কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন : উপমহাদেশের অহংকার গোবিন্দ ধর

কথাসাহিত্যিক  সেলিনা হোসেন : উপমহাদেশের অহংকার  || গোবিন্দ ধর


বাংলাদেশের বন্ধুরা বহুদিন থেকে বললেও আমি বাংলাদেশ যাওয়ার পাসপোর্ট বের করিনি ২০১৬ সাল অব্দি। বাংলাদেশের কত বন্ধুরা আমন্ত্রণ করলেও আমি বাংলাদেশ যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারছিলাম না।২০১৬ সালে ২২ শে ফেব্রুয়ারী বিশ্ব কবিমঞ্চের সম্পাদক কবি পুলককান্তি ধর কতদিন আমায় আমন্ত্রণ জানিয়ে  রেখেছে বিশ্ব কবিমঞ্চের একুশে পদক গ্রহণ করার জন্য।আমাদের আগরতলা বইমেলার শেষ ছিলো বলে এবং তখনও পাসপোর্ট হাতে এলো না তাই  যেতে পারিনি কথা দিলেও।পাসপোর্ট হাতে এলো ২৫শে ফেব্রুয়ারী। 


পরের বছর সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় হয় চট্টগ্রামের কয়েকজন কবি সাহিত্যিক,বাচিক শিল্পী বন্ধুদের সাথে।তাদের মাঝে চট্টগ্রামের আবৃত্তি শিল্পী প্রবীর পাল অন্যতম।


প্রবীরদার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ যাওয়ার পুরো সিদ্ধান্ত নিলাম।


বাংলাদেশ বুক ক্লাব বিশ্ব অর্টিজম নিয়ে কাজ করেন। ত্রিপুরা থেকে আমায় অতিথি ও সম্মানিত করতে চান।আমি রাজী হই।বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বারলাইব্রেরিতে ছিলো অনুষ্ঠান। সেদিন প্রবীরদাসহ সেখানে উপস্থিত হই।ফিরে আসি ঢাকায় চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার মহোদয়ার আর্ট গ্যালারীতে। রাত তখন নয়টা দশটা হবে।এর আগে ঢাকার কোন এক রেস্তোরাঁয় ইমদাদুল হক সফিদার সাথে সাক্ষাৎ হয়।তিনি দেশ প্রসঙ্গে সম্পাদক। কথা হয় পরদিন আমি ও প্রবীরদা উপমহাদেশের কথাসাহিত্যের অহংকার  কথাসাহিত্যিক সেলিনা আপার সাথে সাক্ষাৎ করবো। ২০১৭ সালে।প্রবীরদা আপার নিকট থেকে পরদিন সকাল ১০ টার সময় পান। কী সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর  অনুভবে আমার ঘুম হয়নি। সকাল সকাল স্নান সেরে আমি আর ত্রিপুরার কবি অভীককুমার দে এবং প্রবীর পালদা নাজমা আপার গ্যালারী ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি শ্যামলীর উদ্দেশ্যে।


তরুণ কবি জেনিস আক্তারও আমাদেরকে সঙ্গ দেওয়ার কথা ছিলো।কোন কারণে তখন সে উপস্থিত হতে পারেনি।ঠিক দশটায় শ্যামলীর ১৬ বাই এ আমরা ডোর বেলে নক করি।সৌম্য মাতৃমূর্তির সেলিনা আপা দরজা খোলনেন।সেদিন ছিলো এপ্রিলের ১০ তারিখ। আমাদের মধ্যে এই প্রথম দেখা। 


ঘরোয়া পরিবেশে কত কথা সেদিন আমাদের মধ্যে হলো।সাক্ষাৎ প্রথম হলেও আমাদের মাঝে যুগ যুগ এক গভীর সম্পর্ক অনুভব করেছিলাম সেদিন।আমার সাক্ষাৎ করার মূল উদ্যেশ্য দুটো।এক একটি গল্প সংকলন স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করতে চাই তা তাঁকে তা বলা ও দুই উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কথাসাহিত্য উৎসব:২০১৭ জুন মাসে করতে চাই। তিনি অতিথি হিসেবে আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে আমি কৃতজ্ঞ হই।আমার দুটো আমন্ত্রণেই তিনি সায় দেন।এতে আমি খুবই খুশি হই।


জুনের ১০-১১ তাঁকে আমরা চেয়েছিলাম।তিনি আমার কথা শুনে এক মুহূর্ত সময় না নিয়েই বললেন দুটোই হবে।সেই সময় আমি কি আনন্দিতই না হয়েছিলাম।সারাক্ষণ কত কথা হলো।বাংলাদেশের সাহিত্য,ত্রিপুরার কবিতা,গল্প সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ কথা হয়।চা মিষ্টি ডালমুট ফল খেতে দেন নিজ হাতে।আমরা পরম তৃপ্তিতে গ্রহণ করি।


এক সময় তিনি শিশু একাডেমিতে যাওয়ার সময় চলে আসায় আমাদেরকে বিদায় দেন।সেদিন অসংখ্য ছবি উঠেছিলাম।আমি অভীক সেগুলো যত্নে রেখেছি।ভারতের বাইরে ঢাকায় বসে আপাকে সেদিন মায়ের আসনে বসিয়ে সেদিনকার মতো আমরাও বিদায় নিই।মনে হলো এমন মাতৃমূর্তিরূপী আপাকে পায়ে ধরে প্রণাম করি।যথা সময়ে করিও।তিনি না বললেন কিন্ত আমার মন বললো তাঁকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করাই সে পরিবেশে আমার উচিত।উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন কত বড় মাপের সাহিত্যিক হয়েও আমার মতো একজনের সাক্ষাৎকে কত গুরুত্ব সহকারে সেদিন সময় দিয়েছিলেন আজীবন তা স্মরণযোগ্য।মনে থাকবেন তিনি।


তাঁর বইটিও যথা সময়ে মেলে আসতে থাকে।তিনিও স্রোত আয়োজিত কথাসাহিত্য উৎসব :২০১৭ এ আসেন।


তিনি আখাউড়া চেক পোস্ট হয়ে আসেন তাঁর সফর সঙ্গী ছিকেন বাচিক শিল্পী প্রবীর পাল এবং তাঁর বর মোহাম্মদ। ঢাকা থেকে সেদিন নূর উদ্দীন জাহাঙ্গীর মহোদয়ও সাথী ছিলেন।জাল থেকে জালে উপন্যাস লিখে নূর উদ্দীন জাহাঙ্গীর কথাসাহিত্যে জলজীবনকে নতুন বীক্ষণে কথিত করেন।তাঁকে আমি অশোকানন্দ রায়বর্ধন,অপাংশু দেবনাথ অভীককুমার দে ও সঞ্জীব দে সেদিন শুভেচ্ছা জানতে চেক পোস্ট ছিলাম।


উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কথাসাহিত্য উৎসবে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন।আখাউড়া চেক পোষ্ট হয়ে আগরতলায় আসেন।আমরা ভগৎ সিং যুব আবাসে তুলি।পরে তিনি বয়স জনিত কিছু অসুবিধার জন্য গীতাঞ্জলি লজ এন্ড হোটেলে উঠতে হয়।সাথে দাদাও।পরদিনই এমন জ্বরে আক্রান্ত হবেন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।প্রবীরদা ও অশোকানন্দদার যত্ন,মেডিসিন আর সকলের উৎকন্ঠা। ১৩ ই এপ্রিল বাংলাদেশ যাওয়ার কথা।এদিকে প্রবীরদাকেও ফিরতে হয়।যাক সব কিছুর পর তিনি একটু সুস্থ হয়ে ফিরে গেলেও বাংলাদেশ গিয়ে ধরা পড়ে চিকেন গুণিয়া।এতে প্রায় মাসাধিক সময় আপা ও দাদা অসুস্থ ছিলেন।মনে মনে খুবই কষ্ট পেয়েছি। 


তারপর আপার সাথে আমার ও আমার পরিবারের গভীর আত্মীয়তা গড়ে উঠে।গৈরিকার সাথে তিনি খুব মিশে যান।পদ্মশ্রী মজুমদারের গল্প ও উপন্যাস পড়ে তিনি আপ্লুত হোন।এ এক কাঁটাতার ডিঙ্গিয়ে ভালোবাসার স্বর্গীয় বাঁধন আমাদের মধ্যে গড়ে উঠে।


তিনি পুজোয় আমার জন্য ও পদ্মশ্রীর জন্যে পাঠান শাড়ি শার্ট।


গত বছরও ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন গিল্ড আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন উৎসবে তিনি উদ্বোধক ছিলেন। কামরুল হোসেন কোন বিশেষ কাছে আটকে যাওয়ায় এবং অপূর্ব শর্মার ভিসা না থাকায় আসা হলো না।


এরকম আমাদের রজতজয়ন্তী বর্ষ উৎসব:২০১৯ এ আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেও তিনি আসতে পারেননি।তারপর তিনি ক্রমাগত স্রোত পরিবারের ভালোমন্দে জড়িয়ে গেলেন। তিনি আমাদের উপদেষ্টা মণ্ডলীর ঘনিষ্ঠজনও।


ইতিমধ্যে 'নির্বাচিত পঁচিশটি শ্রেষ্ট ছোটগল্প 'সংকলন প্রকাশিত হয়।তিনি হাতে পেয়ে খুব খুশি হোন।আমায় ফোনে তাঁর উৎচ্ছাস প্রকাশ করেন।


বারবার ছুটে গেছি আপার নিকট।অপাংশু দেবনাথ, সঞ্জীব দে,অভীককুমার দে সাথী ছিলো বার কয়েক।বাংলাদেশ গিয়ে আপার সাথে সাক্ষাৎ না হলে এক অপূর্ণ ভ্রমণ হবে তাই যাই বারবার। যাবোও।

আমার ও পদ্মশ্রীর অনেকগুলো বই পড়ে তিনি আমাদের সাহিত্য জার্নিকে অভিবাদন জানান।আগামী দিন আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হবে:সেলিনা হোসেন:উপমহাদেশের বাংলাকথাসাহিত্যের  অহংকার "বইটি।তিনি আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত মানবিক মূর্তি। 


 সিলেট বইমেলা:২০১৯ অতিথি হয়ে গিয়ে পরদিন চলে যাই একুশে বইমেলায়।রাত নয়টায় অপূর্ব শর্মা আমি  গোপালচন্দ্র দাস  ও সঞ্জীব দে শ্যামলীর বাসায় যাই তাঁর সাথে দেখা করতে। রাতে নানা কথা হয়।ছবি উঠি আমরা।ঢাকার কনকনে শীত তখনও ঝাঁকিয়ে বসেনি।রাত বাড়ছে।নয়টা থেকে দশটা কখন হয়ে গেলো।আলোচনা চলতে চলতে এক সময় আপার পাইলট মেয়ের ছবিতে চোখ পড়ে সকলেরই।প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গের গভীরে আপা ঢুকে কথা বলছেন।মেয়ের বিমান চালনার গল্প।আপাকে নিয়ে সেইসব বিমান চালনোর গল্পগুলো।যেদিন দূর্ঘটনা ঘটে সেদিনও মেয়েটির আত্মপ্রত্যয়ের কথা বলতে বলতে আপার মাতৃহৃদয় থেকে উচ্ছলে আসছে কান্নার অভিব্যক্তি।চোখ ছলছল করছে।আমি প্রসঙ্গ বদল করে পুনরায় ত্রিপুরায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিতে হলো।


১৭:১২:২০১৯

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ