♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
(০১)
♣আরম্ভের আগে♣
মূলত মধ্যমার্চ ২০২০ থেকে চলছে করোনাকাল। এদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। মার্চের কেলেন্ডারে অনেক লাল তারিখ।
৭ মার্চ, ১৭ মার্চ, ২৬ মার্চ। এমাস আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাস। বাংলাদেশের জন্মমাস। কেবল মাস নয়; সনের হিসেবেও এবছরটি জাতির জন্য আনন্দের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মের একশ' বছর পূর্ণ হচ্ছে এ-সনে।
শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের মনে উৎসাহের অন্ত নেই। সব স্কুলেই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠান হবে। সবাই যার-যার মত করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিক্ষকরা প্রতিদিন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। অভিভাবকরা সহযোগিতা করছেন। বছরব্যাপী চলবে বহুমাত্রিক অনুষ্ঠান। কেউ আবৃত্তি করবে, কেউ ছবি আঁকবে। কেউবা গান গাইবে, নাচবে। কেউ-কেউ অভিনয়ের মহড়া দিচ্ছে। নাটক করবে কিংবা একক অভিনয়। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণও মুখস্থ করছে কেউ। কিন্তু করোনার কারসাজিতে ভেস্তে গেল সবই!
মেঘদূত ও রোদদূত পিঠাপিঠি দু'ভাই। মা ওদের মেঘ আর রোদ বলে ডাকে। বড়টির বযস ছয় আর ছোটর চার। মেঘের বর্ণবোধ হয়েছে বছরদেড়েক আগে। এখন সে শিশুদের উপযুক্ত মোটা হরফের বাংলা বই গড়গড় করে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু রোদের বর্ণপরিচয় হয়নি। পড়তে না-পারলে কী হবে লিখতে সে ওস্তাদ! ঘরে এমন কোনো দেয়াল নেই যেখানে সে তার লেখক-প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেনি! শুধু তা-ই নয়; চিত্রশিল্পেও সে প্রতিভাধর। আম কলা কাঁঠাল তো আছেই-- "টানে এক আঁক বক" বানাতেও রোদ সিদ্ধহস্ত। ওর হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ঘরে এমন কোনো দেয়াল নেই যাকে সে তার ছবি আঁকার ক্যানভাস বানায়নি! ওদের ডাক্তার মা-বাবার ফ্রি পাওয়া রাইটিং প্যাডের শ্রাদ্ধ করতেও সে সিদ্ধহস্ত। এক বৈঠকে পাঁচ-সাতটি প্যাড অঙ্কনশিল্পে পূর্ণ করতেও সে মোটেই গলদঘর্ম হয় না!
বড় বিষম সময় এখন শিশুদের। দুঃসময়ই বলা যায়! চারদিকে কেবল মানা আর মানা। শুধু নিষেধ আর নিষেধ। ঘরেও বন্ধনের জাল-- যাবে না, ধরবে না, ছোঁবে না! "ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।" এছাড়া এই অনির্দিষ্টকাল ছুটির অনিশ্চিত বন্দীদশায় আর কী-ইবা করবে ওরা? আর কাহাতক! একোঠা থেকে ওকোঠা, নিচতলা থেকে দোতলা, টিভিতে কার্টুন দেখা, মোবাইলে গেমস্ খেলা! কখনও ছড়া-ছবির বই নিয়ে টানাটানি, হুড়োহুড়ি। হাঁড়ি-পাতিল, পাখি- পুতুল-জাতীয় খেলনা নিয়ে ছেলে- শিশুরা কতক্ষণই-বা কাটাতে পারে? বসার ঘরই ওদের ফুটবল মাঠ এবং ক্রিকেটের ক্রিজ। এক বল-ব্যাটে ওদের চলে না-- সবই লাগে এক জোড়া করে। তাতেও শান্তি নেই-- পান থেকে চুন খসলে মুহূর্তের মধ্যেই কুরুক্ষেত্র কিংবা পানিপথ। রাম-রাবণের যুদ্ধও বলতে পারেন। মেঘ-রোদের প্লাস্টিকের ব্যাটে বলের ছোঁয়া যত না-লাগে তার চেয়ে বেশি আঘাত লাগায় একে অপরের পিঠে! তবে চোখের পলকে তা প্রশমিত হতেও সময় লাগে না। বাসায় তিন জন রেফারির মধ্যে এক জন তো প্রায় সর্বক্ষণই উপস্থিত। মেঘ-রোদের এ-ই তো কম্ম। ওরা যেন শরতের আকাশ-- এই বৃষ্টি, এই রোদ; নিয়ত হাসিকান্নায় দোলদোলানো।
ওদের খেলার সাথিদের অবস্থাও অন্যরকম নয়। ওরাও খাঁচায় বন্দী। পায়েচলার পাঁচফুটি পথের ওপারে শুভদের বাসা আর পাশের বাসা কাব্যদের। শুভ ক্লাস ফাইভে পড়ে আর কাব্য ফোরে। মেঘ-রোদ ওদের খেলার সাথি। খুব ভাব ওদের মধ্যে। দুপুর গড়ালেই খেলনাপাতি নিয়ে ওরা বাইরে যাবার জন্য মুখিয়ে থাকত। দৌড়ঝাঁপ, হৈ-হল্লোর, হাসি- তামাশায় কাটত সোনালি শৈশব। কিন্তু এখন আর কেউ বেরোয় না। করোনার ভীতি ওদের ভেতরও। প্রায়ই জানালায় মুখ গলিয়ে ওরা একে অপরকে ডাকাডাকি করে-- মেতে ওঠে গল্পকথায়। দূরে-দূরেই কাছে থাকে ওরা। কিন্তু মুখ থেকে বিষাদের শ্রাবণী মেঘের ছায়া আর যায় না!
রাগে, অভিমানে, দোষে, অন্যায়ে মেঘ-রোদের পরম আশ্রয় মায়ের আঁচল এবং দিদনে কোল। মায়ের মা দিদিমাকে ওরা দিদন বলে। এখন ওরা আর যখন-তখন জিদ-মর্জি, আবদার করে না। বড় রাস্তার মোড়ে টফি-চকলেট, কেক-কোক কিনতেও যায় না দাদুভাইকে নিয়ে। মেঘ-রোদের আরেক আশ্রয় ওদের দাদুভাই। কেবর আশ্রয় নয়-- সখা, সাথি ও সংরক্ষক! গল্পশোনা, ছবিআঁকা আর খেলার অন্যতম সঙ্গী। দাদুভাই ওদের গল্পের বইগুলো পড়ে শোনায়-- ঈশপের গল্প, ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদা ঝুলি, আরব্য রজনীর গল্প। অভিনয় করে পড়লে ওদের চোখ চকচক করে ওঠে! মহাভারত ও রামায়ণের গল্পও ওরা মনোযোগ দিয়ে শোনে। কখনও বানিয়ে-বানিয়ে গল্পও বলতে হয়। দাদুভাইকে বসা দেখলে কখনও ওরা দুজন মুনকর-নকিরের মত ফেরেশতা হয়ে দুই কাঁধে চড়ে বসে। চিৎ হয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়তে দেখলে লাফিয়ে পেটের ওপর উঠে আবার লাফ দেয়। বিছানায় উবু হয়ে বই পড়লে পিঠের ওপর উঠে নাচে। এর নাম দিয়েছে ওরা চন্দ্রবিন্দু খেলা! দাদুভাই পা গুটিয়ে রাখলে হাঁটুকে ওরা ঘোড়া বানিয়ে চড়ে। এমন নিত্যনতুন খেলা ওরা দিনরাত উদ্ভাবন করে চলেছে। কখনও প্যাড-কলম এনেই বলে মা আঁক, দিদন আঁক, এটা আঁক,ওটা আঁক। মেঘ-রোদের বিশ্বাস ওদের দাদুভাই সবজান্তা, সর্ববিদ্যায় পারদর্শী! গল্পবলায় ঈশপের ঠাকুরদা, ছবি আঁকায় লিওনার্দ্রো দ্য ভিঞ্চির বাপ আর সঙ্গীতে তানসেনের বড়ভাই!
সেই-যে ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ হল, আর খুলছে না! দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কবে-যে খুলবে তাও জানে না কেউ! ধুলো জমছে বেঞ্চে-টেবিলে, বই-পুস্তকে, খাতাপত্রে,শিক্ষা-উপকরণে। কোথাও-কোথাও মাকড়সার জাল কিংবা ঝুলকালি। স্কুলমাঠে ঘাস গজিয়েছে হাটুঅব্দি। মেঘ-রোদের বইগুলোও ওদের স্কুলব্যাগে বন্দী।
সেদিন রাতের বেলা সবাই খাবার টেবিলে।
দাদুভাই মেঘ-রোদকে বলল,
-- কাল সকালে আমি একটি নতুন গল্পবলা শুরু করব।
একথা শুনেই লাফিয়ে উঠল ওরা।
মেঘদূত জোরগলায় বলল,
-- আমি নতুন ভূতের গল্প শুনব।
রোদদূত গলা সপ্তমে চড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
-- না-----আ----! আমি রাক্ষসের গল্প শুনব।
দাদুভাই ওদের বলল,
--- ভূতপ্রেত, রাক্ষস-খোক্কস, রাজা-রানি, লালপরী-নীলপরী ও সিন্দাবাদের গল্প এই ক'মাস অনেক হয়েছে। এবার আমি বর্ণমালার গল্প করব।
না-বুঝেই ওরা একসঙ্গে বলে উঠল,
--- আচ্ছা দাদুভাই!
(চলবে)
2 মন্তব্যসমূহ
কী সুন্দর!
উত্তরমুছুনকী সুন্দর!
উত্তরমুছুন