শাশ্বতী দাস এর একগুচ্ছ কবিতা

শাশ্বতী দাস এর একগুচ্ছ কবিতা 

অস্তিত্ব

বিয়ের পর অপরিচিত বাড়িতে
অস্তিত্ব খুঁজতে খুঁজতে
যখন অস্থির হয়ে পড়তাম, জীবনটা অবহেলিত ভেবে
মনের সঙ্গে লড়াই করে কাঁদতে, 
বুক ফাঁটা আর্তনাদ চিৎকার করতো নিঃশব্দে, 
তুমি তখন জড়িয়ে ধরে হাতে হাত চেপে বলতে আছি তো! 
মুহূর্তে সব গ্লানি কর্পূরের মতো উবে যেত, 
সমস্ত ক্লান্তি সতেজে রূপান্তরিত হত বুকের চৌচির ভূমি, 
নতুন সোনালী ফসলের আনন্দে জেগে উঠতো। 
এসব মনে পড়ে? 
দীঘার সমুদ্র সৈকতে পাথরে পিছলে পড়ে হাতে খুব ব্যাথা পেলে সারা রাত ব্যান্ডেজে বাঁধা হাত নিয়ে কাতরাচ্ছো, ঘুমাই নি সে রাতে
কত ঠাকুর দেবতাকে ডেকেছি
ভোর হতেই একা বেরিয়ে গেছি
উপশমের ঔষধের খোঁজে
অচেনা স্থানে। 
ভাবিনি হারিয়ে যাবে। 
খুঁজতে  খুঁজতে যখন দোকানের সন্ধান পেলাম, তখন সব দোকান বন্ধ ছিল। 
আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম নোনা জলে চোখ ভাসিয়ে। 
জানো, সমুদ্রের নোনা জল তখন
আমার নোনা জলের কাছে হার মেনে ছিল। 
ফিরতে দেরি হলো
তুমি জেগে উঠে আমায় না পেয়ে
অস্থির হয়ে উপর থেকে হোটেলের নিচে রাস্তায় নেমে এলে, 
আমায় দেখে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে এগিয়ে এলে, 
গলায় ঝুলানো হাতের বাঁধন খুলে জড়িয়ে ধরলে আমায়। 
ভুলে গেলে স্থান কাল সমাজের নিয়ম বাঁধন, বক্রনেত্রের চাউনি,লোক লজ্জা। 
হয়তো হারানোর ভয় ছিল মনে। তোমার জন্য আনা ডাব গুলি হাত থেকে খসে পড়ে গিয়েছিল। 
তোমার চোখের কোনে অশ্রু বারি
সূর্যের কোমল আলোয় মুক্তোর মতো ঝড়ে পড়ছিল। 
আজ শুধু খুঁজি
পূর্ণিমা চাঁদে, রাতের তারায়, নির্জন অন্ধকারে, বৃষ্টির প্রতিটি ছন্দে। অস্তিত্ব খুঁজে পাই মনের দূর্বা দলের শিশিরে। 
আমি হাসতে ভালোবাসতাম
যখন বিষন্ন হয়ে পড়তাম
তুমি হাসাতে, গাইতে বলতে। 
একটু আগেও তুমি আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে চাইলে, 
এখন নাকি চাইলেও তোমায় পাব না, কোথাও নাকি নেই।
কেউ বিশ্বাস করতে বলো না, সে নেই, 
বাড়িতে, স্কুলে,ছাদে, এমনকি আমার কাজে হাত বাড়াতে। 
বিশ্বাস করি না তুমি নেই 
বিশ্বাস করি আছো মননে, ঘ্রাণে, অনুভবে, প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে, ভালোবাসায়, হৃদস্পন্দনে, সকল অস্তিত্বে, আছো, আছো আছো। আছো তো?

মন চরের মাঠ

বুকের ভেতরের 
হিরকচূর্ণ ভালোবাসা
দিতে পারি প্রেমের আলিঙ্গনে। 
মনের ব্যাকুলতা বড় ছোঁয়াচে , 
বারবার তোমার দরজায় 
কড়া নাড়ে। 
তুমি তা বোঝো বা না বোঝো, 
নির্ভরতা পেলে ব্যাকুলতা
উত্তাল ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়বে হৃদয় সৈকতে। 
বিশ্বাস কর, 
তোমার আকাশে চাঁদ হয়ে 
আলো দিতে পারি, 
দিতে পারি স্নিগ্ধতা
বুক উজাড় করা তাপে উত্তপ্ত
করতে পারি তোমার শীতলতায়।
তোমার আকাশে মেঘ হয়ে
বৃষ্টি ঝরিয়ে তোমার মাটি
ভিজিয়ে বাউল হতে পারি, 
স্বপ্নের ঘুড়ি উড়িয়ে বিনা অনুমতিতে আকাশ ছূঁতে পারি, 
জোনাকির কাছে আলো ধার চেয়ে
তোমার ঠোঁট রাঙাতে পারি। 
পারি তো?
অনেক কিছুই পারি। 
চোখে চোখ রেখে সুখের ছোঁয়ায়
তোমার হৃদয়ে ঢুকতে পারি
আদর মাখা প্রেমের হামাগুড়িতে। 
দীর্ণ দুপুরের নিস্তব্ধতার মাঝে
তোমার ছবি আঁকতে পারি। 
অন্ধকার রাতে তারা ভরা আকাশের দিকে চেয়ে হাতে হাত রেখে গল্পের দেশে হারিয়ে যেতে পারি, 
ভাবনার পানসিতে মন ভাসিয়ে
মায়াবী অলকাপুরীতে 
পাড়ি দিতে পারি। 
তবে,অবশ্যই তোমাকে সঙ্গে নিয়ে। 
সঙ্গী হবে তো আমার? 

গোপনস্তব

মনের সব আকুতি নিয়ে
নিয়ত স্মরণ করি অতি যত্নে
 স্বস্তির চাদর মুড়ে। 
গোপনে যামিনী দাঁড়িয়ে
দৃষ্টি ঝাপসা,তন্দ্রাচ্ছন্ন হৃদয়
অজানা শঙ্কায় বুক ফোঁড়ে। 
বিরহ দহনে দগ্ধ হয়ে
গোপন অশ্রু কনায়
হৃদি জলকে পুড়ি। 
জানি,
আবার বসন্ত রক্তিম আলোয়
হাসবে পলাশের আদরে, 
সুখ ছুঁবে আকাশ। 
জীবনের অথৈ নদীতে ভেসে 
মধুর মিলনে নৌকো হবে ফেরারি। 
আকুল মেধার, সুজন দাঁড়ি।

মাটির জমিন

শরীরের মেঘখন্ড কখন দরজা খুলে
বেরিয়ে গেছে, হৃদয়ে জ্বলছে তূষের আগুন,
পুড়ে পুড়ে খাচ্ছে মাটির জমিন
নিরন্তর ব্রাহ্মীলিপির অন্তরালে। 
তবুও উসখুস দহনের উজ্জ্বলতা
তৃণক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়ায়, 
মেঘ নাই বা রইল, বৃষ্টিও নেই, 
শিশির তার বিন্দু ঝরায়।

এক এক ফোঁটা শিশির বিন্দু
নিশি জ্যোৎস্নার মায়ায়
শীতল কুয়াশায় তূষের আগুন নিভেও
জ্বলে থাকে নিরন্তর প্রচেষ্টায়।

শরীর জমিন পুড়ে পুড়ে শিশির স্নাত
করুণা ঝরানো কৌশলে
শিশির লুঁকিয়ে থাকুক দগ্ধ
 জমিনের অন্তরালে।

শাশ্বতী দাসের জন্ম ১ লা জানুয়ারি ১৯৭১।তখন যুদ্ধের সময়।মুক্তিযুদ্ধের  দামাল ছেলেরা মুক্তি লাভের জন্য লড়ছে। সুবোধ দাসের ঘর আলো করে শাশ্বতী দাসের জন্ম যেন বাংলাদেশের আকাশে উঠছে মুক্তিসূর্য।
কবিতার পাশাপাশি গল্পও লেখেন তিনি।লেখেন ছড়া আর প্রবন্ধ। তিনি একজন সংগীত শিল্পীও।ত্রিপুরা প্রকাশনা মঞ্চের লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও গ্রন্থমেলা :২০২১ তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন সুবোধ যাত্রা শুরু করে।সুবোধ এখন প্রকাশনাতেও পরিক্রমারত। তিনি কথায় সুর বসান।একদিকে মৃদুভাষী ুহলেও স্পষ্ট বক্তাও।সম্প্রতি তাঁর সঞ্চালনায় মুগ্ধ শ্রোতারা। তাঁর প্রথম একক সংকলন মাটির জমিন আদৃত হবে নিশ্চিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ