এই সময়ের ভাষায় তীক্ষ্ণ তরবারীর মতন লেখনী লীলার রেখা এই প্রিয়া মিতা।সকলের পাতে তুলে দিয়ে সন্দীপ সাহু আমাদের নিকটজন হয়ে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করলেন।তাঁকে আমাদের কৃতজ্ঞতা।
প্রিয়া মিতা
সন্দীপ সাহু
মিতা, তোমার বসন্তমাখা চিঠিটা
আকাশে ঘুড়ি উড়িয়েছিল। ডাকঘুড়ি।
বোঁও বোঁও করে সারা ব্রম্ভাণ্ডে
আদিখ্যেতার সাড়া ফেলে সে এক
প্রলয়ের কাঁপন ধরিয়েছিল,
পাহাড় নদী বন আকাশ বাতাস
ফুল মৌমাছি প্রজাপতিতে!
কোকিল ছিল সেই প্রলয়-সঙ্গীতমঞ্চের
মুখ্য এবং একমাত্র শিল্পী!
তোমার অসম্ভব সুন্দর ছবি এঁকেছিলাম
মোনালিসা হেলেন সেলিমপ্রিয়া কোথায় লাগে!
সে ছবি শুধু আমিই দেখেছিলাম!
তোমাকে দেখাতে চেয়েছি।
তুমি আমাকে দেখেছো তোমার আঁকা।
বাসন্তীরূপে তুমি বসন্তরাণী!
তোমার পরনে লাল হলুদ রঙ
কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া তোমার চূড়া!
সাদা মেঘে জ্যোৎস্নায় ভেজা পাপড়ি তুমি!
আজ প্রভাতে নবারুণবাবু মিষ্টি হেসে
সূয্যিমামা দেয় হামার মতো করে
আমার চোখে এসে বসন্তরাজ হতে বললে!
ওঠো ওঠো তাড়াতাড়ি ওঠো অনেক কাজ যে বাকি!
দাদাঠাকুর রাবীন্দ্রিক দাঁড়ি নেড়ে
মিলন যজ্ঞের তদারকি করছেন!
ওনার আমন্ত্রিতদের মধ্যে কে নেই!
সব্বাই এসেছে প্রজাপতির রঙে রঙিন হয়ে,
গোটা ছায়াপথ জুড়ে আয়োজন!
তুমি এলে ধূসর কোষে আমি
গোটা একটা বাগান হয়ে যাই।
তোমার সমস্ত রঙ প্রজাপতি হয়ে
বাগানময় ফুলে ফুলে নেচে বেরায়।
জ্যোছনার তারারা তোমার সহনর্তকী
জোনাকিরাও নেচে ওঠে তোমার নিক্কনে!
চাঁদ সম্ভবত সমস্ত চিত্রনাট্যটা জানে।
স্থির হাসিতে প্রজ্ঞায় স্থিতধী।
পরাগমিলনের ক্ষণের জন্য পাপড়ি মেলে ধরি!
মিলনযজ্ঞে অনেক গান অনেক নাচের পর
সমস্ত অতিথি বিদায় নিলে,
দাদাঠাকুরের নির্দেশে জাগা বাসরে
নাটোরের বনলতার সঙ্গে জীবনানন্দের মতো
তোমার সামনে বসবো
তোমার কোলে মাথা রাখবো
তুমি রাখবে আমার কোলে।
অখণ্ড নীরবতায় অন্ধকার কথা বলবে
আমার তোমার জীবনালোর!
হাতে হাত চোখে চোখ হারিয়ে যাবো সংখ্যাহীনতায়!
সংখ্যাহীনতাই তো সবচেয়ে বড় সংখ্যা।
ওতে হারাতে পারলেই সব সংখ্যাকে ধরা যায়!
আকাশে হারালেই ব্রম্ভাণ্ডকে পাওয়া যায়।
আমরাও ব্রম্ভাণ্ডকে খুঁজে নেবো ছায়াপথে হেঁটে হেঁটে
ঝড়-জল ভূমিকম্প সুনামি সবকে হেলায় হারিয়ে!
মিতা মিতা মিতা মিতাই ব্রম্ভাণ্ড আমার
আর আমি তো মিতারই।
দুজনেরই একটাই ব্রম্ভাণ্ড।
২
সেদিনের সেই অযোধ্যা পাহাড়ের কথা মনে পড়ে?
ডিসেম্বর মাস। জুবুথুবু ঠাণ্ডায় আমি শীতবুড়ো!
তুমি যেন দীঘল গ্রীবার পরিযায়ী সারস!
দু'হাত দুদিকে ছড়িয়ে ধীর লয়ে উড়ে যাচ্ছ চূড়ায়,
মেঘেদের আলতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
শীতবুড়ো চেয়ে থাকি অসহায়তা মেখে!
ব্রম্ভাণ্ড ছাড়া কি বাঁচা যায়, না ওড়া যায়!
হাত বাড়ালে।ধরতেই,খিল খিল করে হেসে উঠলে।
ঢেউয়ে ডানা পেলাম। উড়তে শুরু করলাম!
উড়তে উড়তে সাদা মেঘ মাখতে মাখতে
কত কথা কত হাসি হয়েছিল সেদিন।
চঞ্চুতে চঞ্চু রেখে পাখিরা যেভাবে বলে।
মুহূর্তে শীতবুড়ীকে বিদায় জানিয়ে এল বসন্ত, শরৎ।
আমাদের ইচ্ছেতেই কাশময় হল অযোদ্ধা।
দখীণাবাতাস কোথায় ছিল কে জানে!
দুলে উঠল কাশমাথা, নিক্কন উঠল তোমার পায়ে!
আমি বেচারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়!বেতালে পা ফেলতেই
ঝর্ণা ঝরালে। ঝর্ণা আমাকে নাচ শেখাল।
অন্ধকার জেগে উঠল সূর্যকে ঢেকে
জাগাল তারাদের, জাগাল চাঁদকে।
অযোধ্যার বনে বনে লক্ষ্য লক্ষ্য তারা
জ্বলছে নিভছে।জ্বলছে নিভছে।
উপরে তারা, নীচে তারা। উপরে চাঁদ নীচেও।
রম্ভা বিদ্যাধরীর কথা শুনেছি ঠাকুমার মুখে।
ঠাকুমা দেবসভায় তাদের নাচ গান
দেখছেন শুনছেন অনেক বছর হল।
আমি তুমি আজ দেখছি জলজ্যান্ত!
এখনো তুমি যখন আমার দিকে তাকাও
মনে হয় কাকচক্ষু দিঘি তোমার চোখে স্থির।
বিগত সাত জন্ম থেকে আগামী সাত জন্ম
তাতে স্পষ্ট দেখতে পাই। তুমিও কি পাও না।
কতবার বলেছো আমার চোখে সাগর-ঢেউ খেলা করে।
সেই ঢেউয়ে ছোঁয়াছুঁই খেলতে খেলতে তুমিও দেখতে পাও।
সাগর বেলাভূমীতে, অযোধ্যার গায়ে মাথায়
আমাদের গায়ের গন্ধ, বসন্ত,শরৎ, দখীণাবাতাস
জীবন্তজীবাশ্ম হয়ে যায় মহাকালকে সাক্ষী রেখে।
শক্তি ও ভরের নিত্যতাসূত্র মানলে আমরাই
ফিরে ফিরে আসি। পাহাড় সাগর-বেলাভূমি খুঁড়ে খুঁড়ে
জীবন্তজীবাশ্ম খুঁজছে খুঁজে নিজেদেরকে চিনি।
শুনতে পাই আমাদের বিগত বসন্ত, শরৎ, দখীণাবাতাসের মিষ্টি গল্পগুলো।
আমাদের আজকের গল্পগুলো তো সেই ভিতেই।
রামী-চণ্ডীদাস, পদ্মাবতী-রত্নসেন,লায়লা-মঞ্জু...
আরো কত জীবন্তজীবাশ্ম আনন্দে গাইছে নাচছে
কত কথা বলছে। তবে আজকের ভাষায়।আমাদের মধ্যে।
৩
তুমি মাথা নীচু করে ঘাস ছিঁড়ছো।
পাশে বসে আমিও।
ময়দান চত্বর।এক মায়াবৃক্ষের তলায়।
সামান্য দূরে ভিক্টরিয়া।ওখানে ছোটো ছোটো ঝোপের ভেতর গন্ধর্ব বিবাহে নীল মানুষ-মানুষীরা।
ঘাসেদের জন্ম সার্থক করে আমরা দু'জনে
ক্লোরোফিল মাখছি। মাঝে মাঝে টুক টাক কথা হাসি।
ভালোবাসা প্রাথমিকে তৃণভোজীই থাকে বিশুদ্ধ নিরামিষ!
ঝর্ণার উচ্ছ্বলতায় যে নিরামিষ ,মদিরতায় ছড়ায়!
তোমার কথা গান হাসি নাচ স্রোতস্বিনী
উচ্চগতিতে ভাসিয়ে নিয়ে চলে।
এক, না বলতে পারা প্রচণ্ড সুখে ভেসে চলি
একটা জিনিস ভেবে ভয় হয়।
কোনো প্রচণ্ড পাথর দাঁড়িয়ে থাকবে না তো
আমার ভেসে যাওয়া মিতা-স্রোতের সামনে!
তুমি বলে চল। আমি ভেসে চলি। ভয়কে ভুলে।
তবু ভোলা যায় না। মরিয়া হয়ে নিজেকে বলি
যখন যা হবে, তখন দেখা যাবে।রক্তাক্ত না হলে কিসের প্রেম!
গোধূলিতে লাল মাটি আদিবাসী প্রান্তরে
শালগাছগুলো পাতা ছড়িয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে।
আদিবাসী কুটিরগুলো নিকানো লতাপাতা আঁকা।
তুমি বসে আছো ছোট্ট একটা টিলার ওপর। নিথর।
সারা আকাশের রঙ মেখে। মায়াবিনী অচিন পুরের।
জোছনায় জেগে উঠল মাদলের শব্দ গান মহুয়া-গন্ধ
তালে তালে পালক গোঁজা মানুষ মানুষী ঢেউ তুলল।
তুমি ভাসলে। মহুয়া পান করে গুঁজেছি পালক।
লালমাটি আকাশ মানুষ মানুষীর লাবণ্যে সুন্দর হলাম আমি তুমি।
বৃষ্টি পড়ছে। ঝিরঝিরে। কাঁচের জানলা দিয়ে দেখছি
আশে পাশের দু'চারটা নারকেল গাছ,টবের গাছ
স্থির ভাবে ভিজছে। বৃষ্টির তালে পাতারা নাচছে।
তুমি কি করছো? কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে।
ইচ্ছা করছে তোমার গন্ধ মেখে খুব ভিজি।
ইচ্ছা তো শুধু বিলাস নয়। তোমার গন্ধ তো
আমার কাছে রাখাই আছে। ভাসলাম আবার।
মেরিনড্রাইভের তীরে। আরব্যরজনীর উচ্ছ্বাস
আর বৃষ্টিতে দু'হাত ছড়িয়ে উড়লাম তোমার মতো।
ভাইয়ের রক্ত মাখা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে
ভাষাশহীদ উদ্যান চত্বরে ভাষা দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি
সাহিত্য উৎসবের আমন্ত্রণে যোগ দিয়ে
দেখেছিলাম কত আমি তুমিকে।ভার্সিটিতে
বাংলা একাডেমিতে ভাষা শহীদ উদ্যানে।
পদ্মায় ভাসতে ভাসতে দু'হাত ছড়িয়ে দিয়েছি আকাশে
ব্রম্ভাণ্ড ছাড়া ওড়া যায় না। আর তুমি তো রয়েছো
আমার প্রতিটি নিলয়ে অলিন্দে। শিরায় উপশিরায়।
পদ্মার ইলিশ নিয়েছি তোমার জন্য।
৪
রাজস্থানে রাজা রত্ন সেনের দুর্গে গিয়েছিলাম
আমি তুমি। আমাদেরকেই খুঁজতে।
দুর্গের পরতে পরতে জীবাশ্ম।
দেখলাম সরোবরের মাঝে রাণি পদ্মিনীর প্রাসাদ।
দেখলাম রেলিং ঘেরা সেই জায়গা যেখানে
পদ্মিনীসহ ষোলশ বিধবা জহরব্রত পেলেছিল।
তুমি আমাকে জাপটে ধরলে। আগুন-তাপে রত্ন হলাম।
পাশের পাড়ায় এক ধনকুবের আলাউদ্দিন আছে বটে
আমার কশেরুকায় রত্ন সেনের তরবারি বাজে।
এখন রাজারা যুদ্ধ করে না সেই রকম।
যুদ্ধ এখন বেনিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। রাজারা বোরের মাত্র।
কত মানুষ মারতে কত অস্ত্র লাগবে কত লাভ হবে
সমস্তটাই হার্ডডিক্সে লোড করা আছে আগে থেকেই।
তুমি আমি আমজনতা মায় রাজাও লাভের কড়ি মাত্র!
লাভ ভালোবাসাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। বাবা মাকেও।
লাভের হিসেবে বিকোয় সন্তান স্নেহ।
তাই আলাউদ্দিনরা আজও জিতে যায়।
কৌটার ভেতর থাকা ভ্রমরাটাকে দ্বিখণ্ডিত করতেই হবে।
ইনক্লাব জিন্দাবাদ। কার স্বার্থে এই কৃষক আইন?
এই আইন বাতিল কর। বাতিল কর।
স্লোগান উঠছে। মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে আঘাত করছে।
কালো রাস্তায় লাল মিছিল চলছে যুদ্ধ জয়ের দৃঢ়তায়।
রক্তপতাকায় কাস্তে হাতুড়ি তারা। আমার হাতেও একটা।
তুমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে। দাঁড়ালে।
চোখ পড়তেই মুষ্টি নামিয়ে হাত ছানি দিলাম।
তুমি দৌড়ে এলে, আমার সামনে মিছিলে পা মেলালে।
শ্লোগান তীব্র হল তীক্ষ্ম হল। এই আইন মানছি না মানব না।
রূপনারানের তীরে এই বিষয় অনেক কথা হয়েছিল
তুমি অবাক বিস্ময়ে বলেছিলে , এতো নীলকর সাহেবদের ফিরে আসা! আমি বলেছিলাম
ইস্টইণ্ডিয়ার জীবাশ্ম মেখে কর্পোরেটের নূতন পথের নীল নক্সা। মুমূর্ষু হয়েও বার বার ফিরে আসা।
দিঘি টল টল করছিল, অসহায় ভাবে জিজ্ঞাসা করলে,
আমার বাবা কাকা দাদাদের কী হবে! কাঁপা গলায়।
আমি তাকিয়ে থাকলাম রূপনারানের চরে
ছলাৎ ছলাৎ করে কঠিন সত্য ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে তোমাকে।
আজ রেল রোকো। জাতীয় সড়ক অবরোধ। রাজ্য জুড়ে।
হাজার হাজার কৃষক। তুমিও এসেছো। সঙ্গে বাবা কাকা দাদা। আলাপ করালে। অনেক আশা তাদের চোখে।
চিন্তা করবেন না। আমরাই শেষ কথা বলে এসেছি
বার বার। জিৎ আমাদের হবেই। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। শ্লোগান উঠল। ইনক্লাব জিন্দাবাদ।
এই কৃষক আইন মানছি না মানব না।
তুমিও গলা মেলালে। বাবা কাকা দাদার হাজার কণ্ঠ মিলল।
মুহূর্তে ছুটে এল উর্দিধারীরা, চলল লাঠি টিয়ার গ্যাস।
৫
তাজমহলে তুমি আমার মমতাজ।
আগ্রার দুর্গ থেকে অসহায় ভাবে নয়,
একেবারে সামনে থেকে মমতাজকে দেখছি।
লোলুপ তাপে পুড়ে মমতাজ শব হয়েছিল
আজকের যমুনার মতো।
আমি তোমাকে সেরকম মমতাজ ভাবি না।
তোমাকে দেহের নয়, হৃদয়ের যে উত্তাপের গোলাপ ফোটে,
তাতে জড়িয়ে রাখতে চাই, আমার তাজমহলে।
যমুনা প্রাণ পাবে, তুমি নাইবে তাতে।
মথুরাতে কৃষ্ণের জন্মগৃহে যখন তুমি দাঁড়িয়েছো,
মনে হয়েছে কংস নয় রাধার জন্যই কৃষ্ণর জন্ম!
কংস তো নিমিত্ত মাত্র। ধন্যবাদ কংসকে!
যমুনা তীরে কৃষ্ণের লীলাবৃক্ষে রাখা কাপড়ে,
তুমি মুখ ঢেকো না। এই লীলা আমাকেও লজ্জা দেয়।
বৃন্দাবনের লীলা অরণ্যের প্রতিটি পাতায় আমাদের ছবি।
ছোট্ট অরণ্যটা ঘেরা কংক্রিট ব্যবসায়,
যে ভাবে স্বার্থের ঘেরাটোপে গোলাপ পাপড়ি মেলে!
এসো গোলাপটাকে মেখে নিই হৃদ-ঝর্ণায়।
বেনারসের দশাশ্বমেধ ঘাটে তুমি তন্ময় গঙ্গারতিতে।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমি তন্ময় তোমায়।
সিরির ধাপে হাঁটু মুড়ে বসে, গালে এক হাত।
মূর্তিময়ী তন্ময়তা হাজার দীপে ময়াময়ী!
সময় যেন অমর হয়ে গেছে!
চার দিকে প্রায় দিগম্বর সাধু সন্ন্যাসীর গঙ্গাস্তব,
গঙ্গার জলে আলো-ঝিলিক
সুন্দরী মা তুলশীমঞ্চে আনত,এক অলৌকিক ভাস্বর।
সবটাই মিলেমিশে গেছে তোমায়। আমার হাজার চোখে গঙ্গা।
আমাদের গভীর বিশ্বাসেও মুখোস পড়ায় করোনা।
শুধু আমাদের নয় গোটা বিশ্বের মুখে।
আসলে কোরনাকেই বিশ্বাস নেই। এই অবিশ্বাসও
বিশ্বাসকে হারাতে পারে না। যোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ়।
কতদিন তুমি আমি আরো অনেকে দাঁড়িয়েছি
মানুষের পাশে মানুষ হয়ে। খলনায়ক সনু সুদের মতো।
মাক্স বেঁধে মাক্স পড়িয়েছো, পৌঁছে দিয়েছো খাবার
পোষাক সুদূর সুন্দরবনের বড় রাক্ষসখালিতেও।
মাক্সের ভেতর আরো গাঢ় হয়েছি আমি তুমি।
দীঘা ডাকছিল কবে থেকে। সময় হচ্ছিল না। একদিন মরিয়া হয়ে চেপে বসলাম দ্বিচক্রে দুজনে।
মনে পড়ছে মিতা? সে এক অনাস্বাদিত সুখ উড়ান!
দু'জনের, এক ব্রম্ভাণ্ড হয়ে মহাকাশ চিরে উড়ে চলা!
বিশ্ব করোনাতঙ্কে কোয়ারেন্টিন কংক্রিটে,
আমরা বালি মেখে, নূন মেখে দীঘা-ঢেউয়ে কোয়ারেন্টিন!
গাঙচিল লালকাকড়া কোরনাকে থোরাই কেয়ার করে
কথা বলে হাসে জানায় তাদের প্রেম-কথা।
দীঘা-ঢেউয়ের পরতে পরতে গোলাপ-ঘ্রাণ জাগে।
৬
দার্জিলিং ম্যাল যে আকাশকে ছুঁয়ে থাকে,
তোমার দিঘি তা ধারণ করে মহাকাশ হয়ে যায়।
টাইগারহিলে দেখতে পাওয়া,এভারেস্টর চূড়ায় ধরা নানান রঙের যে সূর্য, তোমার দিকে তাকালে
লাল সিঁথির মাঝে তাকে দেখি কল্পনায়।
টাইগারহিলের দোতলায় তুমি নিথর এভারেস্টে।
আমি তোমাতে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে মনে পড়ল সত্যজিৎকে।
আকাশ নেমে এল, এভারেস্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা ধরল আমাদের হাত।
সমতলে ধান ক্ষেতে আকাশ ছোটো।
নদীতে থাকে না স্রোত। বুকে জমে চর।
হিসেব বড় হয়ে জেঁকে বসে মনে।
এভারেস্টের কাছে কোনো হিসাব বড় হয় না।
কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছেও।
এদের হাত আমি ধরে রেখেছি, তুমিও ছেড়ো না।
আত্মজদের আকাশ শেখাতে হবে।
তার আগে অবশ্য শেখাতে হবে এভারেস্ট ...
ওদের হাত ধরে রাখতে হবে আমাদের।
সিকিম, সুন্দরী সিকিম। তুষার ঝরে এসে
জমা হয় পায়ের নীচে। গ্যাংটক পেলিং
পাহাড়ের গায়ে সরু সুতোয় আটকে!
জীবন যেখানে ঝুলে থাকে মরনের দিকে মুখ করে
অকুতভয়ে। প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চ-শিহরণ।
রোমাঞ্চকে প্রতি লোমকূপে ধারণ করে অকুতভয়ে
মরনের দিকে এগিয়ে চলেছো খিল খিল তরঙ্গ তুলে।
আমি একটু পিছনে ভয়ে ভয়ে। তুমি উড়িয়ে দিলে চুম্বন।
প্রজাপতি অভয় দিয়ে পথ দেখিয়ে চলল তোমার দিকে।
বাবাসাহেব সেনা-ঈশ্বর। শুধু সেনার নয়, ভারতবাসীর।
সব ধর্মের সব জাতের ভারতবাসীর।
অন্ধভক্তিতে তিনি চীনের সামনে অশরীরি প্রাচীর।
চীনের প্রাচীরও ছোটো হয়ে যায় অনায়াসে।
তুমি পুজো দিলে নিজের মতো করে।
শ্রদ্ধার স্পর্শ রাখলে ওনার সেনা-উর্দিতে
হাত ছুঁয়ে প্রণত হলে ওনার বুটজোড়ায়।
দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাবাসাহেব জীবন্ত হলেন।
জাতীয় পতাকাকে প্রণাম করলে তুমি।
পাহাড়ের পথে তুষার মেখে হাঁটতে হাঁটতে
কৈলাসের কথা বললে, মানস সরোবরের কথা বললে।
মহাদের জটা,গঙ্গা, ভগীরথ আরো কত কথা।
আমি মন দিয়ে শুনে যাই। শুনি না কিছুই।
ঠাকুরমার মুখে অনেক শুনেছি। কল্পকথা, আজ অবান্তর।
আমি শুধু দেখি তোমাকে। ওই গল্পর থেকে তুমিই সত্য।
"সত্য যে কঠিন" প্রতি পদে নেয় অগ্নিপরীক্ষা।
সীতাকে দিতে হয়েছিল শুধু। অনেকে মনে করেন।
রামকেও দিতে হয়েছিল। আমাদেরও দিতে হবে।
৭
হাথরস আর্তনাদে তুমি বিপর্যস্ত। আমিও।
রাষ্ট্র পঁচিশ লক্ষ দেবে। ক্ষতিপূরণ।
করোনায় মরলে পেতো কি!
হাথরসে বিবেকানন্দ ছিলেন দিন চারেক।
রামকৃষ্ণ মিশন কোনো রা করছে কি!
খিচুড়ি নিয়েও গেল কি!
পুলিশের ঘেরাটোপে পরিবার খেতে পেত।
ওনারা বন্যায় খিচুড়ি নিয়ে যান।
মা শারদাকে রামকৃষ্ণ পুজো করেছিলেন।
বিবেকানন্দ মুসলিম কিশোরীকে পুজো করেছিলেন।
সন্ন্যাসী, যার থাকার কথা ছিল অরণ্যে বা গিরি কন্দরে,
সে সিংহাসনে। সুরা-সিংহাসনের সঙ্গে নারীর
দীর্ঘ জুলুমের সম্পর্ক। গেরুয়া পড়লেও।
মিতা তুমি ভয় পেও না। আমি গেরুয়া পরি না।
কোনো সিংহাসনেও বসে নেই।
বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও বলি না আমি।
বলি না, এটা বলার মতো কথাই নয়, কাজের কথা।
ভয় পেও না। গেরুয়া নীল-সাদা যে কোনো সিংহাসনকে,
ইট গেঁথে গেঁথে জীবন্ত দাফনের ব্যবস্থা করবো।
চোখ থেকে হাত নামাও। অশ্রু মোছো। আগুন জ্বাল।
তাকাও আমার দিকে। দেখ ভিসুভিয়সকে।
কান পাত মিছিলে, আগুন স্লোগান শুনতে পাবে।
চোখ মোছো মিতা। ওঠো। ওটা তোমার আমার
আমাদের ভবিষ্যত-এর মিছিল। পা মেলাই চলো,
অভীষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছনো পর্যন্ত।
বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষপূর্তিতে মালা দিয়েছিলাম।
পা না মেলালে ওনাদের অসম্মান করা হবে। নিজেদেরকেও।
ওই দ্যাখ ওরা চলেছে হাথরাসকা বেটি কো ইনসাফ চাহিয়ে।
ভারতকা বেটি কো ইনসাফ চাহিয়ে।
তুমি এগিয়ে চললে। হাথরসের পথে। সামনে পুলিশ প্রাচীর।
মাছকে বিড়াল পাহাড়া দিলে বুঝতে হয় বিড়ালটা পোষা।
ভাগাড়ে গরু পড়লে শকুনেরা উড়ে আসে।
রাজনীতির গন্ধে নেতা নেত্রীরা আসে কুমিরের অশ্রু নিয়ে।
তুমি আমি আসি বাঁচতে বাঁচাতে।
হাজার কণ্ঠে স্লোগান ওঠে হাথরসকা বেটি কো
ইনসাফ চাহিয়ে, ভারতকা বেটি কো ইনসাফ চাহিয়ে।
মিডিয়ার টিআরপি চাই, ব্যবসা চাই।
চাই মায়ের কান্না-ছবি। বাবা দাদার সিবিআই দাবি।
রিপোর্টার ক্যামেরাম্যান ধর্ষণের পোস্টমর্টেম করে!
টিআরপি বাড়ানো মানুষেরা রবিবার মর্টন লাঞ্চ সারে।
চা-দোকানে নীল মানুষগুলো ধর্ষক-বিরোধী শিরা ফোলায়।
ঘরে ফিরে গিয়ে লুকোনোর কোণ খোঁজে।
বিধায়ক সাংসদ ধর্ষিতার দোষ বার করে।
ডাক্তাররাও ভালো দাম পায় ধর্ষিতার আর্তনাদে বধির হয়ে।
তবুও ভয় না পেয়ে তুমি ক্রমশ ভিসুভিয়স হয়ে উঠছো।
0 মন্তব্যসমূহ