চিত্রকর
দেওয়ান আতিকুর রহমান
মুখোমুখি
কবি কথাকার গোবিন্দ ধর
গোবিন্দ ধর :২
আমাদের জীবনের চারপাশে যা আমরা দেখি সবই ছবির বিষয়।সবই ছবি।এই যেমন হাঁটছে কেউ এটাও ছবির বিষয়।বসা দাঁড়ানো দৌড়ে যাওয়া নানান মুদ্রায় চালচলন জঈ জীব সবই ছবির বিষয়।ছবিই সব।তাও একজন শিল্পী কেন আবার আঁকবেন?
উত্তর: পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষ আলাদা। ভিন্ন ভিন্ন সবার দেখার ভঙ্গি। একই জিনিস বা বস্তু আপনি যেভাবে দেখছেন হয়তো অন্য কেউ সেভাবে দেখছে না। আবার অন্য কেউ যেভাবে ভাবছে কিংবা দেখছে, সেভাবে হয়তো আমি দেখছি না। একজন সাধারণ মানুষ আর শিল্পীর দেখার চোখ নিশ্চয় আলাদা। সাধারণ মানুষ সবকিছু দেখে দ্বিমাত্রিক অথবা ত্রিমাত্রিক । কিন্তু শিল্পীর দেখায় আরো কিছু অতিরিক্ত মাত্রা যোগ হয়। যা দেখে দর্শক আনন্দিত বা পুলকিত হন কিংবা দর্শকের চিন্তার দরজা খুলে যায়।
গোবিন্দ ধর :৩
ছবিতে মগ্ন চৈতন্য লাভ কবে ঘটে?
উত্তর: এখনো অপেক্ষায় আছি।
গোবিন্দ ধর :৪
ছবি আঁকতে আঁকতে চলেছেন দীর্ঘদিন।কখনো মনে হয়নি ছবি নয় শিল্পী নয় অন্য কিছু হবার?
উত্তর: সত্যি বলতে আমি ওইভাবে শিল্পীও হতে চাই না। কিছু না হতে চাওয়ার আনন্দটাই আমি সবসময় পেতে চাই।
[গোবিন্দ ধর :৬
পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে ছবি আঁকা যায়?
উত্তর: আসলে পূর্বপরিকল্পনা বলতে যদি লেআউটকে বলি, তাহলে সেটা তো করতেই হয়। তবে ছবি আঁকার সময় পরিকল্পনা পরিবর্তন হতে পারে। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা পরিবর্তন হয়ে অন্য কিছুই দাঁড়ায়।
গোবিন্দ ধর :৮আপনার সাথে তেমন আড্ডা আমার নেই। আপনি আড্ডারু সে আমি জানি।আড্ডা কি শিল্প সৃষ্টির উৎস মনে করেন?
উত্তর: না। তবে সহায়ক।
গোবিন্দ ধর :৭
শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছায় একটি শিল্প রূপ পায়? নাকি আরো কোনো অতিভৌতিক কোন বিষয় প্রতিটি ছবির ঘরনা তৈরী করে?
উত্তর: আমার মনে হয় এটা আধিভৌতিক বা অতিপ্রাকৃতিক কোনকিছু না। তবে আপনি যখন একটা কাজের ভেতর ঢুকে যাবেন। মনেপ্রাণে সেই কাজটার মধ্যে প্রবেশ করবেন। তখন কাজটাই আপনাকে টেনে নেবে। সে ক্ষেত্রে অনেক কিছুই আপনার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হবে না। ছবিই আপনাকে একটা দিকনির্দেশনা দিয়ে দিবে।
গোবিন্দ ধর :১২
কবিতা তো একটি স্বতন্ত্রশিল্প। ছবিও স্বতন্ত্র। একটি রেখা একটি বিন্দু কিংবা তুলির কতটুকু স্বাধীনতা এই সমাজ এই সংবিধান আমাদেরকে দিয়েছে?যদিও বাকস্বাধীনতা যেখানে এসে থমকে যায় শিল্প কি তেমন কোন আটকে পড়ার সম্ভাবনায় দমে যায়?
উত্তর : স্বাধীনতা তো আসলে কেউ দিবে না। সেটা আদায় করে নিতে হবে।
গোবিন্দ ধর :১৩
আপনি বলুন চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও সাধ্য প্রসঙ্গে?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়নের ধৃষ্টতা আমার নাই। তিনি অনেক বড় একজন শিল্পী। আধুনিক শিল্পী।
গোবিন্দ ধর :২০
আপনার এ যাবৎ একক প্রদর্শনী কোথায় কোথায় হয়েছিল?
উত্তর: আমারে কখনো একক প্রদর্শনী হয়নি। তবে বিভিন্ন যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছি অনেকবার।
গোবিন্দ ধর :২১
আপনার ছবি সর্বোচ্চ কত মূল্যে বিক্রি হয়েছে?
উত্তর: আসলে অর্থমূল্য দিয়ে ছবির মান নির্ধারণ করা তো ঠিক না। অনেক ক্ষেত্রে অতি সামান্য অর্থও বিশাল পরিতৃপ্তি এনে দেয়। তাই টাকার অংকটা উল্লেখ করছি না।
গোবিন্দ ধর :২২
কোথায় কোথায় ছবি বিক্রি হয়েছে?
উত্তর: পরিচিত সার্কেলেই।
তবে আমি বেশকিছু কমিশন ওয়ার্ক করেছি দেশের বিভিন্ন জায়গায়। ঢাকার উত্তরা, লালমাটিয়া, কলাবাগানে, খাগড়াছড়িতে, বগুড়ার মহাস্থানগড়ে, ময়মনসিংহের ভালুকায়। এগুলো বেশিরভাগই টেরাকোটা। কয়েকটা স্কাল্পচার আছে। এরমধ্যে ভালুকায় অবস্থিত স্কাল্পচারটি 35 ফুট উচ্চতার। গ্রে সিমেন্টে করা। ঢাকার বিয়াম ফাউন্ডেশনে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে করা 25 ফিট উচ্চতার 5 টি পাখি আছে। তামার পাতে করা ছোট ছোট কয়েকটা বাকি আছে।
গোবিন্দ ধর :২৫
শিল্প বাঁচতে হলে শিল্পীকে বাঁচাতে হবে।মানে খেয়েদেয়ে তো শিল্পচর্চা করতে হয় শিল্পীকে।সেক্ষেত্রে ঢাকার অগ্রগতি আছে?
উত্তর: অগ্রগতি বলতে ঢাকায় এখন কমার্শিয়াল আর্ট (মানে গ্রাফিক ডিজাইন আরকি) বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ শিল্পীরাই পড়াশোনা শেষ করে বিভিন্ন এজেন্সি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে, এখন তো অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানেও শিল্পী পদমর্যাদায় চাকরি করছে। এতে করে হয়তো তাদের পেটের দায় কমেছে, কিন্তু শিল্পের দায় অনেকটাই বাকির খাতায়।
গোবিন্দ ধর :২৬
মানুষের মনের সৌন্দর্যচর্চার বিকাশ ঘটাতে হলে নিশ্চয়ই স্থিরতা খুব প্রাসঙ্গিক। অস্থির পরিবেশে শিল্প ও শিল্পীদের সমন্বয় সম্ভব?
উত্তর: স্থিরতা অবশ্যই শিল্পকে অনেক গুছিয়ে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। কিন্তু অস্থিরতাই আমি মনে করি শিল্পচর্চার আঁতুড়ঘর। সে ক্ষেত্রে প্রপার সমন্বয় অনেক সময় হয়তো হবেনা, কিন্তু অনেক বড় সম্ভাবনার জন্ম হতে পারে।
গোবিন্দ ধর :২৭
এই বিশ্ব চরাচর একটি বিন্দু। জ্যামিতিক নকশায় আঁকা নানা উপকরণ উপাচারে সমৃদ্ধ। আপনার চিত্রশিল্পের কোথাও জ্যামিতিক পরিমিতিবোধ কাজ করে?
উত্তর: পৃথিবীতে আমরা যা কিছুই দেখিনা কেন, সবকিছুই কোনো না কোনো জ্যামিতিক নকশার মানে ফর্ম এর অন্তর্ভুক্ত। তবে এর ব্যবহারের পরিমিতি বোধটাই আমার মনে হয় শিল্পের আসল রহস্য।
গোবিন্দ ধর :২৮
রেখা একটি বিরাট ভূমিকা রাখে শিল্পীর জীবনে।রেখার কোন ভূমিকা সকল শিল্পীকোই তাড়িত করে?
উত্তর: আসলে প্রতিটা জিনিসের তো একটা একক থাকে। একটা সিম্বল থাকে। আমার মনে হয় ছবি আঁকার একক হচ্ছে রেখা। যা কিছুই চিন্তা করি আমরা সেটা রেখার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
গোবিন্দ ধর :২৯
জীবন কেউ কেউ নেশা বলেন।কেউ কেউ উৎসব। কেউ কেউ একটি নাটক।আবার কারো কারো নিকট জীবনে কবিতাই জীবন।আপনি কোন নিজস্ব জীবনচেতনায় তাড়িত নিশ্চয়ই। ব্যাখ্যা চাই।
উত্তর: অবশ্যই আমার নিজস্ব একটা জীবন বোধ আছে। তবে জীবন সম্পর্কে ধারণা যে কারো যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। শৈশবে জীবন সম্পর্কে এক ধরনের চিন্তা ছিল। কৈশোরে সেটা পরিবর্তন হয়েছে। আবার মধ্য বয়সে এসে জীবন সম্পর্কে চিন্তাটা আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। এখন আমার কাছে জীবন হচ্ছে যাপন করার এমন একটা বিষয় যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ। এটাও ছবি আঁকার মত। রঙ তুলি ক্যানভাস চাইলে সবাই সংগ্রহ করতে পারে, কিন্তু সেই ক্যানভাসে কালজয়ী ছবি কজন আঁকতে পারে? জীবনটা তো সবাই যাপন করে, কিন্তু তাতে প্রয়োজনমতো পরিমিতিবোধ, আত্মসংবরণ, এবং মোহ থেকে মুক্তির মাধ্যমে যে জীবন যাপন করা যাবে, তা ক'জনের পক্ষে সম্ভব? হয়তো আমিও পারবো না, তবে এরকম একটা জীবন যাপনের প্রতি আমার লোভ রয়েছে।
গোবিন্দ ধর :৩০
আপনার পারিবারিক পরিবেশ শিল্প ও শিল্পীর।এই সম্মেলন কেমন লাগে?
উত্তর: এটা অসাধারণ অনুভূতি।
গোবিন্দ ধর :৩১
শিল্পীকে একা করাই আসল।আপনার শিল্প কতটুকু আপনাকে চিহ্নিত করে?
উত্তর: আমি চেষ্টা করি। আমার কাজে যেন আমার নিজস্বতা থাকে। কতটুকু পারছি সেটা আসলে মানুষ বলবে।
গোবিন্দ ধর :৩৩
আপনি প্রতিদিন রেখায় ফুটিয়ে তুলেন চিত্র। হোক সে প্রতিকৃতি কিংবা রেখার সমন্বয়। এর সাথে কি কোন সাধনার সম্পর্ক আছে?
উত্তর: সাধনা ছাড়া শিল্পসৃষ্টি সম্ভব না। সেটা হোক সামগ্রিক চিন্তায়, কিংবা শুধুমাত্র মেটেরিয়াল পর্যায়ে। অবশ্য ম্যাটারিয়াল পর্যায়ের সাধনাকে আমরা সাধারণত স্কিলনেস বলি।
গোবিন্দ ধর :৩৫
আপনার নিজস্ব ঘরনায় লৌকিক সংস্কৃতি কতটুকু আনতে পেরেছেন?আপনি কি সচেতনতায় এই বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন?
উত্তর: না আমি এড়িয়ে যাইনি। বরং লৌকিক ঘরানাতে উদ্বুদ্ধ হয়েই সব সময় নিজস্বতা তৈরীর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
0 মন্তব্যসমূহ