সাক্ষাৎকার সঞ্জীব দের মুখোমুখি নারায়ণ দেব
যাত্রা শুরু ঠিক কবে থেকে হয় তার দিনক্ষণ সঠিকভাবে জানা না গেলেও তবে এটা জানতে অসুবিধা হয় না যে যাত্রার ইতিহাস সুপ্রাচীন। যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন যাপন করতো শিকারে যাওয়ার আগে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ করতো তখন থেকেই যাত্রার সূচনা । আনুমানিক ষোল শতাব্দী থেকে যাত্রার জয় যাত্রা। ব্রজেন্দ্রকুমার দে ঐতিহাসিক যাত্রাপালার সার্থক রূপাকার। তাঁর রচিত প্রথম কাল্পনিক যাত্রাপালা রঞ্জন অপেরা'র জন্য- "রাজ নন্দিনী" অসাধারণ যাত্রাপালা।রাজন্য শাসিত ত্রিপুরায় যাত্রার প্রচলন হলেও ধন্য মানিক্যের আমল থেকে যাত্রার প্রসার শুরু হয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তবে তা ধীর গতিতে ।১৯৪৭ সাসে স্বাধীনতার পর তার গতি ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে গ্রামে গঞ্জে । ত্রিপুরার যাত্রাপালার মঞ্চ দ্বার উন্মোচিত হয় মোটামোটি পঞ্চাশের দশকে। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশককে ত্রিপুরার যাত্রা পালার সুবর্ণ যুগ বললে বেশি বলা হবে না। যাত্রা ও নাটক দুটোই সমাজের দর্পন। আজ আমরা মুখোমুখি হবো এমন একজন অভিনেতার সাথে, তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় মানুষ ও ত্রিপুরার নাট্য ব্যাক্তিত্ব নারায়ণ দেব।
সঞ্জীবঃ- দাদা ত্রিপুরায় নাট্য আন্দোলনে আপনার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না --- নাট্য জগতে কবে কি করে আসা?
নারায়ণ দেব ---
১৯৬৯ সাল, আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। কোন একদিন শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হীরালার সেনগুপ্ত, শিবদাস ব্যানার্জী, যুগল বৈদ্যরা রাধানগর আমাদের ক্লাবে এলেন। আমাদেরকে নাটক করাে ব্যাপারে উৎসাহিত করলেন। বই ঠিক হলো অরুন কুমাে দে'র লেখা 'কার দোষ'। আমার চার লাইনের পার্ট। পরিচালক হীরালাল সেনগুপ্ত। সেই শুরু আজও চলছে।
সঞ্জীবঃ-- আপনার দেখা সেরা নাটক।
নারায়ণ দেবঃ-- আমার দেখা সেরা নাটক- 'আলিবাবা' প্রযোজনা -আনন্দম।(১৯৭৭) সাল।নিজের অভিনীত সেরা নাটক- 'অনিকেত সন্ধ্যা"- প্রযোজনা- পটভূমি ( ২০১১-১৫),
প্রিয় নাট্যকারঃ- মোহিত চট্টোপাধ্যায় ( কোলকাতা) কমল রায় চৌধুরী,চন্দন সেনগুপ্ত(ত্রিপুরা)।
সঞ্জীবঃ- আপনার প্রিয় অভিনেতা?
নারায়ণ দেবঃ--আমার প্রিয় অভিনেতাঃ আবদুস সালাম মল্লিক,আশিষ মোদক।
সঞ্জীবঃ--আপনার প্রিয় থিয়েটার ?
নারায়ণ দেবঃ- পিপলস্ থিয়েটার ও পটভূমি।
৩) সঞ্জীব ঃ--"........ ত্রিপুরা" নাট্য গোষ্ঠীর আপনি একজন একনিষ্ঠ সৈনিক --- নাট্য সৈনিক হিসাবে ত্রিপুরার নাটকের সুখ দুঃখ নিয়ে আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।
নারায়ণ দেবঃ-- সুখ দুঃখ বলতে নাটক করে অনেক সম্মান পেয়েছি পুরস্কার পেয়েছি। সবচেয়ে বড় যেটা মূল্যবোধ শিখেছি। নাটক আমাকে শৃঙ্খলা শিখিয়েছে,সঙ্ঘবদ্ধতা শিখিয়েছে। দুঃখ বলতে সংস্কৃতির অন্য শাখার সমস্ত শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি অন্যান্য শিল্পীরা যেরকম সম্মান পান নাট্য শিল্পীরা তেমন সম্মান পাননা। বাইরে কোথাও নাটক করতে গেলে কোন স্কুর ঘর বা ক্লাব ঘরে নাটকের শিল্পীদের থাকার ব্যবস্থা হয়। নাটকের জন্য পৃষ্টপোষকতা করতে কেউ এগিয়ে আসেন না। দেড় - দুই মাস রিহার্সাল করে নাটক করতে হয় নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে।
যাইহোক দুঃখের তুলনায় সুখের পাল্লাটাই বেশি।
সঞ্জীবঃ--শূন্য দশকের পর থেকে ত্রিপুরায় নাটকের গতি কোন পথে --- আপনার মতামত জানতে চাই।
নারায়ণ দেবঃ--ষাট/ সত্তরের দশকে নাটক করার জন্য তরুনদের মধ্যে যে উন্মাদনা ছিল সেটা এখন অনুপস্থিত। রাজধানি আগরতলা শহরে হাতে গোনা কয়েকটা দল নিয়মিত নাট্ক মঞ্চায়ন করছে। বাকিদের অভিনয় অনিয়মিত। তবে নতুন দিকও আছে এখন প্রায় সব গুলি নাট্যদলই শতকরা ৯৯ভাগ স্থানীয় নাট্যকারের লেখা নাটক করছে। আগরতলা থেকে মহকুমায় নাটকের চর্চা বেশি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ধর্মনগর, খোয়াই, বিলোনীয়া উদয়পুরে নিয়মিত নাটক হচ্ছে। নতুন নতুন ছেলে মেয়েরা নাটক নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করছে। অসাধরন সব প্রযোজনা উপহার দিচ্ছে। রাজ্যের নাটক রাজ্যের বাইরে এমন কি বিদেশেও যাচ্ছে, উচ্চ প্রসংশিত হচ্ছে। বলা চলে নাটকের গতিময়তা ধিরে হলেো স্রোতস্বিনী।
সঞ্জীবঃ--নাট্য আন্দোলনে আপনার কিছু স্মরণীয় মুহুর্তের কথা শুনতে চাই প্লিজ।
নারায়ণ দেবঃ---নাটকে প্রচুর স্মরনীয় ঘটনা। স্বল্প পরিসরে সব বলা সম্ভব নয়। ১৯১৫ সাল। ভীষ্মদেব স্মৃতি ছোটদের নাটক প্রতিযোগিতায় আমার নির্দেশনায় নাটক 'রাবন রাজা'। রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের এক নম্বর হল। অভিনেতাদের মধ্যে আমার নাতি সবুজ (৮ বছর) নাতনি রূপকথা ( ৯ মাস) একসঙ্গে অভিনয় করেছে। ৯ মাসের বাচ্চা মঞ্চে কান্নাকাটি নাকরে হামাগুড়ি দিয়েছে। এটা দেখে সবাই বিষ্ময় প্রকাশ করেছিল,প্রশংসাও করেছিল।
সঞ্জীবঃ- ত্রিপুরার নাটকের ভবিষ্যৎ কী?
নারায়ণ দেবঃ--নাটকের ভবিষ্যৎ খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
সঞ্জীবঃ-- ত্রিপুরায় নাট্য চর্চার ক্ষেত্রে কি কোন অন্তারায় আছে বলে মনে করেন?
নারায়ণ দেবঃ-- অর্থই নাট্য চর্চার মূল অন্তরায়। রাজন্য আমলে নাটকের পৃষ্টপোষকতা করতেন রাজারা। রাজ-অন্তঃপুরের বাইরে যখন নাটক এল তখন যারা নাট্য চর্চা করতেন তারা সকলেই রোজগার করতেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ ঠিকেদারি আবার কেউ চাকুরি। রোজগারের তেমন সমস্যা ছিলনা। পরিবার প্রতিপালনের কাজটা এতটা কঠিন ছিলনা। বর্তমানে রোজগার একটা বড় সমস্যা। পেটে ভাত না থাকলে নাটক কি করে হবে? নাটকে ব্যবসায়িক ব্যাপারটাই নেই। মুখে পেশাদারি বললেতো হবে না। ত্রিপুরায় নাটকে পেশাদারিত্ব ব্যাপরটাই গড়ে উঠেনি। NSD / SNA- র অনুদানের উপর নিঅভর করেতো সারা বছর নাটক করা চলেনা।
সঞ্জীবঃ--আগরতলা নাট্য চর্চার শুরু থেকে বর্তমান -- বিভিন্ন দিক নিয়ে যদি একটু তুলে ধরেন।
নারায়ণ দেবঃ--এই প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারিনি। আমার শুরুর দিকটা তো বললাম।
ত্রিপুর রাজ্যের নাট্য চর্চার শুরু রাজন্য আমলে। এ ব্যাপারে মহারাজা বীর চন্দ্র মানিক্য, রাধাকিশোর মানিক্য ও বীরবিক্রম কিশোর মানিক্যের অবদান উল্লেখযোগ্য।উজ্বয়ন্ত নাট্য সমাজ, পুষ্পবন্ত নাট্য সমাজের প্রযোজনা গুলি ছিল যথেষ্ট উন্নত মানের। কিন্তু সে সব নাটকে প্রজা সাধারনের কোন ভূমিকা ছিলনা। ৫০এর দশকে স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের হাত ধরে নাটক রাজ অন্তঃপুরের বাইরে পা রাখে। ত্রিপুরেশ মজুমদারের ত্রিপুর শিল্পায়তন, শক্তি হালদারের -ত্রিপুরা লোক শিল্পী সংসদ, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পায়ন ত্রিপুরার নবনাট্য আন্দোলনে গতির সঞ্চার করেন। ত্রিপুরেশ মজুমদার, শক্তি হালদার ও শিবদাস ব্যানার্জী এই ত্রয়ী রাজ্যে নাট্যান্দোলনের পথিকৃত। এর পর সত্তরের দশক নাটকের সুবর্ণযুগ।
সঞ্জীবঃ--বাংলাদেশও নাটকে দারুণ একটা স্থান দখন করে আছে -- ত্রিপুরায় কি সেই দিক থেকে একটু পিছিয়ে আছে? কী মনে করেন?
নারায়ণ দেবঃ-- বাংলাদেশ একটা রাষ্ট্র আর ত্রিপুরা হচ্ছে একটা অঙ্গ রাজ্য। বাংলাদেশে নাটক করার প্রচুর সু্বিধা আছে,যেটা ত্রিপুরার ক্ষেত্রে অনেকাংশেই কম। তারপরেও আমি বলব ত্রিপুরার নাটকের মান বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে তো নেইই বরং এগিয়ে আছে।
সঞ্জীবঃ--নাট্য চর্চাকে এগিয়ে নিতে আপনার পরামর্শ কী হবে।
নারায়ণ দেবঃ-- শুধু নাটক করলেই হবেনা প্রযোজনার মান উন্নত করতে হবে। লোক কাহিনীর উপর জোর দিতে হবে। নাটকে মানুষের কথা বলতে হবে।নাট্য চর্চার মান সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হলে আবার হলে দর্শকের লাইন পরবে। এই যোগ্যতা বর্তমান প্রজন্মের আছে এটা আমি বিশ্বাস করি।
সঞ্জীবঃ--নাটকে অভিনয়, পরিচালনা ও নির্দেশনা করতে গিয়ে কী কোন সমস্যায় পড়তে হয়েছে কখনো --- সেই সম্পর্কে কিছু বলুন
নারায়ণ দেবঃ-- পরিচালনা/ অভিনয়ে সমস্যা।
আমি ছোটদের নাটক পরিচালনা করি। সে ক্ষেত্রে ছোটদের পড়ার এত চাপ। ফলে তাদের সঙ্গে এডজাস্ট করে আমাকে রিহার্সালের টাইম ঠিক করতে হয়। এমনকি রাত ৯টায়ও রিহর্সাল করতে হয়। প্রাইভেট ট্যুইশনের ফলে সব বাচ্চাদের একসঙ্গে পাওয়াটাও দুষ্কর। আবার দেখা গেল নাটক মঞ্চায়নের দিন কোন অভিনেতার পরিক্ষা বা কোন স্পেশাল ক্লাশ। এগুলো মোকাবিলাতো করতেই হয়।
বড়দের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছ নিয়মানুবর্তিতা। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোন সমস্যার সম্মুখীন হইনি।
সঞ্জীবঃ--আর্থিক সংকট কী নাট্য চর্চার ক্ষেত্রে কোন বাধার সম্মুখীন হয়ে দাঁড়ায়?
নারায়ণ দেবঃ--নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে আর্থিক সংকট প্রধান এবং অন্যতম বাঁধা।
সঞ্জীবঃ--নাটক হল সমাজ দর্পন --- ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি মেলে দিলে দেখতে পাই -- সমাজের শোষণ যন্ত্রনার কথা, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও অবহেলার কথা নাটকে তুলে আনতে গিয়ে অনেকে প্রাণ দিতে হয়েছিল -- সফদার হাজমি সহ আরো কতো -- ইংরেজ আমলেও আমরা নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের কথা শুনেছি --- সেই প্রেক্ষাপট দাঁড়িয়ে আপনার দীর্ঘ নাট্য জীবনের বিশেষ কিছু স্মৃতি জানতে চাই।
নারায়ণ দেবঃ--জরুরি অবস্থা কালীন সময়ে বিধায়ক ভট্টাচর্যেের 'তাহার নামটি রঞ্জনা' নাটক করার জন্য পুলিশের অনুমতি পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার প্রাকমুহুর্তে রূপমের 'ক্যাপ্টেন হুররা' নাটকের প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক এমনি ভাবেই এল,ডি,জি-র 'ফেরারী ফৌজ এবং ত্রিপুরা সংস্কৃতি পরিষদেন 'মারিচ সংবাদ 'নাটকের প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
সঞ্জীবঃ--নাটককে দর্শকদের সামনে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে আপনার পরামর্শ কী হবে।
নারায়ণ দেবঃ---আকর্ষনীয় করতে প্রযোজনার মান উন্নত থেকে উন্নততর করতে হবে। একটাই বক্তব্য নাটকের মান বাড়াতে হবে।
সঞ্জীবঃ--ত্রিপুরার নাটককে আরো বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে আপনার বিশেষ কোনো ভবিষ্যত পরিকল্পনা আছে
নারায়ণ দেবঃ---নাট্য চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগরতলায় সম্মিলিত নাট্য মঞ্চ তৈরী হয়েছে ১৫ টি নাট্য দল নিয়ে। প্রতি দল মাসের শনিবার নাটক করবে। মহকুমায়ও এটা করতে পারলে ভাল। প্রতিটি নাট্যদলের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত মজবুত করতে হবে। একে অপরকে সাহায্য করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়াস জারি আছে।
0 মন্তব্যসমূহ