গুচ্ছ কবিতা // তৈমুর খান


🖍 অনুভূতি

তোমার হাতের ছোঁয়াটুকু
লেগে আছে শরীরে আমার
আমি তাকে অনুভূতির অ্যালবামে রাখি
প্রতিটি বসন্তে পাতা ঝরে গেলে
তাকেই ফোটাতে চাই নতুন মঞ্জরী
অনুভূতির মৃত্যু নেই
প্রাচীনত্ব নেই
অনুভূতি রোজই এসে দরজায় দাঁড়ায়
নতুন কিশোরী
                                 *****

🖍 আমাকে বৃষ্টির ভেতর রাখো

আমাকে বৃষ্টির ভেতর রাখো
সময়ের কোলাহলে হুলস্থুল পাড়া
আগুন জ্বালায় কারা ?
তির-ধনুক ছুটে আসে
মঞ্চে মঞ্চে যুদ্ধের মহড়া
দিন যায় ।  মাইকে ঘোষণা হয়
নাম পরিচয়
সামনে আলোর বৃক্ষ
মনীষীদের নাম লেখা পাতায় পাতায়
এক একটি নামের কাছে এসে
খুঁজতে থাকি কোথায় করুণা
হৃদয় কোথায় থাকে
হাত বাড়ালেই হাত কাছে আসে কিনা
আমাকে বৃষ্টির ভেতর রাখো
বিশ্বাসও অসহ্য এখন
মরে গেছে সব সান্ত্বনা !
                                  ******

🖍ধ্বংস বেশ বাজনা বাজাচ্ছে

মৃত মানুষের ভিড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে
সদ্য রক্তপাত আর যন্ত্রণার চিৎকার
কোন্ দিকে যাব  ?
ধ্বংস বেশ বাজনা বাজাচ্ছে
সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্ধকার
কোথাও যাওয়ার নেই
চকচকে কাদের উলুধ্বনি  ?
অস্ত্রের বিবাহ অস্ত্রের সাথে
ধর্ষক দাঁড়িয়ে আছে ঈশ্বরের মতো
ধর্ষকের পায়ে কারা ফুল রাখে  ?
কোথাও রাস্তা নেই
সভ্যতা কাঁপে এক বিস্ময়ের জ্বরে....
                            ********

🖍 বিষাদের দেশে

বিষাদের দেশে সন্ধ্যা এল
ভাঙা তোরঙ্গগুলি থেকে
আমাদের নিঃশেষ মূলধন
অবলুপ্ত হবে।
সাংসারিক ক্রিয়ার আলো
গৃহে গৃহে জ্বলে
গৃহিণীরা হৃদয় আগলে রাখে ।
বস্তু পৃথিবীর চাঁদ উদিত হলে
কী নামে তাকে ডাকা হবে ?
ভাঙা তোরঙ্গগুলি নিঃস্ব ইতিহাস...
                                 *******

🖍   কলসী

পর্দা সরিয়ে নিলেই দেখি ছায়ার বাঁশি বাজে
দু একটা জোনাক ওড়ে, আগুনের দানা দানা
রূপকথাগুলি ওড়ে
সহিষ্ণু পাথর হয়ে বসে থাকে কাঙাল স্বপ্নেরা
তবু রথ চলে, ৠতুমতী নারীর কঙ্কণ বেজে ওঠে
ফিরে দেখি একাকী দাঁড়িয়ে আছি ঘাটে
কলসি একা ভেসে গেছে দূর
 ও পাড়ার নতুন তরঙ্গের কাছে
                                    ********
🖍 মরীচিক

মরুর পাহাড়ে প্রথম সঙ্গমদৃশ্য লেখা হলো
অভাবী ঘরের চাঁদ নরম স্তনের মতো
দূর থেকে ছুঁয়ে দেখা
দু একটা হরিণ শুধু ছুটে যায়
বাঁকা ও কাতর শিঙ্ তুলে
ব্যথাতুর ঝরনার খোঁজে….
নিজেকে সামলে নিই
এইসব দৃশ্য বড় আবেগ মেশানো
রোদের ভাষায় লেখা অলীক নাটক
যদিও বাস্তব কিছু দৌড় সারাদিন
শোনায় পদধ্বনি…
                                   ********

🖍 শিকারি

শাদা বক হয়ে দিন বসে থাকে জলে
জলের ভেতরে জটিল মাছের গান শোনে
দু একটা স্বরলিপি তুলে নেয় ঠোঁটে
কেননা, তারও জীবিকা আছে সময়ের স্রোতে
রক্তমাখা উল্লাস আর জৈব তাড়না
মাঝে মাঝে উন্মনা করে দ্যায় তাকে
জল তবু দেহ ঢেকে চলে যায় জলে
শিকারির ধ্যান বাড়ে সকালের প্রত্যাশায়
                                    *********
🖍 সমস্ত যুদ্ধের পর

অনেক মৃত্যুর পর এই বেঁচে থাকা
হেসে ওঠে মাঝরাতে
কোনও পিয়ানোর সুরে
খোলাচুল উড়ে আসে তার
বুকের ভেতর থেকে জ্যোৎস্নার ফণা
দেখি দেখি চাঁদ গলে গেছে সারা দেহে
সমস্ত যুগের রক্ত বয়ে গেছে
এই পথ প্রগলভ অতীত
তবুও নিহিত এক মর্মের জানালা
চেতনা ফিরে পায় মৎস্যমুখী মেয়ে
আকাশে গহনে জলে লেখে আলপনা
বিন্দু বিন্দু বেঁচে ওঠা ঘুম
                                     ******

🖍 ঈশ্বর

লীলাকে ডাকিনি কাছে
শরীরই ঈশ্বর হয়ে আমার শরীরে শুয়ে আছে
নিজস্ব ফাঁকা আস্তাবলে আজ কোনও ঘোড়া নেই
সব ঘোড়া অশ্বিনীকুমার হয়ে গেছে
প্রাচীন পৃথিবীর রহস্য-আলোয় জল খেতে এসে দেখি
সব ঝরনায় আমারই ঈশ্বর হেসে ওঠে….
                                   *******

🖍 বাসরবাগান

সব ফুল ফুটবার আগেই
সৌরভ এসে উপস্থিত হয়েছে বাগানে
ফুলের দিকে তাকালেই
 জড়িয়ে ধরছে হাসি
স্বপ্নের সেই পেলব পাপড়িগুলি
এক একটি ইংগিত ডাকছে আমাকে
আগাছার ভিড় ঠেলে
লতানো গাছের বাহু ঠেলে
এগিয়ে চলেছি
আজ ঘাসে ঘাসে শয্যা পাতা আছে
পাতায় পাতায় আশ্চর্য কাহিনি...
                                   *******

🖍 সৌজন্যে

কোথাও কোথাও পরমজনেরা থাকে
দেখা হয়
 তাদের সৌজন্যে আহ্লাদ পাই আমি
দুঃখের ঘষা ঘষা দাগগুলি
 মুছে ফেলি
 আর ক্ষত স্থান জুড়ে রক্তজবা ফোটাই
শোকের ঝরনার তীরে
 কুসুম কুসুম সকাল হলে
আনন্দের প্রতীক্ষায় রোদ খুঁটে খাই
                           *******

🖍 জলজ

নিজেকে ব্যঞ্জনা ছাড়াই তোমার কাছে উপস্থিত করি
আমাকে স্পর্শ করো —
বয়স কি গোখরো সাপ ছুঁলেই ছোবল দেবে ?
শ্যাওলা সরিয়ে দ্যাখো, স্নিগ্ধ জলের তলায়
আমারই নিভৃত অঙ্কুরোদ্গম...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ