঁজে দেয়ার চে তাদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা সাহিত্য সংক্রান্ত কথাবার্তায় কতটা আন্তরিক ছিলেন সমীরদা। কতটা আগ্রহ ছিল মত বিনিময়ে এবং বিতর্কে।

দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সমীর সাহিত্য বিষয়ক লেখক তালিকায় মলয় রায়চৌধুরী থাকবেন না। কেননা আমি চেয়েছিলাম সেই সমীর রায়চৌধুরীকে যিনি স্ববলে বলীয়ান। উনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা, এটা নিছকই ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে পরিগণিত হোক।

আমার দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়েছিল সমীরদার। কেননা ‘আমি’ বিরোধী ‘আমরা’ প্রিয় সমীরদার  নিজের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। তাছাড়াও যে সমস্যাটা প্রধান হয়ে উঠেছিল সেটা হলো ততদিনে উনি মলয় রায়চৌধুরীকে লেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেলেছিলেন। মলয়ের মতো এক প্রধাণ লেখককে আমন্ত্রণ জানানোর পর সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়া যে কতটা অসম্মানজনক সেটা আমিও জানতাম। তবু নিজের সিদ্ধান্তে  এতটাই অটল ছিলাম যে সমীরদা বাধ্য হয়েছিলেন আমার জেদটা মেনে নিতে। এই প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীর ভুমিকাও যথেষ্ট ধন্যবাদ যোগ্য কেননা ব্যাপারটাকে তিনিও প্রেস্টিজ ইস্যু করেননি। আমার সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিয়ে অন্য একটা গদ্য দিয়েছিলেন।

সমীরদার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত মুষ্টিমেয় অথচ বিশিষ্ট লেখকদের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম বেলা রায়চৌধুরীকেও। কেননা  বৌদিকে না দেখলে হয়তো ‘সহধর্মিণী’ শব্দটার ওপর ততটা আস্থাবান হোতে পারতাম না। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট নমুনা পেশ করাটা সঙ্গত বোধ করছি। এই সেদিনও, যখন ঘোর অসুস্থ সমীরদা, তখনও আমাদের গল্পগুজবে কোনো আপত্তি তোলেননি বৌদি। বরং বলেছেন,“তোমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারলেই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে সমীর। আমি জানি এটাই ওর আসল ওষুধ।”

সেই ক্রোড়পত্রে অন্য লেখাগুলোর পাশাপাশি প্রকাশ করেছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর সাক্ষাতকার। অবশ্য সেটাকে সাক্ষাতকার বলাটা কতদূর সঙ্গত, সে বিষয়ে আমি আজও নিশ্চিত নই। বরং বলা ভালো সেসব ছিল একগাদা উৎপটাং প্রশ্ন, যা কিনা আম পাঠকের মনে আকছার জেগে ওঠে।

যথারীতি বিরক্ত হননি সমীরদা। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সেসব উত্তরের সাপেক্ষে কোনো মাতব্বরকে কোট করেননি, নিজস্ব জারণ-বিজারণ মারফত পাওয়া অভিজ্ঞতা সমূহকেই পেশ করেছিলেন।  

দীর্ঘ সাক্ষাতকারটি উদ্ধৃত করা অসম্ভব এবং অহেতুক। তবু খানিকটা নমুনা পেশ করার লোভ সামলাতে পারছি না।

--“আধুনিক গল্পবিশ্বে লেখকেরা কল্পনা করতেন স্বপ্নদেশের। সমস্ত কিছুই সেখানে ইউটোপিয়াকে কেন্দ্র কেের আবর্তিত হত। রচনার গঠনতন্ত্র, বক্তব্য,ভাষা সব ছিল ললিত,নান্দনিকতত্ত¡ দ্বারা পীড়িত। পোস্টমডার্ন কালখন্ডে প্রথমেই যা ঘটল, তাহল এই ইউটোপিয়ান  কনসেপ্টের দেয়াল ভেঙে পড়া। নান্দনিকতার অপর প্রান্ত, সৌন্দর্যের অপর প্রান্ত, শান্তিপ্রিয়তার অপর প্রান্ত --সব জায়গায় অধুনান্তিক লেখকেরা পৌঁছে যেতে লাগলেন। মডার্ন পরিসরে মানুষ কেবল বুঝত হ্যাঁ অথবা না। পোস্টমডার্ন পরিসরে পাঠক এর মধ্যিখানে থাকা অনির্ণীত বিশ্বটিকে আবিস্কার করলেন....দ্যাখো, সাহিত্যে আর শিল্পে আমি মনে করি কেউ কাউকে অতিক্রম করেনা বা বিপ্রতীপ অবস্থান হয়না...বরং উত্তোরত্তর...কন্টিনিউটির ভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করে বা আবিস্কার করে...একটা উত্তরাধিকার নিয়ে সে জন্মায় এবং তারপর সে  নিজের অর্জনকে যোগ করে,তারপর প্রকাশ করে...ইমলিতলা আমার একটা উত্তরাধিকার..তেমনই মহাভারত...উপনিষদ উত্তরাধিকার...সাহিত্যে কাউকে কাউকে বাদ দিয়ে কাউকে কাউকে বেছে নেব কেন? কে আমার পূর্বপুরুষ নয়? আমি তো অভেদের কথা বলি....এরকম কেউ কেউ ভাবে-হাংরিতে থাকলে কৃত্তিবাসকে আক্রমণ করতে হয়,বা হাংরিকে আক্রমণ করতে হয় বা পোস্টমডার্নকে আক্রমণ করতে হয়,ব্যাপারটা ঠিক নয়,ব্যাপারটা হচ্ছে অতিক্রম করার তত্ত¡...একটাকে বড় করে অন্যটাকে হেয় করে দেখার চেষ্টা করাটা ঔপনিবেশিক ধরতাই। প্রগতিবাদীর যে তত্ত¡,রৈখিকতার যে তত্ত¡--সেটাতে বিশ্বাস করলে এই আক্রমণ বা অসন্তুষ্টির কথা ওঠে....এখন আমি মোটেই লেখা নিয়ে আন্দোলনের কথা ভাববোনা ... সেই কন্ডিশনগুলো এখনও আছে কিন্তু অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে আমরা সবাই শিখে গেছি...শিখেয়েছে আন্দোলনগুলো...অতএব আন্দোলনগুলোকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা যায়না...আজ একজন রাজনৈতিক নেতা যখন লগ্নীকারীকে স্বাগতম জানান আমার সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধে হয়না...আমি এইজন্য বুঝি যে ঐ জায়গাটাতে যেখানে তিনি আগে ছিলেন সেই জায়গাটাতে আজ পারফর্ম করা যেতে পারেনা...আধুনিকতা ফুরিয়ে যায়নি....আমরা আছি ভেরী মাচ আধুনিকতার মধ্যে...কিন্তু আধুনিকতার মধ্য থেকে বেরিয়ে যে জায়গায় আমরা যেতে চাইছি....যে পরিসরে পৌঁছতে চাইব...সেই অবস্থাপন্নতাকে আবিস্কার করছি।”

গল্পবিশ্বও সেই সংখ্যাটা কতটা সার্থক হয়েছিল সে সম্পর্কে মতামত দেয়া আমার ক্ষেত্রে শোভন নয়। তবে সম্পাদক হিসেবে এটুকু দাবী করতেই পারি, সমীর রায়চৌধুরীর সাহিত্য নিয়ে সেটাই ছিল প্রথম কাজ। তারপর আরও কেউ কেউ। ভবিষ্যতে অবধারিত ভাবেই আরও অনেকেই করবেন। করতে বাধ্য থাকবেন। 

আমার এই দাবীকে কারুর যদি বাহুল্য মনে হয় সেক্ষেত্রে আমি তাকে অনুরোধ করবো সমীর রায়চৌধুরীর প্রকাশিত শেষ গল্প সংকলনটা পড়ে দেখতে। জীবনভর যে সত্যের অনুসন্ধান করেছেন সমীরদা, খুঁজেছেন যেসব জটিল প্রশ্নের উত্তর, সেসব কিছুই এই বইয়ের দু মলাটের ভেতর বন্দী করে গিয়েছেন। জ্ঞানের ব্যক্তিগত মালিকানাকে  প্রকৃত মৌলবাদ হিসেবে বিবেচনা করা বইটার নামকরণও যথার্থ --খুল যা সিমসিম। অর্থাৎ সেই রত্নগুহায় প্রবেশ মন্ত্রটা জনসমক্ষে ফাঁস করে  দিয়ে সমীরদা বলতে চেয়েছেন--হে জ্ঞানতাপস, স্বাগতম।

অনেক দিন আগে নিজের একটা গল্প সংকলনের ব্যাক কভারে শ্রী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আকাঙ্খা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলা সাহিত্য কোনদিন সৎ হলে তাঁর ওই সংকলনটি পাঠক খুঁজবেন। কিন্তু সৎ-অসৎ,ভালো-মন্দ,সাদা-কালো ইত্যাদি প্রভৃতি বাইনারিতে অবিশ্বাসী সমীরদার প্রয়োজন পড়েনি,‘রেখো মা দাসেরে মনে,’ মার্কা আবেদন পেশ করার। বরং তিনি নিশ্চিত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর বইটি পড়বেনই। সেই বিশ্বাস থেকেই কোনো ধারাগোল মার্কা হেঁয়ালির পরোয়া না করে প্রচ্ছদে ঝুলিয়ে রেখেছেন একজোড়া চাবি। সেই চাবি সংগ্রাহকদের  ভিড় যে দিনকে দিন বাড়বেই সে ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত।


চিঠিপত্র


(’সুনীলকে লেখা চিঠি" বই থেকে। প্রকাশক 'তালপাতা )
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা সমীর রায়চৌধুরীর চিঠি
Bombay ২০/৫/১৯৬৩

সুনীল
         তোর দীর্ঘ চিঠি পেলাম । তোর মানসিক অবস্হা জেনে যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছি। শক্তিকে আমরাই এত বড় করে তুলেছি । এর মূল দায়িত্ব তোর, আমার ও মলয়ের । এবং এখনো আমার প্রতিটি বন্ধুকে বড় করেই তুলতে চাই আমি । শক্তিকে লেখার জন্য প্রাথমিক উৎসাহ তুইই দিয়েছিলি । বারেবারে বাহবা দিয়ে “বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি” একথা তুইই প্রথম তুলেছিস । অর্থাৎ শুধু এই যে আজ শক্তি সেকথা নিজে বলছে । চাইবাসায় থাকতেই তোকে বাদ দিয়ে শিল্পের সিংহাসনে বসার একটা ঘোরতর প্ল্যান উৎপল ও শক্তি অনেকদিন আগেই করেছিল । আমাকেও উপস্হিত থাকতে হয়েছিল এই সব আলোচনায় । পত্রিকা বের করার প্ল্যান তখনই হয়। আন্দোলনের ব্যাপারটাও মলয় বারবার তাগাদা দিতে থাকে । আমি বরাবরই কৃত্তিবাসকে ছাড়তে পারব না জানিয়েছি । নানান সেন্টিমেন্টাল কারণে কৃত্তিবাসকে আমি আমার নিজের পত্রিকা মনে করি । অনেকের মতন ‘সুনীলের কাগজ’ মনে করা সম্ভব নয় । শক্তি ও উৎপল তোকে বাদ দিয়ে ‘জেব্রা’ বার করতে পারবে কিনা মনে হয় না । অন্তত মলয় এটা হতে দেবে না। তাছাড়া সমস্ত নীচতার মধ্যেও সূক্ষ্ম বোধশক্তির দংশন শক্তিও এড়াতে পারবে না । আমাদের মধ্যে একটা ভাঙন গড়ে উঠবে এ আমার বিশ্বাস হয় না । হলে শক্তিরই প্রচণ্ড ক্ষতি হবে । টাকাপয়সার দরকার ওর শিল্পের জন্যও, শীলাও আছে, দার্শনিক ঋণও প্রয়োজন, সমীর ও মলয়কে ও সেইসঙ্গে সুনীলকে বাদ দিলে যে মারাত্মক অবস্হায় ও পড়বে তা ও জানে । আমাকে শক্তি লিখেছে ‘জেব্রা’য় তোর লেখা থাকছে । বেরোতে নাকি মাস দুয়েক দেরি । বরং উৎপলই একটু বেশিমাত্রায় তোর বিরোধী । হয়তো ঈর্ষা, হয়তো অন্য কোনো কারণ । উৎপলকে খুশি রাখতে গিয়ে হয়তো এই সব জটিলতায় শক্তি বাধ্য হচ্ছে । মলয়ের অভিমান এই যে তুই ওকে বিন্দুমাত্র স্নেহ করিস না ; নিতান্ত ছেলেমানুষী । সেবার শীলা পাটনায় ভর্তি হতে গেলে শক্তিকে পাটনায় নিয়ে যাই আমি । সেখানে মলয় ওকে এই আন্দোলন সম্পর্কে Convince করে । ছোটোগল্পে লিখেছে যে গল্পটা, তারই প্লট ও প্ল্যান মলয় শক্তিকে দেয় ( ক্ষুৎকাতর আক্রমণ )। ঠিক হয় যে কলকাতায় গিয়ে পুস্তিকা বের করে ব্যাপারটা আরম্ভ হবে । আমরা সবাই থাকবো। তুইও নিশ্চয়ই । আমাদের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা না করেই শক্তি কলকাতায় ফিরেই ব্যাপারটা আরম্ভ করে দেয় । এদিকে ট্রেনিং-এ চলে আসতে হয় আমাকে । মলয় পাটনায় । কলকাতায় শক্তি একা নানান ভাবে নিজের স্বপক্ষে সিংহাসন গড়ে তোলে ক্রমে । তুই ব্যাপারটায় যোগ না দেওয়ায়, যেটা ভুল-বোঝাবুঝিতে পেছিয়ে গেছে, আজ অবস্হা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা মলয়ও বলেছে । মলয় এখন যেকোনো রকমে তোকে চায় । ফলে হয়তো তোকে এই ধরণের আক্রমণ চালাচ্ছে । অদ্ভুত সব জটিলতা । ‘ক্ষুধার্ত’ নামে একটা কবিতা সংকলন বার করতে চায় ও । আমাকে লিখেছে তোকে পদ্য পাঠাতে বলতে । ব্যাপারটা নিজেই সম্পাদনা করতে চায়, শক্তির জটিলতা এড়িয়ে । সন্দীপনও বোধহয় একটা গদ্য সংকলন বের করবে । আমি ‘চিহ্ণ’, ‘ছোটগল্প’ ও ‘জেব্রা’র জন্য ছোটগল্প পাঠিয়েছি ওদেরই অনুরোধে ।
         খ্যাতির প্রতি শক্তির প্রলোভন চিরদিনই আছে । ওর পরিবেশ অনুযায়ী হয়তো এটা স্বাভাবিক । আসলে মানুষ না হয়েই শিল্পী হওয়া যায়, এটাই যতো গণ্ডগোলের। ছোটোলোক, নীচ ও চোরও শিল্পী হতে পারে । শিল্পী হওয়ার জন্য বরং এসব ব্যাপার সাহায্যই করে । ফলে বন্ধুত্ব, মনুষ্যত্ব নিয়ে গণ্ডোগোল বাধে ।
         এক মুহূর্তেই হয়তো শক্তির সমস্ত দম্ভ, অহংকার, নীচতা ভেঙে চুরমার করে দেওয়া যায় বাংলাদেশের কাছে । এর উপযুক্ত নজিরের অভাব নেই আমার কাছে ; কিন্তু শক্তির বিরুদ্ধে বা কারোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় কোনোদিন । আমার কতকগুলো নিজস্ব আদর্শ আছে, তা ভুল বা ঠিক হোক আমি তা নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই । প্রতিক্রিয়া হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না ।
         কৃত্তিবাসের জন্যও তোর যে আদর্শ, তাকে ধরে রাখতে হবে তোকে, আশপাশের কারো চিৎকারে বিব্রত হওয়ার কিছুই নেই । কৃত্তিবাস আমরা বের করে যাবোই । আমি ব্যক্তিগতভাবে শিল্পের চেয়ে মানুষকে বেশি ভালোবাসি । শক্তি শিল্পী হিসেবে অনেক বড়ো ও মানুষের চেয়ে শিল্পকে অনেক অনেক বড়ো মনে করে । আমি শিল্পকে পৃথক মনে করতে পারি না ।
         প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গী পৃথক হওয়াই স্বাভাবিক এবং উচিতও । শক্তি বা উৎপলের মতো কবিতা না লিখলে কবি নয়, এসব ছেলেমানুষীতে আমি বিশ্বাস করি না । শক্তির কিছু-কিছু কবিতা যেমন আমাকে উন্মত্ত  বিহ্বল করে, অলোকরঞ্জনের কোনো কোনো কবিতায় আমি তেমনই প্রস্ফূট হয়ে যাই । সেই মুহূর্তে অলোকরঞ্জনকে আমার সমস্ত সত্তার মালিক মনে হয় । কি করে তাকে অস্বীকার করি ? তেমনই হয়তো এমনও কেউ আছেন যাঁর তারাপদর পদ্যে আরোগ্য হয় । এসব শ্রেষ্ঠত্ব স্হির করার আমরা কে ? যাঁরা কবিতা পড়েন তাঁদের ওপরই, সময়ের ওপর, এসব ছেড়ে না দিয়ে নিজেদের ঢাক ঢোল নিয়ে কাড়াকাড়ি করার কি যে সুখ আমি বুঝি না । এসব চালিয়ে গেলে শক্তি অনেক বড়ো ভুল করবে । যতো বড়ো হতে পারে ও তাকে নিজ হাতে খর্ব করবে । হয়তো অ্যালেনের বিশ্বজোড়া নাম দেখে ও কিছুটা উত্তেজিত হয়েছে । একথা শক্তি কয়েকবার বলেওছে আমাকে ।
         জুনে পনেরো তারিখে এখান থেকে রওনা হয়ে সতেরো তারিখে চাইবাসা পৌঁছোব। তুই আয় না তখন । শক্তিকেও আসতে বলব । একসঙ্গে তিনজন থাকলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ভেঙে যাবে আপনা থেকেই । চারিদিকে বেড়িয়ে বেড়ানো যাবে । বেলাও বেশ সুস্হ হয়ে উঠেছে।
         চিঠি দিস । হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধেই না হয় কয়েকটা প্রচণ্ড গদ্য ও পদ্য লেখ । হাংরি জেনারেশনের একটা বিশেষ পুস্তিকায় বের করব আমি ; মলয়ও রাজি হবে । আসলে এই সব আন্দোলনের চেয়ে হৃদয়ের আন্দোলনটাই আগে দরকার ।
         সারা জীবন একাকীত্বের দুর্ভোগ হয়তো এভাবেই আত্মসাৎ করে যেতে হবে আমাকে । তবু এবং হয়তো এই জন্যেই শিল্পের চেয়ে আমি মানুষকে পৃথক করতে পারি না, বড়ো মনে করার বা ছোট মনে করার কারণ খুঁজে পাই না ।
                                                           সমীর রায়চৌধুরী


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়েরের লেখা চিঠিপত্র

সমীর,
        এই মাত্র তোর টেলিগ্রাম পেলুম। কী যে সাহেব হয়েছিস । টেলিগ্রামের বদলে চিঠি লিখলে বেলার খবরও জানতে পারতুম; বেলা এবং তোদের নতুন সন্তান কেমন আছে ?
        স্বাতী নার্সিং হোম থেকে ওদের বাড়িতে ফিরে গেছে, ভালো আছে--- ক্রমশ ভালো হয়ে উঠছে। এখন ছেলের নাম নিয়ে জল্পনা চলছে, আমি তার থেকে অনেক দূরে আছি --- নাম নিয়ে আমার একদম ভাবতে ইচ্ছে করে না। নতুন পিতৃত্বের ফলে আমার মধ্যে হঠাৎ খুব অস্বস্তি জেগেছে, খালি মনে হচ্ছে কোথাও বাইরে কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসি --- কোথাও গিয়ে দারুণ গন্ডোগোল করি, অনেক কিছু ভেঙে চুরমার করি, অন্তত বিপুল মদ্যপান করে বেশ কয়েকদিন অজ্ঞান হয়ে থাকি। স্বাতী খুশি হয়েছে, সেই জন্য আমিও খুশী, সে খুশীতে ভেজাল নেই, কিন্তু অস্বস্তিটাও সত্যি, ছটফটানিটাও সত্যি, দেখা যাক। তোর গল্পটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ঐ গল্পটা আমি আগেও তোর মুখে শুনেছিলুম; কিংবা আমেরিকায় থাকার সময়ে আমায় সংক্ষেপে লিখেছিলি --- ব্যাপারটা সত্যি ভালো। যাই হোক, কিন্তু ও-গল্প এখন কৃত্তিবাসে ছাপা যাবে না  -- কেন না, কৃত্তিবাস বহুদিন বেরোয়নি --- জানুয়ারি মাস নাগাদ একটা বার করা যায় কিনা দেখিস, সেটা হবে ২৫ নং সংকলন --- সুতরাং সেটাতে শুধু কবিতাই থাকবে --- সম্ভবত কৃত্তিবাসের ঐটাই শেষ সংখ্যা। গল্পটা এখন থাক, তুই কয়েকটা কবিতা তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দে।

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
যোগীপাড়া রোড
কলকাতা ২৮
৩০ আগস্ট  ১৯৬৬
সমীর
        টেলিগ্রামে কবিতার কথা জানতে চেয়েছিস --- এটা ভারী ভালো লাগলো। টেলিগ্রামের কাগজটা দেখতে হঠাৎ ভালো হয়ে গেছে এজন্য। আমি অবশ্য, কবিতা থেকে এখন কিছুটা দূরে। 
        আমি এখন দুটি ব্যাপারে ব্যস্ত, এক, স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একটি বালিকার সঙ্গে আমি সম্প্রতি প্রণয়াবদ্ধ হয়েছি। বেশ সুন্দরভাবে সরল ও যুবকোচিত হয়ে গিয়ে প্রেম করতে আমার চমৎকার লাগছে। মেয়েটি খুব নম্র ও লাজুক, অসম্ভব সৎ, ছোটো খাটো চেহারা, আমার চোখে তো খুবই সুন্দরী, অন্যরাও ওকে সুন্দরী বলে। ওর সঙ্গে আলাপ খুব রোমান্টিকভাবে। মেয়েটি আমার কবিতা পড়ে আমাকে চিঠি লিখতো বছর খানেক ধরে; মাস চারেক আগে এক দিন আমার বাড়িতে দেখা করতে আসে --- সেদিন নাম বলেনি। পরে, অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশান করাতে গিয়ে মেয়েটি আমাকে হাসপাতাল থেকে আবার চিঠি লেখে। আমি সেখানে দেখা করতে গিয়েছিলাম, এরপর আর তিনচার বার দেখা হবার পরই -- তখনও আমি মেয়েটিকে একবার চুম্বন পর্যন্ত করিনি --- ও জানায় আমাকে ছাড়া ও আর কারুকে বিয়ে করবে না। আমি ব্যাপারটাতে অভিভূত হয়ে যাই, কারণ, ওকে বিয়ে করতে পারা --- আমার অশেষ সৌভাগ্য --- ওকে আমার এতই ভালো লেগেছে। অন্যান্য ঘটনা পরে জানাবো --- যাই হোক, আমি এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাই, নিশ্চিত বিয়ে করবো, কিন্তু আপাতত একটা অসুবিধে দেখা দিয়েছে। মেয়েটির বাড়ি থেকে খুবই আপত্তি, --- শোনা যাচ্ছে ওর পরিবার কিছুটা ধনী, আমার মতো লক্ষ্মীছাড়ার সঙ্গে কিছুতেই ওঁরা বিয়ে দিতে চান না, কোন এক বিলেত-ফেরত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের সঙ্গে নাকি বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক করেছে ইত্যাদি। মেয়েটিকে বাড়িতে এখন আটকে রাখছে --- আমার সঙ্গে দেখা করতে দিতে চায় না, তবু দেখা হয় অবশ্য। যাই হোক আমাকে পোস্টকার্ডে লেখা কোনো চিঠিতে তুই এব্যাপারে উল্লেখ করিস না।
        দ্বিতীয় ব্যাপারটা এই আমাকে এবার 'দেশ' পূজা সংখ্যার জন্য একটা উপন্যাস লিখতে বলেছে। এটা অন্যান্য লেখকদের কাছে খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার হলেও আপাতত আমার কাছে এক বিষম ঝঞ্ঝাট। মাসে মাত্র ৪০০ টাকা উপার্জনের জন্য আমাকে এখন এত লিখতে হয় যে আমি বিষম ক্লান্ত --- হঠাৎ সেগুলি চালিয়ে গিয়েও আবার একটা উপন্যাস লিখতে গিয়ে আমি প্রায় exhausted  হয়ে গেছি। মাথার গোলমাল হবার উপক্রম। উপন্যাসের অর্ধেকটা লিখে দিয়ে দিয়েছি --- বাকি অর্ধেক কিছুই মাথায় আসছে না অথচ, আর দিন দশেকের মধ্যে না দিলে খুন করে ফেলবে। যাই হোক, এই সব ব্যাপারের জন্য আমি 'কৃত্তিবাস' থেকে এক সংখ্যা ছুটি নিয়েছি। আগামী সংখ্যা শরৎ একা সম্পূর্ণভাবে সম্পাদনা করছে, অক্টোবরে বেরুবে। তুই কৃত্তিবাসের জন্য অবিলম্বে লেখা পাঠিয়ে দে।
        হনি, বেলা আর তুই ভালো আছিস তো ।
                                                                     সুনীল

২০.৬.১৯৭৩
৩৭/২ গড়িয়াহাট রোড
কলকাতা ৭০০ ০১৯
ভাই বেলা ও সমীর,

টেলিগ্রামটা পাবার পর খুব মন কেমন করছে। কিন্তু এক্ষুনি যেতেও পারছি না। সংসার পেতে বসলেই অনেক ঝামেলা। তোমাদের ওখানে হঠাৎ চলে যাওয়ার জন্য আমি আর স্বাতী সব ঠিকঠাক করে ফেলেছিলুম--- এমন সময় স্বাতীর জ্বর হলো। ও সেরে ওঠার পর আবার ছেলের জ্বর। দু'জনেই সেরে ওঠার পর আবার অন্য অসুবিধে। অম্বুবাচীর সময় মা প্রায় এক মাস দমদমে গিয়ে থাকেন--- পরশু চলে গেলেন। আমাদের এ-বাড়িটা এমন যে তালাবন্ধ করে সবাই মিলে চলে যাওয়া যায় না। অন্তত স্বাতী তাই মনে করে। আমি একলাই দ্বারভাঙ্গা যাবো ভেবেছিলাম--- কিন্তু স্বাতী একলা থাকতে পারে না--- ভুতের ভয় পায় ! তাহলেই বুঝে দেখো কি ব্যাপার !
          দ্বারভাঙ্গা যাবার জন্য কিছুদিন ধরেই ছটফট করছি। আগামী মাসে আর একবার উদ্যোগ নেওয়া যাবে--- দেখা যাক কি হয়।
          তোমাদের ওদিককার খবর কি ? গত সপ্তাহে শান্তি লাহিড়ীর বাড়ির কাছে এক জলসায় গিয়েছিলাম। নানারকম সব মজার ব্যাপার হয়েছিল। এখানকার অন্যান্য খবর সব চলছে একরকম। ছোটোদের সবাই ভালো আছে তো ?
                                                       ভালোবাসা জানাই
                                                                  সুনীল


কৃত্তিবাস
১১ অক্রুর দত্ত লেন
কলকাতা ৭০০ ০১২
সমীর
          রেণুজীর মৃত্যুসংবাদ হঠাৎ বুকে এসে ধাক্কা মারলো। কৃত্তিবাসের একটি সংখ্যা আজই বেরুচ্ছে। পরবর্তী সংখ্যায় রেণুজী সম্পর্কে তোকেই লিখতে হবে। অবিলম্বে কিছু লিখে পাঠাবি। সাত-আট দিনের মধ্যে।
        আবার কবে কলকাতা আসছিস ?
                                                      সুনীল
                                                             ১৩-৪-৭৭

কমল চক্রবর্তীর চিঠিপত্র 

কমল চক্রবর্তী
জামশেদপুর
২৫/৮/১৯৯৫
প্রিয় সমীরদা

১) মাছের ফাইল, ২) ছাপাখানা। অফসেট, খবরের কাগজের মাপের। বাইকালার। ফাইল। একটা খবরের কাগজ তৈরি হয়ে যাবে। এবং প্রকাশনী। এই দুটো কাজ।
৩) মলয়দা কি ৪ [চার কোটি] টাকা লোনের ব্যবস্হা করতে পারবেন ? কত লোন পারেন?
           আপাতত আপনি এলে আপনাকে একদিন জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবো। ৩৬ বিঘে, হয়ে গেছে। আরও ১০০ বিঘে কিনব। টাকা চাই। সদস্যর তালিকায় আপনার নামও আছে। আপনি ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রথমে কাজের টাকা নিজেদের সংগ্রহ করতে হবে। প্রাথমিক লাগবে ১০; তারপরে আর পেচনে ফিরে তাকানো নেই।
          আপনি ভেবে-চিন্তে জবাব দিন। এই একবার শেষবার স্বাধীনতার পর গোটা বাঙ্গালি ও ভারতীয় এবং বিশ্বকে নাড়া দেবার সুযোগ। এটা আমরা সহজে নষ্ট হতে দেব না। কারণ এদেশের ভবিতব্য ট্রেনে চাপা পড়ে মারা-যাওয়া।
          কাজ করার সুযোগ এসে গেছে। আপনি এক দিনের জন্য চলে আসুন। যে কোনো দিন। বেলাদি ও আপনি শ্রদ্ধা নেবেন।
                                                         অনুগত
                                                          কমল


প্রথম কাব্যগ্রন্হ "ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি"-র পাণ্ডুলিপি


দাদা সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে মলয় রায়চৌধুরীর স্মৃতিচারণ

১.
দাদার প্রথম পোস্টিং ধানবাদে, থাকতো একটা গ্যারাজের ওপরে একতলার ফ্ল্যাটে। একবার গিয়ে দেখি দাদা অফিসে গেছে আর দাদার বন্ধু দীপক মজুমদার বাসন মাজছেন। 
২.
আমি মাটিতে, দাদা চেয়ারে, দাঁড়িয়ে মেজদা, দুইপাশে জাঠতুতো বোন ডলি আর মনু। চেয়ারটা দাদা নিলামে দু’টাকায় কিনে এনেছিল।
৩.
চাকরি করার সময়ে দাদা ভেবে রেখেছিলেন যে অবসর নিয়ে কলকাতায় নিজের বাঁশদ্রোণীর বাড়ি থেকে “হাওয়া৪৯” নামে একটা দার্শনিক-সাহিত্যিক পত্রিকা বের করবেন পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে লেখা চাইতে গেলে কেউই পাত্তা দেননি, এমনকি যাঁরা দাদার চাকুরিস্হলে অতিথি হয়ে সস্ত্রীক নিয়মিত থাকতে যেতেন, তাঁরাও। দাদাকে সঙ্গ-সাহচর্য দিতে এগিয়ে এলেন তরুণ-অতিতরুণরা, যাঁরা নিজেরাই অন্যরকম ভাবা আরম্ভ করেছিলেন। 
৪.
দাদাকে ঠাকুমা খুব ভালোবাসতেন। হাংরি আন্দোলনে দাদার গ্রেপ্তারির সংবাদে সেই দিনই ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয় আর উনি মারা যান। 
৫.
শীতকালে স্কুলে যাবার সময়ে দাদা একটা ঢোলা ডবল-ব্রেস্ট কোট পরে যেত, পরে সেটা আমিও পরেছি। কোটটা ছিল ঠাকুর্দার, পেশোয়ারে থাকার সময়ে পরতেন। ঠাকুমা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন, আর প্রথম বংশধরকে উপহার দিয়েছিলেন। 
৬.
দাদার ব্রহ্মপুরের বাড়িতে থাকার সময়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সামনের বড়ো বারান্দার মাপের মশারি তৈরি করিয়ে তার ভেতরে চেয়ার-টেবিল নিয়ে ‘দারা শিকো’ লিখেছিলেন; যারা ওনার সঙ্গে দেখা করতে আসতো তারা ওই মশারির ভেতরে বসেই আড্ডা দিতো। দাদা পাটনা থেকে ফিরে দ্যাখেন যে ওনার প্রিয় সবেদাগাছ কেটে ফেলেছেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ শ্যামল, হোমাগ্নির কাঠের প্রয়োজন মেটাতে। 
৭.
চাইবাসায় হাড়িয়া মহুয়া ইত্যাদি নেশার জিনিসের কথা শুনে পিটার অরলভস্কিকে নিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ গিয়েছিলেন দাদার বাসায়। দাদা প্রথম দিন ওদের তালশাঁস আর জাম খাইয়েছিল। ওনারা খাবার পর বহুক্ষণ অপেক্ষা করেও নেশা না হওয়ায় দাদাকে জিগ্যেস করেন ব্যাপারটা কী! দাদা বলে, “আয়নায় দ্যাখো, তোমাদের জিভে পয়জানাস ব্লু কালার”। দুজনেই ভয় পেয়ে যান। পরের দিন দাদা ওনাদের হাটে নিয়ে যায় হাড়িয়া আর মহুয়া খাওয়াবার জন্য।
৮.
চাইবাসায় নিমডি টিলার ওপরের চালাঘরে একা থাকতে ভালোলাগে না বলে দাদা কলকাতা থেকে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গেল  সেই বন্ধু কোনো চাকরি করত না, তাই সুবিধাই হল দাদার। বন্ধুটি দাদার চালাবাড়িতে আড়াই বছর থেকে গেল আর প্রতিদিন কবিতা লেখার ফুরসত পেয়ে গেল। দাদা তার জামা, গেঞ্জি, ট্রাউজার, চটিও কিনে দিত। ট্যুরে গেলে একটি পরিচিত পরিবারে তাকে অতিথি হিসাবে রেখে যেত দাদা। সেই বন্ধুর নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। 
৯.
দাদা একবার বলেছিল, “আমি মোটর সাইকেল ভালো চালাতে পারি মানে এই নয় যে রাস্তায় আরো যারা চালাচ্ছে তারাও ভালোভাবে চালাতে পারে, কে কখন ধাক্কা মারবে তার ঠিক নেই। ব্যাপারটা ধর্মের মতন : অন্যের বিশ্বাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার কাছে আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু আসে-যায় না।”
১০.
সিটি কলেজে আই এস সি পড়ার সময়ে দাদা আর দাদার বন্ধু অমিত মৈত্র উত্তরপাড়ার বাড়ি থেকে “লেখা” নামে একটা চটি-পত্রিকা প্রকাশ করত। সিটি কলেজের দেয়াল পত্রিকায় একজনের কবিতা পড়ে দাদার তা প্রশংসনীয় মনে হওয়ায় আর্টস বিভাগে গিয়ে কবিতাটির রচনাকারের সঙ্গে আলাপ করে। সেই তরুণটির কবিতার বই দাদা প্রথম মাইনে পেয়ে প্রকাশ করেছিল। তার নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
১১.
শৈশবে দাদার একটা চোখ ট্যারা ছিল। কুড়িজনের সংসার চালিয়ে পাটনার একমাত্র চোখের ডাক্তার ( জগজীবন রামের বাবা ) দেখাবার মতন টাকা বাবার ছিল না। বাবার দোকানে ডাক্তারের বৃদ্ধ বাঙালি কমপাউণ্ডার আড্ডা মারতে আসতেন। তিনি অন্য একজনের ট্যারা-চোখ সারাবার প্রেসক্রিপশান এনে দিলে বাবা দাদার চশমা করিয়ে দেন। দাদার ট্যারা চোখ সোজা হয়ে গেল, কিন্তু সারাজীবনের জন্য বাঁচোখ খারাপ হয়ে গেল।
১২.
দোতলার ছাদে তিনচাকার সাইকেলে বসে একদিক থেকে আরেক দিকে যেতে-যেতে দাদা চেঁচাচ্ছিল, “এই বুড়ো ( মানে মেজদা ) গলা ছাড়, গলা ছাড়, নেমে যা, লাগছে গলায়।” আমার ছোটো জাঠতুতো বোন মনু চেঁচিয়ে উঠল, “বড়দা, তোমার পিঠে একটা লালমুখো বাঁদর, ফ্রি রাইড নিচ্ছে।” দাদা লাফিয়ে নেমে দ্যাখে সত্যিই একটা বাঁদর, ছাদে দেয়া বড়ি খেতে এসে চেপে গেছে দাদার কাঁধে। 
১৩.
বাড়ির কাজের লোক শিউনন্নির বকুনি দেবার অধিকার ছিল না গৃহস্বামীর ছেলেকে। “রামচরিতমানস” পুরো মুখস্হ ছিল শিউনন্নির, আর বকুনির বদলে উপযুক্ত কোট করত, যার একটা প্রায়ই দাদাকে শুনিয়ে বলত, “তুলসী দেখি সুবেষু ভুলহিঁ মূঢ় ন চতুর নর, সুন্দর কেকিহি পেখু বচন সুধাসম অসন অহি”। মানে, ময়ূর যতোই সুন্দর হোক, সাপ খায় যেন সুধা চাটছে। ( স্মৃতি থেকে, তাই কিছু ভুল থাকতে পারে। 
১৪.
প্রতিবেশী হুলাসবাবুর বাড়িতে গিয়ে একটা খেলা খেলতে দাদার ভালো লাগতো। চোখ বুজে “রামচরিতমানস” বইটা খুলে যে কোনো দোহায় ‘রামশলাকা’ দিয়ে নির্দেশ করা। ‘রামশলাকা’ ছিল ক্রুশকাঠির মাপের লোহার কাঠি। দোহাটা ব্যাখ্যা করে হুলাসবাবু ভবিষ্যত বলতেন। 
১৫.
মেজজ্যাঠা জামের ভিনিগারের ব্যবসা ফাঁদার পরিকল্পনা করেছিলেন। তিন ফিটের এনামেলের গামলা জামে ভরে তার ওপর দাদাকে লেফ্ট-রাইট করতে বলতেন। দাদা পা দিয়ে জাম পেষার সময়ে চেঁচিয়ে একটা গান গাইতো, “তুফান মেল, ইসকে পহিয়ে জোর সে চলতে, অওর অপনা রাস্তা তয় করতে, সবলোগ ইসসে কাম নিকালে, বচ্চে সমঝে খেল, তুফান মেল” ( বোধহয় কাননবালার গাওয়া দাদার প্রিয় কোনো ফিল্মের, স্মৃতি থেকে লিখলুম )
১৬.
প্রতিদিন রাতের খাবার পর বড়জেঠিমা আমাদের ভাইবোনদের একত্র করে গল্প বলতেন, আরব্য রজনী, ইশপের ফেবল, বেতাল ইত্যাদি থেকে অংশ নিয়ে নিজের মতন করে মিলিয়ে-মিশিয়ে অবিশ্বাস্য কাহিনি। আমরা লন্ঠন ঘিরে বসতুম। দাদা লন্ঠনটা নিভিয়ে দিতো, বলতো আলো জ্বললে গল্পটা দেখতে পাবো না।
১৭.
দাদার সজনেগাছ ভরে গিয়েছিল শুঁয়াপোকায়। দাদা বলেছিল, গাছটা মানুষের থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য শুঁয়াপোকার বর্ম পরে নিয়েছে। 
১৮.
দাদা পাড়ার বন্ধু বুল্লুদের বাড়ি থেকে হোমিওপ্যাথির শিশিতে জল এনেছিল, বলেছিল, নতুন ধরনের জল বেরিয়েছে, মাথায় ঘষলেই ফেনায় ফেনা। জল মেখে মাথায় ফেনা দেখে জেঠিমা বলেছিলেন, ফেলে দে, ফেলে দে, নিশ্চই মন্তর পড়া। ইমলিতলার বাড়িতে ওইভাবেই শ্যাম্পুর প্রবেশ। 
১৯.
কোনো কারণে শাস্তি দেবার জন্য বড়জ্যাঠা শরকাঠি নিয়ে দাদাকে মারার জন্য ডাক পাড়লে দাদা আমাদের ছাদ থেকে পাশের বাড়ি হুলাসবাবুদের ছাদে লাফ মেরে পালাতো। দুই বাড়ির মাঝে চার ফিট চওড়া গলি ছিল।
২০.
“তোমাদের বাড়ির রোদ” এই কথাটাও দাদা কাজের বউয়ের কাছ থেকে পেয়েছিল; প্রত্যেকের বাড়িতে যে রোদ আসে তা তার নিজস্ব।
২১.
কমরেডরা যে সময়ে দারিদ্রকে মহিমান্বিত করে গল্প-উপন্যাস লিখছিলেন, দাদা বললেন যে প্রলেতারিয়েতের সৌন্দর্য্যবোধ ও জ্ঞান নিয়ে লিখবেন। কাজের বউ আসার আগে প্রতিদিন ফুলদানিকে টেবিলের মাঝখান থেকে সরিয়ে কোনে বা পাশে রেখে দিতেন। কাজের বউ সকালে কাজে এসে ফুলদানিটা আবার টেবিলের মাঝখানে রেখে দিত, এবং বিরক্তি প্রকাশ করতো।
২২.
ইঁদুর মারার জাঁতিকলে ইঁদুর মরলে দাদা ছাদে উঠে বা মাঠে গিয়ে ইঁদুরটার ল্যাজ ধরে ঘোরাতো আর আকাশে চিলেরা চক্কোর দেয়া আরম্ভ করলে “চিল কা বাচ্চা চিলোড়িয়া” বলে আকাশে ছুঁড়ে দিতো চিলেদের দিকে। কোনো একটা চিল ছোঁ মেরে ইঁদুরটাকে ধরে নিয়ে উড়ে চলে যেতো।
২৩.
ইমলিতলার বাড়িতে সিনেমা দেখাকে মনে করা হতো অধঃপতন। বাড়িতে যাতে কেউ টের না পান তাই একটা ফিল্মের প্রথম অর্ধেক দেখে ইনটারভালের সময়ে গেটপাসটা আমায় দিয়ে দাদা বাড়ি চলে যেতো। পরের দিন আমি প্রথম অর্ধেক দেখতুম আর বেরিয়ে গেটপাসটা দাদাকে দিয়ে বাড়ি চলে যেতুম। 
২৪.
কানাগলির শেষে দলিতদের উঠোনের গর্তে চারপা বাঁধা শুয়োরকে গনগনে লোহা ঢোকাবার আর্তনাদ শোনার পরদিন দাদা বলতো, রান্নাঘর থেকে এলাচ নিয়ে নে, বাড়ি ফিরে ফিটকিরি দিয়ে দাঁত মেজে নিতে হবে, আজকের খাবার শুয়োরের মাংসর সঙ্গে তাড়ি।
২৫.
সাইকেলের টায়ারকে কাঠি মেরে-মেরে গোলা রোডের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত নিয়ে যাবার প্রতিযোগিতায় প্রতিবার দাদা জিততো।
২৬.
একটা নীল মাছিকে মেরে, সুতোয় বেঁধে, গোপাল হালুইকরের ভিমরুলের ঝাঁকে গিজগিজে জিলিপির ওপর ফেলতো দাদা। একটা ভিমরুল যেই নীল মাছিটাকে কামড়ে ধরতো, দাদা ওই সুতোটা ঘুড়ির মতন ভিমরুল ওড়াতে-ওড়াতে ইমলিতলার গলি দিয়ে দৌড়োতো। পেছনে পাড়ার ছেলের দল। 
২৭.
উনোনের জন্য রোজ কয়লা ভাঙতে হতো দাদাকে। পরে মেজদা বা আমাকে। 
২৮.
দাদার পড়ার টেবিল ছিল একটা প্যাকিং-বাক্স, তার ওপর মায়ের পুরনো শাড়ি পাতা। রাতে তার ওপর লন্ঠন। লন্ঠনের ভুষো দাদা পরিষ্কার করতো।
২৯.
গোলারোড দিয়ে শব নিয়ে যাবার সময়ে শববাহকরা খইয়ের সঙ্গে তামার পয়সা ছুঁড়তো। ‘রাম নাম সৎ হ্যায়’ শুনতে পেলেই দাদা বলতো, “চল চল, মড়ার পয়সা লুটবো”। দাদার পেছন-পেছন আমি আর মেজদা দৌড়োতুম। দাদা ওই পয়সায় আলুকাবলি খেতো। 
৩০.
ফুটবল খেলার সময়ে দাদার জুতো দিয়ে গোলপোস্ট হতো, আর বাড়ি ফেরার সময়ে ভুলে যেতো। নতুন জুতো বাবা কিনে দিতেন কেবল পুজোর সময়ে। ততোদিন দাদা খালি পায়ে স্কুলে যেতো। 
৩১.
রবিবার করে বড়োজেঠার র্যালে সাইকেল নিয়ে মাঠে সাইকেল চালানো শিখতে যেতো দাদা। বড়োজেঠার শর্ত ছিল যে দুপুরে ওনার খাওয়া হয়ে গেলে পিঠ থেকে পা পর্যন্ত হাঁটতে হবে। স্প্রিং খাটের লোহার বাটাম ধরে বড়োজেঠার পিঠে পঞ্চাশবার হাঁটতো দাদা। জেঠা তার আগেই নাক ডাকা আরম্ভ করলে চুপচাপ নেমে পড়তো।
 ৩২.
হাংরি মকদ্দমার সময়ে বলা দাদার একটা কথা মনে পড়ে গেল : ”অনেক মানুষ রাস্তার ঢিলের মতন নোংরা হয়, সুট মেরে-মেরে স্কুলের গেট অব্দি নিয়ে যেতে পারবি; আবার অনেকের নোংরামি হয় পাহাড়ের মতন, লাথি মারলে তোর নিজেরই পায়ে লাগবে।”
৩৩.
দাদার স্কুলের বইতে কোনো না কোনো গাছের পাতা থাকতো, পেজমার্ক হিসাবে ব্যবহারের জন্য। কেবল নেসফিল্ডের গ্রামারে থাকত জবার শীষ, সংরক্ষণ করতো পরের সরস্বতীপুজো পর্যন্ত। পৈতে হবার পর দাদা সরস্বতীপুজো করতো, মূর্তির নয় — বই পুজো, তার আগে করতেন পুরুতমশায় সতীশ ঘোষাল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ