আমার একটি গোলটেবিল সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ।সংকলক : তনুময় গোস্বামী

অজিত রায়, কথাকার। ধানবাদ, ঝাড়খণ্ড থাকেন। বাংলা ভাষার গদ্য ভঙ্গিতে চরম সুখ ঢেলে দিয়েছেন। অন্যরকম ব্যতিক্রম ধারা। বিকল্প কল্পনা। টান টান গদ্য।

আমার একটি গোলটেবিল সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ।
সংকলক : তনুময় গোস্বামী
------------------------------------------------------

মানস নাথ : আপনি শয়তান, নাকি ঈশ্বর?

অজিত রায় :   যে কোন সৃষ্টিই হয় শয়তান কিংবা ঈশ্বরের হাত থেকে।  কেননা স্রষ্টা মাত্রেই সময়ে সময়ে ঈশ্বর, আবার শয়তানও।  বিশেষত গদ্যকার। গদ্যকারদের মাথাটা অনেক জটিল ও কুটিল হতে হবে। ধড়িবাজ, খেয়ালি, বেপরোয়া, শ্যেনদৃষ্টি, হারামি, সন্ন্যাসী, রুগী, জাঁবাজ, কীর্তনীয়া, জাদুবাজ সব হতে হবে তাঁকে, তবেই যুগের উপযোগী গদ্য লেখা সম্ভব।  আমাকে মনি বাউরি বলেছিল, বাবুর ধান আর ধেনোর খুব পহিচান দেখছি।  কথাটা ফিলজফি ঠেকেছিল।  তো, কথাটা হচ্ছে ধান, ধন আর ধেনো আমাদের অভিজ্ঞান থেকে আসে। যারা ধানের চাল খায়, তারা কি ধেনোর টেষ্ট বোঝে?  আমি বহুল চালু কথা-কিসসার মুখোস নুচতে চাই, ‘কথা’য় কথা-বানাবার-খেলাই গদ্যকারকে ডোবায়, ন্যারেটিভিটি, যা থেকে আমি বাঁচতে চাই।  পুরো এখুনি পারছিনা হয়ত, কিন্তু মাথায় আছে । লিখছি কি, ছাই লিখছি, কী লিখছি হরদম বুঝিনা আমাকে দিয়ে কে লেখাচ্ছে, তা-ও।  লিখছি কিছু, ভাবছি হয়ত অন্য।  মজার উইট আনছি, হিউমার, অথচ মনটা কী বাজেরকম বিষন্ন।  এমনও হয়েছে কী লিখে ফেলেছি, কতটা, পরদিন হয়ত অবাক হয়েছি পড়ে।  আমি দিনরাত এক থাকি না, যেন এক সুপারি নেওয়া খুনে, ছনভন করে ঘুরে বেড়াই, কখনো নিজেকে খুব খেলো করে মিশি, কে-টির জল-বয়, মাতাড়ু, কখনো নদীতীরে একাকী দোতারা হাতে নিঃসঙ্গ বাউল।  বিশ্বাস মানুন, আমাকে যা দেখতে, আমি তা-ই নিছক নই।  কখনো গান্ধীর রাজনৈতিক-নৈতিকতা ধর্ষিত ইজারাদার গেরো সিং, কখনো গোদারের ছবি দেখে বেরনো ভাবুকরাম।  কখনো লাইনবাজ, কখনো-বা সভ্যতা বা সম্পর্কের জটিলতার পঙ্কিল চক্রব্যুহে ফাঁসা আসামি। ……তো, মজাটা হচ্ছে, হারিয়ে যাবার তো কোন রোকটোক নেই, ফিলজফিকাল ব্যারিয়ার নেই।  হারিয়ে যাই আর-কি।  ওগুলো আমার ‘দেখা’ বা ‘অভিজ্ঞতা’ হয়ে উঠে আসে।  কিন্তু বেশী না। দশজন লেখকও যদি ট্রান্সপারেন্ট হয়, নিজেকে হুবহু তুলে আনে, মাইরি বলছি, বাংলা সাহিত্য ফাটাফাটি হয়ে যাবে।  তখন কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ছোট বা বড় নয়, তখন প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা চোখে দেখা হবে।  পড়া হবে। এরম গড্ডালিকা চালে তো সামুদায়িক ভোজ খেতে যাই আমরা।  মিথিকাল প্যারালালিজম্ বলে বাহ্যভাষায় একটা কথা আছে, কবুল করি।  রুটি গুড়িয়ে চা খেত বলে ভারতচন্দ্র সৃষ্টি জানত না, এ বিশ্বাসে আনা বারণ।  তবে কল্পনার সোর্ড  চালাতে হবে, দ্বিমত নেই।  আরে বাবা, শয়তানের কি সৌন্দর্যবোধ থাকে না?  একজন চরম লম্পটও মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যায়, মালটা ‘খাসা’ বলে। 
দীপঙ্কর দত্ত : আপনি সাহিত্য আর পর্নোগ্রাফির মধ্যে ভেদ মানেন না ?
অজিত রায় :  পশ্চিমের সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক থেকে তথাকথিত ভাবে পোক্ত দেশগুলিতে সাহিত্য আর পর্নোগ্রাফির মাঝের গ্যাপটা খতম হয়ে গেছে। আমি মনে করি পর্নোগ্রাফি সাহিত্যেরই একটি অনিবার্য আর এস্টাবলিশড্ genre।  এই তো কিছুদিন আগে Georges Betaille-এর ‘Story of the Eye’ পড়ছিলাম, যার ওপর ৪৫ পাতা সমীক্ষা লিখেছেন Susan Sontag আর Ronald Barthes, তারপর Giyotat, যাঁর ‘Eden, Eden’-এর প্রিফেস্ লিখেছেন Michel Foucault,- এঁরা প্রত্যেকে সোকল্ড পর্নোগ্রাফি লিখেই সাহিত্যিক হয়েছেন ; শেষের দিকে ফুকো নিজেও ঐরকম একটা বই নাকি লিখেছিলেন।

  ‘শহরে’ সুবিমল মিশ্র যে গল্পটা লিখেছেন, ‘আলো আমার আলো ওগো’, সেটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী গল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ, আবার বাংলা পর্নো-সাহিত্যেরও। প্রয়োজন বা আর্জ হলে আমিও ওরকম উপন্যাস লিখব। তবে আমি তাকে আমার সাহিত্যেরই হিসসা হিসেবে স্বীকৃ্তি দেব। সাহিত্যের নির্দিষ্ট কোন বিষয় আছে বলে আমি মানি না। 
বিমলকান্তি ভট্টাচার্য : আপনি কি প্রতিষ্ঠান-বিরোধী নন ? 
অজিত রায় :    প্রথম কথা, সাহিত্যের মত নিত্য-প্রবহমান শিল্প প্রকরণের, যা কিনা গনগনে আঁচের মত, নদীর মত প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি গড়ে ওঠা আধুনিকতা অভাবনীয় নতুনত্বের তোড়ে ভেসে যায়, দাঁড়ায় না এক মুহূর্তও, সেখানে একজন লিখিত সাহিত্যের লেখকের পক্ষে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া খুব মুশকিল।  কেউ যদি বলছেন তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী, সেটা নিছক তাঁর আত্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছুই নয় । তাছাড়া, এর তো কোন বাঁধাধরা ছক নেই।  প্রতিষ্ঠান মুখিনতা আর বিরোধিতা দুটোই বহুস্তর পরম্পরায় পরস্পর হরদম মুখোমুখি।  ঐ ছকের রাস্তাটা থেকে কেটে বেরিয়ে, বেরোতে থাকার মুহূর্তে যে-সব বাধা তার সঙ্গে যে সংঘাত সেটাই সেই মুহূর্তের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। কিন্তু যে মুহূর্তে চালু ছকটা ভেঙে ফেলছি, পরমুহূর্তেই আরেক ছকে বন্দী, তখন আমিই প্রতিষ্ঠান, বা প্রতিষ্ঠানমুখী।  তখন আবার নিজেকে ভাঙতে হবে, পাল্টাখুন, জহরব্রত চালাতে হবে । তখন ফের সক্রিয় বিরোধিতা।  এভাবে না-ফুরোনো লড়াই।  ফলে কে কখন প্রতিষ্ঠানমুখী বা বিরোধী, তা নির্ণয় করার কোন উপায় নেই।  তবে বাংলাবাজারে যে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’র ঝাণ্ডা উড়তে দেখছি, সেটা সহজে চেনা যায়। আনন্দবাজার, দেশ কে গুনে গুনে ক’টা গাল ডেলিভার করো, ব্যাস্, তুমি বড়কা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ব’নে গেলে।  থাক তোমার পরনে অ্যাডিডাসের গেঞ্জি, নর্থস্টার জুতো, রেমন্ডের স্যুট, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সব থুতু তোমার সর্বাঙ্গে- কিন্তু তুমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী।  আমি তো ভাই বাংলা লেখালেখির জগতে গত বিশ বছর ধরে যা দেখছি, কাউকেই সম্যক অর্থে অ্যান্টি-এশটাবলিশমেন্ট বলতে পারি না।  প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিভিন্ন অনুষঙ্গ অনেকের মধ্যে দেখা যায়, আমার মধ্যেও আছে, কিন্তু যে-মুহূর্তে আমার রচনা-উৎপাদনের কাজ চলছে, আমি সক্রিয়, কিন্তু লেখাটা শেষ হতেই আমি মৃত, তখন আবার সেই ছকে।  বাংলাবাজারে একজন সত্যিকারের প্রতিষ্ঠানবিরোধীর, মানে একই সঙ্গে যিনি থিওরি এবং প্র্যাকটিসে, সামাজিক ও ব্যাক্তিগত কারবারে সেই বিরোধিতার একটা সদা-সক্রিয় রূপ নিজের সঙ্গে মিশিয়ে চলতে পারবেন, সেরকম একজন প্রকৃত প্রতিষ্ঠানবিরোধীর চাহিদা তাই থেকে গেছে।  তাঁকে আগাগোড়া ট্রান্সপারেন্ট হতে হবে, ভেতর-বার স্বচ্ছ হতে হবে।  যিনি পর্নোগ্রাফি আর সাহিত্যে ভেদরেখা টানেন, সেই স্বঘোষিত প্রতিষ্ঠানবিরোধী বাঙালীবাবুটিকে আপনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলবেন? যাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কোন প্রতিফলনই পঁয়ত্রিশ বছরের সাহিত্যচর্চায় প্রকাশিত নয়, তাঁকে?  আত্মনৈরাজ্যের এই কীর্ণ ভূমিতে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ধারণাটাই এখন ভাঁওতা হয়ে গেছে। এবং লেখালেখির ক্ষেত্রে, আমি তো বলব, প্রথাবিরুদ্ধ শাস্ত্রবিরুদ্ধতাও এক ধরণের ব্যতিক্রমী মিথ। 
মৌলিনাথ বিশ্বাস :  তোমার কাছে জীবনের শেষ অর্থ কী? যৌনতা কি তোমাকে সৃষ্টিশীল করে? করলে, কিভাবে? আমি তাত্ত্বিক অবস্থান বুঝতে চাইছি ।
  
অজিত রায় :   বিগত এই চব্বিশ বছরে আমি হয়ত অনেক কিছু করতে পারতাম-কিন্তু, অন্য দিকে না ‘পালিয়ে’ আমি যে লেখালেখিকেই আত্মস্ফূরণের আধার বা আধেয় হিশেবে ধরেছি, বরণ করেছি, লেখালেখি ঘিরেই আমার জীবনের যা-কিছু যখন, জীবনের অর্থ বা শেষ অর্থও, বলা বেশি আমার সমস্ত ভাবনা এবং খনন এই নর্মজীবন, যা আসলে কর্মজীবন,--- একেই ঘিরে।  তাতে যদি জীবনের ‘অনর্থ’ বেরোয়, তা-ও সই।  আগেই বলেছি ব্যাখ্যাহীন না-ইলাজ্ ডিপ্রেশন বা অব্যক্ত মর্মপীড়ার কথা-লেখালখি, একমাত্র লেখালখিই সে-থেকে আমাকে মানসিক উপশম দ্যায়, দিতে পারে।  আমি এখন জীবন আর সাহিত্যের মাঝে হাইফেনটুকুও রাখবার পক্ষপাতী নই, এটা আমার ভেতর থেকেই এসেছে।  ফলত, আমি যদি নিজেকে জানতে চাই, সম্পূর্ণ আবিষ্কার করতে চাই লেখার মাধ্যমেই আমাকে তা করতে হবে।  নিজের বাইরের ‘স্ব’-এর সঙ্গে ভেতরকার সংগুপ্ত ‘আমি’র ‘স্ব’-কে মেলাবার চেষ্টা-সেই আমার লক্ষ্য।  প্রতিমুহূর্তের বদল-খাওয়া ‘আমি’ কে ধরা।  সেই ‘সত্য’ বা ‘অর্থে’র জন্যে আত্মখনন।  পাশাপাশি গদ্য, শব্দকলাপ, তার মজা বা রগড়কে উপভোগ করা। 
আর, দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা, যৌনতা আমাকে সৃষ্টিশীল করে কিনা, এ প্রশ্নেরও জবাব এতখানি হতে পারে যে পৃথক একটি প্রবন্ধই হয়ে যায়। তবু চেষ্টা করি। ‘যৌনতা’ তো আমাদের বানানো শব্দ, পিতৃ্তন্ত্রের ধারণায় খরাদ করা, এবং হালের আমদানি।  আগে যখন পুরুষ-প্রকৃতি সম্পর্কের ব্যাপারটা ছিল, তখন ‘যৌনতা’ ছিল না।  ধর্মশাসন আর অ্যাকাডেমীর ট্যাবু ব্যাপারটার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে যৌনতা তার সনাতনী ঝংকারই ভুলে গেছে। উনিশ শতকের ফর্সারা হঠাৎ ধরে ফেলল যে যৌনতা জৈব-প্রজননের প্রবৃত্তিগত তাড়না হলেও, তাকে মন আর মগজ দিয়েও নাকি ‘করা’ যায়।  যে-কারণে যৌনতার প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা পাচ্ছি ‘কামশক্তি’ আর ‘কর্মপ্রেরণা’ শব্দ-দুটো যদিও  এই ধারণা ফ্রয়েডের লিবিডো ধারণা থেকে খুব-কিছু ফারাকে নয়। ফ্রয়েড যৌনতাকে একটা স্বয়মভূ ব্যাপার ভেবে এগিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর ‘আমি’ হয়ে গেল ‘লিঙ্গ’। 
 মানুষের সৃজনশীলতা, ফ্রয়েড বলেছিলেন এই লিঙ্গবোধ থেকে চাগায়। এ থেকে কিছু সরে এসে, এ-যুগের তত্ত্বদর্শী মিশেল ফুকো বললেন, সমাজের যে-কোন প্রবৃত্তিগত ক্ষমতার সম্পর্ক এবং যৌন-সম্পর্কগুলো, সরাসরি আড়ালে বা আপাত-অযৌন মনে হলেও তা আসলে প্রতাপেরই স্ফূরণ।  আমি এসবের কোনটাই অগ্রাহ্য করছি না, কিন্তু যদি যৌনতা বলতে এখনো শুধু জৈবিক কামতাড়নাকেই ইঙ্গিত করা হয়, দুঃখিত, ঈশ্বরের মত তথাকথিত যৌনতাকেও আমার ভাবনার ভারসাম্যে কোথাও বসাতে পারছি না। কেননা, ঈশ্বরের কথা বাদ দিলেও, সেই ‘যোনি’-উদ্ভূত যৌনতা আমার কাছে ততখানি যথার্থ, তার অনেক বেশি কল্পনা।  একটা নিরাবয়ব ফোর্সের মত আমার কাছে যৌনতা।  এটাকে যে-যেমনভাবে ভাবতে চাইবে, তার কাছে তা-ই যৌনতা। কেউ নারীর পায়ের টো থেকে চুলের ঘ্রাণ অব্দি সর্বত্র যৌনতা পায়, কেউ-বা-যেমন উদয়ন ঘোষ, -কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা লতা মঙ্গেশকরের গলা শুনেও সেটা ফিল্ করেন।  আমার এক বান্ধবীকে দেখতাম, সুন্দর-কিছুর রসময় বর্ণনাই তাকে বেসুধ করে ফেলত, জাগতিক যা-কিছু শুধু কল্পনায় ছোঁয়া যায় অথবা অনুপম কোন কিছুর স্বপ্নই তাকে অরগ্যাজমে পৌঁছাতে দিত। নতো, আমার কাছে যৌনতা খানিক ঐরকম।  যৌনতা শব্দের উচ্চারণ-মাত্রে যে আমার লিঙ্গ বা যোনি মনে পড়ে ঈশ্বর বা অদৃশ্য-শক্তি বলে ভাবি, যে আমাকে ক্রিয়েটিভ রাখছে, আমার ‘আমি’কে স্টিয়ার করছে, হোক সে ‘অহং’, কিন্তু সেই সত্য তো আমি অনুভব করছি!  সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘কামুক’রাই এগিয়ে।  যৌনতা, হ্যাঁ, আধুনিক অভিধায় তো তা-ই বলব।  আসলে এ-দেশে, বহির্বিশ্বেও ‘তত্ত্ব’ হিশেবে যৌনতা এখন এমন পিলপিলে পর্যায়ে আছে যে বিষয়টি উত্থাপন করাই দুরূহ এবং ঝুঁকির।   পিতৃতন্ত্র আর ধর্মের ট্যাবু আমাদের গবেষণা আর জ্ঞানার্জনের ফাটক রুদ্ধ করে রেখেছে ।  ধর্ম বা আধ্যাত্ম নিয়ে আমরা যতটা ভেবেছি, অনাস্থা আর অস্থিরতার পাল্লা যেন ক্রমশ ভারি হচ্ছে।  সংখ্যাতাত্ত্বিক হিশেব নেই, কিন্তু অনুমান করি অ্যান্টি-আরবান মানসিকতায়, নাস্তিকদের দিকেই যেন ভিড় বাড়ছে।  যুক্তির কাছে পরাস্ত প্রফেটদের দাঙ্গা-উৎপাদক শাস্ত্রের উল্লাস।  ঐ ধর্ম নিয়ে যতখানি মেতেছি আমরা, তার চেয়েও বেশি দরকার যৌনতা নিয়ে।  এথোপোয়েটিক্যালি ভাবতে হবে ব্যাপারটা নিয়ে।  ফ্রয়েডের ‘সৃজনশীলতা’র ব্যাখ্যাকে নারীবাদীরা মনগড়া বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, ভাবতে হবে নতুন করে ।  কেননা, ‘মন’ তো বস্তু-নিরপেক্ষ অন্য কিছু না।  হ্যাঁ, ‘কামশক্তি’ অর্থে নয়, ‘কর্মপ্রেরণা’ বা ‘সৃজনশীলতা’ হিশেবে যৌনতাকে আমি মান্য করি।
সঞ্জীব নিয়োগী : ‘শিল্প’ ব্যাপারটাই কি একটা কৃত্রিম ব্যাপার নয়?  শিল্পের কোন ধারা-ই কি এই কৃত্রিমতা (Imitation) এড়াতে পারে?  সম্ভব?  কীভাবে, কীভাবে নয়?  এ প্রসঙ্গে ‘বাস্তবতা’র দাবি-টাবি কী উপায়ে বিশ্লেষিত হবে? 

অজিত রায় :  তুমি যে গোড়াতেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাথরডাঙ্গা গ্রিস থেকে মাইমেসিস শব্দটা ঢুয়ে এনে আমার পিঠে বসালে, ধন্যবাদ, সেই সুদূর প্লেটো-অ্যারিস্টটল্, হোরেস, মধ্যযুগ আর রেনেশাঁর কর্তাদের থেকে ধেয়ে আসছে শব্দটা, এটা নিঃসন্দেহে শিল্প সাহিত্যের ‘সংজ্ঞা’ নিরূপণে তুমিও সত্যের কেন্দ্র-বিন্দু থেকে খুব অল্প দূরেই আছো। অনুকরণ বা মাইমেসিস হলো সর্ববিধ কলার genus. অনুকরণের রীতি-ছন্দ, ভাষা আর সঙ্গতি।  সাইকোলজিক্যালি, লেখক লেখে মূলত দুটি কারণে ----- অনুকরণ-বৃত্তি আর সঙ্গতি-বোধ।  Imitation as an Aesthetic term, এটা এখনো অব্দি অগ্রাহ্য হয়ে যায়নি।  চারুশিল্প বা fine art কথাটা গ্রিকরা জানত না।  তাদের পরিভাষা : ‘মাইমেটিকাই টেকনাই’।  All art is mimesis কথাটার প্রবর্তক অ্যারিস্টটল্ নন, প্লেটো এবং তার আগেও কথাটা চালু ছিল গ্রিসে।  অনুকরণ বা Imitation শুনলে মনে হবে স্বাধীন কল্পনার চান্স নেই ----- যদ্দৃষ্টং তল্লিখিতং গোছের।  তা তো আর নয়।  শিল্পীরা অনুকরণ করে as they ought to be . একটু আগে যেটা বলেছি, শিল্পের অনুকরণ শুধু বাহ্যদৃশ্য বা ঘটনা নয়, তার তিনটে বিষয়- চরিত্র, আবেগ আর ক্রিয়া।  এগুলো ভেতরকার জিনিশ ।  যে-কারণে পরবর্তীকালে সাহিত্য-শিল্পে অনুকরণের ‘বিষয়’ হয়েছে- মানুষের জীবন, জীবনের মানসিক, আত্মিক আর দৈহিক আচার। প্লেটো-অ্যারিস্টটলের সময় wit, taste, imagination, fancy, feeling এসব শব্দের আবির্ভাব ঘটেনি, ফলে ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন্ সম্পর্কে তখন কোন ধারণা গড়ে ওঠেনি।  অথচ লেখালেখি ব্যাপারটা সৃজনশীল কল্পনা বৃত্তিরই কাজ।  ‘কৃ্ত্রিমতা’ কোন্ অর্থে বলছো বুঝতে পারছি না, লেখালেখি তো বাস্তবের হুবহু অনুকরণ বা প্রতিরূপ নয়, ---- সেই বাহ্যবস্তু বা বাস্তব লেখকের মনে যেভাবে প্রতিভাত, তারই প্রেজেন্টেশন্।  লেখার যাদু লেখকের বুদ্ধিতে নয়, অনুভবে, কল্পনাবৃত্তিতে।  শিল্প সত্যের রূপাভিব্যক্তি, সত্যের ধারণামাত্র নয়।  আসলে, আমি যখন লিখি, অভিজ্ঞাত অভিজ্ঞান থেকে লিখি --- সেই জগৎটা কিন্তু অন্ধকার আর মায়ায় ঢাকা, মায়া সৃষ্টিতে দক্ষ না হলে বড় সাহিত্যিক হওয়া যায় না।  অমিয়ভূষণ সম্ভবত একেই বলেতে চেয়েছেন সত্ত্বগুণ, এটা আমার চেয়ে অনেক বেশী মাত্রাই পাই কমল চক্রবর্তী লেখায়।  সন্দীপন বা সুবিমলে তেমন পাই না।  কমল এখনও সেজন্য আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নেন।  আসলে সাহিত্যের যে ‘কৃ্ত্রিমতা’ বা Imitation, তা কিন্তু প্রচন্ডভাবে Phantasia গোছের, জ্যান্ত ।  যে-কারণে মধ্যযুগে Phantasia আর Imagination শব্দ-দুটো একই অর্থে ব্যবহৃত হতো।  যদিও ফ্রেকাসতোরো বলেছিলেন Phantasia হলো reproductive power আর Imagiও9nation হলো unifying power.  আঠারো শতকে এসে প্রথম শব্দ পাচ্ছি ‘এস্থেটিক’।  মানে ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের অটোনমি সাব্যস্ত না হওইয়া পর্যন্ত খাঁটি এস্থেটিকের জন্ম হয়নি। গামবাতিস্তা ভিকো থেকে এস্থেটিকের শুরু।  এইভাবে ভিকো থেকে কান্ট, অনেক তত্ত্বদর্শী্রাই শিল্প-টিল্প নিয়ে নানারকম কথা বলেছেন, কিন্তু শিল্পের মূল যে-সংজ্ঞা প্লেটো-অ্যারিস্টটল অস্পষ্টভাবে দিয়েছিলেন, সেটা থেকে আলাদা বা নতুন কোন লক্ষণ কেউ নির্দেশ করতে পারেননি।  অ্যারিস্টটলের ‘মাইমেসিস’ আর কান্টের ‘জাজমেন্ট’ পৃ্থক ধারণা নয়।  উনিশ শতকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হেগেল, কোলরিজ, ভিক্টর কুঁজো, শেলী, হার্টম্যান, প্রুধোঁ, নীৎসে, টলস্টয় এঁরা আমাদের মাথা খারাপ করেছেন মাত্র, নতুন কিছু শোনান নি।  আমাদের দেশেও রসবাদ, অলঙ্কারবাদ, নীতিবাদ, ধ্বনিবাদ, রম্যার্থবাদ এমনি আরও কতই না মতবাদ সাহিত্য শিল্পের-আত্মার পোস্টমর্টেম করবার চেষ্টা করেছে।  কিন্তু এই চেষ্টার শেষ ফল কিন্তু এক,-সবাই লেখালেখিকে অনুভব-কল্পনা-বুদ্ধিমিশেল যৌগিক মানসিক ব্যাপার বলে মনে করেন। এই প্রাগুক্ত মতবাদ আর লেখকেরা প্রত্যেকে ছিলেন ক্লাসিকাল গোষ্ঠীর, রক্ষণশীল আর এঁড়ে।  সুতরাং তাঁদের উত্তরসূরীরাও, আজও, শিল্প সাহিত্যকে ‘অনুকরণ’ মনে করবেন।  কিন্তু আমি মনে সাহিত্যে আজ যেরকম ভোলবদল আর পরীক্ষা চলছে, তা কোনক্রমেই নিছক ‘নকল’ হতে পারে না।
রীনা ভৌমিক : আপনি শব্দরাজ্যে অরাজকতার তাঁবেদারি করছেন? 

অজিত রায় :  অরাজকতার তাঁবেদারি! আমি করছি?  মানে?  এই কালো পতাকাটা তো পৃথিবীর সমস্ত ভাষাসাহিত্যকেই গোড়া থেকেই সয়ে আসতে হয়েছে বুন্টি। অ্যাংলো-স্যাক্সনে ফরাসি ভাষার মিক্সচার হচ্ছে যখন ইংল্যান্ডে, এইরকমই গেল-গেল হল্লা। সেই হাইব্রিডাইজেশনে লকড়ি লাগালে ইংরেজি সাহিত্য আজ এমন লাফ-মারা হতে পারত?  ইওরোপের সব ভাষাই এমনি, জারগন্ । সব জায়গাতেই তোমাদের দল ছিল, গেল-গেল ছিল। কথাটা হলো, মুখের কথাটা যে সাধুভাষারই অপভ্রংশ, সেইটে কেউ বলে না ; শুধু সাধুভাষাই খানিক মুখের ভাষা ঢুকেছে অমনি হারেরেরে-হারে হামলা। তারবাদে, বাংলা ভাষারই কেঁচো যদি খুঁড়তে চাও, খোঁড়ো, দেখবে এ ভাষার পাতনটাই তৈরি হয়েছে সংস্কৃত শব্দের ডোয়ার্ফ আর ঠুঁটো-নুলো আধভাঙ্গা শব্দ নিয়ে।  রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্তরা তো বিভক্তিহীন সংস্কৃতটাকেই ‘বাংলা’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন।  তারপর মহাকবি মাইকেল মধুসূদন, উনি যখন আমাদের গ্রামে যান, তখন তো ভালো বাংলাই জানতেন না। ওই তোড়ফোড় গোছের এপিকগুলো, ওগুলো তো বেশির ভাগ আরকেইজম্ দিয়ে সারা। ডিকশনারি ঘেঁটে, পথচলতি মামুলি শব্দ এসবই ছিল মাইকেলের বেসিক নিওলজি। তাছাড়া, তার নাটকগুলো দ্যাখো, দীনবন্ধু মিত্র, ----- বেশি না, বঙ্কিমবাবুর মৃণালিনী আবার করে পড়ে দ্যাখো, ওগুলো কি হুতুম প্যাঁচার কোঠায় পড়ে না?  রবীন্দ্রনাথ তো প্রথম ক’দিন ফয়সালাই করে উঠতে পারেন নি, প্রবন্ধগুলি মসনদী ঢঙে লিখবেন নাকি বীরবলী আন্দাজে। তো, আমার চেষ্টাটা, বলতে পারো, একটা তরতিব্।  ঐ চলে আসা কালো পতাকার সারিতে, আরেকটা।  গরম কড়াইয়ের ছনছন হলে তো কবেই উবে যেতাম।…তো, যে-কথাটা আমার তরফে বলার, আমি ভাই বিহার বাংলা ঝাড়খন্ডের ছিলকা-খাওয়া লোক, পিতৃভূমি বাঁকুড়া, মাতৃভূমি মানভূম।  হাজার কিশিমের শব্দ শুনে আসছি হামাগুড়ির বয়স থেকে। কাজ করতে বসে যতরকম ভাষায় আমার দখল, তৎসম বাংলা তো বটেই, তদ্ভব, দেহাতি বাংলা, হাটবাজারের, ভাঁটিখানার বাংলা,  ডেলি প্যাসেঞ্জারের বাংলা, তারপর হিন্দী, চোয়াড়ে হিন্দী, বিহারি বুলি, লালু-রাবড়ি বুলি, ভোজপুরী, মগহী, ঝাড়খন্ডী, খোরঠা, মায় উর্দু-ইংরেজি, যেটা যখন যতটুকু দরকার টপাটপ তুলে এনে গেঁথে দিই।  মনে করি, একজন লেখক যতরকম শব্দ জানেন, সব ঢুয়ে এনে বসাতে হবে গাঁথুনিতে ।  এভাবে বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাস স্প্রেড করবে। ‘কথা’য় নতুন জেল্লা ফুটে উঠবে।  আমি সাহিত্যে শেকড়-বিহীনতার খেলাপ।  মনে করি শেকড়হীন সাহিত্যপ্রচেষ্টা বা ঐতিহ্যবিরোধী সৃষ্টিপ্রযত্ন, কথাগুলি শুনতে যতই রেভলিউশ্যনারি লাগুক, গোটাগোটি এই ধাঁচের কোনও অভ্যুত্থান হতে পারে না।  লেখককে, এবং সাহিত্যকে, জমিনের থেকে শব্দ ওঠাতে হবে, লোড করতে হবে।  আর, ‘গদ্যে ঢালাও হিন্দী শব্দের অনুপ্রবেশ’।  ছ্যা, আমি কি তাই করেছি নাকি?  হাসালে দেখছি। 
বারীন ঘোষাল :  সাহিত্যকর্মকে তুমি বলেছো পলায়নি বৃত্তি।  বলেছো, ‘কাজ আর কৃত্যের বাদাড় থেকে পালিয়ে অক্ষরের মুজঘাসে লুকনো’।  এটা তুমি বিশ্বাস করো ? 
অজিত রায় :   পলায়ন।  হ্যাঁ, বিশ্বাস করি মানে, খটকার কথায় আমি বলেছি।  অবশ্য সেভাবে দেখলে মানুষ যা কিছু করছে সবেতেই, পালাচ্ছে। গান শোনা, ক্রিকেট, সোপ অপেরা, বউ-বাচ্চা সামলানো, ব্যাঙ্ক সামলানো, ভালমন্দ খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, রাতে কাজবাজ সেরে ঘুমিয়ে পড়া, ঐ ঘুমোনোও কিন্তু একরকম পালানো। মানুষ এসবের মধ্যে নিজের স্বপ্নকে দ্যাখে, আর স্বপ্ন দেখবে বলে ঘুমোয়।  লেখকের কাজটা তার-চে আলাদা কিছু নয়।  তফাৎ এই যে, লেখক জেগে জেগে স্বপ্ন দ্যাখে।  
বারীন ঘোষাল :  এই পলায়ন কেন? 

অজিত রায় :  আমি কেন লিখি এর জবাব আত্মজীবনীতে দিয়েছি।  যে, কেউ আমাকে পেছন থেকে স্টিয়ার করছে, কলকাঠি নাড়ছে। আমার মনে হয়, মাত্র সেই কারণেই শুধু নয়, লেখক পালাতে চায় নিজের দুরারোগ্য বা অব্যক্ত ডিপ্রেশন্ থেকে রেহাই পেতে, অমিয়ভূষণ বারবার যাকে ট্রমা বলে উল্লেখ করেছেন।  আমি গভীর ও ব্যাখ্যাতীত ডিপ্রেশনে যখন ভুগি মাঝেমধ্যে, তখন স্ক্রু ড্রাইভার খুঁজি, খুরপি, হাতুড়ি, স্কেচপেন বা বোতল। সেমনি, কলমও খুঁজি।  অমিয়ভূষণ ট্রমা বলতে অবশ্যই গ্রিক শব্দকোষে যে-অর্থে, সাইকিক ট্রমা, কবি-লেখকদের মধ্যে অব্যক্ত প্রতিকারহীন না-ইলাজ মানসিক কষ্ট, অন্তহীন ব্যথা।  লেখকরা এই ট্রমা থেকে মানসিক মুক্তি পেতেই স্বপ্নবৃত্ত রচনা করে, লেখা, গল্প-উপন্যাস, সেই স্ব-সৃষ্ট স্বপ্নবৃত্তে পাক খেয়ে চলে।  স্বপ্ন নির্মিতি পেলে, মানে লেখাটা বেরিয়ে এলে সে সুখও পায়।  ঐ সুখ হল রস । রস না-পাওয়া কোন লেখক ‘সাহিত্যিক’ নয়, কবি নয়, স্রষ্টা নয়।  সেই তার পরিপাশ আর সময় থেকে বেরিয়ে, বন্ধনমুক্ত প্রাণের এহ্সাস। কবি তখন শিশুর মতো।  তার মৃত্যুভয়ও লোপাট তখন।
তনুময় গোস্বামী :   আপনি লেখালেখিকে কখনও ‘spiritual practice’ হিসেবে দেখেছেন ?
অজিত রায় :   জীবনে হয়ত অনেক কিছুই করতে পারতাম, কিন্তু, অন্যদিকে না ‘পালিয়ে’ আমি যে লেখালেখিকেই আত্মস্ফুরণের আধার বা আধেয় হিশেবে ধরেছি, লেখালেখি ঘিরেই আমার জীবনের যা-কিছু যখন, জীবনের অর্থ বা শেষ-অর্থও, বলা বেশি আমার সমস্ত ভাবনা এবং খনন এই নর্মজীবন, যা আসলে কর্মজীবন,--- একেই ঘিরে।  তাতে যদি জীবনের ‘অনর্থ’ বেরোয়, তা-ও সই।  আগেই বলেছি ব্যাখ্যাতীত ডিপ্রেশান্ বা অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা- লেখালেখি, একমাত্র লেখালেখিই সে-থেকে আমাকে মানসিক উপশম দেয়।  এখন আমি জীবন আর সাহিত্যের মাঝে হাইফেনটুকুও রাখবার পক্ষপাতি নই।  ফলত আমি যদি নিজেকে জানতে চাই, সম্পূর্ণ আবিষ্কার করতে চাই, লেখার মাধ্যমেই আমাকে তা করতে হবে।  
তনুময় :   নতুন উপন্যাস শুরু করার আগে আপনার কী ধরণের প্রস্তুতি থাকে?  কোন নির্দিষ্ট গবেষণা ? হলে, তা কতদিনের?  উপন্যাসের চরিত্রগুলোর নাম আপনি কীভাবে নির্বাচন করেন?  আপনি কি কখনও রাইটার্স ব্লকে পড়েছেন? 
অজিত রায় :   লেখালেখি খরিশ জিনিশ।  জগদ্দল পাথর দেওয়া হয়েছে হাতে, তাকে ঠেলে-ঠেলে তোলা।  প্রস্তুতি এটুকুই যে পাথরটা কখন হাতে আসবে।  ওটা না-পাওয়া-অব্দি লেখা খোলস ছাড়ে না। তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতি, সেটাই লেখার ভাবনাকে প্রেগন্যান্ট করে।  উপন্যাসের মূল চরিত্রই আমি। সুতরাং পাণ্ডুলিপির প্রথম খসড়ায় ‘অজিত’ নামটাই বসাই।  ফের হঠাৎ লাগসই নাম মাথায় এলে অজিত কেটে ওটাকে পেস্ট করে দিই।  হ্যাঁ, রাইটার্স ব্লক একসময় হয়েছিল বইকি!  আমার শেষ-চাকরিটা করার বছরগুলোতে, ১৯৮৯ থেকে ’৯৫- এই কাল পরিধিতে।  মায় বাংলাভাষা ভুলে, বাংলা ভুলে , চাদ্ধার কেমন লোপাট আর থম্-মারা। সুতরাং বিষণ্ন ও মৃত্যুমুখী, নিজেকেও কেমন অকেজো ও মৃত ঠেকতো, তদুপরি ফতুর।
★★★★★★★




(সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল 'শহর'-২৬-এ।  তারপর বিশেষ সংযোজন-সহ বের হয় অধ্যাপক Dr Dipak Kumar Sen -এর আর্থিক আনুকূল্যে এবং সম্পাদকত্বে 'বিষয় : অজিত রায়' গ্রন্থে।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ