সমরজিৎ সিংহ

 সমরজিৎ সিংহ
নীচের লেখাটি পড়ুন।
কবির অকপট বাক্য।

৬৭ একটি সংখ্যা । পূর্ণ হল আজ, ১২ জানুয়ারি । কাল থেকে ৬৮ এর যাত্রা শুরু । এ এক আশ্চর্য অনুভূতিও । এক উপলব্ধিও । 
৭ এ মরে যেতাম । পাঁজরের নিচে, ডানদিকে, কোমরের কাছে, পাগলা কুকুর খাবলে নিয়েছিল এক টুকরো মাংস । আমরা বাচ্চারা খেলছিলাম দিনের বেলা । হঠাত্‍ এই পাগলা কুকুর আসে । পাঁচজনের পর ছ'নম্বর ছিলাম আমি । বাকি পাঁচজন জলাতঙ্ক রোগে মারা যায় । আমাকেও বেঁধে রাখা হয়েছিল । হয়তো মৃত্যুর প্রতীক্ষায় । কোথা থেকে এক সন্ন্যাসী এসে মার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যায় আমাকে । মাকে বলেছিল, একে যমের হাতে তুলে দেবার বদলে আমি নিয়ে গেলে আপনার আপত্তি নেই তো ? অসহায় মা কাঁদতে কাঁদতে একমাত্র সন্তানকে ঐ সন্ন্যাসীর হাতে তুলে দিয়েছিল । চীনভারত যুদ্ধ চলছে তখন । ছোট মামা যুদ্ধে গেছেন । তার আর খবর নেই । মায়ের অবস্থা অবর্ণনীয় । ছ'মাস পরে ঐ সন্ন্যাসী ফেরত দিয়ে যায় আমাকে । ১১ তেও মরে যাবার কথা ছিল । হাসপাতাল থেকে ফেরত দেওয়ার পর সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল । তুলসি গাছের নিচে রাখা আমাকে ঘিরে তখন অষ্টপ্রহর কীর্তন । বড়মামা খবর পেয়ে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান থেকে এক ওঝা নিয়ে আসেন । পরদিন কলাগাছর সঙ্গে প্রাণবিনিময় করে কলা গাছটিকে দাহ ও শ্রাদ্ধ করা হয় বিধিমতে । পরগণার সকল লোক ছুটে এসেছিল এই আজবকীর্তি দেখতে । শ্রাদ্ধের পরদিন আমি সুস্থ হয়ে যাই । ঐ ওঝা মাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন এই ছেলের স্বভাব স্বাভাবিক হবে না । জানি না, তা কতটুকু ঠিক । ২১ এ মরতে পারলাম না । শিলচরে রেললাইনে গলা দিলাম । কি কারণে যে সে রাতে রেল এল না ! মরা হল না আমার । ১৯৭৪ এ বাস উলটে পড়ে গেল লংতরাইয়ের অতলে । চারপাঁচবার গড়িয়ে একটা গাছের গায়ে আটকে পড়ল টি আর টি সি বাস । তিনজনের সীটে আমার দুপাশের দুই যাত্রী স্পট ডেড । ড্রাইভার ডেড । আর একজন যাত্রী হাসপাতালে পৌঁছবার আগেই মরে গেল । আমি ড্রাইভারের সীটের নিচে । অক্ষত । তারপর তিনবার আত্মহত্যা করি । ১৯৯৩ এ সাত নং ধলেশ্বর রোডের ভাড়াবাড়িতে । হুইস্কির সঙ্গে ঘুমের বড়ি মেশাই । একটা দুটো করে কুড়িটা । সাতদিন ঐ ঘরে পড়ে রয়েছিলাম মৃতবত্‍ । ১৯৯৯ বা ২০০০ সালে বাইক শুদ্ধু ট্রাকের নিচে । কোমা থেকে এলাম ফিরে । 
প্রতিবার মৃত্যু এসেছিল নিয়ে যেতে । কে যেন আগলে রেখেছিল পথ । সে কে ? তাকে আজও চিনিনি । সে কি তবে এই ৬৭ ? না কি ৬৮র হাতছানি ? ১৯৭৫ এ কলকাতা থেকে এসেছি মায়ের কাছে । এক সন্ন্যাসী এসে পায়ে উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন । বাবা, এতবছর খুঁজতে খুঁজতে এসে আজ তোমাকে পেলাম । এবার ঘরে চল । পাগল ভেবে ঠাট্টা করে ফিরিয়ে দিয়েছি তাকে । ২০১২ অক্টোবরে গৌহাটির পথে এক রিটায়ার্ড আই এফ এস অফিসারের সঙ্গে ট্রেণে দেখা । তীর্থস্থান ও শিবদর্শন যার নেশা । গীতা যার পাথেয় । ঈশ্বর বা কৃষ্ণ ছাড়া শ্বাস নিতে পারেন না তিনি । দু'একমাস আগে ফোনে বললেন, আপনার জন্মস্থান না দেখা পর্যন্ত আমার তীর্থপরিভ্রমণ সম্পূর্ণ হবে না । ইউ ডোন্ট নো হোয়াট আর ইউ । আমাকে নেবেন না আপনি ? আমি যে সামান্য এক মানুষ । কাঙাল ও ভিখারি । গৃহভৃত্য থেকে চা-স্টল আর হোটেলবয় হয়ে ত্রিপুরা সরকারের প্রমোশনবিহীন এক রাজরোষে পতিত কর্মচারি ছিলাম, যার অক্ষমতার সীমা নেই, তা তিনি জানেন না । কবিতা লিখতে এসে টের পেয়েছি, ঐ কর্ম আমার নয় । সংসার করতে এসে বুঝতে পারছি, এই জায়গায় আমার থাকার কথা নয় । ঈশ্বরের প্রতিও অনুরাগ নেই । নেশা, নারী, ভালোবাসা, শূন্যতার এক মাঠ পেরিয়ে আজ এসেছি ৬৮ এর কাছে । এসে দেখি, আমার এক বন্ধু, নাট্যকার মানিক চক্রবর্তী ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে মেতে উঠেছেন যুক্তিতক্কো ও গল্পে । কাল রাত থেকে । সেখানেও আমার স্থান নেই । তাহলে কিছুদিন পর, ৬৮ এর হাত ধরে আমিও চলে যাব বইমেলায় ? সেখানে কি তার দেখা  পাব ? যে বারবার আগলে রেখেছে মৃত্যুর পথ ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ